Pages

Monday, 9 February 2026

বালিকা বেটি - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 

 
বাড়ি থেকে বেরিয়ে মোড়ের দিকে হাঁটছিলাম। পুকুর পাড়ে পৌঁছতেই একটা ভাঙ্গা গলার স্বর কানে ভেসে আসলো—“কুদিন আলেন মামা?” ফিরে দেখলাম, বালিকা বেটি পেছনে গায়ে একটা বহু পুরনো জীর্ণ-প্রায় সাদা শাড়ি, মলিন মুখ, হাতে কটা চ্যালা কাঠ। তাঁর আসল নাম আমি জানি না।বালিকা বেটিনামেই তাঁকে চিনি জানিসম্পর্কে পিসি হবেন, ধর্ম আলাদা হলেও আমাদের সম্পর্কের মাঝে কোনো দেয়াল নেই। আমাকে দেখা মাত্রই এই প্রশ্নটা করেন এই একটা প্রশ্নেই যেন আত্মীয়তার সব সংজ্ঞা পূর্ণ হয়ে যায়। আমিও হেসে বলি— “এই তো বেটি, আইজ্কা বেহানে আইছুতিনি সঙ্গে সঙ্গে যোগ করেন— “বউমা, ভায়ালা সবায় ভালো আছে মামা?”
কুশল বিনিময়ের এই সহজ কথাগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকে অগাধ মমতা নির্ভেজাল আন্তরিকতা জীবনের পাঠশালায় বালিকা বেটি আমার কাছে এক নিঃশব্দ অধ্যায়যার গভীরতা বিশালপ্রায় তিরিশ বছর আগে তাঁর জীবনের আকাশ ভেঙে পড়েছিল। স্বামীকে হারানোর ক্ষত তখনো শুকোয়নি, তার আগেই যাকে আঁকড়ে বাঁচার কথা ভেবেছিলেনসেই একমাত্র মেয়ে মিনতিকেও কেড়ে নেয় মৃত্যু। দুবার সর্বস্ব হারিয়ে অনেকেই ভেঙে পড়েন, কিন্তু বালিকা বেটি ভাঙেননি। কান্নাগুলো বুকের গভীরে শক্ত করে বেঁধে রেখে, জীবনটাকে কাঁধে তুলে নিয়েছেন নিঃশব্দে। কেউ দেখেনি তাঁর চোখের জল, কেউ শোনেনি তাঁর দীর্ঘশ্বাস।
 
তাঁর জীবন অবলম্বন বলতে বাঁশকুড়ি-মহিপাল রাস্তার ধারে ছোট্ট একটা চায়ের দোকানখুবই সাধারণ, বাঁশের বেড়া ও টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরিকিন্তু সেই দোকানের প্রতি-কাপ চায়ের ভেতর মিশে থাকে সংগ্রামের ঘাম, স্বজন হারানোর যন্ত্রণা আর এক অনমনীয় আত্মমর্যাদাবোধ। এই দোকানটা শুধু রুজি-রোজগারের জায়গা নয়; এ যেন তাঁর বেঁচে থাকার ঘোষণা। অভাব তাঁর নিত্যসঙ্গী, তবু কোনোদিন হাত পাতেননি। দুঃখ তাঁর প্রতিদিনের অতিথি, তবু কারো কাছে অভিযোগ করেননি কাপের পর কাপ চা বানিয়ে তিনি জীবনের চাকা সচল রেখেছেনকারো দয়ায় নয়, নিজের মেহনতে  
 
আমি যখন আমার মেয়েকে নিয়ে তাঁর দোকানের সামনে দাঁড়াই, বালিকা বেটির মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এক অদ্ভুত আভা চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ে। সাবা’কে কাছে ডেকে নিয়ে তার গাল টিপে আদর করে বলেন— “আয় আয়, বুবুনকেমন আছি তুই?” সাবা লাজুক হেসে আমার আড়ালে লুকোয়। বালিকা বেটি হেসে বলেন— “এইডা মোর নাতিন, এইডা মোর মহুবা বু, দেখিলেই মনটা ভরি যায়।” 

রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মায়ার বাঁধন যে কতটা গভীর হতে পারে, সেই মুহূর্তে তা স্পষ্ট রূপে অনুভব করি এই সমাজে অনেক মানুষ আছেন, যারা শব্দে বড়। কেবল মুখে বড় বড় বুলি হাঁকেন। আর কাজের বেলায় লবডঙ্কা। কিন্তু বালিকা বেটি তাঁদের একজন, যারা নীরবতায় বিশাল, কথা কম কাজে বড়অবহেলায় ভরা এই পৃথিবীতে তিনি এক জীবন্ত পাঠকীভাবে ভেঙে না পড়ে, মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয় তিনি তার জিন্দা দলিল।  
 
বালিকা বেটির দোকানে যারা নিয়মিত আসেদেলোয়ার, হুচেন, এনামুল, আরাফাত, অনিমেষ সম্পর্ক বয়সের হিসেবে তারা প্রায় সবাই তাঁর নাতি বা নাতির মতো। তাই সেখানে শুধু চা বিক্রি হয় নাচলে হাসিঠাট্টা, খুনসুটি আর নানা ধরণের গল্পগুজব। অদ্ভুত রকমের এক মায়ার বাঁধন তাঁদেরকেউ তাঁকে পিসি বলে, কেউ ডাকে দিদা। কখনো দুষ্টুমি, কখনো মায়া, আর দরকার হলে নিঃশব্দে পাশে দাঁড়ানোসবই চলে অবিরাম।
 
প্রচণ্ড শীত পড়েছে। পৌষের দ্বিতীয় সপ্তাহ সূর্যের দেখা মেলে না, বললেই চলে। শিকড়ের টানে আমরার সদস্যরা তুলাই নদীর পাড়ে শীতবস্ত্র বিতরণের ব্যবস্থা করেছে। তাঁর নাতি-তুল্য সিদ্দিক-রাব্বানি-লতিফ’রা এই প্রচণ্ড শীতে ভালোবাসার টানে যেন খানিকটা জোর করেই তাঁর হাতে তুলে দেয় একটি কম্বলউপহার হিসেবে নয়, আপনজনের দায়বদ্ধতা হিসেবেবালিকা বেটি প্রথমে নিতে চাননিবলেন— “আর কত দিবেন তোমরা?” কিন্তু শেষমেশ চোখের কোণে জমে ওঠা জল লুকিয়ে কম্বলটা বুকে জড়িয়ে ধরেন।
 
বালিকা বেটি কখনো কিছু চান না। কিন্তু জীবন মাঝে মাঝে এমন কিছু মানুষ পাঠিয়ে দেয়, যারা তাঁর চাওয়ার আগেই তাঁর প্রয়োজন অনুভব করে এবং তা পূরণের চেষ্টা করে। আর তাই বালিকা বেটি নাতিদের হাসি, মায়া, খুনসুটি আর ভালোবাসার আদল গায়ে জড়িয়েকণকণে শীতে গাঢ় কুয়াশা ভেদ করে প্রতিদিন বেরিয়ে পড়েন। এক হাতে তাঁর চাবির ঝনঝনানি, আরেক হাতে দুধভরা বোতল। বয়সের ভারে শরীরটা ঈষৎ ন্যুব্জ, পিঠটা সামান্য ঝুঁকে গেছে, তবু তাঁর পা দুটো থেমে থাকে না। কদমগুলো মন্থরকিন্তু ভেতরে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা নিয়ে এগোয়।
 
ওই একই পথ ধরে তিনি হাঁটেনপ্রতিদিন, নির্দিষ্ট সময়ের সরণী বেয়ে। প্রায় তিরিশ বছর ধরে। কী শীত, কী বর্ষা, কী গ্রীষ্মকোনো কিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি। কখনো কুয়াশায় পথ ঢেকে যায়, কখনো বৃষ্টিতে ভিজে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে ওঠে, তবু বালিকা বেটি হাঁটেন, এক অদ্ভুত ছন্দেকারণ ওই পথের ধারে শুধু একটি চায়ের দোকান নয়ওখানে অপেক্ষা করে তাঁর বেঁচে থাকার অর্থ, তাঁর আত্মসম্মান, আর নীরব সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস।
 
০২/০১/২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা

Thursday, 5 February 2026

কালবৈশাখীর তাণ্ডবে - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 

 
সালটা ১৯৭১ উত্তাল সময়। বাতাসে বারুদের গন্ধ। খান সেনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘর্ষ চরম পর্যায়ে। চারদিকে অনিশ্চয়তা, ভয় আর টানটান উত্তেজনা। সীমান্তে শুরু হয়েছে বেশ কড়াকড়ি। ফলে এপাশের মানুষদের পক্ষে ওপারের ডুংডুঙ্গির হাটে যাওয়া অসম্ভব হয়ে উঠল। যে হাট একসময় ছিল জীবিকার ভরসা, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আদানপ্রদানের মাধ্যম, তা হঠাৎই হয়ে গেল অধরা, চলে গেল ধরাছোঁয়ার বাইরেসংসার চলবে কীভাবেএই প্রশ্নে মানুষ তখন দিশেহারা, উৎকণ্ঠিত। ঠিক সেই সময় গ্রামের লোকজন একজোট হয়ে হাজির হলেন নজিবদ্দিন ও অফিজদ্দিন সাহেবের কাছে। কণ্ঠে অনুরোধ, চোখে অসহায়তার ছাপহাট বসানোর জন্য যদি তাঁরা একটু জায়গা দেন!
 
তাঁরা এবং তাঁদের বংশধরেরা শুধু জায়গাই দেননি, দিয়েছিলেন সাহস আর ভরসা। সেদিন তাঁরা ঘোষণা করেছিলেনএই হাট হবে সবার জন্য, এখানে কোনো জমাতলা লাগবে না, কোনো খাজনাও নয়। বিনা মূল্যে, বিনা শর্তে, সকলের জন্য উন্মুক্ত। মানুষের প্রয়োজনে, মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তারই হাত ধরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল শাটিমারি হাটএকটা হাট, যা শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, ছিল বহু মানুষের বাঁচার অবলম্বন।
 
সেই থেকে শাটিমারি হাট বসে প্রতি সোম ও শুক্রবারে আশপাশের গ্রাম থেকে লোকজন আসে। কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ সাইকেল নিয়ে, কেউ গরুর গাড়ি করে। বাঁশের খুঁটি ও টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি দোকানগুলো, কোনটার ছাউনি খড়ের, কোনোটা আবার ছাউনি ছাড়াই। হাটের উত্তর-পশ্চিম কোণে একটা দুর্গামন্দিরও গড়ে উঠেছিল। বহু বছর আগের কথাআমি তখন খুব ছোট। এক শুক্রবারে বাবার সাথে হাটে গেছি। বাবার হাত ধরে সবুজ মাঠের বুক চিরে যাওয়া সরু আল ধরে গুটি গুটি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সেই স্মৃতি আজও চোখে ভাসে। চারদিকে তখন ব্যস্ততার কোলাহল। কেউ চাল কিনছে, কেউ লবণ, কেউ কাপড়। শিশুরা হাওয়াই নাড়ু, লজেন্স, পাউরুটি আর বাতাসা হাতে হাটের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটছে। সবজিওয়ালাদের হাঁকডাকে কান পাতা দায়। সব মিলিয়ে, আর পাঁচটা দিনের মতোই প্রাণচঞ্চল এক হাট।
 
কিন্তু প্রকৃতি হঠাৎই বাধ সাধল। আসমান তার রুদ্ররূপ দেখাল। আচমকা কালবৈশাখী ঝড় উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে দোকানপাট সব কেঁপে উঠল। বিদ্যুতের চমক, বজ্রের গর্জন, উড়ে যাওয়া পলিথিন আর ভাঙা ডালের শব্দে চারদিক যেন ত্রস্তহাটে তখন মানুষের ঢলকেউ কেনাবেচা ফেলে দিগ্বিদিক ছুটছে, কেউ আবার প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয়ের খোঁজে।
 
সেই মুহূর্তে আশ্রয় বলতে একটাই জায়গাহাট-লাগোয়া সেই দুর্গা মন্দিরের চালা। মাটির দেয়াল, টিনের ছাউনিঅতি সাধারণ এক আশ্রয়। কিন্তু বিপদের দিনে সেটাই হয়ে উঠল সবার ভরসা। হিন্দু-মুসলিম-সাঁওতালসব পরিচয় যেন ঝড়ের মুখে মিলিয়ে গেল। সবাই এক ছাদের নিচে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে পড়ল। বাইরে কালবৈশাখীর তাণ্ডব, ভেতরে মানুষের কাঁপা কাঁপা নিঃশ্বাস।
 
কালবৈশাখীর হাত থেকে রেহাই পেতে চালার তলে দাঁড়িয়ে যে যার বিশ্বাস অনুযায়ী প্রার্থনায় মগ্ন। কেউ মন্ত্র জপছে, কেউ দোয়া করছে, কেউ আবার নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। ভয় আর আশার এক অদ্ভুত মিশেল তখন বাতাসে।
 
গোপেশ ও সোবহানশাটিমারি হাটের চেনা মুখ, বহুদিনের বন্ধু। সেদিনও একসঙ্গে হেঁটে হেঁটেই হাটে এসেছিলেন তাঁরাআশ্রয়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে গোপেশ জ্যাঠু চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ছিলেনহঠাৎ চোখ খুলে বন্ধু সোবহানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“হাঁ হো, তোরা কেনে চুপ করি আছেন? দোয়া করো, আজান দেও।
 
সোবহান বড়আব্বা এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। সেই দুর্গা মন্দিরের চালার নিচেই দাঁড়িয়ে তিনি আজান দিলেন। ঝড়ের গর্জনের ভেতর দিয়ে আজানের সুর যেন এক আশ্চর্য প্রশান্তি নিয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। ভয় যেন একটু একটু করে সরে গেল। মানুষের মনে ফিরে এলো ভরসা, ফিরে এলো সাহস।
 
কিছুক্ষণ পর ঝড়ের দাপট ধীরে ধীরে কমে এলো। কালবৈশাখী তার রুদ্ররূপ গুটিয়ে ফিরে গেল তার জগতেমানুষজন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। হাট আবার ফিরল তার স্বাভাবিক ছন্দে। সন্ধ্যা নামলে হাট ভাঙল, সবাই যে যার ঘরের পথে রওনা হলোসাথে নিয়ে গেল মনের গহীনে এক অদ্ভুত উষ্ণতা।
 
সেদিনের শাটিমারি হাট শুধু একটা কেনাবেচার জায়গা হয়েই থাকেনি। সেদিন এক ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে মানুষ প্রমাণ করে দিয়েছিলবিশ্বাস আলাদা হতে পারে, নাম আলাদা হতে পারে, কিন্তু বিপদের দিনে মানুষ মানুষের আশ্রয়, বেঁধে বেঁধে-গেঁথে গেঁথে থাকাতেই আছে মুক্তি, আছে আনন্দ। আর লোকজন যখন বাড়ি পৌঁছল, ততক্ষণে ঝড় থেমে গেছে— শুধু আকাশে নয়, তাদের বুকের ভেতরেও।
 
১৭/০৩/২০১৯
তপ্সিয়া, কোলকাতা

Wednesday, 4 February 2026

আছোল বড়আব্বা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 
 
আছোল বড়আব্বা, ভালো নাম আসলেউদ্দীন আহমেদ। নামের মতোই মানুষটা ছিলেন ভীষণ সহজ-সরল, সাদাসিধে। পেশায় চাষি, জমিজমাও ছিল বেশ ভালোই। তিন ছেলে আর এক মেয়েকে বড় করেছেন পরম যত্নে, সবাইকে পড়াশোনা করিয়েছেন। বড় ও ছোট ছেলে স্কুলশিক্ষক, আর মেজো ছেলে সংসার ও জমিজায়গার দেখাশোনা করেন। কিন্তু এসব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি গ্রামের মানুষের কাছে পরিচিতমুয়াজ্জেন রূপে
 
ছোটবেলা থেকেই তাঁকে দেখেছি গ্রামের মসজিদে আজান দিতে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান, কোনো ভাতা-কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াইকী শীত, কী বর্ষা, কী গ্রীষ্মসময় কখনো এক মুহূর্তও এদিক-ওদিক হয়নি। যেন সময়টাই তাঁর কণ্ঠের সাথে বাঁধা ছিল। তখন মসজিদে মাইক ছিল না। আছোল বড়আব্বা মসজিদের মিনারে উঠে, বুকভরা নিঃশ্বাস নিয়ে, সর্বশক্তি ঢেলে আল্লাহু আকবারহাঁক দিতেন। সেই কণ্ঠস্বর শুনেযে যার কাজে ডুবে থাকুক না কেন, সব ফেলে মানুষ ছুটে আসত মসজিদের দিকে।
 
রমজান মাস এলে স্মৃতিগুলো আরও রঙিন হয়ে ওঠে। আমরা ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মসজিদের কলতলায় খেলায় মেতে থাকতাম। হঠাৎ আছোল বড়আব্বার কণ্ঠ ভেসে আসত—“আল্লাহু আকবার…” আর সঙ্গে সঙ্গে খেলার মাঠে নেমে আসত এক অদ্ভুত উত্তেজনা। আমরা প্রাণপণে দৌড় দিতাম নিজ নিজ বাড়ির দিকে, দম ফুরোনো গলায় চেঁচিয়ে উঠতাম—“আজান হই গেইছে!
 
সেই কণ্ঠস্বর শুধু আজানের ছিল নাওটা ছিল আমাদের শৈশবের সময়চিহ্ন, রমজানের আনন্দ, আর গ্রামের জীবনের এক নিখাদ পবিত্র স্মৃতি। আছোল বড়আব্বা যেন আজও মিনারের মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন, আর তাঁর ডাকে আমাদের মন ছুটে যাচ্ছে সেই নির্ভেজাল দিনগুলোর দিকে।
 
আছোল বড়আব্বা ছিলেন একেবারে আগের দিনের মানুষ। মেশিন, যন্ত্রপাতি কিংবা আধুনিক জিনিসপত্রের সাথে তাঁর তেমন সখ্য ছিল না। তাঁর দুনিয়াটা ছিল মাটি, ফসল, আকাশের রোদবৃষ্টি আর আজানের সময় ধরে চলা এক সরল জীবনের ছকে বাঁধা। তাই যখন মহিপালকদমডাঙ্গা রাস্তার কাজ শুরু হলো, আর বিশাল বিশাল রোডরোলার রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকত, সেগুলো আছোল বড়আব্বার কাছে যেন অন্য এক অচেনা জগতের বস্তু হয়ে উঠল।
 
এই সুযোগেই বাচ্চু, আমু, লাবু ও অন্য সব নাতিরা মিলে শুরু করল নানা রকম মশকরা। কেউ হেসে বলত, “দাদু, এই রোডরোলারের চাকায় তো হাওয়া নাই!কেউ আবার আরও দুকথা যোগ করত, খুনসুটির হাসিতে ভর করে। তিনি, কোনো প্রতিবাদ নয়, কোনো বিরক্তি নয়। শিশুর মতো সরল মুখে শুনতেন, একটু থমকে তাকাতেন সেই বিশাল যন্ত্রটার দিকে, তারপর ধীরে ধীরে মাথা দুলাতেনযেন সত্যিই কথাটা ভেবে দেখছেন। তাঁর সেই মাথা দোলানোতে ছিল এক নির্মল বিশ্বাসমানুষ যা বলে, তা মন দিয়ে শোনাই তো মানুষের কাজ।
 
ওই সরল মাথা দোলানো, ওই নির্বাক বিশ্বাস, ওই হাসিমাখা নীরবতাএসবই ছিল আছোল বড়আব্বার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। আধুনিকতার ভিড়ে, যন্ত্রের শব্দে ঢাকা পড়ে যাওয়া এক পুরোনো দিনের নিষ্পাপ মানুষের ছবি, যা চোখের আড়াল হলেও হৃদয়ের গভীরে অটুট হয়ে গেঁথে থাকে  
 
গাছগাছালির সাথে আছোল বড়আব্বার সখ্যতা ছিল সত্যিই ঈর্ষণীয়। গাছ লাগানো, তার দেখভাল করা, মাটি খুঁড়ে আদরযত্নে বড় করে তোলাএসব ছিল তাঁর ভীষণ প্রিয় কাজ। জীবনের ফাঁকে ফাঁকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন বেশ কয়েকটা ছোট ছোট বাগান; যেন মাটির সাথে তাঁর এক নীরব বন্ধুত্ব ছিল, যা কথার চেয়েও গভীর।
 
আমাদের গ্রামের মোড়ে একসময় ছিল শূন্যতার রাজত্ব। পাকা সড়ক তখনো বহু দূরের স্বপ্ন। ঠিক সেই সময়, একদিন আছোল বড়আব্বা সেখানে একটি পাকুড়ের চারা রোপণ করলেন। চারপাশে বাঁশ আর কঞ্চি দিয়ে ঘিরে দিলেন, যেন কেউ অসাবধানতায় ক্ষতি না করে বসেপ্রতিদিন নিয়ম করে পানি দিতেনরোদে, বৃষ্টিতে, কোনো অজুহাত ছাড়াই। ধীরে ধীরে চারাটির পাতা বেরোল, ডাল ছড়াল, কাণ্ড শক্ত হলো। সময়ের সাথে সাথে সেই ছোট্ট চারাটি একদিন মহিরুহে পরিণত হলো।
 
আজ সেই পাকুড় গাছের ছায়ায় কত শত মানুষ আশ্রয় নেয়। তার তলায় গড়ে উঠেছে কয়েকটা দোকান, পথিকেরা দাঁড়িয়ে জিরিয়ে নেয় ক্লান্ত শরীর। ডালপালায় বাসা বেঁধেছে অসংখ্য পাখি, সকালসন্ধ্যা তাদের কিচিরমিচির ডাকে মুখরিত হয়ে থাকে চারদিক। প্রতিদিনই কেউ না কেউ ওই গাছের পাতা পাড়েছাগলের খিদে মেটাতে, জীবনের কোনো ছোট্ট প্রয়োজনে
 
তুলাই নদীর অগণিত স্রোত টাঙ্গন, পুনর্ভবা, গঙ্গার বুকে নিজেকে বিলিয়ে শেষে গিয়ে মিশেছে অসীম সমুদ্রে। তেমনি আছোল বড়আব্বাও প্রায় কুড়ি বছর আগে এই দুনিয়ার সীমা পেরিয়ে অনন্তের পথে চলে গেছেনকিন্তু তিনি যে পাকুড় গাছটি রোপণ করেছিলেন, তা আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে—নীরব অথচ দৃঢ়, স্থির অথচ জীবন্তনিঃশব্দে, নিরবচ্ছিন্নভাবে সে হয়ে উঠেছে এক সাদাকাহ জারিয়াএক অবিরত দান, যার হিসেব ফেরেশতারা রাখে, মানুষ নয়তাঁর সেই সাদাকাহ অগণিত মানুষের অক্সিজেনের চাহিদা মেটায়, তাঁর সাদাসিধে জীবনের সাক্ষ্য হয়ে, শিকড় ছড়িয়ে ছায়া বিলিয়ে, দাঁড়িয়ে আছে বাঁশকুড়ি মোড়ের মাথায় হাওয়ায় দোল খেয়ে তার পাতাগুলো যখন মৃদু শব্দ তোলে, মনে হয় যেন পথচারীদের উদ্দেশ্যে কেউ হাঁক ছাড়ছে—‘বাঁশকুড়ি এসে গেছে’, ঠিক যেমন করে হাঁক ছাড়তেন তিনি মসজিদের মিনার থেকে। আর উভয় ডাকই যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় কোনো অদৃশ্য পথে।
 
১৭/০১/২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা

Tuesday, 3 February 2026

গোধূলির পথে - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


 
সকালের আলো ঠিকমতো চোখে পড়ার আগেই হোস্টেলের ঘরটা যেন এক অদ্ভুত ব্যস্ততায় ভরে উঠল। ঘুমচোখে কেউ ব্যাগের চেইন টানছে, কেউ জামা ভাঁজ করতে গিয়ে আবার এলোমেলো করে ফেলছে। কোনোদিক থেকে ভেসে আসছে টুথপেস্ট হারানোর অভিযোগ, কোথাও চাবি নিয়ে হুলস্থুল কাণ্ডদুসপ্তাহের ছুটিএই খবরটা যেন সবাইকে একসঙ্গে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে  
 
ওদের তুলনায় আমি একটু আলাদা স্বভাবেরতাড়াহুড়োটা আমার ভেতরে হলেও বাইরে চুপচাপ। তাই মেঝেতে বসে নিজের ব্যাগটা খুলে ধীরে ধীরে জামাকাপড় গুছিয়ে নিলাম। তারপর তাকের দিকে তাকালাম। কয়েক মুহূর্ত দ্বিধাশেষ পর্যন্ত কয়েকটা বই তুলে নিলাম। ছুটি মানে যে পড়াশোনা হবে না, সেটা অভিজ্ঞতা থেকেই জানি। তবু বই না নিলে মনে হয় দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছি। বইগুলো ব্যাগে ঢুকাতেই ওজন বেড়ে গেলব্যাগটা যেন হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল, শুধু কাঁধে নয়, মনেও।
 
হোস্টেলের গেট পর্যন্ত ব্যাগ টেনে আনতে বেশ কষ্ট হলো। বাইরে বেরিয়ে দেখি, রাস্তা প্রায় ফাঁকা। কুয়াশার হালকা চাদরের ভেতর দিয়ে সকালটা ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। ভাগ্য ভালো, একটা রিকশা পেয়ে গেলাম। রিকশাওয়ালা পনেরো টাকায় রাজি হয়ে গেল। মিনিট কুড়ির মধ্যেই পৌঁছে গেলাম খাগড়া বাসস্ট্যান্ড।
 
সেখানে পৌঁছে দেখি পরিচিত দৃশ্যহোস্টেলের ছেলেরা ছোট ছোট দলে জটলা করে গল্পগুজব করছেকেউ ছুটির পরিকল্পনা করছে, কেউ বাড়ির খাবারের গল্প শোনাচ্ছেকোথাও লুচি-পরোঠা ভাগাভাগি করে খাওয়ার দৃশ্যএসবের মাঝেই সময় কেটে গেল। প্রায় এক ঘণ্টা পর বাস এল। ভিড় ঠেলে, ধাক্কাধাক্কি সামলে কোনোরকমে বাসে উঠলাম ভাগ্যক্রমে জানালার পাশে সিট পেয়ে যেন একটু স্বস্তি পেলাম  
 
বাস ছাড়তেই বাইরের দৃশ্যগুলো চলমান ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলোমাঠ-ঘাট, গাছপালা, রাস্তার ধারের চায়ের দোকানসবই যেন উল্টো দিকে ছুটছেমনে হচ্ছিল, বাসটা একে একে রামপুর, কানকি, ডালখোলা, দোমহনা, নাগর, রায়গঞ্জ, কালিয়াগঞ্জকে পেছনে ফেলে শহরের কোলাহল থেকে আমাকে ধীরে ধীরে গ্রামের শান্তির দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে
 
দীর্ঘ চার ঘণ্টার সফর শেষে বাস কুশমুণ্ডিতে থামল। তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার উপক্রমপশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়েছে, তার আলো লম্বা হয়ে শুয়ে আছে রাস্তায়ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিএবার ট্র্যাকার না টমটম? ঠিক তখনই থানার দিক থেকে লাফাতে-হাঁফাতে এক পরিচিত মুখ এগিয়ে এলনির্মল সরকার।
 
পরনে মাটির রঙের পাঞ্জাবি আর সাদা ধুতিযার রং সময়ের ছাপ লেগে সেপিয়া হয়ে গেছে। কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। আমাদের বাড়িতে তাঁর যাতায়াত লেগেই থাকেগ্রামের রাজনীতি, সালিশ, ভোটের কাজসবেতেই তাঁকে দেখা যায়। আমাকে দেখেই নির্মল দা থমকে দাঁড়ালেন।
 
আরে, তুই! তোদের ছুটি নাকি? বেশ তো, মজা করে ছুটি কাটা এবার
আমি হেসে বললাম, — হ্যাঁ দাদা। আপনি এখানে?
থানায় গেছিলাম রে,  জানিসই তো, আমাদের কতো রকমের ঝামেলাঝক্কি পোয়াতে হয়!   
 
এর মাঝে একটা টমটম এসে দাঁড়াল। সবাই উঠতে ব্যস্ত। নির্মল দা আমাকে সরিয়ে দিয়ে কোনোরকমে দুটো জায়গা আগলালেনএকটায় নিজে বসলেন, আরেকটায় আমাকে বসালেন। টমটম চলতে শুরু করলঘটংঘট, টুংটুং আওয়াজে চারপাশ ভরে উঠল। ধুলোর ভেতর দিয়ে এগোতে এগোতে শুরু হলো আমাদের কথা।
পড়াশোনা কেমন চলছে?
মোটামুটি।
ভালো করে পড়িস। কাকু কত কষ্ট করে তোকে পড়াচ্ছে!
চেষ্টা করছি। হাফ-ইয়ার্লিতে ফার্স্ট হয়েছি।
বাহ্! দারুণ তো!
 
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নির্মল দা আবার জানতে চাইলেন মাদ্রাসার পড়াশোনা নিয়ে। ইংরেজি, বাংলা, অংকের পাশাপাশি আরবি, তাফসীর, হাদীস, ফিকাহ্‌সব বললাম। ফিকাহ্‌র নাম শুনে একটু অবাকই হলেন। আমি সহজ করে বোঝালামকুরআন-হাদীসের আলোকে দৈনন্দিন জীবনের আচারআচরণ, রীতিনীতি ও নানান সমস্যার সমাধানের কথা।
 
টমটম এগিয়ে চলল। নাহিট পেরিয়ে দেখলাম, দূরে খড়ের গাদা থেকে ধোঁয়া উঠছে, কেউ গরু নিয়ে বাড়ি ফিরছেসন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। হঠাৎ নির্মল দা ভারী গলায় বললেন,
শোন্‌, ধর্ম আলাদা আলাদা হতে পারে, কিন্তু সব ধর্মই মানুষকে ভালো হতে শেখায়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর মিলেমিশে থাকাই আসল। চণ্ডীপুরে হিন্দু-মুসলমান-সাঁওতাল যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি আছে। তোরা নতুন প্রজন্মতোদের দায়িত্ব আরও বেশি।
 
কিছুক্ষণের মধ্যে রামপুর, চৌরঙ্গী পেরিয়ে টমটম মহিপালে পৌঁছে গেল। নির্মল দা যাওয়ার বেলা মহিপালে সাইকেল রেখে গেছিলেন। তাই নেমে পড়লেনযাওয়ার আগে টমটমওয়ালাকে দুজনের ভাড়া মিটিয়ে দিলেন। আমি বারণ করতে গেলে তিনি আমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, “তোরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। ভালো করে লেখাপড়া করিস্‌, গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করিস্‌!”
 
তাঁর ওই স্নেহমাখা কণ্ঠ শুনে আমার চোখ ভিজে গেল চুপচাপ কিছুক্ষণ শূন্যের দিকে তাকিয়ে রইলাম। পশ্চিম আকাশ তখন গোধূলি আলোয় সেজে উঠেছে। সূর্যাস্তের লাল আলো টমটমের কাঠের দণ্ডে পড়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে তুলাইয়ের জল টাঙনে এসে পড়ছে, আর দুটো স্রোত পাশাপাশি বইছে। মনে হলো, এই পথ শুধু বাড়ির দিকেই নয়মানুষ থেকে মানুষের দিকে যাওয়ার পথও বটে। বিশ্বাস আলাদা হতে পারে, কিন্তু একসঙ্গে চলার শক্তিটাই সবচেয়ে বড়।
 
আমি ব্যাগের ফিতেটা কাঁধে ঠিক করতে করতে সামনে তাকিয়ে রইলাম। পরিচিত গাছপালা, বাঁক নেওয়া পথসবই ধীরে ধীরে আরও চেনা হয়ে উঠছিল। অথচ মনে হচ্ছিল, আমি শুধু বাড়ির দিকেই ফিরছি না; কারও বলা কথাগুলো, নাবলা আশঙ্কাগুলোও সাথে নিয়ে ফিরছি। টমটমের কাঠে পড়ে থাকা লাল আলোটা হঠাৎই ফিকে হয়ে এলসূর্য বুঝি চোখের আড়ালে চলে গেছে। টমটম গতি কমাল। নামার সময় এখনও হয়নি, তবু মনে হলো এই পথের শেষে শুধু বাড়ি নয়আরও অজানা অনেক কিছু অপেক্ষা করছে। চাকা গড়াল, আবার আওয়াজ উঠলঘটংঘটটুংটুং
 
২৪/০৫/২০২৫
হেস্টিংস, কোলকাতা

Friday, 30 January 2026

সমীর মোলবী - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 


শীতের সকাল। ভোরের কুয়াশা তখনো মাঠের ঘাসে লেপ্টে। মেঠো পথটা শিশিরে ভিজে নরম ও মসৃণ। হাতে ছোট্ট তক্তি, বগলে কাগজে মোড়া কেতাব, মায়ের ডাকে ঘুমজড়ানো চোখ মুছতে মুছতে আমরা রওনা দিতাম মক্তবের পথেমনে হতো, যেন পড়তে নয়, কোনো এক পবিত্র যাত্রায় বের হয়েছি  

সেই সোনালী শৈশবের কথা। আমাদের কাছে পৃথিবীটা তখন ছিল খুবই ছোট, সামনের মাঠ পেরিয়ে তুলাইয়ের পাড়ে আকাশ যেন মিশে যেতো মাটিতে। আর বিশ্বাসগুলো ছিল অবিশ্বাস্য রকমের সহজ ও সরল সেই দিনগুলোতেই আরম্ভ হয় কদমডাঙ্গা মক্তবে আমার আরবি পড়তে যাওয়া। 

কদমডাঙ্গা মক্তবটা আকারে-আয়তনে খুব একটা বড় ছিল নাটিনের চাল, মাটির মেঝে, দেয়ালে সময়ের জমে থাকা দাগ। তবে বহু পুরনো মাটির সেই ছোট্ট ঘরটার অন্দরে খুলে যেত অন্য এক দুনিয়া। ‘আলিফবাতা’র প্রথম ধ্বনি, ‘কাফলাম’-এর ভারী উচ্চারণ, আর কেতাব খুললেই এক ধরনের গম্ভীর নীরবতা নেমে আসত পুরো কামরা জুড়ে; সব মিলিয়ে মনে হতো, অক্ষরগুলো শুধু পড়বার জন্য নয়, হৃদয়ের গভীরে গেঁথে নেওয়ার জন্যই এসেছে।

মক্তবে আমাদের দু’জন শিক্ষক ছিলেনএকজনের নাম সমিরুদ্দীন আহমেদ, সম্পর্কে কাকু হবেন। দশ মুখে ‘সমীর মোলবী’ নামেই অধিক পরিচিত। খুবই সাদাসিধে ও সরল স্বভাবের একজন মানুষ। কথার চেয়ে আমলে অধিক বিশ্বাসী ছিলেনমক্তব আর ইমামতির সামান্য আয়ের উপর ভর করেই সারাটা জীবন পার করে দিয়েছেনকখনো কোনো অভিযোগ করেননি, কোনো আক্ষেপ তাঁর চোখেমুখে আমি অন্তত দেখিনি। যতদূর শুনেছি, অভাবের দরুন তিনি বেশি দূর পড়াশোনার সুযোগ পাননি; ওই তিরমিজি বা নাসায়ী পর্যন্ত পড়েছিলেন। তাই সময় ও অবস্থার পরিবর্তনের ফলে কিছু বিষয়ে আমাদের প্রজন্মের ছেলেপুলেদের সঙ্গে তাঁর ভাবনার অমিল ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই মতপার্থক্য নিয়ে আমার সঙ্গে কোনোদিন কোনো তর্ক-বিতর্ক তো দূরের কথা, একটিবারও সে বিষয়ে কথা বলেননি; বলা ভালো, কোন আলাপআলোচনাতেই জাননিযেন তাঁর কাছে সম্পর্কটাই ছিল মুখ্য, মতের ফারাক নয়।

চাকরি পাওয়ার পর একদিন খুব সাধ করে তাঁর কাছে গিয়েছিলাম। হাতে ছিল ছোট্ট একটা উপহার, আমরা যাকে হাদিয়া বলি আরকিবড় কিছু নয়, খুব দামীও নয়, কিন্তু ভালোবেসে কেনাউপহারটা হাতে পেয়ে তিনি যেন শিশুর মতো খুশি হয়েছিলেন। তাঁর চোখেমুখে তখন যে প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়েছিল, তাতে মনে হয়েছিলআমি যেন তাঁর হাতে কোনো অমূল্য উপহার তুলে দিয়েছি।

মাঝে তুলাই দিয়ে বহু জল গড়িয়ে গেছে। বার্ধক্য ও বয়সের ভারে তিনি তখন কর্মহীন। নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে জরাজীর্ণ অবস্থাখবর পেয়ে একদিন দেখতে গেলামতখন তিনি প্রায় শয্যাশায়ী। দোরমার বেড়া দেওয়া ঘর, চাপা টিনের ছাউনি, বারান্দায় মাদুরের উপর বিছানা পাতা, তাতে শুয়ে আছেন। শরীর ভেঙেছে, চোখ দুটো আরও ভেতরে ঢুকে গেছে, মুখমণ্ডলও বেশ মলিন ও বিবর্ণ; কিন্তু মনটা আগের মতোই উচ্ছ্বল ও স্নেহে ভরা। আমাকে দেখেই নিজ স্ত্রীকে ডেকে বললেন,

—“হয় মখলুসুরের মা, আয় দেখি যা, মোর বাপ আইছে মোক দেখিবা, কত বড় মানুষ হইছে, তাও মোক ভুলেইনি। কুন্‌ কালে মুই ওক ‘আলিফ-বে-তে-সে’ পড়েইছু, এখনো মোর কথা মনে থুইছে 

কথাগুলো শুনে খানিকটা লজ্জা পেলাম, চোখ দু’টো আপনা থেকেই মাটিতে নেমে গেল। মনে হল, তিনি যেন আমাকে নয়, আমার শৈশবকে বুকে টেনে নিচ্ছেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেনসেই চেনা স্পর্শ, সেই মমতাময় পরশতারপর অত্যন্ত ক্ষীণ কণ্ঠে দুয়া করলেন,

—“আরও বড় মানুষ হো বা। আল্লাহ তোর ভালো করোউক। তোর বাপ খুব ভালো মানুষ আছোলো, তোর বাপের নামটা থুইস…”

কথার ফাঁকে ফাঁকে আরও অনেক কথা বললেনজীবনের কথা, মানুষ হয়ে ওঠার কথা, শিকড়কে ভুলে না যাওয়ার কথা। মক্তবের কথা। অতীতের কথা। আমার শৈশবের কথা। ফেরার তাড়া ছিল আমার, তাই সময় বেশি কাটাতে পারিনি। বিদায়ের মুহূর্তে ঘূর্ণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি, এই দেখাই হবে শেষ দেখা। নীরবে ফিরে এসেছিলাম, বুকের ভেতর এক অজানা ভার নিয়ে।

কোলকাতায় ফিরে ক’সপ্তাহ বাদে, একদিন সন্ধ্যায় মা’কে ফোন করেছি। ভালোমন্দ জিজ্ঞাসার পর, বড়দা মা’র থেকে ফোনটা নিয়ে বললেন—

একটা খবর শুনিছি, সমীর বেটা গত কাইল মারা গেইছে। ভালোই হইছে, এক্কেবারি বিছানত পড়ি গেইছল। বিছানতে পায়খানা, বিছানতে পেচ্ছাব, খুব কষ্ট হছলো, আল্লাহ্‌ নিগেইছে ভালোই কইছে...

দাদা আরও কতকিছু বলছিলেন, তা আমার কানে ঢুকলেও মগজ অবধি পৌঁছাচ্ছিল না। আমি মুহূর্তেই পৌঁছে গেছিলাম আমার শৈশবে। শীতের সকাল মক্তবের বারান্দায় আমরা সারিবদ্ধ ভাবে বসে সমীর মোলবী একটা ধূসর বর্ণের আলোয়ান গায়ে জড়িয়ে উবু হয়ে বসে আছেন। আমাদেরকে একে একে ডাকছেন। আর আমরা গিয়ে পড়া শুনিয়ে আসছি। দেখতে দেখতে বেলা গড়িয়ে গেছে। স্কুলের সময়ও হয়ে এসেছেদ্রুত বাড়ি ফিরতে হবে, গোসলগাও করে, চারটা ভাত-পন্তা খেয়ে স্কুলে যেতে হবে। সমীর মোলবী হাত নেড়ে ছুটি ঘোষণা করলেন। আমরা লাফিয়ে উঠে ছুটতে ছুটতে সমস্বরে চিৎকার করে উঠলাম—আস্‌-সা-লা-মো-আ-লা-ই-কু-ম...  

আজও যখন কাজকর্মের ফাঁকে বা সামান্য অবসরে কুরআন তেলাওয়াত করতে বসি, মাঝেমধ্যেই আপনা থেকেই মনে পড়ে যায় সেই সুরেলা কণ্ঠ। তাঁর উচ্চারণে খানিকটা ঢিলেমি থাকলেও আন্তরিকতা ছিল একশ ভাগ। আরও মনে পড়ে সেই আখেরি মোলাকাতের কথাআর মনে হয়সেদিন আমি শুধু একজন হুজুরের কাছ থেকে নয়, শৈশবের এক নির্ভেজাল আশ্রয় থেকেও বিদায় নিয়েছিলাম। মাথায় রাখা তাঁর সেই উষ্ণ হাত, সেই নিঃস্বার্থ দোয়া আজও আমার পথচলার গোপন পাথেয় হয়ে আছে। আজও দেশের বাড়িতে গেলে, যখন ফিদ্দুর দোকানের চালায় বসে থাকি, মনে হয়ঈষৎ ন্যুব্জ শরীরটা একটা জীর্ণ আদল গায়ে জড়িয়ে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলেছে কদমডাঙ্গা মক্তবের পথে। শুভ্রকেশে ভরা মাথাটা পায়ের ছন্দে দুলে দুলে উঠছে, আর ভোরের গাঢ় কুয়াশার ভেতরে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে 

১৫ জানুয়ারি ২০২৬

হেস্টিংস, কোলকাতা