Pages

Showing posts with label সহাবস্থান. Show all posts
Showing posts with label সহাবস্থান. Show all posts

Monday, 21 September 2026

আমার ছোট ভাই - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 
শীত চলে গেছে—বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে। তবে বসন্ত তখনও এসে পৌঁছায়নি। ঋতুর খাতায় শীতের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার শেষটুকু যেন তখনও বাতাসের শরীরে লেগে আছে। ভোরের হাওয়ায় তখনও একটা হালকা শীতশীত ভাব, সকালের চাদরে তখনও কুয়াশার স্মৃতি আর নিস্তব্ধতার এক অদ্ভুত আবেশ। মনে হচ্ছিল, শীত বিদায় নিয়েছে বটে, কিন্তু যাওয়ার আগে তার কিছু স্মৃতি বাতাসের কাঁধে রেখে গেছে।
 
সেই রকমই এক কাকভোরে খাদেমুল দা বাড়ি থেকে বেরোলেন। ভোর তখনও পুরোপুরি ভোর হয়ে ওঠেনি। চারদিকের অন্ধকার ধীরে ধীরে পাতলা হচ্ছে, কিন্তু দিনের আলো তখনও দিগন্তের ওপারে। ঘরের মানুষজন ঘুমিয়ে। উঠোন নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও দু-একটা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। খাদেমুল দা চুপচাপ জামাকাপড় পরে নিলেন। সঙ্গে একটা ছোট্ট ব্যাগ, ব্যাগটা খুব ভারী নয়—তাতে প্রয়োজনের সামান্য কিছু জিনিস; আর কিছু অদৃশ্য চিন্তা সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
 
মোড়ে এসে দেখলেন, কয়েকজন মানুষ ইতিমধ্যে হাটাহাটি করছে। কেউ কাজে বেরোবে, কেউ হয়তো বাজারের দিকে যাবে। কিন্তু তখনকার দিনে এমন ভোরবেলায় যানবাহনের এত সহজলভ্যতা ছিল না। ইচ্ছা করলেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ি পাওয়া যেত না। তাই আগের রাতেই পাশের গ্রামের এক রিকশাওয়ালাকে বলে রেখেছিলেন। তবে তার আসতে একটু দেরি হচ্ছিল দেখে খাদেমুল দা অপেক্ষা করতে লাগলেন।
 
অবশেষে কিছুক্ষণ পর রিকশাওয়ালা এসে হাজির। খাদেমুল দা রিকশায় উঠলেন। রিকশা চলতে লাগলো। ভোরের ঠান্ডা বাতাস শিরশির করে যেন বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধছিল। রিকশার চাকার কর্‌কর্‌ শব্দে নিস্তব্ধ রাস্তা যেন ধীরে ধীরে জেগে উঠছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁরা পৌঁছে গেলেন মহিপাল বাসস্ট্যান্ডে। বাস ছাড়তে তখনও প্রায় কুড়ি মিনিট বাকি। এই সামান্য সময়টুকুও তিনি নষ্ট করতে চাইলেন না। তাই রিকশাওয়ালাকে সঙ্গে নিয়ে চায়ের দোকানে বসলেন। দু’জনের জন্য চা-বিস্কুট নিলেন। নিজেও খেলেন, রিকশাওয়ালাকেও খাওয়ালেন। তারপর তার প্রাপ্য ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে বললেন— হাঁ বো কাকা, তোরা এইবার বাড়িত যাও।
 
রিকশাওয়ালা চলে গেল। খাদেমুল দা বাসে উঠে জানালার ধারের একটা সিটে বসে পড়লেন। বাস ছাড়ল প্রায় দশ মিনিট দেরীতে। জানালার বাইরে তখন ভোরের আলো ধীরে ধীরে সকাল হয়ে উঠছে। পরিচিত গ্রাম, মাঠ, গাছপালা, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ—সবকিছু পেছনে পড়ে যাচ্ছে। খাদেমুল দা চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে সেসব দেখছিলেন। তাঁর এই যাত্রা কেবল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার যাত্রা ছিল না; এর মধ্যে ছিল দেখা করার আকাঙ্ক্ষা, কিছু কথা বলার প্রয়োজন, আর নিজের ভেতরে জমে থাকা কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা।
 
প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর বাস পৌঁছাল কুশমুণ্ডিতে। সেখানে নেমে তাঁর কিছু টুকিটাকি জরুরি কাজ ছিল। সেগুলো সেরে আবার একটা বাস ধরলেন। এবার গন্তব্য দোমোহনা। দোমোহনা থেকে ট্রেকার। তারপর ট্রেকার বদলে অবশেষে পৌঁছালেন গোয়ালপোখরে।
 
দীর্ঘ পথ। একের পর এক যানবাহন। একের পর এক রাস্তা। তবু খাদেমুল দা’র মনে কোনো ক্লান্তি ছিল না। কারণ মানুষের কোনো কোনো যাত্রা শরীরের ক্লান্তিকে অতিক্রম করে যায়—গন্তব্যের মানুষটি যখন হৃদয়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন পথের দূরত্ব আর দূরত্ব বলে মনে হয় না।
 
গোয়ালপোখরে তাঁর গন্তব্য ছিল অশোক দা’র বাড়ি। অশোক দা আমাদের এলাকার একজন কৃতী সন্তান। তখন তিনি মৎস্য দপ্তরের একজন কর্মরত অফিসার হিসেবে গোয়ালপোখরে পোস্টেড। আমাদের এলাকার তরুণদের কাছে তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণা। অনেকেই তাঁর কাছে পরামর্শ নিতে যেতেন। কারও পড়াশোনা নিয়ে সমস্যা, কারও চাকরি নিয়ে সংশয়, কারও ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধা—অশোক দা নিজের মতো করে সবাইকে কিছু না কিছু পথ দেখাতেন। শুধু উপদেশ দিতেন না, অনেক সময় পাশে দাঁড়াতেন, সাহস জোগাতেন, এবং সাহায্যও করতেন।
 
খাদেমুল দা’রও তাঁর সঙ্গে কিছু আলাপ-আলোচনা করার ছিল। আগেই কথা হয়েছিল। তাই গোয়ালপোখরে পৌঁছেই তিনি অশোক দা’র অফিসে গেলেন। কিন্তু অশোক দা’র তখন কিছু জরুরি কাজ চলছিল। তিনি বেয়ারাকে ডেকে খাদেমুল দা’কে বাইরে চা-বিস্কুট দিয়ে বসাতে বললেন; এবং বললেন, কাজ শেষ হলেই বেরিয়ে আসবেন।
 
খাদেমুল দা অপেক্ষা করতে লাগলেন। অবশেষে কাজ শেষ হলো। দু’জন একসঙ্গে অফিস থেকে বেরোলেন। ততক্ষণে দিনের আলো অনেকটাই ফুরিয়ে এসেছে। বাড়িতে বাড়িতে সন্ধ্যার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আর তাঁদের গ্রামের  বাড়ি তো গোয়ালপোখর থেকে অনেক দূরে। সেই রাতে খাদেমুল দা’র পক্ষে বাড়ি ফেরা যে সম্ভব নয়—এটা অশোক দাও ভালোভাবেই জানতেন। তাই খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললেন— “খাদেমুল, আজ তুমি আমার সঙ্গে চলো। রাতে আমার কাছেই থেকো। কাল সকালে বাড়ি চলে যেও।”
 
খাদেমুল দা আর কী করবেন! রাজি হয়ে গেলেন। অশোক দা যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন, সেটা ছিল একজন বয়স্ক মহিলার। মহিলা স্বভাবের দিক থেকে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। কিছু বিষয়ে তাঁর নিয়মকানুন ছিল বেশ কড়া। অশোক দা ব্যাপারটি জানতেন। তাই বাড়িতে ঢোকার আগে তিনি খাদেমুল দা’কে একটু সাবধান করে দিলেন। বললেন,
—“খাদেমুল, একটা কথা মনে রেখো। বাড়ির মালকিন ভদ্র মহিলা যদি তোমার নাম জিজ্ঞেস করেন, তুমি ‘খাদেমুল’ বলবে না। বলবে—অমল।”
খাদেমুল দা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারলেন না। কিছুক্ষণ অশোক দা’র মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন।
—“কেন?”
অশোক দা তখন বিস্তারিত কিছু বললেন না। শুধু বললেন,
—“ভেতরে গেলেই বুঝবে।”
অশোক দা এগিয়ে গিয়ে বেল বাজালেন। দরজা খুলেই ভদ্র মহিলা রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করলেন— এ কে, কী নাম?
—আমার ছোট ভাই, মাসিমা। ওর নাম অমল। 
 
তারপর তাঁরা বাড়িতে ঢুকলেন। সেই রাতটা সেখানেই কাটল। দু’জনে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করলেন। গল্পগুজব হলো। হাবিজাবি নানান রকমের আলাপআলোচনা হলো। আর এভাবেই দিনের ক্লান্তি ধীরে ধীরে কথার মধ্যে গলে যেতে থাকলো। কিন্তু খাদেমুল দা’র মনে তখনও একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—কেন নিজের নাম লুকিয়ে অন্য একটা নাম বলতে হলো? রাতে সুযোগ পেয়ে অশোক দা’কে জিজ্ঞেস করলেন—“আচ্ছা, আমার নামটা বদলে বলতে বললেন কেন?”
 
এবার অশোক দা একটু হেসে, একটু গম্ভীর হয়ে আসল কথাটা বললেন। ওই ভদ্র মহিলা শুচিবাইর শিকার। তোমার নাম যদি ‘খাদেমুল’ শুনতেন, তাহলে হয়তো তোমাকে ঘরেই ঢুকতে দিতেন না। শুধু তোমাকেই নয়—আমাকেও নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হতো। হয়তো তোমার সামনে এমন সব কাণ্ডকারখানা করতেন, যেগুলো তোমারও খারাপ লাগত, আমারও খারাপ লাগত। তাই তোমাকে আগে থেকেই সাবধান করে দিয়েছিলাম।”
 
খাদেমুল দা এবার ব্যাপারটা বুঝলেন। কিন্তু তাঁর ভেতরে যেন অন্যরকম একটা অনুভূতি জন্ম নিল। একজন মানুষকে তার নিজের নাম পর্যন্ত গোপন করতে হলো—শুধু একজনের বাড়িতে রাত কাটানোর জন্য! কী অদ্ভুত! একটা নাম—কখনও পরিচয়, কখনও পরিচয়ের বোঝা। একটা নাম—কখনও দরজা খুলে দেয়, আবার কখনও দরজা বন্ধও করে দেয়। মানুষের পরিচয় যে কত বিচিত্রভাবে মানুষের ভাগ্য, সম্পর্ক ও আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই রাতে খাদেমুল দা যেন তার একটা ছোট্ট উদাহরণ চোখের সামনে দেখতে পেলেন।
 
পরদিন সকালে খাদেমুল দা’র বাড়ি ফেরার কথা। অশোক দা তাঁকে একা ছেড়ে দিলেন না। সকালে একটু তাড়াতাড়িই বেরিয়ে তাঁকে নিজে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন। অশোক দা নিয়মিত যাতায়াত করতেন বলে সেখানকার স্টেট বাসের কন্ডাক্টারও তাঁকে চিনতেন। অশোক দা কন্ডাক্টারকে ডেকে বললেন— “কাকা, এ আমার ছোট ভাই। ওকে রায়গঞ্জে নামিয়ে দিও।”
 
খাদেমুল দা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। অশোক দা শুধু মুখে তাঁকে “ছোট ভাই” বলেই থেমে থাকলেন না। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে তাঁকে কিছু নাস্তা কিনে দিলেন, সঙ্গে পানির বোতলও। এমনকি তাঁর বাসভাড়াটাও কন্ডাক্টরের হাতে দিয়ে বললেন— “খেয়াল রেখো, আমার ছোট ভাই। রায়গঞ্জে ঠিকমতো নামিয়ে দেবে।”
 
বাস ছাড়ল। ধীরে ধীরে বাসের চাকা গড়াতে লাগলো। অশোক দা ঠাই দাঁড়িয়ে রইলেন বাসস্ট্যান্ডে যতক্ষণ না বাসটা তাঁর চোখের আড়ালে চলে যায়। আর ওদিকে খাদেমুল দা জানালার পাশের সিটে বসে তাকিয়ে ছিলেন। জানালার কাচের ওপারে অশোক দা’র অবয়ব ক্রমশ ছোট হয়ে আসতে লাগল। খাদেমুল দা অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর একসময় অশোক দা’কে আর দেখা গেল না। শুধু রয়ে গেল রাস্তা, রাস্তার ধুলো; আর বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি।
 
জানালার বাইরে দৃশ্য ক্রমশ বদলাচ্ছিল—মাঠ, গাছ, বাজার, পথের ধারের দোকান, মানুষের আসা-যাওয়া। কিন্তু তাঁর চোখ দুটো যেন বাইরের কোনো দৃশ্য দেখছিল না। তিনি ফিরে যাচ্ছিলেন বারবার রাত থেকে সকালের সফরে। একটা বাড়িতে ঢোকার জন্য তাঁকে নিজের নাম বদলাতে হয়েছিল। ‘খাদেমুল’ নামটি সেখানে যেন একটি অদৃশ্য দেওয়াল। অথচ সেই একই মানুষকে পরদিন আর একজন মানুষ সবার সামনে বললেন— “এ আমার ছোট ভাই।”
 
বাস তখন অনেক দূর চলে এসেছে। খাদেমুল দা ব্যাগ থেকে অশোক দা’র কিনে দেওয়া নাস্তাটুকু বের করলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলেন সেটার দিকে। সামান্য কিছু খাবার—তার দাম হয়তো খুব বেশি নয়। জলের বোতলটার দামও সামান্য। বাসভাড়াটুকুও এমন কিছু নয়, যা হিসাবের খাতায় বড় অঙ্ক হয়ে দাঁড়াবে। তবে সবটাই ভালোবেসে, সাচ্চা মন থেকে দেওয়া। একজন বড় ভাই হিসেবে ছোট ভাইকে দেওয়া। খাদেমুল দা ওই নাস্তা হাতে ক্ষণিকের জন্য চোখদুটো বন্ধ করলেন। মনের চোখ দিয়ে তখন তিনি যেন দেখতে পাচ্ছিলেন, ঘৃণা ও বিদ্বেষের রাত ধীরে ধীরে সরে গিয়ে ভোরের আলো ফুটছে।  
 
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা 

Thursday, 5 February 2026

কালবৈশাখীর তাণ্ডবে - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 

 
সালটা ১৯৭১। উত্তাল সময়। বাতাসে বারুদের গন্ধ। খান সেনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘর্ষ চরম পর্যায়ে। চারদিকে অনিশ্চয়তা, ভয় আর টানটান উত্তেজনা। সীমান্তে শুরু হয়েছে বেশ কড়াকড়ি। ফলে এপাশের মানুষদের পক্ষে ওপারের ডুংডুঙ্গির হাটে যাওয়া অসম্ভব হয়ে উঠল। যে হাট একসময় ছিল জীবিকার ভরসা, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আদানপ্রদানের মাধ্যম, তা হঠাৎই হয়ে গেল অধরা, চলে গেল ধরাছোঁয়ার বাইরে। সংসার চলবে কীভাবে—এই প্রশ্নে মানুষ তখন দিশেহারা, উৎকণ্ঠিত। ঠিক সেই সময় গ্রামের লোকজন একজোট হয়ে হাজির হলেন নজিবদ্দিন ও অফিজদ্দিন সাহেবের কাছে। কণ্ঠে অনুরোধ, চোখে অসহায়তার ছাপ—হাট বসানোর জন্য যদি তাঁরা একটু জায়গা দেন!
 
তাঁরা এবং তাঁদের বংশধরেরা শুধু জায়গাই দেননি, দিয়েছিলেন সাহস আর ভরসা। সেদিন তাঁরা ঘোষণা করেছিলেন—এই হাট হবে সবার জন্য, এখানে কোনো জমাতলা লাগবে না, কোনো খাজনাও নয়। বিনা মূল্যে, বিনা শর্তে, সকলের জন্য উন্মুক্ত। মানুষের প্রয়োজনে, মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তারই হাত ধরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল শাটিমারি হাট—একটা হাট, যা শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, ছিল বহু মানুষের বাঁচার অবলম্বন।
 
সেই থেকে শাটিমারি হাট বসে প্রতি সোম ও শুক্রবারে। আশপাশের গ্রাম থেকে লোকজন আসে। কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ সাইকেল নিয়ে, কেউ গরুর গাড়ি করে। বাঁশের খুঁটি ও টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি দোকানগুলো, কোনটার ছাউনি খড়ের, কোনোটা আবার ছাউনি ছাড়াই। হাটের উত্তর-পশ্চিম কোণে একটা দুর্গামন্দিরও গড়ে উঠেছিল। বহু বছর আগের কথা—আমি তখন খুব ছোট। এক শুক্রবারে বাবার সাথে হাটে গেছি। বাবার হাত ধরে সবুজ মাঠের বুক চিরে যাওয়া সরু আল ধরে গুটি গুটি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সেই স্মৃতি আজও চোখে ভাসে। চারদিকে তখন ব্যস্ততার কোলাহল। কেউ চাল কিনছে, কেউ লবণ, কেউ কাপড়। শিশুরা হাওয়াই নাড়ু, লজেন্স, পাউরুটি আর বাতাসা হাতে হাটের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটছে। সবজিওয়ালাদের হাঁকডাকে কান পাতা দায়। সব মিলিয়ে, আর পাঁচটা দিনের মতোই প্রাণচঞ্চল এক হাট।
 
কিন্তু প্রকৃতি হঠাৎই বাধ সাধল। আসমান তার রুদ্ররূপ দেখাল। আচমকা কালবৈশাখী ঝড় উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে দোকানপাট সব কেঁপে উঠল। বিদ্যুতের চমক, বজ্রের গর্জন, উড়ে যাওয়া পলিথিন আর ভাঙা ডালের শব্দে চারদিক যেন ত্রস্ত। হাটে তখন মানুষের ঢল—কেউ কেনাবেচা ফেলে দিগ্বিদিক ছুটছে, কেউ আবার প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয়ের খোঁজে।
 
সেই মুহূর্তে আশ্রয় বলতে একটাই জায়গা—হাট-লাগোয়া সেই দুর্গা মন্দিরের চালা। মাটির দেয়াল, টিনের ছাউনি—অতি সাধারণ এক আশ্রয়। কিন্তু বিপদের দিনে সেটাই হয়ে উঠল সবার ভরসা। হিন্দু-মুসলিম-সাঁওতাল—সব পরিচয় যেন ঝড়ের মুখে মিলিয়ে গেল। সবাই এক ছাদের নিচে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে পড়ল। বাইরে কালবৈশাখীর তাণ্ডব, ভেতরে মানুষের কাঁপা কাঁপা নিঃশ্বাস।
 
কালবৈশাখীর হাত থেকে রেহাই পেতে চালার তলে দাঁড়িয়ে যে যার বিশ্বাস অনুযায়ী প্রার্থনায় মগ্ন। কেউ মন্ত্র জপছে, কেউ দোয়া করছে, কেউ আবার নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। ভয় আর আশার এক অদ্ভুত মিশেল তখন বাতাসে।
 
গোপেশ ও সোবহান—শাটিমারি হাটের চেনা মুখ, বহুদিনের বন্ধু। সেদিনও একসঙ্গে হেঁটে হেঁটেই হাটে এসেছিলেন তাঁরা। আশ্রয়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে গোপেশ জ্যাঠু চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ছিলেন। হঠাৎ চোখ খুলে বন্ধু সোবহানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“হাঁ হো, তোরা কেনে চুপ করি আছেন? দোয়া করো, আজান দেও।”
 
সোবহান বড়আব্বা এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। সেই দুর্গা মন্দিরের চালার নিচেই দাঁড়িয়ে তিনি আজান দিলেন। ঝড়ের গর্জনের ভেতর দিয়ে আজানের সুর যেন এক আশ্চর্য প্রশান্তি নিয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। ভয় যেন একটু একটু করে সরে গেল। মানুষের মনে ফিরে এলো ভরসা, ফিরে এলো সাহস।
 
কিছুক্ষণ পর ঝড়ের দাপট ধীরে ধীরে কমে এলো। কালবৈশাখী তার রুদ্ররূপ গুটিয়ে ফিরে গেল তার জগতে। মানুষজন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। হাট আবার ফিরল তার স্বাভাবিক ছন্দে। সন্ধ্যা নামলে হাট ভাঙল, সবাই যে যার ঘরের পথে রওনা হলো—সাথে নিয়ে গেল মনের গহীনে এক অদ্ভুত উষ্ণতা।
 
সেদিনের শাটিমারি হাট শুধু একটা কেনাবেচার জায়গা হয়েই থাকেনি। সেদিন এক ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে মানুষ প্রমাণ করে দিয়েছিল—বিশ্বাস আলাদা হতে পারে, নাম আলাদা হতে পারে, কিন্তু বিপদের দিনে মানুষ মানুষের আশ্রয়, বেঁধে বেঁধে-গেঁথে গেঁথে থাকাতেই আছে মুক্তি, আছে আনন্দ। আর লোকজন যখন বাড়ি পৌঁছল, ততক্ষণে ঝড় থেমে গেছে— শুধু আকাশে নয়, তাদের বুকের ভেতরেও।
 
১৭/০৩/২০১৯
তপ্সিয়া, কোলকাতা

Thursday, 23 January 2020

সহাবস্থান ও ইসলামঃ কিছু কথা



 সহাবস্থান ও ইসলামঃ কিছু কথা 
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
  
বহু কাল আগের কথা। পৃথিবীতে তখন কোনো ধর্মীয় বিভাজন ছিল না। সকলে বিশ্বাস করতো, সবার স্রষ্টা এক। তিনিই এই নিখিল বিশ্বের প্রতিপালক। পরবর্তীতে মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়ল নানা ধর্মে-বর্ণে-জাতিতে। আর মনুষ্য সমাজের এই বিভক্তি প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। অবশেষে এই বিভক্তিই ধরিত্রীর বুক খণ্ডক্ষুদ্র করে তৈরি করেছে একটি মানচিত্র; যেখানে সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব ক্রমশ ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। চিন্তা-চেতনা-ধর্ম-বর্ণের এই বিভক্তি পৃথিবী থেকে দূর করা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে আমার ধারণা। তাই জীবনে সুষ্ঠুভাবে বাঁচতে সহাবস্থানের কোনো বিকল্প নেই।

সহাবস্থানের গুরুত্ব— ইসলাম একটি সার্বজনীন জীবন ব্যবস্থা। সকল মানবজাতির জন্যই এর অবতারণা। তাই সমগ্র মনুষ্য সমাজকে ইসলামে ‘উম্মাতুন্‌ ওয়াহিদাহ্‌’ (একটি সম্প্রদায়) হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এবং পবিত্র আল্‌-কুরআনে মহান আল্লাহকে ‘রাব্বুল ‘আলামিন’ (বিশ্বজাহানের পালনকর্তা) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ তিনি মুসলিম-অমুসলিম সবার স্রষ্টা, সবার রব ও প্রতিপালক। একইভাবে নবী মুহাম্মদ (সা)-কে ‘রাহ্‌মাতুল্লিল্‌ ‘আলামিন’ (সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য করুণার মূর্তপ্রতীক) বলা হয়েছে। এছাড়া মহাগ্রন্থ আল্‌-কুর্‌আনকে ‘হুদাল্‌-লিন্‌-নাস’ (সকল মানবজাতির জন্য গাইডবুক ও পথপ্রদর্শক) আখ্যায়িত করা হয়েছে। সুতরাং, মুসলিম-অমুসলিম সকলে একই মানব সমাজের অংশ। একই সমাজে, একই প্রাকৃতিক গণ্ডি ও আবহে সবার বাস। তাই সহাবস্থান ও বহুত্ববাদী জীবনব্যবস্থা ইসলামে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।  

সহাবস্থানের কাঠামো— সহাবস্থান, পারস্পরিক সহিষ্ণুতা, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সহানুভূতি ও সদ্ব্যবহার, মানবতাপূর্ণ উদারতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলির অন্তর্গত। তাই নবী-জীবনে এ আদর্শের প্রজ্বল নমুনা উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি (সা) নিজ জীবনে অমুসলিমদের সাথে মেলামেশা-লেনদেন ও আচার-আচরণের ক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তাছাড়া ঐতিহাসিক ‘মদিনার সনদ’ ইসলামের পরম উদারনীতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার একটি প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

আর তাই একজন মুসলিমের সহিষ্ণু হওয়া খুবই জরুরী। কেননা ইসলাম অমুসলিমদের সাথে সদাচরণ ও উত্তম ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে। কুরআনের ঘোষণা— “যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়নি এবং তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে বিতাড়ন করেনি, তাদের সাথে সদাচরণ ও নিষ্ঠাপূর্ণ ব্যবহার করতে আল্লাহ নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ নিষ্ঠাবানদের পছন্দ করেন।” [সূরা আল্‌-মুম্‌তাহ়িনা ৮] অন্য স্থানে বলা হয়েছে, “আহ্‌লে কিতাব (অন্যান্য ঐশী গ্রন্থের অনুসারী)-দের সাথে তোমরা উত্তমভাবে বাদানুবাদ করো।” [সূরা আল্‌-আনকাবুত ৪৬] অন্য ধর্মের মানুষদের কষ্ট দেওয়া তো দূরের কথা, তাঁদেরকে গালমন্দ করতেও ইসলাম কঠোরভাবে নিষেধ করেছে, বিশেষ করে তাদের উপাস্যদের ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপ করাকে, “তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উপাসনা করে, তোমরা তাদের উপাস্যদের সম্পর্কে অশ্রাব্য কথা বলো না।” [সূরা আল্‌-আন্‌‘আম ১০৮]

তাছাড়া, মুসলিম সমাজে বসবাসরত অমুসলিমরা যাতে নিজেদের সম্মানবোধ বজায় রেখে চলতে পারে, তাদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়, তাদের প্রাণ, স্থাবর-অস্থাবর অর্থসম্পদ ও সম্ভ্রম সব কিছুই নিরাপদ থাকে ইসলাম তার ব্যবস্থা ও নিশ্চয়তা দিয়েছে। বলা হয়েছে— “মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমরা হচ্ছে যিম্মাহ্‌ অর্থাৎ আমানতস্বরূপ।” তাই রাসূল (সা) বলেছেন, “সাবধান! যদি কোনো মুসলিম কোনো অমুসলিম নাগরিকের উপর অত্যাচার করে, তার অধিকার খর্ব করে, তাকে কষ্ট দেয় এবং বলপ্রয়োগ করে তার কোনো কিছু দখল করে নেয়, তাহলে কেয়ামতের দিন আমি ওই মুসলিমের বিরুদ্ধে আল্লাহর নিকট অভিযোগ করব।” [সহিহ আবু দাউদ, আল্‌বানি ২৬২৬]
  
ধর্মীয় সহিষ্ণুতার দৃষ্টিকোণ— নবী (সা) যখন মক্কায় জনমানসকে ইসলামের পথে আহ্বান করলেন। তখন তাওহীদ (একত্ববাদ) ও শির্‌ক (পৌত্তলিকতা)-এর সংঘাত দেখা দিল। এবং নিপীড়িত ও নির্যাতিত লোকেরা ইসলামের সমানাধিকার নীতিকে গ্রহণ করতে লাগল। ফলে কোরায়েশের এক প্রতিনিধি দল রাসুল (সা)-কে প্রস্তাব দিল, “আমরা ছ’ মাস আপনার প্রভুর ইবাদত করবো, আর বাকি ছ’ মাস আপনারা আমাদের উপাস্যের উপাসনা করবেন”। ইসলামে যেহেতু বিশ্বাসের উপর কর্মকাণ্ড নির্ভরশীল, তাই তাদের প্রস্তাব নাকচ করে সমাধান দেওয়া হল, “তোমরা তোমাদের ধর্ম পালন করো, আমি আমার দ্বীন পালন করবো।” [সূরা আল্‌কাফিরূন ৬] পরবর্তীতে বিষয়টিকে আরও একধাপ এগিয়ে স্পষ্ট করা হল, “নিশ্চয় আলো-অন্ধকার ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নিরূপিত হয়েছে; ফলে ধর্মপালনে কোনো প্রকার বল প্রয়োগ বৈধ নয়।” [সূরা আল্‌-বাকারাহ্‌ ২৫৬]

তারপর হিজ্‌রত (মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় আগমন)-পরবর্তী সময়ে নবী (সা) মদিনায় একটি নতুন ইসলামি রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলেন। এবং সেই রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন ‘মদিনা সনদ’-এর উপর। ওই সনদের একটি ধারায় লেখা হয়েছিল– মদিনায় সব ধর্মের লোকেরা স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। কেউ কারোর ধর্মে কোনোরকম হস্তক্ষেপ করবে না...। [সিরাহ্‌, ইব্‌নু হিশাম ১/৫০৩-৫০৪] শুধু তাই নয়, মদিনার ইহুদিরা চরমভাবে ইসলামের বিরোধিতা করত; তা সত্ত্বেও রাসুল (সা) তাদেরকে ধর্ম-পালনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেননি। বরং সহিষ্ণুতার নজির সৃষ্টি করেছেন, একবার মদিনার মসজিদে নবী (সা) নাজ্‌রানের এক খ্রিস্টান প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। আলোচনা শেষে, তারা নিজ ধর্ম-অনুসারে (স়ালাত) প্রার্থনা করার অনুমতি চাইলে নবী (সা) তাদেরকে মসজিদ-ই-নববি (মদিনার মসজিদ)-তে প্রার্থনা করার অনুমতি দিয়েছিলেন। [তাফসির, ইব্‌নু কাসির ২/৪২, যাদুল্‌ মা‘আদ ৩/৫৪৯]  

বিতর্ক ও সমালোচনার পদ্ধতি— সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের জন্য সহাবস্থানের প্রতি উৎসাহিত করার পাশাপাশি মতপ্রকাশেরও স্বাধীনতা দিয়েছে ইসলাম। সেই সাথে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে স্বাধীনতার সীমারেখা এবং দায়িত্ব পালনের বিধিনিষেধ। কারণ, এই সমাজবদ্ধ জীবনযাপনে কথায়, কাজে, আচরণে ভুলত্রুটি ও পদস্খলন একটি অনিবার্য বিষয়। এবং তার সংশোধন ও উত্তরণের জন্য প্রয়োজন যথাযথ সমালোচনা। আর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সমালোচনাকারীর হিতাকাঙ্ক্ষী হওয়া। কেননা “কল্যাণ কামনাই ধর্ম।” [মুসলিম ২০৫] তাই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশদ তথ্য উপস্থাপন করে তার ভালো–মন্দ তুলে ধরে পক্ষে ও বিপক্ষে মতপ্রকাশ করা বা কখনো গভীর বিশ্লেষণ ও বিষয়ের নেতিবাচক দিক এবং তার নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট করা বাঞ্ছনীয়। এবং এই তর্কবিতর্ক ও আলোচনা-সমালোচনা হবে বুদ্ধিদীপ্ত, উপদেশমূলক ও উত্তম পন্থায় [সূরা আন্‌-নাহ়াল ১২৫]। কেননা ইসলামে পরনিন্দা, পরচর্চা, অহেতুক সমালোচনা ও অনর্থক তিরস্কার নিষিদ্ধ [সূরা আল্‌-হুজ্‌রাত ১২]।

সহযোগিতা ও সহমর্মিতার পাঠ— আমরা প্রত্যেকে পরস্পরের পরিপূরক। আমাদের সকলের যৌথ প্রয়াসই আমাদের সমাজ ব্যবস্থার কারিগর। তাই আমাদের সকলকেই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মানসিকতা ও মানবিক প্রেমবোধ দেওয়া হয়েছে। যাতে আমরা সবার সঙ্গে মিলেমিশে প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপন করতে পারি। সত্য-সুন্দর ও জনকল্যাণকর কাজকে গ্রহণ করতে পারি। কাউকে ঘৃণা, অবহেলা ও অবজ্ঞা করা চলবে না। সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সম্মান ও ভালোবাসা প্রদর্শন করতে হবে, সে যে পথের বা দলমতের হোক না কেন। কারণ সব মানুষই পরস্পর ভাই ভাই। আমাদেরকে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত ঘুচাতে বলা হয়েছে। স্রষ্টা আদেশ করেছেন, “নিজেদের মধ্যে বিবাদ করবে না, তাহলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।” [সূরা আল্‌-আন্‌ফাল ৪৬]

বর্তমানে ভালোবাসা ও সহমর্মিতার মহাসংকটে ভুগছে পৃথিবী। মানবপ্রেম নেই মনুষ্যসমাজে। অথচ মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে মানবজাতির কল্যাণ সাধনের জন্য; “তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটেছে।” [সূরা আলে ইমরান ১১০] অতএব তোমরা মানুষের পাশে দাঁড়াবে, আশ্রয়হীনদের আশ্রয় দেবে, অভুক্তদের ক্ষুধা মিটাবে, বিপদগ্রস্তদের উদ্ধার করবে। মনে রাখবে, “বিধবা ও অসহায়দের সাহায্যকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর সমতুল্য।” [বুখারি ৬০০৭, মুসলিম ৭৬৫৯] অন্য হাদিসে আদেশ করেছেন, “অসুস্থ লোকের সেবা করো, ক্ষুধার্তকে অন্ন দাও এবং বন্দিকে মুক্ত করো।” [বুখারি ৫৬৪৯, মুস্‌নাদ আবু ইয়া’লা ৭৩২৫] কারণ, “আল্লাহ তখনই কোনো মানুষের সাহায্য করেন যখন সে নিজ ভাইয়ের সাহায্য করে।’ [মুসলিম ৭০২৮, আবূ দাঊদ ৪৯৪৮, তিরমিযি ১৪২৫]

যেহেতু ইসলাম সবার জন্য শান্তি, সাম্য, উদারতা ও মানবিকতার কথা বলে। তাই মুসলিম-অমুসলিম, সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু সকলের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামের নির্দেশ অত্যন্ত কঠোর। সেজন্যই যে-কারোর প্রতি নিপীড়ন ও অত্যাচারকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, “হে আল্লাহ্‌র বান্দারা (হে মানবজাতি)! আমি তোমাদের সকলের জন্য যে-কোনোরকমের নিপীড়নকে নিষিদ্ধ করেছি।” [মুসলিম ৫৫]। সহাবস্থানের বিষয়টিকে স্পষ্ট করে অন্য এক হাদিসে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি “অমুসলিম নাগরিক”-কে হত্যা করে, সে জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না; যদিও জান্নাতের সুগন্ধি চল্লিশ বছরের দূরত্বে অবস্থান করেও অনুভব করা যাবে। [বুখারি ৩১৬৬] অতএব প্রকৃত মুসলিম হতে হলে ভালো মানুষ হতে হবে, অন্যদের ভালোবাসতে হবে। নবীজি বলেছেন, “যতক্ষণ না অন্যদের ভালোবাসবে তুমি মুমিন হতে পারবে না।” [মুস্‌লিম ৫৪]

[পূবের কলম, ২৪ জানুয়ারি, ২০২০-এর দ্বীনদুনিয়া ক্রোড়পত্রে "সহাবস্থান ও ইসলামের নীতি" নামে প্রকাশিত]