সকালের আলো ঠিকমতো চোখে পড়ার আগেই হোস্টেলের ঘরটা যেন এক অদ্ভুত
ব্যস্ততায় ভরে উঠল। ঘুমচোখে কেউ ব্যাগের চেইন টানছে, কেউ জামা ভাঁজ করতে গিয়ে
আবার এলোমেলো করে ফেলছে। কোনোদিক থেকে ভেসে আসছে টুথপেস্ট হারানোর অভিযোগ, কোথাও চাবি নিয়ে হুলস্থুল কাণ্ড। দু’সপ্তাহের ছুটি—এই খবরটা যেন সবাইকে একসঙ্গে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে।
ওদের তুলনায় আমি একটু আলাদা স্বভাবের। তাড়াহুড়োটা আমার ভেতরে হলেও বাইরে চুপচাপ। তাই মেঝেতে বসে নিজের
ব্যাগটা খুলে ধীরে ধীরে জামাকাপড় গুছিয়ে নিলাম। তারপর তাকের দিকে তাকালাম। কয়েক
মুহূর্ত দ্বিধা—শেষ পর্যন্ত কয়েকটা বই তুলে নিলাম। ছুটি মানে যে পড়াশোনা হবে না, সেটা অভিজ্ঞতা থেকেই জানি। তবুও বই না নিলে মনে হয় দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছি। বইগুলো ব্যাগে ঢুকাতেই ওজন বেড়ে গেল—ব্যাগটা যেন হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল, শুধু কাঁধে নয়, মনেও।
হোস্টেলের গেট পর্যন্ত ব্যাগ টেনে আনতে বেশ কষ্ট হলো। বাইরে
বেরিয়ে দেখি,
রাস্তা প্রায় ফাঁকা। কুয়াশার হালকা চাদরের ভেতর দিয়ে সকালটা
ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। ভাগ্য ভালো, একটা রিকশা পেয়ে
গেলাম। রিকশাওয়ালা পনেরো টাকায় রাজি হয়ে গেল। মিনিট কুড়ির মধ্যেই পৌঁছে গেলাম খাগড়া বাসস্ট্যান্ড।
সেখানে পৌঁছে দেখি পরিচিত দৃশ্য—হোস্টেলের ছেলেরা ছোট ছোট দলে জটলা করে গল্পগুজব করছে। কেউ ছুটির পরিকল্পনা করছে, কেউ বাড়ির খাবারের
গল্প শোনাচ্ছে। কোথাও লুচি-পরোঠা ভাগাভাগি করে খাওয়ার দৃশ্য। এসবের মাঝেই সময় কেটে গেল। প্রায় এক ঘণ্টা পর বাস এল। ভিড় ঠেলে, ধাক্কাধাক্কি সামলে কোনোরকমে বাসে উঠলাম। ভাগ্যক্রমে জানালার পাশে
সিট পেয়ে যেন একটু স্বস্তি পেলাম।
বাস ছাড়তেই বাইরের দৃশ্যগুলো চলমান ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে
উঠতে লাগলো। মাঠ-ঘাট, গাছপালা, রাস্তার ধারের চায়ের দোকান—সবই যেন উল্টো দিকে ছুটছে। মনে হচ্ছিল, বাসটা একে একে রামপুর, কানকি, ডালখোলা, দোমহনা, নাগর, রায়গঞ্জ, কালিয়াগঞ্জকে পেছনে ফেলে শহরের কোলাহল
থেকে আমাকে ধীরে ধীরে গ্রামের শান্তির দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
দীর্ঘ চার ঘণ্টার সফর শেষে বাস কুশমুণ্ডিতে থামল। তখন বিকেল
গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার উপক্রম। পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়েছে, তার আলো লম্বা হয়ে শুয়ে আছে রাস্তায়। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে
দাঁড়িয়ে ভাবছি—এবার ট্র্যাকার না টমটম? ঠিক তখনই থানার দিক
থেকে লাফাতে-হাঁফাতে এক পরিচিত মুখ এগিয়ে এল—নির্মল সরকার।
পরনে মাটির রঙের পাঞ্জাবি আর সাদা ধুতি—যার রং সময়ের ছাপ লেগে সেপিয়া হয়ে গেছে। কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। আমাদের বাড়িতে তাঁর
যাতায়াত লেগেই থাকে—গ্রামের রাজনীতি,
সালিশ, ভোটের কাজ—সবেতেই তাঁকে দেখা যায়। আমাকে দেখেই নির্মল দা থমকে দাঁড়ালেন।
—
আরে,
তুই! তোদের ছুটি নাকি? বেশ তো, মজা করে ছুটি কাটা এবার।
আমি হেসে বললাম, — হ্যাঁ দাদা।
আপনি এখানে?
—
থানায় গেছিলাম রে, জানিসই তো,
আমাদের কতো রকমের ঝামেলাঝক্কি পোয়াতে হয়!
এরই মাঝে একটা টমটম এসে দাঁড়াল। সবাই উঠতে ব্যস্ত। নির্মল দা আমাকে সরিয়ে দিয়ে কোনোরকমে দুটো জায়গা আগলালেন—একটায় নিজে বসলেন,
আরেকটায় আমাকে বসালেন। টমটম চলতে শুরু করল—ঘটংঘট,
টুংটুং আওয়াজে চারপাশ ভরে উঠল। ধুলোর ভেতর দিয়ে এগোতে এগোতে
শুরু হলো আমাদের কথা।
—
পড়াশোনা কেমন চলছে?
—
মোটামুটি।
—
ভালো করে পড়িস। কাকু কত কষ্ট করে তোকে পড়াচ্ছে!
—
চেষ্টা করছি। হাফ-ইয়ার্লিতে ফার্স্ট হয়েছি।
—
বাহ্! দারুণ তো!
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নির্মল দা আবার জানতে চাইলেন মাদ্রাসার পড়াশোনা নিয়ে। ইংরেজি, বাংলা,
অংকের পাশাপাশি আরবি, তাফসীর, হাদীস,
ফিকাহ্—সব বললাম। ফিকাহ্র নাম শুনে একটু অবাকই হলেন। আমি সহজ করে বোঝালাম—কুরআন-হাদীসের আলোকে দৈনন্দিন জীবনের আচারআচরণ, রীতিনীতি ও নানান সমস্যার সমাধানের কথা।
টমটম এগিয়ে চলল। নাহিট পেরিয়ে দেখলাম, দূরে খড়ের গাদা থেকে ধোঁয়া উঠছে, কেউ গরু নিয়ে বাড়ি ফিরছে। সন্ধ্যার আলো ধীরে
ধীরে নরম হয়ে আসছে। হঠাৎ নির্মল দা ভারী গলায় বললেন,
—
শোন্, ধর্ম আলাদা আলাদা হতে পারে, কিন্তু সব ধর্মই মানুষকে ভালো হতে শেখায়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর মিলেমিশে থাকাই আসল। চণ্ডীপুরে হিন্দু-মুসলমান-সাঁওতাল যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি আছে। তোরা নতুন প্রজন্ম—তোদের দায়িত্ব আরও বেশি।
কিছুক্ষণের মধ্যে রামপুর, চৌরঙ্গী
পেরিয়ে টমটম মহিপালে পৌঁছে গেল। নির্মল দা যাওয়ার বেলা মহিপালে সাইকেল রেখে
গেছিলেন। তাই নেমে পড়লেন। যাওয়ার আগে টমটমওয়ালাকে দু’জনের ভাড়া মিটিয়ে দিলেন। আমি বারণ করতে গেলে তিনি আমার মাথায় হাত বোলাতে
বোলাতে বললেন, “তোরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। ভালো করে লেখাপড়া করিস্, গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করিস্!”
তাঁর ওই স্নেহমাখা কণ্ঠ শুনে আমার
চোখ ভিজে গেল। চুপচাপ কিছুক্ষণ শূন্যের দিকে তাকিয়ে রইলাম। পশ্চিম আকাশ তখন গোধূলি আলোয় সেজে উঠেছে। সূর্যাস্তের লাল আলো
টমটমের কাঠের দণ্ডে পড়ে গড়াগড়ি
দিচ্ছে। তুলাইয়ের
জল টাঙনে এসে পড়ছে, আর দুটো স্রোত পাশাপাশি বইছে। মনে হলো, এই পথ শুধু বাড়ির
দিকেই নয়—মানুষ থেকে মানুষের দিকে যাওয়ার পথও বটে। বিশ্বাস আলাদা হতে পারে, কিন্তু একসঙ্গে চলার শক্তিটাই সবচেয়ে বড়।
আমি ব্যাগের ফিতেটা কাঁধে ঠিক করতে করতে সামনে তাকিয়ে রইলাম।
পরিচিত গাছপালা, বাঁক নেওয়া পথ—সবই ধীরে ধীরে আরও চেনা হয়ে উঠছিল। অথচ মনে হচ্ছিল,
আমি শুধু বাড়ির দিকেই ফিরছি না; কারও বলা কথাগুলো,
না–বলা আশঙ্কাগুলোও সাথে নিয়ে ফিরছি। টমটমের কাঠে পড়ে থাকা লাল আলোটা হঠাৎই ফিকে হয়ে এল—সূর্য বুঝি চোখের আড়ালে চলে গেছে। টমটম গতি কমাল। নামার সময় এখনও হয়নি, তবু মনে হলো এই পথের শেষে শুধু বাড়ি নয়—আরও অজানা অনেক কিছুই অপেক্ষা করছে। চাকা গড়াল, আবার আওয়াজ উঠল—ঘটংঘট…
টুংটুং…
২৪/০৫/২০২৫
হেস্টিংস,
কোলকাতা

No comments:
Post a Comment