ক’দিন ধরেই আকাশ ভেঙে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিল। একটানা
বৃষ্টিতে নদী-নালা,
খাল-বিল, পুকুর-ডোবা, খানাখন্দ সবই পানিতে থৈথৈ করছিল। চারদিকে শুধু জল
আর জল। কোথাও যেন এক চিলতে মাটির দেখা নেই। প্রকৃতির সে কী যে
ভয়ংকর রূপ!
১৯৮৭ সাল, শুক্রবারের দিন, এশার নামাজ পড়ে যে যার বাড়িতে রাতের খাবার খেতে বসেছে। হঠাৎ একটা কলরব উঠলো—“তিস্তার বাঁধ ভেঙে গেছে, ঘরবাড়ি সব ভেসে যাচ্ছে!” মুহূর্তের মধ্যে খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল সারা পাড়ায়। কারও মুখে তখন আর অন্য কোনো কথা নেই। সবার চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রায়
দেড়-দু’ ফুট উঁচু উঁচু ঢেউ এসে মুহুর্মুহু
আছড়ে পড়তে শুরু করল। মনে হচ্ছিল, আর একটু পরেই
গোটা গ্রামটাকে জলে গিলে নেবে।
পরিস্থিতি বেসামাল দেখে সবাই মিলে মরিয়া হয়ে ক’টা নৌকা ও ভেলা জোগাড় করল। সিদ্ধান্ত হলো—প্রথমে মহিলা ও শিশুদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হবে। কোনোকিছুতে সময় নষ্ট না করে রাতের অন্ধকারেই শুরু হলো উদ্ধারকাজ। সারা রাত ধরে চলল সেই ভয়ংকর অভিযান। এক এক করে গ্রামের প্রায় সব মহিলা ও শিশুকে শাটিমারি
ডাঙ্গিতে নিয়ে যাওয়া হলো। গ্রামে রয়ে গেলে কেবল যুবক, বৃদ্ধ আর গরু-মোষ-ছাগল-হাঁস-মুরগি।
অনেকের বাড়িতে চাল-ডাল,
ধান-পাট, কাপড়চোপড়, টাকাপয়সা, সোনাদানা ও নানা
মূল্যবান জিনিসপত্র ছিল। সেসবও তো একেবারে ফেলে যাওয়া যায় না। তার উপর বন্যার সুযোগে একদল অসামাজিক মানুষ চারদিকে লুটপাট ও ডাকাতি শুরু করে দিয়েছে বলে খবর চাউর হয়ে গেছিল। তাই বাড়ির পুরুষমানুষরা জিনিসপত্র
পাহারা দেওয়ার জন্য গাছের উপর মাচা বানিয়ে সেখানেই থেকে গেল। সবাই অপেক্ষা করছিল—কখন ভোর হবে!
পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তা রাতের তুলনায় আরও ভয়াবহ। গ্রামে একটা মাটির বাড়িও অক্ষত নেই। সবকিছু পানির নিচে তলিয়ে গেছে। যে ঘরগুলোতে গতকালও মানুষের সংসার ছিল; হাঁড়িপাতিল, বাসনকোসন, খাটপালং ছিল আজ
সেসব নিশ্চিহ্ন প্রায়;
যেন বন্যার জলে সব ভেসে গেছে। হঠাৎ একটা বিকট শব্দ হলো। কেউ একজন চিৎকার করে বলে উঠল— “গুলু বড়বাজির মাটির দোকোঠাটা ভাঙ্গি পলি!”
চারদিকে বিভীষিকাময় দৃশ্য। হাঁস-মুরগিগুলো স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছে। ছোট ছোট বাছুর আর ছাগলগুলো হাবুডুবু
খাচ্ছে। কোথাও মাটির নাগাল না পেয়ে একসময় তারাও স্রোতের তোড়ে ভেসে যাচ্ছে।
চোখের সামনে গবাদিপশু ও ঘরবাড়ির এই পরিণতি দেখে মানুষ স্থির থাকে কী করে। চারদিকে শুধু হাহাকার ও বুকফাটা কান্না। আর আকাশ? সেও যেন মানুষের
সেই কান্নার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অবিরাম কেঁদেই চলেছে। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই।
বড়আব্বা আগের রাতেই শাটিমারি চলে গিয়েছিলেন। বাড়ির মহিলা ও ছোট ছোট বাচ্চারা
তো সেখানে একা থাকতে পারে না—তাদের সঙ্গে একজন
অভিভাবক থাকা দরকার। মজিদ
দা ও
বারি দাও তাঁদের সঙ্গে চলে গিয়েছিল। আর এদিকে বাড়িতে রয়ে গেছিলেন আব্বা,
মেজোআব্বা, মেজদা, বাকি দা ও উম্মেত দা। তারা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলো—আব্বা, মেজোআব্বা ও
উম্মেত দা গাছের উপর মাচা করে এখানেই থাকবেন। বাড়িতে চাল-ডাল, ধান-পাট, কাপড়চোপড়, টাকাপয়সা, সোনাদানা, জমিজায়গার দলীলপত্র—অনেক কিছুই তো আছে। সেগুলো পাহারা দেওয়ারও প্রয়োজন। বন্যার পানি যেমন
বাড়ছিল,
তেমনি বাড়ছিল উৎকণ্ঠাও।
সকালের দিকে মজিদ দা এবং আরও কয়েকজন শাটিমারি থেকে গ্রামে ফিরলেন। সাথে করে সেখানকার খবরাখবর নিয়ে এলেন। বড়দা জানালেন—আশপাশের আদিবাসী মানুষজন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। কেউ
খাবার নিয়ে আসছে,
কেউ জামাকাপড়, কেউ মাদুর ইত্যাদি।
কিছু যুবক হাটের ছাউনিগুলো উপড়ে নিয়ে এসে অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। জোলা মেম্বার আম্মা, বড় আম্মা,
মেজো আম্মা এবং বাড়ির ছোট ছোট বাচ্চাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে
গিয়ে খাওয়া-থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
এদিকে বৃষ্টি থামার
কোনো লক্ষণ নেই। বরং পানির স্তর ক্রমেই বেড়ে চলেছে। মনে
হচ্ছিল,
জল যেন প্রতিমুহূর্তে আরও ফুলে-ফেঁপে উঠছে। মেজোআব্বা পরিস্থিতি দেখে বললেন, “আর বেশি দেরি করা ঠিক হবে না। তোমরা গরু-মোষগুলো শাটিমারি
নিয়ে যাও।”
কথা মতো মজিদ দা,
বাকি দা ও ফিজুর দা গরু-মোষগুলো নিয়ে শাটিমারির উদ্দেশে
রওনা হলেন।
বিন্যাকুড়ির কাছে গিয়ে তাঁরা দেখলেন—পুরো মাঠ এমনকি সড়কটাও পানির নিচে। যে সড়ক দিয়ে মানুষজন প্রতিদিন চলাফেরা করত,
তার কোনো চিহ্নই নেই। তবু থেমে থাকার উপায় নেই। তিন ভাই আন্দাজে এগিয়ে চললেন। সবার সামনে মজিদ দা। তাঁর পেছনে হালের গরুগুলো। তারপর বাকি দা।
তাঁর পেছনে গাভী ও ছাগলগুলো। এরপর ফিজুর দা। আর সবশেষে আমাদের মোষ দু’টো। ক’টা মজবুত দড়ি দিয়ে গরু, গাভী ও ছাগলগুলোকে একসঙ্গে বাঁধা হয়েছিল। দড়ির এক প্রান্ত মজিদ দা ধরে, মাঝখানে বাকি দা, আর পেছনের দিকে ফিজুর দা। শুধু মোষ দুটোকে বাঁধা যায়নি। দড়িটা ছোট পড়ে গিয়েছিল।
মোলানিয়ার কাছে এসে পানির স্রোত আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল। পানির স্তর তখন প্রায় গলা
পর্যন্ত উঠে গেছে। তিন ভাই অত্যন্ত সাবধানে, ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছেন। সামনে গিয়ে দেখা গেল,
রাস্তার একটা অংশ ভেঙে গিয়ে সেখানে যেন ছোট্ট একটা নদী তৈরি
হয়ে গেছে। প্রবল বেগে স্রোত ছুটছে। পা ফেলতেও ভয় হচ্ছে। তবু এগোতে হবে। মজিদ দা ও বাকি দা কোনোমতে সেই ভাঙা জায়গাটা পার হয়ে গেলেন।
গরু-গাভীগুলোও প্রাণপণে হাত-পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে স্রোত পেরিয়ে গেল।
ফিজুর দা পা বাড়িয়েছে সবে। ঠিক তখনই একটা
তীব্র জলোচ্ছ্বাস এসে আছড়ে পড়ল। ফিজুর দা টাল সামলাতে না পেরে মুহূর্তের মধ্যে পানিতে পড়ে গেল। আর সেই ভয়ংকর
স্রোত তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো।
তা দেখে ছিঁড়ার ওপারে বাকি দুই ভাই যেন পাথর; কী করবেন, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন
না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাঁরা শুধু দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। অন্যদিকে ফিজুর দা অথই জলে হাত-পা ছুঁড়ছে। প্রাণপণে
বাঁচার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রবল
স্রোতের সঙ্গে যেন কোনোভাবেই পেরে উঠছে না।
তখনও মোষ দুটো ঠাই দাঁড়িয়ে। হয়তো তারাও বুঝতে পেরেছিল—সামনের স্রোত
ভয়ংকর। কীভাবে এই জলোচ্ছ্বাস পার হবে, যেন সেই চিন্তাতেই দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ তাদের খেয়াল হলো—গুসিয়া সামনে নেই! এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল, গুসিয়া স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছে। আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। নিজের জীবনের কথা না ভেবে একটা মোষ স্রোতে গা ভাসিয়ে দিল। তাকে দেখে
দ্বিতীয় মোষটিও যেন আর স্থির থাকতে পারল না। সেও নিজেকে স্রোতের মধ্যে ছেড়ে দিল।
মেজদা তখন প্রাণপণে হাত-পা ছুঁড়ছে। কিন্তু পেরে উঠছে না। এ যেন প্রকৃতির সাথে
মানুষের অসম লড়াই। ওদিকে প্রবল
জলোচ্ছ্বাসের বুক চিরে মুহূর্তের মধ্যেই মোষ দু’টো মেজদার কাছে
পৌঁছে গেল। তারপর ওরা দু’জনেই মেজদার দিকে মাথা বাড়িয়ে দিল। মেজদাও যেন শেষ আশ্রয়টুকু খুঁজে পেলেন। সর্বশক্তি দিয়ে একটা মোষের শিং দু’টো আঁকড়ে ধরলেন। তারপর শুরু হলো এক অভাবনীয় লড়াই। একদিকে উন্মত্ত স্রোত তাঁদের টেনে নিয়ে যেতে চাইছে, অন্যদিকে মেজদা আর মোষ দু’টো প্রাণপণে সেই
স্রোতের বিরুদ্ধে লড়ছে। অবশেষে তারা স্রোতের বুক চিরে ডাঙ্গির দিকে এগোতে শুরু করল। একটু একটু করে। ধীরে ধীরে। মৃত্যুকে পেছনে
ফেলে।
কিছুক্ষণ পর তারা তিনজনই ডাঙ্গায় এসে পৌঁছাল। ডাঙ্গিতে পা রাখার পর তিনজনেই হাঁপাচ্ছিল। বুকের ভেতর তখনও দমকা বাতাসের মতো শ্বাস ওঠানামা করছে। যেন কেউ কিছু বলার অবস্থায় নেই। একে একে বাকি দা, মজিদ দা সবাই সেই জায়গায় জড়ো হলো। আর তখন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। মোষ দু’টো মেজদার গা ঘেঁসে তাঁর ঘাড়ের উপর মাথা রেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো, তারা যেন কিছু বলতে চাইছে। হয়তো বলতে চাইছে— “তুমি রোজ আমাদের দেখাশোনা করো, আদর-যত্ন করো, সময় মতো জলখাবার দাও। চান করাও। আমরাও তোমাকে ভালোবাসি। তাই তোমাকে এই অবস্থায় একা ছাড়িনি।”
তারপর সবাই মিলে ধীরে ধীরে শাটিমারি হাটের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানেই
গবাদিপশুগুলোর থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পেছনে পড়ে রইল আমাদের ডুবে যাওয়া গ্রামটা—লোকজনের ভাঙা ঘরবাড়ি, ভেসে যাওয়া সংসার,
শিশুদের কান্না, মায়েদের
হাহাকার আর অগণিত বিষাদময় স্মৃতি।
বহু বছর কেটে গেছে। সময়
অনেক কিছু মুছে দিয়েছে। কত মুখ হারিয়ে গেছে স্মৃতির আড়ালে, কত ঘরবাড়ির সময়ের বুকে বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু
১৯৮৭-এর সেই বন্যার রাত, সেই জলোচ্ছ্বাস, সেই হাহাকার আর মেজদাকে শিংয়ে জড়িয়ে নিয়ে স্রোতের বিরুদ্ধে লড়তে থাকা সেই দুই মোষের ছবি আজও পাড়াপড়শির স্মৃতিতে জীবন্ত হয়ে আছে। মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা। তবে সেদিনের সেই ভয়ংকর বন্যা ও প্রকৃতির সেই তাণ্ডবলীলা প্রেম ও ভালোবাসার কিছু অনন্য গল্পও সৃজন করেছিল, যেগুলো আজও আমাদের মনে আলো জ্বেলে রেখেছে—লোকজনের গ্রামীণ কলহ-বিবাদ ভুলে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো,
অন্যকে বাঁচানোর জন্য নিজের সসবটুকু উজাড় করে দেওয়া, আর বিশেষ ভাবে নিজ গুসিয়ার প্রতি সেই মোষ দুটোর অব্যক্ত ভালোবাসা।
হেস্টিংস, কোলকাতা
৯ আগস্ট ২০২৬
