Pages

Showing posts with label সম্প্রীতি. Show all posts
Showing posts with label সম্প্রীতি. Show all posts

Monday, 21 September 2026

আমার ছোট ভাই - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 
শীত চলে গেছে—বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে। তবে বসন্ত তখনও এসে পৌঁছায়নি। ঋতুর খাতায় শীতের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার শেষটুকু যেন তখনও বাতাসের শরীরে লেগে আছে। ভোরের হাওয়ায় তখনও একটা হালকা শীতশীত ভাব, সকালের চাদরে তখনও কুয়াশার স্মৃতি আর নিস্তব্ধতার এক অদ্ভুত আবেশ। মনে হচ্ছিল, শীত বিদায় নিয়েছে বটে, কিন্তু যাওয়ার আগে তার কিছু স্মৃতি বাতাসের কাঁধে রেখে গেছে।
 
সেই রকমই এক কাকভোরে খাদেমুল দা বাড়ি থেকে বেরোলেন। ভোর তখনও পুরোপুরি ভোর হয়ে ওঠেনি। চারদিকের অন্ধকার ধীরে ধীরে পাতলা হচ্ছে, কিন্তু দিনের আলো তখনও দিগন্তের ওপারে। ঘরের মানুষজন ঘুমিয়ে। উঠোন নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও দু-একটা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। খাদেমুল দা চুপচাপ জামাকাপড় পরে নিলেন। সঙ্গে একটা ছোট্ট ব্যাগ, ব্যাগটা খুব ভারী নয়—তাতে প্রয়োজনের সামান্য কিছু জিনিস; আর কিছু অদৃশ্য চিন্তা সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
 
মোড়ে এসে দেখলেন, কয়েকজন মানুষ ইতিমধ্যে হাটাহাটি করছে। কেউ কাজে বেরোবে, কেউ হয়তো বাজারের দিকে যাবে। কিন্তু তখনকার দিনে এমন ভোরবেলায় যানবাহনের এত সহজলভ্যতা ছিল না। ইচ্ছা করলেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ি পাওয়া যেত না। তাই আগের রাতেই পাশের গ্রামের এক রিকশাওয়ালাকে বলে রেখেছিলেন। তবে তার আসতে একটু দেরি হচ্ছিল দেখে খাদেমুল দা অপেক্ষা করতে লাগলেন।
 
অবশেষে কিছুক্ষণ পর রিকশাওয়ালা এসে হাজির। খাদেমুল দা রিকশায় উঠলেন। রিকশা চলতে লাগলো। ভোরের ঠান্ডা বাতাস শিরশির করে যেন বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধছিল। রিকশার চাকার কর্‌কর্‌ শব্দে নিস্তব্ধ রাস্তা যেন ধীরে ধীরে জেগে উঠছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁরা পৌঁছে গেলেন মহিপাল বাসস্ট্যান্ডে। বাস ছাড়তে তখনও প্রায় কুড়ি মিনিট বাকি। এই সামান্য সময়টুকুও তিনি নষ্ট করতে চাইলেন না। তাই রিকশাওয়ালাকে সঙ্গে নিয়ে চায়ের দোকানে বসলেন। দু’জনের জন্য চা-বিস্কুট নিলেন। নিজেও খেলেন, রিকশাওয়ালাকেও খাওয়ালেন। তারপর তার প্রাপ্য ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে বললেন— হাঁ বো কাকা, তোরা এইবার বাড়িত যাও।
 
রিকশাওয়ালা চলে গেল। খাদেমুল দা বাসে উঠে জানালার ধারের একটা সিটে বসে পড়লেন। বাস ছাড়ল প্রায় দশ মিনিট দেরীতে। জানালার বাইরে তখন ভোরের আলো ধীরে ধীরে সকাল হয়ে উঠছে। পরিচিত গ্রাম, মাঠ, গাছপালা, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ—সবকিছু পেছনে পড়ে যাচ্ছে। খাদেমুল দা চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে সেসব দেখছিলেন। তাঁর এই যাত্রা কেবল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার যাত্রা ছিল না; এর মধ্যে ছিল দেখা করার আকাঙ্ক্ষা, কিছু কথা বলার প্রয়োজন, আর নিজের ভেতরে জমে থাকা কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা।
 
প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর বাস পৌঁছাল কুশমুণ্ডিতে। সেখানে নেমে তাঁর কিছু টুকিটাকি জরুরি কাজ ছিল। সেগুলো সেরে আবার একটা বাস ধরলেন। এবার গন্তব্য দোমোহনা। দোমোহনা থেকে ট্রেকার। তারপর ট্রেকার বদলে অবশেষে পৌঁছালেন গোয়ালপোখরে।
 
দীর্ঘ পথ। একের পর এক যানবাহন। একের পর এক রাস্তা। তবু খাদেমুল দা’র মনে কোনো ক্লান্তি ছিল না। কারণ মানুষের কোনো কোনো যাত্রা শরীরের ক্লান্তিকে অতিক্রম করে যায়—গন্তব্যের মানুষটি যখন হৃদয়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন পথের দূরত্ব আর দূরত্ব বলে মনে হয় না।
 
গোয়ালপোখরে তাঁর গন্তব্য ছিল অশোক দা’র বাড়ি। অশোক দা আমাদের এলাকার একজন কৃতী সন্তান। তখন তিনি মৎস্য দপ্তরের একজন কর্মরত অফিসার হিসেবে গোয়ালপোখরে পোস্টেড। আমাদের এলাকার তরুণদের কাছে তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণা। অনেকেই তাঁর কাছে পরামর্শ নিতে যেতেন। কারও পড়াশোনা নিয়ে সমস্যা, কারও চাকরি নিয়ে সংশয়, কারও ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধা—অশোক দা নিজের মতো করে সবাইকে কিছু না কিছু পথ দেখাতেন। শুধু উপদেশ দিতেন না, অনেক সময় পাশে দাঁড়াতেন, সাহস জোগাতেন, এবং সাহায্যও করতেন।
 
খাদেমুল দা’রও তাঁর সঙ্গে কিছু আলাপ-আলোচনা করার ছিল। আগেই কথা হয়েছিল। তাই গোয়ালপোখরে পৌঁছেই তিনি অশোক দা’র অফিসে গেলেন। কিন্তু অশোক দা’র তখন কিছু জরুরি কাজ চলছিল। তিনি বেয়ারাকে ডেকে খাদেমুল দা’কে বাইরে চা-বিস্কুট দিয়ে বসাতে বললেন; এবং বললেন, কাজ শেষ হলেই বেরিয়ে আসবেন।
 
খাদেমুল দা অপেক্ষা করতে লাগলেন। অবশেষে কাজ শেষ হলো। দু’জন একসঙ্গে অফিস থেকে বেরোলেন। ততক্ষণে দিনের আলো অনেকটাই ফুরিয়ে এসেছে। বাড়িতে বাড়িতে সন্ধ্যার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আর তাঁদের গ্রামের  বাড়ি তো গোয়ালপোখর থেকে অনেক দূরে। সেই রাতে খাদেমুল দা’র পক্ষে বাড়ি ফেরা যে সম্ভব নয়—এটা অশোক দাও ভালোভাবেই জানতেন। তাই খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললেন— “খাদেমুল, আজ তুমি আমার সঙ্গে চলো। রাতে আমার কাছেই থেকো। কাল সকালে বাড়ি চলে যেও।”
 
খাদেমুল দা আর কী করবেন! রাজি হয়ে গেলেন। অশোক দা যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন, সেটা ছিল একজন বয়স্ক মহিলার। মহিলা স্বভাবের দিক থেকে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। কিছু বিষয়ে তাঁর নিয়মকানুন ছিল বেশ কড়া। অশোক দা ব্যাপারটি জানতেন। তাই বাড়িতে ঢোকার আগে তিনি খাদেমুল দা’কে একটু সাবধান করে দিলেন। বললেন,
—“খাদেমুল, একটা কথা মনে রেখো। বাড়ির মালকিন ভদ্র মহিলা যদি তোমার নাম জিজ্ঞেস করেন, তুমি ‘খাদেমুল’ বলবে না। বলবে—অমল।”
খাদেমুল দা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারলেন না। কিছুক্ষণ অশোক দা’র মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন।
—“কেন?”
অশোক দা তখন বিস্তারিত কিছু বললেন না। শুধু বললেন,
—“ভেতরে গেলেই বুঝবে।”
অশোক দা এগিয়ে গিয়ে বেল বাজালেন। দরজা খুলেই ভদ্র মহিলা রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করলেন— এ কে, কী নাম?
—আমার ছোট ভাই, মাসিমা। ওর নাম অমল। 
 
তারপর তাঁরা বাড়িতে ঢুকলেন। সেই রাতটা সেখানেই কাটল। দু’জনে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করলেন। গল্পগুজব হলো। হাবিজাবি নানান রকমের আলাপআলোচনা হলো। আর এভাবেই দিনের ক্লান্তি ধীরে ধীরে কথার মধ্যে গলে যেতে থাকলো। কিন্তু খাদেমুল দা’র মনে তখনও একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—কেন নিজের নাম লুকিয়ে অন্য একটা নাম বলতে হলো? রাতে সুযোগ পেয়ে অশোক দা’কে জিজ্ঞেস করলেন—“আচ্ছা, আমার নামটা বদলে বলতে বললেন কেন?”
 
এবার অশোক দা একটু হেসে, একটু গম্ভীর হয়ে আসল কথাটা বললেন। ওই ভদ্র মহিলা শুচিবাইর শিকার। তোমার নাম যদি ‘খাদেমুল’ শুনতেন, তাহলে হয়তো তোমাকে ঘরেই ঢুকতে দিতেন না। শুধু তোমাকেই নয়—আমাকেও নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হতো। হয়তো তোমার সামনে এমন সব কাণ্ডকারখানা করতেন, যেগুলো তোমারও খারাপ লাগত, আমারও খারাপ লাগত। তাই তোমাকে আগে থেকেই সাবধান করে দিয়েছিলাম।”
 
খাদেমুল দা এবার ব্যাপারটা বুঝলেন। কিন্তু তাঁর ভেতরে যেন অন্যরকম একটা অনুভূতি জন্ম নিল। একজন মানুষকে তার নিজের নাম পর্যন্ত গোপন করতে হলো—শুধু একজনের বাড়িতে রাত কাটানোর জন্য! কী অদ্ভুত! একটা নাম—কখনও পরিচয়, কখনও পরিচয়ের বোঝা। একটা নাম—কখনও দরজা খুলে দেয়, আবার কখনও দরজা বন্ধও করে দেয়। মানুষের পরিচয় যে কত বিচিত্রভাবে মানুষের ভাগ্য, সম্পর্ক ও আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই রাতে খাদেমুল দা যেন তার একটা ছোট্ট উদাহরণ চোখের সামনে দেখতে পেলেন।
 
পরদিন সকালে খাদেমুল দা’র বাড়ি ফেরার কথা। অশোক দা তাঁকে একা ছেড়ে দিলেন না। সকালে একটু তাড়াতাড়িই বেরিয়ে তাঁকে নিজে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন। অশোক দা নিয়মিত যাতায়াত করতেন বলে সেখানকার স্টেট বাসের কন্ডাক্টারও তাঁকে চিনতেন। অশোক দা কন্ডাক্টারকে ডেকে বললেন— “কাকা, এ আমার ছোট ভাই। ওকে রায়গঞ্জে নামিয়ে দিও।”
 
খাদেমুল দা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। অশোক দা শুধু মুখে তাঁকে “ছোট ভাই” বলেই থেমে থাকলেন না। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে তাঁকে কিছু নাস্তা কিনে দিলেন, সঙ্গে পানির বোতলও। এমনকি তাঁর বাসভাড়াটাও কন্ডাক্টরের হাতে দিয়ে বললেন— “খেয়াল রেখো, আমার ছোট ভাই। রায়গঞ্জে ঠিকমতো নামিয়ে দেবে।”
 
বাস ছাড়ল। ধীরে ধীরে বাসের চাকা গড়াতে লাগলো। অশোক দা ঠাই দাঁড়িয়ে রইলেন বাসস্ট্যান্ডে যতক্ষণ না বাসটা তাঁর চোখের আড়ালে চলে যায়। আর ওদিকে খাদেমুল দা জানালার পাশের সিটে বসে তাকিয়ে ছিলেন। জানালার কাচের ওপারে অশোক দা’র অবয়ব ক্রমশ ছোট হয়ে আসতে লাগল। খাদেমুল দা অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর একসময় অশোক দা’কে আর দেখা গেল না। শুধু রয়ে গেল রাস্তা, রাস্তার ধুলো; আর বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি।
 
জানালার বাইরে দৃশ্য ক্রমশ বদলাচ্ছিল—মাঠ, গাছ, বাজার, পথের ধারের দোকান, মানুষের আসা-যাওয়া। কিন্তু তাঁর চোখ দুটো যেন বাইরের কোনো দৃশ্য দেখছিল না। তিনি ফিরে যাচ্ছিলেন বারবার রাত থেকে সকালের সফরে। একটা বাড়িতে ঢোকার জন্য তাঁকে নিজের নাম বদলাতে হয়েছিল। ‘খাদেমুল’ নামটি সেখানে যেন একটি অদৃশ্য দেওয়াল। অথচ সেই একই মানুষকে পরদিন আর একজন মানুষ সবার সামনে বললেন— “এ আমার ছোট ভাই।”
 
বাস তখন অনেক দূর চলে এসেছে। খাদেমুল দা ব্যাগ থেকে অশোক দা’র কিনে দেওয়া নাস্তাটুকু বের করলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলেন সেটার দিকে। সামান্য কিছু খাবার—তার দাম হয়তো খুব বেশি নয়। জলের বোতলটার দামও সামান্য। বাসভাড়াটুকুও এমন কিছু নয়, যা হিসাবের খাতায় বড় অঙ্ক হয়ে দাঁড়াবে। তবে সবটাই ভালোবেসে, সাচ্চা মন থেকে দেওয়া। একজন বড় ভাই হিসেবে ছোট ভাইকে দেওয়া। খাদেমুল দা ওই নাস্তা হাতে ক্ষণিকের জন্য চোখদুটো বন্ধ করলেন। মনের চোখ দিয়ে তখন তিনি যেন দেখতে পাচ্ছিলেন, ঘৃণা ও বিদ্বেষের রাত ধীরে ধীরে সরে গিয়ে ভোরের আলো ফুটছে।  
 
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা 

Saturday, 4 April 2026

বিপন্ন সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র - ড. নূরুল ইসলাম



অধুনা এক শ্রেণির হিন্দু হিন্দুধর্মের গরিমা ও হিন্দুদের অস্মিতা জাহির করতে নিজেদের সনাতনী বলছেন। সচেতনভাবে নিজেদের হিন্দু না বলে সনাতনী বলছেন। বস্তুত প্রতিটি ধর্ম অনুসারী নিজেদের সনাতনী বলেন বা তার প্রতিশব্দ ব্যবহার করেন। নিজেদের ধর্ম বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে পৃথিবীর প্রায় সকল মানুষ গর্ব করেন। তবে কিছু মানুষ আছেন যারা এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা চরম ও চুড়ান্ত সত্য আবিষ্কার করতে নিরবিচ্ছিন্ন প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা নিজেদের সত্য সন্ধানী বলেন। উদারপন্থী বলেন। এধরণের মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়। কিন্তু এরাই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। শান্তি ও স্থিতিশীলতার গ্যারান্টার।  
 
এদেশে এখন আমাদের সংবিধানে উল্লিখিত ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে আলোচনা হয় না। বরং প্রশ্ন উঠছে, ভারত কেন ধর্মনিরপেক্ষ হবে? কেন হিন্দু রাষ্ট্র হবে না? সংবিধানের প্রস্তাবনায় কেন ধর্মনিরপেক্ষ শব্দ অনুপ্রবিষ্ট হল? এগুলো নির্দ্বিধায় বলে।
 
হিন্দু বীরত্বের বহিঃপ্রকাশ করতে এক শ্রেণির মানুষ ভয়ঙ্কর অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। কট্টরবাদী হয়ে পড়েছে। তারা নিজেদের বিশ্বাস ও আস্থা অপরের উপরে চাপিয়ে দিতে চায়। এজন্য তারা সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসন শুরু করেছে। সত্য বলতে কি, এই ধারা শুধু ভারতে নয়,  পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সক্রিয়। ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে এই শ্রেণির মানুষ দেশে দেশে একই কাজ করে চলেছে। মজার বিষয়, সকল মৌলবাদী ও উগ্রবাদী আবার অপরকে মৌলবাদী ও উগ্রবাদী বলে। নিজেদের মানবতাবাদী ও শান্তির দূত বলে। বিস্ময়কর ! বিভ্রান্তিকর! 

সম্প্রতি ভারতে অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতা ভয়ঙ্কর স্তরে পৌঁছে গেছে। দুর্বল ও সংখ্যালঘু শ্রেণির মানুষ দারুণভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও দুর্বল ও সংখ্যালঘু শ্রেণির মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। মজার বিষয়, অপরাধীরা সগর্বে ও দুঃসাহসিকভাবে এই অপকর্ম করে চলেছে। পরিকল্পিতভাবে। সুসংঠিতভাবে। এক শ্রেণির মানুষ তাদের বীরের সংবর্ধনা দিচ্ছে। শুধু তাই নয়! আক্রান্তদের রাক্ষস ও অসুর প্রতিপন্ন করতে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে! এটা ভয়ঙ্কর!
 
এরকম এক অসহিষ্ণু ও সংঘাতময় প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বেলাগাম হিন্দুত্ববাদী দল ও তার নেতাকর্মীরা। বিনা প্ররোচনায় প্রতিদিন তারা ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করে চলেছে। অবদমিত দুর্বল ও সংখ্যালঘু শ্রেণির মানুষ প্রতিবাদ করতেও সাহস করছে না। প্রতিবাদ করার ধৃষ্টতা দেখালে প্রতিবাদীদের সমাজবিরোধী ও রাষ্ট্র বিরোধী দেগে দেওয়া হচ্ছে।  অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা ও দেশের জাতীয় উন্নয়ন ভয়ানক সংকটের মুখোমুখি।
 
এই রকম একটি পরিমন্ডলে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে জাতীয় নির্বাচন কমিশন অভূতপূর্ব এস আই আর নামক অভিযান শুরু করেছে। এস আই আর এখন দৈনন্দিন গার্হস্থ্য পরিভাষা। একটি আশঙ্কা ও আতঙ্কের নাম। এখন এদেশের অধিকাংশ মানুষ বলছেন, এস আই আর বাঙালি মুসলিম ও অবদমিত শ্রেণির মানুষের বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত অভিযান। এই বিশ্বাস কীভাবে গড়ে উঠেছে সেবিষয়ে খুব সংক্ষেপে আলোচনা করব।  
 
ষড়যন্ত্র – ১
গত বছর ২০২৫ সালে বিহার রাজ্যে নির্বাচনের প্রাক্কালে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে নির্বাচন কমিশন ভোটারদের নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া শুরু করে। তখন ভোটারদের কাছে যে সুনির্দিষ্ট এগারোটা নথি চাওয়া হয় সে দেখে বুঝা গিয়েছিল, ডাল ম্যাঁয় কুছ কালা হ্যায়। অবৈধ ভোটার খোঁজা নয়। সুনির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের ভোটাধিকার হরণ করার অপপ্রয়াস।  
 
বস্তুত ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশন যে এগারোটা ডকুমেন্টকে বৈধ ভোটার চিহ্নিতকরণের মৌলিক মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে সেটা বিতর্কিত শুধু নয়, অভিসন্ধিমূলক।  অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়, বহিষ্করণমূলক। সুনির্দিষ্ট কিছু মানুষের ভোটাধিকার সংকুচিত করতে সেই অভিযান শুরু হয়। ভালো কথা, উল্লেখিত এগারোটা ডকুমেন্টের মধ্যে যেকোন একটি নথি জমা দিতে পারলে তাকে বৈধ নাগরিক বিবেচনা করা হবে। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, এরকম আরও বিশ প্রকার নথি যোগ করলেও একশো শতাংশ বৈধ নাগরিক নিজেকে বৈধ ভোটার প্রমাণ করতে সক্ষম হবে না। কারণ এজাতীয় নথি সব মানুষের কাছে থাকার কথা নয়। দেশের নাগরিক কখনো ভাবেনি তাদের ভোটে নির্বাচিত সরকার তাদের ভোটাধিকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। এজন্য তারা সদা প্রস্তুত থাকবে!
 
বিস্ময়কর , নির্বাচন কমিশন সরকার প্রদত্ত প্রায় সকল সার্বজনীন নথিগুলোকে এস আই আর  প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করেনি। ভোটার আই কার্ড, রেশন কার্ড, প্যান কার্ড এমনকি আধার কার্ডও এস আই আর প্রক্রিয়ায় মৌলিক নথি হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি! এসব দেখে কী মনে হয়? নির্বাচন কমিশনের অভিপ্রায় বিষয়ে কোন সন্দেহ আছে? তবে ভয় নেই। এই নিয়ম সকলের জন্য প্রযোজ্য হবে না। শুধুমাত্র সুনির্দিষ্ট ধর্ম ও জাতি বিবেচনা করে প্রয়োগ হবে। হচ্ছে তাই।  এই মুহূর্তে এই ষড়যন্ত্রের শিকার পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায়। নগণ্য সংখ্যক মানুষ আছেন দলিত শ্রেণির। বর্ণ হিন্দু থাকলে সেটা একদম ব্যতিক্রমী। এজন্য লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে অবলুপ্ত।
 
ষড়যন্ত্র – ২
নির্বাচন কমিশন যুদ্ধ তৎপরতায় ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে চায় কেন? অভিযোগ , এই অভিলাষের মধ্যে গভীর ষড়যন্ত্র আছে। সেই ষড়যন্ত্রকে আড়াল করতে কখনো এ আই যন্ত্রের দোহাই দিয়ে  নিজেদের অপরাধ ঢাকতে চায়। এখন সময়ের স্বল্পতার অজুহাত দেখিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার সংকুচিত করার পাঁয়তারা শুরু করেছে। এই মুহূর্তে অ্যাডজুডিকেশনে যাদের নাম কাটা গেছে তারা এবার ভোট দিতে পারবেন না। তাদের এখন হয়তো শুনানিই শুরু হবে না। এদের সংখ্যা বিশ পঁচিশ লক্ষের কম নয়। এসব ভোটার সেই সব কেন্দ্রে যেখানে তাদের অনুপস্থিতি একটি নির্দিষ্ট দলকে জিততে সাহায্য করবে। এখন প্রশ্ন, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া এখনো চলছে। এমনকি ট্রাইব্যুনালে এবং পরবর্তীতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত না যাওয়া পর্যন্ত এই এই প্রক্রিয়া চালু থাকার কথা। একটি বৈধ ভোটারের ভোটাধিকার হরণ করাও সংবিধান বিরোধী কাজ। তাহলে এই মুহূর্তে নির্বাচন হয় কী করে?
 
ষড়যন্ত্র – ৩
সর্বশেষ পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিতভাবে অস্বচ্ছ ভোটার তালিকা প্রস্তুত করতে মরিয়া। বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গে এধরণের অস্বচ্ছতা সুস্পষ্ট। অসংখ্য জীবিত মানুষকে মৃত ঘোষণা করে ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম মুছে দেওয়া হয়েছে! অসংখ্য মানুষের নাম আনম্যাপড বলে ডিলিট করা হয়েছে। এসব হতভাগ্য মানুষের সঠিক পরিসংখ্যানও পাওয়া যাচ্ছে না। এসব এমনি করছে না। নির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে। অভিযোগ, সুনির্দিষ্ট একটি দলকে জেতাতে হবে। নতুন ভোটারদের আবেদন গ্রহণ করতে হবে। তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অভিযোগ, লক্ষ লক্ষ আবেদন ঝুলে রয়েছে। ৭ নম্বর ফর্ম জমা দিয়ে এক শ্রেণির মানুষ তাদের শত্রুদের হয়রানি করতে চায়। এজন্য হাজার হাজার এধরণের আবেদনের শুনানি না করে কারো নাম বাদ দেওয়া অপরাধ!
 
মহাষড়যন্ত্র – ৪
বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অভিনব আবিষ্কার লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি বা যৌক্তিক অসঙ্গতি! এআবার কি! ভোটারের প্রদত্ত ক্রেডিনশিয়ালে অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। প্রায় দেড় কোটি মানুষের নামে নাকি অসঙ্গতি ধরা পড়েছে! আবার কারও বাবার নামে নাকি ছয়ের বেশি সন্তানের হদিস পাওয়া গেছে! আচ্ছা, শুধুমাত্র দেড় কোটি কেন? আমি যতদূর জানি, আশি শতাংশ মানুষের নামে বানান ও পদবি মিসম্যাচ আছে। সেটা কি লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি? হ্যাঁ। এটাই লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি। কিন্তু এটা পরিচালিত হচ্ছে সুনির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষকে টার্গেট করে। আচ্ছা, এদেশে কি কোন আইন আছে যে কোন দম্পতি ছয়ের বেশি সন্তান জন্ম দিতে পারবে না! এটাও নাকি লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি। এটা সমাধান করতে হলে কথিত এগারোটার মধ্যে কোন একটি নথি শুনানির সময় জমা করতে হবে! ভাবুন। অভিযোগ কী ছিল আর জবাব কী দিতে হল! এধরণের অভিযোগ সমাধানের কার্যকর পদ্ধতি হচ্ছে, সরাসরি অভিযুক্তের বাড়িতে গিয়ে তদন্ত করা। তা না করে অসুস্থ ও বৃদ্ধ সহ দেড় কোটি মানুষকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া!  এটা যদি সঠিক পদ্ধতি হয়, তাহলে সব রাজ্যে বাস্তবায়ন হচ্ছে না কেন?
 
ষড়যন্ত্র – ৫
কমিশন যে কথিত মিসম্যাচের অভিযোগে অভিযুক্তদের শুনানিতে হাজির হতে বাধ্য করল তা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। একেবারে অসভ্যতা ও নৃশংসতা! এই অসঙ্গতি সমাধানের জন্য বি এল ও একাই যথেষ্ট। তার শংসাপত্র যথেষ্ট। খুব বেশি হলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে এফিডেভিট নিলেই মিটে যেত। কিন্তু না, এন আর সি ডকুমেন্ট লাগবে! উদ্দেশ্য পরিষ্কার। সাংবিধানিক স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান অবিচার করলে তার জবাবদিহিতা দাবি করা সহজ নয়! এজন্য এসব পদে অসৎ মানুষ বসলে জনগণের সর্বনাশ! বর্তমান নির্বাচন কমিশন প্রধান কয়েক দিন আগে প্রকাশ্য সাংবাদিক সম্মেলন করে বলে গেলেন, যেসব ভোটারের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় থাকবে তাদের কোন নথি জমা করতে হবে না। এখন দেখছি, তাদেরকে লক্ষ্যবস্তু করে যত হয়রানি। অধিকাংশ ডিলিটেড নাম ২০০২ সালের তালিকার অন্তর্ভুক্ত। এই প্রহসন কীভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব!
 
ষড়যন্ত্র – ৬
অসাংবিধানিকভাবে মাইক্রো অবজার্ভার ও রোল অবজার্ভার নিয়োগ করে অবৈধভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা একটি গভীর ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতি। বহু পরিশ্রম করে যে কাজ  ই. আর. ও. এবং এ. ই. আর. ও. বন্ধুরা সুসম্পন্ন করে ফেলেছে তখন মাইক্রো অবজার্ভার ও রোল অবজার্ভাররা কোন অধিকারে তাকে রোল ব্যাক করল? এই অবৈধ ও অনৈতিক কাজকে কোর্ট কীভাবে বৈধতা দিচ্ছে ! নির্বাচন কমিশন বিপুল সংখ্যক মানুষের নামে কীভাবে অ্যাডজুডিকেশন তকমা দিয়ে গভীর ফাঁদে জড়িয়ে দিল! এসব সার্কাস খেলার উদ্দেশ্য মানুষ বুঝে গেছে। কোথাও স্বচ্ছতা নেই। গভীর ষড়যন্ত্র আছে।
 
ষড়যন্ত্র – ৭
অ্যাডজুডিকেশন! বিচারপতিরা কাদের বিচার করছেন? কোন অপরাধের বিচার করছেন? বিচার প্রক্রিয়ার মানদণ্ড কী! যে অপরাধীদের বিচার হচ্ছে তারা নিজেদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই কেন? অপরাধ প্রমাণিত হল কীভাবে? সে বিষয়ে কেউ জানতে পারবে না! কী জন্য একজনের নাম ভোটার লিস্ট থেকে মুছে দেওয়ার রায় হল সেবিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানান হবে না? এসব কী হচ্ছে? বিচার না সার্কাস? প্রতি মিনিটে কতজনের বিচার সম্পন্ন হচ্ছে? কতজনের ভাগ্য নির্ণয় হচ্ছে? সর্বনাশ হচ্ছে! বহু বুথে ৩০% থেকে ৮০% মানুষের নাম বাদ! করণিকের কাজের জন্য মহামহিম বিচারপতি! বিচারপতিরা বিচারিক সিদ্ধান্ত নিবেন। লিখিত সিদ্ধান্ত জানাবেন। কিন্তু এসব কী হচ্ছে?
 
ষড়যন্ত্র – ৮
যৌক্তিক অসঙ্গতি তারপর বিচারাধীন তারপর মুছে ফেলার যে প্রক্রিয়া চলছে তার সর্বনাশা  প্রভাবের কথা ভেবেছেন? একটি হাস্যকর নাট্য মঞ্চস্থ করে তারা কত পরিবার ধ্বংস করতে চাইছেন ? খবর রাখেন? প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ থেকে আশি লক্ষ মানুষের জীবনে কি বিভীষিকা নেমে এসেছে! কি মনে হয়? এরা সবাই অনুপ্রবেশকারী? আমি চ্যালেঞ্জ করে বলছি, আপনার ও আমার চেয়ে তাদের অনেকের বেশি ডকুমেন্ট আছে। যা দিয়ে সহজেই প্রমাণিত হবে তিনি এদেশের ভূমিপুত্র ও মূলনিবাসী। দেশপ্রেমিক নাগরিক ও বৈধ ভোটার। কিন্তু কাকে দেখাবে? একজন হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি একাধিক বার নথি জমা দিয়েছেন। এমনকি পাসপোর্ট থেকে শুরু করে সব গুরুত্বপূর্ণ নথি জমা দেওয়ার পরও তাঁর নাম ডিলিট করা হয়েছে। এই দুঃসাহস হয় কী করে! মূলত এসব গভীর ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ!
 
ষড়যন্ত্র – ৯
এক শ্রেণির মানুষের অভিযোগ, এসব সম্ভব হচ্ছে, কারণ একটি অশুভ শক্তি অসৎ মানুষ নিয়ে একটি আঁতাত গড়ে তুলেছে! নেক্সাস! এত বড় অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে কীভাবে! কোটি কোটি নাগরিকের জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ তছনছ করে দিয়েছে -এই কথিত এস আই আর নামক অনুশীলন। কোটি কোটি মানুষ আতঙ্কিত ও সন্ত্রস্ত! লক্ষ লক্ষ কর্মদিবস নষ্ট। কোটি কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে। দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। অথচ তথাকথিত কর্মকর্তাদের গতিবিধি দেখে মনে হচ্ছে, দুনিয়া ডুবলেও তাদের কাছে এক হাঁটু জল! এমন কি হয়েছে? ক্ষমতা দখলের অভিসারে সব বৈধ।
 
ষড়যন্ত্র – ১০
বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। পৃথিবীর সকল মানুষ বিচার ব্যবস্থার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করে। দুর্বৃত্ত ব্যক্তি, মাফিয়া গোষ্ঠী ও স্বৈরাচারী সরকারের নিপীড়ন থেকে বাঁচার একমাত্র আশ্রয় বিচারালয় ও বিচার ব্যবস্থা। কিন্তু একি লক্ষ্য করছি! যতবার  সুপ্রিম কোর্টে শুনানি হচ্ছে তারপর নির্বাচন কমিশন পরের দিন বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে! সুপ্রিম কোর্ট আধার কার্ডকে গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে গ্রহণ করতে একাধিক বার বলার পরেও নির্বাচন কমিশন তা উপেক্ষা করে চলেছে। সুপ্রিম কোর্টে ধমক খাওয়ার পরের দিন এক কোটি ছত্রিশ লক্ষ মানুষের নামে কমিশন লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সির নোটিশ করেছে! তাদের ক্রেডিনশিয়ালে নাকি অসঙ্গতি আছে! মানে সন্দেহজনক। মহামহিম নির্বাচন কমিশনের নিদান আমরা মানতে বাধ্য। সব কাজ ফেলে তার নির্দেশ অবলাইজ করেছি। শত কষ্ট স্বীকার করে।
 
হাজার হাজার সরকারি কর্মচারীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে কথিত লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি যখন প্রায় শেষ হয়েছে তখন আবার কোর্টের শুনানি। কোর্টের ধমক খেয়ে বিচার বিভাগকে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার প্রাক মুহূর্তে নির্বাচন কমিশন ষাট লক্ষ মানুষের নামে আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন ট্যাগ লাগিয়ে দিল। বেলাগাম! বেপরোয়া ! নির্লজ্জ!  
 
আমাদের বিশ্বাস, সুপ্রিম কোর্ট তো সুপ্রিম। তাহলে তাকে অবজ্ঞা করার সাহস হচ্ছে কি করে! সর্ষের মধ্যে ভূত নেই তো! কোর্ট কীভাবে কোটি কোটি মানুষের নামে নোটিশ জারি করাকে মেনে নিল! ষাট লক্ষ মানুষের নামে আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন তকমা কীভাবে স্বীকৃতি দিল! এই মুহূর্তে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশিত বিচারকরা কোন আইন ও মানদণ্ড মেনে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার রহিত করে চলেছে! খুব বিপজ্জনক! এই সর্বনাশের অভিঘাত খুব সহজে মিটবে না।

Thursday, 5 February 2026

কালবৈশাখীর তাণ্ডবে - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 

 
সালটা ১৯৭১। উত্তাল সময়। বাতাসে বারুদের গন্ধ। খান সেনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘর্ষ চরম পর্যায়ে। চারদিকে অনিশ্চয়তা, ভয় আর টানটান উত্তেজনা। সীমান্তে শুরু হয়েছে বেশ কড়াকড়ি। ফলে এপাশের মানুষদের পক্ষে ওপারের ডুংডুঙ্গির হাটে যাওয়া অসম্ভব হয়ে উঠল। যে হাট একসময় ছিল জীবিকার ভরসা, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আদানপ্রদানের মাধ্যম, তা হঠাৎই হয়ে গেল অধরা, চলে গেল ধরাছোঁয়ার বাইরে। সংসার চলবে কীভাবে—এই প্রশ্নে মানুষ তখন দিশেহারা, উৎকণ্ঠিত। ঠিক সেই সময় গ্রামের লোকজন একজোট হয়ে হাজির হলেন নজিবদ্দিন ও অফিজদ্দিন সাহেবের কাছে। কণ্ঠে অনুরোধ, চোখে অসহায়তার ছাপ—হাট বসানোর জন্য যদি তাঁরা একটু জায়গা দেন!
 
তাঁরা এবং তাঁদের বংশধরেরা শুধু জায়গাই দেননি, দিয়েছিলেন সাহস আর ভরসা। সেদিন তাঁরা ঘোষণা করেছিলেন—এই হাট হবে সবার জন্য, এখানে কোনো জমাতলা লাগবে না, কোনো খাজনাও নয়। বিনা মূল্যে, বিনা শর্তে, সকলের জন্য উন্মুক্ত। মানুষের প্রয়োজনে, মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তারই হাত ধরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল শাটিমারি হাট—একটা হাট, যা শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, ছিল বহু মানুষের বাঁচার অবলম্বন।
 
সেই থেকে শাটিমারি হাট বসে প্রতি সোম ও শুক্রবারে। আশপাশের গ্রাম থেকে লোকজন আসে। কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ সাইকেল নিয়ে, কেউ গরুর গাড়ি করে। বাঁশের খুঁটি ও টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি দোকানগুলো, কোনটার ছাউনি খড়ের, কোনোটা আবার ছাউনি ছাড়াই। হাটের উত্তর-পশ্চিম কোণে একটা দুর্গামন্দিরও গড়ে উঠেছিল। বহু বছর আগের কথা—আমি তখন খুব ছোট। এক শুক্রবারে বাবার সাথে হাটে গেছি। বাবার হাত ধরে সবুজ মাঠের বুক চিরে যাওয়া সরু আল ধরে গুটি গুটি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সেই স্মৃতি আজও চোখে ভাসে। চারদিকে তখন ব্যস্ততার কোলাহল। কেউ চাল কিনছে, কেউ লবণ, কেউ কাপড়। শিশুরা হাওয়াই নাড়ু, লজেন্স, পাউরুটি আর বাতাসা হাতে হাটের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটছে। সবজিওয়ালাদের হাঁকডাকে কান পাতা দায়। সব মিলিয়ে, আর পাঁচটা দিনের মতোই প্রাণচঞ্চল এক হাট।
 
কিন্তু প্রকৃতি হঠাৎই বাধ সাধল। আসমান তার রুদ্ররূপ দেখাল। আচমকা কালবৈশাখী ঝড় উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে দোকানপাট সব কেঁপে উঠল। বিদ্যুতের চমক, বজ্রের গর্জন, উড়ে যাওয়া পলিথিন আর ভাঙা ডালের শব্দে চারদিক যেন ত্রস্ত। হাটে তখন মানুষের ঢল—কেউ কেনাবেচা ফেলে দিগ্বিদিক ছুটছে, কেউ আবার প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয়ের খোঁজে।
 
সেই মুহূর্তে আশ্রয় বলতে একটাই জায়গা—হাট-লাগোয়া সেই দুর্গা মন্দিরের চালা। মাটির দেয়াল, টিনের ছাউনি—অতি সাধারণ এক আশ্রয়। কিন্তু বিপদের দিনে সেটাই হয়ে উঠল সবার ভরসা। হিন্দু-মুসলিম-সাঁওতাল—সব পরিচয় যেন ঝড়ের মুখে মিলিয়ে গেল। সবাই এক ছাদের নিচে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে পড়ল। বাইরে কালবৈশাখীর তাণ্ডব, ভেতরে মানুষের কাঁপা কাঁপা নিঃশ্বাস।
 
কালবৈশাখীর হাত থেকে রেহাই পেতে চালার তলে দাঁড়িয়ে যে যার বিশ্বাস অনুযায়ী প্রার্থনায় মগ্ন। কেউ মন্ত্র জপছে, কেউ দোয়া করছে, কেউ আবার নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। ভয় আর আশার এক অদ্ভুত মিশেল তখন বাতাসে।
 
গোপেশ ও সোবহান—শাটিমারি হাটের চেনা মুখ, বহুদিনের বন্ধু। সেদিনও একসঙ্গে হেঁটে হেঁটেই হাটে এসেছিলেন তাঁরা। আশ্রয়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে গোপেশ জ্যাঠু চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ছিলেন। হঠাৎ চোখ খুলে বন্ধু সোবহানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“হাঁ হো, তোরা কেনে চুপ করি আছেন? দোয়া করো, আজান দেও।”
 
সোবহান বড়আব্বা এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। সেই দুর্গা মন্দিরের চালার নিচেই দাঁড়িয়ে তিনি আজান দিলেন। ঝড়ের গর্জনের ভেতর দিয়ে আজানের সুর যেন এক আশ্চর্য প্রশান্তি নিয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। ভয় যেন একটু একটু করে সরে গেল। মানুষের মনে ফিরে এলো ভরসা, ফিরে এলো সাহস।
 
কিছুক্ষণ পর ঝড়ের দাপট ধীরে ধীরে কমে এলো। কালবৈশাখী তার রুদ্ররূপ গুটিয়ে ফিরে গেল তার জগতে। মানুষজন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। হাট আবার ফিরল তার স্বাভাবিক ছন্দে। সন্ধ্যা নামলে হাট ভাঙল, সবাই যে যার ঘরের পথে রওনা হলো—সাথে নিয়ে গেল মনের গহীনে এক অদ্ভুত উষ্ণতা।
 
সেদিনের শাটিমারি হাট শুধু একটা কেনাবেচার জায়গা হয়েই থাকেনি। সেদিন এক ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে মানুষ প্রমাণ করে দিয়েছিল—বিশ্বাস আলাদা হতে পারে, নাম আলাদা হতে পারে, কিন্তু বিপদের দিনে মানুষ মানুষের আশ্রয়, বেঁধে বেঁধে-গেঁথে গেঁথে থাকাতেই আছে মুক্তি, আছে আনন্দ। আর লোকজন যখন বাড়ি পৌঁছল, ততক্ষণে ঝড় থেমে গেছে— শুধু আকাশে নয়, তাদের বুকের ভেতরেও।
 
১৭/০৩/২০১৯
তপ্সিয়া, কোলকাতা

Tuesday, 3 February 2026

গোধূলির পথে - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


 
সকালের আলো ঠিকমতো চোখে পড়ার আগেই হোস্টেলের ঘরটা যেন এক অদ্ভুত ব্যস্ততায় ভরে উঠল। ঘুমচোখে কেউ ব্যাগের চেইন টানছে, কেউ জামা ভাঁজ করতে গিয়ে আবার এলোমেলো করে ফেলছে। কোনোদিক থেকে ভেসে আসছে টুথপেস্ট হারানোর অভিযোগ, কোথাও চাবি নিয়ে হুলস্থুল কাণ্ড। দু’সপ্তাহের ছুটি—এই খবরটা যেন সবাইকে একসঙ্গে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে।  
 
ওদের তুলনায় আমি একটু আলাদা স্বভাবের। তাড়াহুড়োটা আমার ভেতরে হলেও বাইরে চুপচাপ। তাই মেঝেতে বসে নিজের ব্যাগটা খুলে ধীরে ধীরে জামাকাপড় গুছিয়ে নিলাম। তারপর তাকের দিকে তাকালাম। কয়েক মুহূর্ত দ্বিধা—শেষ পর্যন্ত কয়েকটা বই তুলে নিলাম। ছুটি মানে যে পড়াশোনা হবে না, সেটা অভিজ্ঞতা থেকেই জানি। তবুও বই না নিলে মনে হয় দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছি। বইগুলো ব্যাগে ঢুকাতেই ওজন বেড়ে গেল—ব্যাগটা যেন হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল, শুধু কাঁধে নয়, মনেও।
 
হোস্টেলের গেট পর্যন্ত ব্যাগ টেনে আনতে বেশ কষ্ট হলো। বাইরে বেরিয়ে দেখি, রাস্তা প্রায় ফাঁকা। কুয়াশার হালকা চাদরের ভেতর দিয়ে সকালটা ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। ভাগ্য ভালো, একটা রিকশা পেয়ে গেলাম। রিকশাওয়ালা পনেরো টাকায় রাজি হয়ে গেল। মিনিট কুড়ির মধ্যেই পৌঁছে গেলাম খাগড়া বাসস্ট্যান্ড।
 
সেখানে পৌঁছে দেখি পরিচিত দৃশ্য—হোস্টেলের ছেলেরা ছোট ছোট দলে জটলা করে গল্পগুজব করছে। কেউ ছুটির পরিকল্পনা করছে, কেউ বাড়ির খাবারের গল্প শোনাচ্ছে। কোথাও লুচি-পরোঠা ভাগাভাগি করে খাওয়ার দৃশ্য। এসবের মাঝেই সময় কেটে গেল। প্রায় এক ঘণ্টা পর বাস এল। ভিড় ঠেলে, ধাক্কাধাক্কি সামলে কোনোরকমে বাসে উঠলাম। ভাগ্যক্রমে জানালার পাশে সিট পেয়ে যেন একটু স্বস্তি পেলাম।  
 
বাস ছাড়তেই বাইরের দৃশ্যগুলো চলমান ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো। মাঠ-ঘাট, গাছপালা, রাস্তার ধারের চায়ের দোকান—সবই যেন উল্টো দিকে ছুটছে। মনে হচ্ছিল, বাসটা একে একে রামপুর, কানকি, ডালখোলা, দোমহনা, নাগর, রায়গঞ্জ, কালিয়াগঞ্জকে পেছনে ফেলে শহরের কোলাহল থেকে আমাকে ধীরে ধীরে গ্রামের শান্তির দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
 
দীর্ঘ চার ঘণ্টার সফর শেষে বাস কুশমুণ্ডিতে থামল। তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার উপক্রম। পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়েছে, তার আলো লম্বা হয়ে শুয়ে আছে রাস্তায়। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি—এবার ট্র্যাকার না টমটম? ঠিক তখনই থানার দিক থেকে লাফাতে-হাঁফাতে এক পরিচিত মুখ এগিয়ে এল—নির্মল সরকার।
 
পরনে মাটির রঙের পাঞ্জাবি আর সাদা ধুতি—যার রং সময়ের ছাপ লেগে সেপিয়া হয়ে গেছে। কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। আমাদের বাড়িতে তাঁর যাতায়াত লেগেই থাকে—গ্রামের রাজনীতি, সালিশ, ভোটের কাজ—সবেতেই তাঁকে দেখা যায়। আমাকে দেখেই নির্মল দা থমকে দাঁড়ালেন।
 
— আরে, তুই! তোদের ছুটি নাকি? বেশ তো, মজা করে ছুটি কাটা এবার।
আমি হেসে বললাম, — হ্যাঁ দাদা। আপনি এখানে?
— থানায় গেছিলাম রে,  জানিসই তো, আমাদের কতো রকমের ঝামেলাঝক্কি পোয়াতে হয়!   
 
এরই মাঝে একটা টমটম এসে দাঁড়াল। সবাই উঠতে ব্যস্ত। নির্মল দা আমাকে সরিয়ে দিয়ে কোনোরকমে দুটো জায়গা আগলালেন—একটায় নিজে বসলেন, আরেকটায় আমাকে বসালেন। টমটম চলতে শুরু করল—ঘটংঘট, টুংটুং আওয়াজে চারপাশ ভরে উঠল। ধুলোর ভেতর দিয়ে এগোতে এগোতে শুরু হলো আমাদের কথা।
— পড়াশোনা কেমন চলছে?
— মোটামুটি।
— ভালো করে পড়িস। কাকু কত কষ্ট করে তোকে পড়াচ্ছে!
— চেষ্টা করছি। হাফ-ইয়ার্লিতে ফার্স্ট হয়েছি।
— বাহ্! দারুণ তো!
 
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নির্মল দা আবার জানতে চাইলেন মাদ্রাসার পড়াশোনা নিয়ে। ইংরেজি, বাংলা, অংকের পাশাপাশি আরবি, তাফসীর, হাদীস, ফিকাহ্‌—সব বললাম। ফিকাহ্‌র নাম শুনে একটু অবাকই হলেন। আমি সহজ করে বোঝালাম—কুরআন-হাদীসের আলোকে দৈনন্দিন জীবনের আচারআচরণ, রীতিনীতি ও নানান সমস্যার সমাধানের কথা।
 
টমটম এগিয়ে চলল। নাহিট পেরিয়ে দেখলাম, দূরে খড়ের গাদা থেকে ধোঁয়া উঠছে, কেউ গরু নিয়ে বাড়ি ফিরছে। সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। হঠাৎ নির্মল দা ভারী গলায় বললেন,
— শোন্‌, ধর্ম আলাদা আলাদা হতে পারে, কিন্তু সব ধর্মই মানুষকে ভালো হতে শেখায়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর মিলেমিশে থাকাই আসল। চণ্ডীপুরে হিন্দু-মুসলমান-সাঁওতাল যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি আছে। তোরা নতুন প্রজন্ম—তোদের দায়িত্ব আরও বেশি।
 
কিছুক্ষণের মধ্যে রামপুর, চৌরঙ্গী পেরিয়ে টমটম মহিপালে পৌঁছে গেল। নির্মল দা যাওয়ার বেলা মহিপালে সাইকেল রেখে গেছিলেন। তাই নেমে পড়লেন। যাওয়ার আগে টমটমওয়ালাকে দু’জনের ভাড়া মিটিয়ে দিলেন। আমি বারণ করতে গেলে তিনি আমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, “তোরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। ভালো করে লেখাপড়া করিস্‌, গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করিস্‌!”
 
তাঁর ওই স্নেহমাখা কণ্ঠ শুনে আমার চোখ ভিজে গেল। চুপচাপ কিছুক্ষণ শূন্যের দিকে তাকিয়ে রইলাম। পশ্চিম আকাশ তখন গোধূলি আলোয় সেজে উঠেছে। সূর্যাস্তের লাল আলো টমটমের কাঠের দণ্ডে পড়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে। তুলাইয়ের জল টাঙনে এসে পড়ছে, আর দুটো স্রোত পাশাপাশি বইছে। মনে হলো, এই পথ শুধু বাড়ির দিকেই নয়—মানুষ থেকে মানুষের দিকে যাওয়ার পথও বটে। বিশ্বাস আলাদা হতে পারে, কিন্তু একসঙ্গে চলার শক্তিটাই সবচেয়ে বড়।
 
আমি ব্যাগের ফিতেটা কাঁধে ঠিক করতে করতে সামনে তাকিয়ে রইলাম। পরিচিত গাছপালা, বাঁক নেওয়া পথ—সবই ধীরে ধীরে আরও চেনা হয়ে উঠছিল। অথচ মনে হচ্ছিল, আমি শুধু বাড়ির দিকেই ফিরছি না; কারও বলা কথাগুলো, না–বলা আশঙ্কাগুলোও সাথে নিয়ে ফিরছি। টমটমের কাঠে পড়ে থাকা লাল আলোটা হঠাৎই ফিকে হয়ে এল—সূর্য বুঝি চোখের আড়ালে চলে গেছে। টমটম গতি কমাল। নামার সময় এখনও হয়নি, তবু মনে হলো এই পথের শেষে শুধু বাড়ি নয়—আরও অজানা অনেক কিছুই অপেক্ষা করছে। চাকা গড়াল, আবার আওয়াজ উঠল—ঘটংঘট… টুংটুং…
 
২৪/০৫/২০২৫
হেস্টিংস, কোলকাতা