ক’দিন ধরে বড়আব্বা খুব অসুস্থ। তাই
সারাক্ষণ বাড়িতে মানুষের আনাগোনা লেগে আছে। ডাক্তার
আসছেন,
ওষুধপত্র চলছে, স্যালাইন ঝুলছে। আত্মীয়স্বজন একে একে খোঁজ নিতে আসছেন। কেউ ফল নিয়ে আসছেন, তো কেউ মিষ্টি নিয়ে; কেউ বড়আব্বার পাশে বসে খবর নিচ্ছেন, তো কেউ নীরবে দোয়া করে ফিরে যাচ্ছেন। বাড়ির বড়দের চোখেমুখে উৎকণ্ঠা, কথাবার্তায় চাপা গাম্ভীর্য—সবকিছু মিলিয়ে ঘরের পরিবেশ ছিল অদ্ভুত এক ভারে ভরা।
আমি তখন খুবই ছোট।
সম্ভবত তখনো আমার স্কুলিং শুরু হয়নি। সবকিছুই খুব আবছা আবছা মনে পড়ে। যেহেতু আমরা ছোট ছিলাম, অত শত বুঝতাম না। আমাদের চোখে তখন না অসুস্থতার ভয় ছিল, না মৃত্যুর আশঙ্কা। বরং আত্মীয়স্বজনদের আসা-যাওয়ার মধ্যে নতুন নতুন ফল আর মিষ্টি পাওয়াটাই ছিল যেন সবচেয়ে আনন্দের বিষয়।
কে কী নিয়ে এল,
কোন ফলটা বেশি মিষ্টি, কোন মিষ্টিটা আগে খাওয়া হবে—আমাদের ছোট্ট
পৃথিবীটা ঘুরপাক খেত এসব নিয়ে। শিশুমন
বোধহয় এমনই;
সে মৃত্যুর আগমনী সুর শুনতে পায় না, ভবিষ্যতের শূন্যতা দেখতে পায় না। সে কেবল বর্তমানের সামান্য
আনন্দটুকুকেই দু’হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে রাখে।
তিন-চার দিনের মাথায় একদিন সন্ধ্যাবেলা, মাগরিবের আজানের সময়,
বড়আব্বা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আজানের সুমধুর ধ্বনি যখন চারদিকে ছড়িয়ে
পড়ছিল,
ঠিক সেই সময় আমাদের ঘরের ভেতর হঠাৎ কান্নার রোল উঠল।
মুহূর্তের মধ্যে যেন সবকিছু বদলে গেল। যে বাড়িতে কিছুক্ষণ আগেও মানুষের আসা-যাওয়া, কথাবার্তা, ব্যস্ততা ছিল; সেখানে আচমকাই নেমে এলো শোকের এক গভীর অন্ধকার। চারপাশের
বাতাস ভারী হয়ে গেল। পাড়াপড়শিরা ছুটে এলেন। আত্মীয়স্বজনদের খবর দেওয়ার তোড়জোড় শুরু
হলো। বাড়ির বড়রা একাট্টা হয়ে নানা বিষয়ে আলোচনা করতে লাগলেন। সিদ্ধান্ত হলো—পরদিন যোহরের নামাজের পর বড়আব্বাকে দাফন করা হবে।
পরদিন সকাল থেকেই আমাদের বাড়িতে যেন মানুষের ঢল নেমে এল। উঠোন, বারান্দা, বৈঠকখানা—যেদিকেই তাকাই, শুধু মানুষ আর মানুষ। কারও চোখে পানি, কারও মুখে শোকের ছাপ,
কেউ নিচুস্বরে কথা বলছেন, কেউ কুরআন তিলাওয়াত করছেন। আর আমরা ছোটরা সেই বিশাল শোকের ভেতর দাঁড়িয়ে থেকেও যেন পুরো ঘটনাটার মানে বুঝতে পারছিলাম না।
মেজোআম্মা আমাদেরকে বড় ঘরটায় আগলে রেখেছিলেন। বড়দের কড়া নির্দেশ ছিল—ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কেউই গোরস্থানে যাবে না। আমাদের বলা
হয়েছিল,
বড়রা ফিরে আসা পর্যন্ত
আমরা যেন ঘরেই থাকি। সেদিন হয়তো
প্রথমবারের মতো বুঝতে না পেরেও অনুভব করেছিলাম—কিছু একটা চিরতরে বদলে গেছে। কিন্তু মৃত্যু যে কীভাবে বড়আব্বাকে আমাদের
কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, তা তখনও বুঝিনি।
মাঝে কয়েক সপ্তাহ অতিক্রান্ত হয়েছে। একদিন আব্বার সঙ্গে শাটিমারি হাটে গেলাম। ফেরার পথে
আমরা কবরস্থানের মাঝ বরাবর রাস্তা দিয়ে আসছিলাম। হঠাৎ
আব্বা থেমে গেলেন। কোনো কথা না বলে নিজের জুতো জোড়া খুললেন। তারপর আমার ছোট্ট জুতোজোড়াও খুলে দিলেন। আমি অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। তিনি আমার হাত ধরে
কবরস্থানের ভেতরে এগিয়ে গেলেন। তারপর একটি মাটির ঢিবির সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায়
বললেন—
“সালাম দাও।”
আব্বা’র সাথে সাথে আমিও বললাম— “আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহ্লাল কুবুর...” (হে কবরবাসী, তোমাদের উপর শান্তি ও করুণা বর্ষিত হোক…!)
তারপর আব্বা মাটির ঢিবিটার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত, অথচ কেমন যেন এক ভার গলায় বললেন,
—“এটা তোমার বড়আব্বার কবর। তিনি এখানেই শুয়ে আছেন।”
আমি মাটির ঢিবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। বড়আব্বা, যিনি আমাকে আদর
করতেন,
কেউ আমাদের বকা দিলে তিনি পাল্টা তাকেই বকা দিতেন, আমাদের জন্য প্রায় দিন হাট থেকে জিলাপি-শিঙ্গাড়া নিয়ে আসতেন, এই সামান্য মাটির ঢিবির নিচে কীভাবে
শুয়ে আছেন—আমার শিশুমন কোনোভাবেই তার উত্তর খুঁজে পাচ্ছিল না।
আব্বা দু’হাত তুলে মোনাজাত শুরু করলেন। বড় ভাইয়ের জন্য তাঁর কণ্ঠে
ছিল গভীর আকুতি। কথাগুলো আমি বুঝতাম না, কিন্তু তাঁর কণ্ঠের
আকুতি, কান্না ও কম্পন কিছুটা বুঝতে পারছিলাম। আমিও আমার ছোট্ট দু’হাত তুলে তাঁর সাথে
দু’আতে শামিল হলাম আর মাঝে মাঝে বলতে থাকলাম—“আমীন... আমীন...”
হঠাৎ আমার চোখে পড়ল—মোনাজাত করতে করতে আব্বার দু’গাল বেয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সেই দৃশ্যটি আমার শৈশবের স্মৃতিতে আজও অমলিন। একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে কত গভীরভাবে ভালোবাসতে পারে, তার প্রথম পাঠ আমি সেদিন আমার আব্বার চোখের জল থেকে
পেয়েছিলাম।
মোনাজাত শেষে আমরা বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটছি আর আমার
শিশুমনের ভেতর যেন একের পর এক প্রশ্ন দরজা খুলে হুমড়ি কাটছে—বড়আব্বা কি আমার
সালাম শুনেছেন?
তিনি কি আমাকে দেখতে পেয়েছেন? তিনি আমাকে আদর করলেন না কেন? হাট থেকে আর
কোনোদিন কি তিনি আমার জন্য জিলাপি আনবেন না…?
আব্বা নীরবে হাঁটছিলেন। হয়তো তাঁর বুকের ভেতর তখনও ভাই হারানোর শোক তাজা। আর তাঁর পাশে আমি হেঁটে চলেছি, মনের ভেতরে একরাশ কিলবিল করা প্রশ্ন নিয়ে। থাকতে না
পেরে এক পর্যায়ে আমি জিজ্ঞেস করেই বসলাম,
—“বড়আব্বা মাটির নিচে গেলেন কীভাবে?”
আব্বা একটু থেমে বললেন,
—“কবর খুঁড়ে তাঁকে সেখানে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে।”
আমি আবার জানতে চাইলাম,
—“কবর কে খুঁড়ল?”
আব্বা বললেন,
—“তোমার মোজাহার কাকু, মসলেম কাকু—আরও কয়েকজন মিলে।”
আমি চুপ করে গেলাম। হয়তো উত্তরগুলো আমার কৌতূহল কিছুটা মিটিয়েছিল, কিন্তু মৃত্যুকে বুঝতে সাহায্য করেনি। বরং সেদিনের সেই
কথাগুলো আমার মনে আরও গভীর এক রহস্যের জন্ম দিয়েছিল—মানুষ কোথায় যায়?
কেন যায়? আর যে মানুষকে এত
ভালোবাসা হয়, সে কীভাবে একদিন শুধু একটি মাটির ঢিবি হয়ে থাকে?
আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, সেদিন আমি শুধু বড়আব্বার কবরের সামনে দাঁড়াইনি; অজান্তেই দাঁড়িয়েছিলাম জীবনের এক গভীরতম সত্যের সামনে। বড়আব্বার কবরের
সেই মাটির ঢিবি আজ আর শুধু একটি কবর নয়—আমার শৈশবের এক টুকরো আকাশ, আব্বার চোখের
জলের প্রথম পাঠ,
ভালোবাসার প্রথম গভীর উপলব্ধি, আর হারিয়ে ফেলার প্রথম অভিধান।
সময় চলে গেছে। মানুষ বদলেছে। শৈশব পেরিয়ে জীবন অনেক দূর এগিয়ে এসেছে। কত মানুষ
এসেছে,
কত মানুষ চলে গেছে। কিন্তু সেই মাগরিবের আজান, সেই কান্নার শব্দ, আব্বার কাঁপা কণ্ঠ,
মাটির ঢিবির সামনে দাঁড়িয়ে বলা—“এটাই তোমার বড়আব্বার কবর”—আর মোনাজাতের ফাঁকে আব্বার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুবিন্দুগুলো আজও আমার স্মৃতির ভেতর অম্লান
হয়ে আছে।
কখনো কখনো মনে হয়,
বড়আব্বা সেদিন শুধু আমাদের ছেড়ে চলে যাননি; আমার শৈশবের একটুকরো সরলতাকেও সঙ্গে করে নিয়ে গেছিলেন। তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমি যে প্রশ্নগুলো করেছিলাম, সেগুলোর উত্তর হয়তো সেদিন পাইনি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে
সঙ্গে বুঝেছি—কিছু প্রশ্নের উত্তর শব্দে দেওয়া যায় না। কিছু উত্তর
মানুষকে সময়ের কাছে রেখে দিতে হয়। আর হয়তো সেই কারণেই আজও কোনো কবরের পাশ দিয়ে গেলে আমার পা
ধীর হয়ে আসে। মনে পড়ে যায় সেই ছোট্ট শিশুটিকে—যে একদিন বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে মাটির একটি ঢিবির দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, “বড়আব্বা কি আমার সালাম শুনেছেন?”
২৮ জুলাই ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা

No comments:
Post a Comment