Monday, 9 February 2026

বালিকা বেটি - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 

 
বাড়ি থেকে বেরিয়ে মোড়ের দিকে হাঁটছিলাম। পুকুর পাড়ে পৌঁছতেই একটা ভাঙ্গা গলার স্বর কানে ভেসে আসলো—“কুদিন আলেন মামা?” ফিরে দেখলাম, বালিকা বেটি পেছনে গায়ে একটা বহু পুরনো জীর্ণ-প্রায় সাদা শাড়ি, মলিন মুখ, হাতে কটা চ্যালা কাঠ। তাঁর আসল নাম আমি জানি না।বালিকা বেটিনামেই তাঁকে চিনি জানিসম্পর্কে পিসি হবেন, ধর্ম আলাদা হলেও আমাদের সম্পর্কের মাঝে কোনো দেয়াল নেই। আমাকে দেখা মাত্রই এই প্রশ্নটা করেন এই একটা প্রশ্নেই যেন আত্মীয়তার সব সংজ্ঞা পূর্ণ হয়ে যায়। আমিও হেসে বলি— “এই তো বেটি, আইজ্কা বেহানে আইছুতিনি সঙ্গে সঙ্গে যোগ করেন— “বউমা, ভায়ালা সবায় ভালো আছে মামা?”
কুশল বিনিময়ের এই সহজ কথাগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকে অগাধ মমতা নির্ভেজাল আন্তরিকতা জীবনের পাঠশালায় বালিকা বেটি আমার কাছে এক নিঃশব্দ অধ্যায়যার গভীরতা বিশালপ্রায় তিরিশ বছর আগে তাঁর জীবনের আকাশ ভেঙে পড়েছিল। স্বামীকে হারানোর ক্ষত তখনো শুকোয়নি, তার আগেই যাকে আঁকড়ে বাঁচার কথা ভেবেছিলেনসেই একমাত্র মেয়ে মিনতিকেও কেড়ে নেয় মৃত্যু। দুবার সর্বস্ব হারিয়ে অনেকেই ভেঙে পড়েন, কিন্তু বালিকা বেটি ভাঙেননি। কান্নাগুলো বুকের গভীরে শক্ত করে বেঁধে রেখে, জীবনটাকে কাঁধে তুলে নিয়েছেন নিঃশব্দে। কেউ দেখেনি তাঁর চোখের জল, কেউ শোনেনি তাঁর দীর্ঘশ্বাস।
 
তাঁর জীবন অবলম্বন বলতে বাঁশকুড়ি-মহিপাল রাস্তার ধারে ছোট্ট একটা চায়ের দোকানখুবই সাধারণ, বাঁশের বেড়া ও টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরিকিন্তু সেই দোকানের প্রতি-কাপ চায়ের ভেতর মিশে থাকে সংগ্রামের ঘাম, স্বজন হারানোর যন্ত্রণা আর এক অনমনীয় আত্মমর্যাদাবোধ। এই দোকানটা শুধু রুজি-রোজগারের জায়গা নয়; এ যেন তাঁর বেঁচে থাকার ঘোষণা। অভাব তাঁর নিত্যসঙ্গী, তবু কোনোদিন হাত পাতেননি। দুঃখ তাঁর প্রতিদিনের অতিথি, তবু কারো কাছে অভিযোগ করেননি কাপের পর কাপ চা বানিয়ে তিনি জীবনের চাকা সচল রেখেছেনকারো দয়ায় নয়, নিজের মেহনতে  
 
আমি যখন আমার মেয়েকে নিয়ে তাঁর দোকানের সামনে দাঁড়াই, বালিকা বেটির মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এক অদ্ভুত আভা চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ে। সাবা’কে কাছে ডেকে নিয়ে তার গাল টিপে আদর করে বলেন— “আয় আয়, বুবুনকেমন আছি তুই?” সাবা লাজুক হেসে আমার আড়ালে লুকোয়। বালিকা বেটি হেসে বলেন— “এইডা মোর নাতিন, এইডা মোর মহুবা বু, দেখিলেই মনটা ভরি যায়।” 

রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মায়ার বাঁধন যে কতটা গভীর হতে পারে, সেই মুহূর্তে তা স্পষ্ট রূপে অনুভব করি এই সমাজে অনেক মানুষ আছেন, যারা শব্দে বড়। কেবল মুখে বড় বড় বুলি হাঁকেন। আর কাজের বেলায় লবডঙ্কা। কিন্তু বালিকা বেটি তাঁদের একজন, যারা নীরবতায় বিশাল, কথা কম কাজে বড়অবহেলায় ভরা এই পৃথিবীতে তিনি এক জীবন্ত পাঠকীভাবে ভেঙে না পড়ে, মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয় তিনি তার জিন্দা দলিল।  
 
বালিকা বেটির দোকানে যারা নিয়মিত আসেদেলোয়ার, হুচেন, এনামুল, আরাফাত, অনিমেষ সম্পর্ক বয়সের হিসেবে তারা প্রায় সবাই তাঁর নাতি বা নাতির মতো। তাই সেখানে শুধু চা বিক্রি হয় নাচলে হাসিঠাট্টা, খুনসুটি আর নানা ধরণের গল্পগুজব। অদ্ভুত রকমের এক মায়ার বাঁধন তাঁদেরকেউ তাঁকে পিসি বলে, কেউ ডাকে দিদা। কখনো দুষ্টুমি, কখনো মায়া, আর দরকার হলে নিঃশব্দে পাশে দাঁড়ানোসবই চলে অবিরাম।
 
প্রচণ্ড শীত পড়েছে। পৌষের দ্বিতীয় সপ্তাহ সূর্যের দেখা মেলে না, বললেই চলে। শিকড়ের টানে আমরার সদস্যরা তুলাই নদীর পাড়ে শীতবস্ত্র বিতরণের ব্যবস্থা করেছে। তাঁর নাতি-তুল্য সিদ্দিক-রাব্বানি-লতিফ’রা এই প্রচণ্ড শীতে ভালোবাসার টানে যেন খানিকটা জোর করেই তাঁর হাতে তুলে দেয় একটি কম্বলউপহার হিসেবে নয়, আপনজনের দায়বদ্ধতা হিসেবেবালিকা বেটি প্রথমে নিতে চাননিবলেন— “আর কত দিবেন তোমরা?” কিন্তু শেষমেশ চোখের কোণে জমে ওঠা জল লুকিয়ে কম্বলটা বুকে জড়িয়ে ধরেন।
 
বালিকা বেটি কখনো কিছু চান না। কিন্তু জীবন মাঝে মাঝে এমন কিছু মানুষ পাঠিয়ে দেয়, যারা তাঁর চাওয়ার আগেই তাঁর প্রয়োজন অনুভব করে এবং তা পূরণের চেষ্টা করে। আর তাই বালিকা বেটি নাতিদের হাসি, মায়া, খুনসুটি আর ভালোবাসার আদল গায়ে জড়িয়েকণকণে শীতে গাঢ় কুয়াশা ভেদ করে প্রতিদিন বেরিয়ে পড়েন। এক হাতে তাঁর চাবির ঝনঝনানি, আরেক হাতে দুধভরা বোতল। বয়সের ভারে শরীরটা ঈষৎ ন্যুব্জ, পিঠটা সামান্য ঝুঁকে গেছে, তবু তাঁর পা দুটো থেমে থাকে না। কদমগুলো মন্থরকিন্তু ভেতরে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা নিয়ে এগোয়।
 
ওই একই পথ ধরে তিনি হাঁটেনপ্রতিদিন, নির্দিষ্ট সময়ের সরণী বেয়ে। প্রায় তিরিশ বছর ধরে। কী শীত, কী বর্ষা, কী গ্রীষ্মকোনো কিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি। কখনো কুয়াশায় পথ ঢেকে যায়, কখনো বৃষ্টিতে ভিজে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে ওঠে, তবু বালিকা বেটি হাঁটেন, এক অদ্ভুত ছন্দেকারণ ওই পথের ধারে শুধু একটি চায়ের দোকান নয়ওখানে অপেক্ষা করে তাঁর বেঁচে থাকার অর্থ, তাঁর আত্মসম্মান, আর নীরব সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস।
 
০২/০১/২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা

No comments:

Post a Comment