Friday, 30 January 2026

সমীর মোলবিঃ আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 

 
সেই সোনালী শৈশবে, পৃথিবীটা ছিল খুব ছোট, সামনের মাঠ পেরিয়ে তুলাইয়ের পাড়ে আকাশ মিশে যেতো মাটিতে। আর বিশ্বাসগুলো ছিল অবিশ্বাস্য রকম সহজ ও সরল তখনই আরম্ভ হয় কদমডাঙ্গা মক্তবে আমার আরবি পড়তে যাওয়া। ভোরের কুয়াশা মাঠের ঘাসে লেপ্টে থাকত, আর মেঠো পথটা শিশিরে ভিজে নরম হয়ে থাকতো, হাতে ছোট্ট তক্তি, বগলে কাগজে মোড়া কিতাব, মায়ের ডাকে ঘুমজড়ানো চোখ মুছতে মুছতেই আমি রওনা দিতাম। মনে হতো, যেন পড়তে নয়, কোনো এক পবিত্র যাত্রায় বের হয়েছি  
 
কদমডাঙ্গা মক্তবটা খুব বড় ছিল নাটিনের চাল, মাটির মেঝে, দেয়ালে সময়ের জমে থাকা দাগ। অথচ সেই ছোট্ট ঘরটার ভেতরেই খুলে যেত অন্য এক দুনিয়া। ‘আলিফবাতা’র প্রথম ধ্বনি, ‘কাফলাম’-এর ভারী উচ্চারণ, আর কিতাব খুললেই যে এক ধরনের গম্ভীর নীরবতা নেমে আসতসব মিলিয়ে মনে হতো, অক্ষরগুলো শুধু পড়বার জন্য নয়, হৃদয়ের গভীরে গেঁথে নেওয়ার জন্যই এসেছে।
 
মক্তবে আমাদের এক শিক্ষক ছিলেন, নাম সমিরুদ্দীন আহমেদসম্পর্কে কাকু হবেন। দশ মুখে ‘সমীর মোলবি’ নামেই পরিচিত। খুবই সাদাসিধে একজন মানুষ। কথার চেয়ে আমলে অধিক বিশ্বাসী ছিলেনমক্তব আর ইমামতির সামান্য আয়ের ওপর ভর করেই সারাটা জীবন পার করে দিয়েছেনকখনো কোনো অভিযোগ করেননি, কোনো আক্ষেপ তাঁর চোখেমুখে আমি দেখিনি। অভাবের দরুন পড়াশোনার সুযোগ খুব বেশি পাননি; তাই সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু বিষয়ে আমাদের প্রজন্মের ছেলেপুলেদের সঙ্গে তাঁর ভাবনার অমিল ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই মতপার্থক্য নিয়ে আমার সঙ্গে কোনোদিন কোনো তর্ক-বিতর্ক তো দূরের কথা, একটিবার কথাও বলেননি। যেন তাঁর কাছে সম্পর্কটাই ছিল মুখ্য, মতের ফারাক নয়।
 
চাকরি পাওয়ার পর একদিন খুব সাধ করে তাঁর কাছে গিয়েছিলাম। হাতে ছিল ছোট্ট একটা উপহারআমরা যাকে হাদিয়া বলি আরকিবড় কিছু নয়, খুব দামীও নয়, কিন্তু ভালোবেসে কেনাউপহারটা হাতে নিয়ে তিনি যেন শিশুর মতো খুশি হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর চোখেমুখে তখন যে প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়েছিল, তাতে মনে হয়েছিলআমি যেন তাঁর হাটে কোনো অমূল্য উপহার তুলে দিয়েছি।
 
মাঝে তুলাই দিয়ে বহু জল গড়িয়ে গেছে। একদিন খবর পেয়ে দেখতে গেলামতিনি তখন প্রায় শয্যাশায়ী। শরীর ভেঙেছে, চোখ দুটো আরও ভেতরে ঢুকে গেছে, মুখমণ্ডলটা মলিন ও বিবর্ণ, কিন্তু মনটা আগের মতোই উচ্ছ্বল ও স্নেহে ভরা। আমাকে দেখেই স্ত্রীকে ডেকে বললেন,
—“হয় মখলুসুরের মা, আয় দেখি যা, মোর বাপ আইছে মোক দেখিবা, কত বড় মানুষ হইছে, তাও মোক ভুলেইনি। কুন্‌ কালে মুই ওক ‘আলিফ-বে-তে-সে’ পড়েইছু, এখনো মোর কথা মনে থুইছে 
 
কথাগুলো শুনে খানিকটা লজ্জা পেয়েছিলাম, চোখ দুটো আপনা থেকেই মাটিতে নেমে গেছিল। মনে হয়েছিল, তিনি যেন আমাকে নয়, আমার শৈশবটাকেই বুকে টেনে নিচ্ছেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেনসেই চেনা স্পর্শ, সেই মমতাময় পরশতারপর অত্যন্ত ক্ষীণ কণ্ঠে দুয়া করলেন,
—“আরও বড় মানুষ হো বা। আল্লাহ তোর ভালো করোউক। তোর বাপ খুব ভালো মানুষ আছোলো, তোর বাপের নামটা থুইস…”
 
কথার ফাঁকে ফাঁকে আরও অনেক কথা বললেনজীবনের কথা, মানুষ হয়ে ওঠার কথা, শিকড়কে ভুলে না যাওয়ার কথা। ফেরার তাড়া ছিল, সময় বেশি কাটাতে পারিনি। বিদায়ের মুহূর্তে ঘূর্ণাক্ষরেও বুঝতে পারিনিএই দেখাই শেষ দেখা। নীরবে ফিরে এসেছিলাম, বুকের ভেতর এক অজানা ভার নিয়ে।
 
আজ যখন ফিরে তাকাই, মনে হয়সেদিন আমি শুধু একজন শিক্ষকের কাছ থেকে নয়, শৈশবের এক নির্ভেজাল আশ্রয় থেকেও বিদায় নিয়েছিলাম। মাথায় রাখা তাঁর সেই উষ্ণ হাত, সেই নিঃস্বার্থ দোয়াআজও আমার পথচলার গোপন পাথেয় হয়ে আছে। আজও দেশের বাড়িতে গেলে যখন ফিদ্দুর দোকানের চালায় বসে থাকি, মনে হয়ঈষৎ ন্যুব্জ শরীরটা একটা জীর্ণ আদল গায়ে জড়িয়ে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলেছে কদমডাঙ্গা মক্তবের পথে। শুভ্রকেশে ভরা মাথাটা পায়ের ছন্দে দুলে দুলে উঠছে, আর ভোরের কুয়াশার ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে 
 
১৫/০১/২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা

No comments:

Post a Comment