মক্কার আকাশে তখনও ভোরের আলো পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। মরুভূমির
নরম বাতাসের কাঁধে চেপে কাবার চত্বর থেকে ভেসে আসছিল মানুষের কোলাহল। চারদিকে তখনও কুরাইশদের সেই পুরোনো সমাজ ব্যবস্থা,
পুরোনো বিশ্বাস আর বংশগৌরবের দাপট। কিন্তু সেই পরিচিত
পৃথিবীর বুকেই নীরবে জন্ম নিচ্ছিল এক নতুন ইতিহাস।
এই ইতিহাসের কেন্দ্রে ছিলেন যায়নাব (রাঃ)—আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ (সাঃ)-এর প্রিয় কন্যা। যায়নাব (রাঃ)-এর বিয়ে হয়েছিল তাঁরই খালাতো ভাই আবুল আস ইবনুর রাবি’ (রাঃ)-এর সাথে। আবুল আস ছিলেন
কুরাইশদের অন্যতম ধনী,
সম্মানিত ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। মক্কার বাণিজ্য জগতে তাঁর যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। সততা ও
আমানতদারিতার কারণে মানুষ তাঁর উপর অগাধ আস্থা রাখত। দু’জনের দাম্পত্য জীবনও ছিল
ভালোবাসা,
বিশ্বাস ও পারস্পরিক শ্রদ্ধায় পূর্ণ।
কিন্তু সময় কখনো কখনো মানুষের জীবনে এমন এক মুহূর্ত এনে দেয়, যখন হৃদয়ের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির সঙ্গে বিশ্বাসের পথ আলাদা
হয়ে যায়। বিয়ের কয়েক বছর পর যায়নাব (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করলেন। তিনি বিশ্বাস করলেন এক আল্লাহকে, বিশ্বাস করলেন তাঁর প্রিয় পিতা মুহাম্মদ (সাঃ)-এর নবুওয়াতকে। তাঁর হৃদয় ভরে উঠল ঈমানের আলোয়। কিন্তু সেই
আলোয় আবুল আস তখনও আলোকিত হননি। তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের ধর্মেই অটল ছিলেন।
একই ঘরে দু’জন মানুষ—একজনের হৃদয়ে
ঈমানের নতুন আলো,
অন্যজনের হৃদয়ে পূর্বপুরুষদের বিশ্বাস। তবুও ভালোবাসা কি এত সহজে শেষ হয়ে যায়?! যায়নাব (রাঃ) তাঁর স্বামীকে ছেড়ে দিতে চাইলেন না। আর আবুল
আসও তাঁর প্রিয় স্ত্রীকে হারাতে চাননি। কিন্তু তাঁদের সামনে তখন এমন
এক পরীক্ষা অপেক্ষা করছিল,
যার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁদের ভালোবাসা, দাম্পত্য, বিশ্বাস—সবকিছুকেই যেন নতুন করে সংজ্ঞায়িত হতে হবে।
সেদিন তাঁরা কেউই জানতেন না—এই নীরব দূরত্ব
একদিন তাঁদের নিয়ে যাবে মক্কার অন্ধকার গলি পেরিয়ে বদরের প্রান্তরে, সেখান থেকে কারাগারের নিঃসঙ্গতায়, আর শেষ পর্যন্ত এমন এক মিলনের আঙিনায়—যেখানে ভালোবাসা শুধু ভালোবাসা থাকবে না; হয়ে উঠবে ঈমান,
ত্যাগ ও বিশ্বস্ততার এক অনন্য উপাখ্যান।
কুরাইশরা আবুল আসকে নানা ভাবে
বোঝাতে লাগল— “যায়নাবকে তালাক দিয়ে দাও। তুমি কুরাইশের যে সুন্দরী নারীকে চাইবে, আমরা তার সঙ্গেই
তোমার বিয়ে দিয়ে দেবো।” কিন্তু আবুল আস রাজি হলেন না। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে জানিয়ে দিলেন— “কুরাইশের সব
সুন্দরী নারীকে আমার সঙ্গে বিয়ে দিলেও আমি আমার স্ত্রী যায়নাবকে ত্যাগ করতে পারব
না।” কী গভীর ছিল সেই দাম্পত্যের টান!
একদিকে যায়নাব (রাঃ)-এর ঈমান, অন্যদিকে তাঁর
স্বামীর ভালোবাসা—কিন্তু দু’জনের পথ তখন এক নয়। আবুল আস তাঁর ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত
থাকতেন। কুরাইশদের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর সম্পর্ক এবং প্রশ্নাতীত আনুগত্য। আর সেই
আনুগত্যই তাঁকে একদিন এমন এক যুদ্ধের ময়দানে হাজির করলো, যেখানে তাঁর
বিপরীতে ছিল তাঁর শ্বশুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী।
বদরের প্রান্তর। একদিকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ), যায়নাব (রাঃ)-এর বাবা। অন্যদিকে সেই বাহিনীর বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর
স্বামী। ভাবুন, যায়নাব (রাঃ)-এর মনের অবস্থা! যে মানুষটিকে তিনি ভালোবাসেন, তিনি দাঁড়িয়ে
আছেন তাঁর পরম শ্রদ্ধেয় পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। শেষ পর্যন্ত
আবুল আস যুদ্ধে বন্দী হলেন। মক্কায় বসে যায়নাব (রাঃ) যখন জানতে
পারলেন তাঁর স্বামী বন্দী হয়েছেন, তখন তিনি তাঁর মুক্তির জন্য নিজের
গলার মূল্যবান হারটি পাঠিয়ে দিলেন, মুক্তিপণ স্বরূপ। হারটি হাতে নিয়ে
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। তাঁর চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরতে লাগলো। কারণ, এটি ছিল তাঁর
প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রাঃ)-এর হার, যা তিনি বিয়ের সময় মেয়েকে উপহার
দিয়েছিলেন।
একদিকে বন্দী জামাতা, অন্যদিকে প্রিয়
কন্যার ভালোবাসার স্মৃতি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাহাবাদের
আব্দার মেনে সেই মুক্তিপণ ফিরিয়ে দিয়ে আবুল আসকে একটি শর্ত দিলেন—যায়নাবকে মক্কা
থেকে মদীনায় পাঠিয়ে দিতে হবে। আবুল আস কথা রাখলেন। যে নারীকে তিনি কুরাইশের শত প্রলোভন সত্ত্বেও ত্যাগ করেননি, সেই প্রিয়
স্ত্রীকেই শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে দেওয়া কথা রাখার জন্য
মদীনায় পাঠিয়ে দিলেন।
আর যায়নাব (রাঃ)? তিনিও স্বামীকে
খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু যখন তাঁর বাবা, আল্লাহর রাসূল (সাঃ), তাঁকে মদীনায়
চলে যেতে বললেন—তিনি নিজের ভালোবাসাকে বুকের ভেতর চাপা দিয়ে মদীনার পথে পা বাড়ালেন। এটা ছিল তাঁর জীবনের এক বিশাল পরীক্ষা। স্বামীকে ভালোবাসবেন, নাকি ঈমানকে? তিনি ঈমানকে
বেছে নিলেন। তারপর শুরু হলো অপেক্ষা। এক বছর নয়, দু’ বছর নয়—প্রায় পাঁচ বছর।
পাঁচ বছর যায়নাব (রাঃ) মদীনায়
অপেক্ষা করলেন। এই দীর্ঘ পাঁচ বছরে, কত রাত কেটেছে তাঁর চোখের জলে, কতবার হয়তো মনের
অজান্তে মক্কার দিকে তাকিয়ে ভেবেছেন— “আবুল আস কি কখনো ইসলাম গ্রহণ করবে
না, সে কি কখনো আমার কাছে ফিরে আসবে না?”
তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্কও আর আগের
মতো ছিল না। কারণ একজন মুসলিম নারী হিসেবে একজন অমুসলিম পুরুষের সঙ্গে তাঁর সেই
দাম্পত্য বৈধ থাকেনি। তবে যায়নাব (রাঃ) অপেক্ষায় থাকলেন। কোনো নতুন সংসার করলেন না। কোনো নতুন সম্পর্কের দিকে এগোলেন না। তাঁর হৃদয়ের গভীরে তখন একটা আশাই
যেন অনুরণিত হচ্ছিল—একদিন আবুল আস ঠিকই ফিরে আসবে। তবে শুধু আমার কাছে নয়—আমার দ্বীনের
কাছেও।
এরপর এল আরেক কঠিন অধ্যায়। একদিন আবুল আস বাণিজ্যিক কাফেলা নিয়ে মদীনার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। খবর পেয়ে সাহাবিরা
সেই কাফেলাকে ধাওয়া করলেন। আবুল আস কোনোভাবে পালিয়ে গেলেন। পরে তাঁর মনে
হলো—এই কাফেলায় শুধু তাঁর নিজের সম্পদ নেই, কুরাইশদেরও আমানত রয়েছে। তিনি মদীনায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
কিন্তু যাবেন কোথায়? যে শহরে তাঁর
কোনো অধিকার নেই। যে শহরে তিনি কেবল একজন ‘মুশরিক’। যে শহরে তাঁর সঙ্গে যায়নাব
(রাঃ)-এর বৈবাহিক সম্পর্কও আর আগের মতো নেই। তবু তাঁর পা
তাঁকে নিয়ে গেল একটি ঘরের সামনে। যায়নাবের ঘর। মদীনার অসংখ্য
ঘরের মধ্যে তিনি খুঁজে নিলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির আশ্রয়। রাতের
অন্ধকারে তিনি সেখানে আশ্রয় নিলেন। কী অদ্ভুত দৃশ্য! পাঁচ বছর ধরে যে
নারী তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন, সেই নারীই আজ তাঁর আশ্রয়, তাঁর
ঠিকানা।
ভোর হলো। ফজরের নামাজের সময় যায়নাব
(রাঃ) ঘর থেকে বেরিয়ে ঘোষণা দিলেন— “আমি আবুল আসকে নিরাপত্তা দিয়েছি।” রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বিষয়টি
জানতে পেরে বিস্মিত হলেন। কিন্তু যায়নাব (রাঃ)-এর দেওয়া নিরাপত্তা তিনি গ্রহণ
করলেন। তারপর আবুল আসকে জানিয়ে দেওয়া হলো— এখন আর তিনি
যায়নাবের স্বামী নন।
কী কঠিন সেই মুহূর্ত! যে মানুষটির
জন্য যায়নাব (রাঃ) এত বছর অপেক্ষা করেছেন, যাঁর জন্য নিজের গলার হার পর্যন্ত
বিসর্জন দিয়েছেন, সেই মানুষটি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে—তবু তিনি তাঁর স্বামী নন। কিন্তু
যায়নাব (রাঃ) আবারও মেনে নিলেন। কারণ তাঁর ভালোবাসা ছিল গভীর, কিন্তু তাঁর
ঈমান ছিল তার চেয়েও দৃঢ় ও গভীর।
এরপর আবুল আস কুরাইশদের পণ্য ফেরত দেওয়ার
অনুরোধ করলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর অনুরোধ গ্রহণ করলেন। কেউ কেউ তাঁকে বললেন— “তুমি ইসলাম
গ্রহণ করে মদীনায় থেকে যাও। এই সম্পদগুলো তোমারই থাকবে।” কিন্তু আবুল আস
বললেন, না। তিনি মুশরিক অবস্থাতেও ছিলেন আমানতদার। তিনি ভাবলেন— “আমি কি
প্রতারণার মাধ্যমে আমার নতুন জীবন, নতুন সফর শুরু করবো?” তিনি সমস্ত পণ্য
নিয়ে মক্কায় ফিরে গেলেন। এক এক করে সকল সম্পদ তার মালিকদের
বুঝিয়ে দিলেন। তারপর বললেন—“তোমাদের মধ্যে কারও কি আমার কাছে কোনো পাওনা আছে?” সবাই বলল— “না।” তখন তিনি ঘোষণা
করলেন— “তোমরা জেনে রাখো, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি।”
তারপর তিনি ব্যাখ্যা দিলেন, কেন তিনি মক্কায়
ফিরে এসে ইসলাম গ্রহণের কথা জানালেন। তিনি বললেন, মদীনায় থাকা
অবস্থায় যদি তিনি ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করতেন, তাহলে মানুষ মনে করত—তিনি তাদের
সম্পদ আত্মসাৎ করার জন্যই মুসলিম হয়েছেন। তাই তিনি প্রথমে প্রত্যেকের আমানত
ফিরিয়ে দিলেন। তারপর ঈমানের ঘোষণা দিলেন। কী অসাধারণ আমানতদারি! একেবারে
কল্পনাতীত!
এবার তিনি মদীনার পথে
রওয়ানা হলেন। সেই মদীনা—যেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন যায়নাব (রাঃ)। পাঁচ বছর ধরে। পাঁচ বছরের ইন্তেজার শেষে যখন আবুল আস মদীনায় পৌঁছে ইসলাম গ্রহণের কথা জানালেন, তখন মদীনার
আকাশবাতাস যেন আনন্দে ভরে উঠল। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হলেন
একজন—যায়নাব (রাঃ)। যে নারী পাঁচ বছর ধরে অপেক্ষা করছিলেন, তাঁর অপেক্ষার
অবসান হলো। যে স্বামীকে তিনি ভালোবেসেছিলেন, তিনি ফিরে এলেন। তবে শুধু স্বামী হিসেবে নয়— মুসলিম হয়ে।
যায়নাব (রাঃ)-এর জীবনের দিকে
তাকালে মনে হয়, তাঁর ভালোবাসায় কোনো দুর্বলতা, কোনো মোহ ছিল না। তাঁর ভালোবাসায় ছিল ত্যাগ ও অপেক্ষা। ঈমানের কাছে নিজের আবেগকে সমর্পণ করাই ছিল তাঁর কাছে ভালোবাসা। তিনি স্বামীকে ভালোবেসেছিলেন—কিন্তু তাঁর জন্য আল্লাহর বিধান
অমান্য করেননি। তিনি স্বামীকে ফিরে পেতে চেয়েছিলেন—কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তনের পথকে
ঈমানের আলোয় আলোকিত দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি পাঁচ বছর অপেক্ষা করেছিলেন—তাঁর সেই অপেক্ষার
প্রতিটি দিন ছিল একেকটি এবাদতসদৃশ ধৈর্যের পরীক্ষা।
অবশেষে তাঁদের আবার সংসার হলো।
দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর এ যেন এক মহামিলন। কিন্তু নিয়তি তাঁদের এই দীর্ঘ
অপেক্ষার বিনিময়ে খুব বেশি সময় দেয়নি। পাঁচ বছরের বিচ্ছেদের পর, তাঁরা
একসঙ্গে থাকতে পেরেছিলেন মাত্র বছর খানেক; যেন বিস্তীর্ণ কোনো মরুভূমির মাঝে এক
চিলতে মরূদ্যান। তারপর এক বছরের মাথায় যায়নাব (রাঃ) ইন্তেকাল করলেন। আর আবুল আসের জীবনে নেমে এল মরুভূমির শূন্যতা।
[তথ্যসূত্র—ইব্নু ইস্হাক, সীরাতু
রাসূলিল্লাহ, পৃ ৩১৩; সুনান আবু দাউদ ২৬৯২ (হাসান), ২২৪০; সুনান তিরমিযী ১১৪৩;
মুস্নাদ আহ্মাদ ১৮৭৬; ইমাম বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুব্রা ১৪৪৪৯; মুস্তাদ্রাক হাকিম
৫১১৬; ইব্নু হিশাম, আস-সীরাহ্ আন-নাবাবিয়্যাহ্ ১/৬৫২-৬৫৯]
.png)
No comments:
Post a Comment