Wednesday, 4 February 2026

আছোল বড়আব্বা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 
 
আছোল বড়আব্বা, ভালো নাম আসলেউদ্দীন আহমেদ। নামের মতোই মানুষটা ছিলেন ভীষণ সহজ-সরল, সাদাসিধে। পেশায় চাষি, জমিজমাও ছিল বেশ ভালোই। তিন ছেলে আর এক মেয়েকে বড় করেছেন পরম যত্নে, সবাইকে পড়াশোনা করিয়েছেন। বড় ও ছোট ছেলে স্কুলশিক্ষক, আর মেজো ছেলে সংসার ও জমিজায়গার দেখাশোনা করেন। কিন্তু এসব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি গ্রামের মানুষের কাছে পরিচিতমুয়াজ্জেন রূপে
 
ছোটবেলা থেকেই তাঁকে দেখেছি গ্রামের মসজিদে আজান দিতে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান, কোনো ভাতা-কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াইকী শীত, কী বর্ষা, কী গ্রীষ্মসময় কখনো এক মুহূর্তও এদিক-ওদিক হয়নি। যেন সময়টাই তাঁর কণ্ঠের সাথে বাঁধা ছিল। তখন মসজিদে মাইক ছিল না। আছোল বড়আব্বা মসজিদের মিনারে উঠে, বুকভরা নিঃশ্বাস নিয়ে, সর্বশক্তি ঢেলে আল্লাহু আকবারহাঁক দিতেন। সেই কণ্ঠস্বর শুনেযে যার কাজে ডুবে থাকুক না কেন, সব ফেলে মানুষ ছুটে আসত মসজিদের দিকে।
 
রমজান মাস এলে স্মৃতিগুলো আরও রঙিন হয়ে ওঠে। আমরা ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মসজিদের কলতলায় খেলায় মেতে থাকতাম। হঠাৎ আছোল বড়আব্বার কণ্ঠ ভেসে আসত—“আল্লাহু আকবার…” আর সঙ্গে সঙ্গে খেলার মাঠে নেমে আসত এক অদ্ভুত উত্তেজনা। আমরা প্রাণপণে দৌড় দিতাম নিজ নিজ বাড়ির দিকে, দম ফুরোনো গলায় চেঁচিয়ে উঠতাম—“আজান হই গেইছে!
 
সেই কণ্ঠস্বর শুধু আজানের ছিল নাওটা ছিল আমাদের শৈশবের সময়চিহ্ন, রমজানের আনন্দ, আর গ্রামের জীবনের এক নিখাদ পবিত্র স্মৃতি। আছোল বড়আব্বা যেন আজও মিনারের মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন, আর তাঁর ডাকে আমাদের মন ছুটে যাচ্ছে সেই নির্ভেজাল দিনগুলোর দিকে।
 
আছোল বড়আব্বা ছিলেন একেবারে আগের দিনের মানুষ। মেশিন, যন্ত্রপাতি কিংবা আধুনিক জিনিসপত্রের সাথে তাঁর তেমন সখ্য ছিল না। তাঁর দুনিয়াটা ছিল মাটি, ফসল, আকাশের রোদবৃষ্টি আর আজানের সময় ধরে চলা এক সরল জীবনের ছকে বাঁধা। তাই যখন মহিপালকদমডাঙ্গা রাস্তার কাজ শুরু হলো, আর বিশাল বিশাল রোডরোলার রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকত, সেগুলো আছোল বড়আব্বার কাছে যেন অন্য এক অচেনা জগতের বস্তু হয়ে উঠল।
 
এই সুযোগেই বাচ্চু, আমু, লাবু ও অন্য সব নাতিরা মিলে শুরু করল নানা রকম মশকরা। কেউ হেসে বলত, “দাদু, এই রোডরোলারের চাকায় তো হাওয়া নাই!কেউ আবার আরও দুকথা যোগ করত, খুনসুটির হাসিতে ভর করে। তিনি, কোনো প্রতিবাদ নয়, কোনো বিরক্তি নয়। শিশুর মতো সরল মুখে শুনতেন, একটু থমকে তাকাতেন সেই বিশাল যন্ত্রটার দিকে, তারপর ধীরে ধীরে মাথা দুলাতেনযেন সত্যিই কথাটা ভেবে দেখছেন। তাঁর সেই মাথা দোলানোতে ছিল এক নির্মল বিশ্বাসমানুষ যা বলে, তা মন দিয়ে শোনাই তো মানুষের কাজ।
 
ওই সরল মাথা দোলানো, ওই নির্বাক বিশ্বাস, ওই হাসিমাখা নীরবতাএসবই ছিল আছোল বড়আব্বার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। আধুনিকতার ভিড়ে, যন্ত্রের শব্দে ঢাকা পড়ে যাওয়া এক পুরোনো দিনের নিষ্পাপ মানুষের ছবি, যা চোখের আড়াল হলেও হৃদয়ের গভীরে অটুট হয়ে গেঁথে থাকে  
 
গাছগাছালির সাথে আছোল বড়আব্বার সখ্যতা ছিল সত্যিই ঈর্ষণীয়। গাছ লাগানো, তার দেখভাল করা, মাটি খুঁড়ে আদরযত্নে বড় করে তোলাএসব ছিল তাঁর ভীষণ প্রিয় কাজ। জীবনের ফাঁকে ফাঁকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন বেশ কয়েকটা ছোট ছোট বাগান; যেন মাটির সাথে তাঁর এক নীরব বন্ধুত্ব ছিল, যা কথার চেয়েও গভীর।
 
আমাদের গ্রামের মোড়ে একসময় ছিল শূন্যতার রাজত্ব। পাকা সড়ক তখনো বহু দূরের স্বপ্ন। ঠিক সেই সময়, একদিন আছোল বড়আব্বা সেখানে একটি পাকুড়ের চারা রোপণ করলেন। চারপাশে বাঁশ আর কঞ্চি দিয়ে ঘিরে দিলেন, যেন কেউ অসাবধানতায় ক্ষতি না করে বসেপ্রতিদিন নিয়ম করে পানি দিতেনরোদে, বৃষ্টিতে, কোনো অজুহাত ছাড়াই। ধীরে ধীরে চারাটির পাতা বেরোল, ডাল ছড়াল, কাণ্ড শক্ত হলো। সময়ের সাথে সাথে সেই ছোট্ট চারাটি একদিন মহিরুহে পরিণত হলো।
 
আজ সেই পাকুড় গাছের ছায়ায় কত শত মানুষ আশ্রয় নেয়। তার তলায় গড়ে উঠেছে কয়েকটা দোকান, পথিকেরা দাঁড়িয়ে জিরিয়ে নেয় ক্লান্ত শরীর। ডালপালায় বাসা বেঁধেছে অসংখ্য পাখি, সকালসন্ধ্যা তাদের কিচিরমিচির ডাকে মুখরিত হয়ে থাকে চারদিক। প্রতিদিনই কেউ না কেউ ওই গাছের পাতা পাড়েছাগলের খিদে মেটাতে, জীবনের কোনো ছোট্ট প্রয়োজনে
 
তুলাই নদীর অগণিত স্রোত টাঙ্গন, পুনর্ভবা, গঙ্গার বুকে নিজেকে বিলিয়ে শেষে গিয়ে মিশেছে অসীম সমুদ্রে। তেমনি আছোল বড়আব্বাও প্রায় কুড়ি বছর আগে এই দুনিয়ার সীমা পেরিয়ে অনন্তের পথে চলে গেছেনকিন্তু তিনি যে পাকুড় গাছটি রোপণ করেছিলেন, তা আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে—নীরব অথচ দৃঢ়, স্থির অথচ জীবন্তনিঃশব্দে, নিরবচ্ছিন্নভাবে সে হয়ে উঠেছে এক সাদাকাহ জারিয়াএক অবিরত দান, যার হিসেব ফেরেশতারা রাখে, মানুষ নয়তাঁর সেই সাদাকাহ অগণিত মানুষের অক্সিজেনের চাহিদা মেটায়, তাঁর সাদাসিধে জীবনের সাক্ষ্য হয়ে, শিকড় ছড়িয়ে ছায়া বিলিয়ে, দাঁড়িয়ে আছে বাঁশকুড়ি মোড়ের মাথায় হাওয়ায় দোল খেয়ে তার পাতাগুলো যখন মৃদু শব্দ তোলে, মনে হয় যেন পথচারীদের উদ্দেশ্যে কেউ হাঁক ছাড়ছে—‘বাঁশকুড়ি এসে গেছে’, ঠিক যেমন করে হাঁক ছাড়তেন তিনি মসজিদের মিনার থেকে। আর উভয় ডাকই যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় কোনো অদৃশ্য পথে।
 
১৭/০১/২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা

No comments:

Post a Comment