Thursday, 5 February 2026

ঝড় থেমে গেল - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 

 
সালটা ১৯৭১ উত্তাল সময়। বাতাসে বারুদের গন্ধ। খান সেনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘর্ষ চরম পর্যায়ে। চারদিকে অনিশ্চয়তা, ভয় আর টানটান উত্তেজনা। সীমান্তে শুরু হয়েছে বেশ কড়াকড়ি। ফলে এপাশের মানুষদের পক্ষে ওপারের ডুংডুঙ্গির হাটে যাওয়া অসম্ভব হয়ে উঠল। যে হাট একসময় ছিল জীবিকার ভরসা, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আদানপ্রদানের মাধ্যম, তা হঠাৎই হয়ে গেল অধরা, চলে গেল ধরাছোঁয়ার বাইরেসংসার চলবে কীভাবেএই প্রশ্নে মানুষ তখন দিশেহারা, উৎকণ্ঠিত। ঠিক সেই সময় গ্রামের লোকজন একজোট হয়ে হাজির হলেন নজিবদ্দিন ও অফিজদ্দিন সাহেবের কাছে। কণ্ঠে অনুরোধ, চোখে অসহায়তার ছাপহাট বসানোর জন্য যদি তাঁরা একটু জায়গা দেন!
 
তাঁরা এবং তাঁদের বংশধরেরা শুধু জায়গাই দেননি, দিয়েছিলেন সাহস আর ভরসা। সেদিন তাঁরা ঘোষণা করেছিলেনএই হাট হবে সবার জন্য, এখানে কোনো জমাতলা লাগবে না, কোনো খাজনাও নয়। বিনা মূল্যে, বিনা শর্তে, সকলের জন্য উন্মুক্ত। মানুষের প্রয়োজনে, মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তারই হাত ধরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল শাটিমারি হাটএকটা হাট, যা শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, ছিল বহু মানুষের বাঁচার অবলম্বন।
 
সেই থেকে শাটিমারি হাট বসে প্রতি সোম ও শুক্রবারে আশপাশের গ্রাম থেকে লোকজন আসে। কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ সাইকেল নিয়ে, কেউ গরুর গাড়ি করে। বাঁশের খুঁটি ও টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি দোকানগুলো, কোনটার ছাউনি খড়ের, কোনোটা আবার ছাউনি ছাড়াই। হাটের উত্তর-পশ্চিম কোণে একটা দুর্গামন্দিরও গড়ে উঠেছিল। বহু বছর আগের কথাআমি তখন খুব ছোট। এক শুক্রবারে বাবার সাথে হাটে গেছি। বাবার হাত ধরে সবুজ মাঠের বুক চিরে যাওয়া সরু আল ধরে গুটি গুটি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সেই স্মৃতি আজও চোখে ভাসে। চারদিকে তখন ব্যস্ততার কোলাহল। কেউ চাল কিনছে, কেউ লবণ, কেউ কাপড়। শিশুরা হাওয়াই নাড়ু, লজেন্স, পাউরুটি আর বাতাসা হাতে হাটের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটছে। সবজিওয়ালাদের হাঁকডাকে কান পাতা দায়। সব মিলিয়ে, আর পাঁচটা দিনের মতোই প্রাণচঞ্চল এক হাট।
 
কিন্তু প্রকৃতি হঠাৎই বাধ সাধল। আসমান তার রুদ্ররূপ দেখাল। আচমকা কালবৈশাখী ঝড় উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে দোকানপাট সব কেঁপে উঠল। বিদ্যুতের চমক, বজ্রের গর্জন, উড়ে যাওয়া পলিথিন আর ভাঙা ডালের শব্দে চারদিক যেন ত্রস্তহাটে তখন মানুষের ঢলকেউ কেনাবেচা ফেলে দিগ্বিদিক ছুটছে, কেউ আবার প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয়ের খোঁজে।
 
সেই মুহূর্তে আশ্রয় বলতে একটাই জায়গাহাট-লাগোয়া সেই দুর্গা মন্দিরের চালা। মাটির দেয়াল, টিনের ছাউনিঅতি সাধারণ এক আশ্রয়। কিন্তু বিপদের দিনে সেটাই হয়ে উঠল সবার ভরসা। হিন্দু-মুসলিম-সাঁওতালসব পরিচয় যেন ঝড়ের মুখে মিলিয়ে গেল। সবাই এক ছাদের নিচে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে পড়ল। বাইরে কালবৈশাখীর তাণ্ডব, ভেতরে মানুষের কাঁপা কাঁপা নিঃশ্বাস।
 
কালবৈশাখীর হাত থেকে রেহাই পেতে চালার তলে দাঁড়িয়ে যে যার বিশ্বাস অনুযায়ী প্রার্থনায় মগ্ন। কেউ মন্ত্র জপছে, কেউ দোয়া করছে, কেউ আবার নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। ভয় আর আশার এক অদ্ভুত মিশেল তখন বাতাসে।
 
গোপেশ ও সোবহানশাটিমারি হাটের চেনা মুখ, বহুদিনের বন্ধু। সেদিনও একসঙ্গে হেঁটে হেঁটেই হাটে এসেছিলেন তাঁরাআশ্রয়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে গোপেশ জ্যাঠু চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ছিলেনহঠাৎ চোখ খুলে বন্ধু সোবহানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“হাঁ হো, তোরা কেনে চুপ করি আছেন? দোয়া করো, আজান দেও।
 
সোবহান বড়আব্বা এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। সেই দুর্গা মন্দিরের চালার নিচেই দাঁড়িয়ে তিনি আজান দিলেন। ঝড়ের গর্জনের ভেতর দিয়ে আজানের সুর যেন এক আশ্চর্য প্রশান্তি নিয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। ভয় যেন একটু একটু করে সরে গেল। মানুষের মনে ফিরে এলো ভরসা, ফিরে এলো সাহস।
 
কিছুক্ষণ পর ঝড়ের দাপট ধীরে ধীরে কমে এলো। কালবৈশাখী তার রুদ্ররূপ গুটিয়ে ফিরে গেল তার জগতেমানুষজন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। হাট আবার ফিরল তার স্বাভাবিক ছন্দে। সন্ধ্যা নামলে হাট ভাঙল, সবাই যে যার ঘরের পথে রওনা হলোসাথে নিয়ে গেল মনের গহীনে এক অদ্ভুত উষ্ণতা।
 
সেদিনের শাটিমারি হাট শুধু একটা কেনাবেচার জায়গা হয়েই থাকেনি। সেদিন এক ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে মানুষ প্রমাণ করে দিয়েছিলবিশ্বাস আলাদা হতে পারে, নাম আলাদা হতে পারে, কিন্তু বিপদের দিনে মানুষ মানুষের আশ্রয়, বেঁধে বেঁধে-গেঁথে গেঁথে থাকাতেই আছে মুক্তি, আছে আনন্দ। আর লোকজন যখন বাড়ি পৌঁছল, ততক্ষণে ঝড় থেমে গেছে— শুধু আকাশে নয়, তাদের বুকের ভেতরেও।
 
১৭/০৩/২০১৯
তপ্সিয়া, কোলকাতা

No comments:

Post a Comment