Pages

Showing posts with label ভারতীয় মুসলিম. Show all posts
Showing posts with label ভারতীয় মুসলিম. Show all posts

Saturday, 6 June 2026

খুদ্দার - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



আমাদের বাড়ি থেকে উত্তর দিকে কয়েকটা বাড়ি পেরোলেই ছোট্ট একটা মাটির বাড়ি চোখে পড়ে। খুবই সাধারণকিন্তু অদ্ভুত এক মায়া ও সম্ভ্রম জড়িয়ে আছে সেই বাড়িটাকে ঘিরে। একটা ছোট শোয়ার ঘর, তার সঙ্গে লাগোয়া টিনঢাকা বারান্দা। সামনে একচিলতে উঠোন। উঠোনের এক পাশে কঞ্চির বেড়া আর এসবেস্টাসের চালা দেওয়া ছোট্ট রান্নাঘর। একটু দূরে নির্মল বাংলা পায়খানা। বাহ্যিক দিক থেকে দেখলে মনে হবে, এ যেন গ্রামের আরও দশটা দরিদ্র ঘরের মতোই একটা ঘর। সেই ছোট্ট বাড়ির ভেতরে বাস করেন এক বিধবা মা ও তাঁর তালাকপ্রাপ্তা মেয়ে।
 
ভদ্রমহিলার নানা-মামুদের বাড়ি ছিল আমাদেরই গ্রামে। জয়বাংলার আগেই তাঁরা পূর্ব পাকিস্তান, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে চলে যান। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, জীবনের ঘুরপাকে একসময় তিনি বউ হয়ে আবার এই গ্রামেই ফিরে আসেনপ্রথম দিকে তাঁর জীবন মোটামুটি ভালোই চলছিল। স্বামী, সংসার, আর একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ছোট্ট সুখের পৃথিবী ছিল তাঁর। মেয়েটার জন্মের পর হয়তো তিনি আরও অনেক স্বপ্ন বুনেছিলেন। কিন্তু মানুষের জীবন তো সবসময় স্বপ্নের মতো চলে না।
 
কিছুদিন পর থেকেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নানা বিষয় নিয়ে অশান্তি শুরু হপ্রথমে ছোটখাটো মনোমালিন্য, তারপর ধীরে ধীরে তা ঝগড়া-বিবাদ তীব্র বাগবিতণ্ডা রূপ নিলএক পর্যায়ে তাঁর সেই সাজানো সংসার ভেঙ্গে গেলভেঙ্গে গেল তাঁর স্বপ্নের ঘর। কিছুদিন পর, তাঁর স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলেন। কিন্তু তিনি আর কখনো নতুন সংসারের কথা ভাবেননি। নিজের সারাটা জীবন উজাড় করে দিলেন একমাত্র মেয়ের জন্য। সামান্য আয়ের উপর ভর করে কষ্টে-সৃষ্টে মেয়েকে বড় করলেন, সময়মতো বিয়েও দিলেন।
 
কিন্তু নিয়তির নির্মমতা যেন তাঁদের পিছু ছাড়ল না। তাঁর একমাত্র মেয়ের সংসারটাও টিকল না। শেষ পর্যন্ত সে ফিরে এল মায়ের কাছে সেই ছোট্ট মাটির বাড়িতে আর মা ও মেয়ে দুজনে মিলে আবার নেমে পড়লেন জীবনযুদ্ধেমানুষের বাড়িতে টুকিটাকি কাজ করে দেন, কেউ ডাকলে সাহায্য করেন, কারো ঘরদোর লেপাপোঁছা করে দেন, কারো খইমুড়ি ভেজে দেন তাছাড়া দ্বিতীয় পক্ষের ছেলেরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী মাঝেমধ্যে কিছু সাহায্যসহযোগিতাও করে। এভাবেই টেনেটুনে কোনোরকমে তাঁদের দিন চলে যায়  
 
আমার জানা মতে, এত অভাব, এত কষ্টের মধ্যেও তিনি কোনোদিন কারও কাছে হাত পাতেননি। আমার দেখা সবচেয়ে সৎ, আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন আর খুদ্দার মানুষদের মধ্যে তিনি অন্যতম। কেউ আর্থিক সাহায্য করতে গেলে আগে জিজ্ঞেস করেন, “কী রকম দান?” যদি বলা হয় যাকাত বা সাদকার টাকা, সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাথা নাড়িয়ে বলেন— “এইলা আগুনের টাকা, মুই নিবা পারিবানু ভায়ামুই এতোটা অসহায় নাঁওজাকাত-সাদকা মোর নেওয়া জায়েজ হবানে 
 
কিন্তু কেউ যদি কখনো ভালোবেসে, সম্মান করে হাদিয়া বা উপহার হিসেবে কিছু দে, তখন তিনি হাসিমুখে তা গ্রহণ করেন। যেন কেবল সাহায্য নয়, সম্পর্কের উষ্ণতা তাঁর কাছে বড়।
 
রমজান শেষে আমি যখন বাড়ি যাই, তখন গ্রামের হকদার মানুষদের মাঝে আমার যৎসামান্য যাকাতের টাকা বিলি করি। কিন্তু তাঁর জন্য আলাদা করে কিছু টাকা রেখে দিই হাদিয়া হিসেবে। কারণ আমি জানি, তিনি যাকাতের টাকা নেবেন না। টাকা দেওয়ার সময় তিনি বারবার নিশ্চিত হতে চান। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করেন— “হাঁ ভায়া, মোক এইলা জাকাতের টাকা দেছি না তো?”
আমি শান্ত স্বরে বলি— “না বু, তোক মুই জাকাতের টাকা দেওনি। এইডা হাদিয়া, তোর নাগিন।
তখন তাঁর মুখে যে প্রশান্তির হাসি ফুটে ওঠে, তা ভাষায় প্রকাশ করতে আমি অক্ষম  
 
একবারের একটা ঘটনা মনে পড়ে। আমার এক ডাক্তার বন্ধু বিশেষ একটা নিয়েত করেছিলসে একজন সৎ, নামাজি, রোজাদার বিধবা মহিলার জন্য পানীয় জলের ব্যবস্থা করে দেবে, যেন তা তাঁর আমলনামায় সাদকায়ে জারিয়া অর্থাৎ অবিরত দান রূপে লেখা থাকেএকদিন সে আমাকে বলল— “ভাই, তোমাদের এলাকায় এমন কাউকে চিনলে বলো। টিউবওয়েল বসাতে যত খরচ হবে আমি দেবোশুধু মানুষটা যেন ভালো হয়, আল্লাহওয়ালা হয়, আর আমাদের জন্য মন খুলে দোয়া করে।
 
ছুটিতে বাড়ি গিয়ে আমি মাকে সব খুলে বললাম। মা এক মুহূর্ত দেরি না করে তাঁর কথাই বললেন— “তোর নুরবানু বু থেকে বেশি উপযুক্ত মানুষ এ এলাকায় আর একটাও নেই।
 
মায়ের কথা শুনে একদিন আমি তাঁর বাড়িতে গেলাম। তিনি আগের মতোই বারান্দায় একটা পাটি বিছিয়ে আমাকে বসতে দিলেন। কিছুক্ষণ গল্প করার পর সুযোগ বুঝে পুরো বিষয়টা খুলে বললাম। সব শুনে তিনি চুপ করে রইলেন। মুখে কোনো উচ্ছ্বাস নেই, কোনো লোভ নেই, বাড়তি কোনো আগ্রহও নেই। কিছুক্ষণ পরে ধীর গলায় বললেন— “ভায়া, তোর প্রস্তাবটা খুব ভালো। কিন্তু মুই তো এইডা নিবা পারিবানু
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম— “কেনে বু?”
তিনি আমাকে বাড়ির উত্তর পাশের বেড়ার কাছে নিয়ে গেলেন। সেখানে একটা টিউবওয়েল ছিল। সেটা দেখিয়ে বললেন— “মোর মাইজো বেটাটা এইডা বসেইছে। মোক কইছে, ‘তু এইডা ব্যবহার করিবুওরাও ব্যবহার করে, মোঁহোও করোঁতাইলে কেনে ফালতু আরেকডা টিউবওয়েল বসা? মোর কী দরকার? মোক না দি, অন্য কাকো দিলে বেশি ভালো হবি।
 
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কী গ্রাম, কী শহর অভাব মানুষকে কতটা নিচে নামাতে পারে, তার অজস্র নমুনা রোজই দেখি। কিন্তু অভাবের মধ্যেও কেউ কেউ নিজেদের মর্যাদাকে কতটা উঁচুতে তুলে রাখতে পারেন, সেটা সেদিন তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করেছিলাম। তাঁর সেই কথাগুলো শুনে মনে হয়েছিল, এই পৃথিবীতে এখনো কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের আত্মসম্মান ও জীবনবোধ অভাব, অনটন বা দারিদ্র্যের কাছে হেরে যায়নি কিছুক্ষণ পর, তাঁকে সালাম জানিয়ে তাঁর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। মনে হল, আমি যেন জীবনের এক গভীরতম শিক্ষা নিয়ে ফিরছি। সত্যি করে বললে, সেদিনই প্রথম খুদ্দারশব্দটার অর্থ গভীর ভাবে উপলব্ধি করেছিলাম; অভিধানের পাতা উল্টে নয়, একজন মানুষের জীবনাচার, আত্মমর্যাদাবোধ নীরব মহত্ত্বের ভেতর দিয়ে।
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
০৭ মে ২০২৬

Friday, 30 January 2026

সমীর মোলবী - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 


শীতের সকাল। ভোরের কুয়াশা তখনো মাঠের ঘাসে লেপ্টে। মেঠো পথটা শিশিরে ভিজে নরম ও মসৃণ। হাতে ছোট্ট তক্তি, বগলে কাগজে মোড়া কেতাব, মায়ের ডাকে ঘুমজড়ানো চোখ মুছতে মুছতে আমরা রওনা দিতাম মক্তবের পথেমনে হতো, যেন পড়তে নয়, কোনো এক পবিত্র যাত্রায় বের হয়েছি  

সেই সোনালী শৈশবের কথা। আমাদের কাছে পৃথিবীটা তখন ছিল খুবই ছোট, সামনের মাঠ পেরিয়ে তুলাইয়ের পাড়ে আকাশ যেন মিশে যেতো মাটিতে। আর বিশ্বাসগুলো ছিল অবিশ্বাস্য রকমের সহজ ও সরল সেই দিনগুলোতেই আরম্ভ হয় কদমডাঙ্গা মক্তবে আমার আরবি পড়তে যাওয়া। 

কদমডাঙ্গা মক্তবটা আকারে-আয়তনে খুব একটা বড় ছিল নাটিনের চাল, মাটির মেঝে, দেয়ালে সময়ের জমে থাকা দাগ। তবে বহু পুরনো মাটির সেই ছোট্ট ঘরটার অন্দরে খুলে যেত অন্য এক দুনিয়া। ‘আলিফবাতা’র প্রথম ধ্বনি, ‘কাফলাম’-এর ভারী উচ্চারণ, আর কেতাব খুললেই এক ধরনের গম্ভীর নীরবতা নেমে আসত পুরো কামরা জুড়ে; সব মিলিয়ে মনে হতো, অক্ষরগুলো শুধু পড়বার জন্য নয়, হৃদয়ের গভীরে গেঁথে নেওয়ার জন্যই এসেছে।

মক্তবে আমাদের দু’জন শিক্ষক ছিলেনএকজনের নাম সমিরুদ্দীন আহমেদ, সম্পর্কে কাকু হবেন। দশ মুখে ‘সমীর মোলবী’ নামেই অধিক পরিচিত। খুবই সাদাসিধে ও সরল স্বভাবের একজন মানুষ। কথার চেয়ে আমলে অধিক বিশ্বাসী ছিলেনমক্তব আর ইমামতির সামান্য আয়ের উপর ভর করেই সারাটা জীবন পার করে দিয়েছেনকখনো কোনো অভিযোগ করেননি, কোনো আক্ষেপ তাঁর চোখেমুখে আমি অন্তত দেখিনি। যতদূর শুনেছি, অভাবের দরুন তিনি বেশি দূর পড়াশোনার সুযোগ পাননি; ওই তিরমিজি বা নাসায়ী পর্যন্ত পড়েছিলেন। তাই সময় ও অবস্থার পরিবর্তনের ফলে কিছু বিষয়ে আমাদের প্রজন্মের ছেলেপুলেদের সঙ্গে তাঁর ভাবনার অমিল ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই মতপার্থক্য নিয়ে আমার সঙ্গে কোনোদিন কোনো তর্ক-বিতর্ক তো দূরের কথা, একটিবারও সে বিষয়ে কথা বলেননি; বলা ভালো, কোন আলাপআলোচনাতেই জাননিযেন তাঁর কাছে সম্পর্কটাই ছিল মুখ্য, মতের ফারাক নয়।

চাকরি পাওয়ার পর একদিন খুব সাধ করে তাঁর কাছে গিয়েছিলাম। হাতে ছিল ছোট্ট একটা উপহার, আমরা যাকে হাদিয়া বলি আরকিবড় কিছু নয়, খুব দামীও নয়, কিন্তু ভালোবেসে কেনাউপহারটা হাতে পেয়ে তিনি যেন শিশুর মতো খুশি হয়েছিলেন। তাঁর চোখেমুখে তখন যে প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়েছিল, তাতে মনে হয়েছিলআমি যেন তাঁর হাতে কোনো অমূল্য উপহার তুলে দিয়েছি।

মাঝে তুলাই দিয়ে বহু জল গড়িয়ে গেছে। বার্ধক্য ও বয়সের ভারে তিনি তখন কর্মহীন। নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে জরাজীর্ণ অবস্থাখবর পেয়ে একদিন দেখতে গেলামতখন তিনি প্রায় শয্যাশায়ী। দোরমার বেড়া দেওয়া ঘর, চাপা টিনের ছাউনি, বারান্দায় মাদুরের উপর বিছানা পাতা, তাতে শুয়ে আছেন। শরীর ভেঙেছে, চোখ দুটো আরও ভেতরে ঢুকে গেছে, মুখমণ্ডলও বেশ মলিন ও বিবর্ণ; কিন্তু মনটা আগের মতোই উচ্ছ্বল ও স্নেহে ভরা। আমাকে দেখেই নিজ স্ত্রীকে ডেকে বললেন,

—“হয় মখলুসুরের মা, আয় দেখি যা, মোর বাপ আইছে মোক দেখিবা, কত বড় মানুষ হইছে, তাও মোক ভুলেইনি। কুন্‌ কালে মুই ওক ‘আলিফ-বে-তে-সে’ পড়েইছু, এখনো মোর কথা মনে থুইছে 

কথাগুলো শুনে খানিকটা লজ্জা পেলাম, চোখ দু’টো আপনা থেকেই মাটিতে নেমে গেল। মনে হল, তিনি যেন আমাকে নয়, আমার শৈশবকে বুকে টেনে নিচ্ছেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেনসেই চেনা স্পর্শ, সেই মমতাময় পরশতারপর অত্যন্ত ক্ষীণ কণ্ঠে দুয়া করলেন,

—“আরও বড় মানুষ হো বা। আল্লাহ তোর ভালো করোউক। তোর বাপ খুব ভালো মানুষ আছোলো, তোর বাপের নামটা থুইস…”

কথার ফাঁকে ফাঁকে আরও অনেক কথা বললেনজীবনের কথা, মানুষ হয়ে ওঠার কথা, শিকড়কে ভুলে না যাওয়ার কথা। মক্তবের কথা। অতীতের কথা। আমার শৈশবের কথা। ফেরার তাড়া ছিল আমার, তাই সময় বেশি কাটাতে পারিনি। বিদায়ের মুহূর্তে ঘূর্ণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি, এই দেখাই হবে শেষ দেখা। নীরবে ফিরে এসেছিলাম, বুকের ভেতর এক অজানা ভার নিয়ে।

কোলকাতায় ফিরে ক’সপ্তাহ বাদে, একদিন সন্ধ্যায় মা’কে ফোন করেছি। ভালোমন্দ জিজ্ঞাসার পর, বড়দা মা’র থেকে ফোনটা নিয়ে বললেন—

একটা খবর শুনিছি, সমীর বেটা গত কাইল মারা গেইছে। ভালোই হইছে, এক্কেবারি বিছানত পড়ি গেইছল। বিছানতে পায়খানা, বিছানতে পেচ্ছাব, খুব কষ্ট হছলো, আল্লাহ্‌ নিগেইছে ভালোই কইছে...

দাদা আরও কতকিছু বলছিলেন, তা আমার কানে ঢুকলেও মগজ অবধি পৌঁছাচ্ছিল না। আমি মুহূর্তেই পৌঁছে গেছিলাম আমার শৈশবে। শীতের সকাল মক্তবের বারান্দায় আমরা সারিবদ্ধ ভাবে বসে সমীর মোলবী একটা ধূসর বর্ণের আলোয়ান গায়ে জড়িয়ে উবু হয়ে বসে আছেন। আমাদেরকে একে একে ডাকছেন। আর আমরা গিয়ে পড়া শুনিয়ে আসছি। দেখতে দেখতে বেলা গড়িয়ে গেছে। স্কুলের সময়ও হয়ে এসেছেদ্রুত বাড়ি ফিরতে হবে, গোসলগাও করে, চারটা ভাত-পন্তা খেয়ে স্কুলে যেতে হবে। সমীর মোলবী হাত নেড়ে ছুটি ঘোষণা করলেন। আমরা লাফিয়ে উঠে ছুটতে ছুটতে সমস্বরে চিৎকার করে উঠলাম—আস্‌-সা-লা-মো-আ-লা-ই-কু-ম...  

আজও যখন কাজকর্মের ফাঁকে বা সামান্য অবসরে কুরআন তেলাওয়াত করতে বসি, মাঝেমধ্যেই আপনা থেকেই মনে পড়ে যায় সেই সুরেলা কণ্ঠ। তাঁর উচ্চারণে খানিকটা ঢিলেমি থাকলেও আন্তরিকতা ছিল একশ ভাগ। আরও মনে পড়ে সেই আখেরি মোলাকাতের কথাআর মনে হয়সেদিন আমি শুধু একজন হুজুরের কাছ থেকে নয়, শৈশবের এক নির্ভেজাল আশ্রয় থেকেও বিদায় নিয়েছিলাম। মাথায় রাখা তাঁর সেই উষ্ণ হাত, সেই নিঃস্বার্থ দোয়া আজও আমার পথচলার গোপন পাথেয় হয়ে আছে। আজও দেশের বাড়িতে গেলে, যখন ফিদ্দুর দোকানের চালায় বসে থাকি, মনে হয়ঈষৎ ন্যুব্জ শরীরটা একটা জীর্ণ আদল গায়ে জড়িয়ে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলেছে কদমডাঙ্গা মক্তবের পথে। শুভ্রকেশে ভরা মাথাটা পায়ের ছন্দে দুলে দুলে উঠছে, আর ভোরের গাঢ় কুয়াশার ভেতরে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে 

১৫ জানুয়ারি ২০২৬

হেস্টিংস, কোলকাতা

Monday, 9 May 2022

আব্দুল মাতিন ওয়াসিমঃ দ্বেষ ও বুল্ডোজারের দেশে



দ্বেষ ও বুল্ডোজারের দেশে  
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
 
আনন্দ ছিল, ছিল অশ্রু
দুচোখে ছিল হাজারো স্বপ্ন
ঠোঁটের ডগায় ছিল আর্তনাদের ফিরিস্তি
একটা খেলনা গাড়িও ছিল
দু’-পাঁচ টাকার কয়েনে
ঠনঠন করে উঠতো টিনের বাক্সটা
আধশোয়া করে রাখা ছিল হাঁড়িপাতিলগুলো
রান্নাঘরের সেঁতসেঁতে মেঝেতে
ঘরের এক কোণে ইষ বাঁকা হয়ে
দাঁড়িয়ে ছিল এক পা ভাঙ্গা চেয়ারটা
আর ছিল একখানা সেন আমলের টেবিল
তার উপর রাখা ছিল কুরআন মজিদ
একটা কাঠের রেহেল, দাদাজানের ছেঁড়া তসবিহ
আর নানিমা ভাঙ্গা চশমা
ওই ঘরে কটা জীবন্ত লাশ ছিল
ওই ঘরটাই ছিল মা-বাবার সারা জীবনের উপার্জন
বুল্ডোজার ও নীরবতার আঘাতে গুড়িয়ে যাওয়া
এই জীর্ণ বাড়িটাই ছিল আমার সবকিছু
এই যে ধ্বংসস্তূপ, থরে থরে পড়ে ভাঙ্গা চেলাকাঠ
এর নীচে, বহু নীচে একখানা দেশ আছে
তোমার-আমার দেশ!
 
কোলকাতা- ৭০০০৩৯
২১-০৪-২০২২