Pages

Wednesday, 28 October 2026

দাদু - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 
কলেজের কাজে সেদিন ছাত্রীদের নিয়ে পার্শ্ববর্তী একটি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। কাজের ফাঁকে হাসপাতালের এক পাশে বসে থাকা এক বৃদ্ধের দিকে হঠাৎ চোখ আটকে গেল। কোলে ছোট্ট নাতি। বৃদ্ধের হাতে কয়েকটা বিস্কুট। পরম মমতায় একটি বিস্কুট ভেঙে নাতির মুখে তুলে দিচ্ছেন তিনি। নাতিও কম যায় না। নিজের ছোট্ট হাত দিয়ে বিস্কুটের খানিকটা ভেঙে দাদুর মুখের সামনে ধরছে। দাদু মুখ বাড়িয়ে নাতির দেওয়া সেই টুকরোটা খেয়ে নিচ্ছেন। তারপর দু’জনের মুখে হাসি। কী আশ্চর্য এক দৃশ্য! কয়েক টুকরো বিস্কুটের মধ্যে দিয়ে আদানপ্রদান হচ্ছে নিখাদ ভালোবাসা।
 
বৃদ্ধের কোলে নাতির নিশ্চিন্ত আশ্রয়, নাতির ছোট্ট হাতে দাদুর মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চেষ্টা, আর দু’জনের চোখেমুখে ছড়িয়ে থাকা অনাবিল আনন্দ—সব মিলিয়ে দৃশ্যটা আমার বুকের কোথায় যেন আলতো করে নাড়া দিল। কত সাধারণ একটা মুহূর্ত, অথচ তার মধ্যে কী গভীর মায়া! মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ বুঝি এমন কিছু মুহূর্তের কাছে তুচ্ছ।
 
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলাম। তারপর কখন যে হাসপাতালের সেই দৃশ্য পেরিয়ে আমার মন ফিরে গেল বহু বছর আগের আমাদের গ্রামে, টেরই পেলাম না। চোখের সামনে ভেসে উঠল আমাদের বাড়ির উঠোন, চেনা মেঠোপথ, মাদ্‌রাসা মোড়ের দোকান, আর একজন মানুষের মুখ—আমার বাবা। আমার সন্তানদের দাদু।
 
দাদু-নাতির সম্পর্কটা বড় অদ্ভুত! সেখানে ভালোবাসা প্রকাশের জন্য খুব বেশি আয়োজন লাগে না। একটা বিস্কুটের অর্ধেক, একমুঠো মুড়ি, চায়ের দোকানে পাশাপাশি বসে থাকা, কিংবা হাত ধরে পাড়ার পথ ধরে একটু ঘুরে আসা—এই সামান্য জিনিসগুলোর মধ্যেই তৈরি হয় এমন এক মায়ার জগৎ, যার গভীরতা মাপার সাধ্য কারও নেই। সেই জগতে খুনসুটি আছে, অভিমান আছে, ছোট্টখাটো রাগারাগি আছে; আবার মুহূর্তেই সব ভুলে গিয়ে একে অপরের গায়ে গা লাগিয়ে বসে থাকার পরম শান্তিও আছে। দাদু আর নাতির মধ্যে যেন একটা নিজস্ব ভাষা তৈরি হয়, যে ভাষার ব্যাকরণ ভালোবাসা, আর যার প্রতিটি শব্দের অর্থ—আপন।
 
আমাদের বাড়ির প্রথম সন্তান পারভেজ। আমার বাবার চোখের মণি, তাঁর প্রাণের ধন। নিজের জন্য একটা বিস্কুট আনলেও সেটাকে অর্ধেক ভেঙে নাতির হাতে তুলে দেওয়া ছিল তাঁর স্বভাব। বিস্কুটটা ছোট হোক কিংবা বড়, নাতির ভাগটা ঠিকই থাকত। বরং অনেক সময় মনে হতো, বিস্কুটটা যেন কেনাই হয়েছে নাতির জন্য; দাদু কেবল তার ভাগটুকুতে একটু ভাগ বসান!
 
জানুর দোকান হোক কিংবা পচুর দোকান—সকাল-বিকেলের চায়ের সঙ্গী ছিল সেই নাতি। বাবার পায়ের শব্দ পেলেই পারভেজের যেন আর তর সইত না। দাদু যেদিকে যেতেন, সেদিকেই তার ছুটে চলা। দাদু দোকানে বসলে সেও পাশে বসত, দাদু চা খেলে সে বিস্কুটে ভাগ বসাত। হয়তো তখন তার বয়স এতই কম যে এই সম্পর্কের গভীরতা বোঝার কথা নয়। কিন্তু শিশুরা কি ভালোবাসার হিসাব বোঝে? তারা কেবল অনুভব করে, কে তাদের কাছে থাকলে পৃথিবীটা নিরাপদ হয়ে ওঠে, কার কোলে মাথা রাখলে সমস্ত ভয় কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। পারভেজের কাছে সেই মানুষটি ছিলেন তার দাদু।
 
তারও প্রায় তিন বছর পর আমাদের ঘরে এল এক কন্যাসন্তান—তাহিনা। বাবা আদর করে ডাকতেন, ‘কালঠি বু’, অর্থাৎ আমার ছোট পিসি। তাহিনাকেও তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন। এবার ছবিটা একটু বদলে গেল। বাবার দু’টো হাতের দু’টো আঙুল আঁকড়ে ধরে নাতি-নাতনি দু’জন তাঁর সঙ্গে পাড়া ঘুরে বেড়াত। কখনও জানুর দোকান, কখনও পচুর দোকান, কখনও বা গ্রামের এদিক-ওদিক। চা-বিস্কুটের আসরে দু’জনেরই ভাগ থাকত। দাদুর মুখে গল্প, নাতি-নাতনির মুখে হাসি—এভাবেই সাধারণ দিনের মধ্যে অসাধারণ কিছু মুহূর্ত জমা হতে থাকত।
 
বাবা হয়তো বুঝতেই পারেননি, তাঁর হাতের আঙুল আঁকড়ে ধরে হাঁটা সেই ছোট্ট দু’টো প্রাণের কাছে তিনি কত বড় এক পৃথিবী। নাতি-নাতনিরাও তখন জানত না, একদিন এই হাতটাই আর ছুঁতে পারবে না তারা; এই আঙুল ধরে হাঁটার স্মৃতিই একসময় হয়ে উঠবে জীবনের অমূল্য সম্পদ।
 
আরও প্রায় পাঁচ-ছয় বছর পর ঘরে এল আরেক কন্যা—সাদিয়া। তত দিনে বাবার শরীর আর আগের মতো ছিল না। হাঁটাচলা করতে কষ্ট হতো, শরীর অনেকটাই ভেঙে পড়েছিল। আগের মতো নাতি-নাতনিদের নিয়ে পাড়া ঘুরে বেড়ানোর শক্তি আর তাঁর ছিল না। তাই চেয়ারে বসেই সাদিয়াকে কোলে নিয়ে কাটত তাঁর অনেকটা সময়।
 
শরীর দুর্বল হয়েছিল, কিন্তু ভালোবাসার হাত দু’টো তখনও ক্লান্ত হয়নি। নিজের ভাগের মুড়ি কিংবা বিস্কুট ভেঙে সাদিয়ার গালে পুরে দেওয়া যেন তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সাদিয়াও ছিল দাদু-অন্তপ্রাণ। দাদুর কোল, দাদুর বুক, দাদুর হাত—ওর ছোট্ট পৃথিবী যেন এই কয়েকটি আশ্রয়কে ঘিরেই আবর্তিত হতো। চেয়ারে বসা দাদুর কাছে গিয়ে বসা, হাতল ধরে দাদুর গা ঘেঁষে থাকা—এসবের মধ্যেই ওর কত আনন্দ ছিল!
 
সাদিয়া যখন একটু একটু করে বড় হতে লাগল, তখন ঘরটাও যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল। কখনও সে বসতে শিখছে, কখনও হামাগুড়ি দিচ্ছে, কখনও টলমল পায়ে হাঁটছে। তারপর একদিন সেই টলমল পা-ই ছুটতে শিখল। দৌড়ে এসে দাদুর চেয়ারের হাতলে বসে পড়ত, কখনও দোল খেত, কখনও তাঁর গায়ে হেলান দিত। বাবা হয়তো তাকে সামলাতে গিয়ে একটু বিরক্তির ভান করতেন, কিন্তু সেই বিরক্তির আড়ালে যে কী গভীর প্রশ্রয় লুকিয়ে থাকত, তা বুঝতে কারও অসুবিধা হতো না।
 
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া একজন মানুষ আর তার কোলে আশ্রয় নেওয়া এক ছোট্ট শিশু—দু’জনের শরীরের শক্তি এক ছিল না, কিন্তু ভালোবাসার টানে তাদের দূরত্ব ছিল না বললেই চলে। দাদুর কোলে সাদিয়া যেমন নিশ্চিন্ত ছিল, তেমনই সাদিয়ার উপস্থিতিতে বাবার ক্লান্ত দিনগুলোও যেন একটু আলো পেত।
 
এরই মধ্যে আরেকটা সুখবর এল—ঘরে আরও এক নতুন অতিথি আসবে। খবরটা শুনে বাবা খুব খুশি হয়েছিলেন। নতুন নাতি কিংবা নাতনিকে কোলে নেওয়ার স্বপ্ন নিশ্চয়ই তাঁর মনেও দানা বেঁধেছিল। হয়তো মনে মনে ভেবেছিলেন, আবার একটা ছোট্ট প্রাণ তাঁর আঙুল আঁকড়ে ধরবে, আবার তাঁর ভাগের বিস্কুটে কেউ ভাগ বসাবে, আবার ঘরের মধ্যে শিশুর হাসি ছড়িয়ে পড়বে।
 
কিন্তু জীবন তো সব স্বপ্নকে পূর্ণ হওয়ার অবকাশ দেয় না। দিন গড়াতে থাকল। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাবার শরীরও ক্রমশ ভেঙে পড়তে লাগল। শেষ পর্যন্ত এক ডিসেম্বরের সকালে, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই, নিঃশব্দে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। ঘরের পরিচিত মানুষটি হঠাৎ করেই অনুপস্থিত হয়ে গেলেন। যে মানুষটিকে ঘিরে বাড়ির এতগুলো সকাল-বিকেল কাটত, তাঁর চলে যাওয়ার পর সেই বাড়িতেই যেন কোথাও একটা নীরবতা স্থায়ীভাবে বসে গেল। বাবার চলে যাওয়ার প্রায় তিন মাস পর পৃথিবীর আলো দেখল সেই প্রতীক্ষিত অতিথি—ফাওজান।
 
ফাওজান কখনও তার দাদুকে দেখেনি। দাদুর কোলে চড়ার সৌভাগ্য তার হয়নি, দাদুর হাত ধরে পাড়ায় ঘোরার অভিজ্ঞতা তার নেই। দাদুর ভাগের বিস্কুটে ভাগ বসানো, চায়ের দোকানে পাশে বসে থাকা কিংবা নিজের ছোট্ট হাতে বিস্কুট ভেঙে দাদুর মুখে তুলে দেওয়ার কোনো স্মৃতিও তার জীবনে নেই। তার কাছে ‘দাদু’ কেবল একটি শব্দ—বড়দের মুখে শোনা, গল্পের মধ্যে পাওয়া একটি সম্পর্কের নাম।
 
আমার জীবনও বাবাকে ছাড়াই চলতে থাকল। দিন পেরোল, সপ্তাহ পেরোল, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। মানুষ বোধ হয় শোকের সঙ্গেও একসময় বসবাস করতে শিখে যায়। কিন্তু ভুলে যেতে পারে না। প্রতিদিনের কাজকর্মের ভিড়ে প্রিয়জনের অনুপস্থিতি কখনও চাপা পড়ে থাকে, আবার কোনো একটি দৃশ্য, কোনো একটি গন্ধ, কোনো একটি সামান্য ঘটনা হঠাৎ সেই শূন্যতার দরজাটা খুলে দেয়। তখন মনে হয়, এত বছর পরেও মানুষটা বুঝি এই তো পাশের ঘরে আছেন, একটু পরেই ডাক দেবেন।
 
বাবা চলে যাওয়ার প্রায় এগারো বছর পর জন্মাল আমার মেয়ে—সাবা। ‘সাবা’ শব্দের অর্থ সকালের মৃদুমন্দ বাতাস। নামটি বাবার খুব পছন্দের হতো বলেই আমার ধারণা। বাবা যখন সুস্থ ছিলেন, ফজরের নামাজ পড়ে খালি পায়ে মেঠোপথ ধরে হাঁটতে বেরিয়ে পড়তেন। পূব দিক থেকে বয়ে আসা ভোরের বাতাসে মন ভিজিয়ে নিতেন। ভোরের স্নিগ্ধতা, গ্রামের পথ, শিশিরভেজা মাটি আর বাতাসের কোমল স্পর্শ—এসবের সঙ্গে তাঁর ছিল এক নিবিড় সম্পর্ক।
 
কখনও কখনও মনে হয়, সাবা যদি বাবার জীবদ্দশায় জন্মাত, তবে তিনি কি ওকে কোলে নিয়ে সেই ভোরের বাতাসে হাঁটতে বেরোতেন? ওর ছোট্ট হাতটা নিজের আঙুলের মধ্যে রেখে মেঠোপথ ধরে এগিয়ে যেতেন? হয়তো ওর গালে হাত বুলিয়ে আদরের কোনো নাম দিতেন। হয়তো নিজের ভাগের বিস্কুটটা ভেঙে ওর মুখে তুলে দিয়ে অপেক্ষা করতেন, কখন ও-ও একটুখানি ভেঙে দাদুর মুখে তুলে দেবে।
 
এসব ভাবনা বাস্তব নয়, তবু মন বারবার সেই অসম্ভব দৃশ্যগুলোই কল্পনা করে। যে মানুষটি নেই, তাকে ঘিরেই কখনও কখনও সবচেয়ে বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে আমাদের কল্পনার পৃথিবী।
 
সাবার জন্মের প্রায় আড়াই বছর পর আমাদের বাড়িতে এল সর্বকনিষ্ঠ সদস্য—সাওবান। ঘর আবার শিশুর কোলাহলে ভরে উঠল। ছোট্ট পায়ে দৌড়ঝাঁপ, আধো আধো কথা, আবদার, কান্না, হাসি—সব মিলিয়ে সংসার তার নিজস্ব ছন্দে চলতে থাকল। কিন্তু এই নতুন প্রাণের কোলাহলের মধ্যেও কোথাও একটা অপূর্ণতা রয়ে গেল। ঘরে শিশু আছে, অথচ তাদের দাদু নেই। তাদের মাথায় স্নেহের হাত রাখার মানুষটি নেই। তাদের দুষ্টুমিতে মিথ্যে রাগ দেখিয়ে পরক্ষণেই বুকে টেনে নেওয়ার মানুষটি নেই।
 
আমাদের পরিবারের প্রথম তিন সন্তান—পারভেজ, তাহিনা আর সাদিয়া—দাদুকে পেয়েছে। দাদুর কোলে-কাঁধে চড়েছে, তাঁর হাত ধরে পাড়া ঘুরেছে, জানুর দোকান আর পচুর দোকানে গিয়ে চা-বিস্কুটের আসরে ভাগ বসিয়েছে। দাদুর ভাগের মুড়ি, বিস্কুট, এমনকি ভাতেও তাদের অধিকার ছিল। তারা জানে, দাদুর কোলে মাথা রাখলে কেমন লাগে, দাদুর হাতের স্পর্শ কতটা নিশ্চিন্তির, আর দাদুর মুখে নিজের জন্য আদরের ডাক শুনতে কেমন আনন্দ হয়।
 
কিন্তু পরের তিনজন—ফাওজান, সাবা আর সাওবান—তাদের কারও কপালে সেই সৌভাগ্য জোটেনি। তারা দাদুকে দেখেনি, তাঁর কণ্ঠস্বর শোনেনি, তাঁর হাতের স্পর্শ পায়নি। দাদু শব্দটা তারা শিখেছে আর পাঁচটা শব্দের মতো করেই। তাদের কাছে দাদু এমন এক মানুষ, যাঁর কোনো ছবি হয়তো আছে, কিছু গল্প আছে, অন্যদের স্মৃতিতে যাঁর উপস্থিতি আছে; কিন্তু তাদের নিজের জীবনে যাঁর কোনো প্রত্যক্ষ অস্তিত্ব নেই। তাদের দাদু বেঁচে আছেন গল্পে, পুরোনো স্মৃতিতে, পরিবারের কথোপকথনে, আর আমার বুকের গভীরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসে।
 
মাঝেমধ্যে এই কথাটা ভাবলে বুকের মধ্যে কেমন একটা হাহাকার ওঠে। একই পরিবারের ছয়টি শিশুর মধ্যে তিনজন দাদুর আদর পেয়েছে, আর বাকি তিনজন সেই আদরের কথা কেবল শুনেই বড় হচ্ছে। প্রথম তিনজনের স্মৃতিতে দাদু রক্তমাংসের মানুষ; পরের তিনজনের কাছে তিনি স্মৃতিরও আগের এক অনুপস্থিতি। তাঁরা জানে, তাদেরও একজন দাদু ছিলেন; কিন্তু সেই দাদু কেমন করে হাসতেন, কীভাবে কোলে তুলে নিতেন, রাগ করলে কী বলে মানাতেন—এসব জানার কোনো উপায় তাদের নেই।
 
আর আমার? আমি তো জানি, সেই মানুষটি কেমন ছিলেন। তাঁর ভালোবাসার ধরন জানি, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে তাঁর মধুর সম্পর্কের গল্পগুলো জানি। তাই হয়তো আমার আক্ষেপটা আরও বেশি। আমি জানি, আমার সন্তানদের জন্য তিনি কতটা আদরের মানুষ হতে পারতেন। অথচ সেই সম্ভাবনার পৃথিবীটুকু তাঁদের জন্য চিরকাল বন্ধ হয়ে রইল।
 
সাবা ইদানীং খুব প্রশ্ন করতে শিখেছে। এই বয়সে বাচ্চারা যেমন হয়—যা দেখে, যা শোনে, যা বোঝে না, সবকিছুর উত্তর জানতে চায়। মাঝেমধ্যে হঠাৎ এসে জিজ্ঞেস করে,
—আব্বা, তোমার বাবা কোথায়?
আমি কখনও সহজ করে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু ওর প্রশ্ন থামে না।
—তোমার বাবা নেই, না?
কখনও আবার নিজেই নিজের মতো করে একটা উত্তর খুঁজে নেয়—
—তোমার বাবা কি অসুস্থ? তোমার বাবা মারা গেছে?
তারপর একদিন এমন কথাও বলে বসে, যা শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে ওঠে—
—আমি তোমার বাবাকে ওষুধ দেব। তাহলে তোমার বাবা ভালো হয়ে যাবে?
 
কী অদ্ভুত শিশুমন! মৃত্যু যে একবার কাউকে নিয়ে গেলে তাকে আর ফিরিয়ে আনা যায় না, তা সে জানে না। তার কাছে অসুস্থতা মানেই ওষুধ, আর ওষুধ মানেই সুস্থ হয়ে ওঠা। তাই সে ভাবে, দাদু অসুস্থ হয়ে কোথাও পড়ে আছেন হয়তো; ওষুধ দিলেই ভালো হয়ে যাবেন, আবার ফিরে আসবেন। আবার আব্বার কাছে আসবেন। হয়তো কোলে নেবেন তাকেও।
 
ওর এই কথাগুলো শুনে আমি কী বলব বুঝে উঠতে পারি না। ওর নিষ্পাপ বিশ্বাসটুকু ভেঙে দিতে ইচ্ছে করে না। আবার মিথ্যে আশ্বাসও দিতে পারি না। শুধু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে হয়, ইশ্! সত্যিই যদি কোনো ওষুধ থাকত! এমন কোনো ওষুধ, যা খাইয়ে মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনা যায়; এমন কোনো চিকিৎসা, যা সময়ের ব্যবধান মুছে দিয়ে একটি শিশুর সঙ্গে তার না-দেখা দাদুর পরিচয় করিয়ে দিতে পারে!
 
সাবার এই প্রশ্নগুলো আমার কাছে নিছক কৌতূহল নয়। এগুলো ভালোবাসার এক নিষ্পাপ প্রকাশ—না-দেখা একজন মানুষকে আপন করে নেওয়ার সহজাত আকুলতা। সে তার আব্বাকে ভালোবাসে, তাই আব্বার বাবাকেও ভালোবাসতে চায়। সে মানুষটিকে কোনো দিন দেখেনি; তাঁর সঙ্গে তার কোনো স্মৃতি নেই। তবু আব্বার জীবনের সেই মানুষটিকে সে নিজের মতো করে আপন করে নিতে চায়। শিশুমনের এই ভালোবাসা যেন রক্তের সম্পর্কেরও আগে পৌঁছে যায়—স্মৃতির সীমানা পেরিয়ে, সময়ের ব্যবধান অতিক্রম করে।
 
ওর প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমি ক্রমশ হারিয়ে যাই অতীতের পথে। ফিরে যাই জানুর দোকানে, বা পচুর দোকানের সেই চেনা চালায়। মনে পড়ে চায়ের ধোঁয়া, বিস্কুটের গন্ধ, বাবার পাশে বসে থাকা পারভেজ, তাঁর আঙুল ধরে হাঁটা তাহিনা, চেয়ারের হাতলে বসে দোল খাওয়া সাদিয়া। চোখের সামনে ভেসে ওঠে শাটিমারী, আঙ্গারিবন, উদয়পুর হাটের পথ। মনে হয়, দাদুর হাত ধরে নাতি-নাতনিরা এখনও বুঝি হেঁটে চলেছে সেই পথ ধরে। সময় সেখানে থমকে আছে; বাবার হাতের আঙুলগুলো এখনও ছোট ছোট হাতের মুঠোয় ধরা।
 
কিন্তু কল্পনার সেই দৃশ্য যতই স্পষ্ট হোক, বাস্তবের কাছে ফিরে আসতেই হয়। জানি, বাবা আর ফিরবেন না। জানি, সাবা কিংবা সাওবানের ছোট্ট হাত তাঁর হাত ছুঁতে পারবে না। তারা কখনও দাদুর কোলে বসে বিস্কুট খেতে খেতে হাসবে না, তাঁর মুখে আদরের ডাক শুনবে না। আর আমি কোনো দিন তাদের নিয়ে বাবার কাছে গিয়ে বলতে পারব না—‘দেখো বাবা, এরা তোমার নাতি-নাতনি। তোমার বিস্কুটে এদেরও একটু ভাগ দাও।’ এই না-পারার কষ্টটুকুই বোধ হয় সবচেয়ে গভীর।
 
আজও যখন বাবার কথা মনে পড়ে, তখন তাঁর জন্য কেবল চোখ ভিজে ওঠে না; মনে হয়, তাঁর কাছে আমার সন্তানদেরও কিছু পাওনা রয়ে গেল। যে আদর তিনি পারভেজ, তাহিনা আর সাদিয়াকে উজাড় করে দিয়েছিলেন, তার কিছুটা যদি ফাওজান, সাবা আর সাওবানও পেত! তাঁর বিস্কুটে ওরাও যদি একদিন ভাগ বসাতে পারত! হয়তো সেই সামান্য বিস্কুটের টুকরোর মধ্যেই ওরা খুঁজে পেত এমন এক ভালোবাসা, যার কোনো বিকল্প পৃথিবীতে নেই।
 
হাসপাতালের সেই বৃদ্ধ হয়তো এখনও তাঁর নাতিকে নিয়ে কোথাও বসে বিস্কুট ভাগ করে খাচ্ছেন। আর আমার বাবার বিস্কুটটুকু পড়ে আছে স্মৃতির থালায়—অর্ধেক ভাঙা, অর্ধেক খাওয়া, অথচ তার মায়া আজও অক্ষত। আমার সন্তানরা কোনো দিন সেই বিস্কুটের স্বাদ পাবে না। তারা শুধু আমার মুখে দাদুর গল্প শুনবে। আর আমি গল্প বলতে বলতে হয়তো একসময় থেমে যাব—কারণ, কিছু ভালোবাসার কথা বলতে গেলে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে; কিছু অনুপস্থিতির কথা বোঝাতে গেলে শব্দ ফুরিয়ে যায়। তখন হয়তো সাবা আবার জিজ্ঞেস করবে, ‘আব্বা, তোমার বাবা কোথায়?’
 
আমি তার মাথায় হাত রেখে আকাশের দিকে তাকাব। মনে মনে বলব, বাবা, তুমি যেখানেই থাকো, তোমার নাতি-নাতনিদের জন্য একটু দোয়া কোরো। ওরা তোমাকে দেখেনি, তোমার কোলে ওঠেনি, তোমার হাতের স্পর্শ পায়নি—তবু ওদের জীবনের গল্পে তুমি আছ। আমার স্মৃতিতে তুমি আছ। আমার প্রতিটি আক্ষেপে, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে তুমি আছ। আর আমার বুকের এক নিভৃত কোণে আজও একটি ছোট্ট শিশু অপেক্ষা করে আছে—যে শিশুটি তার বাবাকে হারিয়েছে, অথচ নিজের সন্তানদের দাদুকে একবার দেখানোর আকাঙ্ক্ষা থেকে কোনো দিন মুক্ত হতে পারেনি।
 
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মোমিনপুর, কোলকাতা 

Saturday, 10 October 2026

শৈশবের কুয়ো - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



দুপুরের রোদ একটু নরম হয়ে এসেছে। উঠোনের এক পাশে কুয়ো। কুয়োর পাড়ে রাখা লোহার বালতি, তার সঙ্গে বাঁধা মোটা দড়ি। চারপাশে এক ধরনের চেনা নীরবতা। মাঝে মাঝে ভেসে আসছে গরুর ঘণ্টার শব্দ, দূরে কোথাও লোকজনের হাঁকডাক, আর কুয়োর ভেতর থেকে উঠে আসছে ঠান্ডা জলের সোঁদা গন্ধ।
 
হঠাৎ মা কুয়োর দিকে এগিয়ে গেলেন। আমি তখন কাছেই কোথাও খেলছিলাম, বা কিছু একটা করছিলাম—সব ছেড়ে ছুটে গেলাম—“মা, জল তুলে দেব?” মা হয়তো কিছু বললেন, হয়তো বা বললেন, “থাক, আমি তুলছি।” কিন্তু ততক্ষণে আমার হাত বালতির দড়িতে। বালতিটা কুয়োর কালো মুখ দিয়ে নামছে। দড়িটা হাতের তালুর উপর দিয়ে পিছলে যাচ্ছে। নিচে তাকালাম, প্রথমে কিছুই দেখা গেল না। একটু পরে জলের উপর একটা ছোট্ট আলো কাঁপতে লাগলো। তারপর— ছপাৎ!
 
বালতিটা জলে ডুবে গেল। আমি দড়ি টেনে বুঝতে চেষ্টা করলাম, বালতি ভরেছে কি না। একটু পরেই দড়িটা ভারী হয়ে আসল। এবার আমার আসল কাজ শুরু। দু’ হাতে দড়ি ধরে টানছি। একবার। দু’বার। তিনবার। ধীরে ধীরে বালতি উপরে উঠছে। আর আমার হাত-পা যেন তার সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করছে। ছোট্ট শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দড়ি টানছি। কখনো দড়ি ধরে ঝুলে পড়ছি। পা মাটি থেকে উপরে উঠে যাচ্ছে, শরীরটা দোল খেতে থাকছে। তবু দড়ি ছাড়ছি না। মনে হচ্ছে, আমি যেন একাই একটা বিশাল ভারী জিনিস পৃথিবীর অন্তঃপুর থেকে টেনে তুলে আনছি। বালতি একটু একটু করে উপরে আসছে। আর তখন আমার চোখে কী আনন্দ!
 
কিন্তু সেই আনন্দেরও কখনো কখনো পরিণতি ভালো হতো না। বালতি প্রায় কুয়োর মুখের কাছে। আর একটু হলেই হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলব। ঠিক তখনই কোনোভাবে দড়িটা হাত থেকে ফসকে গেল। ছপাৎ! সব শেষ। এক মুহূর্তে বালতিটা আবার অন্ধকারের মধ্যে তলিয়ে গেল। আমি হতভম্ব হয়ে কুয়োর ভেতর তাকিয়ে আছি। নিচে শুধু কালো জল। বালতি নেই, দড়ি নেই—শুধু অন্ধকার। মনে হল, এতক্ষণ ধরে যে বালতিটাকে উপরে তুললাম, সে যেন আমাকে ফাঁকি দিয়ে আবার নিজের জগতে ফিরে গেল।
 
যতদূর মনে পড়ে, আমাদের শিশুবেলায় গ্রামেগঞ্জে জল নিয়ে লোকজনের এত বাছবিচার ছিল না। তৃষ্ণা পেলেই হল। সামনে নদী থাকলে নদীর জল, বিল থাকলে বিলের, খাল থাকলে খালের, পুকুর থাকলে পুকুরের। এমনকি ধানক্ষেতে কাজ করতে করতে ক্ষেতে জমে থাকা জলও কখনো দু হাতের আঁজলা ভরে খেয়ে নিয়েছি। তবে গ্রামের মানুষের সে-সময় পানীয় জলের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল কুয়ো।
 
আমাদের গ্রামের চারদিকে চারটা কুয়ো ছিল—উত্তর পাড়ায়, পশ্চিম পাড়ায়, বড়বাড়িয়ায় আর দক্ষিণ পাড়ায়। সকাল হলেই কুয়োর পাড়ে মানুষের আনাগোনা শুরু হয়ে যেত। কারও হাতে বালতি, কারও হাতে কলসি, কারও হাতে ঘটি। কেউ জল তুলছে রান্নার জন্য, কেউ গোসলের জন্য, কেউ গরু-ছাগলের জন্য। কেউ ওজুর জল নিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছে। কুয়োর পাড় যেন গ্রামের লোকেদের একটা ছোট্ট মিলনস্থল।
 
তাছাড়া গ্রামের গুটি কয়েক বাড়ির মতো আমাদের বাড়িতেও একটা নিজস্ব কুয়ো ছিল। আর সেই কুয়োটা ছিল আমার কাছে এক বিশাল রহস্যময় বস্তু।  কুয়োর ভেতরটা এত গভীর কেন? নিচে কতটা জল? বালতি যখন অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে যায়, তখন সেটা কোথায় যায়? জল ভরে উপরে ফিরে আসে কীভাবে?—শিশু মনে কত প্রশ্ন! আর সেই প্রশ্নের চেয়েও বড় ছিল কুয়ো থেকে নিজ হাতে জল তুলে আনার আনন্দ। আমি তক্কে তক্কে থাকতাম। মা বা বাবা কুয়োর দিকে গেলেই ছুটে যেতাম।
—“মা, তুমি সরে যাও, আমি তুলে দিচ্ছি।”
—“বাবা, তোমার জল লাগবে?”
উত্তরের অপেক্ষা করতাম না। যেন জল তোলা আমার জন্মগত দায়িত্ব।
 
কিন্তু কুয়োর সঙ্গে শুধু জল তোলার আনন্দই জড়িয়ে ছিল না; ছিল কোন কিছু হারিয়ে ফেলারও গ্লানি। কোনোদিন হাত ফসকে বালতি তলায় পড়ে যেতো। কোনোদিন গ্লাস। কখনো বাটি, কখনো মগ। একবার আমার হাত থেকে একটা চাকুও পড়ে গিয়েছিল। পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই কুয়োর পাড়ে এসে দাঁড়াত— “কীভাবে পড়ল?”, “কোন পাশে পড়েছে?”, “কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।”  
 
তারপর শুরু হতো খোঁজাখুঁজি। আমাদেরও একটা ‘কাকড়া’ ছিল—লোহার তৈরি এক অদ্ভুত যন্ত্র। দেখতে অনেকটা অঙ্কুশের মতো। চারদিকে ছোট ছোট বাঁকানো লোহার দাঁত। তার সঙ্গে বাঁধা লম্বা দড়ি। কাকড়াটা কুয়োর মধ্যে নামানো হতো। পাশ থেকে তখন লোকজনের শলাপরামর্শ— “ধীরে ধীরে”, “আরও নিচে”, “আরও একটু”, “একটু ডানে”।  
 
তারপর দড়ি ধরে সেটাকে জলের তলায় ঘোরানো হতো। আর উপস্থিত লোকজন বলাবলি করতো— “এইদিকে দাও।”, “না, আরেকটু বাঁদিকে।”, “আস্তে... আস্তে...” সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করত। হঠাৎ দড়িতে টান পড়লে মনে হতো—লেগেছে! তারপর ধীরে ধীরে দড়ি টেনে কাকড়াটা জলের উপরে তোলা হতো। যদি বালতির গায়ে তার কোনো দাঁত আটকে যায়, তাহলে যেন হারানো ধন ফিরে পাওয়া গেল। আর কুয়োর পাড়ে তখন ছোট্ট একটা উৎসবের আনন্দ।
 
তবে কাকড়া দিয়ে সবকিছু তোলা সম্ভব হতো না। তখন কুয়োর গভীরে নামতে হতো হারানো জিনিসের খোঁজে। আমাদের গ্রামেও কয়েকজন মানুষ ছিলেন, যারা জলের তলায় অনেকক্ষণ থাকতে পারতেন। তাঁরা যেন এক একজন ডুবুরি। কুয়োয় কোনো জিনিস পড়ে গেলে তাঁদের খবর দেওয়া হতো। তাঁরা এসে প্রথমে কুয়োর মুখের দিকে তাকাতেন। তারপর দড়ি কিংবা বাঁশের সাহায্যে ধীরে ধীরে নামতে শুরু করতেন। আমরা কুয়োর চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কারও চোখে ভয়। কারও চোখে কৌতূহল। আমি তো চোখের পলক ফেলতাম না।
 
লোকটা একটু একটু করে নিচে নামছেন। তারপর জলের কাছে পৌঁছে গেলেন। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর মাথাটা জলের নিচে অদৃশ্য। চারদিকে নিস্তব্ধতা। অপেক্ষা, ভয় ও কৌতূহল মিলেমিশে একাকার। সবাই মুখে বিড়বিড় করছে “আল্লাহ্‌ রহম করো, আল্লাহ্‌”। তারপর হঠাৎ জলের উপর বুদবুদ উঠতে শুরু করত। আমাদের বুকের ভেতর ধুকপুক। একটু পরেই লোকটা জলের উপর ভেসে উঠতেন। হাতে হয়তো সেই হারানো চাকু, মগ কিংবা অন্য কোনো জিনিস।
 
আমাদের চোখে তখন তিনি যেন কোনো সাধারণ মানুষ নন—একেবারে জলের তলা থেকে ফিরে আসা কোনো বীর।
এই কাজের বিনিময়ে তাঁদেরকে অনেক সময় এক-দুই কিলো চাল দেওয়া হতো। সেই চালই ছিল তাঁদের পারিশ্রমিক, তাঁদের হাদিয়া। আজকের দিনে ভাবলে অদ্ভুত লাগে, কিন্তু তখন এও ছিল গ্রামীণ জীবনের এক ধরনের পেশা।
 
আমাদের বাড়িতে তখন গরু-ছাগলের পাশাপাশি বিড়ালও ছিল অনেক। মেজদি ও ছোড়দি ভীষণ বিড়াল ভালোবাসত। তাদের কোলে নিত, খাওয়াত, গোসল করিয়ে দিত। বিড়ালগুলোও যেন বাড়ির সদস্য হয়ে উঠেছিল। সারাদিন উঠোনে তাদের ছোটাছুটি। কখনো একে অন্যকে তাড়া করছে। কখনো রোদে গা এলিয়ে শুয়ে আছে। কখনো আমাদের পায়ের কাছে এসে লেজ ঘষছে। কুয়োর পাড়টাও তাদের একটা খেলার জায়গা ছিল।
 
একদিন একটি বিড়াল হয়তো সেখানে খেলা করছিল। খেলতে খেলতে এপাশ থেকে ওপাশে লাফ দিতে গিয়ে কোনোভাবে কুয়োতে পড়ে যায়। আমরা কেউই তা টের পাইনি। বেলা গড়িয়ে যায়। তারপর বড়দা আসরের সময় ওজুর জন্য জল তুলতে এসে কুয়োর নিচে তাকিয়ে থমকে গেল—“আরে! কুয়োয় তো একটা বিড়াল!”
 
সবাই ছুটে এল। কুয়োর ভেতর তাকিয়ে দেখা গেল—জলের মধ্যে বিড়ালটি পড়ে আছে। বালতি নামিয়ে কোনোভাবে তাকে উপরে তোলা হলো। কিন্তু ততক্ষণে সে মারা গেছে। সেই মুহূর্তে কুয়োটা যেন হঠাৎ বিষণ্ণ হয়ে গেল। কারণ সেই জলই তো আমরা খাই। রান্না হয়। ওজু করি। ইমাম সাহেবকে খবর দেওয়া হলো। তিনি বিধান দেখে বললেন, বিড়ালটিকে কুয়ো থেকে তুলে ফেলতে হবে এবং চল্লিশ বালতি জল তুলে বাইরে ফেলে দিতে হবে।
 
তারপর গ্রামপঞ্চায়েতে খবর দেওয়া হলো। পঞ্চায়েতের লোকজন এলেন। কুয়োর জলে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দিলেন। কুয়োর চারপাশেও ছড়িয়ে দেওয়া হলো। তারপর যাওয়ার সময় তাঁরা বলে গেলেন, এক-দু’ দিন পর আবার জল ব্যবহার করা যাবে। দু’দিন পর আবার কুয়ো থেকে জল তোলা শুরু হলো। কিন্তু সেই জলে একটা আলাদা গন্ধ ছিল। ব্লিচিং পাউডারের তীব্র গন্ধ। জল হাতে নিলেই নাকে আসত সেই গন্ধ। তবু সেই জলই আমরা খেতাম। কারণ তখন আমাদের কাছে জল বেছে নেওয়ার এত সুযোগ ছিল না।
 
আজ এত বছর পর মনে হয়, সেই কুয়োগুলো শুধু জল ধরে রাখেনি—আমাদের শৈশবটাকেও যেন ধরে রেখেছিল। সেখানে দড়ি ছিল, বালতি ছিল, অন্ধকার ছিল, ঠান্ডা জল ছিল; আর ছিল আমাদের ছোট ছোট হাতের শক্তি পরীক্ষা, দড়ি ছুটে যাওয়ার ভয়, হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ার আনন্দ, ডুবুরি নামার উত্তেজনা, বিড়ালের জন্য মন খারাপ হয়ে যাওয়া—আরও ছিল মানুষের পরস্পরের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকার এক সরল পৃথিবী।
 
আজ আর কুয়োর পাশে দাঁড়ানোর বয়স আমাদের নেই। কুয়োর দড়ি ধরে ঝুলে পড়ার মতো ছোট্ট শরীরও নেই। তাছাড়া কুয়োগুলোও আর নেই। কোনোটা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, কোনোটা আগাছায় ঢেকে গেছে, কোনোটা জলের আধুনিক ব্যবস্থার কাছে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। নতুন ঘর বানাতে গিয়ে আমাদের কুয়োটাকে বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্মৃতির ভেতর কুয়োটা এখনও ঠিক আগের মতোই— রোদে তার পাড় গরম হচ্ছে। দড়ি ঝুলছে। বালতি নিচে নামছে। আমি ছোট্ট দু’ হাতে দড়িটা আঁকড়ে ধরে আছি। মা একটু দূরে দাঁড়িয়ে বলছেন— “আস্তে, পড়ে যাস না আবার!” আমি শুনছি না। আমার সমস্ত মনোযোগ বালতিতে। বালতি উঠছে। আরও একটু... আরও একটু... হঠাৎ দড়িটা আমার হাত থেকে ফসকে গেল—ছপাৎ! কুয়োর অন্ধকারে আবার হারিয়ে গেল বালতিটা। আমি কুয়োর মুখে ঝুঁকে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখছি, কুয়োর জলে কোথাও যেন শৈশবের দিনগুলো আবছা আলোয় ভাসছে।”
 
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মোমিনপুর, কোলকাতা

Wednesday, 7 October 2026

শিকড় থেকে শিখরে - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামার উপক্রম। আমবাগানের গাছপালার ফাঁক দিয়ে রোদের তেজ ধীরে ধীরে কমে আসছে। সারাদিনের খাটাখাটুনিতে ক্লান্ত চার-পাঁচজন শ্রমিক আপনমনে কাজ করে চলেছেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাঁদের কথাবার্তাও চলছে—সংসার, ছেলেমেয়ে, অভাব-অনটন, দেনা-পাওনা, ভবিষ্যৎ ভাবনা নানা বিষয়ে। কথাগুলো হয়তো খুব সাধারণ, কিন্তু প্রতিটি শব্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে জীবনের না-বলা কষ্ট, দীর্ঘশ্বাস ও অপূর্ণতার গল্প। তারই এক ফাঁকে একজন বলে উঠল—
—“হামার বাড়িত আইজ রান্না করিবার মতোন এক মুঠ চাউলও নাই। মহাজন টাকা দিলে চাউল কিনি বাড়িত নিযাম।”  
 
কথাটি তিনি খুব স্বাভাবিকভাবেই বলেছিলেন। আসলে অভাবের সঙ্গে দীর্ঘদিন বসবাস করতে করতে মানুষ নিজের দুঃখকেও খুব সহজভাবে বলতে শিখে যায়। কিন্তু তাঁর সেই কথা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোরের হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে গেল। কিশোরটি ছিল অল্পবয়সি, স্কুলপড়ুয়া। ঘটনাচক্রে সে ছিল ওই আমবাগানের মালিক পরিবারের সন্তান। বয়সে ছোট, কিন্তু তার হৃদয় যেন বয়সের চেয়ে অনেক বড়।
 
গত জুম’আর খুতবায় ইমাম সাহেব বলেছিলেন, “আপনি মোরগ-পোলাও চিবোতে চিবোতে লম্বা লম্বা ঢেকুর তুলেন; আর আপনার পাশের বাড়িতে অভাবে উনুন জ্বলে না, এই আপনার ,মুসলমানিত্ব”—সেই কথা মনে পড়তেই তার গা কাঁটা দিয়ে উঠলো। বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা নামার পালা। শ্রমিকেরা এবার কাজ গুটিয়ে বাড়ি ফিরবেন, ছেলেটি বাড়ির দিকে ছুটে গেল। হেঁসেল থেকে কিছু চাল বের করে একটা গামছায় মুড়ে ছোট্ট একটা পুঁটলি বানাল। তারপর এক মুহূর্তও দেরি না করে পুঁটলি হাতে ছুটল আমবাগানের দিকে। সোজা গিয়ে দাঁড়াল সেই দিনমজুরের সামনে। পুঁটলিটা তাঁর হাতে দিয়ে বলল,
—“কাকা বো, এই চাউললা বাড়িত নি যাও। আইজ রাইতে আন্ধি করে বাড়ির সবাই মিলি পেট ভরি ভাত খাবেন। আর কুনোদিন যুদি এইরম পরিস্থিতি হয়, তাইলে হামার বাড়িত চলি আসিবেন। চাইরটা ভাতের ব্যবস্থা হাঁরা করি দিমোঁ।”  
 
তাঁদের পরিবার ছিল জমিদার-গোছের। এলাকায় তাঁদের প্রচুর জমিজমা ছিল—চৌষা থেকে পুকুরপাড়া পর্যন্ত। লোকজন সেই জমি ইজারা নিত, কেউ ভাগে চাষ করত, কেউ আধিতো। এলাকায় তাঁদের বেশ নামডাক ছিল। বিপদে-আপদে লোকজন সাহায্যের জন্য তাঁদের কাছে ছুটে যেতো। তাই খুব কাছ থেকে সে লোকজনের অভাব-অনটন, দুঃখ-কষ্ট দেখার সুযোগ পেয়েছিল। ফলে ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে জন্ম নিয়েছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক সহজাত প্রবণতা।  
 
তারপর সময় এগিয়ে চলল নিজ নিয়মে। বহু বর্ষা বয়ে গেলো তুলাইয়ের স্রোতে। ছেলেটি ধীরে ধীরে বড় হলো। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দিল মালদায়। কয়েক বছর সেখানে পড়াশোনা করল। তারপর ডিগ্রি সম্পন্ন করে যখন নিজের গ্রামে ফিরে এল, তখন তার সামনে জীবনের এক জটিল প্রশ্ন—এবার কী করবে?
 
সেই সময় সে দেখল—গ্রামের মানুষদেরকে চাল-ডাল, তেল-নুন, মশলাপাতি, সাবান সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে সাপ্তাহিক হাটের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের এই অপেক্ষায় শুধু অসুবিধাই হয় না; বরং দূরত্ব, সময়, দাম এবং প্রাপ্যতার কারণেও তাঁদের নানান সমস্যায় পড়তে হয়।  
 
সে সিদ্ধান্ত নিল—কদমডাঙ্গা মোড়ে একটা বড় মুদিখানার দোকান করবে। এমন একটা দোকান, যেখানে একসঙ্গে চাল-ডাল থেকে শুরু করে তেল, মশলা, সাবান—প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই পাওয়া যাবে। ব্যবসার পাশাপাশি, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস যেন গ্রামের মানুষ হাতের নাগালে পায় এবং ন্যায্য মূল্যে পায়—সেই চেষ্টা থেকেই শুরু হলো তার মুদিখানার ব্যবসা।
 
গ্রামীণ সমাজে কেউ নতুন কিছু করলে যা হয়, তা-ই হলো—সমালোচনা, মন্তব্য, টিটকারি কতকিছু। কেউ কটাক্ষ করে বলল—এসব করার কী দরকার! কিন্তু সে থামল না। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে কাজ করে যেতে লাগল। পাশাপাশি, তাকে পেয়ে বসলো সমাজসেবার নেশা—অসুস্থ মানুষকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া, প্রয়োজনে হাসপাতালে ছুটে যাওয়া, কাউকে ভর্তি করানোর জন্য ছোটাছুটি করা, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার বিষয়ে পরিবারকে সচেতন করা, মানুষকে শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানো ইত্যাদি।
 
মানুষের জন্য সময় দিতে গিয়ে দোকানে সময় দেওয়া কমে গেলো। ফলে তার ব্যবসা স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হলো। কিন্তু জীবনের কিছু ক্ষতি কখনো কখনো অন্য এক ধরনের প্রাপ্তির দরজা খুলে দেয়। মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে তার পরিচিতি বাড়তে লাগল। নানা শ্রেণি, নানা পেশার মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হলো। মানুষ কাছ থেকে তাকে চিনতে শুরু করল। ধীরে ধীরে সেই পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ল। একসময় সেই পরিচয়ের সূত্র ধরেই বিভিন্ন পরিবার থেকে তার জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসতে শুরু করল। শেষে প্রাণসাগরের এক ভদ্রলোক নিজ মেয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠালেন। মেয়েটি শিক্ষিত, চাকরিজীবী। দুই পরিবারের মধ্যে কথাবার্তা হলো, জানাশোনা হলো, ধীরে ধীরে সম্পর্কটি বিবাহবন্ধনে পরিণত হলো।
 
বিয়ের পর তাঁর জীবন এক নতুন পথে বাঁক নিল। স্ত্রীর কর্মস্থলের দরুন তাকে নিজ এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হলো। ফলে মুদিখানার ব্যবসাও ছাড়তে হল। কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নেশা তিনি ছাড়লেন না। বরং নতুন জায়গায় গিয়ে মানুষের সঙ্গে মেলামিশা করে, তাঁদের জীবনযাপন দেখে তাঁর মনে জন্ম নিল—একটা স্কুল গড়ার স্বপ্ন। অতঃপর ২০০১ সালে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন শুরু হলো। শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠা তিনি করলেন বেস আন-নূর মডেল স্কুল।
 
শুরুটা ছিল খুব ছোট পরিসরে। প্রি-নার্সারি, নার্সারি—এই কয়েকটা ক্লাস দিয়ে। কিন্তু স্বপ্ন যখন বড় হয়, তখন ছোট্ট পরিসর বেশিদিন ছোট থাকে না। ধীরে ধীরে স্কুলের পরিধি বাড়ল। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থাও চালু হলো। সেখানকার ছাত্ররা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ভালো স্কুলে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পড়ার সুযোগ পেল।
 
ছোট্ট একটা স্বপ্ন ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। অনেকেই তাঁর সঙ্গে যুক্ত হলেন, স্কুল গড়ে তোলার কাজে অংশ নিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিন্তার পার্থক্য, মতের অমিল—এসবও সামনে এল। একসময় অনেকেই আলাদা পথে চলে গেলেন। ফলে নানা ধরণের সংকট তৈরি হল। কিন্তু তিনি দমে গেলেন না, শক্ত হাতে স্কুলটির হাল ধরলেন। লড়াই জারি রাখলেন। রাতদিন এক করে দিলেন। একের পর এক প্রতিকূলতাকে ডিঙিয়ে নিজ লক্ষ্যে অবিচল থাকলেন।  
 
নার্সারি থেকে শুরু হওয়া সেই প্রতিষ্ঠান বড় হতে হতে একসময় মাধ্যমিক হলো, তারপর উচ্চমাধ্যমিক। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদের জন্য আলাদা শাখা প্রতিষ্ঠিত হলো। কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হলো। পরবর্তীতে বিভিন্ন জেলায় তার শাখা গড়ে উঠতে শুরু করল। আর আজ সেই প্রতিষ্ঠান উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা-পরিসরেও তার একটা উল্লেখযোগ্য স্থান তৈরি হয়েছে।
 
কিন্তু তাঁর স্বপ্ন শুধু শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে থাকেনি। শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও নানা উদ্যোগ নিয়ে চলেছেন তিনি। ঈদ মিলন অনুষ্ঠান, শীতকালে দরিদ্র মানুষদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ, আর্ত ও পীড়িত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো, শিকড়ের টানে গ্রামে ফিরে এলাকাবাসীর সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়া, বন্যা কিংবা অন্য কোনো দুর্যোগে পাশে দাঁড়ানো। এর পাশাপাশি শুরু হল বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক চর্চা। মানুষের মধ্যে নতুন চিন্তা, নতুন চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া; প্রচলিত সামাজিক চিন্তাভাবনাকে কখনও প্রশ্ন করা; সমাজকে আরও মানবিক, শিক্ষিত ও সচেতন পথে এগিয়ে দেওয়া ইত্যাদি।  
 
কিছুদিন আগে, হরিপুরে গার্লস শাখার নতুন ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছিল। প্রচণ্ড রোদ সেদিন। মাথার উপর যেন আগুন ঝরছে। ছাদে রড বাঁধার কাজে ব্যস্ত শ্রমিক ও মিস্ত্রিরা। তীব্র গরমে তারা দরদর করে ঘামছে। তাঁদের শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। তিনি নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কাজকর্ম তদারকির উদ্দেশ্যে একসময় ছাদে উঠলেন। দেখলেন, ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়েও সেই গরম সহ্য করা যাচ্ছে না। অথচ শ্রমিকেরা ছাতা ছাড়াই সেই প্রখর রোদে কাজ করে চলেছেন। বিষয়টি তাঁর মনকে ব্যথিত করল। দ্রুত নিচে নেমে স্কুলের কর্মচারীদের বললেন, শরবতের ব্যবস্থা করতে।
 
গুলকন্ডি ইত্যাদি দিয়ে শরবত তৈরি করা হলো। অন্য কাউকে দিয়ে সেই শরবত তিনি অনায়াসে উপরে পাঠিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তা করলেন না। নিজেই শরবতের বালতি হাতে নিয়ে ছাদে উঠলেন। একে একে শ্রমিক, মিস্ত্রি ও কর্মচারীদের নিজ হাতে শরবত পান করালেন।
 
দৃশ্যটা হয়তো খুব সাধারণ। কিন্তু এই সামান্য দৃশ্যের মধ্যেই যেন বহু বছরের একটা কাহিনী লুকিয়ে আছে। সেদিন আমবাগানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কিশোরের হাতে ছিল এক পুঁটলি চাল আর আজ এত বছর পরে, সেই একই মানুষ নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন এক বালতি শরবত। সময় ও জায়গা বদলেছে। পরিস্থিতিও বদলেছে। ছোট্ট আমবাগানের জায়গায় এক বিশাল শিক্ষাঙ্গন। সেই কিশোর আজ সেই বৃহৎ শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন ও দায়িত্ব বহন করছেন। শুধু বদলায়নি একটা জিনিস—মানুষের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ। তখন একজন শ্রমিকের ঘরে রাতের ভাতের ব্যবস্থা করতে তিনি এক পুঁটলি চাল নিয়ে ছুটেছিলেন। আর আজ শ্রমিকদের তৃষ্ণা মেটাতে নিজেই শরবতের বালতি হাতে ছাদে উঠেছেন। এই দৃশ্য দু’টির মধ্যে ব্যবধান হয়তো কয়েক দশকের। কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব একটুও বাড়েনি।
 
আমরা যারা তাঁর এই দীর্ঘ পথচলার কোনো না কোনো পর্বের সাক্ষী, আমাদের কাছে এই কথাগুলো শুধু একজন ব্যক্তির সাফল্যের গল্প নয়। এ গল্প হল অন্যের জন্য কিছু করার প্রবণতা ও মানসিকতার। একটা ছোট্ট আমবাগান থেকে শুরু হওয়া সেই সফর আজ এক বিশাল শিক্ষাঙ্গনের ছায়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। এক পুঁটলি চাল থেকে হাজার হাজার শিশুর স্বপ্নপূরণের ঠিকানায়। তবে তাঁর শিকড় এখনও মাটির গভীরে—তুলাইয়ের তল্লাটে সেই প্রত্যন্ত গ্রামে, চাষাভুষা দিনমজুরদের মাঝে, আমবাগানের পাতায় লেগে থাকা গোধূলি আলোয়, যেখানে সেদিনের সেই কিশোর, আজকের খাদেমুল ইসলাম প্রথম শিখেছিল— মানুষের পাশে দাঁড়াতে বড় কিছু লাগে না, লাগে শুধু একটা মানবিক মন, একটা সংবেদনশীল হৃদয়। 
 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা