Pages

Friday, 30 October 2026

বোকা বাক্সে বন্দী শৈশব - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার উপক্রম। পশ্চিম আকাশের শেষ প্রান্তে সূর্যের সোনালি আভাটুকু তখনও মিলিয়ে যায়নি। মাঠ থেকে গরু-ছাগলগুলো নিজ নিজ গোয়ালে ফিরছে, উঠোনে-উঠোনে দিনের শেষ কাজগুলো গুছিয়ে নেওয়ার ব্যস্ততা, কোথাও উনুনের ধোঁয়া, কোথাও সন্ধ্যার রান্নার তোড়জোড়। এরই মধ্যে হঠাৎ করে গোটা গ্রামজুড়ে এক হুলস্থূল কাণ্ড বেঁধে গেল। নিজ নিজ কাজকর্ম দ্রুত সেরে, ছোটরা হাতমুখ ধুয়ে, বড়রা ওজু করে মাগরিবের নামাজ পড়ে, সবাই ছুটলো পুবপাড়ের দিকে। গন্তব্য—সামাদ দা’র বাড়ির বাইরের খোলা জায়গা।  
 
অবশ্য ক’দিন ধরেই এর প্রস্তুতি চলছিল। গ্রামের যুবকেরা উদ্যোগ নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে মুঠো মুঠো চাল তুলেছে। সেই চাল এক জায়গায় জমিয়ে, তার সঙ্গে কিছু টাকা যোগ করে ভাড়া করে আনা হয়েছে একটি ভিসিডি প্লেয়ার আর একটি টেলিভিশন। উদ্দেশ্য, সবাই মিলে সিনেমা দেখা; সে-সময়ের চলতি ও জনপ্রিয় সিনেমা—‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’।
 
মাগরিবের নামাজের পর টেলিভিশন সেট করা হলো, ভিসিডি প্লেয়ারও জুড়ে দেওয়া হলো। বসার জন্য কেউ বাড়ি থেকে মাদুর নিয়ে এসেছে, কেউ ঘরের চাটাই, কেউ খেজুর-পাটি, আবার কেউ খড়ের গাদা থেকে দু-চারটা আঁটি নিয়ে এসেছে। অল্প সময়ের মধ্যেই উঠোনটা যেন কানায় কানায় ভরে উঠল।
 
আমরা শিশুরা একেবারে প্রথম সারিতে গিয়ে বসে পড়লাম। আমাদের পেছনে ডান দিকে বসলেন গ্রামের বয়স্ক পুরুষেরা, আর বাঁ দিকের পুরোটা জুড়ে মহিলাদের বসার ব্যবস্থা হলো। ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সবার চোখ তখন সেই ছোট্ট টেলিভিশনের পর্দায়। সবার মধ্যে এক অদ্ভুত উত্তেজনা! যেন পর্দার ওপারে শুধু একটি সিনেমা নয়, খুলে যেতে চলেছে এক অজানা পৃথিবীর দরজা।
 
কিছুক্ষণ পরেই শুরু হলো ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’। আমাদের কাছে সেটি ছিল একেবারেই নতুন এক অভিজ্ঞতা। পর্দায় কখনও গান, কখনও মজার কৌতুক, কখনও অন্য রকম দৃশ্য—সবকিছুই আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছিলাম। গ্রামের মানুষও বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিলেন সেই অভিনব বিনোদন। কোনো কোনো দৃশ্যে চারদিক থেকে হাততালির শব্দ উঠছিল। আবার সাপুড়ের বাঁশির শব্দ বা সাপের দৃশ্য এলে সবাই খানিকটা চমকে উঠছিলেন, হতচকিত হয়ে তাকিয়ে থাকছিলেন পর্দার দিকে। সেদিনের সেই সন্ধ্যা আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন। উঠোনজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মাদুর-চাটাই, টেলিভিশনের সামনে গাদাগাদি করে বসে থাকা মানুষ, শিশুদের কৌতূহলী চোখ, বড়দের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে সে ছিল এক অন্যরকম আনন্দের সন্ধ্যা।
 
আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, সেই সময় আমাদের এলাকায় বিদ্যুতের সংযোগ ছিল বটে, কিন্তু আশপাশের চার-পাঁচটি গ্রামের কারও বাড়িতে টেলিভিশন ছিল না। তবে বহু বাড়িতে রেডিও ছিল। আর সেই রেডিওই ছিল বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের মাধ্যম। লোকজন রেডিওতে খবর শুনত, নাটক শুনত, নানা অনুষ্ঠান শুনত। ক্রিকেট ও ফুটবলের লাইভ কমেন্ট্রি শুনত। সন্ধ্যা নামলে কোনো কোনো বাড়ির উঠোনে কিংবা বারান্দায় রেডিওকে ঘিরে দু-চারজন মানুষ জটলা করে বসে যেতেন। দূরের কোনো শহর থেকে ভেসে আসা সংবাদ, নাটকের সংলাপ, গান কিংবা ঘোষকের কণ্ঠ—সব মিলিয়ে সেই ছোট্ট যন্ত্রটি আমাদেরকে অচেনা পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিত।
 
এরপর একদিন আমাদের গোটা এলাকায় প্রথম টেলিভিশন এল। কদমডাঙ্গার ইসমাঈল দা কিনলেন। তাঁর বাড়িতে টেলিভিশন আসা মানে চার-পাঁচটি গ্রামের মানুষের কাছে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। সন্ধ্যা নামলেই আশপাশের বিভিন্ন বাড়ি থেকে মানুষ তাঁর বাড়িতে এসে হাজির হতো। কারও হাতে কাজের ক্লান্তি, কারও পরনে দিনের পোশাক—তবু সবার চোখেমুখে একটাই কৌতূহল, আজ টিভিতে কী দেখা যাবে? বিশেষ করে ‘আলিফ লায়লা’ দেখার জন্য মানুষের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। সেই সময় ‘আলিফ লায়লা’ যেন শুধু একটি ধারাবাহিক ছিল না; ছিল সন্ধ্যার এক বিশেষ আকর্ষণ।
 
ইসমাঈল দা’ও যেন বিষয়টি বুঝতেন। প্রতিদিন সময় হলে তিনি টেলিভিশনটি ঘর থেকে বের করে বারান্দায় এনে সেট করতেন। তারপর একে একে লোকজন এসে বারান্দায়, উঠোনে, আশপাশে বসে পড়ত। কেউ মাটিতে, কেউ চাটাইয়ে, কেউ যেখানে একটু জায়গা পেত সেখানেই বসে যেত। ছোট্ট রঙিন পর্দায় তখন খুলে যেত এক অন্য জগৎ—‘আলিফ লায়লা’, কখনও অন্য কোনো সিরিয়াল, আবার কখনও ক্রিকেট কিংবা অন্য কোনো খেলা।
 
ঘটনাচক্রে ইসমাঈল দা’র বড় ছেলে রবি ছিল আমার ক্লাসমেট। সেই সুবাদে আমিও মাঝে মাঝে রবিদের বাড়িতে যেতাম। আর সেই যাওয়াগুলো আমার কাছে ছিল একেকটি বিশেষ সুযোগ। কারণ সেখানে গিয়ে আমি টেলিভিশনে দেখতে পেতাম আমার কল্পনার জগতের একের পর এক চমক—‘চন্দ্রকান্তা’, ‘শক্তিমান’, ‘শাকালাকা বুম বুম’ আরও কত রকম সিরিয়াল!
 
আজ ভাবলে অবাক লাগে, সেই ছোট্ট রঙিন টেলিভিশনের পর্দাটি আমাদের শৈশবের কাছে কত বড় একটি জানালা ছিল! তার ওপারে ছিল এমন এক পৃথিবী, যার সঙ্গে আমাদের গ্রামের বাস্তব জীবনের কোনো মিল ছিল না। অথচ সেই পর্দার সামনে বসে আমরা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। মনে হতো, এই বুঝি পৃথিবীটা আরেকটু বড় হয়ে গেল!
 
এরপর ধীরে ধীরে টেলিভিশন আমাদের এলাকায় আরও বেশ কয়েকটি বাড়িতে পৌঁছে গেল। আমাদের গ্রামে সর্বপ্রথম টেলিভিশন কিনেছিলেন সোলেমান মিয়াভাই। তাঁর বাড়িতে টেলিভিশন আসায় আমাদের বেশ সুবিধাই হলো। আমাদের মতো ছোটদের জন্য টেলিভিশন দেখা যেন অনেকটাই সহজ হয়ে গেল। রবিবার এলেই তখন আমাদের মনে আলাদা একটা অপেক্ষা তৈরি হতো। দূরদর্শনে সকালে চিত্রাহার আর সন্ধ্যায় কোনো হিন্দি সিনেমা। তার জন্য মনটা আগে থেকেই ছটফট করত। আবার শুক্রবারে বিটিভিতে বাংলা সিনেমা। তার সঙ্গে ক্রিকেট খেলা তো ছিলই। ব্যাট-বলের সেই লড়াই দেখার জন্যও আমাদের আগ্রহের অন্ত ছিল না।
 
আত্মীয়তার সুবাদে সলেমান মিয়াভাইর বাড়িতে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের, বিশেষ করে আমার, তেমন কোনো অসুবিধা ছিল না। বরং সেখানে যাওয়ার মধ্যে একটা বাড়তি আনন্দই ছিল। দিদি আমাদের দেখলে বেশ আদর করতেন, খাওয়া-দাওয়াও দিতেন। তারপর আমরা নিশ্চিন্তে বসে টেলিভিশন দেখতাম। দিদির স্নেহ, বাড়ির পরিচিত পরিবেশ, আপনজনের মতো বসে থাকা, কিছু খেয়ে নেওয়া, তারপর একসঙ্গে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে থাকা—শৈশবের সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো তখন হয়তো এত বড় মনে হতো না। কিন্তু সময় যত পেরিয়েছে, ততই বুঝেছি, জীবনের আসল সম্পদ বোধহয় সেই ছোট ছোট আনন্দমুখর মুহূর্তগুলিই।
 
তারপর একে একে আরও কত বাড়িতে টেলিভিশন সেঁধিয়ে গেল—মুনির দা, আজিজ দা, সামাদ দা, আরও কতজনের। আর আমরাও সুযোগ বুঝে কখনও এ বাড়ি, কখনও ও বাড়ি, টেলিভিশন দেখে বেড়াতাম। যে বাড়িতে যে দিন যে অনুষ্ঠান বা খেলা চলছে, সেদিন আমাদের গন্তব্যও যেন ঠিক হয়ে যেত সেই বাড়ি।
 
তবে টেলিভিশন দেখা যে সবসময় সহজ ছিল, তা নয়। অনেক সময় টেলিভিশন দেখার জন্য আমাদেরকে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হতো। কখনও বলা হতো—“তোরা তো ছোট বাচ্চা, বের হয়ে যা।” কখনও সিনেমা চলার সময় ধমক দিয়ে বলা হতো—“যা পড়তে বস।” আবার ক্রিকেট খেলা চললে শুনতে হতো—“তোরা ক্রিকেট কী বুঝিস?”
 
আমরাও এত সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিলাম না। ছোট ছিলাম, কিন্তু টেলিভিশন দেখার ব্যাপারে আমাদের জেদও ছিল প্রবল। মনে মনে যেন পণ করে বসেছিলাম—টেলিভিশন আমরা দেখবই। তাই ঘর থেকে বের করে দিলে আমরা বেরিয়ে আসতাম। কিন্তু বাইরে এসে প্রথমে খুঁজতাম জানালা খোলা আছে কি না। জানালা খোলা থাকলে জানালার কাছে বসেই দেখতাম। বাড়ির লোকজন টের পেলে জানালাটাও বন্ধ করে দিত।
 
তাতেও কি আমরা দমে যেতাম? না। বন্ধ জানালার গায়ে কোথাও কোনো ছোট ছিদ্র আছে কি না, কাঠের ফাঁকে কোথাও সামান্য চিড় আছে কি না—আমরা খুঁজে বের করতাম। সেই সামান্য ফাঁক দিয়ে যদি টেলিভিশনের পর্দার একটুখানি আলো দেখা যায়, তাহলেই হলো। তারপর সেই ফাঁকটুকুতে এক চোখ গুঁজে দিয়ে শুরু হতো আমাদের গোপনে টেলিভিশন দর্শন।
 
ভেতরের লোকজন ভাবত, আমরা বুঝি চলে গেছি। অথচ জানালার ওপাশে আমরা এক চোখে গোটা পৃথিবীটাকে আটকে রেখেছি। কখনও সিনেমা, কখনও চিত্রহার, কখনও ক্রিকেট যা-ই চলুক, আমাদের চোখ আর সরে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একইভাবে জানালার ফাঁকে চোখ রেখে আমরা দেখে যেতাম। এক চোখে পর্দা, অন্য চোখে অন্ধকার। এইভাবেই কখনও পুরো সিনেমা, কখনও পুরো খেলা শেষ করে তবেই বাড়ি ফিরতাম।
 
আর যখন ভেতরের লোকজন আমাদের কৌশল ধরে ফেলত, জানালার সেই ফাঁক বন্ধ করে দিতো, কখনও এমনভাবে জানালায় পর্দা টেনে দিতো যাতে বাইরে থেকে আর কিছুই দেখা না যায়। কিন্তু আমরাও ছিলাম নাছোড়বান্দা। তারা এক কৌশল নিলে আমরা আরেক কৌশল বের করতাম। আমাদের মাঝখানে যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধ চলত। ওরা চাইত আমাদের দূরে রাখতে, আর আমরা চাইতাম যেভাবেই হোক পর্দার একটু আলো চোখে মাখতে।
 
আজ সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে হাসি পায়। একটা সিনেমা বা খেলা দেখার জন্য এত লুকোচুরি, এত কৌশল, এত অপেক্ষা, এত জেদ—আজকের দিনে যেন ভাবাই কঠিন। কিন্তু তখন সেই সামান্য আনন্দটুকুর জন্য কত দৌড়ঝাঁপ, কত বুদ্ধি আর কত অপেক্ষা। সেই জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা টেলিভিশনের পর্দাটুকুই তখন আমাদের কাছে ছিল এক বিশাল পৃথিবীর জানালা।
 
তারপর ধীরে ধীরে সময় পাল্টাল। যে টেলিভিশন একদিন আমাদের কাছে ছিল দুর্লভ, সেটিই এখন প্রায় প্রতিটি বাড়ির নিত্যসঙ্গী। এক সময় বাড়িতে টিভি আসা মানেই ছিল পাড়া-প্রতিবেশীর মধ্যে নতুন এক আনন্দের খবর, আজ সেই টিভি প্রায় প্রতিটি ঘরেই নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—টেলিভিশন যত সহজলভ্য হয়েছে, তাকে দেখার মানুষ যেন তত কমে গেছে। এখন আর আগের মতো টেলিভিশনের সামনে সবাইকে একসঙ্গে বসে থাকতে দেখা যায় না। কোনো বিশেষ উপলক্ষে কখনও খেলা, কখনও কোনো গুরুত্বপূর্ণ খবর—এসব একসঙ্গে বসে দেখা হয়। তারপর আবার যে যার নিজের জগতে ফিরে যায়। ঘরের এক কোণে টেলিভিশনটি নীরবে পড়ে থাকে।
 
টেলিভিশনটাও যেন এখন একা হয়ে গেছে। একসময় তাকে ঘিরে কত মানুষের ভিড় ছিল! কত কোলাহল, কত হাসি, কত অপেক্ষা! সন্ধ্যা নামলেই তাকে ঘর থেকে বারান্দায় বের করে আনতে হতো। মানুষ এসে জড়ো হতো। শিশুরা সামনে বসার জন্য ঠেলাঠেলি করত। বড়রা পেছনে বসতেন। কোনো দৃশ্যে হাসির রোল উঠত, কোনো দৃশ্যে হাততালি পড়ত। আর এখন সেই টেলিভিশনই যেন আমাদের অপেক্ষায় থাকে। কারণ মানুষের হাতে হাতে এখন মুঠোফোন। আঙুলের সামান্য স্পর্শেই খুলে যায় তার পর্দা। স্ক্রোল করলেই সামনে চলে আসে নতুন সিনেমা, গান, খবর কিংবা রিল। একটা শেষ হওয়ার আগেই আরেকটা এসে হাজির হয়। কোনো অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। বিনোদন এখন আর অপেক্ষার জিনিস নয়; বরং আমরা যখন চাই, তখনই আমাদের সামনে হাজির হয়ে যায়।
 
আর এখানেই আমাদের শৈশবের সঙ্গে আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় পার্থক্য। তখন আমরা অপেক্ষা করতাম—কখন টেলিভিশন চালু হবে, কখন সিনেমা শুরু হবে, কখন ক্রিকেট খেলা দেখব। কখনও পুরো সপ্তাহ অপেক্ষা করতাম একটা সিনেমার জন্য। সিনেমা শুরু হয়ে গেলে মাঝপথে উঠে যাওয়ার প্রশ্নই ছিল না। কারণ জানতাম, আবার কখন এমন সুযোগ আসবে কে জানে! আর এখন? সবকিছু হাতের মুঠোয়। অপেক্ষা নেই। অভাব নেই। খুঁজে পাওয়ার কষ্ট নেই। তবু কোথাযও যেন সেই আনন্দটা নেই।
 
আজ প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে টেলিভিশন আছে। তবে টেলিভিশনের সামনে মানুষ নেই। আর তাই কখনও বাড়ির কোণে নীরবে পড়ে থাকা টেলিভিশনটির দিকে তাকালে মনে হয়—সে শুধু একটি যন্ত্র নয়; সে যেন আমাদের ফেলে আসা শৈশবেরও এক নীরব সাক্ষী। একদিন তার পর্দার দিকে তাকানোর জন্য আমরা কতটা ব্যাকুল ছিলাম। ঘর থেকে বের করে দেওয়ার পরও জানালার ফাঁক খুঁজে নিতাম। বন্ধ জানালার গায়ে চোখ রেখে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতাম। একটি সিনেমা দেখার জন্য কতটা পথ দৌড়ে যেতাম, কত অপেক্ষা করতাম। একটি ছোট্ট রঙিন পর্দা কীভাবে আমাদের শৈশবকে রঙিন করে দিয়েছিল! আজ সেই একই পর্দা ঘরের এক কোণে নীরবে পড়ে আছে। হয়তো কোনো অভিমান, কোনো অভিযোগ ছাড়াই। কখনো মনে হয়, সে যেন আমাদের ফেরার অপেক্ষায় আছে। কিন্তু আমাদের চোখ এখন ছোট্ট মুঠোফোনের পর্দায় বন্দী। যদিও আমাদের শৈশব পড়ে আছে সেই পুরোনো টেলিভিশনের সামনে—মাটির উঠোনে, মাদুরের ওপর, বারান্দার এক কোণে, কিংবা বন্ধ জানালার গায়ে এক চোখ গুঁজে।
 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা

Wednesday, 28 October 2026

দাদু - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 
কলেজের কাজে সেদিন ছাত্রীদের নিয়ে পার্শ্ববর্তী একটি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। কাজের ফাঁকে হাসপাতালের এক পাশে বসে থাকা এক বৃদ্ধের দিকে হঠাৎ চোখ আটকে গেল। কোলে ছোট্ট নাতি। বৃদ্ধের হাতে কয়েকটা বিস্কুট। পরম মমতায় একটি বিস্কুট ভেঙে নাতির মুখে তুলে দিচ্ছেন তিনি। নাতিও কম যায় না। নিজের ছোট্ট হাত দিয়ে বিস্কুটের খানিকটা ভেঙে দাদুর মুখের সামনে ধরছে। দাদু মুখ বাড়িয়ে নাতির দেওয়া সেই টুকরোটা খেয়ে নিচ্ছেন। তারপর দু’জনের মুখে হাসি। কী আশ্চর্য এক দৃশ্য! কয়েক টুকরো বিস্কুটের মধ্যে দিয়ে আদানপ্রদান হচ্ছে নিখাদ ভালোবাসা।
 
বৃদ্ধের কোলে নাতির নিশ্চিন্ত আশ্রয়, নাতির ছোট্ট হাতে দাদুর মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চেষ্টা, আর দু’জনের চোখেমুখে ছড়িয়ে থাকা অনাবিল আনন্দ—সব মিলিয়ে দৃশ্যটা আমার বুকের কোথায় যেন আলতো করে নাড়া দিল। কত সাধারণ একটা মুহূর্ত, অথচ তার মধ্যে কী গভীর মায়া! মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ বুঝি এমন কিছু মুহূর্তের কাছে তুচ্ছ।
 
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলাম। তারপর কখন যে হাসপাতালের সেই দৃশ্য পেরিয়ে আমার মন ফিরে গেল বহু বছর আগের আমাদের গ্রামে, টেরই পেলাম না। চোখের সামনে ভেসে উঠল আমাদের বাড়ির উঠোন, চেনা মেঠোপথ, মাদ্‌রাসা মোড়ের দোকান, আর একজন মানুষের মুখ—আমার বাবা। আমার সন্তানদের দাদু।
 
দাদু-নাতির সম্পর্কটা বড় অদ্ভুত! সেখানে ভালোবাসা প্রকাশের জন্য খুব বেশি আয়োজন লাগে না। একটা বিস্কুটের অর্ধেক, একমুঠো মুড়ি, চায়ের দোকানে পাশাপাশি বসে থাকা, কিংবা হাত ধরে পাড়ার পথ ধরে একটু ঘুরে আসা—এই সামান্য জিনিসগুলোর মধ্যেই তৈরি হয় এমন এক মায়ার জগৎ, যার গভীরতা মাপার সাধ্য কারও নেই। সেই জগতে খুনসুটি আছে, অভিমান আছে, ছোট্টখাটো রাগারাগি আছে; আবার মুহূর্তেই সব ভুলে গিয়ে একে অপরের গায়ে গা লাগিয়ে বসে থাকার পরম শান্তিও আছে। দাদু আর নাতির মধ্যে যেন একটা নিজস্ব ভাষা তৈরি হয়, যে ভাষার ব্যাকরণ ভালোবাসা, আর যার প্রতিটি শব্দের অর্থ—আপন।
 
আমাদের বাড়ির প্রথম সন্তান পারভেজ। আমার বাবার চোখের মণি, তাঁর প্রাণের ধন। নিজের জন্য একটা বিস্কুট আনলেও সেটাকে অর্ধেক ভেঙে নাতির হাতে তুলে দেওয়া ছিল তাঁর স্বভাব। বিস্কুটটা ছোট হোক কিংবা বড়, নাতির ভাগটা ঠিকই থাকত। বরং অনেক সময় মনে হতো, বিস্কুটটা যেন কেনাই হয়েছে নাতির জন্য; দাদু কেবল তার ভাগটুকুতে একটু ভাগ বসান!
 
জানুর দোকান হোক কিংবা পচুর দোকান—সকাল-বিকেলের চায়ের সঙ্গী ছিল সেই নাতি। বাবার পায়ের শব্দ পেলেই পারভেজের যেন আর তর সইত না। দাদু যেদিকে যেতেন, সেদিকেই তার ছুটে চলা। দাদু দোকানে বসলে সেও পাশে বসত, দাদু চা খেলে সে বিস্কুটে ভাগ বসাত। হয়তো তখন তার বয়স এতই কম যে এই সম্পর্কের গভীরতা বোঝার কথা নয়। কিন্তু শিশুরা কি ভালোবাসার হিসাব বোঝে? তারা কেবল অনুভব করে, কে তাদের কাছে থাকলে পৃথিবীটা নিরাপদ হয়ে ওঠে, কার কোলে মাথা রাখলে সমস্ত ভয় কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। পারভেজের কাছে সেই মানুষটি ছিলেন তার দাদু।
 
তারও প্রায় তিন বছর পর আমাদের ঘরে এল এক কন্যাসন্তান—তাহিনা। বাবা আদর করে ডাকতেন, ‘কালঠি বু’, অর্থাৎ আমার ছোট পিসি। তাহিনাকেও তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন। এবার ছবিটা একটু বদলে গেল। বাবার দু’টো হাতের দু’টো আঙুল আঁকড়ে ধরে নাতি-নাতনি দু’জন তাঁর সঙ্গে পাড়া ঘুরে বেড়াত। কখনও জানুর দোকান, কখনও পচুর দোকান, কখনও বা গ্রামের এদিক-ওদিক। চা-বিস্কুটের আসরে দু’জনেরই ভাগ থাকত। দাদুর মুখে গল্প, নাতি-নাতনির মুখে হাসি—এভাবেই সাধারণ দিনের মধ্যে অসাধারণ কিছু মুহূর্ত জমা হতে থাকত।
 
বাবা হয়তো বুঝতেই পারেননি, তাঁর হাতের আঙুল আঁকড়ে ধরে হাঁটা সেই ছোট্ট দু’টো প্রাণের কাছে তিনি কত বড় এক পৃথিবী। নাতি-নাতনিরাও তখন জানত না, একদিন এই হাতটাই আর ছুঁতে পারবে না তারা; এই আঙুল ধরে হাঁটার স্মৃতিই একসময় হয়ে উঠবে জীবনের অমূল্য সম্পদ।
 
আরও প্রায় পাঁচ-ছয় বছর পর ঘরে এল আরেক কন্যা—সাদিয়া। তত দিনে বাবার শরীর আর আগের মতো ছিল না। হাঁটাচলা করতে কষ্ট হতো, শরীর অনেকটাই ভেঙে পড়েছিল। আগের মতো নাতি-নাতনিদের নিয়ে পাড়া ঘুরে বেড়ানোর শক্তি আর তাঁর ছিল না। তাই চেয়ারে বসেই সাদিয়াকে কোলে নিয়ে কাটত তাঁর অনেকটা সময়।
 
শরীর দুর্বল হয়েছিল, কিন্তু ভালোবাসার হাত দু’টো তখনও ক্লান্ত হয়নি। নিজের ভাগের মুড়ি কিংবা বিস্কুট ভেঙে সাদিয়ার গালে পুরে দেওয়া যেন তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সাদিয়াও ছিল দাদু-অন্তপ্রাণ। দাদুর কোল, দাদুর বুক, দাদুর হাত—ওর ছোট্ট পৃথিবী যেন এই কয়েকটি আশ্রয়কে ঘিরেই আবর্তিত হতো। চেয়ারে বসা দাদুর কাছে গিয়ে বসা, হাতল ধরে দাদুর গা ঘেঁষে থাকা—এসবের মধ্যেই ওর কত আনন্দ ছিল!
 
সাদিয়া যখন একটু একটু করে বড় হতে লাগল, তখন ঘরটাও যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল। কখনও সে বসতে শিখছে, কখনও হামাগুড়ি দিচ্ছে, কখনও টলমল পায়ে হাঁটছে। তারপর একদিন সেই টলমল পা-ই ছুটতে শিখল। দৌড়ে এসে দাদুর চেয়ারের হাতলে বসে পড়ত, কখনও দোল খেত, কখনও তাঁর গায়ে হেলান দিত। বাবা হয়তো তাকে সামলাতে গিয়ে একটু বিরক্তির ভান করতেন, কিন্তু সেই বিরক্তির আড়ালে যে কী গভীর প্রশ্রয় লুকিয়ে থাকত, তা বুঝতে কারও অসুবিধা হতো না।
 
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া একজন মানুষ আর তার কোলে আশ্রয় নেওয়া এক ছোট্ট শিশু—দু’জনের শরীরের শক্তি এক ছিল না, কিন্তু ভালোবাসার টানে তাদের দূরত্ব ছিল না বললেই চলে। দাদুর কোলে সাদিয়া যেমন নিশ্চিন্ত ছিল, তেমনই সাদিয়ার উপস্থিতিতে বাবার ক্লান্ত দিনগুলোও যেন একটু আলো পেত।
 
এরই মধ্যে আরেকটা সুখবর এল—ঘরে আরও এক নতুন অতিথি আসবে। খবরটা শুনে বাবা খুব খুশি হয়েছিলেন। নতুন নাতি কিংবা নাতনিকে কোলে নেওয়ার স্বপ্ন নিশ্চয়ই তাঁর মনেও দানা বেঁধেছিল। হয়তো মনে মনে ভেবেছিলেন, আবার একটা ছোট্ট প্রাণ তাঁর আঙুল আঁকড়ে ধরবে, আবার তাঁর ভাগের বিস্কুটে কেউ ভাগ বসাবে, আবার ঘরের মধ্যে শিশুর হাসি ছড়িয়ে পড়বে।
 
কিন্তু জীবন তো সব স্বপ্নকে পূর্ণ হওয়ার অবকাশ দেয় না। দিন গড়াতে থাকল। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাবার শরীরও ক্রমশ ভেঙে পড়তে লাগল। শেষ পর্যন্ত এক ডিসেম্বরের সকালে, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই, নিঃশব্দে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। ঘরের পরিচিত মানুষটি হঠাৎ করেই অনুপস্থিত হয়ে গেলেন। যে মানুষটিকে ঘিরে বাড়ির এতগুলো সকাল-বিকেল কাটত, তাঁর চলে যাওয়ার পর সেই বাড়িতেই যেন কোথাও একটা নীরবতা স্থায়ীভাবে বসে গেল। বাবার চলে যাওয়ার প্রায় তিন মাস পর পৃথিবীর আলো দেখল সেই প্রতীক্ষিত অতিথি—ফাওজান।
 
ফাওজান কখনও তার দাদুকে দেখেনি। দাদুর কোলে চড়ার সৌভাগ্য তার হয়নি, দাদুর হাত ধরে পাড়ায় ঘোরার অভিজ্ঞতা তার নেই। দাদুর ভাগের বিস্কুটে ভাগ বসানো, চায়ের দোকানে পাশে বসে থাকা কিংবা নিজের ছোট্ট হাতে বিস্কুট ভেঙে দাদুর মুখে তুলে দেওয়ার কোনো স্মৃতিও তার জীবনে নেই। তার কাছে ‘দাদু’ কেবল একটি শব্দ—বড়দের মুখে শোনা, গল্পের মধ্যে পাওয়া একটি সম্পর্কের নাম।
 
আমার জীবনও বাবাকে ছাড়াই চলতে থাকল। দিন পেরোল, সপ্তাহ পেরোল, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। মানুষ বোধ হয় শোকের সঙ্গেও একসময় বসবাস করতে শিখে যায়। কিন্তু ভুলে যেতে পারে না। প্রতিদিনের কাজকর্মের ভিড়ে প্রিয়জনের অনুপস্থিতি কখনও চাপা পড়ে থাকে, আবার কোনো একটি দৃশ্য, কোনো একটি গন্ধ, কোনো একটি সামান্য ঘটনা হঠাৎ সেই শূন্যতার দরজাটা খুলে দেয়। তখন মনে হয়, এত বছর পরেও মানুষটা বুঝি এই তো পাশের ঘরে আছেন, একটু পরেই ডাক দেবেন।
 
বাবা চলে যাওয়ার প্রায় এগারো বছর পর জন্মাল আমার মেয়ে—সাবা। ‘সাবা’ শব্দের অর্থ সকালের মৃদুমন্দ বাতাস। নামটি বাবার খুব পছন্দের হতো বলেই আমার ধারণা। বাবা যখন সুস্থ ছিলেন, ফজরের নামাজ পড়ে খালি পায়ে মেঠোপথ ধরে হাঁটতে বেরিয়ে পড়তেন। পূব দিক থেকে বয়ে আসা ভোরের বাতাসে মন ভিজিয়ে নিতেন। ভোরের স্নিগ্ধতা, গ্রামের পথ, শিশিরভেজা মাটি আর বাতাসের কোমল স্পর্শ—এসবের সঙ্গে তাঁর ছিল এক নিবিড় সম্পর্ক।
 
কখনও কখনও মনে হয়, সাবা যদি বাবার জীবদ্দশায় জন্মাত, তবে তিনি কি ওকে কোলে নিয়ে সেই ভোরের বাতাসে হাঁটতে বেরোতেন? ওর ছোট্ট হাতটা নিজের আঙুলের মধ্যে রেখে মেঠোপথ ধরে এগিয়ে যেতেন? হয়তো ওর গালে হাত বুলিয়ে আদরের কোনো নাম দিতেন। হয়তো নিজের ভাগের বিস্কুটটা ভেঙে ওর মুখে তুলে দিয়ে অপেক্ষা করতেন, কখন ও-ও একটুখানি ভেঙে দাদুর মুখে তুলে দেবে।
 
এসব ভাবনা বাস্তব নয়, তবু মন বারবার সেই অসম্ভব দৃশ্যগুলোই কল্পনা করে। যে মানুষটি নেই, তাকে ঘিরেই কখনও কখনও সবচেয়ে বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে আমাদের কল্পনার পৃথিবী।
 
সাবার জন্মের প্রায় আড়াই বছর পর আমাদের বাড়িতে এল সর্বকনিষ্ঠ সদস্য—সাওবান। ঘর আবার শিশুর কোলাহলে ভরে উঠল। ছোট্ট পায়ে দৌড়ঝাঁপ, আধো আধো কথা, আবদার, কান্না, হাসি—সব মিলিয়ে সংসার তার নিজস্ব ছন্দে চলতে থাকল। কিন্তু এই নতুন প্রাণের কোলাহলের মধ্যেও কোথাও একটা অপূর্ণতা রয়ে গেল। ঘরে শিশু আছে, অথচ তাদের দাদু নেই। তাদের মাথায় স্নেহের হাত রাখার মানুষটি নেই। তাদের দুষ্টুমিতে মিথ্যে রাগ দেখিয়ে পরক্ষণেই বুকে টেনে নেওয়ার মানুষটি নেই।
 
আমাদের পরিবারের প্রথম তিন সন্তান—পারভেজ, তাহিনা আর সাদিয়া—দাদুকে পেয়েছে। দাদুর কোলে-কাঁধে চড়েছে, তাঁর হাত ধরে পাড়া ঘুরেছে, জানুর দোকান আর পচুর দোকানে গিয়ে চা-বিস্কুটের আসরে ভাগ বসিয়েছে। দাদুর ভাগের মুড়ি, বিস্কুট, এমনকি ভাতেও তাদের অধিকার ছিল। তারা জানে, দাদুর কোলে মাথা রাখলে কেমন লাগে, দাদুর হাতের স্পর্শ কতটা নিশ্চিন্তির, আর দাদুর মুখে নিজের জন্য আদরের ডাক শুনতে কেমন আনন্দ হয়।
 
কিন্তু পরের তিনজন—ফাওজান, সাবা আর সাওবান—তাদের কারও কপালে সেই সৌভাগ্য জোটেনি। তারা দাদুকে দেখেনি, তাঁর কণ্ঠস্বর শোনেনি, তাঁর হাতের স্পর্শ পায়নি। দাদু শব্দটা তারা শিখেছে আর পাঁচটা শব্দের মতো করেই। তাদের কাছে দাদু এমন এক মানুষ, যাঁর কোনো ছবি হয়তো আছে, কিছু গল্প আছে, অন্যদের স্মৃতিতে যাঁর উপস্থিতি আছে; কিন্তু তাদের নিজের জীবনে যাঁর কোনো প্রত্যক্ষ অস্তিত্ব নেই। তাদের দাদু বেঁচে আছেন গল্পে, পুরোনো স্মৃতিতে, পরিবারের কথোপকথনে, আর আমার বুকের গভীরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসে।
 
মাঝেমধ্যে এই কথাটা ভাবলে বুকের মধ্যে কেমন একটা হাহাকার ওঠে। একই পরিবারের ছয়টি শিশুর মধ্যে তিনজন দাদুর আদর পেয়েছে, আর বাকি তিনজন সেই আদরের কথা কেবল শুনেই বড় হচ্ছে। প্রথম তিনজনের স্মৃতিতে দাদু রক্তমাংসের মানুষ; পরের তিনজনের কাছে তিনি স্মৃতিরও আগের এক অনুপস্থিতি। তাঁরা জানে, তাদেরও একজন দাদু ছিলেন; কিন্তু সেই দাদু কেমন করে হাসতেন, কীভাবে কোলে তুলে নিতেন, রাগ করলে কী বলে মানাতেন—এসব জানার কোনো উপায় তাদের নেই।
 
আর আমার? আমি তো জানি, সেই মানুষটি কেমন ছিলেন। তাঁর ভালোবাসার ধরন জানি, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে তাঁর মধুর সম্পর্কের গল্পগুলো জানি। তাই হয়তো আমার আক্ষেপটা আরও বেশি। আমি জানি, আমার সন্তানদের জন্য তিনি কতটা আদরের মানুষ হতে পারতেন। অথচ সেই সম্ভাবনার পৃথিবীটুকু তাঁদের জন্য চিরকাল বন্ধ হয়ে রইল।
 
সাবা ইদানীং খুব প্রশ্ন করতে শিখেছে। এই বয়সে বাচ্চারা যেমন হয়—যা দেখে, যা শোনে, যা বোঝে না, সবকিছুর উত্তর জানতে চায়। মাঝেমধ্যে হঠাৎ এসে জিজ্ঞেস করে,
—আব্বা, তোমার বাবা কোথায়?
আমি কখনও সহজ করে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু ওর প্রশ্ন থামে না।
—তোমার বাবা নেই, না?
কখনও আবার নিজেই নিজের মতো করে একটা উত্তর খুঁজে নেয়—
—তোমার বাবা কি অসুস্থ? তোমার বাবা মারা গেছে?
তারপর একদিন এমন কথাও বলে বসে, যা শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে ওঠে—
—আমি তোমার বাবাকে ওষুধ দেব। তাহলে তোমার বাবা ভালো হয়ে যাবে?
 
কী অদ্ভুত শিশুমন! মৃত্যু যে একবার কাউকে নিয়ে গেলে তাকে আর ফিরিয়ে আনা যায় না, তা সে জানে না। তার কাছে অসুস্থতা মানেই ওষুধ, আর ওষুধ মানেই সুস্থ হয়ে ওঠা। তাই সে ভাবে, দাদু অসুস্থ হয়ে কোথাও পড়ে আছেন হয়তো; ওষুধ দিলেই ভালো হয়ে যাবেন, আবার ফিরে আসবেন। আবার আব্বার কাছে আসবেন। হয়তো কোলে নেবেন তাকেও।
 
ওর এই কথাগুলো শুনে আমি কী বলব বুঝে উঠতে পারি না। ওর নিষ্পাপ বিশ্বাসটুকু ভেঙে দিতে ইচ্ছে করে না। আবার মিথ্যে আশ্বাসও দিতে পারি না। শুধু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে হয়, ইশ্! সত্যিই যদি কোনো ওষুধ থাকত! এমন কোনো ওষুধ, যা খাইয়ে মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনা যায়; এমন কোনো চিকিৎসা, যা সময়ের ব্যবধান মুছে দিয়ে একটি শিশুর সঙ্গে তার না-দেখা দাদুর পরিচয় করিয়ে দিতে পারে!
 
সাবার এই প্রশ্নগুলো আমার কাছে নিছক কৌতূহল নয়। এগুলো ভালোবাসার এক নিষ্পাপ প্রকাশ—না-দেখা একজন মানুষকে আপন করে নেওয়ার সহজাত আকুলতা। সে তার আব্বাকে ভালোবাসে, তাই আব্বার বাবাকেও ভালোবাসতে চায়। সে মানুষটিকে কোনো দিন দেখেনি; তাঁর সঙ্গে তার কোনো স্মৃতি নেই। তবু আব্বার জীবনের সেই মানুষটিকে সে নিজের মতো করে আপন করে নিতে চায়। শিশুমনের এই ভালোবাসা যেন রক্তের সম্পর্কেরও আগে পৌঁছে যায়—স্মৃতির সীমানা পেরিয়ে, সময়ের ব্যবধান অতিক্রম করে।
 
ওর প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমি ক্রমশ হারিয়ে যাই অতীতের পথে। ফিরে যাই জানুর দোকানে, বা পচুর দোকানের সেই চেনা চালায়। মনে পড়ে চায়ের ধোঁয়া, বিস্কুটের গন্ধ, বাবার পাশে বসে থাকা পারভেজ, তাঁর আঙুল ধরে হাঁটা তাহিনা, চেয়ারের হাতলে বসে দোল খাওয়া সাদিয়া। চোখের সামনে ভেসে ওঠে শাটিমারী, আঙ্গারিবন, উদয়পুর হাটের পথ। মনে হয়, দাদুর হাত ধরে নাতি-নাতনিরা এখনও বুঝি হেঁটে চলেছে সেই পথ ধরে। সময় সেখানে থমকে আছে; বাবার হাতের আঙুলগুলো এখনও ছোট ছোট হাতের মুঠোয় ধরা।
 
কিন্তু কল্পনার সেই দৃশ্য যতই স্পষ্ট হোক, বাস্তবের কাছে ফিরে আসতেই হয়। জানি, বাবা আর ফিরবেন না। জানি, সাবা কিংবা সাওবানের ছোট্ট হাত তাঁর হাত ছুঁতে পারবে না। তারা কখনও দাদুর কোলে বসে বিস্কুট খেতে খেতে হাসবে না, তাঁর মুখে আদরের ডাক শুনবে না। আর আমি কোনো দিন তাদের নিয়ে বাবার কাছে গিয়ে বলতে পারব না—‘দেখো বাবা, এরা তোমার নাতি-নাতনি। তোমার বিস্কুটে এদেরও একটু ভাগ দাও।’ এই না-পারার কষ্টটুকুই বোধ হয় সবচেয়ে গভীর।
 
আজও যখন বাবার কথা মনে পড়ে, তখন তাঁর জন্য কেবল চোখ ভিজে ওঠে না; মনে হয়, তাঁর কাছে আমার সন্তানদেরও কিছু পাওনা রয়ে গেল। যে আদর তিনি পারভেজ, তাহিনা আর সাদিয়াকে উজাড় করে দিয়েছিলেন, তার কিছুটা যদি ফাওজান, সাবা আর সাওবানও পেত! তাঁর বিস্কুটে ওরাও যদি একদিন ভাগ বসাতে পারত! হয়তো সেই সামান্য বিস্কুটের টুকরোর মধ্যেই ওরা খুঁজে পেত এমন এক ভালোবাসা, যার কোনো বিকল্প পৃথিবীতে নেই।
 
হাসপাতালের সেই বৃদ্ধ হয়তো এখনও তাঁর নাতিকে নিয়ে কোথাও বসে বিস্কুট ভাগ করে খাচ্ছেন। আর আমার বাবার বিস্কুটটুকু পড়ে আছে স্মৃতির থালায়—অর্ধেক ভাঙা, অর্ধেক খাওয়া, অথচ তার মায়া আজও অক্ষত। আমার সন্তানরা কোনো দিন সেই বিস্কুটের স্বাদ পাবে না। তারা শুধু আমার মুখে দাদুর গল্প শুনবে। আর আমি গল্প বলতে বলতে হয়তো একসময় থেমে যাব—কারণ, কিছু ভালোবাসার কথা বলতে গেলে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে; কিছু অনুপস্থিতির কথা বোঝাতে গেলে শব্দ ফুরিয়ে যায়। তখন হয়তো সাবা আবার জিজ্ঞেস করবে, ‘আব্বা, তোমার বাবা কোথায়?’
 
আমি তার মাথায় হাত রেখে আকাশের দিকে তাকাব। মনে মনে বলব, বাবা, তুমি যেখানেই থাকো, তোমার নাতি-নাতনিদের জন্য একটু দোয়া কোরো। ওরা তোমাকে দেখেনি, তোমার কোলে ওঠেনি, তোমার হাতের স্পর্শ পায়নি—তবু ওদের জীবনের গল্পে তুমি আছ। আমার স্মৃতিতে তুমি আছ। আমার প্রতিটি আক্ষেপে, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে তুমি আছ। আর আমার বুকের এক নিভৃত কোণে আজও একটি ছোট্ট শিশু অপেক্ষা করে আছে—যে শিশুটি তার বাবাকে হারিয়েছে, অথচ নিজের সন্তানদের দাদুকে একবার দেখানোর আকাঙ্ক্ষা থেকে কোনো দিন মুক্ত হতে পারেনি।
 
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মোমিনপুর, কোলকাতা