রমজান মাসে রাতের প্রথম প্রহরে “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার”
ডাক কানে ভেসে এলেই আমাদের বাড়ির পুরো ছবিটা বদলে যেত। বাতাসে নেমে আসত এক অদ্ভুত
রকমের ব্যস্ততা। আমি কোনোরকম দেরি না করে তাড়াতাড়ি অজু সেরে নিতাম, যেন আজানের
ধ্বনি আমাকে তাড়া দিচ্ছে। তারপর পাঞ্জাবিটা গায়ে গলিয়ে ছোট্ট লুঙ্গিটায় দু’বার, কখনো তিনবার
টেনে শক্ত করে গিঁট বেঁধে নিতাম—মনের ভেতরে একটা ভয় কাজ করতো, পাছে রুকু-সাজদায়
গিয়ে যদি লুঙ্গি খুলে যায়!
বাবা তখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করতেন। আমার অজু করা
হলে তিনি যত্ন করে আমার মাথায় টুপি পরিয়ে দিতেন। তারপর রেডি হয়ে আমি তাঁর হাত ধরে
মসজিদের পথে রওয়ানা দিতাম। তাঁর হাতটা ধরলেই আমার মনে হতো, পুরো দুনিয়াটাই
বুঝি নিরাপদ হয়ে গেছে। রাস্তার অসমতল মাটি, সন্ধ্যার হালকা অন্ধকার, বারান্দায়
বারান্দায় জ্বলতে থাকা বাতি—সবকিছু মিলিয়ে সেটা ছিল এক মায়াবী পথ। আজও মনে হলে
বুকের ভেতর অদ্ভুত এক হাহাকার জেগে ওঠে। বোধ করি, তারাবীহ পড়তে
যাওয়ার সেই পথটা শুধু একটা পথ ছিল না, সেটা ছিল আমাদের
শৈশবের এক নির্ভার যাত্রা।
রমজান এলেই তারাবীহ আমাদের কাছে উৎসব হয়ে উঠত। যদিও
তা নফল (অর্থাৎ আবশ্যিক নয় এমন) নামাজ—তবে আমরা তখন এত কিছু বুঝতাম না। আমরা শুধু
বুঝতাম, রাতে মসজিদে
গেলে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে। আনন্দ হবে। হৈচৈ হবে, এই আরকি। আমাদের গ্রামে আট
রাকাআত তারাবীহ পড়া হতো। এখনো আট রাকাআতই হয়। যদিও কোথাও দশ হয়, কোথাও আবার বিশ—তবে হিসাবের এই
মারপ্যাঁচ তখন জীবনে ঢোকেনি। আমাদের তখনকার হিসাব ছিল খুব সোজা—কে কার পাশে
দাঁড়াবে, কে আগে মসজিদে
পৌঁছাবে। এই সব।
মসজিদে ঢুকেই আমাদের ঠাঁই হতো একেবারে পেছনের কাতারে।
নিয়ম মেনে বড়রা সামনে, আর আমরা ছোটরা
পেছনে। পেছনের সেই কাতার—যেন আমাদের তরে
আলাদা এক রাজ্য। নামাজ শুরু হতেই আমাদের মন নামাজে কম, খুনসুটিতে বেশি
আটকে যেত। কখনো আমু হঠাৎ করে পেছন থেকে কারো পাঞ্জাবি ধরে টান দিচ্ছে, তো লাবু লুঙ্গির
গিটে আঙুল ঢুকিয়ে খোঁচা মারছে। কখনো দেলোয়ার আর পাগলু চোখাচোখি করে নিঃশব্দে হেসে
উঠছে। আবার কখনো আফসার কানে কানে এমন কিছু বলছে, যেটা শুনে সাজ্জেত দাঁত চেপে হাসতে
হাসতে প্রায় কেঁপে উঠছে। কখনো সামনের কাতারে মিঠুন আর ঠিক তার পেছনে জুয়েল দাঁড়ালে,
সাজদার বেলা সুযোগ বুঝে মিঠুনের পা ধরে জুয়েল একটা হ্যাঁচকা টান দিতো। অমনি মিঠুন
নামাজের মধ্যেই ঝাঁঝিয়ে উঠত, “শালারা নামাজ পড়িব আসি শয়তানি করেছে”। আরও কতো কিছু,
তবে আমরা সবাই বুঝতাম—হাসি বেরিয়ে
গেলে বিপদ, তাই আমরা সেই
হাসি গিলে নামাজের জায়গায় চোখ আটকে রাখার অভিনয় করতাম।
সত্যি করে বলতে, পেছনের কাতারটা তখন আমাদের জন্য এক
অদ্ভুত স্বর্গ ছিল—যেখানে শাসন ছিল
না বললেই চলে, কিন্তু স্বাধীনতা ছিল
অফুরান। আর তাই শিশুসুলভ দুষ্টুমি, চাপা হাসি, দৃষ্টির লুকোচুরি,
ঠাট্টামশকরা—সব মিলিয়ে এক অনাবিল
শৈশবের মঞ্চ ছিল পেছনের সেই কাতার।
তবে একটা মুহূর্তে সব সিনারিও বদলে যেত। যেই না ইমাম
সাহেব কিরাত শেষ করে “ওয়ালাজ-জাল্লীন” বলতেন, অমনি আমরা সবাই
যেন একসঙ্গে সিরিয়াস হয়ে যেতাম। আমু, লাবু, দেলোয়ার, পাগলু, আফসার, সাজ্জেত, মিঠুন,
জুয়েল—আমরা সবাই
বুকভরা দম নিয়ে একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠতাম, “আমীন”। এত জোরে যে, আমাদের কণ্ঠ যেন
টিনের ছাউনি ভেদ করে আরশে পৌঁছে যাচ্ছে। মনে হতো, এই একটিমাত্র শব্দে আমাদের সব
দুষ্টুমি ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে। ইদানীং মনে হয়,
হয়তো সেই ‘আমীন’ উচ্চারণেই ছিল
আমাদের শিশুমনের সব বিশ্বাস, সব আশা, সব নির্ভরতা।
তারপর ইমাম সাহেব যখন অন্য কোনো সূরার পাঠ আরম্ভ
করতেন, আবার শুরু হতো আমাদের দুষ্টুমি—জামা টানাটানি, চোখে চোখে ইশারা, ঠাট্টামশকরা আর চাপা হাসির
গুঞ্জন। কিন্তু দু’ রাকাআত শেষে যেই না ইমাম সাহেব সালাম ফেরাতেন, আমরা হঠাৎই
অসম্ভব ভদ্র হয়ে যেতাম। চোখ নামিয়ে চুপচাপ বসে থাকতাম, কেউ আবার তাসবীহ পাঠের আদলে
মুখ নাড়ত—যেন আমাদের
পেছনের কাতারে কোনো কিছুই হয়নি। তবে ইমাম সাহেব আবার যখন “আল্লাহু আকবার” বলে পরবর্তী
রাকাআত আরম্ভ করতেন, আমাদের ছোট্ট
রাজ্যে আবার প্রাণ ফিরে আসত।
এভাবে চার রাকাআত নামাজ শেষে, আরম্ভ হতো
মোনাজাত। ইমাম সাহেব যখন দোয়ার জন্য হাত তুলতেন, তখন মসজিদের আকাশে বাতাসে এক
অদ্ভুত রকমের নীরবতা নেমে আসতো। তাঁর কণ্ঠ
মাঝেমধ্যে কেঁপে কেঁপে উঠত, কান্নার ভারে
গলা বুজে আসত। মুসল্লি মহলেও একটা চাপা কান্নার রোল উঠত। আর তা দেখে আমাদের
বুকের ভেতর অজানা এক ভার নেমে আসত। আমরা তখন দোয়াগুলোর
মানে বুঝতাম না, কিন্তু জানতাম—কোথায়, কখন ‘আমীন’ বলতে হয়। তাই
বারবার বলে উঠতাম, “আমীন, সুম্মা আমীন, আমীন ইয়া রাব্বাল
আলামীন।” আজ মনে হয়, সেই আমীনগুলোই
ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে খাঁটি ও নির্ভেজাল দোয়া।
তারাবীহ শেষ হলে আমরা আর এক মুহূর্তও মসজিদে থাকতাম
না। জুতো জোড়া হাতে নিয়ে দে দৌড়। মনে হতো, যেন পায়ে বল নিয়ে গোল পোস্টের দিকে
ধাওয়া করছে কোনো ফুটবলার, যেন কেউ মেসি, কেউ রোনাল্ডো, কেউ মোহাম্মদ সালাহ—সেই আলোআঁধারি
পথ ধরে কেবল ছুটছি, আর ছুটছি। যেন আমাদের সেই
দৌড়ের ভেতরই শৈশবের সকল আনন্দ, সম্পূর্ণ মুক্তি।
আমাদের গ্রামের সেই মসজিদ আজও আছে, এখন আরও বড়
আকারে, আধুনিক
সাজসরঞ্জামে ভরা, মেঝেতে মার্বেল
পাতা, আজানও হয়,
তারাবীহ্ও হয়, এবং শেষ ক’বছর ধরে মেয়েরাও তাতে শামিল হয়। কিন্তু পেছনের
কাতারের সেই ছোট্ট ছেলেগুলো আর নেই। আমু, লাবু, দেলোয়ার, পাগলু, আফসার, সাজ্জেত, জুয়েল—সবাই যে যার
জীবনের কাতারে দাঁড়িয়ে গেছে। বাবার হাত ধরার সুযোগটাও আমার আর নেই। তবে রমজানের
রাতে আজও যখন দূর থেকে ভেসে আসে—“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার”, হঠাৎই মনে হয়, আমি আবার সেই
ছোট্ট ছেলেটা, লুঙ্গির গিট
শক্ত করে বাঁধছি, আর বাবার হাত
ধরে তারাবীহ পড়তে আলোআঁধারি পেরিয়ে মসজিদের পথে হাঁটছি।
হেস্টিংস, কোলকাতা
২৪/০২/২০২৬
ইসলাম মানুষের ঈমানকে শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। ঈমান
মানে কেবল নামাজ,
রোজা বা তাসবিহ-তেলাওয়াত নয়;
বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ন্যায়
ও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো। সমাজে অন্যায়, জুলুম ও
অবিচারের মুখোমুখি হলে একজন মানুষ কী অবস্থান নেয়—তার মধ্য দিয়েই ঈমানের বাস্তব রূপ প্রকাশ পায়। পবিত্র আল্-কুরআন স্পষ্টভাবে
ঘোষণা করেছে— “হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর জন্য
সাক্ষ্য প্রদান করো—যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেই হয়।” [সূরাতু আন্-নিসা: ১৩৫] এই আয়াত আমাদের শেখায়—ঈমান কখনো
সুবিধাবাদী হতে পারে না। ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে হলেও দাঁড়াতে হবে এটাই ঈমানের দাবি। এই সত্যটি রাসুল (সাঃ)-এর সেই বিখ্যাত হাদিসে
আরও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে— “তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোনো অন্যায় দেখবে, সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিহত করে; যদি সে তা করতে সক্ষম না হয়, তবে মুখে প্রতিবাদ করে; আর যদি তাও না পারে, তবে অন্তরে তা ঘৃণা করে—আর এটাই ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর।” [সাহীহ মুসলিম ৪৯] এই হাদিস আমাদের জানিয়ে দেয়—ঈমান মানেই দায়িত্বশীল
হওয়া।
অন্যায়ের সামনে নিশ্চুপ থাকা ঈমানের পূর্ণতা নয়।
নীরব নিরপেক্ষতা ঈমানের পরিপন্থী
অনেকেই মনে করেন—“আমি তো কাউকে কষ্ট দিচ্ছি না, তাই আমার কোনো দায়
নেই।”
কিন্তু ইসলাম এই যুক্তিকে গ্রহণ করে না। কারণ অন্যায় দেখেও
চুপ থাকা মানে অনেক সময় সেই অন্যায়কে টিকে থাকার সুযোগ দেওয়া। পবিত্র আল্-কুরআন পূর্ববর্তী জাতিসমূহের সমালোচনা করে বলেছে— “তারা একে অপরকে অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করত না। তারা যা করত, তা কতই না নিকৃষ্ট ছিল!” [সূরাতু আল্-মায়েদাহ্: ৭৯] অন্যত্র মহান আল্লাহ আরও বলেন— “অশান্তি ও বিপর্যয় থেকে বাঁচো, যা বিশেষভাবে শুধু জালিমদের উপরই আপতিত হয় না।” [সূরাতু আল্-আনফাল: ২৫] অর্থাৎ সমাজে অন্যায় ছড়িয়ে পড়লে তার ক্ষতি শুধু জালিমদের
মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না;
নীরব দর্শকরাও এর পরিণতি ভোগ করে। তাই অন্যায় দেখেও চুপ করে থাকা, ক্ষমতা সত্ত্বেও প্রতিবাদ না করা ঈমানের পরিপন্থী।
প্রতিবাদ ও
ক্ষমতার প্রয়োগ
প্রতিবাদ সম্পর্কিত হাদিসটিতে উল্লেখিত প্রথম স্তরটি হল—হাত দিয়ে প্রতিবাদ। এই পদ্ধতি
মূলত তাঁদের জন্য, যাঁদের হাতে
বৈধ ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব রয়েছে। মনে রাখতে হবে, ইসলাম ক্ষমতাকে ভোগের বস্তু নয়, বরং আমানত
হিসেবে দেখে। আর আমানত সম্পর্কে পবিত্র
আল্-কুরআনের নির্দেশ—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আমানত তার প্রাপ্যদের নিকট ফিরিয়ে দিতে আদেশ করেছেন; আর যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার করো, তখন ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করো।” [সূরাতু আন্-নিসা: ৫৮] এবং এ মর্মে নবীজি (সাঃ) বলেছেন— “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং তোমাদের প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” [সাহীহ বুখারী ২৫৫৪ ও সাহীহ মুসলিম ১৮২৯] এখানে ‘হাত’
বলতে জুলুম বা বলপ্রয়োগ বোঝানো হয়নি। বরং বোঝানো হয়েছে
আইনসম্মত,
ন্যায়ভিত্তিক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। অন্যায় রোধের নামে
অন্যায় করা ইসলামের শিক্ষা নয়। এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, যেখানে তৎক্ষণাৎ হস্তক্ষেপের ফলে
ন্যায়সঙ্গতভাবে কোনো অন্যায় প্রতিরোধ সম্ভব সেখানে সাধারণ মানুষেরও হাত দিয়ে
প্রতিবাদের জন্য সক্রিয় হওয়া কর্তব্য। কিন্তু যেখানে আইনি প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ
থাকবে সেখানে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সক্রিয় হবে। সেখানে
সাধারণ মানুষ অন্যায়ের শাস্তি দিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে না। এতে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার সমূহ সম্ভাবনা
থাকে।
বাক্যের মাধ্যমে অন্যায়ের মোকাবিলা
আর যাঁদের হাতে ক্ষমতা নেই, তাঁদের জন্যও দায়ভার
ঝেড়ে ফেলার সুযোগ নেই। ঈমানের পরীক্ষায় ইসলাম তাঁদের দায়িত্বের পথ বন্ধ করেনি।
সত্য বলা,
অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, নিপীড়িতের
পক্ষে দাঁড়ানো—এসবও ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাসুল (সাঃ) বলেছেন— “অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ।” [মুস্নাদ আহ্মাদ ১৮৮২৮, সুনান নাসায়ী ৭৭৮৬] আর এ প্রসঙ্গে কুরআন নির্দেশ
দেয়— “তোমরা ন্যায়ের আদেশ দাও এবং অন্যায় থেকে নিষেধ করো।” [সূরাতু আলে ইমরান: ১০৪] তবে ইসলাম প্রতিবাদে শালীনতা ও প্রজ্ঞার ওপর জোর দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন— “প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো।” [সূরাতু আন্-নাহল: ১২৫] অর্থাৎ সত্য বলবে, কিন্তু
দায়িত্বশীল ভাষায়;
প্রতিবাদ করবে, কিন্তু মানবিক
সীমা অতিক্রম না করে।
অন্তরের প্রতিবাদ ঈমানের শেষ রেখা
কখনো কখনো এমন পরিস্থিতি আসে, যখন মানুষ একেবারে
অসহায় হয়ে পড়ে। না হাতে শক্তি থাকে, না থাকে মৌখিক
প্রতিবাদের সুযোগ। তখন অন্তরে অন্যায়কে ঘৃণা করাই ঈমানের শেষ আশ্রয়। কিন্তু রাসুল (সাঃ) সতর্ক করে বলেছেন—এটি ঈমানের
সবচেয়ে দুর্বল স্তর। অর্থাৎ এখানেই থেমে যাওয়া কাম্য নয়। এবং তিনি অন্য এক হাদিসে আমাদেরকে অন্তরের অবস্থার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন—
“সাবধান! শরীরে একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে—যদি তা সঠিক থাকে,
তাহলে পুরো শরীর সঠিক থাকে;
আর যদি তা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায় এবং পুরো সিস্টেমই বিগড়ে যায়। সেটি হলো অন্তর।” [সাহীহ বুখারি ৫২ ও মুসলিম ১৫৯৯] আর তাই অন্তর যদি অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে নেয়, তাহলে ঈমান ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যায়।
নীরবতার মূল্য ও বিবেকের ক্ষয়
নীরবতা অনেক সময় মানুষ নিজের নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য
কিংবা স্বার্থরক্ষার অজুহাতে বেছে নেয়। কিন্তু ইসলাম আমাদের বারবার সতর্ক করেছে—এই নীরবতাই এক সময় ব্যক্তি, সমাজ ও সামগ্রিক
মানবতার জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। যখন অন্যায় চোখের সামনে ঘটতে থাকে, অথচ কেউ প্রতিবাদ করে না, তখন সেই অন্যায় ধীরে
ধীরে ‘অস্বাভাবিক’
থেকে ‘স্বাভাবিক’-এ রূপ নেয়। বিবেক ভোঁতা হয়ে যায়, সত্য ম্লান হয়ে
পড়ে, আর জুলুম সমাজের রীতিতে পরিণত হয়। রাসুল (সাঃ) এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন— “যখন মানুষ কোনো জালিমকে দেখে তাকে বাধা দেয় না, তখন আশঙ্কা রয়েছে—আল্লাহ তাদের সবাইকেই শাস্তির আওতায় আনবেন।” [আবু দাউদ ৪৩৩৮, তিরমিজি ৩০৫৭] এই হাদিস স্পষ্ট করে দেয়—অন্যায়ের সময় নিরপেক্ষ
থাকার সুযোগ নেই। জুলুমের সামনে নীরব থাকা মানে, এক প্রকারে জালিমকে শক্তিশালী করা এবং তার অপরাধে নীরব সম্মতি দেওয়া। এই সত্যটি রাসুল (সাঃ) আরেকটি গভীর ও
হৃদয়স্পর্শী উপমার মাধ্যমে বুঝিয়েছেন। তিনি বলেন— “একদল মানুষ একটি নৌকায় উঠল। তাদের কেউ উপরের তলায়, কেউ নিচের তলায়। নিচের তলার লোকেরা যখন পানির প্রয়োজন অনুভব করত, তখন তাদের উপরের তলায় যেতে হতো। একসময় তারা বলল—‘আমরা যদি আমাদের অংশে নৌকায় একটি ছোট্ট ছিদ্র করে নিই, তাহলে আর উপরের লোকদের কষ্ট দিতে হবে না।’ যদি উপরের লোকেরা তাদের এই কাজে বাধা না দেয়, তাহলে সবাই ডুবে যাবে। আর যদি বাধা দেয়, তাহলে তারা নিজেরাও বাঁচবে, অন্যদেরও বাঁচাবে।” [সাহীহ বুখারী ২৪৯৩] এটি কেবল একটি উপমা নয়;
এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক দর্শন। এখানে নৌকা হলো সমাজ, আর ছিদ্র করা হলো অন্যায় ও অপরাধ। কেউ যদি বলে—“ও তো আমার অংশে বা আমার সাথে অন্যায় করছে না, এতে আমার কী?" অথবা যদি মনে করে,"নৌকা তো আমার নয়, তার মালিক যে সে কেন বাধা
দিচ্ছে না? ”—ইসলাম স্পষ্ট করে দেয়,
এই যুক্তি ভ্রান্ত। কারণ সমাজ একটা নৌকা। এক অংশে করা
অন্যায়ের প্রতি নিষ্ক্রিয়তা ও মালিকের প্রতি দোষারোপ সেই মূহুর্তে সবাইকে ডুবিয়ে
দেবে। অতএব,
নীরবতা শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; এটি ধীরে অথচ অবশ্যম্ভাবী সামাজিক আত্মহত্যার নামান্তর। ইসলাম আমাদের শেখায়—ক্ষমতা অনুযায়ী অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে: হাত দিয়ে, কথা দিয়ে,
অন্তত অন্তরে ঘৃণা রেখে। নীরব থাকা নয়, বরং দায়িত্বশীল ও
বিবেকবান হওয়াই একজন মুসলিমের পরিচয়।
প্রজ্ঞাময় প্রতিবাদ ও ইসলামের ভারসাম্যের দর্শন
ইসলাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা সমর্থন করে না; বরং প্রতিবাদকে ঈমানি দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে এই প্রতিবাদ যেন
অন্ধ ক্রোধ,
উগ্রতা কিংবা সীমালঙ্ঘনের রূপ না নেয়—সে ব্যাপারেও ইসলাম সমানভাবে সতর্ক করেছে। ইসলামের প্রতিবাদ-দর্শন একটি
ভারসাম্যপূর্ণ পথ দেখায়,
যেখানে বিবেক, প্রজ্ঞা, ন্যায়বোধ এবং পরিণতির গভীর উপলব্ধি অপরিহার্য। পবিত্র আল্-কুরআনে মহান আল্লাহ অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন— “নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার এবং আত্মীয়স্বজনকে সাহায্যের নির্দেশ দেন; আর অশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।” [সূরাতু আন্-নাহল: ৯০] এই আয়াতটি ইসলামের সামাজিক ও নৈতিক দর্শনের এক সারসংক্ষেপ।
এখানে ‘আদ্ল অর্থাৎ ন্যায়’
মানে শুধু অন্যায়ের প্রতিবাদ নয়; বরং প্রতিবাদের মধ্যেও ন্যায় বজায় রাখা। ‘ইহ্সান অর্থাৎ
সদাচার’
মানে এমন আচরণ, যা পরিস্থিতিকে
আরও উত্তপ্ত না করে বরং সংশোধনের পথ খুলে দেয়। আর ‘বাগ্ই অর্থাৎ সীমালঙ্ঘন’ থেকে নিষেধাজ্ঞা
স্পষ্ট করে দেয়—ন্যায়ের নামে অন্যায় করার অনুমতি ইসলামে নেই। এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ সম্পর্কিত “তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনো অন্যায় দেখে…” এই হাদিস প্রমাণ করে, প্রতিবাদ
অবশ্যই করতে হবে,
কিন্তু ক্ষমতা ও পরিস্থিতির বিবেচনায়। শক্তি প্রয়োগের অনুমতি তখনই, যখন তা আরও বড় ফিতনা, রক্তপাত বা বিশৃঙ্খলার কারণ না হয়। নচেৎ কথা ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবাদই
শ্রেষ্ঠ পথ। উল্লেখ্য যে, ইসলামের লক্ষ্য কখনোই প্রতিশোধ নয়। প্রতিশোধ মানুষকে তৃপ্ত করতে পারে, কিন্তু সমাজকে সংশোধন করে না। পবিত্র আল্-কুরআন স্পষ্টভাবে বলে— “মন্দের প্রতিদান মন্দের সমান; তবে যে ক্ষমা করে এবং সংশোধনের পথ অবলম্বন করে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে।” [সূরাতু আশ্-শূরা: ৪০] এখানে লক্ষ্য করা যায়, প্রতিকার ও
ক্ষমার সুযোগ রাখা হয়েছে,
কারণ ইসলামের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো সংশোধন, শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা—ধ্বংস বা
বিশৃঙ্খলা নয়। সুতরাং ইসলামের
দৃষ্টিতে প্রতিবাদ হবে এমন,
যা অন্যায়কে রুখে দেয় কিন্তু নতুন অন্যায়ের জন্ম দেয় না; যা জুলুমের বিরোধিতা করে কিন্তু নিজে জালিম হয়ে ওঠে না। প্রজ্ঞাহীন প্রতিবাদ
আগুনের মতো—সব পুড়িয়ে দেয়;
আর প্রজ্ঞাসম্পন্ন প্রতিবাদ আলোর মতো—পথ দেখায়। এই ভারসাম্যই ইসলামের
সৌন্দর্য,
এই প্রজ্ঞাই ইসলামের শক্তি।
আলোচিত এই হাদিস ও আয়াতগুলো
আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা যখন অন্যায়ের মুখোমুখি হই, তখন আমাদের ঈমান কী করে? চুপ থাকে,
না দায়িত্ব নেয়? মহান আল্লাহ বলেন— “নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরাই নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।” [সূরাতু আর্-রা‘দ: ১১] ইসলাম চায়,
ঈমান যেন শুধু অন্তরের বিশ্বাস হয়ে না থাকে; বরং তা ন্যায়,
সত্য ও মানবিকতার পক্ষে এক জীবন্ত শক্তিতে পরিণত হয়। তাই
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়—এটি ঈমানের স্পষ্ট সাক্ষ্য, একজন মুমিনের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।