Pages
Friday, 18 September 2026
ভালোবাসার বাঁধন (হযরত যায়নাব ও আবুল ‘আস রাঃ-এর) - ড. আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
Friday, 11 September 2026
শেষ দিয়ে শুরু - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
বিকেল খানিকটা গড়িয়েছে। পাকুড় গাছের
পাতার ভেতর দিয়ে মিঠা রোদ উঁকিঝুঁকি মারছে। আর খানিকটা রোদ মাদ্রাসার বারান্দা ও মাঠে গড়াগড়ি দিচ্ছে। মোড়ের পুরোনো কালভার্টটার উপরে বসে মোজাহার কাকু
একমনে জাল বুনছেন। বিকেলের নরম আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে, চারপাশে দিনের কোলাহলও যেন একটু একটু করে স্তিমিত হচ্ছে। তাঁকে একা পেয়ে মনের
মধ্যে বহুদিন ধরে জমে থাকা প্রশ্নটা করেই ফেললাম— কাকু, একটা কথা জিজ্ঞেস করি, তুমি তো গ্রামের কতশত মানুষের কবর খুঁড়েছ। কারও কাছ থেকে এক
পয়সাও নাও না। শুধু মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর আখেরাতে উত্তম প্রতিদানের আশায়
বছরের পর বছর এই কাজ করে চলেছ। কিন্তু বলো তো, এই কাজের শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?
আমার কথা শুনে মোজাহার কাকু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। হাতের জালটা ধীরে ধীরে
পাশে নামিয়ে রাখলেন। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, বহু বছরের পুরোনো কোনো দরজা যেন হঠাৎ খুলে গেল। তারপর ধীর
কণ্ঠে বললেন,
—এর পেছনে একটা করুণ কাহিনি আছে, ব্যাটা। তোমার আজিজ চাচার কথা মনে আছে?
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম,
—না কাকু। তাঁকে তো আমি দেখিনি। তিনি তো আমার জন্মেরও আগে মারা গেছেন। তবে তাঁর নাম শুনেছি।
কাকু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—হ্যাঁ, ঠিকই বলেছো। তাঁর পুরো নাম
আব্দুল আজিজ মিয়াঁ। করঞ্জি সিনিয়র মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন তিন মাস হবে। সদ্য টাইটেল পাশ করা তরুণ আলেম। বয়সে তরুণ হলেও জ্ঞান, বিনয় আর চরিত্রে ছিলেন অসাধারণ। শান্ত স্বভাবের মানুষ
ছিলেন। কারও সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলতেন না। গ্রামের মানুষ তাঁকে খুব ভালোবাসত।
তাঁর মধ্যে যেন একটা আলাদা মায়া ছিল—যে একবার তাঁর সঙ্গে কথা বলেছে, সে-ই তাঁকে মনে রেখেছে।
কাকু একটু থামলেন। তাঁর চোখেমুখে তখন যেন বহু বছর আগের কোনো ছায়া ফুটে উঠেছে। বললেন,
—একদিন মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে তুলাই নদীর পাড়ে হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়লেন
তিনি। খবরটা মুহূর্তের
মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে গেল। মানুষ ছুটে গেল তাঁকে দেখতে। কোনো রকমে তাঁকে বাড়িতে
নিয়ে আসা হলো। বাটুয়া দীঘির জরিফদ্দীন আহমেদ
ওরফে ডাহারু ডাক্তার এলেন। পরীক্ষা করে জানালেন, অবস্থা খুবই সংকটজনক, তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
কিন্তু তখন তো আর আজকের মতো আশেপাশে অ্যাম্বুলেন্স,
বাস বা ট্যাক্সি ছিল না। হাসপাতালে যাওয়ার একমাত্র ভরসা ছিল গরুর গাড়ি। সবাই ছুটোছুটি
শুরু করল একটা টোপরওলা গরুর গাড়ির ব্যবস্থা করার জন্য। কিন্তু গাড়ি জোগাড় হওয়ার আগেই সব শেষ হয়ে
গেল।
আব্দুল আজিজ মিয়াঁ চলে গেলেন—চিরদিনের জন্য।
কাকুর কণ্ঠ ভারী হয়ে এল,
—সেদিন পুরো গ্রাম যেন থমকে গেছিল। চারদিকে
শুধু কান্না আর কান্না। কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না, যে মানুষটি কিছুক্ষণ আগেও আমাদের মাঝে ছিলেন, তিনি আর নেই। মা-বাবা, ভাই-বোন,
আত্মীয়-স্বজন, পাড়াপড়শি সবাই যেন শোকে পাথর হয়ে গেছিল। মানুষের
কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছিল। পুরো পাড়া যেন থমথমে। অথচ এমন
পরিস্থিতিতে যে কাজটি সবার আগে করার কথা, সেই কবর খোঁড়ার কথাটুকুও যেন কারও মনে ছিল না। আসলে শোক মানুষকে
এমনই অসহায় করে দেয়—চোখের সামনে প্রয়োজনীয় কাজ থাকলেও হাত-পা যেন অবশ হয়ে আসে।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে কাকু আবার বললেন,
—শেষ পর্যন্ত আমরা কয়েকজন তরুণ এগিয়ে এলাম। আমি, মোসলেম, আরও কয়েকজন। কোদাল আর টুকরি হাতে আমরা চণ্ডিপুর গোরস্থানের দিকে রওনা
দিলাম। জীবনে এর আগে
আমরা কেউই কোনোদিন কবর খুঁড়িনি। কবর কীভাবে কাটতে হয়, কতটা গভীর করতে হয়, কীভাবে মাটি সরাতে হয়—কিছুই জানতাম না।
কাকুর চোখের সামনে যেন সেই দৃশ্যটা আবার জীবন্ত হয়ে উঠল,
—কখনো কবরের এক পাশ বেঁকে যাচ্ছিল, কখনো মাটি ধসে পড়ছিল। আবার কখনো কোদাল শক্ত মাটিতে আটকে
যাচ্ছিল। হাতে ব্যথা হচ্ছিল,
শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছিল। তবুও আমরা থামিনি। মনে
হচ্ছিল,
আজিজ মিয়াঁর মতো একজন ভালো মানুষের শেষ ঠিকানাটুকু আমাদেরই
প্রস্তুত করতে হবে। যত কষ্টই হোক, কাজটা শেষ করতেই
হবে।
অনেকক্ষণ পর, অনেক ঘাম আর পরিশ্রমের শেষে আমরা কবরটি প্রস্তুত করলাম। সেই কবরেই শায়িত হলেন
আব্দুল আজিজ মিয়াঁ—আমাদের প্রিয় আজিজ ভাই।
মোজাহার কাকু একটু থামলেন। তারপর খুব আস্তে স্বরে বললেন,
—সেই যে শুরু বাবাজী, তারপর আর থামিনি।
আমি নির্বাক হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তিনি আবার জালটা হাতে তুলে
নিলেন। জালের ফাঁকে ফাঁকে তাঁর আঙুল আবার চলতে লাগলো। আর তা দেখে আমার মনে হল—তিনি যেন শুধু জালই বুনছেন না, বুনে চলেছেন এক দীর্ঘ ইতিহাসও। কত মানুষের শেষ বিদায়ের
সাক্ষী হয়েছেন তিনি,
কত কবরের মাটি তাঁর হাতে নরম হয়েছে, কত অশ্রুসিক্ত পরিবার তাঁর দিকে তাকিয়ে শেষ আশ্রয় পেয়েছে—তার কোনো হিসাব নেই।
কোনো পারিশ্রমিক নেই, কোনো দাবিদাবা নেই,
প্রতিদানের কোনো প্রত্যাশাও নেই। শুধু আছে মনে এক টুকরো বিশ্বাস—মানুষের শেষযাত্রায় পাশে দাঁড়ানোও এক ধরনের ইবাদত; আর মানুষের জন্য করা এই সামান্য শ্রমের উত্তম প্রতিদান একদিন
না একদিন আল্লাহ তা’আলার কাছ থেকে তিনি ঠিকই পাবেন।
সেদিন বিকেলে মোজাহার কাকুর কাছ থেকে শুনেছিলাম, একজন তরুণ আলেমের
আকস্মিক মৃত্যু কীভাবে আরেকজন তরুণের জীবনে একটি নীরব অঙ্গীকারের জন্ম দিয়েছিল। আজও যখন কোনো মানুষের মৃত্যুসংবাদ শুনি, মনে পড়ে মোজাহার কাকুর সেই কথাগুলো—“সেই যে শুরু,
আজও চলছে”—তখন বুকের ভেতর
কেমন যেন একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়। মনে হয়, মানুষের জীবন আসলে কত বিচিত্র! কেউ চলে যায়, আর তার চলে যাওয়া কখনো কখনো অন্য কারও জীবনে রেখে যায় এমন এক দায়িত্ব, যা মৃত্যুর বহু বছর পরেও বেঁচে থাকে।
আব্দুল আজিজ চাচার অকাল প্রয়াণে, তাঁর কবরটি খনন করতে গিয়ে মোজাহার কাকুর হাতে যে কোদাল উঠেছিল, সেই কোদাল যেন আজও থামেনি। এক মানুষের শেষ বিদায়ের মুহূর্ত
থেকে শুরু হওয়া সেই মানবিকতার যাত্রা আজও নীরবে এগিয়ে চলেছে—একটি কবর থেকে আরেকটি কবরের দিকে, এক শোকাহত পরিবার থেকে আরেকটি শোকাহত পরিবারের পাশে, একটা দাফন শেষে আরেকটা দাফনের পথে।
২৮ জুলাই ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা
.png)
