Pages

Monday, 27 April 2026

পয়লা মোলাকাতে - ড. ওবাইদুর রাহমান বুখারি



সাল ২০১২। আমি তখন স্নাতক তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। জীবনের এক ব্যস্ত অথচ স্বপ্নময় সময়। সেদিনও অন্য দিনের মতোই একটি বেসরকারি মাদ্রাসায় পড়িয়ে বিকেল প্রায় পাঁচটার সময় ফিরেছি। ক্লান্ত শরীর নিয়ে হোস্টেলে ঢুকতেই হঠাৎ আমার সেই সাধারণ কীপ্যাড ফোনটা বেজে উঠল। ওপাশ থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠ— “ওবাইদ! পার্ক সার্কাস আসতে পারবে?”
 
আমি কিছুটা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম—“কোথায়? আর কতক্ষণের মধ্যে?” উত্তর এল—“আধা ঘণ্টার মধ্যে, দিলখুশা নার্সিংহোমের পাশে।
 
আর দেরি করিনি। সঙ্গে সঙ্গে হোস্টেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম। মনে অজানা এক উত্তেজনা, কৌতূহল আর হালকা উদ্বেগ। ঠিক সময়েই পৌঁছে গেলাম নির্ধারিত স্থানে।
 
গিয়ে যা দেখলাম, তা যেন এক অন্য জগত! সুঠামদেহী, গাম্ভীর্যে পরিপূর্ণ, ব্যক্তিত্বময় একজন মানুষকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন একঝাঁক প্রফেসর ও স্কলারযাদের সামনে দাঁড়ানোর সাহসও আমাদের মতো ছাত্রদের সচরাচর হয় না। আমি দূরে দাঁড়িয়ে রইলাম, হৃদয়ে এক অদ্ভুত কম্পন নিয়ে।
 
কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে রওনা দেওয়ার সময় আমাকে উদ্দেশ্য করে বলা হলো— “কমপক্ষে ২০ মিটার দূরত্ব বজায় রেখে আমাদের ফলো করবে।
 
নির্বাকভাবে সেই নির্দেশ মেনে চলতে শুরু করলাম। প্রায় দশ মিনিট হাঁটার পর পৌঁছলাম একটি লাল রঙের পাঁচতলা ভবনের সামনে। সেখানে কিছুক্ষণ আলোচনা শেষে সবাই বিদায় নিলেন। আর আমি থেকে গেলাম সেই মহান ব্যক্তির সঙ্গে।
 
ভয়, সংশয় আর অজানা অনুভূতিকে সঙ্গে নিয়েই তাঁর সঙ্গে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাম। পাঁচতলায় পৌঁছে তিনি আমাকে ডাইনিং টেবিলে বসতে বললেন। মিষ্টি ও জলখাবার খাওয়ানোর পর তিনি নানা বইপত্র এনে সামনে রাখলেন এবং একে একে আমাকে সেসব দেখাতে শুরু করলেন।
 
অদ্ভুত এক পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম তাঁর মধ্যেসেই গাম্ভীর্যের আড়ালে যেন এক স্নেহময়, আন্তরিক মানুষ। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি আমাকে আপন করে নিলেন। আমার সব ভয়, সংকোচ যেন কোথায় মিলিয়ে গেল। তিনি আমার সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করলেন, আমার কথা আগ্রহভরে শুনলেন।
 
তারপর একটি বই এবং ইংরেজিতে হাতে লেখা একটি প্রবন্ধ আমাকে দিয়ে বললেন— “এগুলো কম্পোজ করে দিতে হবে”। আমি সময় নিলাম তিন-চার দিন। নিষ্ঠার সঙ্গে টাইপ করে আবার তাঁর কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি তা মনোযোগ দিয়ে সংশোধন করতে লাগলেন। আর সেই ফাঁকে আমাকে শেখাতে লাগলেন অনেক নতুন বিষয়। আর যেন আমার জীবনে জ্ঞানের এক নতুন দুয়ার খুলে গেল। চিন্তার পরিধি প্রসারিত হতে লাগলো, শেখার আগ্রহ বহুগুণে বেড়ে গেল।
 
এর আগে অবশ্য তাঁর সঙ্গে একবার দেখা হয়েছিলযখন আমি স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়ি। তখন মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পরীক্ষায় কোয়ালিফা করেছিলাম। সেই সময় আমার বড় ভাইয়ের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, তবে সেটি ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত, প্রায় অপরিচয়ের মতোই।
 
যাই হোক, ধীরে ধীরে যখন তাঁর সান্নিধ্যে আসতে শুরু করলাম, ঠিক সেই সময় কোলকাতায় রাবেতাতুল আদাব-ইসলামির পক্ষ থেকে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করা হলো পার্ক সার্কাস হাজ হাউসে, জিবরিল ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সহযোগিতায়  
 
সেমিনারের বিষয়বস্তুগুলো দেখে আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগলপশ্চিমবঙ্গে এমন একটি সেমিনার, অথচ বাংলার ওপর আরবি ভাষার প্রভাব নিয়ে কোনো আলোচনা নেই! এই ভাবনা থেকেই হঠাৎ করেই এক ধরণের সাহস জন্ম নিল। তড়িঘড়ি করে আব্দুল মাতিন ভাইয়ের টিউশন রুমে বসে একটা প্রবন্ধ প্রস্তুত করলাম।
 
প্রবন্ধটি যখন সেই মহান ব্যক্তিকে দেখালাম, তিনি আগের মতোই যত্নসহকারে তা সংশোধন করে দিলেন। শুধু তাই নয়, সেমিনারে তা উপস্থাপন করার জন্য আমাকে সাহস জোগালেন। তাঁর সেই উৎসাহ, সেই প্রেরণাআজও আমার হৃদয়ে অনুরণিত হয়।
 
যার ফোনে সেদিন আমি পার্কসার্কাস ছুটে গিয়েছিলাম, তিনি হলেন প্রোফেসর মহম্মদ মসিহুর রহমানতৎকালীন বিভাগীয় প্রধান, আরবি বিভাগ, মাওলানা আজাদ কলেজ, কোলকাতা। আর যাঁর কথা এতক্ষণ বলছিলামতিনি আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় শিক্ষক বি.আর. স্যার, অর্থাৎ প্রোফেসর বদিউর রহমান, রাহিমাহুল্লাহু তা’আলা!  
 
সেদিনের সেই প্রথম দেখাশুধু একটি সাক্ষাৎ নয়, বরং আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক আলোকময় মোলাকাত। তাঁর সান্নিধ্য আমাকে শিখিয়েছেজ্ঞান শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা একজন মানুষের আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুপ্রেরণার মধ্যেও বিকশিত হয়।
 
রাজারহাট, কোলকাতা
১৯ এপ্রিল ২০২৬

Wednesday, 22 April 2026

ফুটু ভাই - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



ফুটু ভাইতাঁর ভালো নাম কী আমার জানা নেই ছোট থেকেই দেখে আসছি, গ্রামের প্রায় সবাই তাঁকে ফুটু ভাই নামেই ডাকে ছোটোখাটো গড়ন, রোগা-পাতলা শরীর, কাঁচাপাকা চুল, সামান্য নুয়ে পড়া নাকের ডগা, গভীর কোটরে ঢুকে দুটো চোখ আর হাঁটবার সময় সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে হাঁটতেন
 
এমনিতে ফুটু ভাই খুব ভালো মানুষ ছিলেনতবে তাঁর মেজাজটা ছিল তিরিক্ষিহঠাৎ হঠাৎ রেগে যেতেন, আবার ঠাণ্ডাও হয়ে যেতেন খুব তাড়াতাড়িআর এই অনিয়ন্ত্রিত রাগের কারণেতাঁর সংসারজীবন বারবার ভাঙনের সম্মুখীন হয়েছে। শেষ পর্যন্ত একজনই আমৃত্যু তাঁর পাশে থেকেছেন, কখনো তাঁকে ছেড়ে যাননি, তিনি আমাদের কিনি ভাবি অদ্ভুত ভাবে, তাঁরও ভালো নাম আমার জানা নেই
 
কিনি ভাবি মাটির মানুষ। কথাবার্তায় তাঁর নিছক সরলতা খানিকটা ওই গ্রামীণ বোকা গোছের। ওর একটা ঘটনা লোকমুখে ছড়িয়ে আছে, একবার ওদের মাটির ঘরে টিনের ছাউনি দেওয়ার পর আগের টালিগুলো একপাশে তুলে রাখা ছিল। একদিন গ্রামের একজন এসে বলল, তার ঘর ছাওয়ার কাজে টালি কম পড়েছেযদি ক’টা টালি তাকে দেওয়া হয়, তাহলে তার উপকার হয়! কিনি ভাবির জবাব ছিল সোজাসাপ্টা—“মুই এইলা দিবানু। সামনে বাইশ্যা, পানিঝড়ির দিন, অতো জ্বালুনখড়ি কুঠি পাম, তখন এই টালিলা পুড়ি মুই ভাত-তরকারি আন্ধিবা পারিম।
 
দু’ বছর আগে ২০২৫-এর ঈদুল ফিতরের পরের দিন বারান্দায় বসে মোবাইল ঘাঁটছি। এমন সময় কিনি ভাবি আমাদের বাড়িতে আসলেন। জানতে পারলাম, তিনি ফেতরা সংগ্রহ করতে বেরিয়েছেন। এক বাড়ি থেকে কিছু চাল এনে আমাদের বাড়িতে রেখে আবার বেরিয়ে গেলেন আরও চাল সংগ্রহের জন্য। শেষে সব চাল একত্র করে একটা বস্তায় ভরলেন। এবার সেই বস্তা কীভাবে বাড়ি নিয়ে যাবেন, তাই নিয়ে চিন্তিত। কেউ একজন ওর জন্য একটা টোটো ডাকতে রাস্তায় গেল। সেই ফাঁকে মা তাকে ডেকে খোঁজখবর নিতে লাগলেনগল্পের মধ্যেই মা নিঃশব্দে কিছু টাকা তার হাতে গুঁজে দিলেন। কিনি ভাবি বুঝতে পেরে নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না। ছোট মাবলে মাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে আরম্ভ করলেন। বোধ করি, তাঁর সেই কান্নায় ছিল অভাব, ছিল লজ্জা ও কৃতজ্ঞতাআর ছিল এক অসহায় ও অভাবী জীবনযাত্রার দীর্ঘ ক্লান্তি।
 
আমার যতদূর মনে পড়ে, ফুটু ভাই বেশ হুনরীও ছিলেন। নানা রকম হাতের কাজে অসম্ভব দক্ষ ছিলেনখড়, টিন, টালি যা দিয়েই হোক, ঘর ছাওয়ার কাজ নিপুণভাবে করতে পারতেন। তবে তাঁর বিশেষ খ্যাতি ছিল ছাতা মেরামতির কাজেবর্ষা নামারগে দেখতাম, তিনি তাঁর সাজসরঞ্জাম নিয়ে বাঁশকুড়ি মোড়ে কালভার্টের ওপর বসে এক মনে ছাতা সারাইয়ের কাজ করে চলেছেনএকে একে মানুষজন ছাতা নিয়ে আসছেকারও ছেঁড়া কাপড় বদলে দিচ্ছেন, কারও ভাঙা ডান্ডি পালটে নতুন ডান্ডি লাগিয়ে দিচ্ছেন, কারও ভাঙা হুক ঠিক করে দিচ্ছেন। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় ভাঙাচোরা ছাতাগুলো যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে
 
তবে তাঁর রাগ ছিল তীব্র ও আকস্মিক। মাঝসাঝে একটুতেই রেগে যেতেন। একবার গ্রামের কারো একটা ছাতা ঠিক করেছিলেন। কোনোভাবে দুদিন পর সেটা আবার খারাপ হয়ে গেল। তার জন্য গ্রামের কিছু দুষ্টু ছেলে আর কিছু রসিক মানুষ তাঁর পেছনে লেগে গেলতারা তাঁকে খোঁচাতে শুরু কর— “এই যে ফুটু ভাই, তুই কীরম ছাতা ঠিক করলু? দুদিনেই খারাপ হই গেল!কেউ বল— “ফুটু ভাই মনে হয় ঠিকঠাক ছাতার কাজ জানে না!কেউ আবার আরও একধাপ বাড়িয়ে বলল— “ফুটু ভাই কিস্সু জানে নাএই সব শুনে তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়লেন নিজের সমস্ত সরঞ্জাম নয়ঞ্জলিতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, অভিমানভরা পায়ে হন হন করে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন
 
ফুটু ভাই ধর্মভীরুও ছিলেন। গ্রামের আর পাঁচ জনের মতোই নিয়মিত নামাজ পড়তেন। রোজা করতেন। প্রতি রমজানে নিজের বাবা-মায়ের নামে গোর জিয়ারত করতেন। তখন আমাদের গ্রামে একটা রীতি প্রচলিত ছিল রমজান মাসে লোকজন গোর জিয়ারতের দাওয়াত দিত, আসরের নামাজের পর সবাই মিলে কবরস্থানে গিয়ে মা-বাবা ও অন্য সকল মৃতের জন্য দোয়া করতো, তারপর ফিরে এসে যে বা যারা দাওয়াত দিয়েছিল তাদের বাড়িতে ইফতার করএখন সেই রীতি লোপ পেয়েছে। ইদানীং দিন নির্ধারণ করে নয়, বরং যে যার সুবিধা মতো গোরস্থানে যায়, সকল মাইয়েতের জন্য দুআ করে। আর কে কবে ইফতার করাবে, তারাবিহ্‌র নামাজ শেষে দাঁড়িয়ে দাওয়াত দেয়।
 
একবার ফুটু ভাই গোর জিয়ারতের দাওয়াত দিয়েছিলেন। অভাবের সংসার, বে আন্তরিকতায় কোনো খামতি ছিল না। আদা-কালাই দিয়ে ইফতার, তারপর ক্ষীরমুড়ি, শেষে ডিম-ভাতএই ছিল তার সামর্থ্য মাফিক আয়োজন। আমি তখন কিশানগঞ্জ মাদ্রাসার ছাত্র, রমজানে বাড়ি এসেছি। দাওয়াত পেয়ে আমিও গেলাম। ইফতারের সময় হয়ে গেছে, কিন্তু ইমাম সাহেব কেন জানি আসেননি। একটু অপ্রস্তুত হয়ে ফুটু ভাই আমাকে বললেন— “ভাই, মোলবী সাহেব তো আসিলি না, তুই এনা মোর বাপ-মায়ের নাগিন দু করি দিনা
 
আমি তখন ছাত্র, অল্পবিদ্যার মানুষ, তবু যা জানতাম তাই দিয়ে দু’আ শুরু করলাম। দুআর মাঝে যখন রাব্বির হাম্‌হুমাপড়ে, তার অর্থ বাংলায় বিড়বিড় করে বললাম, ফুটু ভাই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। তাঁর কান্না দেখে অনেকের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। হয়তো তখন তাদের চোখে নিজ মৃত মা-বাবারর স্মৃতি ভর করেছিল।  
 
অভাব ফুটু ভাইয়ের চিরসঙ্গী ছিল। ফলে তাঁর সামান্য যেটুকু জমি ছিল, একসময় তিনি সেটাও বিক্রি করেতে বাধ্য হন। তবে তার মধ্য থেকে কিছু টাকা দিয়ে তিনি মসজিদের জন্য একটা লোহার গেট দান করেছিলেন। বহু বছর তাঁর ওই গেট খুলে শত শত নামাজি মসজিদে ঢুকেছে-বেরিয়েছে। তবে কবছর আগে আমাদের গ্রামের মসজিদটা নতুন করে নির্মিত হয়েছেবেশ বড়সড়, সুন্দর, ঝকঝকে-তকতকে, মোজাইক করা। তাতে নতুন একটা কাঠের গেট লাগানো হয়েছে। আর ফুটু ভাইয়ের দান করা সেই লোহার গেটটা পড়ে আছে এক কোণে, সময়ের প্রবাহে পরিত্যক্ত হয়ে। সেদিন রমজানে তারাবিহ্‌র পর মসজিদ থেকে বেরিয়ে আমরা কজন মসজিদের নানা কাজ নিয়ে গল্প করছি। এমন সময় হারুন মামা কাছে এসে ফুটু ভাইয়ের ওই লোহার গেটটার দিকে ইশারা করে বলল— “লোকটা ভালোবেসে গেটটা দান করেছিল, ওটাকে কোথাও কাজে লাগাতে হবে, মামা”  
 
তার ওই কথায় বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় উঠল। মনে হলো, মানুষটা ধীরে ধীরে স্মৃতি থেকেও হারিয়ে যাচ্ছে। আর তাঁর সেই ভালোবাসার দান পড়ে আছে নীরবে, অযত্নে। মুহূর্তেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো, এই তো সেদিনের কথা—আসরের নামাজের পর মসজিদের বারান্দা পেরিয়ে ফুটু ভাই বেরিয়ে যাচ্ছেন, মাথাটা সামান্য ঝুঁকে, চেনা ভঙ্গিতে হন হন করে হাঁটছেন নিজ বাড়ির পথে ফুটু ভাই চলে গেলেন, পেছনে পড়ে থাকলো বিকেলের এক টুকরো আলো, আর কিছু অপূর্ণ অমলিন স্মৃতি।
 
 হেস্টিংস, কোলকাতা
১০ এপ্রিল ২০২৬

Friday, 17 April 2026

গোসলপুনা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


আমাদের শৈশবের পৃথিবীটা যেন অন্যরকম ছিলঅদ্ভুত এক শান্তিতে ভরা। বর্ষা নামার আগেই পৃথিবী রঙ বদলাতে শুরু করত। আকাশে মেঘ তখনো পুরোপুরি জমে ওঠেনি, তার আগেই চাষিদের মনে বর্ষার আগমনী সুর বাজতে শুরু করে দিত। ভোরের আলো ফোটা মাত্রই তারা হাল কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ত। দূর থেকে দেখতাম, কুয়াশা ভেদ করে একে একে এগিয়ে যাচ্ছে মাঠের পথেকারো কাঁধে লাঙল, কারো কাঁধে মই, কারো হাতে কোদাল, তো কারো হাতে জোয়াল; আর সবার চোখে সোনালী ধানের নতুন স্বপ্ন।  
 
মাঠজুড়ে তখন এক অপূর্ব দৃশ্য। দলে দলে মানুষ হাল বাইছেলাঙলের ফাল জমির বুক চিরে দিচ্ছে, নতুন জীবনের জন্য প্রস্তুত করছে তাকেকেউ আবার চাষের পর জমিতে মই দিচ্ছে, কেউ জমির ঢেলা ভাঙছে। তারপর একটু বেলা বাড়লে সবাই কাজ থামিয়ে বসে পড়ছে আলেগামছা খুলে পোঁটলা থেকে বার করছে পান্তা ভাত, সাথে লবণ, কাঁচামরিচ, কাঁচা পেঁয়াজ, বরাত ভালো হলে বাসী তরকারী, কারো আলু ভর্তা, তো কারো তিসীর শানাসেই সরল আহারেও যেন ছিল এক অন্যরকম তৃপ্তি। মাঝেমধ্যে আমরা ছোটরা বাড়িতে না খেয়ে, বড়দের সাথে মাঠে গিয়ে ওই আলের মাথায় বসে পান্তা খেতাম। মনে হতো, এ যেন এক উৎসব, মাটির সাথে মানুষের গভীর ভালোবাসার উৎসব  
 
তারপর যখন সত্যিই বর্ষা নেমে আসত। মুষলধার বর্ষণে ভিজে যেতো মাটির বুক। আর ভেজা মাটির গন্ধে ভরে উঠত চারিদিক। আবার শুরু হতো নতুন করে হালচাষদ্বিতীয় দফাযাদের নিজেদের জমিজমা কম, তারা নিজেদের জমি চাষ হয়ে গেলে অন্যের জমিতে কাজ করতে যেত। কেউ হাল দিত, কেউ মই দিত, আর এভাবেই একটু একটু করে রোজগারের পথ খুলে যেত সেই দিনগুলোতে জীবন ছিল বহু কষ্টের, কিন্তু তাতে লোকজনের তেমন কোনো হাহাকার ছিল নাছিল একধরণে তৃপ্তি, সন্তুষ্টি আর সহজ স্বীকারোক্তি।
 
বর্ষা যখন পুরোপুরি নেমে আসত, তখন গ্রামটা যেন আরও ব্যস্ত হয়ে উঠত। শুরু হতো বাড়ি বাড়ি দিনমজুরদের আনাগোনাকেউ ধান লাগানোর কাজ নিত, কেউ বীজ তোলার ঠিকা, কেউ বা আল কাটার। একেকটা জমি ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে উঠত নতুন চারা রোপণের জন্য। মনে হতো, পুরো গ্রামটাই যেন একসাথে মিলে কোনো বিশাল বড় ওলিমা প্রস্তুতি নিচ্ছে
 
তারপর আরম্ভ হতো ধান লাগানো যেদিন কোনো বাড়িপ্রথম ধান রোপণ শুরু হতো, সেদিন তারা গোসলপুনার আয়োজন করতোআহামরি কিছু নয়, ভাত, ঠাকুরি কালাই (মাষকলাই)-এর গাঢ় ডাল, আর কচুর লতি ও শাক একসাথে সেদ্ধ করে বানানো এক বিশেষ তরকারিসাথে আলু ভর্তা, বা কাঁঠাল বীজের ভর্তা, বা অন্য কোনো সবজি খুবই সাধারণ আয়োজন। কিন্তু সেই সাধারণ আয়োজনের মধ্যে ছিল এক অসাধারণ স্বাদ। আর তখন তা আমাদের কাছে কোনো রাজকীয় ভোজের মতোই মনে হতো।  
 
যেদিন আমাদের বাড়িতে গোসলপুনা থাকতো, সেদিনটা ভোর থেকেই অন্যরকম মনে হতো আমারঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারতাম, আজ বাড়িতে বিশেষ কিছু আছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসতো খুটখাট শব্দ, মাটির চুলোয় জ্বলন্ত আগুনের কটকট আওয়াজ, মায়ের ব্যস্ত পায়ের শব্দসব মিলিয়ে এক অদ্ভুত উত্তেজনা জন্ম দিতো মনে।  
 
মা সেদিন খুব ভোরেই উঠে পড়তেন। প্রথমে ঠাকুরি কালাইয়ের ডালা নিয়ে বসতেন। গরম তাওয়ার উপর বালু দিয়ে হালকা করে কলাইগুলো ভেজে নিতেনআর তখন একটা মৃদু খসখস শব্দ বাড়িময় ছড়িয়ে পড়তো, সাথে এক চেনা গন্ধ তারপর সেই ভাজা কলাইগুলো যাতায় দিয়ে মা ধীরে ধীরে যাতা ঘুরিয়ে ডাল ভাঙতেন লক্ষ্য করতাম, তাঁর হাত এক অদ্ভুত ছন্দে ঘুরেই চলেছে। এ যেন ধৈর্য, অভ্যাস আর ভালোবাসার এক নিঃশব্দ প্রকাশ  
 
ডাল পিষার কাজ শেষ হতেই মা শাড়ির আঁচল গুটিয়ে পুকুরপাড়ের দিকে রওয়ানা দিতেন। অনেক সময় আমিও মায়ের পিছু পিছু যেতাম। পুন্যাদীঘির জলনিকাশি-নালায় তখন সারি সারি কচু শাক, সবুজে ভরা এক টুকরো স্বর্গ যেন। মা খুব যত্ন করে এক একটা লতি তুলতেন, তারপর কাদামাটি ধুয়ে আঁচলে জমাতেন। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো অস্থিরতা নেইসবকিছুই যেন এক গভীর মনোযোগ আর মমতায় ভরা। পরিমাণ মতো শাক তুলে মা যখন বাড়ি ফিরতেন, তখন তাঁর আঁচল ভরে কচু শা    
 
বাড়ি ফিরে মা সেগুলো খুব যত্ন নিয়ে পরিষ্কার করতেন। তারপর শুরু হতো রান্নাবান্নার কাজমাটির উনুনের ধোঁয়া, ফুটন্ত ডালের গন্ধ, আর কচু শাকের সুবাসধীরে ধীরে সারা বাড়ি ছড়িয়ে পড়ত। দুপুর গড়ানোর আগেই বুঝতে পারতাম, আজকের সেই প্রতীক্ষিত স্বাদ আর বেশিক্ষণ দূরে নেই।
 
রান্নাবান্না হয়ে গেলে, মা বাটিতে করে ডাল আর কচু শাক তুলে দিতেন আমার হাতে। বলতেন, “এইটা তোমার মেজোআব্বার বাড়িতে দিয়ে আসো, এইটা তোমার বড়আব্বার বাড়ি।আমি দায়িত্ব সহকারে একেকটা বাড়িতে সেই ডাল ও কচু শাক দিয়ে আসতামযেমন করে অন্যদিনে তারা আমাদেরকে দিয়ে গেছিল। আমাদের সেই দেওয়া-নেওয়ার মধ্যে কোনো হিসে ছিল না, না কোনো বাধ্যবাধকতা ছিলছিল কেবল আন্তরিকতা, সম্পর্কের উষ্ণতা আর একে অপরের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
 
আমরা ছোটরা গোসলপুনার খবর পেলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম হয়তো ডাক পড়বে, নয়তো কেউ এক বাটি ডাল ও একটু কচু শাকের তরকারি দিয়ে যাবে। সেই আশাতেই বসে থাকতাম। আর যখন সেই খাবার হাতে পেতাম, তখন মনে হতো এর চেয়ে সুস্বাদু পৃথিবীতে কিছু নেই। ধীরে ধীরে, তারিয়ে তারিয়ে, একেকটা লুকমা উপভোগ করতামযেন সেই স্বাদের সাথে মিশে আছে গ্রামের মাটি, মানুষের ভালোবাসা আর আমাদের সোনালী শৈশব।
 
আজকাল অনেক কিছুই বদলে গেছে। আগের সেই বিশাল মাঠ আর নেই, জমি চাষের সেই ব্যস্ততা নেই, সেই মানুষগুলো অনেকেই আর বেঁচে নেই। তবে ইদানীং কোনোদিন যখন শহরের কোনো রেস্তোরাঁয় বসে কচু-চিংড়ি পাতে তুলে নিই, হঠাৎ করেই মনে পড়ে যায় গোসলপুনার সেই সরল আয়োজন, সেই গাঢ় ডালের গন্ধ, আর কচু শাকের অমলিন স্বাদ। স্মৃতির পাতায় এক মায়াবী আলোর মতো জ্বলজ্বল করে। এখন আমার আর আগের মতো গ্রামের বাড়ি যাওয়া হয় না। গেলেও দেখি, গ্রামে এখন কেউ আর গোসলপুনা করে না। সেই রীতি প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার পথে হয়তো তাই আমার আর কোনোদিন গোসলপুনা খাওয়া হবে না; তবে ঠাকুরি কালাইয়ের সেই গাঢ় ডাল ও কচু শাকের সেই মাখামাখা তরকারি রয়ে যাবে আজীবন স্মৃতির ভাঁজে, ঝাপসা আলোর মতো, একটুখানি শান্তি রূপে   
 
মোমিনপুর, কোলকাতা
৬ মার্চ ২০২৬ 

Thursday, 9 April 2026

তুলাই ও টাঙন পেরিয়ে - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



আমি তখন খুব ছোটবয়স দেড় কিংবা দু’ বছর হবেসেই বয়সে আমার ছোট্ট নিষ্পাপ শরীর জুড়ে হঠাৎই একদিন ফুটে উঠল ক’টা দগদগে ঘাপ্রথমে ক্ষুদ্র ফুসকুড়ির মতো তুচ্ছ। কিন্তু কয়েক প্রহর গড়াতেই যেন অশুভ অঙ্কুরের মতো ফুলে-ফেঁপে ঢোল তার উপর কয়েক দিনের মধ্যেই সব ঘা জলে ভরে উঠলো আমি ব্যথায় ছটফট করতে লাগলাম। আর আমার ছোট্ট শরীরটা ক্রমাগত কাঁপতে লাগলো আমার অমন দুরবস্থা দেখে মা-বাবা’র বুকের ভেতর বইতে লাগলো এক অস্থির স্রোতহায় আল্লাহ্‌ এ কোন্‌ রোগ, এ কেমন দুর্দশা!
 
দিনে দিনে পরিস্থিত আরও ভয়াবহ রূপ নিলগ্রাম্য ডাক্তারদের সব শলাপরামর্শ, সকল ওষুধপাতিই ব্যর্থ হতে লাগল। কূলকিনারা না পেয়ে মা-বাবা দু’জনে মিলে সিদ্ধান্ত নিলেনআমাকে ইকড়াকুড়ি গ্রামের বিখ্যাত কাসেম ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন তবে আমাদের গ্রাম থেকে ইকড়াকুড়ির দূরত্ব কমপক্ষে তেরো-চৌদ্দ কিলোমিটার হবে; আর সেই সময় গ্রামীণ পথ-ঘাটে যানবাহন বলতে গরুর গাড়ি বা সাইকেল, নইলে পায়ে হেঁটেই যাত্রা। কথায় আছে, মায়ের ভালোবাসা পাহাড় কেটে পথ বানাতে পারে; সন্তান যখন কাঁদে তখন মায়ের দেহে যে-অদৃশ্য শক্তি নেমে আসে, তা উত্তাল তরঙ্গ হোক বা দুর্গম পর্বতশৃঙ্গ সবকিছুকেই হার মানায়।
 
তা-ই হল। মা-বাবা আমাকে কোলে নিয়ে রওনা দিলেন ইকড়াকুড়ির পথে। মাঝে দু-দু’টো নদী—তুলাই ও টাঙ্গন। তুলাই নদীর উপর তখন বাঁশের তৈরি ধাড়া, ধীর পায়ে সাবধানে তা অতিক্রম করে কিছুটা পথ এগোতেই টাঙ্গনযার স্রোত বর্ষা শেষেও বুনো ঘোড়ার মতো ছুটে চলেছেটাঙ্গনের তীরে গিয়ে তারা দেখল, স্রোত প্রবল, নৌকা ওপারের ঘাটে বাঁধা এবং মাঝির ছায়াও কোথাও নেই। কোলের শিশুকে বাঁচাতে মা তখন কী ভেবে আর কী করে যে সেসব করেছিলেনভাবলে আজও আমার মনে বিস্ময় জাগে   
 
মা শাড়িটা খুলে গায়ে একটা চাদর জড়ালেন। তারপর নেমে পড়লেন উত্তাল স্রোতের মুখোমুখি। মায়ের পেছন পেছন বাবাও জলে নেমে পড়লেন। সন্তানকে আঁকড়ে ধরে, দম ফেলে ফেলে, ধীরে ধীরে, কখনো বুক জলে ডুবে, তো কখনো ঢেউয়ের ধাক্কায় টাল খেয়েআশ্চর্য এক দৃঢ়তায় দু’জনেই নদী পার করলেন। ওপারে উঠে মা ভেজা চাদর ছেড়ে আবার শাড়ি পরলেন; তারপর আমাকে বুকে জড়িয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটা দিলেন কাসেম ডাক্তারের বাড়ির দিকে
 
কাসেম ডাক্তার আমার শরীর জুড়ে সেই দগদগে ঘা দেখে এবং মা-বাবা’র মুখে সব কথা শুনে, কপালের রেখা ঈষৎ সংকুচিত করে বললেন— “বাচ্চার অবস্থা ভালো নয়। আমার যেটুকু বিদ্যেবুদ্ধি তা দিয়েই বলছি, আজই ওষুধ খাওয়াতে হবে, না হলে সামনে বিপদ আছে।
 
ডাক্তারের কথা শুনে উদ্বেগ যেন হঠাৎই আকাশ গুঁড়ো করে নামল মা-বাবা’র মাথায়। সেই ওষুধ যে আশেপাশে কোথাও পাওয়া যাবে না; ডাক্তার বাবু স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন একমাত্র কুশমুণ্ডি বাজারেই পাওয়া যাবে। তাই বাবা সিদ্ধান্ত নিলেনতিনি সেখানেই যাবেন। তবে বাড়ি ফিরে পথে সময় নষ্ট না করে, ডাক্তারখানা থেকেই সেদিকে রওনা দেবেনআর মা আমাকে নিয়ে একা বাড়ি ফিরবেন।  
 
বাবা মাকে জিজ্ঞেস করলেন— “মজিদের মা, এতটা পথ একলায় যাবা পারিবু?”
মা অবিচল, শান্ত গলায় উত্তর দিলেন— “তোরা খালি মোক নদীটা পার করি দেও। বাকিটা মুই একলায় যাবা পারিম 
 
এ যেন মা নামক শক্তিরই এক অন্যরকম দ্যুতি। বাবা মাকে নদীর ওপারে পৌঁছে দিলেন। তারপর তিনি কুশমুণ্ডির পথে দীর্ঘ পদযাত্রা শুরু করলেন; আর মা শুরু করলেন একা পথচলাদুধের শিশুকে বুকে আঁকড়ে ধরে। বিস্তীর্ণ মাগুরাকুড়ির পাথার, চারিদিকে খাঁ খাঁ মাঠ; দুপুরের রোদ যেন মাথায় জ্বালা ধরাচ্ছেএকমাত্র মাঝখানে একটি আমগাছ; তার আগে কোথাও কোনো ছায়া নেইতার উপর রমজান মাসমা রোজাদার। ঘরে ফিরে আবার তাঁকে একা হাতে সব রান্নাবান্না সামলাতে হবে। এসব চিন্তা, শারীরিক কষ্ট, নির্জন মাঠের নীরবতাসব মিলিয়ে মার হাঁটার ভঙ্গি যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। তবুও যথা সম্ভব দ্রুত পায়ে বাড়ির পথে হাটছিলেন। ঠিক তখনই ভাগ্য স্নেহভরে দু’ হাত বাড়িয়ে দিলকিছুটা পথ এগোতেই আল্লাহ্‌র রহমতে গ্রামেরই এক মহিলার সাথে মা’র দেখা হলদুজনে মিলে কথার ভেলায় ক্লান্তি ভুলে ধীরে ধীরে পৌঁছে গেলেন বাঁশকুড়ি  
 
অন্যদিকে, বাবা একাই মাইলের পর মাইল হেঁটে অবশেষে কুশমুণ্ডি পৌঁছলেন। কত ফার্মেসি ঘুরলেন, কত দোকানে জিজ্ঞেস করলেন! শেষে একটা দোকানে ওষুধটা পেলেন। তারপর ওষুধ নিয়ে আবার পায়ে হেঁটে বাড়ির পথে রওনা দিলেন। বাড়ি পৌঁছে মা’কে ধরালেন সেই ওষুধ। আর মা ডাক্তারের নির্দেশ অনুযায়ী ওষুধ-কুসুম, পানিপথ্য সবই প্রয়োগ করলেন। অতঃপর মহান আল্লাহ্‌র অসীম রহমতে আমি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলাম।
 
বহু বছর বাদে, এখন আমি নিজেও দুসন্তানের পিতা যদি কোনোদিন সাবা বা সাওবান একটু অসুস্থ হয়ে পড়ে, আমার স্ত্রীকে দেখি ভীষণ অস্থির হয়ে ওঠে। তার চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত উৎকণ্ঠাছটফট করতে থাকে বারবার ফোন করে ডাক্তারদের; কখনো জামিরুল দাকে, কখনো আনসারিকে, তো কখনো সোহেলকে। একটার পর একটা উপসর্গের কথা বলে, যেন কোনোকিছুই বাদ না পড়ে। তারপর আমি ওষুধ এনে দিলে সে একদম নিয়ম মেনে, ঘড়ি ধরে, যত্ন করে সন্তানের মুখে তুলে দেয় প্রতিটা ওষুধ।
 
অদ্ভুত লাগেসে নিজেও ইদানীং নানা শারীরিক কষ্টে ভুগছে, তবুও তার নিজের যন্ত্রণা যেন সেই মুহূর্তে কোথা মিলিয়ে যায়! সন্তানের সামান্য কষ্টের সামনে নিজের সব ক্লান্তি, সব ব্যথা তুচ্ছ হয়ে পড়ে তার আর এই দৃশ্যগুলো নিঃশব্দে আমার হৃদয়ের ভেতর এক গভীর উপলব্ধির জন্ম দেয়।
 
মনের গহীনে এক অটল বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে—‘মাআসলে আত্মত্যাগের অপর নাম। মাতৃত্ব কোনো সম্পর্ক নয়; এ এক অনন্ত যাত্রা, এক বিস্ময়কর মহাকাব্য। এই যাত্রার প্রতিটা বাঁকে, কী আলো কী অন্ধকার সব ক্ষেত্রেই একজন মা নিজেকে বিলিয়ে দে, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক অবিরাম স্রোতে।
 
হয়তো এই কারণেই মহান প্রতিপালক সতর্ক করে দিয়েছেন—“তোমার মা-বাবা অসন্তুষ্ট হলে আমিও অসন্তুষ্ট হবো; আর তাঁরা সন্তুষ্ট থাকলে আমিও সন্তুষ্ট থাকবো বোধ করি, এই বাণী শুধু উপদেশ নয়, এটি এক চিরন্তন সত্য, এক অপরিবর্তনীয় বিধান, যা মানুষের জীবনকে পথ দেখায়। আমার ধারণা, আজও এই পৃথিবীর সকল আশ্রয়ের শুরু এবং শেষ, দুটোই যেন মায়ের কোলে এসে মিশে যায়। যেই কোলে লুকিয়ে আছে নিরাপত্তার প্রথম স্পর্শ, শান্তির শেষ ঠিকানা, আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক অনন্ত আকাশ।
 
বাঁশকুড়ি, দঃ দিনাজপুর
২৭ ডিসেম্বর ২০২৫