দুপুরের রোদ একটু নরম হয়ে এসেছে। উঠোনের এক পাশে কুয়ো। কুয়োর পাড়ে রাখা লোহার
বালতি,
তার সঙ্গে বাঁধা মোটা দড়ি। চারপাশে এক ধরনের চেনা নীরবতা। মাঝে মাঝে ভেসে আসছে গরুর ঘণ্টার
শব্দ,
দূরে কোথাও লোকজনের হাঁকডাক, আর কুয়োর ভেতর থেকে উঠে আসছে ঠান্ডা জলের সোঁদা গন্ধ।
হঠাৎ মা কুয়োর দিকে এগিয়ে গেলেন। আমি তখন কাছেই কোথাও খেলছিলাম, বা কিছু একটা করছিলাম—সব ছেড়ে ছুটে গেলাম—“মা,
জল তুলে দেব?” মা হয়তো কিছু বললেন,
হয়তো বা বললেন, “থাক, আমি তুলছি।”
কিন্তু ততক্ষণে আমার হাত বালতির দড়িতে। বালতিটা কুয়োর কালো মুখ দিয়ে নামছে। দড়িটা হাতের তালুর উপর দিয়ে পিছলে যাচ্ছে। নিচে তাকালাম, প্রথমে কিছুই দেখা গেল না। একটু পরে জলের উপর একটা ছোট্ট আলো কাঁপতে লাগলো। তারপর—
ছপাৎ!
বালতিটা জলে ডুবে গেল। আমি দড়ি টেনে বুঝতে
চেষ্টা করলাম, বালতি ভরেছে কি না। একটু পরেই দড়িটা ভারী হয়ে আসল। এবার আমার আসল কাজ শুরু। দু’ হাতে দড়ি ধরে টানছি। একবার। দু’বার। তিনবার। ধীরে ধীরে বালতি উপরে উঠছে। আর আমার হাত-পা যেন তার সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করছে। ছোট্ট শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দড়ি টানছি। কখনো দড়ি ধরে ঝুলে পড়ছি। পা মাটি থেকে উপরে উঠে যাচ্ছে, শরীরটা দোল
খেতে থাকছে। তবু দড়ি ছাড়ছি না। মনে হচ্ছে, আমি যেন একাই
একটা বিশাল ভারী জিনিস পৃথিবীর অন্তঃপুর থেকে টেনে তুলে আনছি। বালতি একটু একটু করে উপরে আসছে। আর তখন আমার চোখে কী
আনন্দ!
কিন্তু সেই আনন্দেরও কখনো কখনো পরিণতি ভালো হতো না। বালতি প্রায় কুয়োর মুখের কাছে। আর একটু হলেই হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলব। ঠিক তখনই
কোনোভাবে দড়িটা হাত থেকে ফসকে গেল। ছপাৎ! সব শেষ।
এক মুহূর্তে বালতিটা আবার অন্ধকারের মধ্যে তলিয়ে গেল। আমি হতভম্ব হয়ে কুয়োর ভেতর তাকিয়ে আছি। নিচে শুধু কালো জল।
বালতি নেই,
দড়ি নেই—শুধু অন্ধকার। মনে হল, এতক্ষণ ধরে যে বালতিটাকে উপরে তুললাম, সে যেন আমাকে
ফাঁকি দিয়ে আবার নিজের জগতে ফিরে গেল।
যতদূর মনে পড়ে, আমাদের শিশুবেলায় গ্রামেগঞ্জে জল নিয়ে লোকজনের এত বাছবিচার ছিল না। তৃষ্ণা পেলেই হল। সামনে নদী থাকলে নদীর জল, বিল থাকলে বিলের,
খাল থাকলে খালের, পুকুর থাকলে
পুকুরের। এমনকি ধানক্ষেতে কাজ
করতে করতে ক্ষেতে জমে থাকা জলও কখনো দু হাতের আঁজলা ভরে খেয়ে নিয়েছি। তবে গ্রামের মানুষের সে-সময় পানীয় জলের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল কুয়ো।
আমাদের গ্রামের চারদিকে চারটা কুয়ো ছিল—উত্তর পাড়ায়, পশ্চিম পাড়ায়,
বড়বাড়িয়ায় আর দক্ষিণ পাড়ায়। সকাল হলেই কুয়োর পাড়ে মানুষের
আনাগোনা শুরু হয়ে যেত। কারও হাতে বালতি, কারও হাতে কলসি,
কারও হাতে ঘটি। কেউ জল তুলছে
রান্নার জন্য,
কেউ গোসলের জন্য, কেউ গরু-ছাগলের
জন্য। কেউ ওজুর জল নিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছে। কুয়োর পাড় যেন গ্রামের লোকেদের একটা ছোট্ট মিলনস্থল।
তাছাড়া গ্রামের গুটি কয়েক বাড়ির মতো আমাদের বাড়িতেও একটা নিজস্ব কুয়ো ছিল।
আর সেই কুয়োটা ছিল আমার কাছে এক বিশাল রহস্যময় বস্তু। কুয়োর ভেতরটা এত গভীর
কেন? নিচে কতটা জল?
বালতি যখন অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে যায়, তখন সেটা কোথায় যায়?
জল ভরে উপরে ফিরে আসে কীভাবে?—শিশু মনে কত প্রশ্ন! আর সেই প্রশ্নের চেয়েও বড় ছিল কুয়ো থেকে নিজ হাতে জল তুলে আনার আনন্দ। আমি তক্কে তক্কে থাকতাম। মা বা বাবা কুয়োর দিকে গেলেই ছুটে
যেতাম।
—“মা,
তুমি সরে যাও, আমি তুলে
দিচ্ছি।”
—“বাবা,
তোমার জল লাগবে?”
উত্তরের অপেক্ষা করতাম না। যেন জল তোলা আমার জন্মগত দায়িত্ব।
কিন্তু কুয়োর সঙ্গে শুধু জল তোলার আনন্দই জড়িয়ে ছিল না; ছিল কোন কিছু
হারিয়ে ফেলারও গ্লানি। কোনোদিন হাত ফসকে বালতি তলায় পড়ে যেতো। কোনোদিন গ্লাস। কখনো বাটি, কখনো মগ। একবার আমার
হাত থেকে একটা চাকুও পড়ে গিয়েছিল। পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই কুয়োর
পাড়ে এসে দাঁড়াত— “কীভাবে পড়ল?”, “কোন পাশে পড়েছে?”, “কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।”
তারপর শুরু হতো খোঁজাখুঁজি। আমাদেরও একটা ‘কাকড়া’ ছিল—লোহার তৈরি এক অদ্ভুত যন্ত্র। দেখতে অনেকটা অঙ্কুশের মতো। চারদিকে ছোট ছোট
বাঁকানো লোহার দাঁত। তার সঙ্গে বাঁধা লম্বা দড়ি। কাকড়াটা কুয়োর মধ্যে নামানো হতো। পাশ থেকে তখন লোকজনের শলাপরামর্শ— “ধীরে ধীরে”, “আরও নিচে”, “আরও একটু”, “একটু ডানে”।
তারপর দড়ি ধরে সেটাকে জলের তলায় ঘোরানো হতো। আর
উপস্থিত লোকজন বলাবলি করতো— “এইদিকে দাও।”,
“না,
আরেকটু বাঁদিকে।”, “আস্তে... আস্তে...” সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করত। হঠাৎ দড়িতে টান পড়লে মনে হতো—লেগেছে! তারপর ধীরে ধীরে দড়ি টেনে কাকড়াটা জলের উপরে তোলা হতো। যদি বালতির গায়ে তার কোনো দাঁত আটকে যায়, তাহলে যেন
হারানো ধন ফিরে পাওয়া গেল। আর কুয়োর পাড়ে তখন ছোট্ট একটা উৎসবের আনন্দ।
তবে কাকড়া দিয়ে সবকিছু তোলা সম্ভব হতো না। তখন কুয়োর গভীরে নামতে হতো হারানো জিনিসের খোঁজে। আমাদের গ্রামেও কয়েকজন মানুষ ছিলেন, যারা জলের তলায় অনেকক্ষণ থাকতে পারতেন। তাঁরা যেন এক একজন ডুবুরি। কুয়োয় কোনো
জিনিস পড়ে গেলে তাঁদের খবর দেওয়া হতো। তাঁরা এসে
প্রথমে কুয়োর মুখের দিকে তাকাতেন। তারপর দড়ি কিংবা বাঁশের সাহায্যে ধীরে ধীরে
নামতে শুরু করতেন।
আমরা কুয়োর চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কারও চোখে ভয়।
কারও চোখে কৌতূহল। আমি তো চোখের পলক ফেলতাম না।
লোকটা একটু একটু করে নিচে নামছেন। তারপর জলের কাছে পৌঁছে গেলেন। মুহূর্তের মধ্যে
তাঁর মাথাটা জলের নিচে অদৃশ্য। চারদিকে
নিস্তব্ধতা।
অপেক্ষা, ভয় ও কৌতূহল মিলেমিশে একাকার। সবাই মুখে বিড়বিড় করছে “আল্লাহ্ রহম করো, আল্লাহ্”। তারপর হঠাৎ জলের উপর বুদবুদ উঠতে শুরু করত। আমাদের বুকের
ভেতর ধুকপুক।
একটু পরেই লোকটা জলের উপর ভেসে উঠতেন। হাতে হয়তো সেই হারানো চাকু, মগ কিংবা অন্য
কোনো জিনিস।
আমাদের চোখে তখন তিনি যেন কোনো সাধারণ মানুষ নন—একেবারে জলের তলা থেকে ফিরে আসা কোনো বীর।
এই কাজের বিনিময়ে তাঁদেরকে অনেক সময় এক-দুই কিলো চাল দেওয়া হতো। সেই চালই ছিল তাঁদের
পারিশ্রমিক,
তাঁদের হাদিয়া। আজকের দিনে ভাবলে অদ্ভুত লাগে, কিন্তু তখন এও ছিল গ্রামীণ জীবনের এক ধরনের পেশা।
আমাদের বাড়িতে তখন গরু-ছাগলের পাশাপাশি বিড়ালও ছিল অনেক। মেজদি ও ছোড়দি ভীষণ বিড়াল ভালোবাসত। তাদের কোলে নিত, খাওয়াত,
গোসল করিয়ে দিত। বিড়ালগুলোও যেন বাড়ির সদস্য হয়ে উঠেছিল। সারাদিন উঠোনে তাদের ছোটাছুটি। কখনো একে
অন্যকে তাড়া করছে।
কখনো রোদে গা এলিয়ে শুয়ে আছে। কখনো আমাদের পায়ের কাছে এসে লেজ ঘষছে। কুয়োর পাড়টাও তাদের একটা খেলার জায়গা ছিল।
একদিন একটি বিড়াল হয়তো সেখানে খেলা করছিল। খেলতে খেলতে এপাশ থেকে ওপাশে লাফ দিতে গিয়ে কোনোভাবে কুয়োতে পড়ে যায়। আমরা কেউই তা টের পাইনি।
বেলা গড়িয়ে যায়।
তারপর বড়দা আসরের সময় ওজুর জন্য জল তুলতে এসে কুয়োর নিচে তাকিয়ে থমকে গেল—“আরে! কুয়োয় তো একটা
বিড়াল!”
সবাই ছুটে এল।
কুয়োর ভেতর তাকিয়ে দেখা গেল—জলের মধ্যে বিড়ালটি পড়ে আছে। বালতি নামিয়ে
কোনোভাবে তাকে উপরে তোলা হলো।
কিন্তু ততক্ষণে সে মারা গেছে। সেই মুহূর্তে কুয়োটা যেন হঠাৎ বিষণ্ণ হয়ে গেল। কারণ সেই জলই তো আমরা খাই। রান্না হয়। ওজু করি। ইমাম সাহেবকে খবর দেওয়া হলো। তিনি বিধান
দেখে বললেন,
বিড়ালটিকে কুয়ো থেকে তুলে ফেলতে হবে এবং চল্লিশ বালতি
জল তুলে বাইরে ফেলে দিতে হবে।
তারপর গ্রামপঞ্চায়েতে খবর দেওয়া হলো। পঞ্চায়েতের লোকজন এলেন। কুয়োর জলে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দিলেন। কুয়োর চারপাশেও ছড়িয়ে
দেওয়া হলো। তারপর যাওয়ার সময় তাঁরা বলে গেলেন,
এক-দু’ দিন পর আবার জল ব্যবহার করা যাবে। দু’দিন পর আবার কুয়ো থেকে জল তোলা শুরু হলো। কিন্তু সেই জলে একটা আলাদা গন্ধ ছিল। ব্লিচিং পাউডারের তীব্র গন্ধ। জল হাতে নিলেই নাকে আসত সেই গন্ধ। তবু সেই জলই
আমরা খেতাম।
কারণ তখন আমাদের কাছে জল বেছে নেওয়ার এত সুযোগ ছিল না।
আজ এত বছর পর মনে হয়,
সেই কুয়োগুলো শুধু জল ধরে রাখেনি—আমাদের
শৈশবটাকেও যেন ধরে রেখেছিল।
সেখানে দড়ি ছিল, বালতি ছিল, অন্ধকার ছিল,
ঠান্ডা জল ছিল; আর ছিল আমাদের
ছোট ছোট হাতের শক্তি পরীক্ষা, দড়ি ছুটে যাওয়ার ভয়, হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ার আনন্দ, ডুবুরি নামার
উত্তেজনা,
বিড়ালের জন্য মন খারাপ হয়ে যাওয়া—আরও ছিল মানুষের পরস্পরের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকার এক সরল পৃথিবী।
আজ আর কুয়োর পাশে দাঁড়ানোর বয়স আমাদের নেই। কুয়োর দড়ি ধরে ঝুলে পড়ার মতো ছোট্ট শরীরও নেই। তাছাড়া কুয়োগুলোও আর নেই। কোনোটা মাটির সঙ্গে মিশে
গেছে,
কোনোটা আগাছায় ঢেকে গেছে, কোনোটা জলের আধুনিক ব্যবস্থার
কাছে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। নতুন ঘর বানাতে গিয়ে আমাদের কুয়োটাকে বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্মৃতির ভেতর কুয়োটা এখনও ঠিক আগের মতোই— রোদে তার পাড় গরম হচ্ছে। দড়ি ঝুলছে। বালতি নিচে নামছে। আমি ছোট্ট দু’ হাতে দড়িটা আঁকড়ে ধরে আছি। মা একটু দূরে দাঁড়িয়ে বলছেন— “আস্তে,
পড়ে যাস না আবার!” আমি শুনছি না। আমার সমস্ত মনোযোগ বালতিতে। বালতি উঠছে।
আরও একটু... আরও একটু... হঠাৎ দড়িটা আমার হাত থেকে ফসকে গেল—ছপাৎ!
কুয়োর অন্ধকারে আবার হারিয়ে গেল বালতিটা।
আমি কুয়োর মুখে ঝুঁকে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখছি, কুয়োর
জলে কোথাও যেন শৈশবের
দিনগুলো আবছা আলোয়
ভাসছে।”
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মোমিনপুর, কোলকাতা


