দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামার উপক্রম। আমবাগানের গাছপালার ফাঁক দিয়ে রোদের তেজ ধীরে ধীরে কমে আসছে। সারাদিনের খাটাখাটুনিতে
ক্লান্ত চার-পাঁচজন শ্রমিক আপনমনে কাজ করে চলেছেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাঁদের
কথাবার্তাও চলছে—সংসার, ছেলেমেয়ে, অভাব-অনটন, দেনা-পাওনা, ভবিষ্যৎ ভাবনা নানা বিষয়ে। কথাগুলো হয়তো খুব সাধারণ, কিন্তু প্রতিটি
শব্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে জীবনের না-বলা কষ্ট, দীর্ঘশ্বাস ও অপূর্ণতার গল্প। তারই এক ফাঁকে একজন বলে উঠল—
—“হামার বাড়িত আইজ রান্না করিবার মতোন এক মুঠ চাউলও নাই। মহাজন টাকা দিলে চাউল
কিনি বাড়িত নিযাম।”
কথাটি তিনি খুব স্বাভাবিকভাবেই
বলেছিলেন। আসলে অভাবের সঙ্গে দীর্ঘদিন বসবাস করতে করতে মানুষ নিজের দুঃখকেও খুব
সহজভাবে বলতে শিখে যায়। কিন্তু তাঁর সেই কথা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোরের হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে
গেল। কিশোরটি ছিল অল্পবয়সি, স্কুলপড়ুয়া। ঘটনাচক্রে সে ছিল ওই
আমবাগানের মালিক পরিবারের সন্তান। বয়সে ছোট, কিন্তু তার হৃদয় যেন বয়সের চেয়ে
অনেক বড়।
গত জুম’আর
খুতবায় ইমাম সাহেব বলেছিলেন, “আপনি মোরগ-পোলাও চিবোতে চিবোতে লম্বা লম্বা ঢেকুর তুলেন; আর
আপনার পাশের বাড়িতে অভাবে উনুন জ্বলে না, এই আপনার ,মুসলমানিত্ব”—সেই কথা মনে পড়তেই তার গা কাঁটা দিয়ে
উঠলো। বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা নামার পালা। শ্রমিকেরা এবার কাজ গুটিয়ে বাড়ি
ফিরবেন, ছেলেটি বাড়ির দিকে ছুটে গেল। হেঁসেল থেকে কিছু চাল বের করে একটা গামছায়
মুড়ে ছোট্ট একটা পুঁটলি বানাল। তারপর এক মুহূর্তও দেরি না করে পুঁটলি হাতে ছুটল
আমবাগানের দিকে। সোজা গিয়ে দাঁড়াল সেই দিনমজুরের সামনে। পুঁটলিটা তাঁর
হাতে দিয়ে বলল,
—“কাকা বো, এই চাউললা বাড়িত নি যাও। আইজ রাইতে আন্ধি করে বাড়ির সবাই মিলি পেট ভরি ভাত খাবেন। আর কুনোদিন যুদি এইরম পরিস্থিতি হয়, তাইলে হামার
বাড়িত চলি আসিবেন। চাইরটা ভাতের ব্যবস্থা হাঁরা করি দিমোঁ।”
তাঁদের পরিবার ছিল জমিদার-গোছের।
এলাকায় তাঁদের প্রচুর জমিজমা ছিল—চৌষা থেকে পুকুরপাড়া পর্যন্ত। লোকজন
সেই জমি ইজারা নিত, কেউ ভাগে চাষ করত, কেউ আধিতো। এলাকায় তাঁদের বেশ নামডাক ছিল। বিপদে-আপদে লোকজন সাহায্যের জন্য তাঁদের কাছে
ছুটে যেতো। তাই খুব কাছ থেকে সে লোকজনের অভাব-অনটন, দুঃখ-কষ্ট দেখার সুযোগ
পেয়েছিল। ফলে ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে জন্ম নিয়েছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক সহজাত
প্রবণতা।
তারপর সময় এগিয়ে চলল নিজ নিয়মে।
বহু বর্ষা বয়ে গেলো তুলাইয়ের স্রোতে। ছেলেটি ধীরে ধীরে বড় হলো। উচ্চমাধ্যমিক
পাশ করে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দিল মালদায়। কয়েক বছর সেখানে পড়াশোনা করল। তারপর
ডিগ্রি সম্পন্ন করে যখন নিজের গ্রামে ফিরে এল, তখন তার সামনে জীবনের এক জটিল
প্রশ্ন—এবার কী করবে?
সেই সময় সে দেখল—গ্রামের মানুষদেরকে
চাল-ডাল, তেল-নুন, মশলাপাতি, সাবান সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে সাপ্তাহিক হাটের জন্য অপেক্ষা করতে
হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের এই অপেক্ষায় শুধু অসুবিধাই হয় না; বরং দূরত্ব, সময়, দাম এবং প্রাপ্যতার কারণেও তাঁদের নানান সমস্যায় পড়তে হয়।
সে সিদ্ধান্ত নিল—কদমডাঙ্গা মোড়ে
একটা বড় মুদিখানার দোকান করবে। এমন একটা দোকান, যেখানে একসঙ্গে চাল-ডাল থেকে শুরু
করে তেল, মশলা, সাবান—প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই পাওয়া যাবে। ব্যবসার
পাশাপাশি, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস যেন গ্রামের মানুষ হাতের নাগালে পায় এবং ন্যায্য মূল্যে পায়—সেই চেষ্টা থেকেই শুরু হলো তার মুদিখানার ব্যবসা।
গ্রামীণ সমাজে কেউ নতুন কিছু করলে
যা হয়, তা-ই হলো—সমালোচনা, মন্তব্য, টিটকারি কতকিছু। কেউ কটাক্ষ করে বলল—এসব করার কী
দরকার! কিন্তু সে থামল না। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে কাজ করে
যেতে লাগল। পাশাপাশি, তাকে পেয়ে বসলো সমাজসেবার নেশা—অসুস্থ মানুষকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে
যাওয়া, প্রয়োজনে হাসপাতালে ছুটে যাওয়া, কাউকে ভর্তি করানোর জন্য ছোটাছুটি
করা, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার বিষয়ে পরিবারকে সচেতন করা, মানুষকে শিক্ষার
গুরুত্ব বোঝানো ইত্যাদি।
মানুষের জন্য সময় দিতে গিয়ে
দোকানে সময় দেওয়া কমে গেলো। ফলে তার ব্যবসা স্বাভাবিকভাবেই
ক্ষতিগ্রস্ত হলো। কিন্তু জীবনের কিছু ক্ষতি কখনো কখনো অন্য এক ধরনের প্রাপ্তির
দরজা খুলে দেয়। মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে তার পরিচিতি বাড়তে লাগল। নানা শ্রেণি, নানা পেশার
মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হলো। মানুষ কাছ থেকে তাকে চিনতে শুরু করল। ধীরে
ধীরে সেই পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ল। একসময় সেই পরিচয়ের সূত্র ধরেই
বিভিন্ন পরিবার থেকে তার জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসতে শুরু করল। শেষে প্রাণসাগরের এক ভদ্রলোক নিজ মেয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠালেন। মেয়েটি
শিক্ষিত, চাকরিজীবী। দুই পরিবারের মধ্যে কথাবার্তা হলো, জানাশোনা হলো, ধীরে ধীরে
সম্পর্কটি বিবাহবন্ধনে পরিণত হলো।
বিয়ের পর তাঁর জীবন এক নতুন পথে
বাঁক নিল। স্ত্রীর কর্মস্থলের দরুন তাকে নিজ এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হলো। ফলে মুদিখানার
ব্যবসাও ছাড়তে হল। কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নেশা তিনি ছাড়লেন না। বরং নতুন জায়গায় গিয়ে
মানুষের সঙ্গে মেলামিশা করে, তাঁদের জীবনযাপন দেখে তাঁর মনে
জন্ম নিল—একটা স্কুল গড়ার স্বপ্ন। অতঃপর ২০০১ সালে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন শুরু হলো।
শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠা তিনি করলেন বেস আন-নূর মডেল স্কুল।
শুরুটা ছিল খুব ছোট পরিসরে। প্রি-নার্সারি, নার্সারি—এই কয়েকটা ক্লাস দিয়ে। কিন্তু স্বপ্ন যখন বড় হয়, তখন ছোট্ট পরিসর
বেশিদিন ছোট থাকে না। ধীরে ধীরে স্কুলের পরিধি বাড়ল।
তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থাও চালু হলো। সেখানকার
ছাত্ররা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ভালো স্কুলে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পড়ার সুযোগ
পেল।
ছোট্ট একটা স্বপ্ন ধীরে ধীরে বড়
হতে লাগল। অনেকেই তাঁর সঙ্গে যুক্ত হলেন, স্কুল গড়ে তোলার কাজে অংশ নিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিন্তার পার্থক্য, মতের অমিল—এসবও সামনে এল।
একসময় অনেকেই আলাদা পথে চলে গেলেন। ফলে নানা ধরণের সংকট তৈরি হল। কিন্তু তিনি দমে গেলেন না, শক্ত হাতে স্কুলটির হাল ধরলেন। লড়াই জারি রাখলেন। রাতদিন এক করে দিলেন। একের পর এক প্রতিকূলতাকে ডিঙিয়ে নিজ
লক্ষ্যে অবিচল থাকলেন।
নার্সারি থেকে শুরু হওয়া সেই
প্রতিষ্ঠান বড় হতে হতে একসময় মাধ্যমিক হলো, তারপর উচ্চমাধ্যমিক। ছেলেদের
পাশাপাশি মেয়েদের জন্য আলাদা শাখা প্রতিষ্ঠিত হলো। কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হলো। পরবর্তীতে
বিভিন্ন জেলায় তার শাখা গড়ে উঠতে শুরু করল। আর আজ সেই প্রতিষ্ঠান উত্তরবঙ্গের
অন্যতম বৃহৎ সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের
শিক্ষা-পরিসরেও তার একটা উল্লেখযোগ্য স্থান তৈরি হয়েছে।
কিন্তু তাঁর স্বপ্ন শুধু
শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে থাকেনি। শিক্ষার
পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও নানা উদ্যোগ নিয়ে চলেছেন তিনি। ঈদ মিলন অনুষ্ঠান, শীতকালে দরিদ্র মানুষদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ, আর্ত ও পীড়িত মানুষদের পাশে
দাঁড়ানো, শিকড়ের টানে গ্রামে ফিরে এলাকাবাসীর সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়া, বন্যা কিংবা
অন্য কোনো দুর্যোগে পাশে দাঁড়ানো। এর পাশাপাশি শুরু হল বৌদ্ধিক ও
সাংস্কৃতিক চর্চা। মানুষের মধ্যে নতুন চিন্তা, নতুন চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া; প্রচলিত সামাজিক
চিন্তাভাবনাকে কখনও প্রশ্ন করা; সমাজকে আরও মানবিক, শিক্ষিত ও সচেতন
পথে এগিয়ে দেওয়া ইত্যাদি।
কিছুদিন আগে, হরিপুরে গার্লস শাখার
নতুন ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছিল। প্রচণ্ড রোদ সেদিন। মাথার উপর যেন
আগুন ঝরছে। ছাদে রড বাঁধার কাজে ব্যস্ত শ্রমিক ও মিস্ত্রিরা। তীব্র গরমে তারা দরদর
করে ঘামছে। তাঁদের শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। তিনি নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কাজকর্ম তদারকির উদ্দেশ্যে একসময় ছাদে উঠলেন। দেখলেন, ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়েও
সেই গরম সহ্য করা যাচ্ছে না। অথচ শ্রমিকেরা ছাতা ছাড়াই সেই প্রখর
রোদে কাজ করে চলেছেন। বিষয়টি তাঁর মনকে ব্যথিত করল। দ্রুত নিচে নেমে স্কুলের কর্মচারীদের বললেন, শরবতের ব্যবস্থা করতে।
গুলকন্ডি ইত্যাদি দিয়ে শরবত তৈরি
করা হলো। অন্য কাউকে দিয়ে সেই শরবত তিনি অনায়াসে উপরে পাঠিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তা করলেন না। নিজেই শরবতের বালতি হাতে নিয়ে
ছাদে উঠলেন। একে একে শ্রমিক, মিস্ত্রি ও কর্মচারীদের নিজ হাতে
শরবত পান করালেন।
দৃশ্যটা হয়তো খুব সাধারণ। কিন্তু এই সামান্য দৃশ্যের মধ্যেই যেন বহু বছরের একটা কাহিনী লুকিয়ে আছে। সেদিন আমবাগানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কিশোরের হাতে ছিল এক পুঁটলি চাল আর আজ এত বছর পরে, সেই একই মানুষ নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন এক বালতি শরবত। সময় ও জায়গা
বদলেছে। পরিস্থিতিও বদলেছে। ছোট্ট আমবাগানের জায়গায় এক বিশাল
শিক্ষাঙ্গন। সেই কিশোর আজ সেই বৃহৎ শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন ও দায়িত্ব বহন করছেন। শুধু
বদলায়নি একটা জিনিস—মানুষের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ। তখন একজন শ্রমিকের ঘরে রাতের ভাতের
ব্যবস্থা করতে তিনি এক পুঁটলি চাল নিয়ে ছুটেছিলেন। আর আজ শ্রমিকদের তৃষ্ণা মেটাতে
নিজেই শরবতের বালতি হাতে ছাদে উঠেছেন। এই দৃশ্য দু’টির মধ্যে ব্যবধান হয়তো কয়েক
দশকের। কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব একটুও বাড়েনি।
আমরা যারা তাঁর এই দীর্ঘ পথচলার
কোনো না কোনো পর্বের সাক্ষী, আমাদের কাছে এই কথাগুলো শুধু একজন
ব্যক্তির সাফল্যের গল্প নয়। এ গল্প হল অন্যের জন্য কিছু করার প্রবণতা ও মানসিকতার। একটা ছোট্ট আমবাগান থেকে শুরু হওয়া সেই সফর আজ এক বিশাল শিক্ষাঙ্গনের ছায়ায়
এসে দাঁড়িয়েছে। এক পুঁটলি চাল থেকে হাজার হাজার শিশুর স্বপ্নপূরণের ঠিকানায়। তবে তাঁর শিকড় এখনও মাটির গভীরে—তুলাইয়ের তল্লাটে সেই প্রত্যন্ত
গ্রামে, চাষাভুষা দিনমজুরদের মাঝে, আমবাগানের পাতায় লেগে থাকা গোধূলি
আলোয়, যেখানে সেদিনের সেই কিশোর, আজকের খাদেমুল ইসলাম প্রথম শিখেছিল— মানুষের পাশে
দাঁড়াতে বড় কিছু লাগে না, লাগে শুধু একটা মানবিক মন, একটা সংবেদনশীল হৃদয়।
২৬ সেপ্টেম্বর
২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা


