Pages

Friday, 1 May 2026

আধুনিক আরবি কবিতা: বিকাশ, বৈশিষ্ট্য ও কবিগণ - ড. আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



আধুনিক আরবি কবিতা এক দীর্ঘ রূপান্তরের ফসলযেখানে প্রাচীন ঐতিহ্যের দৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে নবচেতনা, সৃষ্টিশীলতা ও মননের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। উনবিংশ শতাব্দীর আরব পুনর্জাগরণ (নাহদা), পাশ্চাত্যের সঙ্গে বর্ধিত যোগাযোগ, শিক্ষা ও মুদ্রণব্যবস্থার উন্নয়ন, এবং বহুবিধ রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবর্তন এই রূপান্তরের পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এর ফলে আরবি কবিতা শুধু তার রূপ-রীতিতেই নয়, ভাব ও দৃষ্টিভঙ্গিতেও এক মৌলিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়।
 
আধুনিক আরবি কবিতার বিকাশ 
আধুনিক আরবি কবিতা সময়ের প্রবাহে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে ক্রমে পরিণত রূপ লাভ করেছে
 
(ক) পুনর্জাগরণ বা ক্লাসিক ধারাঃ এই ধারা আধুনিকতার সূচনালগ্নকে নির্দেশ করে। এ সময়ের কবিরা প্রাচীন আরবি কাব্যের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যবিশেষত আব্বাসীয় যুগের শিল্পরীতিপুনরুজ্জীবিত করতে সচেষ্ট হন। ছন্দ, অন্ত্যমিল ও কাঠামোগত শৃঙ্খলা বজায় রেখেও তারা ভাষা ও ভাবপ্রকাশে সূক্ষ্ম নতুনত্বের সঞ্চার করেন। প্রশংসা, শোকগাথা ও আত্মগৌরবের পাশাপাশি দেশপ্রেম ও সামাজিক চেতনার সুরও এ সময়ের কবিতায় ধ্বনিত হয়। এই ধারার উজ্জ্বল প্রতিনিধি হলেন মাহমুদ সামী আল-বারুদী, আহমাশাকী এবং হাফিজ ইবরাহীম।
 
(খ) রোমান্টিক বা আবেগপ্রবণ ধারাঃ বিশ শতকের প্রথমার্ধে উদ্ভূত এই ধারা ক্লাসিক রীতির অনমনীয়তা থেকে মুক্তির এক সজীব প্রত্যয় বহন করে। এখানে কবির অন্তর্জগৎ, ব্যক্তিমানসের সূক্ষ্ম অনুভব ও আবেগময় অভিজ্ঞতা বিশেষ গুরুত্ব পায়। প্রকৃতির সান্নিধ্য, একাকিত্বের বেদনামিশ্রিত সৌন্দর্য, কল্পনার উন্মুক্ততাএসবই এই কবিতার প্রাণ। এই ধারার বিশিষ্ট কবিদের মধ্যে আছেন ইব্‌রাহীম নাজি, আলি মাহমুদ তাহা, মিখাইল নুয়াইমা, ইলিয়া আবু মাজী এবং খালিল মুরানযাঁদের রচনায় হৃদয়ের নিবিড় স্পন্দন ধ্বনিত হয়েছে।  
 
(গ) মুক্তছন্দ বা তাফইলা কবিতাঃ চল্লিশের দশকে আরবি কবিতা এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। প্রচলিত পঙ্‌ক্তিবদ্ধ কাঠামো ভেঙে দিয়ে কবিরা নতুন ছন্দচেতনার অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হন। তাফইলাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই কবিতায় ভাবপ্রকাশ পায় অধিক স্বাধীনতা, প্রবাহমানতা ও স্বাভাবিকতা। একক অন্ত্যমিলের বাধা শিথিল হয়ে কবিতার অভিব্যক্তি হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত ও গভীর। এই নবধারার পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন বদর শাকির আ-সাইয়াব এবং নাজিক আল-মালাইকা।  
 
(ঘ) গদ্যকবিতাঃ বিশ শতকের মধ্যভাগে উদ্ভূত গদ্যকবিতা আরবি কাব্যধারায় এক ভিন্নমাত্রা যোগ করে। এখানে ছন্দ ও অন্ত্যমিলের প্রচলিত নিয়ম সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত হলেও, অন্তর্লীন সুর, চিত্রকল্প ও ভাবগভীরতা কবিতাকে স্বতন্ত্র সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত করে। এই ধারা নিয়ে মতভেদ থাকলেও এর শিল্পমূল্য অস্বীকার করা যায় না। এই ধারার উল্লেখযোগ্য কবিদের মধ্যে রয়েছেন আদুনিস, আনসি আল-হাজ্জ, মুহাম্মদ আল-মাগুত এবং সারকুন বুলুস।
 
আধুনিক আরবি কবিতার বৈশিষ্ট্য 
আধুনিক আরবি কবিতা তার স্বাতন্ত্র্য নির্মাণ করেছে নানাবিধ বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে
(ক) রূপ ও গঠনে নবচেতনা: কবিতা প্রথাগত কাঠামোর সীমা অতিক্রম করে বহুরূপী প্রকাশভঙ্গি অর্জন করেছে।
(খ) ছন্দের বৈচিত্র্য ও স্বাধীনতা: একঘেয়ে অন্ত্যমিলের পরিবর্তে এসেছে পরিবর্তনশীল ছন্দ, এমনকি অন্তর্লীন সুরের সূক্ষ্ম ব্যবহার।
(গ) বিষয়ের ব্যাপ্তি ও গভীরতা: ব্যক্তিমানস থেকে শুরু করে সমাজ, রাজনীতি, মানবিক সংকটসবকিছুই কবিতার পরিসরে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
(ঘ) পাশ্চাত্য প্রভাবের সংমিশ্রণ: রোমান্টিকতা, প্রতীকবাদ, অতীন্দ্রিয়বাদ ও অস্তিত্ববাদ কবিতাকে নতুন দার্শনিক মাত্রা দিয়েছে।
(ঙ) প্রতীক ও ইঙ্গিতময়তা: সরল বক্তব্যের বদলে ইঙ্গিত, প্রতীক ও রূপকের মাধ্যমে ভাব প্রকাশিত হয়েছে গভীরতর ও শিল্পসম্মত ভঙ্গিতে।
(চ) ব্যক্তিসত্তার উন্মেষ: কবির ব্যক্তিগত অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা কবিতার কেন্দ্রস্থলে স্থান পেয়েছে।
(ছ) চিত্রকল্প ও কল্পনার প্রসার: সমৃদ্ধ চিত্রকল্প ও সৃজনশীল কল্পনা কবিতাকে নান্দনিক ঔজ্জ্বল্যে ভরিয়ে তুলেছে।
(জ) ভাষার অভিনব রূপ: কখনো সহজ, কখনো প্রতীকধর্মীএই দ্বৈত বৈশিষ্ট্যে আধুনিক কবিতার ভাষা হয়েছে জীবন্ত ও তাৎপর্যময়।
 
উপসংহার 
আধুনিক আরবি কবিতা এক নিরবচ্ছিন্ন অভিযাত্রার নামযেখানে অতীতের ঐতিহ্য ও বর্তমানের সৃজনশীলতা একসূত্রে গাঁথা। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এটি নিজেকে বারবার নতুনভাবে আবিষ্কার করেছে। ফলে আধুনিক মানুষের অনুভব, সংকট ও স্বপ্নকে প্রকাশ করার এক শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম হিসেবে এটি আজও প্রাসঙ্গিক ও প্রাণবন্ত। 

Wednesday, 29 April 2026

ফাঁসিতলা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 

আমরা তখন খুব ছোট কেউ প্রাইমারীতে, তো কেউ মক্তবে পড়ি পানিঝড়ির দিনে, কখনো বা মাগরিবের পরে, আবার কখনো সকালের কোমল মিঠা রোদে, আমরা বাড়ির বাচ্চারা ডেড়িতে, মানে আমাদের বৈঠকখানায় গোল হয়ে বসতাম আর আমাদের মাঝখানে বসতেন মেজো আব্বা হাতে তাঁর একটা মাঝারি সাইজের হুঁকো ধোঁয়ার কুণ্ডলী ধীরে ধীরে উপরে উঠতো, আর সেই সঙ্গে উন্মোচিত হতো গল্পের এক অদ্ভুত ও অজানা জগৎ।
 
মেজো আব্বার গল্প মানেই এক রহস্যময় ভুবনে প্রবেশ। কখনো ভূতের গল্প, যা শুনে শরীর শিউরে উঠত আর মনের ভেতরে ডর ঢুকে পড়তো। আবার কখনো পরীদের গল্প, যা মনে স্বপ্নের রঙ ছড়িয়ে দিত। এছাড়া রাজা-বাদশাদের ঐশ্বর্য, বিন্যাকুড়ির ভূত, মোলানিয়ার কালী, পীরপখরিয়ার পীর, কিংবা ফাঁসিতলার সিন্দুক কত গল্প যে শোনাতেন, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আর আমরা প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনতাম, যেন টু শব্দ লেই গল্পের জাদু ভেঙে যাবে।
 
একদিন মেজো আব্বা বলছিলেন তাঁর ছোটবেলার কথা। তখন তিনি আমাদের মতোই ছোট। দাদুর সঙ্গে, মানে তাঁর বাবার সঙ্গে প্রায় দিন মানপারের জমিতে যেতেন। তখন মানপারে, ফাঁসিতলার আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল অনেক ভগ্নস্তূপকোনোটা দোতলা দালানের ধ্বংসাবশেষ, কোনোটা একতলার, আবার কোথাও বড় কোনো ইঁদারার। সময়ের নির্মম আঘাতে সবকিছুই ভেঙে পড়ে ছিল
 
ফাঁসিতলাকে ঘিরে আমাদের এলাকায় লোকমুখে কত গল্প যে প্রচলিত আছে, তার কোনো হিসেব নেই। পাশের শহর দিনাজপুর, যা এখন বাংলাদেশের অন্তর্গতসেখানকার রাজা ছিলেন দিনানাজ, কেউ কেউ বলেন দিনানাথবলা হয়, তাঁর তিন রানী ছিল, আর তাঁদের তিনজনের জন্য প্রাসাদের তিন পাশে তিনটি পুকুর খনন করা হয়েছিল। অনেকে মনে করেন, সেই রাজার আস্তাবল, আদালত ও কয়েদখানা ছিল আমাদের এই মানপার-ফাঁসিতলা এলাকাতেযেহেতু এখানে কয়েদখানা ছিল, তাই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের নাকি এখানেই ফাঁসি দেওয়া হতোসেই থেকেই নাকি এই জায়গার নাম হয়েছে ফাঁসিতলা  
 
শুধু ইতিহাসের কৌতূহল নয়, এই জায়গাকে ঘিরে রহস্যেরও অন্ত নেই। এখানে নাকি রাজার গুপ্তধন লুকানো আছে। কতজন যে কত অদ্ভুত গল্প বলে! কেউ বলে, হাল চাষ করতে গিয়ে হঠাৎ লাঙলের ফাল আটকে গেছেখুঁড়ে দেখে একটা পীতলের ডেকচি, সোনারূপায় ভর্তিকিন্তু যেই তুলতে যাবে উধাও! কেউ আবার বলে, সে হাল বাইছিল, এমন সময় পার্শ্ববর্তী ঢিবির মাটি হঠাৎ সরে গিয়ে দেখা দিয়েছে একটা দরজা, আস্তে করে দরজাটা খুলে গেছে, ওপারে চোখ ধাঁধানো রত্নভাণ্ডার, মনিমুক্তায় ভরা। কিন্তু হাত বাড়াতে নিমেষেই দরজা বন্ধ হয়ে মাটিতে সব ঢেকে গেছে।
 
এমন হাজারো গল্প গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে আছে। কেউ কেউ তো স্বপ্নে দেখেছে, এই ধনরত্ন নাকি এখনো গচ্ছিত আছে, কাউকে পাওয়ার অপেক্ষায়। যেন কোনো এক বিশেষ মানুষ জন্মাবে, আর এইসব ধনরত্ন তার হস্তগত হবে। শুনতে শুনতে মনে হতো, আমরা যেন আলিফ লায়লা বা সিন্দাবাদের গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়ছি।
 
তবে এসব কল্পকাহিনীর আড়ালে একটা বাস্তব সত্য লুকিয়ে আছেএই অঞ্চলে কোনো এক সময় নিশ্চয়ই সমৃদ্ধ কোনো সভ্যতা ছিল। হয়তো দিনানাজ রাজার রাজত্ব, কিংবা পাল রাজাদের সুশাসন। আর এর প্রমাণ যেন চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। কাছেই মহিপাল দীঘিদ্বিতীয় মহিপাল রাজার খনন করা বিশাল জলাধার। তাছাড়া চণ্ডিপুরের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য পুকুর যেন কোনো কৃষিনির্ভর সমৃদ্ধ জনপদের সাক্ষ্য দেয়।
 
শুধু তাই নয়, সময় সময় এই অঞ্চলে মাটি খুঁড়তে গিয়ে, বা কখনো পুকুরে খনন কাজ করতে গিয়ে পাওয়া গেছে বেশ কিছু অমূল্য নিদর্শনকখনো পাথরের দামী মূর্তি, যার মূল্য কোটির উপরে, যেগুলো বর্তমানে জেলার যাদুঘরে সংরক্ষিত আছেতো কখনো মাটির কলসি বা হাড়ি, তাতে রুপোর বা সোনার মুদ্রা আবার কখনো কড়ি ভর্তি মাটির বারিয়া, যা নিয়ে আমরা ছোটবেলায় খেলা করতাম, যেগুলো প্রাচীন কোনো কালে বিনিময়ের মাধ্যম বা মুদ্রা রূপে ব্যবহার হতোএসব আবিষ্কার যেন কোনোভাবে জানান দেয়এই মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এক হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস, এক বিস্মৃত সভ্যতা
 
আমার মনে আছে, ছোটবেলায় একদিন আমি, বাবলু কাকু, আমু আর সাজ্জেত আমরা আমাদের বৈঠকখানার পাশেই টালির খোলা ছোড়াছুঁড়ি খেলছিলাম। খেলাটার নাম আমাদের অঞ্চলে টাকা-টাকা দেশলাইয়ের ছেড়া খাম ছিল আমাদের টাকা। যেখানে খেলছিলাম তার পাশে একটা ছোট্ট মাটির ঢিবি ছিলহঠাৎ বাবলু কাকু ঢিবির ওপাশে নিজের খোলাটা ছুড়ে দিল, যাতে কেউ তার নাগাল না পায় খোলাটা গিয়ে পড়ল ঢিবির একটা ফাটলে, আর ঠককরে একটা অদ্ভুত আওয়াজ হলো। আমাদের মধ্যে বয়সে সে ছিল সবচেয়ে বড় তৎক্ষণাৎ বুঝে গেল, এখানে কিছু একটা আছে। তাড়াতাড়ি মাটি সরাতে শুরু করল। আমরা সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলো একটা ছোট মাটির পাইলাভেতরেও মাটি ভর্তি। সেটাকে উপুড় করতেই খনৎ করে একটা শব্দ ল। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে সেটা দ্রুত পকেটে পুরে নিল
 
আরও মনে পড়ে। বাড়ি ভাগ হওয়ার পর আমাদের পুরনো মাটির ঘরগুলো ভাঙা হচ্ছিল। ঘরগুলো কত পুরনো, কেউই জানত না অনেকেই মনে মনে আশা করেছিল, খননের সময় হয়তো লুকিয়ে থাকা কোনো ধনসম্পদ বেরিয়ে আসবে। সত্যিই তাই হল, পাওয়া গেল কয়েকটা মাটির হাঁড়ি আর কলসি। কিন্তু সেগুলোতে সোনার বা রুপোর কোনো ঝলক ছিল না। একটাতে মিলল কটা তামার মুদ্রা, আর বাকিগুলোতে শুধু কড়ি।
 
আজ যখন অতীতের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, মনে হয়আমাদের শৈশব শুধু গল্পে ভরা ছিল না, ছিল ইতিহাস আর রহস্যের এক অপূর্ব মিশেল। মেজো আব্বার সেই গল্পগুলো হয়তো নিছক কল্পনা ছিল, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল আমাদের মাটির অতীত, আমাদের শিকড়ের কাহিনীআর তাই সেই গল্পগুলো আজও আমাদের মনে এক অদ্ভুত টান সৃষ্টি করেআমাদের ইচ্ছে করে ফিরে যেতে সেই ডেড়ির কোণে হুঁকোর ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে আবার শুনতে ইচ্ছে করে সেই হারিয়ে যাওয়া দিনের কথা।
 
যদিও এই গালগল্পগুলো অধিকাংশই লোককথার আবরণে মোড়া, তবু তার ভেতরে কোথাও না কোথাও বাস্তবতার ক্ষীণ রেখা যে লুকিয়ে আছে, তা অস্বীকার করা যায় না। আর সেই কারণেই ইদানীং আশঙ্কা হয়কিছুদিন আগে যেভাবে ছাওয়াসিনেমাটা দেখার পর একদল ভক্ত রায়গড় কেল্লার বাইরে টর্চ, কোদাল, ফাওড়া, এমনকি কেউ কেউ হাতে মেটাল ডিটেক্টর নিয়ে হাজির হয়েছিল, গুপ্তধনের খোঁজে মাটি খুঁড়তে ঠিক তেমনি এইসব গল্পের টানে যদি ওদের আরেক দল কোনো একদিন ফাঁসিতলাপৌঁছে যায়, সেই একই মোহে, অদেখা গুপ্তধনের খোঁজে!  
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
৮ এপ্রিল ২০২৬

Monday, 27 April 2026

পয়লা মোলাকাতে - ড. ওবাইদুর রাহমান বুখারি



সাল ২০১২। আমি তখন স্নাতক তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। জীবনের এক ব্যস্ত অথচ স্বপ্নময় সময়। সেদিনও অন্য দিনের মতোই একটি বেসরকারি মাদ্রাসায় পড়িয়ে বিকেল প্রায় পাঁচটার সময় ফিরেছি। ক্লান্ত শরীর নিয়ে হোস্টেলে ঢুকতেই হঠাৎ আমার সেই সাধারণ কীপ্যাড ফোনটা বেজে উঠল। ওপাশ থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠ— “ওবাইদ! পার্ক সার্কাস আসতে পারবে?”
 
আমি কিছুটা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম—“কোথায়? আর কতক্ষণের মধ্যে?” উত্তর এল—“আধা ঘণ্টার মধ্যে, দিলখুশা নার্সিংহোমের পাশে।
 
আর দেরি করিনি। সঙ্গে সঙ্গে হোস্টেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম। মনে অজানা এক উত্তেজনা, কৌতূহল আর হালকা উদ্বেগ। ঠিক সময়েই পৌঁছে গেলাম নির্ধারিত স্থানে।
 
গিয়ে যা দেখলাম, তা যেন এক অন্য জগত! সুঠামদেহী, গাম্ভীর্যে পরিপূর্ণ, ব্যক্তিত্বময় একজন মানুষকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন একঝাঁক প্রফেসর ও স্কলারযাদের সামনে দাঁড়ানোর সাহসও আমাদের মতো ছাত্রদের সচরাচর হয় না। আমি দূরে দাঁড়িয়ে রইলাম, হৃদয়ে এক অদ্ভুত কম্পন নিয়ে।
 
কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে রওনা দেওয়ার সময় আমাকে উদ্দেশ্য করে বলা হলো— “কমপক্ষে ২০ মিটার দূরত্ব বজায় রেখে আমাদের ফলো করবে।
 
নির্বাকভাবে সেই নির্দেশ মেনে চলতে শুরু করলাম। প্রায় দশ মিনিট হাঁটার পর পৌঁছলাম একটি লাল রঙের পাঁচতলা ভবনের সামনে। সেখানে কিছুক্ষণ আলোচনা শেষে সবাই বিদায় নিলেন। আর আমি থেকে গেলাম সেই মহান ব্যক্তির সঙ্গে।
 
ভয়, সংশয় আর অজানা অনুভূতিকে সঙ্গে নিয়েই তাঁর সঙ্গে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাম। পাঁচতলায় পৌঁছে তিনি আমাকে ডাইনিং টেবিলে বসতে বললেন। মিষ্টি ও জলখাবার খাওয়ানোর পর তিনি নানা বইপত্র এনে সামনে রাখলেন এবং একে একে আমাকে সেসব দেখাতে শুরু করলেন।
 
অদ্ভুত এক পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম তাঁর মধ্যেসেই গাম্ভীর্যের আড়ালে যেন এক স্নেহময়, আন্তরিক মানুষ। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি আমাকে আপন করে নিলেন। আমার সব ভয়, সংকোচ যেন কোথায় মিলিয়ে গেল। তিনি আমার সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করলেন, আমার কথা আগ্রহভরে শুনলেন।
 
তারপর একটি বই এবং ইংরেজিতে হাতে লেখা একটি প্রবন্ধ আমাকে দিয়ে বললেন— “এগুলো কম্পোজ করে দিতে হবে”। আমি সময় নিলাম তিন-চার দিন। নিষ্ঠার সঙ্গে টাইপ করে আবার তাঁর কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি তা মনোযোগ দিয়ে সংশোধন করতে লাগলেন। আর সেই ফাঁকে আমাকে শেখাতে লাগলেন অনেক নতুন বিষয়। আর যেন আমার জীবনে জ্ঞানের এক নতুন দুয়ার খুলে গেল। চিন্তার পরিধি প্রসারিত হতে লাগলো, শেখার আগ্রহ বহুগুণে বেড়ে গেল।
 
এর আগে অবশ্য তাঁর সঙ্গে একবার দেখা হয়েছিলযখন আমি স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়ি। তখন মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পরীক্ষায় কোয়ালিফা করেছিলাম। সেই সময় আমার বড় ভাইয়ের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, তবে সেটি ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত, প্রায় অপরিচয়ের মতোই।
 
যাই হোক, ধীরে ধীরে যখন তাঁর সান্নিধ্যে আসতে শুরু করলাম, ঠিক সেই সময় কোলকাতায় রাবেতাতুল আদাব-ইসলামির পক্ষ থেকে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করা হলো পার্ক সার্কাস হাজ হাউসে, জিবরিল ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সহযোগিতায়  
 
সেমিনারের বিষয়বস্তুগুলো দেখে আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগলপশ্চিমবঙ্গে এমন একটি সেমিনার, অথচ বাংলার ওপর আরবি ভাষার প্রভাব নিয়ে কোনো আলোচনা নেই! এই ভাবনা থেকেই হঠাৎ করেই এক ধরণের সাহস জন্ম নিল। তড়িঘড়ি করে আব্দুল মাতিন ভাইয়ের টিউশন রুমে বসে একটা প্রবন্ধ প্রস্তুত করলাম।
 
প্রবন্ধটি যখন সেই মহান ব্যক্তিকে দেখালাম, তিনি আগের মতোই যত্নসহকারে তা সংশোধন করে দিলেন। শুধু তাই নয়, সেমিনারে তা উপস্থাপন করার জন্য আমাকে সাহস জোগালেন। তাঁর সেই উৎসাহ, সেই প্রেরণাআজও আমার হৃদয়ে অনুরণিত হয়।
 
যার ফোনে সেদিন আমি পার্কসার্কাস ছুটে গিয়েছিলাম, তিনি হলেন প্রোফেসর মহম্মদ মসিহুর রহমানতৎকালীন বিভাগীয় প্রধান, আরবি বিভাগ, মাওলানা আজাদ কলেজ, কোলকাতা। আর যাঁর কথা এতক্ষণ বলছিলামতিনি আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় শিক্ষক বি.আর. স্যার, অর্থাৎ প্রোফেসর বদিউর রহমান, রাহিমাহুল্লাহু তা’আলা!  
 
সেদিনের সেই প্রথম দেখাশুধু একটি সাক্ষাৎ নয়, বরং আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক আলোকময় মোলাকাত। তাঁর সান্নিধ্য আমাকে শিখিয়েছেজ্ঞান শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা একজন মানুষের আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুপ্রেরণার মধ্যেও বিকশিত হয়।
 
রাজারহাট, কোলকাতা
১৯ এপ্রিল ২০২৬

Wednesday, 22 April 2026

ফুটু ভাই - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



ফুটু ভাইতাঁর ভালো নাম কী আমার জানা নেই ছোট থেকেই দেখে আসছি, গ্রামের প্রায় সবাই তাঁকে ফুটু ভাই নামেই ডাকে ছোটোখাটো গড়ন, রোগা-পাতলা শরীর, কাঁচাপাকা চুল, সামান্য নুয়ে পড়া নাকের ডগা, গভীর কোটরে ঢুকে দুটো চোখ আর হাঁটবার সময় সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে হাঁটতেন
 
এমনিতে ফুটু ভাই খুব ভালো মানুষ ছিলেনতবে তাঁর মেজাজটা ছিল তিরিক্ষিহঠাৎ হঠাৎ রেগে যেতেন, আবার ঠাণ্ডাও হয়ে যেতেন খুব তাড়াতাড়িআর এই অনিয়ন্ত্রিত রাগের কারণেতাঁর সংসারজীবন বারবার ভাঙনের সম্মুখীন হয়েছে। শেষ পর্যন্ত একজনই আমৃত্যু তাঁর পাশে থেকেছেন, কখনো তাঁকে ছেড়ে যাননি, তিনি আমাদের কিনি ভাবি অদ্ভুত ভাবে, তাঁরও ভালো নাম আমার জানা নেই
 
কিনি ভাবি মাটির মানুষ। কথাবার্তায় তাঁর নিছক সরলতা খানিকটা ওই গ্রামীণ বোকা গোছের। ওর একটা ঘটনা লোকমুখে ছড়িয়ে আছে, একবার ওদের মাটির ঘরে টিনের ছাউনি দেওয়ার পর আগের টালিগুলো একপাশে তুলে রাখা ছিল। একদিন গ্রামের একজন এসে বলল, তার ঘর ছাওয়ার কাজে টালি কম পড়েছেযদি ক’টা টালি তাকে দেওয়া হয়, তাহলে তার উপকার হয়! কিনি ভাবির জবাব ছিল সোজাসাপ্টা—“মুই এইলা দিবানু। সামনে বাইশ্যা, পানিঝড়ির দিন, অতো জ্বালুনখড়ি কুঠি পাম, তখন এই টালিলা পুড়ি মুই ভাত-তরকারি আন্ধিবা পারিম।
 
দু’ বছর আগে ২০২৫-এর ঈদুল ফিতরের পরের দিন বারান্দায় বসে মোবাইল ঘাঁটছি। এমন সময় কিনি ভাবি আমাদের বাড়িতে আসলেন। জানতে পারলাম, তিনি ফেতরা সংগ্রহ করতে বেরিয়েছেন। এক বাড়ি থেকে কিছু চাল এনে আমাদের বাড়িতে রেখে আবার বেরিয়ে গেলেন আরও চাল সংগ্রহের জন্য। শেষে সব চাল একত্র করে একটা বস্তায় ভরলেন। এবার সেই বস্তা কীভাবে বাড়ি নিয়ে যাবেন, তাই নিয়ে চিন্তিত। কেউ একজন ওর জন্য একটা টোটো ডাকতে রাস্তায় গেল। সেই ফাঁকে মা তাকে ডেকে খোঁজখবর নিতে লাগলেনগল্পের মধ্যেই মা নিঃশব্দে কিছু টাকা তার হাতে গুঁজে দিলেন। কিনি ভাবি বুঝতে পেরে নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না। ছোট মাবলে মাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে আরম্ভ করলেন। বোধ করি, তাঁর সেই কান্নায় ছিল অভাব, ছিল লজ্জা ও কৃতজ্ঞতাআর ছিল এক অসহায় ও অভাবী জীবনযাত্রার দীর্ঘ ক্লান্তি।
 
আমার যতদূর মনে পড়ে, ফুটু ভাই বেশ হুনরীও ছিলেন। নানা রকম হাতের কাজে অসম্ভব দক্ষ ছিলেনখড়, টিন, টালি যা দিয়েই হোক, ঘর ছাওয়ার কাজ নিপুণভাবে করতে পারতেন। তবে তাঁর বিশেষ খ্যাতি ছিল ছাতা মেরামতির কাজেবর্ষা নামারগে দেখতাম, তিনি তাঁর সাজসরঞ্জাম নিয়ে বাঁশকুড়ি মোড়ে কালভার্টের ওপর বসে এক মনে ছাতা সারাইয়ের কাজ করে চলেছেনএকে একে মানুষজন ছাতা নিয়ে আসছেকারও ছেঁড়া কাপড় বদলে দিচ্ছেন, কারও ভাঙা ডান্ডি পালটে নতুন ডান্ডি লাগিয়ে দিচ্ছেন, কারও ভাঙা হুক ঠিক করে দিচ্ছেন। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় ভাঙাচোরা ছাতাগুলো যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে
 
তবে তাঁর রাগ ছিল তীব্র ও আকস্মিক। মাঝসাঝে একটুতেই রেগে যেতেন। একবার গ্রামের কারো একটা ছাতা ঠিক করেছিলেন। কোনোভাবে দুদিন পর সেটা আবার খারাপ হয়ে গেল। তার জন্য গ্রামের কিছু দুষ্টু ছেলে আর কিছু রসিক মানুষ তাঁর পেছনে লেগে গেলতারা তাঁকে খোঁচাতে শুরু কর— “এই যে ফুটু ভাই, তুই কীরম ছাতা ঠিক করলু? দুদিনেই খারাপ হই গেল!কেউ বল— “ফুটু ভাই মনে হয় ঠিকঠাক ছাতার কাজ জানে না!কেউ আবার আরও একধাপ বাড়িয়ে বলল— “ফুটু ভাই কিস্সু জানে নাএই সব শুনে তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়লেন নিজের সমস্ত সরঞ্জাম নয়ঞ্জলিতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, অভিমানভরা পায়ে হন হন করে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন
 
ফুটু ভাই ধর্মভীরুও ছিলেন। গ্রামের আর পাঁচ জনের মতোই নিয়মিত নামাজ পড়তেন। রোজা করতেন। প্রতি রমজানে নিজের বাবা-মায়ের নামে গোর জিয়ারত করতেন। তখন আমাদের গ্রামে একটা রীতি প্রচলিত ছিল রমজান মাসে লোকজন গোর জিয়ারতের দাওয়াত দিত, আসরের নামাজের পর সবাই মিলে কবরস্থানে গিয়ে মা-বাবা ও অন্য সকল মৃতের জন্য দোয়া করতো, তারপর ফিরে এসে যে বা যারা দাওয়াত দিয়েছিল তাদের বাড়িতে ইফতার করএখন সেই রীতি লোপ পেয়েছে। ইদানীং দিন নির্ধারণ করে নয়, বরং যে যার সুবিধা মতো গোরস্থানে যায়, সকল মাইয়েতের জন্য দুআ করে। আর কে কবে ইফতার করাবে, তারাবিহ্‌র নামাজ শেষে দাঁড়িয়ে দাওয়াত দেয়।
 
একবার ফুটু ভাই গোর জিয়ারতের দাওয়াত দিয়েছিলেন। অভাবের সংসার, বে আন্তরিকতায় কোনো খামতি ছিল না। আদা-কালাই দিয়ে ইফতার, তারপর ক্ষীরমুড়ি, শেষে ডিম-ভাতএই ছিল তার সামর্থ্য মাফিক আয়োজন। আমি তখন কিশানগঞ্জ মাদ্রাসার ছাত্র, রমজানে বাড়ি এসেছি। দাওয়াত পেয়ে আমিও গেলাম। ইফতারের সময় হয়ে গেছে, কিন্তু ইমাম সাহেব কেন জানি আসেননি। একটু অপ্রস্তুত হয়ে ফুটু ভাই আমাকে বললেন— “ভাই, মোলবী সাহেব তো আসিলি না, তুই এনা মোর বাপ-মায়ের নাগিন দু করি দিনা
 
আমি তখন ছাত্র, অল্পবিদ্যার মানুষ, তবু যা জানতাম তাই দিয়ে দু’আ শুরু করলাম। দুআর মাঝে যখন রাব্বির হাম্‌হুমাপড়ে, তার অর্থ বাংলায় বিড়বিড় করে বললাম, ফুটু ভাই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। তাঁর কান্না দেখে অনেকের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। হয়তো তখন তাদের চোখে নিজ মৃত মা-বাবারর স্মৃতি ভর করেছিল।  
 
অভাব ফুটু ভাইয়ের চিরসঙ্গী ছিল। ফলে তাঁর সামান্য যেটুকু জমি ছিল, একসময় তিনি সেটাও বিক্রি করেতে বাধ্য হন। তবে তার মধ্য থেকে কিছু টাকা দিয়ে তিনি মসজিদের জন্য একটা লোহার গেট দান করেছিলেন। বহু বছর তাঁর ওই গেট খুলে শত শত নামাজি মসজিদে ঢুকেছে-বেরিয়েছে। তবে কবছর আগে আমাদের গ্রামের মসজিদটা নতুন করে নির্মিত হয়েছেবেশ বড়সড়, সুন্দর, ঝকঝকে-তকতকে, মোজাইক করা। তাতে নতুন একটা কাঠের গেট লাগানো হয়েছে। আর ফুটু ভাইয়ের দান করা সেই লোহার গেটটা পড়ে আছে এক কোণে, সময়ের প্রবাহে পরিত্যক্ত হয়ে। সেদিন রমজানে তারাবিহ্‌র পর মসজিদ থেকে বেরিয়ে আমরা কজন মসজিদের নানা কাজ নিয়ে গল্প করছি। এমন সময় হারুন মামা কাছে এসে ফুটু ভাইয়ের ওই লোহার গেটটার দিকে ইশারা করে বলল— “লোকটা ভালোবেসে গেটটা দান করেছিল, ওটাকে কোথাও কাজে লাগাতে হবে, মামা”  
 
তার ওই কথায় বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় উঠল। মনে হলো, মানুষটা ধীরে ধীরে স্মৃতি থেকেও হারিয়ে যাচ্ছে। আর তাঁর সেই ভালোবাসার দান পড়ে আছে নীরবে, অযত্নে। মুহূর্তেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো, এই তো সেদিনের কথা—আসরের নামাজের পর মসজিদের বারান্দা পেরিয়ে ফুটু ভাই বেরিয়ে যাচ্ছেন, মাথাটা সামান্য ঝুঁকে, চেনা ভঙ্গিতে হন হন করে হাঁটছেন নিজ বাড়ির পথে ফুটু ভাই চলে গেলেন, পেছনে পড়ে থাকলো বিকেলের এক টুকরো আলো, আর কিছু অপূর্ণ অমলিন স্মৃতি।
 
 হেস্টিংস, কোলকাতা
১০ এপ্রিল ২০২৬