Wednesday, 4 February 2026

আছোল বড়আব্বা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 
 
আছোল বড়আব্বা, ভালো নাম আসলেউদ্দীন আহমেদ। নামের মতোই মানুষটা ছিলেন ভীষণ সহজ-সরল, সাদাসিধে। পেশায় চাষি, জমিজমাও ছিল বেশ ভালোই। তিন ছেলে আর এক মেয়েকে বড় করেছেন পরম যত্নে, সবাইকে পড়াশোনা করিয়েছেন। বড় ও ছোট ছেলে স্কুলশিক্ষক, আর মেজো ছেলে সংসার ও জমিজায়গার দেখাশোনা করেন। কিন্তু এসব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি গ্রামের মানুষের কাছে পরিচিতমুয়াজ্জেন রূপে
 
ছোটবেলা থেকেই তাঁকে দেখেছি গ্রামের মসজিদে আজান দিতে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান, কোনো ভাতা-কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াইকী শীত, কী বর্ষা, কী গ্রীষ্মসময় কখনো এক মুহূর্তও এদিক-ওদিক হয়নি। যেন সময়টাই তাঁর কণ্ঠের সাথে বাঁধা ছিল। তখন মসজিদে মাইক ছিল না। আছোল বড়আব্বা মসজিদের মিনারে উঠে, বুকভরা নিঃশ্বাস নিয়ে, সর্বশক্তি ঢেলে আল্লাহু আকবারহাঁক দিতেন। সেই কণ্ঠস্বর শুনেযে যার কাজে ডুবে থাকুক না কেন, সব ফেলে মানুষ ছুটে আসত মসজিদের দিকে।
 
রমজান মাস এলে স্মৃতিগুলো আরও রঙিন হয়ে ওঠে। আমরা ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মসজিদের কলতলায় খেলায় মেতে থাকতাম। হঠাৎ আছোল বড়আব্বার কণ্ঠ ভেসে আসত—“আল্লাহু আকবার…” আর সঙ্গে সঙ্গে খেলার মাঠে নেমে আসত এক অদ্ভুত উত্তেজনা। আমরা প্রাণপণে দৌড় দিতাম নিজ নিজ বাড়ির দিকে, দম ফুরোনো গলায় চেঁচিয়ে উঠতাম—“আজান হই গেইছে!
 
সেই কণ্ঠস্বর শুধু আজানের ছিল নাওটা ছিল আমাদের শৈশবের সময়চিহ্ন, রমজানের আনন্দ, আর গ্রামের জীবনের এক নিখাদ পবিত্র স্মৃতি। আছোল বড়আব্বা যেন আজও মিনারের মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন, আর তাঁর ডাকে আমাদের মন ছুটে যাচ্ছে সেই নির্ভেজাল দিনগুলোর দিকে।
 
আছোল বড়আব্বা ছিলেন একেবারে আগের দিনের মানুষ। মেশিন, যন্ত্রপাতি কিংবা আধুনিক জিনিসপত্রের সাথে তাঁর তেমন সখ্য ছিল না। তাঁর দুনিয়াটা ছিল মাটি, ফসল, আকাশের রোদবৃষ্টি আর আজানের সময় ধরে চলা এক সরল জীবনের ছকে বাঁধা। তাই যখন মহিপালকদমডাঙ্গা রাস্তার কাজ শুরু হলো, আর বিশাল বিশাল রোডরোলার রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকত, সেগুলো আছোল বড়আব্বার কাছে যেন অন্য এক অচেনা জগতের বস্তু হয়ে উঠল।
 
এই সুযোগেই বাচ্চু, আমু, লাবু ও অন্য সব নাতিরা মিলে শুরু করল নানা রকম মশকরা। কেউ হেসে বলত, “দাদু, এই রোডরোলারের চাকায় তো হাওয়া নাই!কেউ আবার আরও দুকথা যোগ করত, খুনসুটির হাসিতে ভর করে। তিনি, কোনো প্রতিবাদ নয়, কোনো বিরক্তি নয়। শিশুর মতো সরল মুখে শুনতেন, একটু থমকে তাকাতেন সেই বিশাল যন্ত্রটার দিকে, তারপর ধীরে ধীরে মাথা দুলাতেনযেন সত্যিই কথাটা ভেবে দেখছেন। তাঁর সেই মাথা দোলানোতে ছিল এক নির্মল বিশ্বাসমানুষ যা বলে, তা মন দিয়ে শোনাই তো মানুষের কাজ।
 
ওই সরল মাথা দোলানো, ওই নির্বাক বিশ্বাস, ওই হাসিমাখা নীরবতাএসবই ছিল আছোল বড়আব্বার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। আধুনিকতার ভিড়ে, যন্ত্রের শব্দে ঢাকা পড়ে যাওয়া এক পুরোনো দিনের নিষ্পাপ মানুষের ছবি, যা চোখের আড়াল হলেও হৃদয়ের গভীরে অটুট হয়ে গেঁথে থাকে  
 
গাছগাছালির সাথে আছোল বড়আব্বার সখ্যতা ছিল সত্যিই ঈর্ষণীয়। গাছ লাগানো, তার দেখভাল করা, মাটি খুঁড়ে আদরযত্নে বড় করে তোলাএসব ছিল তাঁর ভীষণ প্রিয় কাজ। জীবনের ফাঁকে ফাঁকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন বেশ কয়েকটা ছোট ছোট বাগান; যেন মাটির সাথে তাঁর এক নীরব বন্ধুত্ব ছিল, যা কথার চেয়েও গভীর।
 
আমাদের গ্রামের মোড়ে একসময় ছিল শূন্যতার রাজত্ব। পাকা সড়ক তখনো বহু দূরের স্বপ্ন। ঠিক সেই সময়, একদিন আছোল বড়আব্বা সেখানে একটি পাকুড়ের চারা রোপণ করলেন। চারপাশে বাঁশ আর কঞ্চি দিয়ে ঘিরে দিলেন, যেন কেউ অসাবধানতায় ক্ষতি না করে বসেপ্রতিদিন নিয়ম করে পানি দিতেনরোদে, বৃষ্টিতে, কোনো অজুহাত ছাড়াই। ধীরে ধীরে চারাটির পাতা বেরোল, ডাল ছড়াল, কাণ্ড শক্ত হলো। সময়ের সাথে সাথে সেই ছোট্ট চারাটি একদিন মহিরুহে পরিণত হলো।
 
আজ সেই পাকুড় গাছের ছায়ায় কত শত মানুষ আশ্রয় নেয়। তার তলায় গড়ে উঠেছে কয়েকটা দোকান, পথিকেরা দাঁড়িয়ে জিরিয়ে নেয় ক্লান্ত শরীর। ডালপালায় বাসা বেঁধেছে অসংখ্য পাখি, সকালসন্ধ্যা তাদের কিচিরমিচির ডাকে মুখরিত হয়ে থাকে চারদিক। প্রতিদিনই কেউ না কেউ ওই গাছের পাতা পাড়েছাগলের খিদে মেটাতে, জীবনের কোনো ছোট্ট প্রয়োজনে
 
তুলাই নদীর অগণিত স্রোত টাঙ্গন, পুনর্ভবা, গঙ্গার বুকে নিজেকে বিলিয়ে শেষে গিয়ে মিশেছে অসীম সমুদ্রে। তেমনি আছোল বড়আব্বাও প্রায় কুড়ি বছর আগে এই দুনিয়ার সীমা পেরিয়ে অনন্তের পথে চলে গেছেনকিন্তু তিনি যে পাকুড় গাছটি রোপণ করেছিলেন, তা আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে—নীরব অথচ দৃঢ়, স্থির অথচ জীবন্তনিঃশব্দে, নিরবচ্ছিন্নভাবে সে হয়ে উঠেছে এক সাদাকাহ জারিয়াএক অবিরত দান, যার হিসেব ফেরেশতারা রাখে, মানুষ নয়তাঁর সেই সাদাকাহ অগণিত মানুষের অক্সিজেনের চাহিদা মেটায়, তাঁর সাদাসিধে জীবনের সাক্ষ্য হয়ে, শিকড় ছড়িয়ে ছায়া বিলিয়ে, দাঁড়িয়ে আছে বাঁশকুড়ি মোড়ের মাথায় হাওয়ায় দোল খেয়ে তার পাতাগুলো যখন মৃদু শব্দ তোলে, মনে হয় যেন পথচারীদের উদ্দেশ্যে কেউ হাঁক ছাড়ছে—‘বাঁশকুড়ি এসে গেছে’, ঠিক যেমন করে হাঁক ছাড়তেন তিনি মসজিদের মিনার থেকে। আর উভয় ডাকই যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় কোনো অদৃশ্য পথে।
 
১৭/০১/২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা

Tuesday, 3 February 2026

গোধূলির পথে - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


 
সকালের আলো ঠিকমতো চোখে পড়ার আগেই হোস্টেলের ঘরটা যেন এক অদ্ভুত ব্যস্ততায় ভরে উঠল। ঘুমচোখে কেউ ব্যাগের চেইন টানছে, কেউ জামা ভাঁজ করতে গিয়ে আবার এলোমেলো করে ফেলছে। কোনোদিক থেকে ভেসে আসছে টুথপেস্ট হারানোর অভিযোগ, কোথাও চাবি নিয়ে হুলস্থুল কাণ্ডদুসপ্তাহের ছুটিএই খবরটা যেন সবাইকে একসঙ্গে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে  
 
ওদের তুলনায় আমি একটু আলাদা স্বভাবেরতাড়াহুড়োটা আমার ভেতরে হলেও বাইরে চুপচাপ। তাই মেঝেতে বসে নিজের ব্যাগটা খুলে ধীরে ধীরে জামাকাপড় গুছিয়ে নিলাম। তারপর তাকের দিকে তাকালাম। কয়েক মুহূর্ত দ্বিধাশেষ পর্যন্ত কয়েকটা বই তুলে নিলাম। ছুটি মানে যে পড়াশোনা হবে না, সেটা অভিজ্ঞতা থেকেই জানি। তবু বই না নিলে মনে হয় দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছি। বইগুলো ব্যাগে ঢুকাতেই ওজন বেড়ে গেলব্যাগটা যেন হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল, শুধু কাঁধে নয়, মনেও।
 
হোস্টেলের গেট পর্যন্ত ব্যাগ টেনে আনতে বেশ কষ্ট হলো। বাইরে বেরিয়ে দেখি, রাস্তা প্রায় ফাঁকা। কুয়াশার হালকা চাদরের ভেতর দিয়ে সকালটা ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। ভাগ্য ভালো, একটা রিকশা পেয়ে গেলাম। রিকশাওয়ালা পনেরো টাকায় রাজি হয়ে গেল। মিনিট কুড়ির মধ্যেই পৌঁছে গেলাম খাগড়া বাসস্ট্যান্ড।
 
সেখানে পৌঁছে দেখি পরিচিত দৃশ্যহোস্টেলের ছেলেরা ছোট ছোট দলে জটলা করে গল্পগুজব করছেকেউ ছুটির পরিকল্পনা করছে, কেউ বাড়ির খাবারের গল্প শোনাচ্ছেকোথাও লুচি-পরোঠা ভাগাভাগি করে খাওয়ার দৃশ্যএসবের মাঝেই সময় কেটে গেল। প্রায় এক ঘণ্টা পর বাস এল। ভিড় ঠেলে, ধাক্কাধাক্কি সামলে কোনোরকমে বাসে উঠলাম ভাগ্যক্রমে জানালার পাশে সিট পেয়ে যেন একটু স্বস্তি পেলাম  
 
বাস ছাড়তেই বাইরের দৃশ্যগুলো চলমান ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলোমাঠ-ঘাট, গাছপালা, রাস্তার ধারের চায়ের দোকানসবই যেন উল্টো দিকে ছুটছেমনে হচ্ছিল, বাসটা একে একে রামপুর, কানকি, ডালখোলা, দোমহনা, নাগর, রায়গঞ্জ, কালিয়াগঞ্জকে পেছনে ফেলে শহরের কোলাহল থেকে আমাকে ধীরে ধীরে গ্রামের শান্তির দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে
 
দীর্ঘ চার ঘণ্টার সফর শেষে বাস কুশমুণ্ডিতে থামল। তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার উপক্রমপশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়েছে, তার আলো লম্বা হয়ে শুয়ে আছে রাস্তায়ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিএবার ট্র্যাকার না টমটম? ঠিক তখনই থানার দিক থেকে লাফাতে-হাঁফাতে এক পরিচিত মুখ এগিয়ে এলনির্মল সরকার।
 
পরনে মাটির রঙের পাঞ্জাবি আর সাদা ধুতিযার রং সময়ের ছাপ লেগে সেপিয়া হয়ে গেছে। কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। আমাদের বাড়িতে তাঁর যাতায়াত লেগেই থাকেগ্রামের রাজনীতি, সালিশ, ভোটের কাজসবেতেই তাঁকে দেখা যায়। আমাকে দেখেই নির্মল দা থমকে দাঁড়ালেন।
 
আরে, তুই! তোদের ছুটি নাকি? বেশ তো, মজা করে ছুটি কাটা এবার
আমি হেসে বললাম, — হ্যাঁ দাদা। আপনি এখানে?
থানায় গেছিলাম রে,  জানিসই তো, আমাদের কতো রকমের ঝামেলাঝক্কি পোয়াতে হয়!   
 
এর মাঝে একটা টমটম এসে দাঁড়াল। সবাই উঠতে ব্যস্ত। নির্মল দা আমাকে সরিয়ে দিয়ে কোনোরকমে দুটো জায়গা আগলালেনএকটায় নিজে বসলেন, আরেকটায় আমাকে বসালেন। টমটম চলতে শুরু করলঘটংঘট, টুংটুং আওয়াজে চারপাশ ভরে উঠল। ধুলোর ভেতর দিয়ে এগোতে এগোতে শুরু হলো আমাদের কথা।
পড়াশোনা কেমন চলছে?
মোটামুটি।
ভালো করে পড়িস। কাকু কত কষ্ট করে তোকে পড়াচ্ছে!
চেষ্টা করছি। হাফ-ইয়ার্লিতে ফার্স্ট হয়েছি।
বাহ্! দারুণ তো!
 
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নির্মল দা আবার জানতে চাইলেন মাদ্রাসার পড়াশোনা নিয়ে। ইংরেজি, বাংলা, অংকের পাশাপাশি আরবি, তাফসীর, হাদীস, ফিকাহ্‌সব বললাম। ফিকাহ্‌র নাম শুনে একটু অবাকই হলেন। আমি সহজ করে বোঝালামকুরআন-হাদীসের আলোকে দৈনন্দিন জীবনের আচারআচরণ, রীতিনীতি ও নানান সমস্যার সমাধানের কথা।
 
টমটম এগিয়ে চলল। নাহিট পেরিয়ে দেখলাম, দূরে খড়ের গাদা থেকে ধোঁয়া উঠছে, কেউ গরু নিয়ে বাড়ি ফিরছেসন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। হঠাৎ নির্মল দা ভারী গলায় বললেন,
শোন্‌, ধর্ম আলাদা আলাদা হতে পারে, কিন্তু সব ধর্মই মানুষকে ভালো হতে শেখায়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর মিলেমিশে থাকাই আসল। চণ্ডীপুরে হিন্দু-মুসলমান-সাঁওতাল যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি আছে। তোরা নতুন প্রজন্মতোদের দায়িত্ব আরও বেশি।
 
কিছুক্ষণের মধ্যে রামপুর, চৌরঙ্গী পেরিয়ে টমটম মহিপালে পৌঁছে গেল। নির্মল দা যাওয়ার বেলা মহিপালে সাইকেল রেখে গেছিলেন। তাই নেমে পড়লেনযাওয়ার আগে টমটমওয়ালাকে দুজনের ভাড়া মিটিয়ে দিলেন। আমি বারণ করতে গেলে তিনি আমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, “তোরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। ভালো করে লেখাপড়া করিস্‌, গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করিস্‌!”
 
তাঁর ওই স্নেহমাখা কণ্ঠ শুনে আমার চোখ ভিজে গেল চুপচাপ কিছুক্ষণ শূন্যের দিকে তাকিয়ে রইলাম। পশ্চিম আকাশ তখন গোধূলি আলোয় সেজে উঠেছে। সূর্যাস্তের লাল আলো টমটমের কাঠের দণ্ডে পড়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে তুলাইয়ের জল টাঙনে এসে পড়ছে, আর দুটো স্রোত পাশাপাশি বইছে। মনে হলো, এই পথ শুধু বাড়ির দিকেই নয়মানুষ থেকে মানুষের দিকে যাওয়ার পথও বটে। বিশ্বাস আলাদা হতে পারে, কিন্তু একসঙ্গে চলার শক্তিটাই সবচেয়ে বড়।
 
আমি ব্যাগের ফিতেটা কাঁধে ঠিক করতে করতে সামনে তাকিয়ে রইলাম। পরিচিত গাছপালা, বাঁক নেওয়া পথসবই ধীরে ধীরে আরও চেনা হয়ে উঠছিল। অথচ মনে হচ্ছিল, আমি শুধু বাড়ির দিকেই ফিরছি না; কারও বলা কথাগুলো, নাবলা আশঙ্কাগুলোও সাথে নিয়ে ফিরছি। টমটমের কাঠে পড়ে থাকা লাল আলোটা হঠাৎই ফিকে হয়ে এলসূর্য বুঝি চোখের আড়ালে চলে গেছে। টমটম গতি কমাল। নামার সময় এখনও হয়নি, তবু মনে হলো এই পথের শেষে শুধু বাড়ি নয়আরও অজানা অনেক কিছু অপেক্ষা করছে। চাকা গড়াল, আবার আওয়াজ উঠলঘটংঘটটুংটুং
 
২৪/০৫/২০২৫
হেস্টিংস, কোলকাতা

Friday, 30 January 2026

সমীর মোলবিঃ আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 

সমীর মোলবি
 
সেই সোনালী শৈশবে, পৃথিবীটা ছিল খুব ছোট, সামনের মাঠ পেরিয়ে তুলাইয়ের পাড়ে আকাশ মিশে যেতো মাটিতে। আর বিশ্বাসগুলো ছিল অবিশ্বাস্য রকম সহজ ও সরল তখনই আরম্ভ হয় কদমডাঙ্গা মক্তবে আমার আরবি পড়তে যাওয়া। ভোরের কুয়াশা মাঠের ঘাসে লেপ্টে থাকত, আর মেঠো পথটা শিশিরে ভিজে নরম হয়ে থাকতো, হাতে ছোট্ট তক্তি, বগলে কাগজে মোড়া কিতাব, মায়ের ডাকে ঘুমজড়ানো চোখ মুছতে মুছতেই আমি রওনা দিতাম। মনে হতো, যেন পড়তে নয়, কোনো এক পবিত্র যাত্রায় বের হয়েছি  
 
কদমডাঙ্গা মক্তবটা খুব বড় ছিল নাটিনের চাল, মাটির মেঝে, দেয়ালে সময়ের জমে থাকা দাগ। অথচ সেই ছোট্ট ঘরটার ভেতরেই খুলে যেত অন্য এক দুনিয়া। ‘আলিফবাতা’র প্রথম ধ্বনি, ‘কাফলাম’-এর ভারী উচ্চারণ, আর কিতাব খুললেই যে এক ধরনের গম্ভীর নীরবতা নেমে আসতসব মিলিয়ে মনে হতো, অক্ষরগুলো শুধু পড়বার জন্য নয়, হৃদয়ের গভীরে গেঁথে নেওয়ার জন্যই এসেছে।
 
মক্তবে আমাদের এক শিক্ষক ছিলেন, নাম সমিরুদ্দীন আহমেদসম্পর্কে কাকু হবেন। দশ মুখে ‘সমীর মোলবি’ নামেই পরিচিত। খুবই সাদাসিধে একজন মানুষ। কথার চেয়ে আমলে অধিক বিশ্বাসী ছিলেনমক্তব আর ইমামতির সামান্য আয়ের ওপর ভর করেই সারাটা জীবন পার করে দিয়েছেনকখনো কোনো অভিযোগ করেননি, কোনো আক্ষেপ তাঁর চোখেমুখে আমি দেখিনি। অভাবের দরুন পড়াশোনার সুযোগ খুব বেশি পাননি; তাই সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু বিষয়ে আমাদের প্রজন্মের ছেলেপুলেদের সঙ্গে তাঁর ভাবনার অমিল ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই মতপার্থক্য নিয়ে আমার সঙ্গে কোনোদিন কোনো তর্ক-বিতর্ক তো দূরের কথা, একটিবার কথাও বলেননি। যেন তাঁর কাছে সম্পর্কটাই ছিল মুখ্য, মতের ফারাক নয়।
 
চাকরি পাওয়ার পর একদিন খুব সাধ করে তাঁর কাছে গিয়েছিলাম। হাতে ছিল ছোট্ট একটা উপহারআমরা যাকে হাদিয়া বলি আরকিবড় কিছু নয়, খুব দামীও নয়, কিন্তু ভালোবেসে কেনাউপহারটা হাতে নিয়ে তিনি যেন শিশুর মতো খুশি হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর চোখেমুখে তখন যে প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়েছিল, তাতে মনে হয়েছিলআমি যেন তাঁর হাটে কোনো অমূল্য উপহার তুলে দিয়েছি।
 
মাঝে তুলাই দিয়ে বহু জল গড়িয়ে গেছে। একদিন খবর পেয়ে দেখতে গেলামতিনি তখন প্রায় শয্যাশায়ী। শরীর ভেঙেছে, চোখ দুটো আরও ভেতরে ঢুকে গেছে, মুখমণ্ডলটা মলিন ও বিবর্ণ, কিন্তু মনটা আগের মতোই উচ্ছ্বল ও স্নেহে ভরা। আমাকে দেখেই স্ত্রীকে ডেকে বললেন,
—“হয় মখলুসুরের মা, আয় দেখি যা, মোর বাপ আইছে মোক দেখিবা, কত বড় মানুষ হইছে, তাও মোক ভুলেইনি। কুন্‌ কালে মুই ওক ‘আলিফ-বে-তে-সে’ পড়েইছু, এখনো মোর কথা মনে থুইছে 
 
কথাগুলো শুনে খানিকটা লজ্জা পেয়েছিলাম, চোখ দুটো আপনা থেকেই মাটিতে নেমে গেছিল। মনে হয়েছিল, তিনি যেন আমাকে নয়, আমার শৈশবটাকেই বুকে টেনে নিচ্ছেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেনসেই চেনা স্পর্শ, সেই মমতাময় পরশতারপর অত্যন্ত ক্ষীণ কণ্ঠে দুয়া করলেন,
—“আরও বড় মানুষ হো বা। আল্লাহ তোর ভালো করোউক। তোর বাপ খুব ভালো মানুষ আছোলো, তোর বাপের নামটা থুইস…”
 
কথার ফাঁকে ফাঁকে আরও অনেক কথা বললেনজীবনের কথা, মানুষ হয়ে ওঠার কথা, শিকড়কে ভুলে না যাওয়ার কথা। ফেরার তাড়া ছিল, সময় বেশি কাটাতে পারিনি। বিদায়ের মুহূর্তে ঘূর্ণাক্ষরেও বুঝতে পারিনিএই দেখাই শেষ দেখা। নীরবে ফিরে এসেছিলাম, বুকের ভেতর এক অজানা ভার নিয়ে।
 
আজ যখন ফিরে তাকাই, মনে হয়সেদিন আমি শুধু একজন শিক্ষকের কাছ থেকে নয়, শৈশবের এক নির্ভেজাল আশ্রয় থেকেও বিদায় নিয়েছিলাম। মাথায় রাখা তাঁর সেই উষ্ণ হাত, সেই নিঃস্বার্থ দোয়াআজও আমার পথচলার গোপন পাথেয় হয়ে আছে। আজও দেশের বাড়িতে গেলে যখন ফিদ্দুর দোকানের চালায় বসে থাকি, মনে হয়ঈষৎ ন্যুব্জ শরীরটা একটা জীর্ণ আদল গায়ে জড়িয়ে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলেছে কদমডাঙ্গা মক্তবের পথে। শুভ্রকেশে ভরা মাথাটা পায়ের ছন্দে দুলে দুলে উঠছে, আর ভোরের কুয়াশার ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে 
 
১৫/০১/২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা

Saturday, 24 January 2026

সূরাতু আল-হুজুরাতঃ সমাজ বিনির্মাণের পাঠ

 

সূরাতু আল-হুজুরাত পবিত্র কুরআনের ৪৯তম সূরা। এটি মদিনায় অবতীর্ণ হয়েছে। এই সূরার মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে আত্মশুদ্ধি, শালীনতা, ভদ্রতা ও শিষ্টাচারের এক পূর্ণাঙ্গ দিশা প্রদান করেছেন। বিশেষ করে সামাজিক জীবন, পারস্পরিক সম্পর্ক ও আচরণবিধি সম্পর্কে এই সূরায় অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে।
 
সূরার প্রথম পাঁচটি আয়াতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর প্রতি প্রদর্শনীয় আদব-কায়দা ও শিষ্টাচারের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এখানে সরাসরি নবীজি (সা.)-কে কেন্দ্র করে আচরণবিধি শেখানো হয়েছেযেমন তাঁর উপস্থিতিতে অগ্রসর হয়ে কথা না বলা, তাঁর সামনে উচ্চস্বরে কথা না বলা, কিংবা অভদ্র ভঙ্গিতে তাঁকে সম্বোধন না করা। তবে এই নির্দেশনাগুলো কেবল নবীজি (সা.)-এর ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; পরোক্ষভাবে এগুলো আমাদের শিক্ষক, গুরুজন, পিতামাতা ও প্রকৃত ধর্মীয় আলেমদের প্রতিও প্রযোজ্য। একই সঙ্গে যেখানে আল্লাহ, তাঁর রাসূল, কুরআন ও হাদিসের আলোচনা হয়সেসব স্থানেও এই আদব ও শিষ্টাচার রক্ষা করা অপরিহার্য।
 
পরবর্তী কয়েকটি আয়াতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সামাজিক বিধান বর্ণিত হয়েছে। যদিও প্রত্যক্ষ সম্বোধন নবী (সা.)-এর প্রতি, তবুও এর লক্ষ্যবস্তু সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাই। এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছেকোনো ফাসেক ব্যক্তি কোনো সংবাদ প্রদান করলে তা যাচাই না করে বিশ্বাস করা যাবে না। প্রতিটি সংবাদ অন্ধভাবে গ্রহণ করে তার ওপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত বা কার্যক্রম গ্রহণ করা সমীচীন নয়। বিশেষত কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা জাতির বিরুদ্ধে কোনো সংবাদ এলে প্রথমেই ভাবতে হবেসংবাদটির উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য। উৎস যদি সন্দেহজনক হয়, তবে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কারণ একটি মিথ্যা সংবাদের ভিত্তিতে কোনো জাতির সম্মান, এমনকি ইতিহাস পর্যন্ত কলুষিত বা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
 
এরপর আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের পারস্পরিক সংঘাতের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। যদি কখনো মুসলমানদের দুটি দল পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, সে ক্ষেত্রে অন্য মুসলমানদের কী করণীয়তা স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে। এখানে ন্যায়বিচার, সংযম ও সহনশীলতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং মুসলিম উম্মাহর ভ্রাতৃত্ববোধকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
 
এরপর মুসলমানদের এমন সব নৈতিক ব্যাধি থেকে আত্মরক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেগুলো সমাজজীবনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তোলে। একে অপরকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা, উপহাস করা, অপমানজনক নামে ডাকা, কু-ধারণা পোষণ করা, গোপন দোষ অনুসন্ধান করা এবং অনুপস্থিতিতে বদনাম করাএসবই গুরুতর গোনাহ এবং সামাজিক অশান্তির মূল কারণ। আল্লাহ তাআলা একে একে এসব কাজকে হারাম ঘোষণা করেছেন। মুসলিম নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একে অপরকে অসৎ নামে সম্বোধন না করা, অমূলক সন্দেহ পোষণ না করা এবং সর্বোপরি গীবত অর্থাৎ পরচর্চা ও পরনিন্দা থেকে বিরত থাকার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গীবতকে আল্লাহ তাআলা এতটাই জঘন্য কাজ হিসেবে তুলে ধরেছেন যে, একে মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণের সঙ্গে তুলনা করেছেন
 
এরপর আল্লাহ তাআলা গোষ্ঠীগত ও বংশগত বৈষম্যের মূলে আঘাত হেনেছেনযা যুগে যুগে পৃথিবীতে ভয়াবহ বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে। জাতি, বংশ কিংবা গোত্রের অহংকারে মত্ত হয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ও অন্যকে নীচু মনে করা, নিজের বড়ত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যকে হেয় করাএসব নিকৃষ্ট প্রবৃত্তির কারণেই পৃথিবী জুলুমে ভরে উঠেছে। আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর একটি আয়াতে এসব ভ্রান্তির মূলোৎপাটন করে ঘোষণা করেছেনসমস্ত মানুষ একই উৎস থেকে সৃষ্টি; জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করা হয়েছে কেবল পারস্পরিক পরিচয়ের জন্য, শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারের জন্য নয়। আল্লাহর কাছে মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড হলো তাকওয়া অর্থাৎ আল্লাহ্‌ভীতি ও সংযমশীলতা 
 
সবশেষে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ঈমান কেবল মুখে দাবি করার বিষয় নয়। প্রকৃত ঈমান হলো অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সত্য বলে গ্রহণ করা, বাস্তবে তাঁদের নির্দেশের অনুসরণ করা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর পথে জান ও মাল উৎসর্গ করা। যারা শুধু মৌখিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে, অথচ অন্তরে তা গ্রহণ করে নাতারা পার্থিব বিচারে মুসলমান হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং সামাজিকভাবে তাদের সঙ্গে মুসলমানদের মতো আচরণ করা যেতে পারে; কিন্তু আল্লাহর দরবারে তারা প্রকৃত মুমিন হিসেবে গণ্য হয় না।
 
শেষ কয়েকটি আয়াতে ঈমান, ইসলাম ও নিফাকের অর্থাৎ দ্বিচারিতার পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছেইসলাম গ্রহণ কোনো স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যম নয়; বরং প্রকৃত ইসলাম গ্রহণের সুফল সম্পূর্ণভাবে মানুষের নিজের জন্যই। ইসলাম গ্রহণ করে তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে উপকার করছেএমন ধারণা নিছক মূর্খতা ছাড়া কিছু নয়।
 
এই সূরার সামগ্রিক শিক্ষা থেকে আমরা যা উপলব্ধি করতে পারি তা হলো
(১) নবীজি (সা.) তো বটেই, সকল সম্মানীয় ব্যক্তির প্রতি শিষ্টাচার ও ভদ্রতা রক্ষা করা।
(২) কোনো ফাসেক অর্থাৎ অসৎ ও পাপিষ্ঠ ব্যক্তির সংবাদ যাচাই না করে গ্রহণ না করা।
(৩) কোনো মানুষকে অপমানজনক নামে সম্বোধন না করা।
(৪) কু-ধারণা ও গীবতের মতো ভয়াবহ গোনাহ থেকে নিজেকে সংযত রাখা।
 
সূরা হুজরাতের এই মহান শিক্ষাগুলো যদি আমরা আমাদের ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে নিঃসন্দেহে আমরা একটি সুন্দর সমাজ গঠনে সফল হবো এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সক্ষম হবোযা আমাদের ইহকাল ও পরকাল উভয় জীবনকেই সৌন্দর্যমণ্ডিত করবে, ইন্‌ শা আল্লাহ। 

ড. আব্দুল মাতিন ওয়াসিম 


Thursday, 18 December 2025

অহী—অর্থ, প্রকৃতি ও পার্থক্যঃ কিছু কথা


 
অহ়ী— অর্থ, প্রকৃতি ও পার্থক্যঃ কিছু কথা
ড. আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
 
মানব সভ্যতার ইতিহাসে জ্ঞানের উৎস ও প্রকৃতি নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে জ্ঞানের সর্বোচ্চ রূপ হলো অহ়ী অর্থাৎ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী রাসূলদের নিকট প্রেরিত বার্তা। অহ়ী ইসলাম ধর্মে যেমন মৌলিক বিষয়, তেমনি মানব-স্রষ্টা সম্পর্ক, ভাষা ও জ্ঞানতত্ত্বের পর্যালোচনাতে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
 
আভিধানিক অর্থ অহ়ী আরবি শব্দএর মূল ধাতু য়াও-হ়া-ইয়া, যার আভিধানিক অর্থ দ্রুত, ইশারা, গোপন বার্তা, অন্তর্দৃষ্টি নীরব ইঙ্গিত। বিখ্যাত ভাষাবিদ ইবনু মানজ়ূর তাঁর লিসানুল-রা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেনঅহ়ী হলো নীরবে এবং দ্রুত বার্তা প্রেরণ করা [ইব্‌নু মানজ়ূ, লিসানুল-‘রাব ১৫/৩৮০] আরবি ব্যাকরণবিদ রাগ়িব আল-ইস়্‌ফ়াহানী বলেছেনঅহ়ী ইশারায়, লেখায়, বার্তায়, অনুপ্রেরণায় এবং গোপন কথোপকথনে প্রকাশ পায় [মুফ়্‌রাদাতু আল্‌ফ়াজ়িল ক়ুর্‌আন ৫৩৪] অতএব আভিধানিক ভাবে অহ়ী এমন এক প্রকার যোগাযোগ, অনেক সময়ে যা উচ্চারিত নয়, কিন্তু অনুধাবনযোগ্য; দৃশ্যমান নয়, কিন্তু হৃদয়ে প্রবাহিত।
 
পারিভাষিক অর্থ পরিভাষায় অহ়ী হল আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতা (দূত) মারফৎ নবী রাসূলদের নিকট প্রেরিত ঐশী বার্তা, যা মানবজীবনে পথনির্দেশ হিসেবে কার্যকর। ক়ুর্‌আনে অহ়ী শব্দটি প্রায় ৭৮ বার ব্যবহৃত হয়েছে, বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে। উদাহরণস্বরূপনবী (সাঃ) অন্যান্য নবী-রাসূলদের প্রতি অহ়ী [সূরা আশ্‌-শূরা ৩, আজ়্-জ়ুমার ৬৫, আল্‌-কাহাফ় ২৭, আল্‌,-আন্‌‘আম ১০৬, ইউনুস ১০৯, আল্‌-রাফ় ২০৩] মৌমাছিকে প্রেরিত নির্দেশ [সূরা আন-নাহ়্‌, ৬৮], মূসা (আঃ)-এর মায়ের প্রতি অহ়ী [সূরা আল-ক়াস়াস়, ] সুতরাং অহ়ী প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের অন্তরে নেমে আসা ঐশী অনুপ্রেরণাকেও নির্দেশ করে।
 
দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অহ়ী দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে, অহ়ী হলো জ্ঞানের এমন এক রূপ যা ইন্দ্রিয় ও যুক্তির সীমা অতিক্রম করে। মুসলিম চিন্তাবিদ ইমাম গ়াজ়্জ়ালী তাঁর হ়্ইয়া উলূমিদ-দীন গ্রন্থে বলেছেনঅহ়ী সেই আলো যা মহান স্রষ্টার জ্ঞান থেকে নির্গত হয়ে নবীর হৃদয়ে প্রতিফলিত হয়। ইমাম ব্‌নু খ়াদূ তাঁর আল-মুক়াদ্দিমাহ গ্রন্থে অহ়ীকে মানবচেতনার অতীন্দ্রিয় পর্যায়ে পৌঁছানোবলে বর্ণনা করেছেন, যেখানে আত্মা সরাসরি ঐশী জ্ঞানের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। আধুনিক কালে, অহ়ীকে মানুষের অন্তর্দৃষ্টি ও সৃজনশীল জ্ঞানের উৎস হিসেবেও মূল্যায়ন করা হয়। আর সমসাময়িক চিন্তাবিদরা অহ়ীকে এক প্রকার অন্তর্গত প্রেরণা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
 
সালাফ়দের দৃষ্টিভঙ্গিতে অহ়ী— সালাফ়দের মতে, অহ়ী এক অলৌকিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে আল্লাহ নবী-রাসূলদের নিকট নির্ভুলভাবে নিজ বার্তা পৌঁছে দেন। অহ়ী ব্যতীত নবুয়ত, শরীয়াহ্‌, বা আল্লাহ্‌র নির্দেশসমূহ মানবজাতির কাছে পৌঁছানো অসম্ভব। তাঁদের মতে, অহ়ী হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে বেশ কিছু পদ্ধতিতে নবী-রাসূলদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন ও বার্তা প্রেরণ। যেমন পবিত্র আল-ক়ুরআনের সূরা আশ্‌-শুরার ৫১ নম্বর আয়াতে অহ়ীপ্রকৃতি তিনভাবে নির্দেশ করা হয়েছে— (১) সরাসরি অহ়ী, (২) পর্দার আড়াল থেকে কথা বলা, (৩) ফেরেশতার মাধ্যমে বার্তা প্রেরণ। তাঁদের মতে, অহ়ীর চারটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে— () অলৌকিক, () ত্রুটিমুক্ত, () নির্দেশনামূলক, () এবং এর গ্রহীতা সীমিত। ইমাম ইব্‌নু তাইমিয়াহ (রাহঃ) বলেছেনঅহ়ী হল, বান্দাদের জানানোর উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ্র নিজ নবী-রাসূলদের নানা বিষয়ে অবহিত করা [মাজ্মূউল ফ়াতাওয়াহ্১২/২৭] আর ইমাম ব্‌নু ক়াইয়্যিম (রাহঃ)-এর মতেঅহ়ী এমন এক আলো, যা আল্লাহ তাঁর নির্বাচিত বান্দার অন্তরে প্রক্ষেপণ করেন। [মাদারিজুস্‌ সালেকীন ১/৬৫]
 
অহ়ী অবতরণের পদ্ধতি— অহ়ী বিভিন্ন ভাবে নবী (সাঃ)-এর প্রতি অবতীর্ণ হতো। নানা বর্ণনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অহ়ী কখনো সরাসরি, কখনো ফেরেশতার মাধ্যমে, কখনো অনুপ্রেরণা বা স্বপ্নের আকারে নবীজির কাছে পৌঁছেছে। পবিত্র আল্‌-ক়ুরআনে রয়েছেকোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় যে, আল্লাহ তার সঙ্গে কথা বলবেন তবে অহ়ীর মাধ্যমে, অথবা পর্দার আড়াল থেকে, অথবা কোনো দূত (ফেরেশতা) প্রেরণ করে।” [সূরা শ্‌-শুরা ৫১] ওলামা, মুহ়াদ্দিস মুফ়াস্সিরগণ অবতরণের বর্ণনাগুলি বিশ্লেষণ করে এই পদ্ধতিগুলি নির্ধারণ করেছেন— () রুইয়া স়াদিক়া বা সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে, “নবুয়তের সূচনায় রাসূলু (সাঃ)-এর প্রতি অহ়ী আসত সত্য স্বপ্নের আকারে।” [স়াহ়ীহ় বুখ়ারী ] () কখনো ফেরেশতা নবীর অন্তরে কথা স্থাপন করতেন, কিন্তু নবী তাঁকে দেখতে পেতেন না, জিবরাঈল (আঃ) আমার অন্তরে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন যে, কোনো প্রাণ তার নির্ধারিত রিজিক ও সময় পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যু বরণ করবে না।” [স়াহ়ীহ় মুসলিম ২৯৮৫], একেই ইল্হাম বলে () কখনো নবীজি ফেরেশতার কণ্ঠ শুনতেন, কিন্তু তাঁকে দেখতে পেতেন না, কখনো অহ়ী আমার কাছে ঘণ্টাধ্বনির মতো শব্দে আসে, যা আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন রূপ।” [স়াহ়ীহ় বুখারী ৬৮৬৫, স়াহ়ীহ় মুসলিম ২৩৩৩] () কখনো ফেরেশতা মানবাকৃতি ধারণ করে নবীর সামনে উপস্থিত হতেন, হ়াদীস--জিব্রীল [স়াহ়ীহ় মুসলিম ৮] () কখনও ফেরেশতার প্রকৃত রূপে আগমন, নবীজি দুবার জিবরীল (আঃ)-কে  তাঁর প্রকৃত রূপে দেখেছেন, তিনি (মুহ়াম্মদ সাঃ) তাঁকে (জিবরীল আঃ-কে) আরেকবার দেখেছিলেন সিদরাতুল মুনতাহায়।” [সূরা আন্‌-নাজ্ ১৩-১৪] সেই সময় জিবরীল (আঃ)-এর ছিল ছয়শডানা, যা দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত ছিল। () পর্দার আড়াল থেকে আল্লাহ্র কথোপকথন, এটি বিরল ও বিশেষ মর্যাদার অহ়ীযেমন মূসা (আঃ)-এর ক্ষেত্রে ঘটেছিল, নিশ্চয় আমি তোমার প্রভু; তোমার জুতো জোড়া খুলে ফেলো।” [সূরা তাহা ১১-১৩] তাছাড়া নবীজিও মিরাজ-এর রাতে আল্লাহর সঙ্গে পর্দার আড়াল থেকে কথা বলেছেন এবং এর মাধ্যমে নামাজ় ফরজ় করা হয়েছে আর অহ়ী অবতরণের সময় নবীজির মুখমণ্ডল লাল হয়ে যেত, কপাল ঘামে ভিজে যেত, কখনো উটের পীঠে থাকলে উট বসে পড়ত, আর অহ়ী শেষে তিনি আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে তেলাওয়াত করতেন। অহ়ী অবতরণ পদ্ধতি ইসলামে এক অনন্য অধ্যায়। এগুলো নবুয়তের স্বকীয়তা ও অহ়ীর ঐশী প্রকৃতিকে প্রমাণ করে। আর তাই সালাফ়দের বিশ্বাস অহ়ী মানবীয় চিন্তা, কল্পনা বা অভিজ্ঞতার ফল নয়; এটি আল্লাহর নির্ভুল যোগাযোগ ব্যবস্থা।
 
অহ়ীর প্রকারভেদ ইসলামী তত্ত্ব ও শাস্ত্রে অহ়ী একটি কেন্দ্রীয় ধারণা। অহ়ী মহান আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত নির্দেশ, যা মানবজগতের জন্য আইন, শিক্ষা ও নির্দেশনা বহন করে। অহ়ীকে প্রধানত দু ভাগে ভাগ করা হয়— () অহ়ী মাত্‌লু অর্থাৎ তেলাওয়াতযোগ্য অহ়ী () অহ়ী গ়ায়ের মাত্‌লু অর্থাৎ তেলাওয়াতের জন্য নয়, তবে নির্দেশনামূলক উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত, তবে তাদের ভাষাগত ও ব্যবহারিক বৈশিষ্ট্য ভিন্ন।
 
(১) অহ়ী মাত্‌লু— মাত্‌লুশব্দটি আরবি শব্দ তালা ইয়াত্‌লু তিলাওয়াতানথেকে নির্গত, যার অর্থ পাঠ করা বা আবৃত্তি করা। সুতরাং অহ়ী মাতলু বলতে বোঝায়, যে অহ়ীর শব্দ ও অর্থ উভয়ই মহান আল্লাহ পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং যা তিলাওয়াতযোগ্য। এটি কেবলমাত্র পবিত্র আল্‌-ক়ুর্‌আনআর এ সম্পর্কে পবিত্র আল-ক়ুর্‌আনের সূরা আশ্‌-শু‘আরাতে বলা হয়েছে—এটি বিশ্বজগতের প্রতিপালকের অবতীর্ণ বাণী। বিশ্বস্ত রূহ (জিব্‌রাঈল আঃ) তা অবতীর্ণ করেছেন তোমার অন্তরে, সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়।” [সূরা আশ্‌-শুআরা 192195] এবং সূরা আল্‌-হ়িজ্‌র-এ রয়েছে— “নিশ্চয় আমিই এই জ়িক্‌’ (ক়ুর্‌আন) অবতীর্ণ করেছি, এবং আমিই একে সংরক্ষণ করবো” [সূরা আল্‌-হ়িজ্‌র ৯] আর সূরা আল্‌-ক়িয়ামাহ্‌তে রয়েছে“নিশ্চয় (তোমার অন্তরে) এটি সমাবিষ্ট করা ও (তোমাকে) পাঠ করানো  আমার দায়িত্ব। যখন আমি এটি  (জিবরীলের মাধ্যমে) পাঠ করবো, তখন তুমি তার তেলাওয়াত অনুসরণ করো। এরপর তার ব্যাখ্যা করাও আমা দায়িত্ব” [সূরা ল্‌-ক়িয়ামাহ্‌ ১৭-১৯] এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, পবিত্র আল-ক়ুর্‌আন শব্দ ও অর্থসহ আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ; আর তাই পাঠযোগ্য ও সংরক্ষিত। এবং এর পাঠ একটি পুণ্যময় কাজ।
 
() অহ়ী গ়ায়ের মাত্‌লু— গ়ায়ের মাতলু”-এর অর্থ যা তেলাওয়াতের জন্য নয়, অর্থাৎ যে অহ়ীর ভাব অর্থ আল্লাহর, কিন্তু শব্দ ও ভাষা নবী (সাঃ)-এর নিজের। এটি তেলাওয়াতের জন্য নয়, অর্থাৎ এটি আল-কুরআনের মতো তেলাওয়াত ও পাঠ  করলে পুণ্য হবে, এমনটা নয়; তবে নির্দেশ ও বিধান ক়ুর্‌আনের মতোই অনুসরণের উপযোগী। সাধারণত হ়াদীস ও সুন্নাহ এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। এ মর্মে পবিত্র আল-ক়ুর্‌আনে রয়েছেতিনি (সাঃ) নিজ ইচ্ছায় কোনো কথা বলেন না; তবে তা অহ়ী যা তাঁর প্রতি প্রেরণ করা হয়” [সূরা আন্‌-নাজ্‌ম ৩-] অর্থাৎ নবী (সাঃ)-এর বক্তব্যও আল্লাহর অহ়ী, যদিও শব্দ ও ভাষা নবীজির। বিভিন্ন হ়াদীসেও এ বিষয়টি উপস্থাপিত হয়েছে, নবীজি (সাঃ) বলেছেনশোনো, আমাকে ক়ুর্‌আনের পাশাপাশি তারই মতো আরেকটি (অহ়ী) প্রদান করা হয়েছে।” [বু দাদ 4604, মুসনাদ আহ়মাদ 17174] সহজ করে বললে, হ়াদীস ও সুন্নাহ অহ়ী গ়ায়ের মাতলুর অন্তর্ভুক্ত।
 
অহ়ী মাত্‌লু ও গ়ায়ের মাত্‌লুর পার্থক্য মাত্‌লু ও গ়ায়ের মাত্‌লু উভয় অহ়ীর উৎস মহান আল্লাহ্‌। তবে মাত্‌লুর ভাষা আল্লাহ্‌ কর্তৃক নির্ধারিত, আর গ়ায়ের মাত্‌লুর ভাষা খোদ নবীজির। তাছাড়া মাত্‌লু তেলাওয়াত যোগ্য অর্থাৎ এর কেবল পাঠও এক ধরণের ইবাদত বা পুণ্যের কাজ। কিন্তু গ়ায়ের মাত্‌লু’র কেবল পাঠ পুণ্যময় কাজ হিসেবে গণ্য হয় না। মাত্‌লু বলতে পবিত্র আল-ক়ুর্‌আন আর গ়ায়ের মাত্‌লু বলতে হ়াদীস ও সুন্নাহকে বোঝানো হয়।
 
অহ়ী গ়ায়ের মাত্‌লুর গুরুত্ব— অহ়ী গ়ায়ের মাত্‌লুর পাঠ পুন্যময় কাজ না হলেও শরীয়তে এর গুরুত্ব অপরিসীম। অহ়ী মাত্‌লু অর্থাৎ পবিত্র আল-ক়ুর্‌আনেবহু আয়াত সংক্ষিপ্তরূপে অবতীর্ণ হয়েছে পরবর্তীতে অহ়ী গ়ায়ের মাত্লু অর্থাৎ হ়াদীস ও সুন্নাহ সেই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা ও বিস্তারিত রূপ প্রদান করেছেযেমন নামাজ়, রোজ়া, হ়জ্জ জ়াকাতের পদ্ধতি ক়ুর্‌আনে সবিস্তারে আলোচিত হয়নি, তবে হ়াদীসে পূর্ণ রূপে উপস্থাপিত হয়েছে তাই বলা হয়, অহ়ী গ়ায়ের মাত্লু ক়ুর্‌আনের সহায়ক ও ব্যাখ্যাকারী। এটি ক়ুর্‌আনের নির্দেশ বাস্তব জীবনে কীভাবে পালন করতে হবে তা শেখায়। এটি শরীয়তের অন্যতম উৎসএর মাধ্যমে মুসলিম সমাজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক দিকনির্দেশনা পায়। তাছাড়া নবীজি এমন বহু বিষয়ে কথা বলেছেন যা ক়ুর্‌আনে নেই, কিন্তু পরে তা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তাই এটি নবীজির নবুয়ত ও সত্যতারও প্রমাণ অতএব অহ়ী গ়ায়ের মাত্লু শরীয়তের এক অপরিহার্য অংশ। এটি ক়ুর্‌আনের পরিপূরক ও ব্যাখ্যাকারী হিসেবে কাজ করে, ইসলামী জীবনব্যবস্থাকে পূর্ণতা প্রদান করে। আর তাই নবীজি বিদায়ী হ়জ্জের ভাষণে অহ়ী মাত্‌লু ও গ়ায়ের মাত্‌লু অর্থাৎ ক়ুর্‌আন ও সুন্নাহ দুটোকেই আঁকড়ে ধরার আহবান জানিয়েছেন। 

[পূবের কলম, দ্বীন দুনিয়া, ৫ ডিসেম্বর ২০২৫-এ প্রকাশিত]