আমাদের পুরনো বাড়িটা বেশ বড়ই ছিল। তবে তিন-তিনটে পরিবার থাকার উপযোগী নয়। তাই
বাড়ি ভাগ হলো। উত্তর দিকের ঘরদোর ও আঙিনা বড় আব্বা নিলেন, আর দক্ষিণ দিকের বাকি অংশটা মেজো আব্বা নিলেন। আমরা চলে এলাম পূর্বদিকে—যেটা মূলত বৈঠকখানা ও গোয়ালঘর ছিল। সেখানে ছিল তিনটে খড়ের ছাউনি-ওয়ালা মাটির
ঘর। সামনের দিকে খানিকটা ফাঁকা জায়াগ। আর পেছনের
দিকে লম্বা করে অনেকটা জায়গা। সামনের দিকটায় ইটের প্রাচীর তুলে তাতে একটা চালা টাঙিয়ে আমরা থাকতে আরম্ভ করলাম। একটা ঘরে আমি আর মা থাকতাম। বাবা থাকতেন বারান্দায়। আর দুই দাদা থাকতো অন্য ঘরটায়। আরেকটা
ঘর ছিল একটু পেছনের দিকে—সেটায় থাকতো আমাদের হালের গরু, গাভী ও
ছাগলগুলো। আর ওই ঘরের পেছনের চালায় মা রান্নাবান্না করতেন। এবং ফাঁকা জায়গায় নানা রকমের শাকসবজি চাষ করা হতো। দুই দাদা মিলে মায়ের
ফরমায়েশ মোতাবেক বাঁশ ও কঞ্চি দিয়ে একটা চাঙ্গিও তৈরি করে দিয়েছিল। তাতে মা লাউ, কুমড়ো, শিম, পুই শাক কতকিছু যে চাষ করতেন।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় মাগরিবের
পর আমাদের সামনের চালায় আড্ডা বসত। বাবা-মা আমাকে গল্প
শোনাতেন। দুই দাদা নিজের কাজকর্ম ও পড়াশোনার ফাঁকে আমাকে পড়াতেন। মাঝেসাঝে পাড়াপড়শিরা আসতো আব্বার কাছে পরামর্শ নিতে।
আর বিকেল বেলা পার্শ্ববর্তী বাড়িগুলোর কাকিমা ও ভাবিরা এসে মায়ের সঙ্গে গল্প করতো। ও বাড়িতে ওভাবেই বেশ ক’ বছর থেকেছি আমরা।
সামনের চালাটায় ছিল টিনের ছাউনি, আর বাকি ঘর ও
চালাগুলো ছিল খড়ের। খড়ের ছাউনিতে গরমের দিনে ভীষণ আরাম—ঘরদোর বেশ ঠাণ্ডা থাকে। যারা কখনও থেকেছে জানে। তবে বর্ষাকালে বেশ
ভোগায়। তার ওপর বছর বছর খড় পালটানোর ঝামেলা, বাড়তি খরচ। তাছাড়া একটু হাওয়া দিলেই চালা
নড়বড়ে করে। দেয়াল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। ভারি বর্ষা হলে চালার মাঝখান দিয়েও টিপটিপ
করে জল পড়ে।
আমি তখন খুব ছোট,
তবুও স্পষ্ট মনে আছে। মাঝরাতে মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে। আকাশ মুহুর্মুহু হাঁক ছাড়ছে। সেই সাথে বিদ্যুতের
ঝলকানি, চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। বাবা আমাকে ডাকলেন—
“বাবু,
ওঠ্। বিছানাটা গুটিয়ে নে। দেখ, ওইখানে জল পড়ছে। যা,
বদনাটা নিয়ে আয়—ওই জায়গায় পেতে
দে। বাবু,
পূব কোণে দেখ—ওখানে চালটা ফুটো হয়ে
গেছে মনে হয়। টিপটিপ করে জল পড়ছে, সেখানে একটা বালতি
পেতে দে। যা তো,
তোর বড়দাকে ছাগলগুলো অন্য জায়গায় বাঁধতে বল। ছাগলগুলো সেই তখন থেকে ভেবাচ্ছে—ভিজে গেছে মনে
হয়।”
আমি ধড়ফড় করে উঠে চোখ
রগড়াতে রগড়াতে দেখি—মা বিছানাপত্র সব গুটোচ্ছেন; বাবা টর্চ মেরে মেরে দেখছেন, কোথায় কোথায় জল পড়ছে;
দুই দাদা গোয়ালঘরে গরু-ছাগল নিয়ে ব্যস্ত। আর আমি ঘুম-চোখে বাবার নির্দেশ মতো কোথাও বালতি, কোথাও বদনা, কোথাও মগ,
কোথাও থালা, কোথাও হাঁড়ি
পেতে বৃষ্টি আর দুর্যোগের মোকাবেলা করছি।
ওই বাড়িতে এভাবেই বহু রাত এবং বেশ ক’টা বর্ষা কেটেছে আমাদের। বাড়িটাও এই ক’ বছরে বহুবার
তার রূপ ও খোলস পালটেছে। খড়ের চালার জায়গায় টিনের ছাউনি হয়েছে। মাটির দেয়াল ভেঙে ইটের হয়েছে।
কিছু অংশে মাথার ওপরে কংক্রিটের ছাদও উঠেছে। এক তলা থেকে দোতলা হয়েছে। তুলাই নদী দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। ‘বিশে বিষ’ হয়ে গেছে সময়। করোনার কবলে পড়ে থমকে গেছে জীবন। লকডাউন ও নানা অসুবিধার কারণে
আমি এখন গ্রামের বাড়িতেই আটকে। দিনের বেলা অনলাইন ক্লাসের পাশাপাশি কলেজের নানা কাজ করছি।
আর রাতগুলো মেতে উঠছে ইউরো’র ফুটবলে।
গতকাল খেলাটা সবে শেষ হয়েছে, এমন সময় এক বন্ধু ফোন
করল। তার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলার পর একটা আর্টিকেল পড়তে আরম্ভ করলাম। অপূর্ব
লেখা—এত ভালো যে একবার শুরু করলে শেষ না করে থাকা যায় না। কখন যে রাত দুটো বেজে গেছে
টেরই পাইনি। হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানি চোখে পড়ল। বাইরে ঝমঝম করে বর্ষা নেমেছে। চারিদিক নিঝুম।
ল্যাপটপটা বন্ধ করে বারান্দায় এলাম। কার্নিশের পাশে দাঁড়াতেই জলের ঝাপটা গায়ে
এসে পড়ল। এক পা,
দু’
পা করে মায়ের ঘরের দিকে গেলাম। আস্তে করে দরজা খুলে দেখি—মা আর ছোট ভাইঝি গভীর ঘুমে। দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে এধার-ওধার পায়চারী করে দেখলাম, বড়দা-মেজদা কেউই জেগে নেই। সবাই নিদ্রামগ্ন।
ফিরে এলাম আমার ঘরের বারান্দায়। চারিদিকে শুধু ঝমঝম-ঝমঝম বৃষ্টির আওয়াজ। বারান্দার
ডান পাশে কার্নিশটার নিচে দাঁড়াতেই দেখি—কার্নিশ বেয়ে টপটপ-টপটপ করে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে। বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের মধ্যেও জলের ওই টপটপ শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। আর সেই সঙ্গে অবচেতন
মনে শুনতে পাচ্ছি কোথা থেকে যেন একটা দরাজ কণ্ঠ ভেসে আসছে, খুব পরিচিত সেই কণ্ঠ—“বাবু ওঠ্,
ওইখানে জল পড়ছে… বালতিটা পেতে
দে… ওখানে মগটা…
ওই জায়গায় একটা থালা দিয়ে দে…”
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সম্বিৎ ফিরে পেলাম। বর্ষার মতো করে চোখ দিয়ে জল ঝরতে লাগল।
বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। চোখ দুটো বন্ধ করে অস্ফুটে উচ্চারণ করতে লাগলাম—
“বাবা, তুমি কি পারো না, একবার—অন্তত একবার এসে দেখে যেতে, আমাদের নতুন বাড়িটা কেমন
হয়েছে; ঘরগুলো বেশ বড়সড়, বারান্দাটাও বেশ চওড়া, জানালা-দরজাও মানানসই, ঠিক যেরকম একটা দালানবাড়ির তোমার শখ ছিল, সেসব দেখে যেতে; তোমার ইজি-চেয়ারটা
বারান্দার কোন পাশে রাখবো তা দেখিয়ে দিতে, পারো না বাবা,
একবার… শুধু একবার…!”
বাঁশকুড়ি, দঃ দিনাজপুর
২০/০৬/২০২১



.png)