Wednesday, 11 March 2026

এক অন্য রকম সংবর্ধনা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

  

২০০৭ সাল। আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। সে বছর আমি বাসুরিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা থেকে আলিম পরীক্ষা দিই। আলিম পরীক্ষাপশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষৎ কর্তৃক আয়োজিত, মাধ্যমিকের সমতুল্য এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাতবে আমার কাছে তা শুধু একটি পরীক্ষাই ছিল না, ছিল স্বপ্ন, ছিল প্রত্যাশা, ছিল নিজের ভেতরের সাধনার এক নীরব প্রকাশ।
 
পরীক্ষার সেন্টার পড়েছিল আবেশকুড়ি হাই মাদ্রাসায়। বাড়ি থেকে বেশ দূরে। ফলে গিয়ে উঠলাম জলকুড়িয়ায় সুরো দি’র বাড়িতে। পরীক্ষার দিনগুলো আজও চোখে ভাসে। সকাল সকাল গোসল করে, চারটা ডালভাত খেয়ে সাইকেল নিয়ে যথাসময়ে পৌঁছে যেতাম সেন্টারে। পরীক্ষা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকেই ইনভিজিলেটর স্যার ও ম্যাডামেরা মাঝে মাঝে এসে আমার খাতা উল্টেপাল্টে দেখতেন, মৃদু হেসে বলতেন—“বেশ সুন্দর হাতের লেখা, বিশেষ করে আরবি।কথাগুলো শুনে বুকের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসত। আমাদের স্কুলের স্যারেরা আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন, যেন পরীক্ষার হলে আমার কোনো রকম ডিস্টার্ব না হয়। সেই যত্ন, সেই আস্থাআজও মনে পড়লে বুকটা ভরে যায়।
 
পরীক্ষা শেষে ফিরে এলাম বেলপুকুর মাদ্রাসায়। দিন কাটছিল খুব সাধারণভাবেদিনে একটু আধটু পড়াশোনা, বিকেলে মাসুদের সঙ্গে গল্প, কখনো বা খেলাধুলা। এরই মাঝে একদিন বিকেলে বনিপাড়ার মোতালেব স্যার আমাকে ডেকে বললেন— “মাতিন, তুমি একটা কাজ করবে? সন্ধ্যেবেলা আমাদের বাড়িতে এসে তোমার কাকিমা আর বাকিদের আরবি উচ্চারণটা একটু শুদ্ধ করে শিখিয়ে দেবে। যাতে ওরা ঠিকভাবে কুরআন পড়তে পারে।
 
স্যার আমাকে খুব স্নেহ করতেনফলে তাঁর  সেই কথা অমান্য করে তাঁকে অসম্মান করার মতো আহাম্মকি করি কী করেতাই মাগরিবের নামাজের পর স্যারের বাড়ি যেতে আরম্ভ করলামএভাবেই দিন গড়াতে লাগলনিঃশব্দে, নীরবে
 
তারপর এলো রেজাল্টের দিন। মোতালেব স্যার মালদা গেলেন বেলপুকুর হাই মাদ্রাসার রেজাল্ট আনতে। সেখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয় আমাদের হেড স্যারেরঅর্থাৎ সুপারিন্টেন্ডেন্ট গণি স্যারেরসেখান থেকেই প্রথম খবরটা আসে। মোতালেব স্যার ফোন করে বললেন, “মাতিন, তুমি র‍্যাংক করেছো।কত নম্বর, কত র‍্যাংকতা তখনও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।
 
কিছুক্ষণ পরেই স্কুলের স্যারেরা জানালেনআমি রাজ্যে দ্বিতীয় হয়েছি। আনন্দে বুক ভরে গেল। কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেই ফারুকী স্যারের কণ্ঠে প্রবল ক্ষোভ— “এই পেপারটায় তো তুমি আরও ভালো করেছিলে! এখানে এত কম নম্বর কেন?”
 
স্যারের সেই কথার ভেতর ছিল ছাত্রের প্রতি গভীর দরদ পরবর্তীতে তাঁরাই উদ্যোগ নিয়ে রিভিউয়ের আবেদন করলেন। যথাসময়ে ফল বেরোলদেখা গেল, আমার সেই পেপারে দশ নম্বর বেড়েছেমুহূর্তেই বদলে গেল ইতিহাস। আমি রাজ্যে প্রথম হয়ে গেলাম।
 
এরপর যেন একের পর এক ঘটনা। কোলকাতায় গিয়ে বিভিন্ন সংস্থা থেকে পুরস্কার, সংবর্ধনা, মানপত্র গ্রহণ। খবর বেরোল পত্রপত্রিকায়। এলাকায় জানাজানি হয়ে গেল। চারপাশ থেকে স্নেহ, ভালোবাসা, দোয়াসবকিছু একসঙ্গে এসে আমাকে ঘিরে ধরল। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেও এমন এক ঘটনা ঘটেছিল, যা আজও আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
একদিন হোস্টেল থেকে বাড়ি ফিরছি। মহিপালে বাস থেকে নামলাম। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর একটা রিকশা পেলাম। কথা হতে লাগল রিকশাওয়ালা কাকুর সঙ্গে। তাঁর বাড়ি আমাদের পাশের গ্রাম চাঁদপুরে। তাঁর কথাবার্তায় বুঝতে পারলাম, তিনি আমাদের পরিবারকে অল্পস্বল্প চেনেন ও জানেন। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করছিলেনআমি এখন কোথায় পড়ছি, কী পড়ছি। আমিও সহজভাবেই সব বলছিলাম।
 
আধ ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের গ্রামের মোড়ে পৌঁছে গেলাম। তখন মহিপাল থেকে বাঁশকুড়ি পর্যন্ত রিকশা ভাড়া ছিল সম্ভবত কুড়ি টাকাসে সময়ের হিসেবে যা মোটেই কম নয়। আমি যখন ভাড়া দিতে এগিয়ে গেলাম, তিনি হাত বাড়ালেন না।  মৃদু হেসে বললেন— “বাপু, তোরা হামার এলাকার নাম উজ্জ্বল কইছেন। তোমার ঠি হাঁরা ভাড়া নিমো না। ভগবান তোমাক আরও বড় মানুষ করৌক!”  
 
আমি থমকে দাঁড়িয়ে রইলাম। এতটা নিঃস্বার্থ ভালোবাসা! কীভাবে তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানাবোসেই মুহূর্তে মাথায় কিছুই আসছিল না। এতটাই অবাক হয়ে গেছিলাম যে, কাকুকে তাঁর নামটাও জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছিলাম  
 
আজ এতো বছর পর আমার আফসোস হয়। যদি রিকশাওয়ালা কাকুর নামটা জানা থাকত, ওই গ্রামে আমার যে বন্ধুবান্ধব আছে, তাদের মাধ্যমে হয়তো তাঁর খোঁজখবর নিতে পারতাম। কিন্তু নাতা আর হয়ে ওঠেনি।
 
মাঝে মাঝেই কেন জানি মনে হয়, জীবনে কিছু মানুষ সত্যিই ফেরেশতার মতো আসে। কোনো পরিচয় ছাড়াই, কোনো প্রত্যাশা ছাড়াইনিজের ভালোবাসাটুকু দিয়ে চলে যায়। সেই রিকশাওয়ালা কাকু আমার জীবনে ঠিক তেমনই এক ফেরেশতা হয়ে এসেছিলেন। আসলেনস্নেহ-ভালোবাসায় জড়িয়ে আবার নিঃশব্দে মিলিয়ে গেলেন
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
০৪/০৩/২০২৬

Sunday, 8 March 2026

শইরদ্দিন ডাক্তার - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

  

সকাল বেলা সবাই বসে চা খাচ্ছি এমন সময় মেইন দরজায় ক্রিং ক্রিং করে সাইকেলের বেল বেজে উঠলো সেই সাথে বাতাসে ভেসে এল একটা দরাজ কণ্ঠ— “কাঁ বো মামি, বাড়িত আছেন?” মুহূর্তেই হাড়াম করে দরজাটা খুলে গেলে আর সেই সাথে লম্বা একটা সালাম শুনতে পেলাম আমরা দেখলাম, দরজায় শইরদ্দিন ডাক্তার 
 
তাঁর ভালো নাম শহিরুদ্দীন আহমেদ। কিন্তু এই নামটা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। মানুষ তাঁকে চেনে ও ডাকেশইরদ্দিন ডাক্তার নামে। সম্পর্কে তিনি আমার দাদু হোনআমার বাবার দূরসম্পর্কের মামা। তাই দেখা হলে, আমাদের দাদু-নাতির খুনসুটি লেগেই থাকে। তবে এই সম্পর্কের চেয়েও বড় পরিচয়, তিনি আমাদের এলাকার এক জীবন্ত ইতিহাস।
 
সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। একটা পুরনো সাইকেল, হ্যান্ডেলে ঝোলানো ব্যাগ ও মাঝেসাঝে একটা বর্ষাতিএই তাঁর সব, এই তাঁর সম্বল। সেই সাইকেল নিয়েই তিনি চষে বেড়ান পুরো এলাকাচণ্ডিপুর, পুতহরি, তুলাই পেরিয়ে উদয়পুর, আরও আশপাশের কতশত গ্রাম। সাইকেলের হ্যান্ডেলে ঝোলানো সেই পুরনো ব্যাগে থাকে নানারকমের ওষুধহোমিওপ্যাথির শিশি, কাগজে মোড়া বড়ি, আর সঙ্গে তাঁর অদ্ভুত বিশ্বাসমানুষ ঠিক হলে ওষুধও কাজ করে। কোনো ডিগ্রি নেই, কোনো চেম্বার নেই; তবু অসংখ্য মানুষের ভরসার জায়গা তিনি।
 
তিনি শুধু ডাক্তার নন, তিনি একজন গল্পকারও এলাকার সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষদের একজন, তাঁর ঝুলিতে জমে আছে সময়ের অগণিত কাহিনীসন্ধ্যা নামলে, বা অলস দুপুরে, তাঁর মুখে শুনেছি পলিয়া পাড়ার গল্প, ফাঁসিতলার ইতিহাস, শালেককুড়ির অজানা উপাখ্যান, বড় মৌলানা ও তাঁর ভাইয়ের শিক্ষা, সংগ্রাম, রাজনীতি ও নানা টানাপোড়েনআরও কত শত গল্প, যা কোনো বইয়ে লেখা নেই, শুধু মানুষের মুখে মুখেই বেঁচে আছে।
 
এসবের বাইরেও তাঁর একটা অদ্ভুত শখ আছেশখ বললে কম বলা হবে, তবে কেউ চাইলে একে বদ নেশাও বলতে পারে। তিনি বছরের পর বছর ধরে লিখে রেখেছেন এলাকার মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ। কার কখন জন্ম, কে কবে চলে গেলসবই তাঁর খাতায় যত্ন করে লেখা। কোনো গবেষণার উদ্দেশ্যে নয়, কোনো উপার্জনের আশায়ও নয়, আর না কোনো স্বীকৃতির লোভেশুধু মানুষকে, এলাকা আর তার ইতিহাসকে ভালোবেসে। যেন সময় হারিয়ে গেলে অন্তত নাম-তারিখগুলো বেঁচে থাকে।
 
ইদানীং বয়স বেড়েছে তাঁর শরীর ভার হয়েছে, চোখে ঝাপসা দেখেন, হাত কাঁপে কখনো কখনো। তবে আশ্চর্য এক জেদে আজও থেমে যায়নি তাঁর সাইকেলের চাকা, এক দিনের জন্যেও নাগতি কমেছে, পথ ও পরিধি ছোট হয়েছে, কিন্তু থামেনি। কারণ এই সাইকেল শুধু যাতায়াতের বাহন নয়এটাই তাঁর পরিচয়, তাঁর দায়বদ্ধতা, তাঁর নিঃশব্দ সেবা।
 
এবার বাড়ি গিয়ে একদিন মোড়ে বসে মোবাইল ঘাঁটছি, এমন সময় তিনি মহিপাল থেকে ফিরছিলেন। আমাকে দেখে অটো থেকে নেমে পড়লেন। কাছে এসে বিনয়ের স্বরে বললেন,
—“প্রোফেসর সাহেব, একটা অনুরোধ রাখতে হবে”
উত্তর দিলাম—হুকুম করেন, মহারাজ।
হা হা করে হাসতে হাসতে বললেন,
—আমাদের গ্রামে একবার যেতে হবে, মসজিদটা দেখতে। বহুবার বলেছি, এবার যেতেই হবে।
—আলবৎ যাবো। কথা দিলাম। ইন্‌ শা আল্লাহ্‌!
 
পরের দিন সকাল বেলা চা খেয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম বাটুয়াদীঘি। আমাদের জমিজমাগুলো এক নজর দেখে প্রথমে গেলাম বড় দাদিকে দেখতে। তাঁর সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিলাম। তারপর শইরদ্দিন দাদুর বাড়ি গেলাম। গিয়ে দেখি, তিনি যথারীতি সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। দাদি ঘর থেকে বেরিয়ে বেশ জোরাজুরি করতে লাগলেন চা খাওয়ার জন্য। তাঁকে কোনোরকমে মানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আব্দুল ওয়াহাব, তাঁর ছোট ছেলে আমাকে তাঁদের মসজিদটা দেখাতে নিয়ে গেল। মসজিদে ঢুকেই আমি অবাক। সুন্দর করে সাজানো। চারপাশে ফুলের গাছ। কতশত রকমের ফুল ফুটে আছে ডালে ডালে। প্রাচীরের গায়ে লম্বা লম্বা সুপুরি ও পাইন গাছ দাঁড়িয়ে। মেঝের মার্বেল আয়নার মতো স্বচ্ছ। কোথাও ধূলিকণাও নেই। আব্দুল ওয়াহাবকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, দাদু রোজ দু’ বেলা নিজে প্রথমে ঝাড়ু দেন। তারপর একবার জল দিয়ে পোছা লাগান। শেষে একবার শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে দেন। আর এসবই করেন পরম যত্নে, মমতা ভরে।  
 
সত্যি করে বলতে, শইরদ্দিন দাদু শুধু একজন মানুষ ননতিনি একটা যুগ, একটা জনপদ, একটা চলমান স্মৃতিভাণ্ডার। তিনি ওষুধ দিয়ে যেমন বহু মানুষের রোগ সারিয়েছেন, তেমনই গল্প দিয়ে জুড়ে রেখেছেন ভাঙতে বসা স্মৃতিগুলোকে এই এলাকায় জন্ম নেওয়া আর চলে যাওয়া অসংখ্য মানুষের নামের পাশে, নীরবে কোথাও না কোথাও লেখা আছে তাঁরই ছায়া—যে ছায়া এখনো হেঁটে বেড়ায়, শীতের সকালে কুয়াশার চাদর জড়িয়ে, অথবা গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় গোধূলির আলো গায়ে মেখে, অথবা নিঝুম বর্ষায় বর্ষাতি মাথায়, হেঁটে বেড়ায় বাঁশকুড়ি-বাটুয়াদীঘি মেঠো পথে।
 
১৯/০১/২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা

Friday, 6 March 2026

পীর পখরিয়া - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 


কাঁ বাহে, পন্তা খাবানেন। বেলা হই গেল।
কেনে খামোঁ না। আলবাৎ খামোঁ। কুইন্না খাবেন চলো।
কেনে, পীর পখরিয়া ডাঙিত।
চলো তাইলে।
 
আমাদের গ্রামের দক্ষিণপশ্চিম কোণে, এক্কেবারে মাঝ মাঠে অবস্থিত একটা ছোট্ট জলাশয়তার চারপাশে বিস্তৃত ধানক্ষেত, পুকুর লাগোয়া একটা ডাঙা ধাঁচের সামান্য উঁচু জমি, আর পাড়ে কয়েকটা পুরনো গাছযে গাছগুলো বহু বছর ধরে সবকিছুর নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লোক মুখে এর নাম পীর পখরিয়া। এই নামটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের একখণ্ড শৈশবএই পুকুরটাই ছিল আমাদের ছেলেবেলার পরিচিত দিগন্তের শেষ সীমানা। এখানে পখর বা পখরিয়া মানে পুকুরআর শোনা যায়, কোনো এককালে এই পুকুরপাড়েই নাকি এক পীরের আবাস ছিল। সেই থেকে পীর পখরিয়া। তবে সত্য-মিথ্যা আমার জানা নেইআর তখন তা যাচাই করার বয়সও আমাদের ছিল না; প্রয়োজনও মনে হয়নি। তখন বিশ্বাসটাই ছিল আমাদের একমাত্র যুক্তি।
 
বছরের পর বছর ধরে সেই পুকুরপাড়ে কত মানুষের যে ক্লান্তি এসে জমা পড়েছে, তা আল্লাহ্‌ই ভালো জানে ছোটবেলায় দেখতাম, রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে চাষা, দিনমজুর ও রাখালেরা কাজের ফাঁকে সেখানে এসে বসত। কেউ পোঁটলার ভেতর থেকে পান্থা ভাত বের করে বলত,
—“এই জায়গাত বসো, এইন্না হাওয়া লাগেছে
কেউ পুকুরের জল হাতে-মুখে ছিটিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলত,
—“আহ্‌, কী আরাম লাগেছে, মনে হছে স্বর্গত আনু!
 
পুকুরের ঠান্ডা জল, গাছের ছায়া আর নিঃশব্দ মাঠসব মিলিয়ে জায়গাটার মধ্যে ছিল এক নৈস্বর্গীক সৌন্দর্য, সেখানে বিরাজ করতো অদ্ভুত এক প্রশান্তি, যা শব্দে ধারণ করা আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব।  
 
আমাদের শৈশবের স্কুল ফেরত বিকেলগুলো সেই পুকুরকে ঘিরেই আবর্তিত হতোস্কুল ছুটির পর আমরা ছুটে যেতাম পীর পখরিয়ায়। কেউ চিৎকার করে বলত,
—“চলো, আগে পুকুরপাড়ত দৌড় দিমোঁ!
কেউ আবার সাবধানের সুরে ফিসফিস করে বলত,
—“আন্ধার হইলে কিন্তু পীর বাবা রাগ করিবি!
 
হঠাৎ যদি কোনো অচেনা শব্দ কানে আসত, কিংবা আকাশটা আচমকা কালো হয়ে উঠত, আমরা সবাই একসাথে বলে উঠতাম
—“পীর বাবা, হামাক বাঁচা!
আর সঙ্গে সঙ্গে দর কষাকষি শুরু হয়ে যেত
—“দুটা ঘোড়া চড়ামো তোর থানত
—“মুই বাতাসা দিম
—“মুই খুরমা দিম, কথা দেছু
সেই প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল শিশুসুলভ, কিন্তু আন্তরিক।
 
সময় এগোল, আমরা একটু বড় হলাম। ভয় কিছুটা কমল, সাহসও খানিকটা বাড়ল। সেই সময় সকালে, কোনোদিন বিকেলে, মাঠে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই আমাদের চোখে পড়তপীরের থানে কেউ নতুন করে মাটির ঘোড়া চড়িয়ে গেছে। তখন আমরা খুশিতে লাফিয়ে উঠতাম।
—“দ্যাখ, নয়া রঙিন ঘোড়া!
—“এইটা মোর, আগে মুই ধইছু!
 
কখনো দেখতাম পীরের থানে বাতাসা বা খুরমা রাখা আছে। আমরা সেসব গামোছায় বেঁধে নিয়ে গাছের ডালে উঠে ভাগাভাগি করে খেতাম। খেতে খেতে কেউ গল্প ধরত, কেউ গুনগুন করে গান গাইত, আবার কেউ তার সাথে তাল মিলিয়ে বলত,
—“এনা আরও জোরে, পীর বাবা শুনেছে!
এটা শুনে আমরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়তাম। আর আমাদের হাসি, কোলাহল ও গানের সুরে মাঠটা যেন আরও প্রশস্ত হয়ে উঠত।
 
আজ এত বছর পর মনে হয়, পীর পখরিয়া আদতে কোনো অলৌকিক জায়গা ছিল না; ওটা ছিল আমাদের শৈশবের এক আশ্রয়স্থল। সেখানে ভয় ছিল, কিন্তু সেই ভয়েই ছিল ভরসা। সেখানে বিশ্বাস ছিল, কিন্তু তা কোনো ধর্মগ্রন্থে বাঁধা ছিল নাছিল নিছক মানব-আশ্রিত
 
আজ এতো বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়, যদি কোনো এক বিকেলে আবার সেই মাঠের পথে হাঁটি, হয়তো পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে কারো কণ্ঠ শুনতে পাবো
—“পীর বাবা হামাক বাঁচা!
 
যদিও সেই কণ্ঠ আর ফিরবে না জানি। সময় অনেক বদলেছেএখন গ্রামের শিশুকিশোরেরা স্কুল থেকে ফিরে আর পীর পখরিয়ায় যায় না পুকুরটাও অবহেলায় অযত্নে হয়তো বুজে গেছে সেই গাছগুলো হয়তো নেইধর্ম নিয়ে মানুষের কৌতূহল ও সচেতনতা বেড়েছে, ফলে পীরের থানে ঘোড়াগুলো আর কেউ চড়ায় না, বাতাসা-খুরমাও আর কেউ রেখে আসে না মাঝে মাঝে বালিকা বেটির দোকানের চালায় বসে অপলক পীর পখরিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকি। পচিশ-তিরিশ বছর আগের ছবিগুলো একে একে চোখে ভেসে ওঠে। মনে হয়, স্মৃতির ভেতরে পীর পখরিয়া আজও জেগে আছেপূর্ণ হয়েও যেন অপূর্ণ, ছোঁয়া যায় না অথচ ভুলে যাওয়াও যায় না। মনে হয়, সেই অপূর্ণতার স্বাদ নিয়েই আমাদের শৈশব আজ দূরে কোথাও দাঁড়িয়ে, আমার মতো করে নিঃশব্দে অপলক তাকিয়ে আছে
 
৩১/০১/২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা

Tuesday, 3 March 2026

তারাবীহ্‌র নামাজে - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 

রমজান মাসে রাতের প্রথম প্রহরে “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার” ডাক কানে ভেসে এলেই আমাদের বাড়ির পুরো ছবিটা বদলে যেত। বাতাসে নেমে আসত এক অদ্ভুত রকমের ব্যস্ততা। আমি কোনোরকম দেরি না করে তাড়াতাড়ি অজু সেরে নিতাম, যেন আজানের ধ্বনি আমাকে তাড়া দিচ্ছে। তারপর পাঞ্জাবিটা গায়ে গলিয়ে ছোট্ট লুঙ্গিটায় দুবার, কখনো তিনবার টেনে শক্ত করে গিঁট বেঁধে নিতামমনের ভেতরে একটা ভয় কাজ করতো, পাছে রুকু-সাজদায় গিয়ে যদি লুঙ্গি খুলে যায়!
 
বাবা তখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করতেনআমার অজু করা হলে তিনি যত্ন করে আমার মাথায় টুপি পরিয়ে দিতেন। তারপর রেডি হয়ে আমি তাঁর হাত ধরে মসজিদের পথে রওয়ানা দিতাম। তাঁর হাতটা ধরলেই আমার মনে হতো, পুরো দুনিয়াটাই বুঝি নিরাপদ হয়ে গেছে। রাস্তার অসমতল মাটি, সন্ধ্যার হালকা অন্ধকার, বারান্দায় বারান্দায় জ্বলতে থাকা বাতিসবকিছু মিলিয়ে সেটা ছিল এক মায়াবী পথ আজও মনে হলে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক হাহাকার জেগে ওঠেবোধ করি, তারাবীহ পড়তে যাওয়ার সেই পথটা শুধু একটা পথ ছিল না, সেটা ছিল আমাদের শৈশবের এক নির্ভার যাত্রা
 
রমজান এলেই তারাবীহ আমাদের কাছে উৎসব হয়ে উঠত। যদিও তা নফল (অর্থাৎ আবশ্যিক নয় এমন) নামাজতবে আমরা তখন এত কিছু বুঝতাম না আমরা শুধু বুঝতাম, রাতে মসজিদে গেলে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে। আনন্দ হবে। হৈচৈ হবে, এই আরকি। আমাদের গ্রামে আট রাকাআত তারাবীহ পড়া হতো। এখনো আট রাকাআতই হয়। যদিও কোথাও দশ হয়, কোথাও আবার বিশতবে হিসাবের এই মারপ্যাঁচ তখন জীবনে ঢোকেনি। আমাদের তখনকার হিসাব ছিল খুব সোজাকে কার পাশে দাঁড়াবে, কে আগে মসজিদে পৌঁছাবে।  এই সব।
 
মসজিদে ঢুকেই আমাদের ঠাঁই হতো একেবারে পেছনের কাতারে। নিয়ম মেনে বড়রা সামনে, আর আমরা ছোটরা পেছনেপেছনের সেই কাতারযেন আমাদের তরে আলাদা এক রাজ্য। নামাজ শুরু হতেই আমাদের মন নামাজে কম, খুনসুটিতে বেশি আটকে যেত। কখনো আমু হঠাৎ করে পেছন থেকে কারো পাঞ্জাবি ধরে টান দিচ্ছে, তো লাবু লুঙ্গির গিটে আঙুল ঢুকিয়ে খোঁচা মারছে। কখনো দেলোয়ার আর পাগলু চোখাচোখি করে নিঃশব্দে হেসে উঠছে। আবার কখনো আফসার কানে কানে এমন কিছু বলছে, যেটা শুনে সাজ্জেত দাঁত চেপে হাসতে হাসতে প্রায় কেঁপে উঠছে। কখনো সামনের কাতারে মিঠুন আর ঠিক তার পেছনে জুয়েল দাঁড়ালে, সাজদার বেলা সুযোগ বুঝে মিঠুনের পা ধরে জুয়েল একটা হ্যাঁচকা টান দিতো। অমনি মিঠুন নামাজের মধ্যেই ঝাঁঝিয়ে উঠত, “শালারা নামাজ পড়িব আসি শয়তানি করেছে”আরও কতো কিছু, তবে আমরা সবাই বুঝতামহাসি বেরিয়ে গেলে বিপদ, তাই আমরা সেই হাসি গিলে নামাজের জায়গায় চোখ আটকে রাখার অভিনয় করতাম
 
সত্যি করে বলতে, পেছনের কাতারটা তখন আমাদের জন্য এক অদ্ভুত স্বর্গ ছিলযেখানে শাসন ছিল না বললেই চলে, কিন্তু স্বাধীনতা ছিল অফুরানআর তাই শিশুসুলভ দুষ্টুমি, চাপা হাসি, দৃষ্টির লুকোচুরি, ঠাট্টামশকরাসব মিলিয়ে এক অনাবিল শৈশবের মঞ্চ ছিল পেছনের সেই কাতার  
 
তবে একটা মুহূর্তে সব সিনারিও বদলে যেত। যেই না ইমাম সাহেব কিরাত শেষ করে ওয়ালাজ-জাল্লীনবলতেন, অমনি আমরা সবাই যেন একসঙ্গে সিরিয়াস হয়ে যেতাম। আমু, লাবু, দেলোয়ার, পাগলু, আফসার, সাজ্জেত, মিঠুন, জুয়েলআমরা সবাই বুকভরা দম নিয়ে একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠতাম, “আমীন এত জোরে যে, আমাদের কণ্ঠ যেন টিনের ছাউনি ভেদ করে আরশে পৌঁছে যাচ্ছে। মনে হতো, এই একটিমাত্র শব্দে আমাদের সব দুষ্টুমি ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছেইদানীং মনে হয়, হয়তো সেই আমীনউচ্চারণেই ছিল আমাদের শিশুমনের সব বিশ্বাস, সব আশা, সব নির্ভরতা।
 
তারপর ইমাম সাহেব যখন অন্য কোনো সূরার পাঠ আরম্ভ করতেন, আবার শুরু হতো আমাদের দুষ্টুমিজামা টানাটানি, চোখে চোখে ইশারা, ঠাট্টামশকরা আর চাপা হাসির গুঞ্জনকিন্তু দু’ রাকাআত শেষে যেই না ইমাম সাহেব সালাম ফেরাতেন, আমরা হঠাৎই অসম্ভব ভদ্র হয়ে যেতাম। চোখ নামিয়ে চুপচাপ বসে থাকতাম, কেউ আবার তাসবীহ পাঠের আদলে মুখ নাড়তযেন আমাদের পেছনের কাতারে কোনো কিছুই হয়নি। তবে ইমাম সাহেব আবার যখন আল্লাহু আকবার বলে পরবর্তী রাকাআত আরম্ভ করতেন, আমাদের ছোট্ট রাজ্যে আবার প্রাণ ফিরে আসত।
 
এভাবে চার রাকাআত নামাজ শেষে, আরম্ভ হতো মোনাজাতইমাম সাহেব যখন দোয়ার জন্য হাত তুলতেন, তখন মসজিদের আকাশে বাতাসে এক অদ্ভুত রকমের নীরবতা নেমে আসতোতাঁর কণ্ঠ মাঝেমধ্যে কেঁপে কেঁপে উঠত, কান্নার ভারে গলা বুজে আসত। মুসল্লি মহলেও একটা চাপা কান্নার রোল উঠত। আর তা দেখে আমাদের বুকের ভেতর অজানা এক ভার নেমে আসতআমরা তখন দোয়াগুলোর মানে বুঝতাম না, কিন্তু জানতামকোথায়, কখন আমীনবলতে হয়। তাই বারবার বলে উঠতাম, “আমীন, সুম্মা আমীন, আমীন ইয়া রাব্বাল আলামীন।আজ মনে হয়, সেই আমীনগুলোই ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে খাঁটি ও নির্ভেজাল দোয়া।
 
তারাবীহ শেষ হলে আমরা আর এক মুহূর্তও মসজিদে থাকতাম নাজুতো জোড়া হাতে নিয়ে দে দৌড়। মনে হতো, যেন পায়ে বল নিয়ে গোল পোস্টের দিকে ধাওয়া করছে কোনো ফুটবলার, যেন কেউ মেসি, কেউ রোনাল্ডো, কেউ মোহাম্মদ সালাহসেই আলোআঁধারি পথ ধরে কেবল ছুটছি, আর ছুটছিযেন আমাদের সেই দৌড়ের ভেতরই শৈশবের সকল আনন্দ, সম্পূর্ণ মুক্তি।
 
আমাদের গ্রামের সেই মসজিদ আজও আছে, এখন আরও বড় আকারে, আধুনিক সাজসরঞ্জামে ভরা, মেঝেতে মার্বেল পাতা, আজানও হয়, তারাবীহ্‌ও হয়, এবং শেষ ক’বছর ধরে মেয়েরাও তাতে শামিল হয়কিন্তু পেছনের কাতারের সেই ছোট্ট ছেলেগুলো আর নেই। আমু, লাবু, দেলোয়ার, পাগলু, আফসার, সাজ্জেত, জুয়েলসবাই যে যার জীবনের কাতারে দাঁড়িয়ে গেছে। বাবার হাত ধরার সুযোগটাও আমার আর নেই। তবে রমজানের রাতে আজও যখন দূর থেকে ভেসে আসে—“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার”, হঠাৎই মনে হয়, আমি আবার সেই ছোট্ট ছেলেটা, লুঙ্গির গিট শক্ত করে বাঁধছি, আর বাবার হাত ধরে তারাবীহ পড়তে আলোআঁধারি পেরিয়ে মসজিদের পথে হাঁটছি
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
২৪/০২/২০২৬