Pages

Friday, 11 September 2026

শেষ দিয়ে শুরু - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


বিকেল খানিকটা গড়িয়েছে। পাকুড় গাছের পাতার ভেতর দিয়ে মিঠা রোদ উঁকিঝুঁকি মারছে। আর খানিকটা রোদ মাদ্‌রাসার বারান্দা ও মাঠে গড়াগড়ি দিচ্ছে। মোড়ের পুরোনো কালভার্টটার রে বসে মোজাহার কাকু একমনে জাল বুনছেন। বিকেলের নরম আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে, চারপাশে দিনের কোলাহলও যেন একটু একটু করে স্তিমিত হচ্ছেতাঁকে একা পেয়ে মনের মধ্যে বহুদিন ধরে জমে থাকা প্রশ্নটা করে ফেললামকাকু, একটা কথা জিজ্ঞেস করি, তুমি তো গ্রামের কতশত মানুষের কবর খুঁড়েছকারও কাছ থেকে এক পয়সাও নাও না। শুধু মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর আখেরাতে উত্তম প্রতিদানের আশায় বছরের পর বছর এই কাজ করে চলেছ। কিন্তু বলো তো, এই কাজের শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?

 

আমার কথা শুনে মোজাহার কাকু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। হাতের জালটা ধীরে ধীরে পাশে নামিয়ে রাখলেন। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, বহু বছরের পুরোনো কোনো দরজা যেন হঠাৎ খুলে গেল। তারপর ধীর কণ্ঠে বললেন,

এর পেছনে একটা করুণ কাহিনি আছে, ব্যাটা। তোমার আজিজ চাচার কথা মনে আছে?

আমি একটু ইতস্তত করে বললাম,

না কাকু। তাঁকে তো আমি দেখিনি। তিনি তো আমার জন্মেরও আগে মারা গেছেনতবে তাঁর নাম শুনেছি।

কাকু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছোতাঁর পুরো নাম আব্দুল আজিজ মিয়াঁ। করঞ্জি সিনিয়র মাদ্‌রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন তিন মাস হবেসদ্য টাইটেল পাশ করা তরুণ আলেম। বয়সে তরুণ হলেও জ্ঞান, বিনয় আর চরিত্রে ছিলেন অসাধারণ। শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। কারও সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলতেন না। গ্রামের মানুষ তাঁকে খুব ভালোবাসত। তাঁর মধ্যে যেন একটা আলাদা মায়া ছিলযে একবার তাঁর সঙ্গে কথা বলেছে, সে-ই তাঁকে মনে রেখেছে।

 

কাকু একটু থামলেন। তাঁর চোখেমুখে তখন যেন বহু বছর আগের কোনো ছায়া ফুটে উঠেছেবললেন,

একদিন মাদ্‌রাসায় যাওয়ার পথে তুলাই নদীর পাড়ে হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনিখবরটা মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে গেল। মানুষ ছুটে গেল তাঁকে দেখতে। কোনো রকমে তাঁকে বাড়িতে নিয়ে আসা হলো। বাটুয়া দীঘির জরিফদ্দীন আহমেদ ওরফে ডাহারু ডাক্তার এলেন। পরীক্ষা করে জানালেন, অবস্থা খুবই সংকটজনক, তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

 

কিন্তু তখন তো আর আজকের মতো আশেপাশে অ্যাম্বুলেন্স, বাস বা ট্যাক্সি ছিল না। হাসপাতালে যাওয়ার একমাত্র ভরসা ছিল গরুর গাড়ি। সবাই ছুটোছুটি শুরু করল একটা টোপরওলা গরুর গাড়ির ব্যবস্থা করার জন্য। কিন্তু গাড়ি জোগাড় হওয়ার আগেই সব শেষ হয়ে গেল। আব্দুল আজিজ মিয়াঁ চলে গেলেনচিরদিনের জন্য।

 

কাকুর কণ্ঠ ভারী হয়ে এল,

সেদিন পুরো গ্রাম যেন থমকে গেছিল। চারদিকে শুধু কান্না আর কান্না। কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না, যে মানুষটি কিছুক্ষণ আগেও আমাদের মাঝে ছিলেন, তিনি আর নেই। মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়াপড়শি সবাই যেন শোকে পাথর হয়ে গেছিল। মানুষের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছিল। পুরো পাড়া যেন থমথমে। অথচ এমন পরিস্থিতিতে যে কাজটি সবার আগে করার কথা, সেই কবর খোঁড়ার কথাটুকুও যেন কারও মনে ছিল না। আসলে শোক মানুষকে এমনই অসহায় করে দেয়চোখের সামনে প্রয়োজনীয় কাজ থাকলেও হাত-পা যেন অবশ হয়ে আসে  

 

কিছুক্ষণ নীরব থেকে কাকু আবার বললেন,

শেষ পর্যন্ত আমরা কয়েকজন তরুণ এগিয়ে এলাম। আমি, মোসলেম, আরও কয়েকজনকোদাল আর টুকরি হাতে আমরা চণ্ডিপুর গোরস্থানের দিকে রওনা দিলাম। জীবনে এর আগে আমরা কেউ কোনোদিন কবর খুঁড়িনি। কবর কীভাবে কাটতে হয়, কতটা গভীর করতে হয়, কীভাবে মাটি সরাতে হয়কিছুই জানতাম না।

 

কাকুর চোখের সামনে যেন সেই দৃশ্যটা আবার জীবন্ত হয়ে উঠল,

কখনো কবরের এক পাশ বেঁকে যাচ্ছিল, কখনো মাটি ধসে পড়ছিল। আবার কখনো কোদাল শক্ত মাটিতে আটকে যাচ্ছিল। হাতে ব্যথা হচ্ছিল, শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছিল। তবুও আমরা থামিনি। মনে হচ্ছিল, আজিজ মিয়াঁর মতো একজন ভালো মানুষের শেষ ঠিকানাটুকু আমাদেরই প্রস্তুত করতে হবে। যত কষ্টই হোক, কাজটা শেষ করতেই হবে। অনেকক্ষণ পর, অনেক ঘাম আর পরিশ্রমের শেষে আমরা কবরটি প্রস্তুত করলাম। সেই কবরেই শায়িত হলেন আব্দুল আজিজ মিয়াঁআমাদের প্রিয় আজিজ ভাই

 

মোজাহার কাকু একটু থামলেন। তারপর খুব আস্তে স্বরে বললেন,

সেই যে শুরু বাবাজী, তারপর আর থামিনি।

 

আমি নির্বাক হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম তিনি আবার জালটা হাতে তুলে নিলেন। জালের ফাঁকে ফাঁকে তাঁর আঙুল আবার চলতে লাগলোআর তা দেখে আমার মনে হলতিনি যেন শুধু জালই বুনছেন না, বুনে চলেছেন এক দীর্ঘ ইতিহাসও। কত মানুষের শেষ বিদায়ের সাক্ষী হয়েছেন তিনি, কত কবরের মাটি তাঁর হাতে নরম হয়েছে, কত অশ্রুসিক্ত পরিবার তাঁর দিকে তাকিয়ে শেষ আশ্রয় পেয়েছেতার কোনো হিসাব নেই।

 

কোনো পারিশ্রমিক নেই, কোনো দাবিদাবা নেই, প্রতিদানের কোনো প্রত্যাশাও নেই। শুধু আছে মনে এক টুকরো বিশ্বাসমানুষের শেষযাত্রায় পাশে দাঁড়ানোও এক ধরনের ইবাদত; আর মানুষের জন্য করা এই সামান্য শ্রমের উত্তম প্রতিদান একদিন না একদিন আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে তিনি ঠিকই পাবেন

 

সেদিন বিকেলে মোজাহার কাকুর কাছ থেকে শুনেছিলাম, একজন তরুণ আলেমের আকস্মিক মৃত্যু কীভাবে আরেকজন তরুণের জীবনে একটি নীরব অঙ্গীকারের জন্ম দিয়েছিল আজও যখন কোনো মানুষের মৃত্যুসংবাদ শুনি, মনে পড়ে মোজাহার কাকুর সেই কথাগুলো—“সেই যে শুরু, আজও চলছে”—তখন বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়। মনে হয়, মানুষের জীবন আসলে কত বিচিত্র! কেউ চলে যায়, আর তার চলে যাওয়া কখনো কখনো অন্য কারও জীবনে রেখে যায় এমন এক দায়িত্ব, যা মৃত্যুর বহু বছর পরেও বেঁচে থাকে।

 

আব্দুল আজিজ চাচার অকাল প্রয়াণে, তাঁর কবরটি খনন করতে গিয়ে মোজাহার কাকুর হাতে যে কোদাল উঠেছিল, সেই কোদাল যেন আজও থামেনি। এক মানুষের শেষ বিদায়ের মুহূর্ত থেকে শুরু হওয়া সেই মানবিকতার যাত্রা আজও নীরবে এগিয়ে চলেছেএকটি কবর থেকে আরেকটি কবরের দিকে, এক শোকাহত পরিবার থেকে আরেকটি শোকাহত পরিবারের পাশে, একটা দাফন শেষে আরেকটা দাফনের পথে।  

 

২৮ জুলাই ২০২৬

হেস্টিংস, কোলকাতা 

Monday, 7 September 2026

মাটির ঢিবির ওপারে - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



দিন ধরে বড়আব্বা খুব অসুস্থ। তাই সারাক্ষণ বাড়িতে মানুষের আনাগোনা লেগে আছেডাক্তার আসছেন, ওষুধপত্র চলছে, স্যালাইন ঝুলছে। আত্মীয়স্বজন একে একে খোঁজ নিতে আসছেন। কেউ ফল নিয়ে আসছেন, তো কেউ মিষ্টি নিয়ে; কেউ বড়আব্বার পাশে বসে খবর নিচ্ছেন, তো কেউ নীরবে দোয়া করে ফিরে যাচ্ছেন। বাড়ির বড়দের চোখেমুখে উৎকণ্ঠা, কথাবার্তায় চাপা গাম্ভীর্যসবকিছু মিলিয়ে ঘরের পরিবেশ ছিল অদ্ভুত এক ভারে ভরা।

 

আমি তখন খুবই ছোট। সম্ভবত তখনো আমার স্কুলিং শুরু হয়নি। সবকিছুই খুব আবছা আবছা মনে পড়ে যেহেতু আমরা ছোট ছিলাম, অত শত বুঝতাম না। আমাদের চোখে তখন না অসুস্থতার ভয় ছিল, না মৃত্যুর আশঙ্কাবরং আত্মীয়স্বজনদের আসা-যাওয়ার মধ্যে নতুন নতুন ফল আর মিষ্টি পাওয়াটাই ছিল যেন সবচেয়ে আনন্দের বিষয়। কে কী নিয়ে এল, কোন ফলটা বেশি মিষ্টি, কোন মিষ্টিটা আগে খাওয়া হবেআমাদের ছোট্ট পৃথিবীটা ঘুরপাক খেত এসব নিয়েশিশুমন বোধহয় এমনই; সে মৃত্যুর আগমনী সুর শুনতে পায় না, ভবিষ্যতের শূন্যতা দেখতে পায় না। সে কেবল বর্তমানের সামান্য আনন্দটুকুকেই দুহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে রাখে।

 

তিন-চার দিনের মাথায় একদিন সন্ধ্যাবেলা, মাগরিবের আজানের সময়, বড়আব্বা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আজানের সুমধুর ধ্বনি যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল, ঠিক সেই সময় আমাদের ঘরের ভেতর হঠাৎ কান্নার রোল উঠল। মুহূর্তের মধ্যে যেন সবকিছু বদলে গেল। যে বাড়িতে কিছুক্ষণ আগেও মানুষের আসা-যাওয়া, কথাবার্তা, ব্যস্ততা ছিল; সেখানে আচমকাই নেমে এলো শোকের এক গভীর অন্ধকার। চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে গেল। পাড়াপড়শিরা ছুটে এলেন। আত্মীয়স্বজনদের খবর দেওয়ার তোড়জোড় শুরু হলো। বাড়ির বড়রা একাট্টা হয়ে নানা বিষয়ে আলোচনা করতে লাগলেন। সিদ্ধান্ত হলোপরদিন যোহরের নামাজের পর বড়আব্বাকে দাফন করা হবে।

 

পরদিন সকাল থেকেই আমাদের বাড়িতে যেন মানুষের ঢল নেমে এল। উঠোন, বারান্দা, বৈঠকখানাযেদিকেই তাকাই, শুধু মানুষ আর মানুষ। কারও চোখে পানি, কারও মুখে শোকের ছাপ, কেউ নিচুস্বরে কথা বলছেন, কেউ কুরআন তিলাওয়াত করছেন। আর আমরা ছোটরা সেই বিশাল শোকের ভেতর দাঁড়িয়ে থেকেও যেন পুরো ঘটনাটামানে বুঝতে পারছিলাম না।

 

মেজোআম্মা আমাদেরকে বড় ঘরটায় আগলে রেখেছিলেন। বড়দের কড়া নির্দেশ ছিলছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কেউই গোরস্থানে যাবে না। আমাদের বলা হয়েছিল, বড়রা ফিরে আসা পর্যন্ত আমরা যেন ঘরেই থাকিসেদিন হয়তো প্রথমবারের মতো বুঝতে না পেরেও অনুভব করেছিলামকিছু একটা চিরতরে বদলে গেছে। কিন্তু মৃত্যু যে কীভাবে বড়আব্বাকে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, তা তখনও বুঝিনি।

 

মাঝে কয়েক সপ্তাহ অতিক্রান্ত হয়েছেএকদিন আব্বার সঙ্গে শাটিমারি হাটে গেলাম। ফেরার পথে আমরা কবরস্থানের মাঝ বরাবর রাস্তা দিয়ে আসছিলামহঠাৎ আব্বা থেমে গেলেন। কোনো কথা না বলে নিজের জুতো জোড়া খুললেন। তারপর আমার ছোট্ট জুতোজোড়াও খুলে দিলেন। আমি অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। তিনি আমার হাত ধরে কবরস্থানের ভেতরে এগিয়ে গেলেন। তারপর একটি মাটির ঢিবির সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বললেন

সালাম দাও।

আব্বা’র সাথে সাথে আমিও বললামআসসালামু আলাইকুম ইয়া আহ্‌লাল কুবুর... (হে কবরবাসী, তোমাদের উপর শান্তি ও করুণা বর্ষিত হোক…!)

তারপর আব্বা মাটির ঢিবিটার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত, অথচ কেমন যেন এক ভার গলায় বললেন,

—“এটা তোমার বড়আব্বার কবর। তিনি এখানেই শুয়ে আছেন।

 

আমি মাটির ঢিবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। বড়আব্বা, যিনি আমাকে আদর করতেন, কেউ আমাদের বকা দিলে তিনি পাল্টা তাকেই বকা দিতেন, আমাদের জন্য প্রায় দিন হাট থেকে জিলাপি-শিঙ্গাড়া নিয়ে আসতেন, এই সামান্য মাটির ঢিবির নিচে কীভাবে শুয়ে আছেনআমার শিশুমন কোনোভাবেই তার উত্তর খুঁজে পাচ্ছিল না।

 

আব্বা দুহাত তুলে মোনাজাত শুরু করলেন। বড় ভাইয়ের জন্য তাঁর কণ্ঠে ছিল গভীর আকুতি। কথাগুলো আমি বুঝতাম না, কিন্তু তাঁর কণ্ঠের আকুতি, কান্না ও কম্পন কিছুটা বুঝতে পারছিলাম। আমিও আমার ছোট্ট দুহাত তুলে তাঁর সাথে দুআতে শামিল হলাম আর মাঝে মাঝে বলতে থাকলাম—“আমীন... আমীন...

 

হঠাৎ আমার চোখে পড়লমোনাজাত করতে করতে আব্বার দুগাল বেয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সেই দৃশ্যটি আমার শৈশবের স্মৃতিতে আজও অমলিন। একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে কত গভীরভাবে ভালোবাসতে পারে, তার প্রথম পাঠ আমি সেদিন আমার আব্বার চোখের জল থেকে পেয়েছিলাম।

 

মোনাজাত শেষে আমরা বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটছি আর আমার শিশুমনের ভেতর যেন একের পর এক প্রশ্ন দরজা খুলে হুমড়ি কাটছেবড়আব্বা কি আমার সালাম শুনেছেন? তিনি কি আমাকে দেখতে পেয়েছেন? তিনি আমাকে আদর করলেন না কেন? হাট থেকে আর কোনোদিন কি তিনি আমার জন্য জিলাপি আনবেন না? 

 

আব্বা নীরবে হাঁটছিলেন। হয়তো তাঁর বুকের ভেতর তখনও ভাই হারানোর শোক তাজা। আর তাঁর পাশে আমি হেঁটে চলেছি, মনের ভেতরে একরাশ কিলবিল করা প্রশ্ন নিয়ে। থাকতে না পেরে এক পর্যায়ে আমি জিজ্ঞেস করেই বসলাম,

—“বড়আব্বা মাটির নিচে গেলেন কীভাবে?”

আব্বা একটু থেমে বললেন,

—“কবর খুঁড়ে তাঁকে সেখানে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে।

আমি আবার জানতে চাইলাম,

—“কবর কে খুঁড়ল?”

আব্বা বললেন,

—“তোমার মোজাহার কাকু, মসলেম কাকুআরও কয়েকজন মিলে।

 

আমি চুপ করে গেলাম। হয়তো উত্তরগুলো আমার কৌতূহল কিছুটা মিটিয়েছিল, কিন্তু মৃত্যুকে বুঝতে সাহায্য করেনি। বরং সেদিনের সেই কথাগুলো আমার মনে আরও গভীর এক রহস্যের জন্ম দিয়েছিলমানুষ কোথায় যায়? কেন যায়? আর যে মানুষকে এত ভালোবাসা হয়, সে কীভাবে একদিন শুধু একটি মাটির ঢিবি হয়ে থাকে?

 

আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, সেদিন আমি শুধু বড়আব্বার কবরের সামনে দাঁড়াইনি; অজান্তেই দাঁড়িয়েছিলাম জীবনের এক গভীরতম সত্যের সামনে। বড়আব্বার কবরের সেই মাটির ঢিবি আজ আর শুধু একটি কবর নয়আমার শৈশবের এক টুকরো আকাশ, আব্বার চোখের জলের প্রথম পাঠ, ভালোবাসার প্রথম গভীর উপলব্ধি, আর হারিয়ে ফেলার প্রথম অভিধান।

 

সময় চলে গেছে। মানুষ বদলেছে। শৈশব পেরিয়ে জীবন অনেক দূর এগিয়ে এসেছে। কত মানুষ এসেছে, কত মানুষ চলে গেছে। কিন্তু সেই মাগরিবের আজান, সেই কান্নার শব্দ, আব্বার কাঁপা কণ্ঠ, মাটির ঢিবির সামনে দাঁড়িয়ে বলা—“এটাই তোমার বড়আব্বার কবর”—আর মোনাজাতের ফাঁকে আব্বার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুবিন্দুগুলো আজও আমার স্মৃতির ভেতর অম্লান হয়ে আছে।

 

কখনো কখনো মনে হয়, বড়আব্বা সেদিন শুধু আমাদের ছেড়ে চলে যাননি; আমার শৈশবের একটুকরো সরলতাকেও সঙ্গে করে নিয়ে গেছিলেন। তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমি যে প্রশ্নগুলো করেছিলাম, সেগুলোর উত্তর হয়তো সেদিন পাইনি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছিকিছু প্রশ্নের উত্তর শব্দে দেওয়া যায় না। কিছু উত্তর মানুষকে সময়ের কাছে রেখে দিতে হয়। আর হয়তো সেই কারণেই আজও কোনো কবরের পাশ দিয়ে গেলে আমার পা ধীর হয়ে আসে। মনে পড়ে যায় সেই ছোট্ট শিশুটিকেযে একদিন বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে মাটির একটি ঢিবির দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, বড়আব্বা কি আমার সালাম শুনেছেন?”

 

২৮ জুলাই ২০২৬

হেস্টিংস, কোলকাতা