Pages

Monday, 7 September 2026

মাটির ঢিবির ওপারে - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



দিন ধরে বড়আব্বা খুব অসুস্থ। তাই সারাক্ষণ বাড়িতে মানুষের আনাগোনা লেগে আছেডাক্তার আসছেন, ওষুধপত্র চলছে, স্যালাইন ঝুলছে। আত্মীয়স্বজন একে একে খোঁজ নিতে আসছেন। কেউ ফল নিয়ে আসছেন, তো কেউ মিষ্টি নিয়ে; কেউ বড়আব্বার পাশে বসে খবর নিচ্ছেন, তো কেউ নীরবে দোয়া করে ফিরে যাচ্ছেন। বাড়ির বড়দের চোখেমুখে উৎকণ্ঠা, কথাবার্তায় চাপা গাম্ভীর্যসবকিছু মিলিয়ে ঘরের পরিবেশ ছিল অদ্ভুত এক ভারে ভরা।

 

আমি তখন খুবই ছোট। সম্ভবত তখনো আমার স্কুলিং শুরু হয়নি। সবকিছুই খুব আবছা আবছা মনে পড়ে যেহেতু আমরা ছোট ছিলাম, অত শত বুঝতাম না। আমাদের চোখে তখন না অসুস্থতার ভয় ছিল, না মৃত্যুর আশঙ্কাবরং আত্মীয়স্বজনদের আসা-যাওয়ার মধ্যে নতুন নতুন ফল আর মিষ্টি পাওয়াটাই ছিল যেন সবচেয়ে আনন্দের বিষয়। কে কী নিয়ে এল, কোন ফলটা বেশি মিষ্টি, কোন মিষ্টিটা আগে খাওয়া হবেআমাদের ছোট্ট পৃথিবীটা ঘুরপাক খেত এসব নিয়েশিশুমন বোধহয় এমনই; সে মৃত্যুর আগমনী সুর শুনতে পায় না, ভবিষ্যতের শূন্যতা দেখতে পায় না। সে কেবল বর্তমানের সামান্য আনন্দটুকুকেই দুহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে রাখে।

 

তিন-চার দিনের মাথায় একদিন সন্ধ্যাবেলা, মাগরিবের আজানের সময়, বড়আব্বা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আজানের সুমধুর ধ্বনি যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল, ঠিক সেই সময় আমাদের ঘরের ভেতর হঠাৎ কান্নার রোল উঠল। মুহূর্তের মধ্যে যেন সবকিছু বদলে গেল। যে বাড়িতে কিছুক্ষণ আগেও মানুষের আসা-যাওয়া, কথাবার্তা, ব্যস্ততা ছিল; সেখানে আচমকাই নেমে এলো শোকের এক গভীর অন্ধকার। চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে গেল। পাড়াপড়শিরা ছুটে এলেন। আত্মীয়স্বজনদের খবর দেওয়ার তোড়জোড় শুরু হলো। বাড়ির বড়রা একাট্টা হয়ে নানা বিষয়ে আলোচনা করতে লাগলেন। সিদ্ধান্ত হলোপরদিন যোহরের নামাজের পর বড়আব্বাকে দাফন করা হবে।

 

পরদিন সকাল থেকেই আমাদের বাড়িতে যেন মানুষের ঢল নেমে এল। উঠোন, বারান্দা, বৈঠকখানাযেদিকেই তাকাই, শুধু মানুষ আর মানুষ। কারও চোখে পানি, কারও মুখে শোকের ছাপ, কেউ নিচুস্বরে কথা বলছেন, কেউ কুরআন তিলাওয়াত করছেন। আর আমরা ছোটরা সেই বিশাল শোকের ভেতর দাঁড়িয়ে থেকেও যেন পুরো ঘটনাটামানে বুঝতে পারছিলাম না।

 

মেজোআম্মা আমাদেরকে বড় ঘরটায় আগলে রেখেছিলেন। বড়দের কড়া নির্দেশ ছিলছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কেউই গোরস্থানে যাবে না। আমাদের বলা হয়েছিল, বড়রা ফিরে আসা পর্যন্ত আমরা যেন ঘরেই থাকিসেদিন হয়তো প্রথমবারের মতো বুঝতে না পেরেও অনুভব করেছিলামকিছু একটা চিরতরে বদলে গেছে। কিন্তু মৃত্যু যে কীভাবে বড়আব্বাকে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, তা তখনও বুঝিনি।

 

মাঝে কয়েক সপ্তাহ অতিক্রান্ত হয়েছেএকদিন আব্বার সঙ্গে শাটিমারি হাটে গেলাম। ফেরার পথে আমরা কবরস্থানের মাঝ বরাবর রাস্তা দিয়ে আসছিলামহঠাৎ আব্বা থেমে গেলেন। কোনো কথা না বলে নিজের জুতো জোড়া খুললেন। তারপর আমার ছোট্ট জুতোজোড়াও খুলে দিলেন। আমি অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। তিনি আমার হাত ধরে কবরস্থানের ভেতরে এগিয়ে গেলেন। তারপর একটি মাটির ঢিবির সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বললেন

সালাম দাও।

আব্বা’র সাথে সাথে আমিও বললামআসসালামু আলাইকুম ইয়া আহ্‌লাল কুবুর... (হে কবরবাসী, তোমাদের উপর শান্তি ও করুণা বর্ষিত হোক…!)

তারপর আব্বা মাটির ঢিবিটার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত, অথচ কেমন যেন এক ভার গলায় বললেন,

—“এটা তোমার বড়আব্বার কবর। তিনি এখানেই শুয়ে আছেন।

 

আমি মাটির ঢিবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। বড়আব্বা, যিনি আমাকে আদর করতেন, কেউ আমাদের বকা দিলে তিনি পাল্টা তাকেই বকা দিতেন, আমাদের জন্য প্রায় দিন হাট থেকে জিলাপি-শিঙ্গাড়া নিয়ে আসতেন, এই সামান্য মাটির ঢিবির নিচে কীভাবে শুয়ে আছেনআমার শিশুমন কোনোভাবেই তার উত্তর খুঁজে পাচ্ছিল না।

 

আব্বা দুহাত তুলে মোনাজাত শুরু করলেন। বড় ভাইয়ের জন্য তাঁর কণ্ঠে ছিল গভীর আকুতি। কথাগুলো আমি বুঝতাম না, কিন্তু তাঁর কণ্ঠের আকুতি, কান্না ও কম্পন কিছুটা বুঝতে পারছিলাম। আমিও আমার ছোট্ট দুহাত তুলে তাঁর সাথে দুআতে শামিল হলাম আর মাঝে মাঝে বলতে থাকলাম—“আমীন... আমীন...

 

হঠাৎ আমার চোখে পড়লমোনাজাত করতে করতে আব্বার দুগাল বেয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সেই দৃশ্যটি আমার শৈশবের স্মৃতিতে আজও অমলিন। একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে কত গভীরভাবে ভালোবাসতে পারে, তার প্রথম পাঠ আমি সেদিন আমার আব্বার চোখের জল থেকে পেয়েছিলাম।

 

মোনাজাত শেষে আমরা বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটছি আর আমার শিশুমনের ভেতর যেন একের পর এক প্রশ্ন দরজা খুলে হুমড়ি কাটছেবড়আব্বা কি আমার সালাম শুনেছেন? তিনি কি আমাকে দেখতে পেয়েছেন? তিনি আমাকে আদর করলেন না কেন? হাট থেকে আর কোনোদিন কি তিনি আমার জন্য জিলাপি আনবেন না? 

 

আব্বা নীরবে হাঁটছিলেন। হয়তো তাঁর বুকের ভেতর তখনও ভাই হারানোর শোক তাজা। আর তাঁর পাশে আমি হেঁটে চলেছি, মনের ভেতরে একরাশ কিলবিল করা প্রশ্ন নিয়ে। থাকতে না পেরে এক পর্যায়ে আমি জিজ্ঞেস করেই বসলাম,

—“বড়আব্বা মাটির নিচে গেলেন কীভাবে?”

আব্বা একটু থেমে বললেন,

—“কবর খুঁড়ে তাঁকে সেখানে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে।

আমি আবার জানতে চাইলাম,

—“কবর কে খুঁড়ল?”

আব্বা বললেন,

—“তোমার মোজাহার কাকু, মসলেম কাকুআরও কয়েকজন মিলে।

 

আমি চুপ করে গেলাম। হয়তো উত্তরগুলো আমার কৌতূহল কিছুটা মিটিয়েছিল, কিন্তু মৃত্যুকে বুঝতে সাহায্য করেনি। বরং সেদিনের সেই কথাগুলো আমার মনে আরও গভীর এক রহস্যের জন্ম দিয়েছিলমানুষ কোথায় যায়? কেন যায়? আর যে মানুষকে এত ভালোবাসা হয়, সে কীভাবে একদিন শুধু একটি মাটির ঢিবি হয়ে থাকে?

 

আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, সেদিন আমি শুধু বড়আব্বার কবরের সামনে দাঁড়াইনি; অজান্তেই দাঁড়িয়েছিলাম জীবনের এক গভীরতম সত্যের সামনে। বড়আব্বার কবরের সেই মাটির ঢিবি আজ আর শুধু একটি কবর নয়আমার শৈশবের এক টুকরো আকাশ, আব্বার চোখের জলের প্রথম পাঠ, ভালোবাসার প্রথম গভীর উপলব্ধি, আর হারিয়ে ফেলার প্রথম অভিধান।

 

সময় চলে গেছে। মানুষ বদলেছে। শৈশব পেরিয়ে জীবন অনেক দূর এগিয়ে এসেছে। কত মানুষ এসেছে, কত মানুষ চলে গেছে। কিন্তু সেই মাগরিবের আজান, সেই কান্নার শব্দ, আব্বার কাঁপা কণ্ঠ, মাটির ঢিবির সামনে দাঁড়িয়ে বলা—“এটাই তোমার বড়আব্বার কবর”—আর মোনাজাতের ফাঁকে আব্বার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুবিন্দুগুলো আজও আমার স্মৃতির ভেতর অম্লান হয়ে আছে।

 

কখনো কখনো মনে হয়, বড়আব্বা সেদিন শুধু আমাদের ছেড়ে চলে যাননি; আমার শৈশবের একটুকরো সরলতাকেও সঙ্গে করে নিয়ে গেছিলেন। তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমি যে প্রশ্নগুলো করেছিলাম, সেগুলোর উত্তর হয়তো সেদিন পাইনি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছিকিছু প্রশ্নের উত্তর শব্দে দেওয়া যায় না। কিছু উত্তর মানুষকে সময়ের কাছে রেখে দিতে হয়। আর হয়তো সেই কারণেই আজও কোনো কবরের পাশ দিয়ে গেলে আমার পা ধীর হয়ে আসে। মনে পড়ে যায় সেই ছোট্ট শিশুটিকেযে একদিন বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে মাটির একটি ঢিবির দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, বড়আব্বা কি আমার সালাম শুনেছেন?”

 

২৮ জুলাই ২০২৬

হেস্টিংস, কোলকাতা

Tuesday, 1 September 2026

মহিষ হল সারথি - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


দিন ধরেই আকাশ ভেঙে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিলএকটানা বৃষ্টিতে নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা, খানাখন্দ সবই পানিতে থৈথৈ করছিলচারদিকে শুধু জল আর জল। কোথাও যেন এক চিলতে মাটির দেখা নেই। প্রকৃতির সে কী যে ভয়ংকর রূপ!  

 

১৯৮৭ সা, শুক্রবারের দিন, এশার নামাজ পড়ে যে যার বাড়িতে রাতের খাবার খেতে বসেছে। হঠাৎ একটা কলরব উঠলোতিস্তার বাঁধ ভেঙে গেছে, ঘরবাড়ি সব ভেসে যাচ্ছে! মুহূর্তের মধ্যে খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল সারা পাড়ায়কারও মুখে তখন আর অন্য কোনো কথা নেই। সবার চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপকিছুক্ষণের মধ্যেই প্রায় দেড়-দুফুট উঁচু উঁচু ঢেউ এসে মুহুর্মুহু আছড়ে পড়তে শুরু করল। মনে হচ্ছিল, আর একটু পরেই গোটা গ্রামটাকে জলে গিলে নেবে।

 

পরিস্থিতি বেসামাল দেখে সবাই মিলে মরিয়া হয়ে কটা নৌকা ও ভেলা জোগাড় করল। সিদ্ধান্ত হলোপ্রথমে মহিলা ও শিশুদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হবে। কোনোকিছুতে সময় নষ্ট না করে রাতের অন্ধকারেই শুরু হলো উদ্ধারকাজ। সারা রাত ধরে চলল সেই ভয়ংকর অভিযান। এক এক করে গ্রামের প্রায় সব মহিলা ও শিশুকে শাটিমারি ডাঙ্গিতে নিয়ে যাওয়া হলো। গ্রামে রয়ে গেলে কেবল যুবক, বৃদ্ধ আর গরু-মোষ-ছাগল-হাঁস-মুরগি  

 

অনেকের বাড়িতে চাল-ডাল, ধান-পাট, কাপড়চোপড়, টাকাপয়সা, সোনাদানা ও নানা মূল্যবান জিনিসপত্র ছিল সেসবও তো একেবারে ফেলে যাওয়া যায় না। তার পর বন্যার সুযোগে একদল অসামাজিক মানুষ চারদিকে লুটপাট ও ডাকাতি শুরু করে দিয়েছে বলে খবর চাউর হয়ে গেছিলতাই বাড়ির পুরুষমানুষরা জিনিসপত্র পাহারা দেওয়ার জন্য গাছের পর মাচা বানিয়ে সেখানেই থেকে গেল সবাই অপেক্ষা করছিলকখন ভোর হবে!

 

পরদিন ভোরে আলো ফুটতেই যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তা রাতের তুলনায় আরও ভয়াবহ। গ্রামে একটা মাটির বাড়িও অক্ষত নেই। সবকিছু পানির নিচে তলিয়ে গেছেযে ঘরগুলোতে গতকালও মানুষের সংসার ছিল; হাঁড়িপাতিল, বাসনকোসন, খাটপালং ছিল আজ সেসব নিশ্চিহ্ন প্রায়; যেন বন্যার জলে সব ভেসে গেছে। হঠাৎ একটা বিকট শব্দ হলো। কেউ একজন চিৎকার করে বলে উঠল গুলু বড়বাজির মাটির দোকোঠাটা ভাঙ্গি পলি!

 

চারদিকে বিভীষিকাময় দৃশ্য। হাঁস-মুরগিগুলো স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছে। ছোট ছোট বাছুর আর ছাগলগুলো হাবুডুবু খাচ্ছে। কোথাও মাটির নাগাল না পেয়ে একসময় তারাও স্রোতের তোড়ে ভেসে যাচ্ছে। চোখের সামনে গবাদিপশু ও ঘরবাড়ির এই পরিণতি দেখে মানুষ স্থির থাকে কী করে চারদিকে শুধু হাহাকার ও বুকফাটা কান্না। আর আকাশ? সেও যেন মানুষের সেই কান্নার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অবিরাম কেঁদেই চলেছে। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই।

 

বড়আব্বা আগের রাতেই শাটিমারি চলে গিয়েছিলেন। বাড়ির মহিলা ও ছোট ছোট বাচ্চারা তো সেখানে একা থাকতে পারে নাতাদের সঙ্গে একজন অভিভাবক থাকা দরকার। মজিদ দা বারি দাও তাঁদের সঙ্গে চলে গিয়েছিল। আর এদিকে বাড়িতে রয়ে গেছিলেন আব্বা, মেজোআব্বা, মেজদা, বাকি দা ও উম্মেত দা। তারা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলোআব্বা, মেজোআব্বা ও উম্মেত দা গাছের পর মাচা করে এখানেই থাকবেন। বাড়িতে চাল-ডাল, ধান-পাট, কাপড়চোপড়, টাকাপয়সা, সোনাদানা, জমিজায়গার দলীলপত্রঅনেক কিছুই তো আছে। সেগুলো পাহারা দেওয়ারও প্রয়োজন। বন্যার পানি যেমন বাড়ছিল, তেমনি বাড়ছিল উৎকণ্ঠা

 

সকালের দিকে মজিদ দা এবং আরও কয়েকজন শাটিমারি থেকে গ্রামে ফিরলেনসাথে করে সেখানকার খবরাখবর নিয়ে এলেন। বড়দা জানালেনআশপাশের আদিবাসী মানুষজন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। কেউ খাবার নিয়ে সছে, কেউ জামাকাপড়, কেউ মাদুর ইত্যাদি কিছু যুবক হাটের ছাউনিগুলো উপড়ে নিয়ে এসে অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছে জোলা মেম্বার আম্মা, বড় আম্মা, মেজো আম্মা এবং বাড়ির ছোট ছোট বাচ্চাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাওয়া-থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

 

এদিকে বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। বরং পানির স্তর ক্রমেই বেড়ে চলেছেমনে হচ্ছিল, জল যেন প্রতিমুহূর্তে আরও ফুলে-ফেঁপে উঠছে। মেজোআব্বা পরিস্থিতি দেখে বললেন, আর বেশি দেরি করা ঠিক হবে না। তোমরা গরু-মোষগুলো শাটিমারি নিয়ে যাও।

 

কথা মতো মজিদ দা, বাকি দা ও ফিজুর দা গরু-মোষগুলো নিয়ে শাটিমারির উদ্দেশে রওনা হলেন। বিন্যাকুড়ির কাছে গিয়ে তাঁরা দেখলেনপুরো মাঠ এমনকি সড়কটাও পানির নিচে। যে সড়ক দিয়ে মানুষজন প্রতিদিন চলাফেরা কর, তার কোনো চিহ্নই নেই। তবু থেমে থাকার উপায় নেই। তিন ভাই আন্দাজে এগিয়ে চললেন সবার সামনে মজিদ দা। তাঁর পেছনে হালের গরুগুলোতারপর বাকি দা। তাঁর পেছনে গাভী ও ছাগলগুলো। এরপর ফিজুর দা। আর সবশেষে আমাদের মোষ দুটো টা মজবুত দড়ি দিয়ে গরু, গাভী ও ছাগলগুলোকে একসঙ্গে বাঁধা হয়েছিল। দড়ির এক প্রান্ত মজিদ দা ধরে, মাঝখানে বাকি দা, আর পেছনের দিকে ফিজুর দা। শুধু মোষ দুটোকে বাঁধা যায়নি। দড়িটা ছোট পড়ে গিয়েছিল।

 

মোলানিয়ার কাছে এসে পানির স্রোত আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল। পানির স্তর তখন প্রায় গলা পর্যন্ত উঠে গেছে। তিন ভাই অত্যন্ত সাবধানে, ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছেন। সামনে গিয়ে দেখা গেল, রাস্তার একটা অংশ ভেঙে গিয়ে সেখানে যেন ছোট্ট একটা নদী তৈরি হয়ে গেছে। প্রবল বেগে স্রোত ছুটছে পা ফেলতেও ভয় হচ্ছে তবু এগোতে হবে। মজিদ দা ও বাকি দা কোনোমতে সেই ভাঙা জায়গাটা পার হয়ে গেলেন। গরু-গাভীগুলোও প্রাণপণে হাত-পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে স্রোত পেরিয়ে গেল। ফিজুর দা পা বাড়িয়েছে সবে। ঠিক তখনই একটা তীব্র জলোচ্ছ্বাস এসে আছড়ে পড়ল। ফিজুর দা টাল সামলাতে না পেরে মুহূর্তের মধ্যে পানিতে পড়ে গেল আর সেই ভয়ংকর স্রোত তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো

 

তা দেখে ছিঁড়ার ওপারে বাকি দুই ভাই যেন পাথর; কী করবেন, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাঁরা শুধু দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। অন্যদিকে ফিজুর দা অথই জলে হাত-পা ছুঁড়ছেপ্রাণপণে বাঁচার চেষ্টা করছেকিন্তু প্রবল স্রোতের সঙ্গে যেন কোনোভাবেই পেরে উঠছে না।

 

তখন মোষ দুটো ঠাই দাঁড়িয়ে হয়তো তারাও বুঝতে পেরেছিলসামনের স্রোত ভয়ংকর। কীভাবে এই জলোচ্ছ্বাস পার হবে, যেন সেই চিন্তাতেই দাঁড়িয়ে ছিল হঠাৎ তাদের খেয়াল হলোগুসিয়া সামনে নেই! এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল, গুসিয়া স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছে। আর এক মুহূর্তও দেরি করল না নিজের জীবনের কথা না ভেবে একটা মোষ স্রোতে গা ভাসিয়ে দিল তাকে দেখে দ্বিতীয় মোষটিও যেন আর স্থির থাকতে পারল না। সেও নিজেকে স্রোতের মধ্যে ছেড়ে দিল।

 

মেজদা তখন প্রাণপণে হাত-পা ছুঁড়ছে। কিন্তু পেরে উঠছে না। এ যেন প্রকৃতির সাথে মানুষের অসম লড়াই। ওদিকে প্রবল জলোচ্ছ্বাসের বুক চিরে মুহূর্তের মধ্যেই মোষ দুটো মেজদার কাছে পৌঁছে গেল। তারপর ওরা দুজনেই মেজদার দিকে মাথা বাড়িয়ে দিল। মেজদাও যেন শেষ আশ্রয়টুকু খুঁজে পেলেন। সর্বশক্তি দিয়ে একটা মোষের শিং দুটো আঁকড়ে ধরলেন। তারপর শুরু হলো এক অভাবনীয় লড়াই। একদিকে উন্মত্ত স্রোত তাঁদের টেনে নিয়ে যেতে চাইছে, অন্যদিকে মেজদা আর মোষ দুটো প্রাণপণে সেই স্রোতের বিরুদ্ধে লড়ছে। অবশেষে তারা স্রোতের বুক চিরে ডাঙ্গির দিকে এগোতে শুরু করল। একটু একটু করে। ধীরে ধীরে। মৃত্যুকে পেছনে ফেলে।

 

কিছুক্ষণ পর তারা তিনজনই ডাঙ্গায় এসে পৌঁছাল ডাঙ্গিতে পা রাখার পর তিনজনেই হাঁপাচ্ছিলবুকের ভেতর তখনও দমকা বাতাসের মতো শ্বাস ওঠানামা করছে। যেন কেউ কিছু বলার অবস্থায় নেই। একে একে বাকি দা, মজিদ দা সবাই সেই জায়গায় জড়ো হলো। আর তখন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটলমোষ দুটো মেজদার গা ঘেঁসে তাঁর ঘাড়ের পর মাথা রেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো, তারা যেন কিছু বলতে চাইছে। হয়তো বলতে চাইছেতুমি রোজ আমাদের দেখাশোনা করো, আদর-যত্ন করো, সময় মতো জলখাবার দাও। চান করাও। আমরাও তোমাকে ভালোবাসি। তাই তোমাকে এই অবস্থায় একা ছাড়িনি।

 

তারপর সবাই মিলে ধীরে ধীরে শাটিমারি হাটের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানেই গবাদিপশুগুলোর থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পেছনে পড়ে রইল আমাদের ডুবে যাওয়া গ্রামটালোকজনের ভাঙা ঘরবাড়ি, ভেসে যাওয়া সংসার, শিশুদের কান্না, মায়েদের হাহাকার আর অগণিত বিষাদময় স্মৃতি।

 

বহু বছর কেটে গেছে। সময় অনেক কিছু মুছে দিয়েছে। কত মুখ হারিয়ে গেছে স্মৃতির আড়ালে, কত ঘরবাড়ির সময়ের বুকে বিলীন হয়ে গেছে কিন্তু ১৯৮৭-এর সেই বন্যার রাত, সেই জলোচ্ছ্বাস, সেই হাহাকার আর মেজদাকে শিংয়ে জড়িয়ে নিয়ে স্রোতের বিরুদ্ধে লড়তে থাকা সেই দুই মোষের ছবি আজও পাড়াপড়শির স্মৃতিতে জীবন্ত হয়ে আছে মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা। তবে সেদিনের সেই ভয়ংকর বন্যা ও প্রকৃতির সেই তাণ্ডবলীলা প্রেম ও ভালোবাসার কিছু অনন্য গল্প সৃজন করেছিল, যেগুলো আজও আমাদের মনে আলো জ্বেলে রেখেছেলোকজনের গ্রামীণ কলহ-বিবাদ ভুলে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো, অন্যকে বাঁচানোর জন্য নিজের সসবটুকু উজাড় করে দেওয়া, আর বিশেষ ভাবে নিজ গুসিয়ার প্রতি সেই মোষ দুটোর অব্যক্ত ভালোবাসা।

 

হেস্টিংস, কোলকাতা

৯ আগস্ট ২০২৬