Sunday, 15 March 2026

ইউসুফ মিয়াঁ - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



আমাদের গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে তুলাইয়ের পাড় ঘেঁষে একটা ছোট্ট গ্রাম নাম কদমডাঙ্গা। গুটি কয়েক বাড়ির বসত সেখানে একসময় সেই ছোট্ট গ্রামটিই ছিল এলাকার বহু মানুষের ভরসার জায়গা। সেই গ্রামেই থাকতেন তিন ভাইজাকারিয়া মিয়াঁ, এহ্‌ইয়া মিয়াঁ ইউসুফ মিয়াঁ। লোকে অবশ্য তাঁদেরকে আসল নামের চেয়ে বেশি চিনত ও ডাকতো বড় মিয়াঁ, মেজো মিয়াঁ এবং ছোট মিয়াঁ নামে।
 
তাঁরা তিন ভাই ছিলেন জমিদার গোছের মানুষপুকুরপাড়া থেকে শুরু করে চৌষা অবধি বিস্তৃত ছিল তাঁদের জমিজায়গা। আশ্বিন-কার্তিক মাসে যখন মাঠ ভরে উঠতো সোনালি ধানে, আর ধানের ঘ্রাণে মেতে উঠতো আশপাশের গ্রামগুলো, তখন তা দেখে এলাকার গরীবদুঃখীদের মলিন মুখগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠতো কিন্তু এত শয়সম্পত্তি, জমিজমা অর্থসম্পদ সত্ত্বেও তাঁরা কখনো অহংকারী হয়ে ওঠেননিবিশেষ করেইউসুফ মিয়াঁতিনি ছিলেন একেবারেই আলাদা প্রকৃতির মানুষ, খাঁটি অর্থেই মাটির মানুষ
 
সকলের খুব কাছের মানুষও ছিলেন তিনিসকালে কিংবা বিকেলে তাঁকে দেখা যেত গ্রামের পথ ধরে হেঁটে চলেছেন, হাঁটতে হাঁটতে থামছেন কারও সাথে কথা বলতে, কারও খোঁজ নিতে, আবার হাঁটছেনকারো মুখে অভাবের কথা শুনলে তিনি শুধু আল্লাহ ভরসাবলে পাশ কাটিয়ে যেতেন না। অনেক সময় কাউকে না জানিয়ে বস্তায় করে লোক মারফত চাল-ডাল পাঠিয়ে দিতেন সোজা তার বাড়িতে। কোনো দরিদ্র মানুষ যেন লজ্জা না পায়, সে দিকটা তিনি সব সময় খেয়াল রাখতেন।
 
গ্রামে কেউ যদি কোনো ছোটোখাটো ব্যবসাবাণিজ্য করতে চাইতো, তিনি নিজেই জায়গা দেখিয়ে দিতেনরাস্তার ধারে একটু খালি জমি। তারপর পুঁজির জন্য কখনো ধার স্বরূপ, তো কখনো এককালীন কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলতেন, “কাজ শুরু করো, আল্লাহ বরকত দেবে
 
শিক্ষার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ আর দায়িত্ববোধ ছিল অন্য রকম। তিনি বিশ্বাস করতেনজমিজমা একদিন শেষ হয়ে যেতে পারে, অনেকের ক্ষেত্রে তা হতেও দেখা যায়, কিন্তু শিক্ষা কখনো নিঃস্ব করে না। তাই প্রথমে নিজের ঘর দিয়ে শুরু করলেন, মেজো ভাইয়ের ছেলে মানিক মিয়াঁ পড়াশোনায় খুব একটা আগ্রহী ছিল না, আর পাঁচটা ছেলের মতোইগ্রামে থেকেই কোনো রকমে দিন কাটাতে চাইতকিন্তু তিনি তা মানতে রাজি হননি। প্রায় জোর করেই তাকে বাড়ির বাইরে ভালো জায়গায় পড়তে পাঠান। খরচাপাতি, থাকা-খাওয়াসবই নিজের কাঁধে তুলে নেন। অনেক সময় মানিক দা অনিচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলতেন, “আজ কষ্ট করবি, কাল বুঝবি এর দাম কত।
 
শুধু ভাইপোই নয়, নিজের শ্যালকদের পড়াশোনার ব্যাপারেও তিনি ছিলেন সমান দায়িত্বশীল। তাদের বইপত্র, পড়ার খরচ, প্রয়োজনীয় সহযোগিতাকিছুই বাদ রাখতেন না। যেন তারা শিক্ষার পথে পিছিয়ে না পড়ে, সেটাই ছিল তাঁর একমাত্র চিন্তা।
 
গ্রামের এক মেধাবী ছেলে নজরুল ছিল তাঁর বিশেষ নজরে। ছেলেটার দু’চোখে ছিল স্বপ্ন, কিন্তু পরিবারে ছিল অভাব। তাই তার সব দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেনপড়াশোনা থেকে শুরু করে যাবতীয় খরচ। নজরুলকে তিনি শুধু সাহায্যই করেননি, সাহসও জুগিয়েছিলেননিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে শিখিয়েছিলেন।
 
সময় গড়িয়ে যায়, তুলাইয়ের জলের মতো করেযাদেরকে হাত ধরে তিনি পড়াশোনার পথে এগিয়ে দিয়েছিলেন, তারা একে একে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। কেউ শিক্ষক হয়, কেউ সরকারি আধিকারিক, কেউবা শিক্ষাকর্মী হিসেবে সমাজের সেবায় নিজেকে যুক্ত করে। তাদের প্রত্যেকের জীবনের ভেতরে কোথাও না কোথাও লেখা আছে ইউসুফ বড় আব্বার নিঃস্বার্থ অবদান।
 
তবে জীবন তো আর থেমে থাকে নাএক গভীর রাতে, হঠাৎ করেই স্ট্রোক করে ইউসুফ বড় আব্বা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লে, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াইখবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো এলাকা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। মানুষ বিশ্বাসই করতে পারছিল নাযিনি বিপদআপদে মানুষের পাশে দাঁড়া, তিনি হঠাৎ এভাবে চলে যাবেন! বড়আব্বা জানতেন এক নতুন অতিথি আসছে, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে মনে মনে স্বপ্নও বুনেছিলেন হয়তোকিন্তু সেই সন্তানের মুখ তাঁর আর দেখা হলো না বাবা-ছেলের আর কোনোদিন দেখা হয়নি। মুখ ফুটে ‘আব্বা’ ডাকার সাধ অধরাই রয়ে গেল মোমিন দার আজীবন
 
রেরদিন গ্রামের আকাশ ভারী হয়ে উঠল শোকের মেঘে। যাঁর ঘরে অভাবী মানুষ আশ্রয় পেত, যাঁর হাতে বহু জীবন নতুন করে গড়া শুরু হয়েছিলতাঁকে শেষ বিদায় জানাতে এসেছিল অগণিত মানুষ। ছোট্ট সেই গ্রামের রাস্তাঘাট সেদিন ভরে গেছিল নীরব কান্না আর গভীর কৃতজ্ঞতায়। সেদিন গ্রামের মানুষ শুধু একজন ‘বড়লোক’ হারায়নি, হারিয়েছিল একজন অভিভাবক, একজন শুভাকাঙ্ক্ষী, একজন শিক্ষানুরাগী মানুষকে
 
ইউসুফ বড় আব্বা চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর দয়া, তাঁর মানবিকতা আর নিঃশব্দ ভালোবাসা আজও বেঁচে আছে মানুষের মুখে মুখেগল্প হয়ে, স্মৃতি হয়ে। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর ছায়া আজও রয়ে গেছেপ্রতিষ্ঠিত সেই মানুষগুলোর জীবনে, তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি খাদেমুল দার কর্মযজ্ঞে, গ্রামের মানুষের কৃতজ্ঞ স্মৃতিতে, আর এই গল্পের প্রতিটি লাইন, প্রতিটা পরত ও প্রতিটা হরফে  
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
২৮/০১/২০২৬

Friday, 13 March 2026

এক বৃষ্টিস্নাত রাতে - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 


আমাদের পুরনো বাড়িটা বেশ বড়ই ছিল। তবে তিন-তিনটে পরিবার থাকার উপযোগী নয়। তাই বাড়ি ভাগ হলো। উত্তর দিকের ঘরদোর ও আঙিনা বড় আব্বা নিলেন, আর দক্ষিণ দিকের বাকি অংশটা মেজো আব্বা নিলেন। আমরা চলে এলাম পূর্বদিকেযেটা মূলত বৈঠকখানা ও গোয়ালঘর ছিল। সেখানে ছিল তিনটে খড়ের ছাউনি-ওয়ালা মাটির ঘর। সামনের দিকে খানিকটা ফাঁকা জায়াগ। আর পেছনের দিকে লম্বা করে অনেকটা জায়গা। সামনের দিকটায় ইটের প্রাচীর তুলে তাতে একটা চালা টাঙিয়ে আমরা থাকতে আরম্ভ করলাম। একটা ঘরে আমি আর মা থাকতাম। বাবা থাকতেন বারান্দায়। আর দুই দাদা থাকতো অন্য ঘরটায়। আরেকটা ঘর ছিল একটু পেছনের দিকেসেটায় থাকতো আমাদের হালের গরু, গাভী ও ছাগলগুলো। আর ওই ঘরের পেছনের চালায় মা রান্নাবান্না করতেন। এবং ফাঁকা জায়গায় নানা রকমের শাকসবজি চাষ করা হতো। দুই দাদা মিলে মায়ের ফরমায়েশ মোতাবেক বাঁশ ও কঞ্চি দিয়ে একটা চাঙ্গিও তৈরি করে দিয়েছিল। তাতে মা লাউ, কুমড়ো, শিম, পুই শাক কতকিছু যে চাষ করতেন

 

প্রতিদিন সন্ধ্যায় মাগরিবের পর আমাদের সামনের চালায় আড্ডা বসত। বাবা-মা আমাকে গল্প শোনাতেন। দুই দাদা নিজের কাজকর্ম ও পড়াশোনার ফাঁকে আমাকে পড়াতেন।  মাঝেসাঝে পাড়াপড়শিরা আসতো আব্বার কাছে পরামর্শ নিতে আর বিকেল বেলা পার্শ্ববর্তী বাড়িগুলোর কাকিমা ও ভাবিরা এসে মায়ের সঙ্গে গল্প করতোও বাড়িতে ওভাবেই বেশ ক বছর থেকেছি আমরা।

 

সামনের চালাটায় ছিল টিনের ছাউনি, আর বাকি ঘর ও চালাগুলো ছিল খড়ের। খড়ের ছাউনিতে গরমের দিনে ভীষণ আরামঘরদোর বেশ ঠাণ্ডা থাকে। যারা কখনও থেকেছে জানে। তবে বর্ষাকালে বেশ ভোগায়। তার ওপর বছর বছর খড় পালটানোর ঝামেলা, বাড়তি খরচ। তাছাড়া একটু হাওয়া দিলেই চালা নড়বড়ে করে। দেয়াল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। ভারি বর্ষা হলে চালার মাঝখান দিয়েও টিপটিপ করে জল পড়ে।

 

আমি তখন খুব ছোট, তবুও স্পষ্ট মনে আছে। মাঝরাতে মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছেআকাশ মুহুর্মুহু হাঁক ছাড়ছে। সেই সাথে বিদ্যুতের ঝলকানি, চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। বাবা আমাকে ডাকলে

বাবু, ওঠ্‌। বিছানাটা গুটিয়ে নে। দেখ, খানে জল পড়ছে। যা, বদনাটা নিয়ে আয়ওই জায়গায় পেতে দে। বাবু, পূ কোণে দেখওখানে চালটা ফুটো হয়ে গেছে মনে হয়। টিপটিপ করে জল পড়ছে, সেখানে একটা বালতি পেতে দে। যা তো, তোর বড়দাকে ছাগলগুলো অন্য জায়গায় বাঁধতে বল। ছাগলগুলো সেই তখন থেকে ভেবাচ্ছেভিজে গেছে মনে হয়।

 

আমি ধড়ফড় করে উঠে চোখ রগড়াতে রগড়াতে দেখিমা বিছানাপত্র সব গুটোচ্ছেন; বাবা টর্চ মেরে মেরে দেখছেন, কোথায় কোথায় জল পড়ছে; দুই দাদা গোয়ালঘরে গরু-ছাগল নিয়ে ব্যস্ত। আর আমি ঘুম-চোখে বাবার নির্দেশ মতো কোথাও বালতি, কোথাও বদনা, কোথাও মগ, কোথাও থালা, কোথাও হাঁড়ি পেতে বৃষ্টি আর দুর্যোগের মোকাবেলা করছি  

 

ওই বাড়িতে এভাবেবহু রাত এবং বেশ কটা বর্ষা কেটেছে আমাদের। বাড়িটাও এই কবছরে বহুবার তার রূপ ও খোলস পালটেছে। খড়ের চালার জায়গায় টিনের ছাউনি হয়েছে। মাটির দেয়াল ভেঙে ইটের হয়েছে। কিছু অংশে মাথার ওপরে কংক্রিটের ছাদও উঠেছে। এক তলা থেকে দোতলা হয়েছে। তুলাই নদী দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। বিশে বিষহয়ে গেছে সময়। করোনার কবলে পড়ে থমকে গেছে জীবন। লকডাউন ও নানা অসুবিধার কারণে আমি এখন গ্রামের বাড়িতেই আটকেদিনের বেলা অনলাইন ক্লাসের পাশাপাশি কলেজের নানা কাজ করছি। আর রাতগুলো মেতে উঠছে ইউরোর ফুটবলে 

 

গতকাল খেলাটা সবে শেষ হয়েছে, এমন সময় এক বন্ধু ফোন করল। তার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলার পর একটা আর্টিকেল পড়তে আরম্ভ করলাম। অপূর্ব লেখাএত ভালো যে একবার শুরু করলে শেষ না করে থাকা যায় না। কখন যে রাত দুটো বেজে গেছে টেরই পাইনি। হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানি চোখে পড়ল। বাইরে ঝমঝম করে বর্ষা নেমেছে। চারিদিক নিঝুম।

 

ল্যাপটপটা বন্ধ করে বারান্দায় এলাম। কার্নিশের পাশে দাঁড়াতেই জলের ঝাপটা গায়ে এসে পড়ল। এক পা, দুপা করে মায়ের ঘরের দিকে গেলাম। আস্তে করে দরজা খুলে দেখিমা আর ছোট ভাইঝি গভীর ঘুমে। দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে এধার-ওধার পায়চারী করে দেখলাম, বড়দা-মেজদা কেউ জেগে নেই। সবাই নিদ্রামগ্ন।

 

ফিরে এলাম আমার ঘরের বারান্দায়। চারিদিকে শুধু ঝমঝম-ঝম বৃষ্টির আওয়াজ। বারান্দার ডান পাশে কার্নিশটার নিচে দাঁড়াতেই দেখিকার্নিশ বেয়ে টপটপ-টপটপ করে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে। বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের মধ্যেও জলের ওই টপটপ শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। আর সেই সঙ্গে অবচেতন মনে শুনতে পাচ্ছি কোথা থেকে যেন একটা দরাজ কণ্ঠ ভেসে আসছে, খুব পরিচিত সেই কণ্ঠ—“বাবু ওঠ্‌, ওইখানে জল পড়ছেবালতিটা পেতে দেওখানে মগটাওই জায়গায় একটা থালা দিয়ে দে…”

 

অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সম্বিৎ ফিরে পেলাম। বর্ষার মতো করে চোখ দিয়ে জল ঝরতে লাগল। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। চোখ দুটো বন্ধ করে অস্ফুটে উচ্চারণ করতে লাগলাম

বাবা, তুমি কি পারো না, একবারঅন্তত একবার এসে দেখে যেতে, আমাদের নতুন বাড়িটা কেমন হয়েছে; ঘরগুলো বেশ বড়সড়, বারান্দাটাও বেশ চওড়া, জানালা-দরজাও মানানসই, ঠিক যেরকম একটা দালানবাড়ির তোমার শখ ছিল, সেসব দেখে যেতে; তোমার ইজি-চেয়ারটা বারান্দার কোন পাশে রাখবো তা দেখিয়ে দিতে, পারো না বাবা, একবারশুধু একবার…!”

 

বাঁশকুড়ি, দঃ দিনাজপুর
২০/০৬/২০২১

Wednesday, 11 March 2026

এক অন্য রকম সংবর্ধনা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

  

২০০৭ সাল। আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। সে বছর আমি বাসুরিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা থেকে আলিম পরীক্ষা দিই। আলিম পরীক্ষাপশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষৎ কর্তৃক আয়োজিত, মাধ্যমিকের সমতুল্য এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাতবে আমার কাছে তা শুধু একটি পরীক্ষাই ছিল না, ছিল স্বপ্ন, ছিল প্রত্যাশা, ছিল নিজের ভেতরের সাধনার এক নীরব প্রকাশ।
 
পরীক্ষার সেন্টার পড়েছিল আবেশকুড়ি হাই মাদ্রাসায়। বাড়ি থেকে বেশ দূরে। ফলে গিয়ে উঠলাম জলকুড়িয়ায় সুরো দি’র বাড়িতে। পরীক্ষার দিনগুলো আজও চোখে ভাসে। সকাল সকাল গোসল করে, চারটা ডালভাত খেয়ে সাইকেল নিয়ে যথাসময়ে পৌঁছে যেতাম সেন্টারে। পরীক্ষা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকেই ইনভিজিলেটর স্যার ও ম্যাডামেরা মাঝে মাঝে এসে আমার খাতা উল্টেপাল্টে দেখতেন, মৃদু হেসে বলতেন—“বেশ সুন্দর হাতের লেখা, বিশেষ করে আরবি।কথাগুলো শুনে বুকের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসত। আমাদের স্কুলের স্যারেরা আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন, যেন পরীক্ষার হলে আমার কোনো রকম ডিস্টার্ব না হয়। সেই যত্ন, সেই আস্থাআজও মনে পড়লে বুকটা ভরে যায়।
 
পরীক্ষা শেষে ফিরে এলাম বেলপুকুর মাদ্রাসায়। দিন কাটছিল খুব সাধারণভাবেদিনে একটু আধটু পড়াশোনা, বিকেলে মাসুদের সঙ্গে গল্প, কখনো বা খেলাধুলা। এরই মাঝে একদিন বিকেলে বনিপাড়ার মোতালেব স্যার আমাকে ডেকে বললেন— “মাতিন, তুমি একটা কাজ করবে? সন্ধ্যেবেলা আমাদের বাড়িতে এসে তোমার কাকিমা আর বাকিদের আরবি উচ্চারণটা একটু শুদ্ধ করে শিখিয়ে দেবে। যাতে ওরা ঠিকভাবে কুরআন পড়তে পারে।
 
স্যার আমাকে খুব স্নেহ করতেনফলে তাঁর  সেই কথা অমান্য করে তাঁকে অসম্মান করার মতো আহাম্মকি করি কী করেতাই মাগরিবের নামাজের পর স্যারের বাড়ি যেতে আরম্ভ করলামএভাবেই দিন গড়াতে লাগলনিঃশব্দে, নীরবে
 
তারপর এলো রেজাল্টের দিন। মোতালেব স্যার মালদা গেলেন বেলপুকুর হাই মাদ্রাসার রেজাল্ট আনতে। সেখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয় আমাদের হেড স্যারেরঅর্থাৎ সুপারিন্টেন্ডেন্ট গণি স্যারেরসেখান থেকেই প্রথম খবরটা আসে। মোতালেব স্যার ফোন করে বললেন, “মাতিন, তুমি র‍্যাংক করেছো।কত নম্বর, কত র‍্যাংকতা তখনও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।
 
কিছুক্ষণ পরেই স্কুলের স্যারেরা জানালেনআমি রাজ্যে দ্বিতীয় হয়েছি। আনন্দে বুক ভরে গেল। কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেই ফারুকী স্যারের কণ্ঠে প্রবল ক্ষোভ— “এই পেপারটায় তো তুমি আরও ভালো করেছিলে! এখানে এত কম নম্বর কেন?”
 
স্যারের সেই কথার ভেতর ছিল ছাত্রের প্রতি গভীর দরদ পরবর্তীতে তাঁরাই উদ্যোগ নিয়ে রিভিউয়ের আবেদন করলেন। যথাসময়ে ফল বেরোলদেখা গেল, আমার সেই পেপারে দশ নম্বর বেড়েছেমুহূর্তেই বদলে গেল ইতিহাস। আমি রাজ্যে প্রথম হয়ে গেলাম।
 
এরপর যেন একের পর এক ঘটনা। কোলকাতায় গিয়ে বিভিন্ন সংস্থা থেকে পুরস্কার, সংবর্ধনা, মানপত্র গ্রহণ। খবর বেরোল পত্রপত্রিকায়। এলাকায় জানাজানি হয়ে গেল। চারপাশ থেকে স্নেহ, ভালোবাসা, দোয়াসবকিছু একসঙ্গে এসে আমাকে ঘিরে ধরল। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেও এমন এক ঘটনা ঘটেছিল, যা আজও আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
একদিন হোস্টেল থেকে বাড়ি ফিরছি। মহিপালে বাস থেকে নামলাম। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর একটা রিকশা পেলাম। কথা হতে লাগল রিকশাওয়ালা কাকুর সঙ্গে। তাঁর বাড়ি আমাদের পাশের গ্রাম চাঁদপুরে। তাঁর কথাবার্তায় বুঝতে পারলাম, তিনি আমাদের পরিবারকে অল্পস্বল্প চেনেন ও জানেন। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করছিলেনআমি এখন কোথায় পড়ছি, কী পড়ছি। আমিও সহজভাবেই সব বলছিলাম।
 
আধ ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের গ্রামের মোড়ে পৌঁছে গেলাম। তখন মহিপাল থেকে বাঁশকুড়ি পর্যন্ত রিকশা ভাড়া ছিল সম্ভবত কুড়ি টাকাসে সময়ের হিসেবে যা মোটেই কম নয়। আমি যখন ভাড়া দিতে এগিয়ে গেলাম, তিনি হাত বাড়ালেন না।  মৃদু হেসে বললেন— “বাপু, তোরা হামার এলাকার নাম উজ্জ্বল কইছেন। তোমার ঠি হাঁরা ভাড়া নিমো না। ভগবান তোমাক আরও বড় মানুষ করৌক!”  
 
আমি থমকে দাঁড়িয়ে রইলাম। এতটা নিঃস্বার্থ ভালোবাসা! কীভাবে তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানাবোসেই মুহূর্তে মাথায় কিছুই আসছিল না। এতটাই অবাক হয়ে গেছিলাম যে, কাকুকে তাঁর নামটাও জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছিলাম  
 
আজ এতো বছর পর আমার আফসোস হয়। যদি রিকশাওয়ালা কাকুর নামটা জানা থাকত, ওই গ্রামে আমার যে বন্ধুবান্ধব আছে, তাদের মাধ্যমে হয়তো তাঁর খোঁজখবর নিতে পারতাম। কিন্তু নাতা আর হয়ে ওঠেনি।
 
মাঝে মাঝেই কেন জানি মনে হয়, জীবনে কিছু মানুষ সত্যিই ফেরেশতার মতো আসে। কোনো পরিচয় ছাড়াই, কোনো প্রত্যাশা ছাড়াইনিজের ভালোবাসাটুকু দিয়ে চলে যায়। সেই রিকশাওয়ালা কাকু আমার জীবনে ঠিক তেমনই এক ফেরেশতা হয়ে এসেছিলেন। আসলেনস্নেহ-ভালোবাসায় জড়িয়ে আবার নিঃশব্দে মিলিয়ে গেলেন
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
০৪/০৩/২০২৬

Sunday, 8 March 2026

শইরদ্দিন ডাক্তার - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

  

সকাল বেলা সবাই বসে চা খাচ্ছি এমন সময় মেইন দরজায় ক্রিং ক্রিং করে সাইকেলের বেল বেজে উঠলো সেই সাথে বাতাসে ভেসে এল একটা দরাজ কণ্ঠ— “কাঁ বো মামি, বাড়িত আছেন?” মুহূর্তেই হাড়াম করে দরজাটা খুলে গেলে আর সেই সাথে লম্বা একটা সালাম শুনতে পেলাম আমরা দেখলাম, দরজায় শইরদ্দিন ডাক্তার 
 
তাঁর ভালো নাম শহিরুদ্দীন আহমেদ। কিন্তু এই নামটা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। মানুষ তাঁকে চেনে ও ডাকেশইরদ্দিন ডাক্তার নামে। সম্পর্কে তিনি আমার দাদু হোনআমার বাবার দূরসম্পর্কের মামা। তাই দেখা হলে, আমাদের দাদু-নাতির খুনসুটি লেগেই থাকে। তবে এই সম্পর্কের চেয়েও বড় পরিচয়, তিনি আমাদের এলাকার এক জীবন্ত ইতিহাস।
 
সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। একটা পুরনো সাইকেল, হ্যান্ডেলে ঝোলানো ব্যাগ ও মাঝেসাঝে একটা বর্ষাতিএই তাঁর সব, এই তাঁর সম্বল। সেই সাইকেল নিয়েই তিনি চষে বেড়ান পুরো এলাকাচণ্ডিপুর, পুতহরি, তুলাই পেরিয়ে উদয়পুর, আরও আশপাশের কতশত গ্রাম। সাইকেলের হ্যান্ডেলে ঝোলানো সেই পুরনো ব্যাগে থাকে নানারকমের ওষুধহোমিওপ্যাথির শিশি, কাগজে মোড়া বড়ি, আর সঙ্গে তাঁর অদ্ভুত বিশ্বাসমানুষ ঠিক হলে ওষুধও কাজ করে। কোনো ডিগ্রি নেই, কোনো চেম্বার নেই; তবু অসংখ্য মানুষের ভরসার জায়গা তিনি।
 
তিনি শুধু ডাক্তার নন, তিনি একজন গল্পকারও এলাকার সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষদের একজন, তাঁর ঝুলিতে জমে আছে সময়ের অগণিত কাহিনীসন্ধ্যা নামলে, বা অলস দুপুরে, তাঁর মুখে শুনেছি পলিয়া পাড়ার গল্প, ফাঁসিতলার ইতিহাস, শালেককুড়ির অজানা উপাখ্যান, বড় মৌলানা ও তাঁর ভাইয়ের শিক্ষা, সংগ্রাম, রাজনীতি ও নানা টানাপোড়েনআরও কত শত গল্প, যা কোনো বইয়ে লেখা নেই, শুধু মানুষের মুখে মুখেই বেঁচে আছে।
 
এসবের বাইরেও তাঁর একটা অদ্ভুত শখ আছেশখ বললে কম বলা হবে, তবে কেউ চাইলে একে বদ নেশাও বলতে পারে। তিনি বছরের পর বছর ধরে লিখে রেখেছেন এলাকার মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ। কার কখন জন্ম, কে কবে চলে গেলসবই তাঁর খাতায় যত্ন করে লেখা। কোনো গবেষণার উদ্দেশ্যে নয়, কোনো উপার্জনের আশায়ও নয়, আর না কোনো স্বীকৃতির লোভেশুধু মানুষকে, এলাকা আর তার ইতিহাসকে ভালোবেসে। যেন সময় হারিয়ে গেলে অন্তত নাম-তারিখগুলো বেঁচে থাকে।
 
ইদানীং বয়স বেড়েছে তাঁর শরীর ভার হয়েছে, চোখে ঝাপসা দেখেন, হাত কাঁপে কখনো কখনো। তবে আশ্চর্য এক জেদে আজও থেমে যায়নি তাঁর সাইকেলের চাকা, এক দিনের জন্যেও নাগতি কমেছে, পথ ও পরিধি ছোট হয়েছে, কিন্তু থামেনি। কারণ এই সাইকেল শুধু যাতায়াতের বাহন নয়এটাই তাঁর পরিচয়, তাঁর দায়বদ্ধতা, তাঁর নিঃশব্দ সেবা।
 
এবার বাড়ি গিয়ে একদিন মোড়ে বসে মোবাইল ঘাঁটছি, এমন সময় তিনি মহিপাল থেকে ফিরছিলেন। আমাকে দেখে অটো থেকে নেমে পড়লেন। কাছে এসে বিনয়ের স্বরে বললেন,
—“প্রোফেসর সাহেব, একটা অনুরোধ রাখতে হবে”
উত্তর দিলাম—হুকুম করেন, মহারাজ।
হা হা করে হাসতে হাসতে বললেন,
—আমাদের গ্রামে একবার যেতে হবে, মসজিদটা দেখতে। বহুবার বলেছি, এবার যেতেই হবে।
—আলবৎ যাবো। কথা দিলাম। ইন্‌ শা আল্লাহ্‌!
 
পরের দিন সকাল বেলা চা খেয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম বাটুয়াদীঘি। আমাদের জমিজমাগুলো এক নজর দেখে প্রথমে গেলাম বড় দাদিকে দেখতে। তাঁর সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিলাম। তারপর শইরদ্দিন দাদুর বাড়ি গেলাম। গিয়ে দেখি, তিনি যথারীতি সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। দাদি ঘর থেকে বেরিয়ে বেশ জোরাজুরি করতে লাগলেন চা খাওয়ার জন্য। তাঁকে কোনোরকমে মানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আব্দুল ওয়াহাব, তাঁর ছোট ছেলে আমাকে তাঁদের মসজিদটা দেখাতে নিয়ে গেল। মসজিদে ঢুকেই আমি অবাক। সুন্দর করে সাজানো। চারপাশে ফুলের গাছ। কতশত রকমের ফুল ফুটে আছে ডালে ডালে। প্রাচীরের গায়ে লম্বা লম্বা সুপুরি ও পাইন গাছ দাঁড়িয়ে। মেঝের মার্বেল আয়নার মতো স্বচ্ছ। কোথাও ধূলিকণাও নেই। আব্দুল ওয়াহাবকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, দাদু রোজ দু’ বেলা নিজে প্রথমে ঝাড়ু দেন। তারপর একবার জল দিয়ে পোছা লাগান। শেষে একবার শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে দেন। আর এসবই করেন পরম যত্নে, মমতা ভরে।  
 
সত্যি করে বলতে, শইরদ্দিন দাদু শুধু একজন মানুষ ননতিনি একটা যুগ, একটা জনপদ, একটা চলমান স্মৃতিভাণ্ডার। তিনি ওষুধ দিয়ে যেমন বহু মানুষের রোগ সারিয়েছেন, তেমনই গল্প দিয়ে জুড়ে রেখেছেন ভাঙতে বসা স্মৃতিগুলোকে এই এলাকায় জন্ম নেওয়া আর চলে যাওয়া অসংখ্য মানুষের নামের পাশে, নীরবে কোথাও না কোথাও লেখা আছে তাঁরই ছায়া—যে ছায়া এখনো হেঁটে বেড়ায়, শীতের সকালে কুয়াশার চাদর জড়িয়ে, অথবা গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় গোধূলির আলো গায়ে মেখে, অথবা নিঝুম বর্ষায় বর্ষাতি মাথায়, হেঁটে বেড়ায় বাঁশকুড়ি-বাটুয়াদীঘি মেঠো পথে।
 
১৯/০১/২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা