Pages

Monday, 6 April 2026

চলো হাওলি দিমোঁ - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



বড়দি, মেজোআব্বার বড় মেয়ে নাম হালিমা বেগম আমরা ভালোবেসে, আদর করে হালি দি ডাকতামছোটবেলা থেকেই ছিল গার্হস্থ্যের কাজে নিপুণ, আচরণে এক মায়ামাখা কোমলতা ছিল তার, আর ব্যবহারে এমন আন্তরিকতা ছিল যা মানুষকে খুব সহজেই আপন করে নিত। সেই গুণের টানেই একদিন তাকে ঘরের বউ করে নিয়ে গেলেন আমাদের গ্রামেরই দবিরদ্দীন সাহেব, তাঁর একমাত্র ছেলে সোলেমান মিয়াঁর জন্য, যে কিছুদিন আগেই এলাকারই এক প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছে  
 
বিয়ের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বড়দি তার স্বভাবসিদ্ধ মাধুর্যে শ্বশুরবাড়ির সকলের মন জয় করে নিলশুধু ঘরের মানুষদের নয়, পাড়াপড়শিদের মনে জায়গা করে নিয়েছিল সেফলে তার জীবন আপন গতিতে বইতে লাগলযেমন করে সূর্যের আলো মেখে তুলাই নদীর জল নীরব স্রোতের ঘাড়ে চেপে পৌঁছে যায় টাঙনে, তারপর নানা নদনদী হয়ে মিলিয়ে যায় সমুদ্রের বুকে   
 
আমি যখন কদমডাঙা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, তখন সোলেমান দুলাভাই সেখানকার শিক্ষক। কী স্কুল, কী রাস্তাঘাট, কী বাড়ির উঠোন যেখানেই আমাকে দেখতেন, সাইকেল থামিয়ে মুচকি হেসে রসিকতা রে ডাক দিতেন— “অ্যাই শালা, শোন্‌! আর তার ডাকে আমি রাগে গজগজ করতাম দেখে মুচকি হেসে বলতেন, “তুই তো সম্পর্কে আমার শালাই হবি, তাও আবার কনিষ্ঠতম শালা, আমার পেয়ারা শালা!
 
দুলাভাই ছিলেন আগাগোড়া এক রসিক মানুষ আর আমার ও তাঁর সম্পর্কটা খানিকটা ওই টম এন্ড জেরির মতো ছিল। আমি যত ক্ষেপে যেতাম, তিনি ততই ক্ষেপাতেন। ফলে অনেক সময় রেগে গিয়ে আমি ছোট ভাগ্নিকে, মানে তাঁর ছোট মেয়ে শিরীনকে ধরে মার দিতাম আর বলতাম, “তোর বাপ কেনে মোর সাথে লাগেছে
 
তিনি ভীষণ পরিশ্রমীও ছিলেনশিক্ষকতার পাশাপাশি জমিজমা দেখাশোনা, ব্যবসাবাণিজ্য সবকিছুই সামলাতেন সমান দক্ষতায়। আগে থেকেই বেশ কিছু জমিজায়গা ছিল, পরে আরও কিনলেন। ধীরে ধীরে অনেক জমিজমার মালিক হয়েছিলেন। ফলে আষাঢ়-শ্রাবণ এলেই তাঁর জীবন যেন এক অবিরাম কর্মযজ্ঞে পরিণত হতো। জমি চাষ, আল কাটা, বীজ তোলা, ধান রোপণকাজ যেন শেষই হতো না তাঁর যেন বর্ষাকালে ধান রোপণের ওই মহাযজ্ঞে তিনি অকুল দরিয়ায় পড়ে গেছেন।
 
আর সেই সময়েই দেখা যেত গ্রামের প্রকৃত রূপমানুষ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে নিঃস্বার্থভাবে। কেউ এসে বীজ তুলে দিচ্ছে, কেউ হাল ধরছে, কেউ আল কাটছে, কেউ আবার রোপণে হাত লাগাচ্ছে। কোনো পারিশ্রমিক নেই, নেই কোনো চুক্তিশুধু সম্পর্কের টান আর একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধতা। তবে সেই সময় কাজের ফাঁকে ফাঁকে জমে উঠত হাসি, মশকরা আর খুনসুটির আসর যেন কোনো উৎসব চলছে
কেউ বলতো,
—“দুলাভাই, রাইতে কিন্তু হাঁস খামোঁ, নাইলে কাইল থাকি কাজ বন্!
দুলাভাই হেসে উত্তর দিতেন,
—“হাঁসে তো খাবেন। কটা খাবেন, খালি কহো। কম হইলে তোরা আর আসিবেন!”
পাশ থেকে অন্যজন বলতো,
—“এইটা ঠিক কাথা, চাইরটা হাঁস তো লাগিবিই
আল কাটতে কাটতে মোসলেম খোঁচা দিয়ে বলতো,
—“অ্যাই মছো, তোর আটা বেঁকি যাছে কেনে রে?”
মছোও ছাড়ার পাত্র নয়,
—“বেঁকা হইলেও কী, সোজা হইলেও কী, হাঁসের গোশত সোজা পেটত্‌ যাবি, চিন্তা কই না!
কেউ আবার কাজ ফাঁকি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে সঙ্গে সঙ্গে শোনা যেত,
—“হাঁ হো, তোরা ফের দাঁড়েই আছেন, কেনে তে?”
সে হেসে সহসা উত্তর দিতো,
—“মুই এনা জিরাছু, আর তোরা কীরম কাজ করেছেন তদারকি করেছু!
 
মন সব কথার ফাঁকে মাঠজুড়ে হাসির রোল উঠত। কষ্টকর কাজও তখন আর কঠিন মনে হতো নাসবকিছুই যেন একসাথে থাকার আনন্দে হালকা মনে হতো দিন শেষে থাকত সেই প্রতীক্ষিত ভোজকলাপাতায় গরম ভাত, সাথে হাঁসের কষা মাংসআর এই ভোজ ও রীতিকে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় বলা হতোহাওলি দেওয়া 
 
তবে হাওলি শুধু একটা ভোজ নয়আমি মনে করি, এটা এক ধরণের সম্পর্ক, এটা একটা বন্ধনযেখানে মানুষ অর্থের জন্য নয়, কাজ করত মানুষের জন্যবিনিময়ে পেত একসাথে বসে পাত পেড়ে খাওয়ার আনন্দ, আর হৃদয়ের গভীরে এক অদ্ভুত ও অবর্ণনীয় তৃপ্তি।
 
কোথাও, কারও জমিতে লোকে হাওলি দিচ্ছে এই খবরটা কানে এলেই আমরা ছোটরা আর স্থির থাকতে পারতাম না। আমি, পাগলু, দেলোয়ার, আমু, মাসুম, জুয়েল, রবিউল দা, মোমেন দা, বাবলু কাকু আমরা যেই শুনতাম, সঙ্গে সঙ্গে একে অপরকে ডেকে বলতাম— “লো, হাঁরাও হাওলি দিমোঁ!
 
আমাদের সেই ডাকের মধ্যে ছিল উচ্ছ্বাস, ছিল বন্ধুত্ব, আর আমাদের ছোট্ট পৃথিবীর এক বিশাল আনন্দ। আমার স্মৃতিতে আজও ভেসে ওঠে সেই দিনগুলো। আমরা ছোটরা ভারী কাজ করতে পারতাম না, তাই ছোটখাটো কাজে নিজেদের জুড়ে দিতামআমাদের মধ্যে কেউ বীজের আঁটি এগিয়ে দিতো, কেউ পানির কলসি এনে দিতো, আবার কেউ ভার সাজাতে সাহায্য করতো   
 
তবে পরবর্তীতে আমরা এই রীতিতে সামান্য একটু পরিবর্তন করেছিলাম, নিজেদের সুবিধার্থে হাওলি দিয়ে আমরা হাঁসের গোশতের বদলে অন্য কিছু চাইতামকখনো ক্রিকেট বল, কখনো ব্যাট, কখনো ফুটবল, আবার কখনো ভলিবল। শেষদিকে তো একবার হাওলির বদলেজনের থেকে আমরা একটা ক্যারামবোর্ড চেয়ে বসেছিলাম! তবে সেই চাওয়ার মধ্যেও ছিল একসাথে কিছু পাওয়ার আনন্দ ও একরাশ নিষ্পাপ স্বপ্ন।
 
আর তাই শুধু সোলেমান দুলাভাইয়ের জন্য নয়, গ্রামের আরও অনেকের কাজেই আমরা হাওলি দিতামকারো ধান ঝাড়া, কারো সরিষা কাটা, কারো আলু তোলাযেখানে দরকার, আমরা সেখানে হাজির। যেন এই হাওলি দেওয়াটা আমাদের কাছে একটা উৎসব হয়ে উঠেছিল।
 
আজ সময় বদলেছে। যন্ত্র এসেছে, পদ্ধতি বদলেছে, মানুষের জীবনও অনেক আধুনিক হয়েছে। সেই সাথে কোথা যেন হারিয়ে গেছে সেই সহজ, নিঃস্বার্থ, একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি; হারিয়ে গেছে হাওলি দেওয়ার মনমানসিকতাএখন গ্রামাঞ্চলেও সবকিছুতেই হিসেব, লাভ-ক্ষতি, স্বার্থের টানাপোড়েন। বে স্মৃতির ভেতরে আজও বেঁচে আছে সেই নির্মল ও নিঃস্বার্থ দিনগুলো হাঁসের কষা মাংসের ঘ্রাণে, কলাপাতায় সাজানো গরম ভাতের ধোঁয়ায়, আর মানুষের প্রতি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসার অনন্ত ও অবিরাম গল্পে
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
৩১ মার্চ ২০২৬

Saturday, 4 April 2026

বিপন্ন সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র - ড. নূরুল ইসলাম



অধুনা এক শ্রেণির হিন্দু হিন্দুধর্মের গরিমা ও হিন্দুদের অস্মিতা জাহির করতে নিজেদের সনাতনী বলছেন। সচেতনভাবে নিজেদের হিন্দু না বলে সনাতনী বলছেন। বস্তুত প্রতিটি ধর্ম অনুসারী নিজেদের সনাতনী বলেন বা তার প্রতিশব্দ ব্যবহার করেন। নিজেদের ধর্ম বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে পৃথিবীর প্রায় সকল মানুষ গর্ব করেন। তবে কিছু মানুষ আছেন যারা এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা চরম ও চুড়ান্ত সত্য আবিষ্কার করতে নিরবিচ্ছিন্ন প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা নিজেদের সত্য সন্ধানী বলেন। উদারপন্থী বলেন। এধরণের মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়। কিন্তু এরাই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। শান্তি ও স্থিতিশীলতার গ্যারান্টার।  
 
এদেশে এখন আমাদের সংবিধানে উল্লিখিত ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে আলোচনা হয় না। বরং প্রশ্ন উঠছে, ভারত কেন ধর্মনিরপেক্ষ হবে? কেন হিন্দু রাষ্ট্র হবে না? সংবিধানের প্রস্তাবনায় কেন ধর্মনিরপেক্ষ শব্দ অনুপ্রবিষ্ট হল? এগুলো নির্দ্বিধায় বলে।
 
হিন্দু বীরত্বের বহিঃপ্রকাশ করতে এক শ্রেণির মানুষ ভয়ঙ্কর অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। কট্টরবাদী হয়ে পড়েছে। তারা নিজেদের বিশ্বাস ও আস্থা অপরের উপরে চাপিয়ে দিতে চায়। এজন্য তারা সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসন শুরু করেছে। সত্য বলতে কি, এই ধারা শুধু ভারতে নয়,  পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সক্রিয়। ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে এই শ্রেণির মানুষ দেশে দেশে একই কাজ করে চলেছে। মজার বিষয়, সকল মৌলবাদী ও উগ্রবাদী আবার অপরকে মৌলবাদী ও উগ্রবাদী বলে। নিজেদের মানবতাবাদী ও শান্তির দূত বলে। বিস্ময়কর ! বিভ্রান্তিকর! 

সম্প্রতি ভারতে অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতা ভয়ঙ্কর স্তরে পৌঁছে গেছে। দুর্বল ও সংখ্যালঘু শ্রেণির মানুষ দারুণভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও দুর্বল ও সংখ্যালঘু শ্রেণির মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। মজার বিষয়, অপরাধীরা সগর্বে ও দুঃসাহসিকভাবে এই অপকর্ম করে চলেছে। পরিকল্পিতভাবে। সুসংঠিতভাবে। এক শ্রেণির মানুষ তাদের বীরের সংবর্ধনা দিচ্ছে। শুধু তাই নয়! আক্রান্তদের রাক্ষস ও অসুর প্রতিপন্ন করতে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে! এটা ভয়ঙ্কর!
 
এরকম এক অসহিষ্ণু ও সংঘাতময় প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বেলাগাম হিন্দুত্ববাদী দল ও তার নেতাকর্মীরা। বিনা প্ররোচনায় প্রতিদিন তারা ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করে চলেছে। অবদমিত দুর্বল ও সংখ্যালঘু শ্রেণির মানুষ প্রতিবাদ করতেও সাহস করছে না। প্রতিবাদ করার ধৃষ্টতা দেখালে প্রতিবাদীদের সমাজবিরোধী ও রাষ্ট্র বিরোধী দেগে দেওয়া হচ্ছে।  অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা ও দেশের জাতীয় উন্নয়ন ভয়ানক সংকটের মুখোমুখি।
 
এই রকম একটি পরিমন্ডলে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে জাতীয় নির্বাচন কমিশন অভূতপূর্ব এস আই আর নামক অভিযান শুরু করেছে। এস আই আর এখন দৈনন্দিন গার্হস্থ্য পরিভাষা। একটি আশঙ্কা ও আতঙ্কের নাম। এখন এদেশের অধিকাংশ মানুষ বলছেন, এস আই আর বাঙালি মুসলিম ও অবদমিত শ্রেণির মানুষের বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত অভিযান। এই বিশ্বাস কীভাবে গড়ে উঠেছে সেবিষয়ে খুব সংক্ষেপে আলোচনা করব।  
 
ষড়যন্ত্র –
গত বছর ২০২৫ সালে বিহার রাজ্যে নির্বাচনের প্রাক্কালে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে নির্বাচন কমিশন ভোটারদের নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া শুরু করে। তখন ভোটারদের কাছে যে সুনির্দিষ্ট এগারোটা নথি চাওয়া হয় সে দেখে বুঝা গিয়েছিল, ডাল ম্যাঁয় কুছ কালা হ্যায়। অবৈধ ভোটার খোঁজা নয়। সুনির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের ভোটাধিকার হরণ করার অপপ্রয়াস।  
 
বস্তুত ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশন যে এগারোটা ডকুমেন্টকে বৈধ ভোটার চিহ্নিতকরণের মৌলিক মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে সেটা বিতর্কিত শুধু নয়, অভিসন্ধিমূলক।  অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়, বহিষ্করণমূলক। সুনির্দিষ্ট কিছু মানুষের ভোটাধিকার সংকুচিত করতে সেই অভিযান শুরু হয়। ভালো কথা, উল্লেখিত এগারোটা ডকুমেন্টের মধ্যে যেকোন একটি নথি জমা দিতে পারলে তাকে বৈধ নাগরিক বিবেচনা করা হবে। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, এরকম আরও বিশ প্রকার নথি যোগ করলেও একশো শতাংশ বৈধ নাগরিক নিজেকে বৈধ ভোটার প্রমাণ করতে সক্ষম হবে না। কারণ এজাতীয় নথি সব মানুষের কাছে থাকার কথা নয়। দেশের নাগরিক কখনো ভাবেনি তাদের ভোটে নির্বাচিত সরকার তাদের ভোটাধিকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। এজন্য তারা সদা প্রস্তুত থাকবে!
 
বিস্ময়কর , নির্বাচন কমিশন সরকার প্রদত্ত প্রায় সকল সার্বজনীন নথিগুলোকে এস আই আর  প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করেনি। ভোটার আই কার্ড, রেশন কার্ড, প্যান কার্ড এমনকি আধার কার্ডও এস আই আর প্রক্রিয়ায় মৌলিক নথি হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি! এসব দেখে কী মনে হয়? নির্বাচন কমিশনের অভিপ্রায় বিষয়ে কোন সন্দেহ আছে? তবে ভয় নেই। এই নিয়ম সকলের জন্য প্রযোজ্য হবে না। শুধুমাত্র সুনির্দিষ্ট ধর্ম ও জাতি বিবেচনা করে প্রয়োগ হবে। হচ্ছে তাই।  এই মুহূর্তে এই ষড়যন্ত্রের শিকার পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায়। নগণ্য সংখ্যক মানুষ আছেন দলিত শ্রেণির। বর্ণ হিন্দু থাকলে সেটা একদম ব্যতিক্রমী। এজন্য লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে অবলুপ্ত।
 
ষড়যন্ত্র –
নির্বাচন কমিশন যুদ্ধ তৎপরতায় ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে চায় কেন? অভিযোগ , এই অভিলাষের মধ্যে গভীর ষড়যন্ত্র আছে। সেই ষড়যন্ত্রকে আড়াল করতে কখনো এ আই যন্ত্রের দোহাই দিয়ে  নিজেদের অপরাধ ঢাকতে চায়। এখন সময়ের স্বল্পতার অজুহাত দেখিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার সংকুচিত করার পাঁয়তারা শুরু করেছে। এই মুহূর্তে অ্যাডজুডিকেশনে যাদের নাম কাটা গেছে তারা এবার ভোট দিতে পারবেন না। তাদের এখন হয়তো শুনানিই শুরু হবে না। এদের সংখ্যা বিশ পঁচিশ লক্ষের কম নয়। এসব ভোটার সেই সব কেন্দ্রে যেখানে তাদের অনুপস্থিতি একটি নির্দিষ্ট দলকে জিততে সাহায্য করবে। এখন প্রশ্ন, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া এখনো চলছে। এমনকি ট্রাইব্যুনালে এবং পরবর্তীতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত না যাওয়া পর্যন্ত এই এই প্রক্রিয়া চালু থাকার কথা। একটি বৈধ ভোটারের ভোটাধিকার হরণ করাও সংবিধান বিরোধী কাজ। তাহলে এই মুহূর্তে নির্বাচন হয় কী করে?
 
ষড়যন্ত্র –
সর্বশেষ পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিতভাবে অস্বচ্ছ ভোটার তালিকা প্রস্তুত করতে মরিয়া। বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গে এধরণের অস্বচ্ছতা সুস্পষ্ট। অসংখ্য জীবিত মানুষকে মৃত ঘোষণা করে ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম মুছে দেওয়া হয়েছে! অসংখ্য মানুষের নাম আনম্যাপড বলে ডিলিট করা হয়েছে। এসব হতভাগ্য মানুষের সঠিক পরিসংখ্যানও পাওয়া যাচ্ছে না। এসব এমনি করছে না। নির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে। অভিযোগ, সুনির্দিষ্ট একটি দলকে জেতাতে হবে। নতুন ভোটারদের আবেদন গ্রহণ করতে হবে। তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অভিযোগ, লক্ষ লক্ষ আবেদন ঝুলে রয়েছে। ৭ নম্বর ফর্ম জমা দিয়ে এক শ্রেণির মানুষ তাদের শত্রুদের হয়রানি করতে চায়। এজন্য হাজার হাজার এধরণের আবেদনের শুনানি না করে কারো নাম বাদ দেওয়া অপরাধ!
 
মহাষড়যন্ত্র –
বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অভিনব আবিষ্কার লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি বা যৌক্তিক অসঙ্গতি! এআবার কি! ভোটারের প্রদত্ত ক্রেডিনশিয়ালে অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। প্রায় দেড় কোটি মানুষের নামে নাকি অসঙ্গতি ধরা পড়েছে! আবার কারও বাবার নামে নাকি ছয়ের বেশি সন্তানের হদিস পাওয়া গেছে! আচ্ছা, শুধুমাত্র দেড় কোটি কেন? আমি যতদূর জানি, আশি শতাংশ মানুষের নামে বানান ও পদবি মিসম্যাচ আছে। সেটা কি লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি? হ্যাঁ। এটাই লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি। কিন্তু এটা পরিচালিত হচ্ছে সুনির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষকে টার্গেট করে। আচ্ছা, এদেশে কি কোন আইন আছে যে কোন দম্পতি ছয়ের বেশি সন্তান জন্ম দিতে পারবে না! এটাও নাকি লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি। এটা সমাধান করতে হলে কথিত এগারোটার মধ্যে কোন একটি নথি শুনানির সময় জমা করতে হবে! ভাবুন। অভিযোগ কী ছিল আর জবাব কী দিতে হল! এধরণের অভিযোগ সমাধানের কার্যকর পদ্ধতি হচ্ছে, সরাসরি অভিযুক্তের বাড়িতে গিয়ে তদন্ত করা। তা না করে অসুস্থ ও বৃদ্ধ সহ দেড় কোটি মানুষকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া!  এটা যদি সঠিক পদ্ধতি হয়, তাহলে সব রাজ্যে বাস্তবায়ন হচ্ছে না কেন?
 
ষড়যন্ত্র –
কমিশন যে কথিত মিসম্যাচের অভিযোগে অভিযুক্তদের শুনানিতে হাজির হতে বাধ্য করল তা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। একেবারে অসভ্যতা ও নৃশংসতা! এই অসঙ্গতি সমাধানের জন্য বি এল ও একাই যথেষ্ট। তার শংসাপত্র যথেষ্ট। খুব বেশি হলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে এফিডেভিট নিলেই মিটে যেত। কিন্তু না, এন আর সি ডকুমেন্ট লাগবে! উদ্দেশ্য পরিষ্কার। সাংবিধানিক স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান অবিচার করলে তার জবাবদিহিতা দাবি করা সহজ নয়! এজন্য এসব পদে অসৎ মানুষ বসলে জনগণের সর্বনাশ! বর্তমান নির্বাচন কমিশন প্রধান কয়েক দিন আগে প্রকাশ্য সাংবাদিক সম্মেলন করে বলে গেলেন, যেসব ভোটারের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় থাকবে তাদের কোন নথি জমা করতে হবে না। এখন দেখছি, তাদেরকে লক্ষ্যবস্তু করে যত হয়রানি। অধিকাংশ ডিলিটেড নাম ২০০২ সালের তালিকার অন্তর্ভুক্ত। এই প্রহসন কীভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব!
 
ষড়যন্ত্র –
অসাংবিধানিকভাবে মাইক্রো অবজার্ভার ও রোল অবজার্ভার নিয়োগ করে অবৈধভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা একটি গভীর ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতি। বহু পরিশ্রম করে যে কাজ  ই. আর. ও. এবং এ. ই. আর. ও. বন্ধুরা সুসম্পন্ন করে ফেলেছে তখন মাইক্রো অবজার্ভার ও রোল অবজার্ভাররা কোন অধিকারে তাকে রোল ব্যাক করল? এই অবৈধ ও অনৈতিক কাজকে কোর্ট কীভাবে বৈধতা দিচ্ছে ! নির্বাচন কমিশন বিপুল সংখ্যক মানুষের নামে কীভাবে অ্যাডজুডিকেশন তকমা দিয়ে গভীর ফাঁদে জড়িয়ে দিল! এসব সার্কাস খেলার উদ্দেশ্য মানুষ বুঝে গেছে। কোথাও স্বচ্ছতা নেই। গভীর ষড়যন্ত্র আছে।
 
ষড়যন্ত্র –
অ্যাডজুডিকেশন! বিচারপতিরা কাদের বিচার করছেন? কোন অপরাধের বিচার করছেন? বিচার প্রক্রিয়ার মানদণ্ড কী! যে অপরাধীদের বিচার হচ্ছে তারা নিজেদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই কেন? অপরাধ প্রমাণিত হল কীভাবে? সে বিষয়ে কেউ জানতে পারবে না! কী জন্য একজনের নাম ভোটার লিস্ট থেকে মুছে দেওয়ার রায় হল সেবিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানান হবে না? এসব কী হচ্ছে? বিচার না সার্কাস? প্রতি মিনিটে কতজনের বিচার সম্পন্ন হচ্ছে? কতজনের ভাগ্য নির্ণয় হচ্ছে? সর্বনাশ হচ্ছে! বহু বুথে ৩০% থেকে ৮০% মানুষের নাম বাদ! করণিকের কাজের জন্য মহামহিম বিচারপতি! বিচারপতিরা বিচারিক সিদ্ধান্ত নিবেন। লিখিত সিদ্ধান্ত জানাবেন। কিন্তু এসব কী হচ্ছে?
 
ষড়যন্ত্র –
যৌক্তিক অসঙ্গতি তারপর বিচারাধীন তারপর মুছে ফেলার যে প্রক্রিয়া চলছে তার সর্বনাশা  প্রভাবের কথা ভেবেছেন? একটি হাস্যকর নাট্য মঞ্চস্থ করে তারা কত পরিবার ধ্বংস করতে চাইছেন ? খবর রাখেন? প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ থেকে আশি লক্ষ মানুষের জীবনে কি বিভীষিকা নেমে এসেছে! কি মনে হয়? এরা সবাই অনুপ্রবেশকারী? আমি চ্যালেঞ্জ করে বলছি, আপনার ও আমার চেয়ে তাদের অনেকের বেশি ডকুমেন্ট আছে। যা দিয়ে সহজেই প্রমাণিত হবে তিনি এদেশের ভূমিপুত্র ও মূলনিবাসী। দেশপ্রেমিক নাগরিক ও বৈধ ভোটার। কিন্তু কাকে দেখাবে? একজন হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি একাধিক বার নথি জমা দিয়েছেন। এমনকি পাসপোর্ট থেকে শুরু করে সব গুরুত্বপূর্ণ নথি জমা দেওয়ার পরও তাঁর নাম ডিলিট করা হয়েছে। এই দুঃসাহস হয় কী করে! মূলত এসব গভীর ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ!
 
ষড়যন্ত্র –
এক শ্রেণির মানুষের অভিযোগ, এসব সম্ভব হচ্ছে, কারণ একটি অশুভ শক্তি অসৎ মানুষ নিয়ে একটি আঁতাত গড়ে তুলেছে! নেক্সাস! এত বড় অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে কীভাবে! কোটি কোটি নাগরিকের জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ তছনছ করে দিয়েছে -এই কথিত এস আই আর নামক অনুশীলন। কোটি কোটি মানুষ আতঙ্কিত ও সন্ত্রস্ত! লক্ষ লক্ষ কর্মদিবস নষ্ট। কোটি কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে। দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। অথচ তথাকথিত কর্মকর্তাদের গতিবিধি দেখে মনে হচ্ছে, দুনিয়া ডুবলেও তাদের কাছে এক হাঁটু জল! এমন কি হয়েছে? ক্ষমতা দখলের অভিসারে সব বৈধ।
 
ষড়যন্ত্র – ১০
বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। পৃথিবীর সকল মানুষ বিচার ব্যবস্থার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করে। দুর্বৃত্ত ব্যক্তি, মাফিয়া গোষ্ঠী ও স্বৈরাচারী সরকারের নিপীড়ন থেকে বাঁচার একমাত্র আশ্রয় বিচারালয় ও বিচার ব্যবস্থা। কিন্তু একি লক্ষ্য করছি! যতবার  সুপ্রিম কোর্টে শুনানি হচ্ছে তারপর নির্বাচন কমিশন পরের দিন বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে! সুপ্রিম কোর্ট আধার কার্ডকে গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে গ্রহণ করতে একাধিক বার বলার পরেও নির্বাচন কমিশন তা উপেক্ষা করে চলেছে। সুপ্রিম কোর্টে ধমক খাওয়ার পরের দিন এক কোটি ছত্রিশ লক্ষ মানুষের নামে কমিশন লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সির নোটিশ করেছে! তাদের ক্রেডিনশিয়ালে নাকি অসঙ্গতি আছে! মানে সন্দেহজনক। মহামহিম নির্বাচন কমিশনের নিদান আমরা মানতে বাধ্য। সব কাজ ফেলে তার নির্দেশ অবলাইজ করেছি। শত কষ্ট স্বীকার করে।
 
হাজার হাজার সরকারি কর্মচারীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে কথিত লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি যখন প্রায় শেষ হয়েছে তখন আবার কোর্টের শুনানি। কোর্টের ধমক খেয়ে বিচার বিভাগকে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার প্রাক মুহূর্তে নির্বাচন কমিশন ষাট লক্ষ মানুষের নামে আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন ট্যাগ লাগিয়ে দিল। বেলাগাম! বেপরোয়া ! নির্লজ্জ!  
 
আমাদের বিশ্বাস, সুপ্রিম কোর্ট তো সুপ্রিম। তাহলে তাকে অবজ্ঞা করার সাহস হচ্ছে কি করে! সর্ষের মধ্যে ভূত নেই তো! কোর্ট কীভাবে কোটি কোটি মানুষের নামে নোটিশ জারি করাকে মেনে নিল! ষাট লক্ষ মানুষের নামে আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন তকমা কীভাবে স্বীকৃতি দিল! এই মুহূর্তে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশিত বিচারকরা কোন আইন ও মানদণ্ড মেনে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার রহিত করে চলেছে! খুব বিপজ্জনক! এই সর্বনাশের অভিঘাত খুব সহজে মিটবে না।

Thursday, 2 April 2026

ঈদে নতুন জামা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 


ঈদের আর মাত্র দু’-তিন দিন বাকি মোড়ে মোড়ে, মুখে মুখে জোর জল্পনাকবে চাঁদের দেখা মিলবে তা নিয়ে আমি তখন খুব ছোটআমার ছোট্ট মনটাও ঈদের আনন্দ ও উত্তেজনায় টইটম্বুরচারপাশে উৎসবের এক অদৃশ্য ঢেউ বইছেবাড়ির ভেতরে-বাইরে ব্যস্ততা, মায়েদের তাড়াহুড়ো, বাবাদের হিসেব-নিকেশ, আর ছোটদের চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক। বাজারে গেলে মনে হ, পুরো পৃথিবীটাই যেন হঠাৎ করে রঙিন হয়ে উঠেছেদোকানের সামনে ঝোলানো নানা রঙের কাপড়, বাতাসে নতুন কাপড়ের ঘ্রাণ, মানুষের কোলাহলসব মিলিয়ে এক প্রীতিকর আবেশ। যতদূর মনে পড়ে, ওটা আমার স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠা প্রথম ঈদ।  
 
সেদিন অলস দুপুর সবে গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। বাবা হঠাৎ আমায় ডেকে বললেন, “তোমার জন্য এবার একটা পাঞ্জাবী কিনবো, ঠিক করেছিতাঁর এই একটিমাত্র বাক্য যেন আমার ছোট্ট পৃথিবীটাকে আনন্দে ভরিয়ে দিল। সেই মুহূর্ত থেকে আমার দিন-রাতের একটাই স্বপ্ননতুন পাঞ্জাবী। কেমন হবে সেটা? সাদা? নীল? নাকি হালকা কাজ করা? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে কল্পনা করতামআমি নতুন পাঞ্জাবী পরে ঈদগাহে যাচ্ছি। সেই কল্পনাতেই কতবার যে চোখেমুখে হাসির রেখা ছড়িয়েছে, তার হিসেব নেই।
 
কিন্তু বাস্ত টাও সহজ ছিল না। টানা দুদিন বাবা আমাকে নিয়ে বাজারে ঘুরলেন। এক দোকান থেকে আরেক দোকানকোথাও মাপ মিলছে না, কোথাও কাপড় ভালো লাগছে না, কোথাও আবার দাম শুনে বাবা নিঃশব্দে সরে আসছেনতখন এত কিছু বুঝতাম না, শুধু এটুকুই বুঝতামআমার পাঞ্জাবীটা এখনও কেনা হয়নি। ছোট্ট মনটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, হয়তো এবারের ঈদে আমার নতুন জামা হবে না। অন্য বাচ্চাদের মতো আমি নতুন কাপড় পরে বেরোতে পারবো না সেই কষ্টটা ছিল খুব নিঃশব্দ, কিন্তু গভীর শিশুমনের নির্ভেজাল দুঃখগুলো যেমন হয় আরকি   
 
অবশেষে ঈদের আগের দিন বিকেলে বাবা আমাকে নিয়ে আবার বেরোলেন। এলাকার ব্যস্ত এক বাজারেচৌরঙ্গীর এক দোকানে ঢুকলাম। দোকানটা যেন আলোয় ঝলমল করছে, চারিদিকে সারি সারি পাঞ্জাবী ঝুলছেসাদা, ক্রিম, হালকা নীল, কোথাও সূক্ষ্ম কারুকাজ। দোকানদার একের পর এক পাঞ্জাবী নামিয়ে দেখাচ্ছেন। বাবা বারবার বলছেন, “আরেকটু ছোট সাইজ আছে?” 

অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে একটা পাঞ্জাবী পাওয়া গেল। একেবারে মাপ মতো নয়, একটু ঢিলেঢালা, হাতাটা সামান্য বড়। কিন্তু তখন সেটা আমার কাছে যেন জান্নাত থেকে নামা মান্না-সালওয়ার মতো কোনো উপহার। আমি সেটা গায়ে দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালামনিজেকে দেখে মনে হলো, আমি যেন হঠাৎ করেই বড় হয়ে গেছি। বাবার চোখের কোণে তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি, ঠোঁটে মৃদু হাসি, কপালে আনন্দের রেখাদাম মিটিয়ে তিনি যখন পাঞ্জাবীটা ভাঁজ করে হাতে নিলেন, তখন বুঝিনিওই ভাঁজের ভেতর শুধু একটা কাপড় নয়, লুকিয়ে আছে তাঁর অগণিত না-পাওয়া, না-কেনা ইচ্ছেগুলো।
 
ঈদের দিন সকালে সেই পাঞ্জাবীটা গায়ে দিয়ে আনন্দে আমি যেন হাওয়ায় উড়ছিলাম। ঈদগাহে যাওয়ার পথে লাফাতে লাফাতে এগোচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটা বুঝি আমি। চারিদিকে তাকবিরের ধ্বনি, লোকজন সালাম-মুসাফাহ করছে, দীর্ঘ দিন পর যাদের দেখা কোলাকুলি করছে, মানুষের মুখে অমলিন হাসিসব মিলিয়ে এক অপার্থিব আনন্দ। সেই আনন্দের রেশ আজও বুকের ভেতরে কোথাও নরম হয়ে লেগে আছে।
 
কিন্তু তখন একটা জিনিস বুঝিনি, বা বলা ভালো বোঝার ক্ষমতাই হয়নিবাবা সেই ঈদে নিজের জন্য কেন কিছুই কেনেননি। মনে হয়েছিল, হয়তো তাঁর দরকার নেই। কিন্তু আজ বুঝি, ভালো রকম ভাবেই বুঝিদরকার ছিল, হয়তো ইচ্ছেও ছিল; কিন্তু তিনি নিঃশব্দে সেগুলো সরিয়ে রেখেছিলেন। সন্তানের হাসিটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় ঈদী
 
আজ পঁচিশ-তিরিশ বছর পরে, খন আমিও দুসন্তানের বাবা সেই পুরনো দিনের ছবিগুলো এখন নতুন করে অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে আমার কাছেঈদের আগে আমিও এখন বাজারে যাইনিউ মার্কেট-বড়বাজার ঘুরি, এক দোকান থেকে আরেক দোকান, এই শপিংমল থেকে ওই শপিংমলেসন্তানের জন্য সবচেয়ে ভালোটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করিতারপর তাদের চোখে যখন নতুন জামা পাওয়ার আনন্দের ঝিলিক দেখি, তখন নিজের ক্লান্তি, নিজের চাওয়াপাওয়া সব যেন কোথায় মিলিয়ে যায়। কখন যে নিজের জন্য কিছু কেনার সময় ও সামর্থ্য দুটোই ফুরিয়ে যায়, বুঝতেই পারি না। কখনো বা চুপিচুপি একটা সাধারণ কিছু কিনে নিই, নিজের মনের পাশাপাশি বাড়ির সবাইকে বোঝানোর জন্যঈদে আমিও কিছু নিয়েছি।
 
আসলে এটা শুধু আমার গল্প নয়, এটা আমাদের চারপাশের অসংখ্য পরিবারের গল্প। মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের অগণিত বাবার গল্প। তারা হয়তো বছরের পর বছর একই পাঞ্জাবী যত্ন করে পরে, কেউ খেয়ালই করে না। বাইরে থেকে তাদের জীবন স্বাভাবিক মনে হয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেদের স্বপ্নগুলোকে বিদায় জানায়।
 
কখনো মনে হয়, এরা সবাই নিঃশব্দ যোদ্ধা। আবার অন্যভাবে ভাবলে, এরা যেন একেকজন খুনি এরা নিঃশব্দে খুন করে। তবে দের হাতে কোনো রক্ত নেই; এরা হত্যা করে নিজেদের ইচ্ছেগুলোকে, নিজেদের ছোট ছোট স্বপ্নগুলোকে, নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলোকে  
 
হয়তো আমিও আজ সেই দলে মিশে গেছি। বে আশ্চর্যের বিষয়, এই হারানোর মাঝেও এক অদ্ভুত পাওয়া লুকিয়ে থাকে। যখন সন্তানের মুখে নতুন জামা পরে সেই নির্ভেজাল হাসিটা দেখি, তখন মনে হয় আমি কিছু হারাইনি, বরং নিজের ভেতরের সবচেয়ে সুন্দর মানুষটাকে খুঁজে পেয়েছি। হয়তো এটাই জীবনের সবচেয়ে গভীর সত্যনিজেকে নিঃশেষ করে দিয়েই মানুষ সবচেয়ে পূর্ণ হয়ে ওঠে।
 
বাঁশকুড়ি, দক্ষিণ দিনাজপুর
২০ মার্চ ২০২৬