Pages
Saturday, 6 June 2026
খুদ্দার - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
Saturday, 16 May 2026
কুরবানি - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
কুরবানি আরবি শব্দ। এর অর্থ নৈকট্য লাভ, ত্যাগ,
আত্মোৎসর্গ ও বলিদান। আমাদের উপমহাদেশে একে অনেকে বকরাঈদও বলে। আবার কেউ কেউ “ইদুজ্জোহা”
উচ্চারণ করে, যদিও শুদ্ধ উচ্চারণ হলো “ঈদুল আজ্হা”। আমাদের দু’টি প্রধান ধর্মীয় উৎসবের অন্যতম এই বকরাঈদ। এর সঙ্গে
জড়িয়ে আছে নবী ইবরাহীম (আঃ)–এর সেই অনন্য আত্মত্যাগের স্মৃতি, যে স্মৃতি যুগ যুগ ধরে মানুষকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ ও উৎসর্গের পথে চলতে।
আরবি ক্যালেন্ডারের দ্বাদশ মাস জিলহজ্জ-এর ১০ থেকে ১৩
তারিখ পর্যন্ত আমরা মুসলমানরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কুরবানি করি; কেউ উট, কেউ গরু, কেউ মোষ, কেউ ছাগল, তো কেউ ভেড়া, আবার কেউ দুম্বা। ইসলামে এমন ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যাতে আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল মানুষও এই আনন্দ ও ইবাদতে শরিক
হতে পারে। তাই একটা গরু বা মোষে সাত ভাগ এবং একটা উটে দশ ভাগ অর্থাৎ দশটা পরিবারের শরিক হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কুরবানির মাংস আমরা সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করি। এক ভাগ নিজ পরিবারের জন্য
রাখা হয়। এক ভাগ আত্মীয়স্বজনদের দেওয়া হয়। আর এক ভাগ গরিব-দুঃখী ও পাড়াপড়শিদের মাঝে বিলিবণ্টন করা হয়। যেন ঈদের আনন্দ শুধু বিত্তবানদের ঘরে সীমাবদ্ধ না থেকে সবার দোরগোড়ায়
পৌঁছে যায়।
এক সময় আমাদের পরিবারে সদস্য সংখ্যা ছিল পাঁচ—বাবা-মা আর আমরা তিন ভাই। সেই সময় আমাদের বাড়িতে সাধারণত ছাগলই কুরবানি করা হতো। বোধ করি, তখন সেটাই
যথেষ্ট ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংসারও বড় হতে লাগল। একে একে আমাদের সবার বিয়েশাদি হলো,
ঘরে বাচ্চাকাচ্চা এল, পরিবারের সদস্যসংখ্যা বাড়ল। ফলে শুধু ছাগলে আর কুলিয়ে ওঠা যাচ্ছিল না। তাই ছাগলের পাশাপাশি একটা মাঝারী সাইজের গরুও কুরবানি করা শুরু হল।
করোনা মহামারির এক-দু’বছর আগের কথা। কুরবানির ক’দিন আগে আমি কোলকাতা থেকে বাড়ি ফিরেছি। ততদিনে খাসি কেনা
হয়ে গেছে,
শুধু গরু কেনা বাকি। বিকেলে দাদা বললেন— সাঁকোপাড়ায় একটা মাঝারি সাইজের আড়িয়ার খোঁজ আছে। দেখে ভালো লাগলে ওটাই ফাইনাল করতে হবে।
পরের দিন সকালে তিন ভাই মিলে বেরিয়ে পড়লাম সাঁকোপাড়ার উদ্দেশ্যে। গ্রামের এক প্রান্তে, মাটির উঠোনওয়ালা একটা ছোট্ট বাড়ি। সেই বাড়িতে থাকেন এক বৃদ্ধা ও তাঁর স্বামী। তাঁদের দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে
বহুদিন। সামান্য একটু জমিজমা আছে, তা চাষ করেন দু’জনে মিলে। সঙ্গে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পুষে কোনো রকমে সংসারের ঘানী টেনে চলেছেন। দাদাদের উনি আগে থেকেই চিনতেন। ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করলেন। তারপর আমাকে দেখিয়ে বড়দাকে প্রশ্ন করলেন — এটা কে মামা?
দাদা হেসে বললেন—
আমার ছোট ভাই। কোলকাতায় থাকে। গতকালই বাড়ি এসেছে।
অমনি বৃদ্ধা ছুটে এলেন আমার কাছে। যেন কোনো আপনজনকে ফিরে পেয়েছেন। আমার
মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন— অছিমদ্দিন দা’র তিনটা বেটা মুই জানক নাই। ওই দুজনক হামরা চিনেন বাপু। হাটবাজারত
দেখাসাইক্ষাত হয়। কথাবাত্রা হয়। তোমাক হামরা চিনেন না মামা। এত্ত বড় মানুষ হই
গেইছেন বাপু। ভগবান তোমাক আরও বড় মানুষ করৌক!
গ্রামের সহজ-সরল মানুষের এই আন্তরিক আশীর্বাদে বুকটা ভরে উঠল। গল্পের ফাঁকে গরুটা দেখালেন। খুব বড় নয়, ছোটখাটো গড়নের।
কিন্তু বেশ সুন্দর, ছিমছাম, শরীর ভর্তি মাংস,
চকচকে গা, শান্ত দু’টো চোখ। এক্কেবারে গুদুমগাদুম, নাদুসনুদুস। প্রথম দেখাতেই আমাদের সবার পছন্দ হয়ে গেল।
এরপর শুরু হলো দরদাম। উনার স্বামী বললেন—
সাড়ে ষোল হাজার দ্যান মামা।
মেজদা বললেন—
তেরো হাজার নেও জামাই।
বৃদ্ধা তখন একরকম মিনতির সুরে বললেন— মামা,
সাড়ে চইদ্দ হাজার দেও। এর কম দেন না। নাইলে বিপদত পড়ি যামো।
কথাগুলো বলার সময় তাঁর কণ্ঠে এক অদ্ভুত উৎকণ্ঠার অনুরণন ছিল। তাঁর স্বরে মিশে ছিল এক অসহায় কম্পন, যা সহজে উপেক্ষা
করা যায় না। আমার মনে হল, এই টাকার সঙ্গে তাঁদের বেঁচে থাকার কোনো গভীর সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। তাই জিজ্ঞেস করে বসলাম—
পিসি, কোনোকিছু হয়েছে?
বৃদ্ধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন— মামা,
এনা বিপদত আছেন হামরা। পেটত কী বা হইছে বাপু। ডাক্তার
অপারেশন করিবা কইছে। মেলায় খরচ। মেলা জাগাত ঘুরিনো। শেষে বাগডুমার ডাক্তারটার গড়ত গেইছোনো। খরচ মেলায়,
তাও ওয় কমশমে করিবি। মোটমাট সাড়ে চইদ্দ হাজার।
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম— হাজিকুল দা’র সাথে সরাসরি কথা বলেছেন?
—না মামা, ওর বড় ভাইক
ধইছেনেন। খরচ বিশ-বাইশ হাজার। হামার নাগিন কমেই সাড়ে চইদ্দ হাজার কইছে।
শুনে বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল। মনে হল, এই গরুটা শুধু একটা পশু নয়—এটা এই সংসারের
দুঃসময়ের সঞ্চয়,
হয়তো শেষ সম্বল। পকেট থেকে টাকা বের করে সাড়ে চৌদ্দ হাজার গুনে তাঁর হাতে দিলাম। তারপর আলাদা
করে আরও পাঁচশো টাকা বাড়িয়ে দিয়ে বললাম— পিসি,
এটা দিয়ে ফলমুল কিছু কিনে খাবেন।
টাকাগুলো হাতে নিতেই তাঁর চোখেমুখে এমন এক হাসি ফুটে উঠল, যা শব্দে ধারণ করা আমার পক্ষে অসম্ভব। সেই হাসির ভেতর ছিল স্বস্তি, ছিল
কৃতজ্ঞতা, আর ছিল অদ্ভুত এক বেদনা। যেন তিনি কিছুটা বাঁচার ভরসা পেলেন, একই সঙ্গে বুকের
গভীরে কোথাও খুব কাছের কিছু হারানোর কষ্ট লুকিয়ে ছিল।
আমি আর বেশি কথা বাড়ালাম না। মেজদা বাইক স্টার্ট দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, আমি উঠে বসলাম। আমরা বাইকে ফিরবো আর বড়দা গরুটাকে নিয়ে হেঁটে বাড়ি আসবেন। বাইকে ওঠার পর
পিসিকে “আসছি” বলার জন্য একবার
ফিরে তাকালাম।
দেখলাম, পিসি গরুর দড়িটা
বড়দার হাতে তুলে দিয়ে গরুটার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। গরুটাও কেমন উদাস হয়ে
তাঁর শরীরের সঙ্গে সেঁটে দাঁড়িয়ে আছে। যেন সেও বুঝতে পারছে, এবার বিদায়ের পালা ঘনিয়ে এসেছে, ‘এবার যে যেতে হবে’! পিসির চোখ ছলছল করছে। ঠোঁট কাঁপছে। মুখে কোনো শব্দ নেই, সেই নীরবতার ভেতর যেন হাজারটা কান্না জমে আছে।
সেই দৃশ্য দেখে হঠাৎই মনে হলো,
আমি যেন শরৎবাবুর আমিনা আর মহেশকে নিজের চোখের সামনে দেখছি। বোধ করি, গ্রামের দরিদ্র-চাষি মানুষদের সঙ্গে তাদের গবাদিপশুর যে সম্পর্ক, তা শুধু অর্থের নয়, তা মায়া ও মমতার সম্পর্ক, স্নেহ ও ভালোবাসার সম্পর্ক। আর তাই ফিরতি পথে সারা
রাস্তা জুড়ে মাথায় কেবল একটা জিনিসই কিলবিল করছিল—জীবনে কতো জন যে কতো রকম ভাবে কুরবানি দেয়...!
মোমিনপুর, কোলকাতা
০৮ মে ২০২৬

