Pages

Tuesday, 9 June 2026

ত্যাগের সফর - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



আমার মা ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। গ্রামেই একটা প্রাইমারী স্কুল ছিল সেখানে। তারপর আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। সেই প্রত্যন্ত গ্রামে তখন মেয়েদের পড়াশোনার তেমন পরিবেশই ছিল না। আশেপাশে স্কুলও ছিল নাকিন্তু মায়ের ভেতরে শেখার একটা অদ্ভুদ জেদ ছিল। আর তাই গ্রামের অন্য মেয়েদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত মসজিদে যেতেন পড়তে। সেখানে কুরআন শরীফ পড়েছেন, উর্দুর পহেলি, দোসরী, তিসরী পর্যন্ত শেষ করেছেন। ফিকাহ মুহাম্মদীখতম করেছিলেন বেশ আগ্রহ আর নিষ্ঠার সাথেমা এখনও রোজ সকালে কিছুক্ষণ কুরআন তেলাওয়াত করেন। তারপর কিছুক্ষণ অর্থ সহ কুরআন পড়ার চেষ্টা করেন।
 
বাবা তখন কলেজে পড়তেন। লজিং থাকতেন যে বাড়িতে, সেটি ছিল মায়ের ফুফুর বাড়ি এবং আমার বড় আম্মার বাপের বাড়ি। আত্মীয়তার সূত্রে সবাই পরিচিত। বাবা ছিলেন শান্ত স্বভাবের, ভদ্র, পড়াশোনা জানা এক তরুণ। তাই বড় আম্মা নিজের দেওরের জন্য মায়ের কথা ভাবেন। তারপর দেখাশোনা হয়, কথাবার্তা চলে, আর এভাবেই একদিন তাঁদের বিয়ে হয়ে যায়।
 
ছোটবেলা থেকেই মাকে আমি দেখেছি এক অসম্ভব লড়াকু মানুষ হিসেবে। জীবনের কাছে তিনি কখনো সহজে হার মানেননি। দাঁতে দাঁত চেপে সংসারের সমস্ত ঝড় সামলেছেনঅভাব, অনটন, কষ্ট সবকিছুকে নিজের ভেতরে লুকিয়ে রেখে আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তাঁর মুখে কষ্টের শব্দ আমি খুব কমই শুনেছি, কিন্তু তাঁর ত্যাগের ছাপ ছড়িয়ে আছে আমার পুরো জীবনজুড়ে।
 
মনে পড়ে, আমি তখন খুব ছোট। আমাকে সাথে নিয়েই মা নামাজ পড়তেন। বাড়িতে আর কেউ ছিল না আমাকে দেখার মতো। বাবা ও দাদারা সবাই গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত। মা নামাজ পড়তেন আর আমি জায়নামাজের এধারওধার বসে খেলতাম। আর মা যখন সাজদায় যেতেন, আমি দৌড়ে গিয়ে তাঁর পিঠে চেপে বসতাম। ফলে মা দীর্ঘক্ষণ সাজদায় পড়ে থাকতেন। তিনি ভয় পেতেন, সাজদা থেকে মাথা তুললে পাছে যদি আমি পড়ে যাই! একজন মায়ের সাজদাও তখন সন্তানের নিরাপত্তার জন্য থমকে যেতো 
 
আরও মনে পড়ে, রাতের বেলা রান্নাঘরে মা রান্না করতেন, আর সেই রান্নার ফাঁকেই চলত আমার পড়াশোনা। কড়াইয়ে তরকারি ফুটছে, চুলোর আগুন লাল হয়ে জ্বলছে, আর মা আমাকে অ আ ক খশেখাচ্ছেন। স্লেটে লিখে দিয়ে তার উপর হাত বোলাতে বলছেন। কখনো ছড়া শোনাচ্ছেন—“আতা গাছে তোতা পাখি”, কখনো হাট্টিমাটিম টিম”, কখনো বা ঘরে আছে হুল বিড়াল কোমর বেঁধেছে”… বোধ করি, আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্কুল ছিল সেই মাটির রান্নাঘর, আর আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক আমার মা।
 
যখন আরও একটু বড় হলাম, তখন মা শুধু পড়াতেন না, নিয়ম করে লেখাতেনও। তাঁর নিজের পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি, কিন্তু আমার পড়াশোনার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহের কোনো কমতি ছিল না। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় তিনি আমাকে দোয়াদরূদ শেখাতেন ঘুমোতে যাওয়ার দোয়া, ঘুম থেকে ওঠার দোয়া, পেচ্ছাব-পায়খানায় যাওয়ার দোয়া, ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া, আয়াতুল কুরসি, আরও কতো কিছু। এভাবে অজান্তেই আমার ছোট্ট হৃদয়ের ভেতর তিনি ধর্ম, শিষ্টাচার জীবনের সৌন্দর্য বুনে দিতেন।
 
রমজান মাসে ভোরবেলা ফজরের নামাজের পর মা কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আমি তখন তাঁর পাশেই জায়নামাজের উপর বালিশ মাথায় ঘুমিয়ে থাকতাম। আধোঘুমে কুরআনের সেই সুরেলা তিলাওয়াত শুনতে শুনতে কখন যে সকাল হয়ে যেত, বুঝতেই পারতাম না। আজও মাঝেসাঝে, ফজরের পর কুরআনের তিলাওয়াত শুনলে আমার মনের আকাশে ভেসে ওঠে মায়ের সাদা ওড়না, ভোরের নরম আলো আর এক অপার্থিব প্রশান্তি।
 
তারপর, ১৯৯৫ সালের শেষের দিকে আমি হোস্টেলে চলে গেলাম। এই প্রথম মাকে ছেড়ে বাড়ির বাইরে থাকা। বুকের ভেতরটা যেন সবসময় খালি খালি লাগত। পৌনে দুমাস পর কুরবানির ছুটিতে বাড়ি ফিরলাম। বাড়িতে পৌঁছাতেই মা আমাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদে ফেললেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন— “এই প্রথম এক মাস তেইশ দিন মুই তোক ছাড়ি থাকিনু বাপ…”
 
সেই প্রকম্পিত কণ্ঠ আজও আমার কানে বাজে। তখন ঠিক মতো ঠাহর করতে পারিনি, কিন্তু আজ ভালোভাবেই বুঝি সন্তানের দূরত্বে শুধু সন্তানের কষ্ট হয় না, মা-বাবা বুকও সমান শূন্য হয়ে যায়।
 
আরও কবছর পরের কথা। রমজান ঈদের ছুটি শেষে আবার হোস্টেলে ফিরবো। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক দুশ্চিন্তা বাসা বেঁধেছেআমি তো চাষির ছেলে। অভাব-অনটন আমাদের নিত্যসঙ্গী। বাড়ি থেকে যে টাকা পেয়েছিলাম, তা দিয়ে বোর্ডিং ফি আর মাসের খরচ টেনেটুনে পার হবে কথা আমি যেমন বুঝছিলাম, মাও নিশ্চয়ই বুঝেছিলেন। তবে আমার কাছে শুনে নয়, আমার চোখের ভাষা পড়ে। মায়েরা বোধহয় এমনই, না বললেও সব বুঝে যা  
 
সেদিন বিকেলে বাড়ির ভেতরে হালকা ব্যস্ততা বিরাজ করছিলকেউ রান্নাঘরে, কেউ উঠোনে, কেউ বারান্দায়। মা নিঃশব্দে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন এক কোণেচারপাশে একবার তাকালেনকেউ দেখছে কি নাতারপর আলমারির ভেতর থেকে খুব যত্ন করে ভাঁজ করা একটা পুরনো কাপড় বের করলেন। কাপড়টার ভেতরে লুকানো ছিল কিছু টাকাসম্ভবত বহুদিন ধরে জমিয়ে রাখা তাঁর গোপন সঞ্চয়। হয়তো নিজের কোনো শখ বিসর্জন দিয়ে, হয়তো নতুন কাপড় না কিনে, হয়তো বা হাজারো ছোট ছোট ইচ্ছা চেপে রেখে জমিয়েছিলেন সেই টাকাগুলো। মা আস্তে করে টাকাগুলো আমার হাতে গুঁজে দিলেন। তারপর আমার হাতটা শক্ত করে ধরে নিচু স্বরে বললেন— “খবরদার, কাউকে বলবি নারেখে দে। কাজে লাগবে।
 
তারপর বহু বছর কেটে গেছে। কোথাও তুলাইয়ের পাড় ভেঙ্গেছে, তো কোথাও তার গতিপথই সংকুচিত হয়ে গেছে। সময়ের স্রোতে আমিও সংসারী হয়েছি। নিজের সন্তান, নিজের দায়িত্ব, জীবনের হিসাব-কেতাব সব মিলিয়ে আমিও এখন বুঝতে শিখে গেছি সংসারের বোঝা কাকে বলে। এবার ঈদের ছুটিতে বাড়ি গেছিলাম। একদিন রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে বাড়ির সবাই প্রায় ঘুমিয়ে গেছে। চারপাশ পুরো নিস্তব্ধদূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। আমি আর মা মুখোমুখি বসে গল্প করছি গ্রামের মানুষজন, আত্মীয়স্বজন, সংসারের টুকিটাকি হিসাব, পুরোনো দিনের স্মৃতি নানা বিষয় নিয়ে হঠাৎ মা জিজ্ঞেস করে বসলেন— “সাবাকে স্কুলে ভর্তি করাতে কতো টাকা লাগলো বাবু?”
আমি টাকার অঙ্কটা বললাম। মা মন দিয়ে শুনলেন। তারপর আবার জিজ্ঞেস করলেন— “মাসে মাসে ফি কতো?”
—“চার-সাড়ে চার হাজারের মতো।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার জিজ্ঞেস করলেন— “আর যাওয়া-আসা?”
আমি হেসে বললাম—“স্কুটি করে দিয়ে আসবো-নিয়ে আসবো, কখনো সাহানা গিয়ে নিয়ে আসবে
 
মা চুপ করে রইলেন। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছিলাম, ভেতরে ভেতরে কীসের যেন হিসেব কষছেন। কিছুক্ষণ পর ধীর এবং দৃঢ় কণ্ঠে বললেন— “আমাকে আর মাসে মাসে হাতখরচের টাকা দিতে হবে না।
আমি চমকে উঠলামলোকমুখে শুনেছিলাম, মায়েরা সন্তানের বোঝা সন্তানের অজান্তেই নিজের কাঁধে তুলে নেন, এ যেন ঠিক তেমনজিজ্ঞেস করলাম— “কিন্তু তোমার ওষুধপাতি?”
মা খুব সহজ গলায় বললেন— “সে চলে যাবে। তোমার এখন অনেক খরচ। সাবার স্কুল ফি, টিউশন, বইখাতা, জামাকাপড়আবার ওদিকে ফ্ল্যাটের ইএমআই…”
 
কথাগুলো তিনি এমনভাবে বলছিলেন, যেন তাঁর নিজের প্রয়োজন বলে কিছুই নেই। যেন সন্তানের কষ্ট একটু কমাতে পারাই তাঁর সবচেয়ে বড় শান্তি। আমি চুপচাপ বসে ছিলাম। বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে আসছিল। মা হয়তো আমার নীরবতা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই নিজে থেকেখোলাসা করলেন— “অনন্তপুর, মানে আমরা নানীর বাড়ির অংশ পেয়েছি। সেই বাবদ কিছু টাকা হাতে এসেছে…”
 
এই বলে তিনি আঁচলের ভাঁজ খুলে কিছু টাকা বের করলেন। তারপর টাকাগুলো আমার হাতে দিয়ে বললেন— “এই টাকাগুলো সাবার কোনো কাজে লাগাবে”  
জিজ্ঞেস করলামশুধু সাবাকে দিচ্ছো?
না, না। তাহিনা ও সাদিয়ার জন্যও দিয়েছি। 
 
আমি নির্বাক হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, সময় যেন হঠাৎ থেমে গেছে। যে মানুষটা সারাজীবন নিজের চাওয়া-পাওয়াগুলো চুপচাপ বিসর্জন দিয়ে এসেছেন, বয়সের এই পড়ন্ত বেলাতেও তিনি নিজের জন্য কিছু রাখলেন না। নানীর বাড়ির জমির অংশ থেকে পাওয়া টাকাটুকুও নিজের ওষুধ, নিজের প্রয়োজন কিংবা একটু স্বস্তির জন্য সম্পূর্ণ খরচ না করে নাতনিদের ভবিষ্যতের কথা ভাবলেন।
 
আরও মনে হলো, পৃথিবীতে মানামের মানুষগুলো বোধহয় এমনই হয়তারা কখনো সত্যিকার অর্থে বুড়ো হন না, কখনো নিজের কথা ভাবতে শেখেন না। সন্তানের কষ্ট কমানোর চিন্তাটাই তাদের জীবনের শেষ বয়সে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হয়ে থাকে। আমি টাকাগুলো হাতে নিয়ে বসে ছিলাম। আর মনে হচ্ছিল, এই কাগজের নোটগুলোর ওজন যেন আমার পক্ষে অসহনীয়; কারণ তাতে মিশে ছিল আমার মায়ের অতুলনীয় ত্যাগ, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা নিঃশব্দ আত্মদান।
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
১৪ মে ২০২৬

Saturday, 6 June 2026

খুদ্দার - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



আমাদের বাড়ি থেকে উত্তর দিকে কয়েকটা বাড়ি পেরোলেই ছোট্ট একটা মাটির বাড়ি চোখে পড়ে। খুবই সাধারণকিন্তু অদ্ভুত এক মায়া ও সম্ভ্রম জড়িয়ে আছে সেই বাড়িটাকে ঘিরে। একটা ছোট শোয়ার ঘর, তার সঙ্গে লাগোয়া টিনঢাকা বারান্দা। সামনে একচিলতে উঠোন। উঠোনের এক পাশে কঞ্চির বেড়া আর এসবেস্টাসের চালা দেওয়া ছোট্ট রান্নাঘর। একটু দূরে নির্মল বাংলা পায়খানা। বাহ্যিক দিক থেকে দেখলে মনে হবে, এ যেন গ্রামের আরও দশটা দরিদ্র ঘরের মতোই একটা ঘর। সেই ছোট্ট বাড়ির ভেতরে বাস করেন এক বিধবা মা ও তাঁর তালাকপ্রাপ্তা মেয়ে।
 
ভদ্রমহিলার নানা-মামুদের বাড়ি ছিল আমাদেরই গ্রামে। জয়বাংলার আগেই তাঁরা পূর্ব পাকিস্তান, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে চলে যান। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, জীবনের ঘুরপাকে একসময় তিনি বউ হয়ে আবার এই গ্রামেই ফিরে আসেনপ্রথম দিকে তাঁর জীবন মোটামুটি ভালোই চলছিল। স্বামী, সংসার, আর একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ছোট্ট সুখের পৃথিবী ছিল তাঁর। মেয়েটার জন্মের পর হয়তো তিনি আরও অনেক স্বপ্ন বুনেছিলেন। কিন্তু মানুষের জীবন তো সবসময় স্বপ্নের মতো চলে না।
 
কিছুদিন পর থেকেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নানা বিষয় নিয়ে অশান্তি শুরু হপ্রথমে ছোটখাটো মনোমালিন্য, তারপর ধীরে ধীরে তা ঝগড়া-বিবাদ তীব্র বাগবিতণ্ডা রূপ নিলএক পর্যায়ে তাঁর সেই সাজানো সংসার ভেঙ্গে গেলভেঙ্গে গেল তাঁর স্বপ্নের ঘর। কিছুদিন পর, তাঁর স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলেন। কিন্তু তিনি আর কখনো নতুন সংসারের কথা ভাবেননি। নিজের সারাটা জীবন উজাড় করে দিলেন একমাত্র মেয়ের জন্য। সামান্য আয়ের উপর ভর করে কষ্টে-সৃষ্টে মেয়েকে বড় করলেন, সময়মতো বিয়েও দিলেন।
 
কিন্তু নিয়তির নির্মমতা যেন তাঁদের পিছু ছাড়ল না। তাঁর একমাত্র মেয়ের সংসারটাও টিকল না। শেষ পর্যন্ত সে ফিরে এল মায়ের কাছে সেই ছোট্ট মাটির বাড়িতে আর মা ও মেয়ে দুজনে মিলে আবার নেমে পড়লেন জীবনযুদ্ধেমানুষের বাড়িতে টুকিটাকি কাজ করে দেন, কেউ ডাকলে সাহায্য করেন, কারো ঘরদোর লেপাপোঁছা করে দেন, কারো খইমুড়ি ভেজে দেন তাছাড়া দ্বিতীয় পক্ষের ছেলেরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী মাঝেমধ্যে কিছু সাহায্যসহযোগিতাও করে। এভাবেই টেনেটুনে কোনোরকমে তাঁদের দিন চলে যায়  
 
আমার জানা মতে, এত অভাব, এত কষ্টের মধ্যেও তিনি কোনোদিন কারও কাছে হাত পাতেননি। আমার দেখা সবচেয়ে সৎ, আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন আর খুদ্দার মানুষদের মধ্যে তিনি অন্যতম। কেউ আর্থিক সাহায্য করতে গেলে আগে জিজ্ঞেস করেন, “কী রকম দান?” যদি বলা হয় যাকাত বা সাদকার টাকা, সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাথা নাড়িয়ে বলেন— “এইলা আগুনের টাকা, মুই নিবা পারিবানু ভায়ামুই এতোটা অসহায় নাঁওজাকাত-সাদকা মোর নেওয়া জায়েজ হবানে 
 
কিন্তু কেউ যদি কখনো ভালোবেসে, সম্মান করে হাদিয়া বা উপহার হিসেবে কিছু দে, তখন তিনি হাসিমুখে তা গ্রহণ করেন। যেন কেবল সাহায্য নয়, সম্পর্কের উষ্ণতা তাঁর কাছে বড়।
 
রমজান শেষে আমি যখন বাড়ি যাই, তখন গ্রামের হকদার মানুষদের মাঝে আমার যৎসামান্য যাকাতের টাকা বিলি করি। কিন্তু তাঁর জন্য আলাদা করে কিছু টাকা রেখে দিই হাদিয়া হিসেবে। কারণ আমি জানি, তিনি যাকাতের টাকা নেবেন না। টাকা দেওয়ার সময় তিনি বারবার নিশ্চিত হতে চান। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করেন— “হাঁ ভায়া, মোক এইলা জাকাতের টাকা দেছি না তো?”
আমি শান্ত স্বরে বলি— “না বু, তোক মুই জাকাতের টাকা দেওনি। এইডা হাদিয়া, তোর নাগিন।
তখন তাঁর মুখে যে প্রশান্তির হাসি ফুটে ওঠে, তা ভাষায় প্রকাশ করতে আমি অক্ষম  
 
একবারের একটা ঘটনা মনে পড়ে। আমার এক ডাক্তার বন্ধু বিশেষ একটা নিয়েত করেছিলসে একজন সৎ, নামাজি, রোজাদার বিধবা মহিলার জন্য পানীয় জলের ব্যবস্থা করে দেবে, যেন তা তাঁর আমলনামায় সাদকায়ে জারিয়া অর্থাৎ অবিরত দান রূপে লেখা থাকেএকদিন সে আমাকে বলল— “ভাই, তোমাদের এলাকায় এমন কাউকে চিনলে বলো। টিউবওয়েল বসাতে যত খরচ হবে আমি দেবোশুধু মানুষটা যেন ভালো হয়, আল্লাহওয়ালা হয়, আর আমাদের জন্য মন খুলে দোয়া করে।
 
ছুটিতে বাড়ি গিয়ে আমি মাকে সব খুলে বললাম। মা এক মুহূর্ত দেরি না করে তাঁর কথাই বললেন— “তোর নুরবানু বু থেকে বেশি উপযুক্ত মানুষ এ এলাকায় আর একটাও নেই।
 
মায়ের কথা শুনে একদিন আমি তাঁর বাড়িতে গেলাম। তিনি আগের মতোই বারান্দায় একটা পাটি বিছিয়ে আমাকে বসতে দিলেন। কিছুক্ষণ গল্প করার পর সুযোগ বুঝে পুরো বিষয়টা খুলে বললাম। সব শুনে তিনি চুপ করে রইলেন। মুখে কোনো উচ্ছ্বাস নেই, কোনো লোভ নেই, বাড়তি কোনো আগ্রহও নেই। কিছুক্ষণ পরে ধীর গলায় বললেন— “ভায়া, তোর প্রস্তাবটা খুব ভালো। কিন্তু মুই তো এইডা নিবা পারিবানু
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম— “কেনে বু?”
তিনি আমাকে বাড়ির উত্তর পাশের বেড়ার কাছে নিয়ে গেলেন। সেখানে একটা টিউবওয়েল ছিল। সেটা দেখিয়ে বললেন— “মোর মাইজো বেটাটা এইডা বসেইছে। মোক কইছে, ‘তু এইডা ব্যবহার করিবুওরাও ব্যবহার করে, মোঁহোও করোঁতাইলে কেনে ফালতু আরেকডা টিউবওয়েল বসা? মোর কী দরকার? মোক না দি, অন্য কাকো দিলে বেশি ভালো হবি।
 
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কী গ্রাম, কী শহর অভাব মানুষকে কতটা নিচে নামাতে পারে, তার অজস্র নমুনা রোজই দেখি। কিন্তু অভাবের মধ্যেও কেউ কেউ নিজেদের মর্যাদাকে কতটা উঁচুতে তুলে রাখতে পারেন, সেটা সেদিন তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করেছিলাম। তাঁর সেই কথাগুলো শুনে মনে হয়েছিল, এই পৃথিবীতে এখনো কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের আত্মসম্মান ও জীবনবোধ অভাব, অনটন বা দারিদ্র্যের কাছে হেরে যায়নি কিছুক্ষণ পর, তাঁকে সালাম জানিয়ে তাঁর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। মনে হল, আমি যেন জীবনের এক গভীরতম শিক্ষা নিয়ে ফিরছি। সত্যি করে বললে, সেদিনই প্রথম খুদ্দারশব্দটার অর্থ গভীর ভাবে উপলব্ধি করেছিলাম; অভিধানের পাতা উল্টে নয়, একজন মানুষের জীবনাচার, আত্মমর্যাদাবোধ নীরব মহত্ত্বের ভেতর দিয়ে।
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
০৭ মে ২০২৬

Saturday, 16 May 2026

কুরবানি - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


কুরবানি আরবি শব্দ। এর অর্থ নৈকট্য লাভ, ত্যাগ, আত্মোৎসর্গ বলিদান। আমাদের উপমহাদেশে একে অনেকে বকরাঈদও বলেআবার কেউ কেউ ইদুজ্জোহাউচ্চারণ করে, যদিও শুদ্ধ উচ্চারণ হলো ঈদুল আজ্‌হাআমাদের দুটি প্রধান ধর্মীয় উৎসবের অন্যতম এই বকরাঈদ। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নবী ইবরাহীম (আঃ)এর সেই অনন্য আত্মত্যাগের স্মৃতি, যে স্মৃতি যুগ যুগ ধরে মানুষকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ ও উৎসর্গের পথে চলতে

 

আরবি ক্যালেন্ডারের দ্বাদশ মাস জিলহজ্জ-এর ১০ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত আমরা মুসলমানরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কুরবানি করি; কেউ উট, কেউ গরু, কেউ মোষ, কেউ ছাগল, তো কেউ ভেড়া, আবার কেউ দুম্বাইসলামে এমন ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যাতে আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল মানুষও এই আনন্দ ও ইবাদতে শরিক হতে পারেতাই একটা গরু বা মোষে সাত ভাগ এবং একটা উটে দশ ভাগ অর্থাৎ দশটা পরিবারের শরিক হওয়ার সুযোগ রয়েছেকুরবানির মাংস আমরা সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করিএক ভাগ নিজ পরিবারের জন্য রাখা হয় এক ভাগ আত্মীয়স্বজনদেদেওয়া হয়। আর এক ভাগ গরিব-দুঃখী ও পাড়াপড়শিদের মাঝে বিলিবণ্টন করা হয়। যেন ঈদের আনন্দ শুধু বিত্তবানদের ঘরে সীমাবদ্ধ না থেকে সবার দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়।

 

এক সময় আমাদের পরিবারে সদস্য সংখ্যা ছিল পাঁচবাবা-মা আর আমরা তিন ভাই। সেই সময় আমাদের বাড়িতে সাধারণত ছাগলই কুরবানি করা হতো। বোধ করি, তখন সেটাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংসারও বড় হতে লাগল। একে একে আমাদের সবার বিয়েশাদি হলো, ঘরে বাচ্চাকাচ্চা এল, পরিবারের সদস্যসংখ্যা বাড়ল। ফলে শুধু ছাগলে আর কুলিয়ে ওঠা যাচ্ছিল না। তাই ছাগলের পাশাপাশি একটা মাঝারী সাইজের গরু কুরবানি করা শুরু হল  

 

করোনা মহামারির এক-দুবছর আগের কথাকুরবানির কদিন আগে আমি কোলকাতা থেকে বাড়ি ফিরেছি। ততদিনে খাসি কেনা হয়ে গেছে, শুধু গরু কেনা বাকি। বিকেলে দাদা বললেনসাঁকোপাড়ায় একটা মাঝারি সাইজের আড়িয়ার খোঁজ আছে। দেখে ভালো লাগলে ওটাই ফাইনাল করতে হবে।  

 

পরের দিন সকালে তিন ভাই মিলে বেরিয়ে পড়লাম সাঁকোপাড়ার উদ্দেশ্যে গ্রামের এক প্রান্তে, মাটির উঠোনওয়ালা একটা ছোট্ট বাড়ি। সেই বাড়িতে থাকেন এক বৃদ্ধা ও তাঁর স্বামী তাঁদের দুই মেয়েবিয়ে হয়ে গেছে বহুদিন। সামান্য একটু জমিজমা আছে, তা চাষ করেন দুজনে মিলেসঙ্গে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পুষে কোনো রকমে সংসারের ঘানী টেনে চলেছেন। দাদাদের উনি আগে থেকেই চিনতেন। ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করলেন। তারপর আমাকে দেখিয়ে বড়দাকে প্রশ্ন করলেন এটা কে মামা?

দাদা হেসে বললেনআমার ছোট ভাই। কোলকাতায় থাকে। গতকালই বাড়ি এসেছে।  

 

অমনি বৃদ্ধা ছুটে এলেন আমার কাছে। যেন কোনো আপনজনকে ফিরে পেয়েছেন। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেনঅছিমদ্দিন দার তিনটা বেটা মুই জানক নাই। ওই দুজনক হামরা চিনেন বাপু। হাটবাজারত দেখাসাইক্ষাত হয়। কথাবাত্রা হয়। তোমাক হামরা চিনেন না মামা। এত্ত বড় মানুষ হই গেইছেন বাপু। ভগবান তোমাক আরও বড় মানুষ করৌক!

 

গ্রামের সহজ-সরল মানুষের এই আন্তরিক আশীর্বাদে বুকটা ভরে উঠল। গল্পের ফাঁকে গরুটা দেখালেনখুব বড় নয়, ছোটখাটো গড়নের। কিন্তু বেশ সুন্দর, ছিমছাম, শরীর ভর্তি মাংস, চকচকে গা, শান্ত দুটো চোখ। এক্কেবারে গুদুমগাদুম, নাদুসনুদুসপ্রথম দেখাতেই আমাদের সবার পছন্দ হয়ে গেল।

 

এরপর শুরু হলো দরদাম। উনার স্বামী বললেনসাড়ে ষোল হাজার দ্যান মামা।

মেজদা বললেনতেরো হাজার নেও জামাই

বৃদ্ধা তখন একরকম মিনতির সুরে বললেনমামা, সাড়ে চদ্দ হাজার দেও। এর কম দেন না। নাইলে বিপদত পড়ি যামো

 

কথাগুলো বলার সময় তাঁর কণ্ঠে এক অদ্ভুত উৎকণ্ঠার অনুরণন ছিল তাঁর স্বরে মিশে ছিল এক অসহায় কম্পন, যা সহজে উপেক্ষা করা যায় না। আমার মনে হল, এই টাকার সঙ্গে তাঁদের বেঁচে থাকার কোনো গভীর সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। তাই জিজ্ঞেস করে বসলামপিসি, কোনোকিছু হয়েছে?

বৃদ্ধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেনমামা, এনা বিপদত আছেন হামরা। পেটত কী বা হইছে বাপু। ডাক্তার অপারেশন করিবা কইছে। মেলায় খরচ। মেলা জাগাত ঘুরিনো। শেষে বাগডুমা ডাক্তারটার গড়ত গেইছোনো। খরচ মেলায়, তাও ওয় কমশমে করিবি। মোটমাট সাড়ে চইদ্দ হাজার।

আমি আবার জিজ্ঞেস করলামহাজিকুল দার সাথে সরাসরি কথা বলেছে?

না মামা, ওর বড় ভাইক ধইছেনেন। খরচ বিশ-বাইশ হাজার। হামার নাগিন কমেই সাড়ে চইদ্দ হাজার কইছে

 

শুনে বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল। মনে হল, এই গরুটা শুধু একটা পশু নয়এটা এই সংসারের দুঃসময়ের সঞ্চয়, হয়তো শেষ সম্বল। পকেট থেকে টাকা বের করে সাড়ে চৌদ্দ হাজার গুনে তাঁর হাতে দিলাম। তারপর আলাদা করে আরও পাঁচশো টাকা বাড়িয়ে দিয়ে বললামপিসি, এটা দিয়ে ফলমুল কিছু কিনে খাবেন।

 

টাকাগুলো হাতে নিতেই তাঁর চোখেমুখে এমন এক হাসি ফুটে উঠল, যা শব্দে ধারণ করা আমার পক্ষে অসম্ভবসেই হাসির ভেতর ছিল স্বস্তি, ছিল কৃতজ্ঞতা, আর ছিল অদ্ভুত এক বেদনা। যেন তিনি কিছুটা বাঁচার ভরসা পেলেন, একই সঙ্গে বুকের গভীরে কোথাও খুব কাছের কিছু হারানোর কষ্ট লুকিয়ে ছিল  

 

মি আর বেশি কথা বাড়ালাম না। মেজদা বাইক স্টার্ট দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, আমি উঠে বসলাম। আমরা বাইকে ফিরবো আর বড়দা গরুটাকে নিয়ে হেঁটে বাড়ি আসবেন। বাইকে ওঠার পর পিসিকে আসছিবলার জন্য একবার ফিরে তাকালাম। দেখলাম, পিসি গরুর দড়িটা বড়দার হাতে তুলে দিয়ে গরুটার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। গরুটাও কেমন উদাস হয়ে তাঁর শরীরের সঙ্গে সেঁটে দাঁড়িয়ে আছে। যেন সেও বুঝতে পারছে, এবার বিদায়ের পালা ঘনিয়ে এসেছে, ‘এবার যে যেতে হবে’! পিসির চোখ ছলছল করছে। ঠোঁট কাঁপছে। মুখে কোনো শব্দ নেই, সেই নীরবতার ভেতর যেন হাজারটা কান্না জমে আছে।

 

সেই দৃশ্য দেখে হঠাৎ মনে হলো, আমি যেন শরৎবাবুর আমিনা আর মহেশকে নিজের চোখের সামনে দেখছি বোধ করি, গ্রামের দরিদ্র-চাষি মানুষদের সঙ্গে তাদের গবাদিপশুর যে সম্পর্ক, তা শুধু অর্থের নয়, তা মায়া ও মমতার সম্পর্ক, স্নেহ ও ভালোবাসার সম্পর্ক। আর তাই ফিরতি পথে সারা রাস্তা জুড়ে মাথায় কেবল একটা জিনিসই কিলবিল করছিলজীবনে কতো জন যে কতো রকম ভাবে কুরবানি দেয়...!   

 

মোমিনপুর, কোলকাতা

০৮ মে ২০২৬