Pages

Wednesday, 8 July 2026

এক লা-জবাব পথ্য - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



পুরোনো বাড়ি ছেড়ে নতুন বাড়িতে এসে উঠেছি মাস ছয়েক হবে। নতুন বাড়ি মানেই তো নতুন করে গুছিয়ে নেওয়া জীবন, কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে তা হয়নি। নতুন ঘরদোরের তো কোন বালাই ছিল নাআগে যেগুলো আমাদের বৈঠকখানা ছিল, সেগুলোই আমাদের থাকার ঘর হল আর তার একটাতে আব্বা থাকতে আরম্ভ করলেন, একটাতে মা আমি, আরেকটাতে বড়দা ও মেজদা 
 
আষাঢ় মাসের দিন সবে পড়েছে। আকাশে-বাতাসে বর্ষার গন্ধ, মাটিতে সোঁদা সোঁদা আর্দ্রতা, আর আমার শরীরে সিজিনাল জ্বরের ছায়া। টানা দুদিনের প্রবল জ্বরে কাহিল হয়ে পড়েছিলাম। কখনো কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে, তো কখনো শরীর ভেঙে যাচ্ছে অবসাদে। ডাক্তার ওষুধ দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু সেই ওষুধ খেয়ে মুখ এমন তেঁতো হয়ে গেছিল যে জল পর্যন্ত গিলতে কষ্ট হচ্ছিল। সবকিছুই বিস্বাদ ও অরুচিকর ঠেকছিলজ্বর যেন শুধু শরীরকেই নাকাল করে দেয়নি, মুখের স্বাদও কেড়ে নিয়েছিল
 
সেদিন বিকেলে হঠাৎ করেই আকাশ কালো হয়ে এলো। দূরে কোথাও মেঘ গর্জাচ্ছেদাদারা তখন উঠোনে ছুটোছুটি করছে, গরু-ছাগলগুলোকে তাড়াতাড়ি গোয়ালে তুলতে হবে। মা ব্যস্ত হয়ে জ্বালুনখড়ি হেঁসেলে গুছিয়ে রাখছেন, বৃষ্টি নামলে আর বাইরে যাওয়া যাবে না। আর আমি তখন নিঢাল শরীর নিয়ে বাবার ঘরে শুয়ে আছি। মাথাটা পাথরের মতো ভার, শরীর জ্বরের আগুনে ঝলসে যাচ্ছে আর বাবা শিয়রে বসে আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।  
 
বাবার সেই হাতের স্পর্শ আজও যেন আমার কপালে লেগে আছে। কত মমতা, কত স্নেহ, কত নির্ভরতা ছিল সেই স্পর্শে! তিনি আমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে হজরত আইয়ুব (আঃ)-এর কাহিনি শোনাচ্ছিলেন। অসুস্থতার মধ্যেও বাবার কণ্ঠে গল্প শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, জ্বরের কষ্ট যেন একটু একটু করে কমে আসছে। হঠাৎ বাবা স্নেহমাখা গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
—“কিছু খাবে বাবুবলো কী খেতে ইচ্ছে করছে তোমার?”
আমি কষ্ট করে বললাম,
—“কিছুই ভালো লাগছে না, বাবাযা খাচ্ছি সবই কেমন তেঁতো লাগছে।
বাবা একটু ভেবে বললেন,
—“মিষ্টি খাবে? মজিদকে আনতে বলবো?”
আমি মাথা নেড়ে বললাম,
—“না বাবা, কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না।
বাবা তখন আরেকটু ঝুঁকে মমতা জড়ানো কণ্ঠে বললেন,
—“আচ্ছা, মাছ-ভাত খাবে?”
আমি যেন অনেক কষ্টে মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ইচ্ছেটুকু খুঁজে পেলামআস্তে করে বললাম,
—“মাগুর মাছ আর মুসুর ডালের বড়া খাবো, বাবা।
বাবা একগাল মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে ছিল আশ্বাস, ছিল স্নেহ, ছিল এমন এক নিশ্চিন্ততা, যেন আমি যা চাইছি, তা তিনি এনে দেবেনই। তিনি শুধু বললেন,
—“আচ্ছা।
 
কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। টিনের চাল, উঠোন, গাছের পাতা সব একসঙ্গে বৃষ্টির তালে মুখর হয়ে উঠল। বাবা একটি পাতলা খেন্দা মানে কাঁথা আমার গায়ে জড়িয়ে দিয়ে বললেন,
—“তুমি একটু ঘুমাও
 
এই বলে তিনি বাইরে চলে গেলেন। কখন যে বৃষ্টির শব্দে, শরীরের ক্লান্তিতে, আর বাবার হাতের উষ্ণতা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, তা টের পাইনি। ঘুম ভাঙল হৈহট্টগোল শুনেচোখ খুলে দেখি, চাদিক আবছা অন্ধকারে ঢেকে গেছে। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ঠিক তখনই বাতাস ভেদ করে মাগরিবের আজান ভেসে এলো। আমার সাড়া পেয়ে বাবা ঘরে ঢুকলেন। তাঁকে দেখে আমি অবাকভিজে একেবারে যবুথবু! গায়ের কাপড় চুপচুপে, চুল ভিজে কপালে লেগে আছে। কিন্তু তাঁর মুখে কী অপার উচ্ছ্বাস! একগাল হেসে বললেন,
—“বাবু, বাইরে আসো, দেখো কী কাণ্ড হয়েছে!
 
আমি কোনোরকমে উঠে বাইরে গেলাম। গিয়ে দেখি, একটা হাঁড়িতে অনেকগুলো মাগুর মাছ কিলবিল করছে। বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলাম,
—“বাবা, এতগুলো মাগুর মাছ! কোথায় পেলে?”
বাবা ছোট্ট ছেলের মতো আনন্দ নিয়ে বললেন,
—“আমি আর তোমার মেজদা পুন্যা দীঘির নালায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামায় মাছগুলো ডাঙায় উঠে আসছিল। আমরা জাল নিয়ে তৈরি ছিলামব্যাস, ধরতে শুরু করলাম!
আমি আরও কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
—“কতগুলো ধরলে, বাবা?”
বাবা হেসে বললেন,
—“ওই, চল্লিশটার মতো হবে। আমাদের মাছ ধরতে দেখে তোমার বারি দাগেছিল। ওকেটা দিয়েছি।
 
মাগরিবের নামাজ শেষে বাবা আদা-চা আর মুড়ি নিয়ে বসলেন। আমাকেও এক মুঠ করে মুড়ি খাইয়ে দিচ্ছিলেন। পাশাপাশি গল্প শোনাচ্ছিলেনঠাকুমার ঝুলি, শেয়াল পণ্ডিত, আরও নানা রকম মজার কাহিনি। জ্বরের ঘোরে, আধো ঘুমে-আধো জাগরণে আমি বাবার থেকে গল্প শুনছিলাম; মনে হচ্ছিল, বাইরের অন্ধকার, বৃষ্টি, জ্বর সবকিছুর ভেতরেও এক অদ্ভুত নিরাপদ আশ্রয়ে আছি আমি। সেই আশ্রয়ের নামবাবা।
 
ক’দিনের জ্বরে শরীরটা এক্কেবারে কাহিল হয়ে গেছিল। ফলে কিছুক্ষণ পর আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম, জানা নেই। হঠাৎ বাবার ডাকে ঘুম ভাঙল
—“বাবু, ওঠো, ভাত খাবে চলো তোমার মা তোমাদের জন্য খাবার নিয়ে বসে আছে
 
বাইরে তখন বেশ গাঢ় অন্ধকার। আমি উঠে কুলি করে, মুখে-হাতে জল দিয়ে হেঁশেলে গেলাম। গিয়ে দেখি, মা গরম গরম ভাত বেড়ে বসে আছেন। আমরা সবাই সার বেঁধে বসলামমা আর বাবার মাঝখানে আমি। মা বাটিতে করে আমার সামনে রাখলেন মাগুর মাছের মাথা, একটা গাদা আর ঝোল, সঙ্গে দুটো মুসুর ডালের বড়া আর একটা শুকনো বড়াসেই খাবার দেখে আমার চোখ-মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। যেন জ্বর, তেতো মুখ, অরুচি সব মুহূর্তে কোথা মিলিয়ে গেল!
 
খেতে শুরু করলাম। তিন-চার দিন পর সেদিনই প্রথম পেট ভরে ভাত খেলাম। গরম ভাতের সাথে মাগুর মাছের ঝোল, ডালের বড়া, কী সুস্বাদু! শেষে মাগুর মাছের মাথাটা খুব তৃপ্তি করে, তারিয়ে তারিয়ে খেলাম। আমার খাওয়া দেখে মা-বাবার মুখে যে আনন্দ ফুটে উঠেছিল, তা আজও চোখে ভাসে। মায়ের চোখ চিকচিক করে উঠেছিল; যেন আমার সুস্থ হয়ে ওঠার প্রথম আলামত দেখে তাঁর বুকটা হালকা হয়ে গেছিল। আর বাবা হয়তো মনে মনে ভাবছিলেন, তাঁর বৃষ্টিভেজা পরিশ্রম সার্থক হয়েছে অন্যদিকে আমার খাওয়া দেখে মেজদা খুনসুটির ভঙ্গিতে বলে উঠল,
—“এইলা, মিছামিছি জ্বর, মা! মাগুর মাছ দেখি ভালো হই গেল! খামাখা ডাক্তার দেখাবা হলি!
 
এই কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠল। আর আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে রইলামআজ বহু বছর পর ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, সেদিনের সেই আষাঢ়ের সন্ধ্যা আমার শৈশবের এক গভীর আশ্রয়ের স্মৃতি। সেখানে ছিল বাবার ভেজা কাপড়ে লুকিয়ে থাকা সীমাহীন ভালোবাসা, মায়ের নিঃশব্দ উদ্বেগ, দাদাদের হাসি-ঠাট্টা, আর এক অসুস্থ শিশুর মন ভালো করে দেওয়ার জন্য একটি পরিবারের সম্মিলিত প্রয়াস। আষাঢ়ের সেই বৃষ্টি, কিলবিল করা মাগুর মাছ, মায়ের হাতের গরম ভাত, আর বাবার বাবুডাক সব মিলিয়ে তা ছিল আমার জীবনের এক অমলিন, উষ্ণ, ভালোবাসায়-ভেজা সন্ধ্যা, যার পরশ এখনো হৃদয়ের কোণে কোথাও লেগে আছে।  
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
৪ জুলাই ২০২৬

Wednesday, 1 July 2026

পাগলি বেটি - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


 
আমাদের জীবনে কিছু মানুষ এমনও থাকেন, যাঁদের সঙ্গে রক্তের কোনো সম্পর্ক থাকে না, অথচ তাঁরা নিঃশব্দে হৃদয়ের গভীরে জায়গা দখল করে নেন। সময়ের স্রোত কত কিছুই না ভাসিয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু কিছু মুখ, কিছু হাসি, কিছু মুহূর্ত কখনো মুছে যায় না। আমার শৈশবের স্মৃতির পাতায় এমনই এক অমলিন নাম পাগলি বেটিতাঁর আসল নাম মোমেনা বেওয়া নিতান্তই সহজ-সরল, নিষ্পাপ মমতাময়ী একজন মানুষদারিদ্র্য ছিল তাঁর চিরসঙ্গী কিন্তু অভাব তাঁর সততা ও আত্মসম্মানকে কোনো দিন পরাজিত করতে পারেনি।
 
তাঁর স্বামীকে লোকে ডাকত আশি পাগলা নামে। তিনিও ছিলেন বেশ সহজ-সরল মানুষ অন্যদের সাহায্য করতে ভালোবাসতেন। জমিতে কাজ করা বা ভার বওয়া যে কাজই হোক না কেন, হাসিমুখে করতেন। সেবার নড়বড়িয়া শিবের মেলা বসেছে। অনেকেই দোকান নিয়ে যাচ্ছে, ব্যবসা করবে, কিছু মুনাফা কামাবেআশি পাগলা এক দোকানীর মালপত্র ভারে করে মেলায় নিয়ে গেলেন। ভেবেছিলেন, বিনিময়ে মিষ্টি খেতে পাবেন, হাতে দু-চারটা টাকাও আসবে। কিন্তু নিয়তি তাঁর জন্য অন্য গল্প লিখে রেখেছিল। প্রথম দিনেই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মেলা প্রাঙ্গণেই তিনি পৃথিবী ত্যাগ করলেন। যে ভারে করে অন্যের মাল বয়ে নিয়ে গেছিলেন, সেই ভারেই তাঁর নিথর দেহ ফিরে এল গ্রামে।
 
সেদিন থেকে পাগলি বেটির জীবন আরও কঠিন হয়ে গেল। লোকের বাড়িতে কাজ করে কোনোমতে তাঁর সংসার চলতআমার মা কোথাও গেলে আমাদের বাড়ির সব দায়িত্ব তাঁর হাতেই তুলে দিতেন। তাছাড়া রান্নাবান্নায় সাহায্য করা, ঘরের ছোটখাটো কাজ সামলানো, আমাকে আগলে রাখা সবই তিনি করতেনআমাকে নিজ সন্তানের মতো করে ভালোবাসতেন। প্রায়ই আমাকে সাথে করে তাঁর ছোট্ট কুঁড়েঘরে নিয়ে যেতেন। সেই ঘরে কোনো আসবাব ছিল না, ছিল না কোনো ঐশ্বর্য; ছিল শুধু দারিদ্র্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত উষ্ণতা।
 
একদিন আমি তাঁর উঠানে খেলা করছিহঠাৎ দেখি, তিনি একটা বাটিতে করে ধোঁয়া ওঠা সাদা সাদা কিছু খাচ্ছেন। দূর থেকে দেখে মনে হলো গরম দুধ! আমি দৌড়ে গিয়ে বললাম— “মহোঁ খাম বেটি!
তিনি মৃদু হেসে বললেন— “না বা, ইলা তোক খাবা হবানে
কিন্তু আমি ছিলাম জেদের রাজা। শেষ পর্যন্ত নিজের বাটি থেকে অন্য বাটিতে একটু ঢেলে আমার হাতে দিলেন। আমি এক চুমুক দিতেই মুখ বিকৃত হয়ে গেল, এ কেমন দুধ! আমার মুখ দেখে তিনি এমন প্রাণখোলা হাসি দিলেন, যা আজও আমার কানে বাজে। তারপর স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন— “ইলা দুধ না বা, মাড় ভোক লাগিছে তো, তার নাগিন ছাঁকি করে তাতে এনা নুন দি খাছেন হাঁরা
 
আরও একটা দিনের কথা খুব মনে পড়ে পাগলি বেটি নানাহারপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে যাবেন। আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় তিন-চার মাইল পথ। মূল উদ্দেশ্য, সেখানে বিনা পয়সায় ওষুধ পাওয়া যাবে আমি বায়না ধরলাম, আমিও যাব। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে আমাকে নিয়েই তিনি রওনা দিলেন। পথে কারও একটা বাড়িতে আমরা একটু বিশ্রাম নিলাম সময়ে পৌঁছে ডাক্তার দেখানো হলতারপর ওষুধ নিয়ে আবার হাঁটতে হাঁটতে বাড়িরথে  
 
মহিপালে এক দোকানের সামনে এসে আমার চোখ আটকে গেল একটা রঙিন বলে। শিশুমনের লোভ সামলাতে না পেরে কান্না শুরু করে দিলাম। আমার কান্না থামাতে পাগলি বেটি আমাকে বলটা কিনে দিলেন। তারপর আমলাপুকুরে তাঁর এক পরিচিত বাড়িতে দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরলাম।
 
পরদিন সকালে বলটা নিয়ে খেলা করছি। হেন সময়ে আমার এক দাদা বলটা নিয়ে একটা কিক মারতেই সেটা ফেটে গেল। তা দেখে আমি কান্না জুড়ে দিলাম। আমার কান্নায় পুরো বাড়ি মাথায় উঠল। খবর পাগলি বেটির কানে যেতেই তিনি দৌড়ে এলেন। আমাকে বুকে টেনে নিয়ে বললেনকান্দি না বা, মুই তোক আরও একটা বল কিনি দিম।
 
তুলাইর স্রোত মাঝেমধ্যে থেমে যায়। কিন্তু সময়ের নদী থেমে থাকে না। জীবনের পড়ন্ত প্রহরে এসে পাগলি বেটি দ্বিতীয়বার বিয়ে করলেন। আমাদের গ্রাম থেকে কিছুটা দূরের পৈনালা গ্রামের এক বয়স্ক মানুষকে অনেকেই তা ভালো চোখে দেখেনি। অনেকে তা নিয়ে ছিঃছাঃ করেছিল কিন্তু আমি কৌতূহল বশত একদিন তাঁকে পৈনালায় দেখতে গেলাম। ছোট্ট মাটির বাড়ি। সুন্দর করে লেপে-পুঁছে রাখা। তবে ঘরে আসবাবপত্র কিছুই নেইআমাকে দেখে তিনি বেজায় খুশী হলেন। ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন, নাশতা খাওয়ালেন। আমাদের গ্রাম ও লোকজন নিয়ে কত গল্প করলেন।
 
তার কয়েক বছর পর, পাগলি বেটি পৈনালা ছেড়ে পাকাপাকি ভাবে আমাদের গ্রামে চলে আসলেন। ওই বাড়িটা বিক্রি করে আমাদের গ্রামে জায়গা কিনে, তাতে কঞ্চির বেড়া আর খড়ের ছাউনি দিয়ে ছোট্ট একটি আশ্রয় গড়ে তুললেন। সেই কুটিরেই তাঁদের বেশ কটা বসন্ত ওভাবেই কেটে গেল। হঠাৎ একদিন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন এমন অসুস্থ যে নিজে উঠে বসতেও পারতেন না। তাঁর স্বামী সব করতেন। তাঁকে ধরে বসিয়ে দেওয়া, গোসল করানো, রান্নাবান্না করা, হাতে করে তাঁকে খাইয়ে দেওয়া, সবই করতেন নিঃশব্দে, ভালোবেসে।
 
খবর পেয়ে একদিন তাঁকে দেখতে গেলাম। সেদিন আমার কোমরে প্রচণ্ড ব্যথানিচে বসতে পারছিলাম না। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পাগলি বেটি অভিমান ও অনুযোগের স্বরে বললেন— “বসেক বা। কেনে বসি না তে? গরিব মানুষ মুই, এংকার করি বসি না নাকি?" কথাগুলো শুনে বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠেছিল। কিন্তু কোনো উত্তর দিইনি শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
 
পরবর্তীতে গ্রামের মানুষ কয়েকবার চাঁদা তুলে তাঁকে রায়গঞ্জ ও মালদায় ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেছিল। কিন্তু কোনো সুফল মেলেনি তাঁর স্বামী দিনভর অন্যের বাড়িতে কাজ করততারপর বাড়ি ফিরে রান্না করে তাঁকে খাইয়ে দিতগ্রামের মানুষও যে যার সাধ্যমতো সাহায্য করতো এভাবেই কাটছিল তাঁদের জীবন। একদিন ভোরে খবর এল, তাঁর স্বামী উঠোনের এক পাশে পড়ে আছে। গ্রামের মানুষ খবর পেয়ে ছুটে গেল। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।
 
দুপুর গড়িয়ে তাঁর কাফন-দাফন সম্পন্ন হল। তাঁর চলে যাওয়ার পর পাগলি বেটির ঠাই হল তাঁর এক নিকট আত্মিয়ের বাড়িতে, পার্শ্ববর্তী গ্রাম পাইটকাপুকুরেআমি কয়েক বার তাঁকে দেখতে যেতে চেয়েছি, কিন্তু মা কিছুতেই যেতে দেয়নি। শুনেছি, কেউ গেলে পাগলি বেটি ভীষণই রিয়েক্ট করতেন। খুব বাজে বাজে গালি দিতেন। হয়তো তাই মা আমাকে যেতে দেননি। পাগলি বেটির প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা কমে যাক, মা চাননি। হয়তো মা চেয়েছিলেন, পাগলি বেটি বেঁচে থাকুক আমার স্মৃতিতে, খড়ের ছাউনি দেওয়া ছোট্ট ঘর, ধোঁয়া ওঠা এক বাটি মাড়, দুটাকা দিয়ে কেনা রঙিন ফুটবল আর মায়াভরা সেই হাসি নিয়ে, বেঁচে থাকুক আজীবন সহাস্য বদনে!  
 
মোমিনপুর, কোলকাতা
১৫ জুন ২০২৬

Tuesday, 16 June 2026

প্রিয় দা’র ভেলকি - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



আমি তখন খুব ছোটসবে প্রাইমারিতে ভর্তি হয়েছি। চারপাশের পৃথিবীটাকে রোজ নতুন ভাবে আবিষ্কার করছিসেই সময় প্রিয় দা প্রস্তুতি নিচ্ছিল তার জীবনের এক বড় পরীক্ষার। প্রতিদিন ভোররাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রথম যে শব্দটা আমার কানে ভেসে আসতো, সেটা ছিল প্রিয় দার পড়ার আওয়াজ। তার ঘরের জানালাটা ছিল আমাদের উঠানের একেবারে গা ঘেঁষে, তাই তার জোরে জোরে পড়ার শব্দ সহজেই ভেসে আসত আমাদের ঘর পর্যন্তঅদ্ভুত এক ছন্দ ছিল সেই পড়ায়মনে হতো, শব্দগুলো যেন বইয়ের পাতা ছাড়িয়ে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
 
প্রিয় দার ভালো নাম প্রিয়নাথ সরকার কালু জ্যাঠুর ছোট ছেলে আমাদের ঘর-সংসারের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক বেশ গভীর। আমাদের বাড়ি, জমি, পুকুর, বসতভিটা, খামার সবই যেন একসুতোয় গাঁথা। এই ঘনিষ্ঠতার পেছনে আছে ইতিহাসের এক জটিল অধ্যায়। স্বাধীনতার পর, দেশভাগের সেই অস্থির সময়ে, এক্সচেঞ্জ পলিসির মাধ্যমে আমার বড় দাদু চলে যান পূর্ব পাকিস্তান অধুনা বাংলাদেশে। তাঁদের জায়াগায় গোপেশ জ্যাঠুরা এপারে চলে আসেন। আর আমরা হয়ে যাই একে অপরের আপনজন। তাই আমাদের হাসি-কান্না, উৎসব-অনুষ্ঠান সবকিছুই প্রায় একসাথে হতো  
 
প্রিয় দা রোজ ভোরে আওয়াজ করে পড়ত। সেই আওয়াজে ভোরের নীরবতা কেমন যেন জীবন্ত হয়ে উঠত। ঠিক তখনই বাবা আমাকে ঘুম থেকে তুলে দিতেন। মৃদু গলায় বলতেন, “দেখো, তোমার প্রিয় দা কত ভোরে উঠে পড়তে বসেছে। তুমিও ওঠো, পড়তে বসো।ঘুম জড়ানো চোখে আমি অবাক হয়ে শুনতাম সেই পড়ার শব্দ। কৌতূহলী হয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করতাম, “প্রিয় দা এত কী পড়ছে?” বাবা হেসে বলতেন, “ও এবার মাধ্যমিক দেবে।
 
মাধ্যমিকশব্দটা তখন আমার কাছে এক রহস্যের মতো ছিল। শুনেই আমি হা করে বসে থাকতাম। মনে মনে ভাবতাম, এ নিশ্চয় খুব কঠিন কিছুনা হলে কেউ কি আর এত ভোরে উঠে, এত মন দিয়ে পড়তে বসে! ছোট্ট মনে একটা অদ্ভুত শ্রদ্ধা আর বিস্ময় মিশে যেত প্রিয় দাকে ঘিরে।
 
প্রিয় দা আমাদেকে খুব ভালোবাসতোবাড়ির উঠোন থেকে শুরু করে খেলার মাঠ, এমনকি পাথারেও যখন গরু-ছাগল চরাতে যেতাম, সে আমাদের আগলে রাখত। মনে হতো, সে শুধু পাশের বাড়ির ছেলে নয়, আমাদের পরিবারেরই একজনরক্তের না হলেও হৃদয়ের সম্পর্কে বাঁধা। ছোটদের খেলাধুলায় ঝগড়াঝাটি, ঠেলাঠেলি, মারামারি লেগেই থাকে, আমাদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু যতবারই এমন কিছু ঘটত, প্রিয় দা ঢাল হয়ে দাঁড়াত আমাদের সামনে। ওর উপস্থিতি মানেই একটা ভরসাআমরা জানতাম, যা কিছুই হোক না, প্রিয় দা আছে।
 
আনন্দ দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রিয় দার জুড়ি ছিল না। সে, জোগাই দা, বাবলু কাকু, রবিউল দা, মোমেন দা সকলে মিলে আমাদের জন্য নানারকম খেলার আয়োজন করত। আমাদের ছোট্ট পৃথিবীটাকে রঙিন করে তুলত তাঁদের সহজ-সরল খেলাগুলো। প্রিয় দা নিজের হাতে আমাদেরকে তালপাতার নৌকা বানিয়ে দিত, আমরা সেগুলো পুকুরের জলে ভাসিয়ে দিতামনারকেল পাতা দিয়ে তার তৈরি ঘড়ি ও চশমা আমাদের কাছে ছিল অমূল্য ধন। সে কখনো থানকুনি পাতার গলার হার বানিয়ে দিত আমরা সেগুলো গলায় ঝুলিয়ে আনন্দে মেতে উঠতাম। ছোট ছোট এই সৃষ্টিগুলোই তখন আমাদের কাছে ছিল এক বিরাট বিস্ময়, এক অপরিসীম আনন্দের উৎস।
 
প্রিয় দা মাঝেমধ্যে ছোট ছোট ঢেপটিয়া সাপ পকেটে করে নিয়ে ঘুরে বেড়াতআর হঠাৎ আমাদের সামনে এসে পকেট থেকে সেগুলো বের করে খেলা দেখাত। আমরা হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতামভয়, কৌতূহল আর আনন্দ মিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি হতো মনে। তাছাড়া লাটিম খেলা অসাধারণ দক্ষতা ছিল তারলাটিম ছুঁড়ে দিয়ে সুতো টেনে সেটাকে নিজের হাতে এনে ঘোরাত, আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। ভাবতাম, নিশ্চয় সে জাদু জানে!
 
তারপর, জীবনের স্রোত আমাকে অন্য দিকে টেনে নিয়ে গেল পড়াশোনার জন্য আমি চলে গেলাম হোস্টেলেআমার বাড়িতে থাকা সীমিত হয়ে গেল ফলে আমার জীবন থেকে আগের মতো নির্ভার ও দৌড়ঝাঁপে ভরা দিনগুলো ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল। আর সময় তার নিজের নিয়মেই আমাকে বড় করে তুলল।
 
অন্যদিকে, প্রিয় দা’র জীবনেও কত কিছু বদলে গেল যথা সময়ে তার বিয়ে হয়ে গেএকদিন সে নিজেই আমাকে ডেকে বউদির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। লাজুক হাসি, নতুন সংসারের উষ্ণতা সব মিলিয়ে যেন এক শান্ত, স্বাভাবিক জীবনের ছবিকিছুদিন পর খবর এলো, তাদের ঘর আলো করে এসেছে এক ফুটফুটে মেয়ে। তিনজনের ছোট্ট সংসারআনন্দ, অভাব, হাসি, কষ্ট সবকিছু মিশিয়ে বেশ ভালোই চলছিল তাদের দিনকাল   
 
কিন্তু সুখের সেই ছবি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি প্রিয় দা জন্ডিসে আক্রান্ত হলগ্রামের মতো করেই তার চিকিৎসা চলতে লাগলোডাক্তার, কবিরাজ, ওষুধ-পানি, ঝাড়ফুঁক সবইকখনো একটু ভালো, আবার কিছুদিন পর আগের মতো খারাপ। এইভাবে প্রায় এক-দেড় বছর কেটে গেল।
 
তখন আমি কোলকাতায় পড়াশোনা করি ছুটিতে বাড়ি ফিরেছি। একদিন জানতে পারলাম, প্রিয় দার অবস্থা খুব ভালো নয়বিকেলে দেখতে গেলাম। যে মানুষটা একসময় আমাদের আগলে রাখত, হাসিখুশি, চঞ্চল আজ তার শরীরটা যেন কেবল হাড়গোড়ের একটা ছায়া। চোখেমুখে সেই চেনা দীপ্তি নেই। দৃশ্যটা দেখে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তবুও মনে আশা ছিল, হয়তো ভালো হয়ে যাবে, হয়তো আবার আগের মতোই প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠবে
 
কিন্তু না। পরের দিন সকালে, বেলা একটু গড়াতেই হঠাৎ কান্নার রোল উঠলআমরা সবাই ছুটে গেলাম। গিয়ে দেখি, সব শেষ। প্রিয় দা আর নেই। নিথর, নিশ্চুপ আমাদের ছেড়ে চলে গেছে চিরতরে। পাশে জ্যাঠিমা বসে আছেন, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন ছোট ছেলের নিথর দেহের দিকেচোখে জল নেই, কিন্তু সেই শূন্য দৃষ্টি যেন হাজারো অশ্রুর চেয়েও ভারী। বউদি ছোট্ট মনাকে কোলে নিয়ে বসে আছেএকেবারে স্তব্ধ, পাথরের মতো।
 
খবর পেয়ে পাশের বাড়ির তাপস দা ছুটে এলো। তাদের নিয়ম-রীতির অংশ হিসেবে, সে প্রিয় দার নিথর দেহের হাত-পায়ের হাড় ভেঙ্গে দিল। সেই দৃশ্য দেখে আমার বুকের ভেতরটা কেমন হু-হু করে উঠল অসহায় ও অস্থির বোধ করতে লাগলাম। বড় দা বুঝতে পেরে আমাকে টেনে বাইরে নিয়ে লেন। বেরিয়ে আসার মুহূর্তে, চোখের সামনে একে একে কতশত স্মৃতি ভেসে উঠলখেলার মাঠে আমাদের আগলে রাখা সেই ছায়ামূর্তি, তালপাতার নৌকা বানিয়ে দেওয়া সেই হাত, পকেট থেকে সাপ বের করে আমাদের চমকে দেওয়া সেই দুষ্টু হাসি, আর লাটিম ঘোরানোর সেই অবাক করা দক্ষতা। সবকিছু হঠাৎ করেই থেমে গেলপ্রিয় দা যেন এগিয়ে গেলেন, আর আমরা পিছনে পড়ে রইলাম।
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
২৩ এপ্রিল ২০২৬