Pages

Sunday, 27 September 2026

এক হাতে টর্চ, অন্য হাতে কোঁচা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



রাতের প্রথম প্রহর। চারদিক গভীর অন্ধকারে ডুবে। আকাশ ভেঙে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামছে। মুষলধার বৃষ্টির শব্দে চারপাশে যেন এক অদৃশ্য সুর বেজে চলেছে। সেই ভারী বর্ষণকে উপেক্ষা করে এক স্কুলপড়ুয়া কিশোর নিঃশব্দে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। এক হাতে তার কোঁচা, অন্য হাতে একটি টর্চ। গন্তব্য বাটুয়া দীঘির নালা। ধীরে ধীরে সে গিয়ে দাঁড়াল নালার মুখে। দেখল, বৃষ্টির জল পুকুরের পানিতে মিশে এক অন্য রকম আবহ তৈরি করেছে। নতুন জলের স্বাদ পেয়ে পুকুরের মাছেরা যেন উৎসবে মেতে উঠেছে। একে একে তারা গভীর জল ছেড়ে নালার দিকে উঠে আসছে।  
 
কিশোরটি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে মাছেদের খেলা। এক হাতে তার কোঁচা (যাকে বিভিন্ন অঞ্চলে টেঁটা, কোচ ও শলাকা বলা হয়), আর অন্য হাতে টর্চ। টর্চের আলোয় জলের বুক চিরে মাছেদের আসা-যাওয়া সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছে। কাছে আসা কয়েকটি মাগুরকে সাবধানে ধরে থলেতে ভরলো। মাছ ধরার আনন্দের চেয়েও তখন যেন তার কাছে বড় হয়ে উঠলো মাছেদের এই রহস্যময় জগৎকে কাছ থেকে দেখা।
 
এভাবে কেটে গেল প্রায় দেড়-দু ঘণ্টা। হঠাৎ সেই রাতটিকে আরও স্মরণীয় করে তুলল আরেক অতিথি। একটি মাছোয়া সাপ—সেও এসেছে তার রাতের শিকারে। অন্ধকারের মধ্যে নিঃশব্দে, ধীর শরীরে বেঁকে বেঁকে, সাপটি এগিয়ে এসে একসময় কিশোরটির ডান পায়ের উপর উঠে পড়ল। যখন সে টের পেল, মুহূর্তের জন্য তার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন হিম হয়ে গেল। সামান্য নড়াচড়া করলেই সাপটি ভয় পেয়ে যাবে; আর ভয় পেলেই ছোবল দেবে। তাই সে স্থির হয়ে গেল। একেবারে গাছের মতো। পাথরের মতো। নিঃশ্বাসটুকুও যেন হিসেব করে নিতে লাগল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ তার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। টর্চের আলোর প্রতিফলন যে দিকে পড়ছিল, সে লক্ষ করল—সাপটির দৃষ্টি সেদিকেই নিবদ্ধ। কিশোরটি খুব ধীরে, অত্যন্ত সাবধানে টর্চের আলো সরাতে শুরু করল। আলো একটু সরল। সাপটিও একটু সরল। আলো আরও দূরে গেল। সাপটিও তার পায়ের ওপর থেকে ধীরে ধীরে নেমে গেল। তারপর, আরও একটু দূরে, আরও একটু দূরে—শেষ পর্যন্ত অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
 
কিশোরটি তখনও ঠাই দাঁড়িয়ে। আরও কিছুক্ষণ সে মাছেদের সেই খেলা দেখল। তারপর থলেতে রাখা মাছগুলো নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো। তবে সে জানত না—সেই রাতে শুধু কয়েকটি মাছই তার থলেতে ওঠেনি; তার জীবনের ভেতরেও উঠে এসেছিল এক অদ্ভুত ভালোবাসা। মাছের প্রতি ভালোবাসা। জলের প্রতি ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসাই একদিন তাকে যে অনেক দূর নিয়ে যাবে—সে কথা তখনও সে জানত না।
 
পড়াশোনার জন্য একসময় তাকে পার্শ্ববর্তী ছোট্ট শহর কালিয়াগঞ্জে যেতে হলো। সেখানে একটি হিন্দু বাড়িতে ভাড়া থাকতে লাগলো। পড়াশোনার পাশাপাশি তার কৌতূহল তখন ক্রমশ এক অদ্ভুত দিকে মোড় নিতে লাগলো। অবসর পেলেই সে চলে যেত কাছের মাছবাজারে। কখনো মাছের আড়তে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখত মাছ ওঠানামা করছে, দরদাম হচ্ছে, ব্যবসায়ীরা হিসাব করছে। শুধু দেখা নয়—সে প্রশ্ন করত। এই মাছের দাম এত বেশি কেন? এই মাছের চাহিদা বেশি কেন? কোন মাছ কত দ্রুত বাড়ে? কোন মাছের খাদ্য কী? কোন মাছ কোথায় ভালো হয়? ইত্যাদি।
 
আড়তদারদের কাছ থেকে সে জানতে চাইত মাছের বাজার, দরদাম, মুনাফা—সবকিছু। মাছ বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে তাদের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার থেকেও সে শিখে নিত অজস্র কথা। আর যে বাড়িতে সে ভাড়া থাকত, সেই বাড়ির ভদ্রমহিলাকেও সে ছাড়ত না। সস্নেহে যাঁকে সে ‘জেঠিমা’ বলে ডাকত, তাঁর কাছেও ছিল তার অগণিত প্রশ্ন। কোন মাছ দিয়ে কোন পদ ভালো হয়? কীভাবে মাছ রান্না করলে স্বাদ বাড়ে? কোন মাছ কীভাবে পরিষ্কার করতে হয়? কোন মাছের সঙ্গে কোন মশলা মানায়? মাছ যেন তার কাছে শুধু একটি খাদ্য ছিল না। মাছ হয়ে উঠেছিল একটি বিস্তৃত জগৎ—যার মধ্যে বাজার আছে, বিজ্ঞান আছে, অর্থনীতি আছে, রান্না আছে, প্রকৃতি আছে; আর আছে মানুষের বহু পুরোনো জীবনযাত্রার ইতিহাস। তার কৌতূহল দিন দিন গভীরতর হতে লাগল।
 
গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে সে বাড়ি ফিরে এল। ফিরেই ভাবতে শুরু করল—নিজেদের পুকুরে মাছ চাষ করা যায় কি না। শুরু হলো ছোট্ট করে। নিজের পুকুরে টুকটাক মাছ চাষ। বইপত্র ঘাঁটা। অভিজ্ঞ মানুষদের সঙ্গে কথা বলা। মাছের খাদ্য, পানির গুণমান, পোনা ছাড়ার সময়, প্রজাতি নির্বাচন—সবকিছু বোঝার চেষ্টা। কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই সে বুঝে গেল—শুধু আগ্রহ দিয়ে মাছ চাষ করা যায় না। এর পেছনে বিজ্ঞান আছে, প্রযুক্তি আছে, নিয়ম আছে, গবেষণা আছে।
 
তখনই তার মনে হলো—মাছ নিয়ে আরও পড়াশোনা করা দরকার। শুরু হলো খোঁজখবর। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে বেড়ানো। তথ্য সংগ্রহ। নানা মানুষের সঙ্গে কথা বলা। অবশেষে জানতে পারল, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মৎস্যবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। সুযোগ পাওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু যে মানুষটির কাছে মাছ তখন আর নিছক শখ নয়, মাছ নেশা ও ভালোবাসা—তার কাছে কঠিন পথও তখন আর কঠিন হয়ে থাকল না।
 
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে শেষ পর্যন্ত সে সুযোগ পেল। প্রায় চার বছর কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে মাছ নিয়ে পড়াশোনা করল। তবে তার পড়াশোনার উদ্দেশ্য ছিল অন্যরকম। অন্যরা হয়তো ডিগ্রি নিয়ে চাকরির বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তার চোখে তখন চাকরি ছিল না। ছিল মাছ। ছিল মাছকে বোঝার চেষ্টা। ছিল মাছ চাষকে বৈজ্ঞানিকভাবে জানার আকাঙ্ক্ষা। মাছের বৈজ্ঞানিক নাম থেকে শুরু করে তাদের খাদ্যাভ্যাস, বৃদ্ধি, প্রজনন, জলজ পরিবেশ, চাষের আধুনিক পদ্ধতি—একটার পর একটা বিষয় সে শিখতে লাগল। সে পড়াশোনা করছিল চাকরি পাওয়ার জন্য নয়; শেখার জন্য। মাছকে ভালোবেসে। মাছ চাষকে ভালোবেসে। আর একদিন নিজের হাতে শেখা জ্ঞানকে মাটির সঙ্গে, জলের সঙ্গে, বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে—এই স্বপ্নে।
 
কোর্স শেষ হলো। সে আবার বাড়ি ফিরল। এবার আর আগের সেই তরুণটি নয়। এবার তার হাতে অভিজ্ঞতা, মাথায় বিজ্ঞান, আর বুকের মধ্যে বহুদিনের স্বপ্ন। নতুন উদ্যোগে শুরু হলো মাছ চাষ। প্রচলিত পদ্ধতির সঙ্গে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান মিলিয়ে একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে লাগল সে। মাছের খাবার নিয়ে ভাবল, পানির গুণমান নিয়ে পরীক্ষা করল, মাছের বৃদ্ধির হার পর্যবেক্ষণ করল। নিজের হাতে তৈরি করতে লাগল জৈব পদ্ধতিতে মাছের খাবার। কখনো নৌকা নিয়ে পুকুরের মাঝখানে চলে যেত। সেখান থেকে বিশেষ কৌশলে মাছের খাবার ছড়িয়ে দিত। আর মানুষ পাড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখত।
 
একসময় যে ছেলেটিকে মাছ ধরতে দেখে মানুষ বলত, নিছক শখের ছলে করছে; এবার সেই ছেলেটির কাজ দেখতে মানুষ আগ্রহ নিয়ে ভিড় করতে শুরু করল। তার পরিশ্রম ধীরে ধীরে ফল দিতে লাগল। অল্প সময়ে ছোট্ট কাতলা বড় হতে হতে চার-পাঁচ কিলোর মাছ হয়ে উঠতে লাগল। পুকুরে শুরু হলো চিতল মাছের চাষ। একেকটি চিতল দশ কিলো, বারো কিলো, পনেরো কিলো—এমনকি তারও বেশি ওজনের হতে লাগল। মাছ বড় হচ্ছে। উৎপাদন বাড়ছে। মুনাফা আসছে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে তার স্বপ্নও।
 
ঠিক তখনই তার সামনে এলো আরেকটি পথ। তার ডিগ্রি, ভালো ফলাফল এবং মৎস্যচাষে দক্ষতার কারণে চাকরির সুযোগ এল। বাড়ির লোকজন বোঝাতে লাগলেন— চাকরিটা নিয়ে নাও। স্থায়ী চাকরি। সম্মান আছে। নিরাপত্তা আছে। আত্মীয়স্বজন, পাড়াপড়শি এমনকি বন্ধুরাও বলল। কিন্তু সে রাজি হলো না। তার উত্তর ছিল একটাই— “আমি চাকরি করার জন্য এই ডিগ্রি করিনি।” আরও বলল, “আমি মাছকে ভালোবেসে এসব পড়াশোনা করেছি। মাছ চাষকে ভালোবেসে শিখেছি। আমি জানতে চেয়েছি, এই জ্ঞান দিয়ে নতুন কিছু করা যায় কি না। ডিগ্রিটা আমার কাছে চাকরির দরজা খোলার চাবি নয়; ডিগ্রিটা আমার শেখার পথ।” সে চাকরি নিল না। সবাই যখন নিরাপদ পথের দিকে যেতে বলছে, তখন সে বেছে নিল অনিশ্চিত পথকে। কারণ তার কাছে স্বপ্নের মূল্য চাকরির নিরাপত্তার চেয়েও বেশি।
 
তারপর শুরু হলো বিস্তারের গল্প। একটার পর একটা পুকুর। প্রথমে নিজের পুকুর। তারপর পাশের একটা। তারপর আরও একটা। প্রতি বছর নতুন পুকুর ইজারা নিতে লাগল সে। একসময় তার অধীনে প্রায় চল্লিশ হেক্টরের মতো জলাশয় চলে এল। তার মাছ চাষ তখন আর পারিবারিক পর্যায়ের কাজ নয়—একটি বড় উদ্যোগ। খবরের কাগজে তাকে নিয়ে লেখা শুরু হলো। ব্লক স্তর থেকে জেলা, জেলা থেকে রাজ্য—বিভিন্ন পর্যায়ে সে পুরস্কৃত হলো। মৎস্য দপ্তর তাকে উৎসাহ দিল। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সহায়তা এল। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ঋণের ব্যবস্থাও হলো।
 
সে আর থামল না। একসময় একে একে বড় বড় ঐতিহাসিক দিঘিও তার মাছ চাষের আওতায় এল—মহিপাল দিঘি, ঢোল দিঘি, কাল দিঘি, মালিয়ান দিঘির মতো বিশাল বিশাল জলাশয়। তার কাজ তখন শুধু ব্যবসায়ীদের চোখে নয়, বিজ্ঞানীদের চোখেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। বিভিন্ন মৎস্যবিজ্ঞানী তার চাষের পদ্ধতি দেখতে এলেন। তার কাজ নিয়ে গবেষণা হলো। কেউ প্রবন্ধ লিখলেন। কেউ তার পদ্ধতি নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেন। কেউ ব্যক্তিগতভাবে ডেকে তার অভিজ্ঞতা শুনলেন। একসময় যে ছেলেটি মাছ ধরতে গিয়ে মাছের দিকে তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত, তার মাছ চাষের পদ্ধতি নিয়ে বিজ্ঞানীরা আগ্রহী হয়ে উঠলেন। জীবন কখনো কখনো এভাবেই বৃত্ত সম্পূর্ণ করে।
 
কিন্তু তার স্বপ্ন এখানেই থেমে থাকেনি। বরং এখান থেকেই তার স্বপ্নের আরেকটি অধ্যায় শুরু হলো। সে বুঝতে পারল—একের পর এক পুকুর ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করা তার চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। তাই একসময় নতুন পুকুর ইজারা নেওয়া বন্ধ করে দিল। যে পুকুরগুলো আগে ইজারা নিয়েছিল, সেগুলোও ধীরে ধীরে ছেড়ে দিতে শুরু করল। মানুষ অবাক হলো। এত বড় ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছে, কেন?
 
কিন্তু সে জানত, সে পিছিয়ে যাচ্ছে না। সে এগিয়ে যাচ্ছে। নিজের স্বপ্নের দিকে। তুলাই নদীর তীরে ধীরে ধীরে জমি কিনতে শুরু করল। একসময় প্রায় সত্তর-বাহাত্তর বিঘার মতো বিশাল একটা প্লট তার মালিকানায় এলো। সেখানেই শুরু হলো নতুন স্বপ্নের নির্মাণ। জমি কেটে তৈরি হলো একাধিক পুকুর। প্রতিটি পুকুরে আলাদা আলাদা মাছ। কোথাও কই। কোথাও শিঙি। কোথাও মাগুর। কোথাও চিতল। কোথাও কাতল। কোথাও পাবদা। কোথাও ট্যাংরা। এক-একটা পুকুর যেন এক-একটা আলাদা গবেষণাগার। প্রতিটি জলাশয় যেন তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার নতুন পরীক্ষা।
 
তুলাই নদীর গা ঘেঁষে তৈরি করল বিশাল এক বাঁধ। সেই বাঁধ শুধু মাটির বাঁধ নয়—তার স্বপ্নেরও এক প্রান্তরেখা। বাঁধের গায়ে লাগালো নানা ধরনের সবজি। ফুলের গাছ। বিভিন্ন জাতের তুলসী। কালাইসহ নানা ধরনের গাছপালা। প্রতিটি পুকুরের পাড়েও লাগিয়েছে ছোট ছোট গাছ। জল আর মাটির মাঝখানে সে যেন তৈরি করেছে নিজের একটি সবুজ পৃথিবী। সন্ধ্যাবেলা সেখানে দাঁড়ালে মনে হয় অন্য এক জগতে চলে এসেছি। বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে। পেছনে বয়ে চলে তুলাই নদী। সূর্যের শেষ আলো এসে নদীর জলে মিশে যায়। জল তখন সোনালি হয়ে ওঠে। হালকা বাতাস বয়ে যায়। গাছের পাতাগুলো দুলতে থাকে। ফুলের গন্ধ বাতাসে মিশে যায়। আর সেই মানুষটি দাঁড়িয়ে থাকে বাঁধের ওপর। চোখের সামনে তার পুকুরগুলো। পেছনে নদী। চারদিকে সবুজ। মাঝখানে মাছের জলজ পৃথিবী। আর তার চোখের সামনে তখন বাস্তবের দৃশ্যের সঙ্গে মিশে যায় ভবিষ্যতের এক স্বপ্ন।
 
সে স্বপ্ন দেখে—একদিন হয়তো এই পুকুরগুলোকে আরও পরিকল্পিত আকারে সাজাবে। তুলাই নদীর জল একদিক দিয়ে এসে প্রবেশ করবে। নদীর স্বচ্ছ জল পুকুরগুলোর সঙ্গে মিশে যাবে। মাছেরা সেই জলে সাঁতার কাটবে। আর যখন জল অতিরিক্ত হয়ে উঠবে, অন্য দিক দিয়ে তা বেরিয়ে মিশে যাবে নদীর স্রোতে। নদী থেকে জল আসবে, পুকুরে মাছ বেড়ে উঠবে, অতিরিক্ত জল আবার নদীতে ফিরে যাবে—একটি স্বাভাবিক জলচক্রের মতো, প্রকৃতি আর বিজ্ঞান হাত ধরাধরি করে চলবে। এখনও সেই স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তব হয়নি। মাটি আছে। পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতা আছে। অনেক কাজ বাকি। কিন্তু স্বপ্ন তো সবসময় বাস্তবের আগে জন্ম নেয়।
 
আমি যখন তাকে নিয়ে ভাবি, কখনো কখনো মনে হয়, সেই বৃষ্টির রাতে পুকুরের নালায় দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরটি আর আজকের এই মানুষটি যেন একই মানুষ নয়। কিন্তু আসলে তারা একই। সেদিন তার এক হাতে ছিল কোঁচা, আর অন্য হাতে টর্চ। আজ এক হাতে বিজ্ঞান, অন্য হাতে স্বপ্ন। সেদিন সে মাছ ধরতে পুকুরের ধারে দাঁড়িয়েছিল। আজ সে মাছকে বাঁচিয়ে, মাছকে বুঝে, মাছকে ভালোবেসে একটি পৃথিবী গড়ে তুলেছে।
 
আজ যখন তুলাই নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সে তার পুকুরগুলোর দিকে তাকায়, তখন হয়তো তার চোখে শুধু মাছেদের নানা রকম ক্রীড়াকৌতুক দেখা যায় না। তখন তাঁর চোখে দেখা যায়—
বর্ষার সেই রাত।
টর্চের ক্ষীণ আলো।
পায়ের ওপর উঠে আসা এক বিষধর সাপ।
শহরের মাছবাজার।
আড়তদারদেরকে করা অজস্র প্রশ্ন।
জেঠিমার রান্নাঘর।
কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর।  
চাকরি ছেড়ে দেওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত।
ইজারা নেওয়া একের পর এক পুকুর।
পুরস্কার, সম্মান, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, বিজ্ঞানীদের আগ্রহ।
আর সবশেষে দেখা যায়—তুলাই নদীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক মাঝবয়সী মানুষকে, যে এখনও স্বপ্ন দেখে। কারণ অনেকে মাছ চাষ করে শুধু জীবিকা নির্বাহের জন্য। আর সে মাছ চাষ করে ভালোবেসে। তার কাছে পুকুর শুধু একটি জলাশয় নয়। মাছ কেবল উৎপাদনের জিনিস নয়। মাটি শুধু জমি নয়। আর নদী শুধুই নদী নয়। এসবই যেন তার জীবন। আর সেই জীবনের গভীরে, খুব গোপনে, আজও বৃষ্টিভেজা সেই রাতের কিশোরটি দাঁড়িয়ে আছে—এক হাতে কোঁচা ও অন্য হাতে টর্চ নিয়ে; জলের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে দেখছে, কী আশ্চর্য এক পৃথিবী তার সামনে ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে…  
 
সেদিনের সেই কিশোরটি আজকের পশ্চিমবঙ্গ খ্যাত মৎস্যচাষি, তুলাইয়ের তল্লাটে বেড়ে ওঠা এক কৃতি সন্তান— আনিসুর রহমান।
 
৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা

Monday, 21 September 2026

আমার ছোট ভাই - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 
শীত চলে গেছে—বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে। তবে বসন্ত তখনও এসে পৌঁছায়নি। ঋতুর খাতায় শীতের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার শেষটুকু যেন তখনও বাতাসের শরীরে লেগে আছে। ভোরের হাওয়ায় তখনও একটা হালকা শীতশীত ভাব, সকালের চাদরে তখনও কুয়াশার স্মৃতি আর নিস্তব্ধতার এক অদ্ভুত আবেশ। মনে হচ্ছিল, শীত বিদায় নিয়েছে বটে, কিন্তু যাওয়ার আগে তার কিছু স্মৃতি বাতাসের কাঁধে রেখে গেছে।
 
সেই রকমই এক কাকভোরে খাদেমুল দা বাড়ি থেকে বেরোলেন। ভোর তখনও পুরোপুরি ভোর হয়ে ওঠেনি। চারদিকের অন্ধকার ধীরে ধীরে পাতলা হচ্ছে, কিন্তু দিনের আলো তখনও দিগন্তের ওপারে। ঘরের মানুষজন ঘুমিয়ে। উঠোন নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও দু-একটা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। খাদেমুল দা চুপচাপ জামাকাপড় পরে নিলেন। সঙ্গে একটা ছোট্ট ব্যাগ, ব্যাগটা খুব ভারী নয়—তাতে প্রয়োজনের সামান্য কিছু জিনিস; আর কিছু অদৃশ্য চিন্তা সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
 
মোড়ে এসে দেখলেন, কয়েকজন মানুষ ইতিমধ্যে হাটাহাটি করছে। কেউ কাজে বেরোবে, কেউ হয়তো বাজারের দিকে যাবে। কিন্তু তখনকার দিনে এমন ভোরবেলায় যানবাহনের এত সহজলভ্যতা ছিল না। ইচ্ছা করলেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ি পাওয়া যেত না। তাই আগের রাতেই পাশের গ্রামের এক রিকশাওয়ালাকে বলে রেখেছিলেন। তবে তার আসতে একটু দেরি হচ্ছিল দেখে খাদেমুল দা অপেক্ষা করতে লাগলেন।
 
অবশেষে কিছুক্ষণ পর রিকশাওয়ালা এসে হাজির। খাদেমুল দা রিকশায় উঠলেন। রিকশা চলতে লাগলো। ভোরের ঠান্ডা বাতাস শিরশির করে যেন বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধছিল। রিকশার চাকার কর্‌কর্‌ শব্দে নিস্তব্ধ রাস্তা যেন ধীরে ধীরে জেগে উঠছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁরা পৌঁছে গেলেন মহিপাল বাসস্ট্যান্ডে। বাস ছাড়তে তখনও প্রায় কুড়ি মিনিট বাকি। এই সামান্য সময়টুকুও তিনি নষ্ট করতে চাইলেন না। তাই রিকশাওয়ালাকে সঙ্গে নিয়ে চায়ের দোকানে বসলেন। দু’জনের জন্য চা-বিস্কুট নিলেন। নিজেও খেলেন, রিকশাওয়ালাকেও খাওয়ালেন। তারপর তার প্রাপ্য ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে বললেন— হাঁ বো কাকা, তোরা এইবার বাড়িত যাও।
 
রিকশাওয়ালা চলে গেল। খাদেমুল দা বাসে উঠে জানালার ধারের একটা সিটে বসে পড়লেন। বাস ছাড়ল প্রায় দশ মিনিট দেরীতে। জানালার বাইরে তখন ভোরের আলো ধীরে ধীরে সকাল হয়ে উঠছে। পরিচিত গ্রাম, মাঠ, গাছপালা, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ—সবকিছু পেছনে পড়ে যাচ্ছে। খাদেমুল দা চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে সেসব দেখছিলেন। তাঁর এই যাত্রা কেবল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার যাত্রা ছিল না; এর মধ্যে ছিল দেখা করার আকাঙ্ক্ষা, কিছু কথা বলার প্রয়োজন, আর নিজের ভেতরে জমে থাকা কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা।
 
প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর বাস পৌঁছাল কুশমুণ্ডিতে। সেখানে নেমে তাঁর কিছু টুকিটাকি জরুরি কাজ ছিল। সেগুলো সেরে আবার একটা বাস ধরলেন। এবার গন্তব্য দোমোহনা। দোমোহনা থেকে ট্রেকার। তারপর ট্রেকার বদলে অবশেষে পৌঁছালেন গোয়ালপোখরে।
 
দীর্ঘ পথ। একের পর এক যানবাহন। একের পর এক রাস্তা। তবু খাদেমুল দা’র মনে কোনো ক্লান্তি ছিল না। কারণ মানুষের কোনো কোনো যাত্রা শরীরের ক্লান্তিকে অতিক্রম করে যায়—গন্তব্যের মানুষটি যখন হৃদয়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন পথের দূরত্ব আর দূরত্ব বলে মনে হয় না।
 
গোয়ালপোখরে তাঁর গন্তব্য ছিল অশোক দা’র বাড়ি। অশোক দা আমাদের এলাকার একজন কৃতী সন্তান। তখন তিনি মৎস্য দপ্তরের একজন কর্মরত অফিসার হিসেবে গোয়ালপোখরে পোস্টেড। আমাদের এলাকার তরুণদের কাছে তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণা। অনেকেই তাঁর কাছে পরামর্শ নিতে যেতেন। কারও পড়াশোনা নিয়ে সমস্যা, কারও চাকরি নিয়ে সংশয়, কারও ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধা—অশোক দা নিজের মতো করে সবাইকে কিছু না কিছু পথ দেখাতেন। শুধু উপদেশ দিতেন না, অনেক সময় পাশে দাঁড়াতেন, সাহস জোগাতেন, এবং সাহায্যও করতেন।
 
খাদেমুল দা’রও তাঁর সঙ্গে কিছু আলাপ-আলোচনা করার ছিল। আগেই কথা হয়েছিল। তাই গোয়ালপোখরে পৌঁছেই তিনি অশোক দা’র অফিসে গেলেন। কিন্তু অশোক দা’র তখন কিছু জরুরি কাজ চলছিল। তিনি বেয়ারাকে ডেকে খাদেমুল দা’কে বাইরে চা-বিস্কুট দিয়ে বসাতে বললেন; এবং বললেন, কাজ শেষ হলেই বেরিয়ে আসবেন।
 
খাদেমুল দা অপেক্ষা করতে লাগলেন। অবশেষে কাজ শেষ হলো। দু’জন একসঙ্গে অফিস থেকে বেরোলেন। ততক্ষণে দিনের আলো অনেকটাই ফুরিয়ে এসেছে। বাড়িতে বাড়িতে সন্ধ্যার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আর তাঁদের গ্রামের  বাড়ি তো গোয়ালপোখর থেকে অনেক দূরে। সেই রাতে খাদেমুল দা’র পক্ষে বাড়ি ফেরা যে সম্ভব নয়—এটা অশোক দাও ভালোভাবেই জানতেন। তাই খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললেন— “খাদেমুল, আজ তুমি আমার সঙ্গে চলো। রাতে আমার কাছেই থেকো। কাল সকালে বাড়ি চলে যেও।”
 
খাদেমুল দা আর কী করবেন! রাজি হয়ে গেলেন। অশোক দা যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন, সেটা ছিল একজন বয়স্ক মহিলার। মহিলা স্বভাবের দিক থেকে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। কিছু বিষয়ে তাঁর নিয়মকানুন ছিল বেশ কড়া। অশোক দা ব্যাপারটি জানতেন। তাই বাড়িতে ঢোকার আগে তিনি খাদেমুল দা’কে একটু সাবধান করে দিলেন। বললেন,
—“খাদেমুল, একটা কথা মনে রেখো। বাড়ির মালকিন ভদ্র মহিলা যদি তোমার নাম জিজ্ঞেস করেন, তুমি ‘খাদেমুল’ বলবে না। বলবে—অমল।”
খাদেমুল দা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারলেন না। কিছুক্ষণ অশোক দা’র মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন।
—“কেন?”
অশোক দা তখন বিস্তারিত কিছু বললেন না। শুধু বললেন,
—“ভেতরে গেলেই বুঝবে।”
অশোক দা এগিয়ে গিয়ে বেল বাজালেন। দরজা খুলেই ভদ্র মহিলা রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করলেন— এ কে, কী নাম?
—আমার ছোট ভাই, মাসিমা। ওর নাম অমল। 
 
তারপর তাঁরা বাড়িতে ঢুকলেন। সেই রাতটা সেখানেই কাটল। দু’জনে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করলেন। গল্পগুজব হলো। হাবিজাবি নানান রকমের আলাপআলোচনা হলো। আর এভাবেই দিনের ক্লান্তি ধীরে ধীরে কথার মধ্যে গলে যেতে থাকলো। কিন্তু খাদেমুল দা’র মনে তখনও একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—কেন নিজের নাম লুকিয়ে অন্য একটা নাম বলতে হলো? রাতে সুযোগ পেয়ে অশোক দা’কে জিজ্ঞেস করলেন—“আচ্ছা, আমার নামটা বদলে বলতে বললেন কেন?”
 
এবার অশোক দা একটু হেসে, একটু গম্ভীর হয়ে আসল কথাটা বললেন। ওই ভদ্র মহিলা শুচিবাইর শিকার। তোমার নাম যদি ‘খাদেমুল’ শুনতেন, তাহলে হয়তো তোমাকে ঘরেই ঢুকতে দিতেন না। শুধু তোমাকেই নয়—আমাকেও নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হতো। হয়তো তোমার সামনে এমন সব কাণ্ডকারখানা করতেন, যেগুলো তোমারও খারাপ লাগত, আমারও খারাপ লাগত। তাই তোমাকে আগে থেকেই সাবধান করে দিয়েছিলাম।”
 
খাদেমুল দা এবার ব্যাপারটা বুঝলেন। কিন্তু তাঁর ভেতরে যেন অন্যরকম একটা অনুভূতি জন্ম নিল। একজন মানুষকে তার নিজের নাম পর্যন্ত গোপন করতে হলো—শুধু একজনের বাড়িতে রাত কাটানোর জন্য! কী অদ্ভুত! একটা নাম—কখনও পরিচয়, কখনও পরিচয়ের বোঝা। একটা নাম—কখনও দরজা খুলে দেয়, আবার কখনও দরজা বন্ধও করে দেয়। মানুষের পরিচয় যে কত বিচিত্রভাবে মানুষের ভাগ্য, সম্পর্ক ও আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই রাতে খাদেমুল দা যেন তার একটা ছোট্ট উদাহরণ চোখের সামনে দেখতে পেলেন।
 
পরদিন সকালে খাদেমুল দা’র বাড়ি ফেরার কথা। অশোক দা তাঁকে একা ছেড়ে দিলেন না। সকালে একটু তাড়াতাড়িই বেরিয়ে তাঁকে নিজে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন। অশোক দা নিয়মিত যাতায়াত করতেন বলে সেখানকার স্টেট বাসের কন্ডাক্টারও তাঁকে চিনতেন। অশোক দা কন্ডাক্টারকে ডেকে বললেন— “কাকা, এ আমার ছোট ভাই। ওকে রায়গঞ্জে নামিয়ে দিও।”
 
খাদেমুল দা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। অশোক দা শুধু মুখে তাঁকে “ছোট ভাই” বলেই থেমে থাকলেন না। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে তাঁকে কিছু নাস্তা কিনে দিলেন, সঙ্গে পানির বোতলও। এমনকি তাঁর বাসভাড়াটাও কন্ডাক্টরের হাতে দিয়ে বললেন— “খেয়াল রেখো, আমার ছোট ভাই। রায়গঞ্জে ঠিকমতো নামিয়ে দেবে।”
 
বাস ছাড়ল। ধীরে ধীরে বাসের চাকা গড়াতে লাগলো। অশোক দা ঠাই দাঁড়িয়ে রইলেন বাসস্ট্যান্ডে যতক্ষণ না বাসটা তাঁর চোখের আড়ালে চলে যায়। আর ওদিকে খাদেমুল দা জানালার পাশের সিটে বসে তাকিয়ে ছিলেন। জানালার কাচের ওপারে অশোক দা’র অবয়ব ক্রমশ ছোট হয়ে আসতে লাগল। খাদেমুল দা অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর একসময় অশোক দা’কে আর দেখা গেল না। শুধু রয়ে গেল রাস্তা, রাস্তার ধুলো; আর বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি।
 
জানালার বাইরে দৃশ্য ক্রমশ বদলাচ্ছিল—মাঠ, গাছ, বাজার, পথের ধারের দোকান, মানুষের আসা-যাওয়া। কিন্তু তাঁর চোখ দুটো যেন বাইরের কোনো দৃশ্য দেখছিল না। তিনি ফিরে যাচ্ছিলেন বারবার রাত থেকে সকালের সফরে। একটা বাড়িতে ঢোকার জন্য তাঁকে নিজের নাম বদলাতে হয়েছিল। ‘খাদেমুল’ নামটি সেখানে যেন একটি অদৃশ্য দেওয়াল। অথচ সেই একই মানুষকে পরদিন আর একজন মানুষ সবার সামনে বললেন— “এ আমার ছোট ভাই।”
 
বাস তখন অনেক দূর চলে এসেছে। খাদেমুল দা ব্যাগ থেকে অশোক দা’র কিনে দেওয়া নাস্তাটুকু বের করলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলেন সেটার দিকে। সামান্য কিছু খাবার—তার দাম হয়তো খুব বেশি নয়। জলের বোতলটার দামও সামান্য। বাসভাড়াটুকুও এমন কিছু নয়, যা হিসাবের খাতায় বড় অঙ্ক হয়ে দাঁড়াবে। তবে সবটাই ভালোবেসে, সাচ্চা মন থেকে দেওয়া। একজন বড় ভাই হিসেবে ছোট ভাইকে দেওয়া। খাদেমুল দা ওই নাস্তা হাতে ক্ষণিকের জন্য চোখদুটো বন্ধ করলেন। মনের চোখ দিয়ে তখন তিনি যেন দেখতে পাচ্ছিলেন, ঘৃণা ও বিদ্বেষের রাত ধীরে ধীরে সরে গিয়ে ভোরের আলো ফুটছে।  
 
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা