Pages

Saturday, 10 October 2026

শৈশবের কুয়ো - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



দুপুরের রোদ একটু নরম হয়ে এসেছে। উঠোনের এক পাশে কুয়ো। কুয়োর পাড়ে রাখা লোহার বালতি, তার সঙ্গে বাঁধা মোটা দড়ি। চারপাশে এক ধরনের চেনা নীরবতা। মাঝে মাঝে ভেসে আসছে গরুর ঘণ্টার শব্দ, দূরে কোথাও লোকজনের হাঁকডাক, আর কুয়োর ভেতর থেকে উঠে আসছে ঠান্ডা জলের সোঁদা গন্ধ।
 
হঠাৎ মা কুয়োর দিকে এগিয়ে গেলেন। আমি তখন কাছেই কোথাও খেলছিলাম, বা কিছু একটা করছিলাম—সব ছেড়ে ছুটে গেলাম—“মা, জল তুলে দেব?” মা হয়তো কিছু বললেন, হয়তো বা বললেন, “থাক, আমি তুলছি।” কিন্তু ততক্ষণে আমার হাত বালতির দড়িতে। বালতিটা কুয়োর কালো মুখ দিয়ে নামছে। দড়িটা হাতের তালুর উপর দিয়ে পিছলে যাচ্ছে। নিচে তাকালাম, প্রথমে কিছুই দেখা গেল না। একটু পরে জলের উপর একটা ছোট্ট আলো কাঁপতে লাগলো। তারপর— ছপাৎ!
 
বালতিটা জলে ডুবে গেল। আমি দড়ি টেনে বুঝতে চেষ্টা করলাম, বালতি ভরেছে কি না। একটু পরেই দড়িটা ভারী হয়ে আসল। এবার আমার আসল কাজ শুরু। দু’ হাতে দড়ি ধরে টানছি। একবার। দু’বার। তিনবার। ধীরে ধীরে বালতি উপরে উঠছে। আর আমার হাত-পা যেন তার সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করছে। ছোট্ট শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দড়ি টানছি। কখনো দড়ি ধরে ঝুলে পড়ছি। পা মাটি থেকে উপরে উঠে যাচ্ছে, শরীরটা দোল খেতে থাকছে। তবু দড়ি ছাড়ছি না। মনে হচ্ছে, আমি যেন একাই একটা বিশাল ভারী জিনিস পৃথিবীর অন্তঃপুর থেকে টেনে তুলে আনছি। বালতি একটু একটু করে উপরে আসছে। আর তখন আমার চোখে কী আনন্দ!
 
কিন্তু সেই আনন্দেরও কখনো কখনো পরিণতি ভালো হতো না। বালতি প্রায় কুয়োর মুখের কাছে। আর একটু হলেই হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলব। ঠিক তখনই কোনোভাবে দড়িটা হাত থেকে ফসকে গেল। ছপাৎ! সব শেষ। এক মুহূর্তে বালতিটা আবার অন্ধকারের মধ্যে তলিয়ে গেল। আমি হতভম্ব হয়ে কুয়োর ভেতর তাকিয়ে আছি। নিচে শুধু কালো জল। বালতি নেই, দড়ি নেই—শুধু অন্ধকার। মনে হল, এতক্ষণ ধরে যে বালতিটাকে উপরে তুললাম, সে যেন আমাকে ফাঁকি দিয়ে আবার নিজের জগতে ফিরে গেল।
 
যতদূর মনে পড়ে, আমাদের শিশুবেলায় গ্রামেগঞ্জে জল নিয়ে লোকজনের এত বাছবিচার ছিল না। তৃষ্ণা পেলেই হল। সামনে নদী থাকলে নদীর জল, বিল থাকলে বিলের, খাল থাকলে খালের, পুকুর থাকলে পুকুরের। এমনকি ধানক্ষেতে কাজ করতে করতে ক্ষেতে জমে থাকা জলও কখনো দু হাতের আঁজলা ভরে খেয়ে নিয়েছি। তবে গ্রামের মানুষের সে-সময় পানীয় জলের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল কুয়ো।
 
আমাদের গ্রামের চারদিকে চারটা কুয়ো ছিল—উত্তর পাড়ায়, পশ্চিম পাড়ায়, বড়বাড়িয়ায় আর দক্ষিণ পাড়ায়। সকাল হলেই কুয়োর পাড়ে মানুষের আনাগোনা শুরু হয়ে যেত। কারও হাতে বালতি, কারও হাতে কলসি, কারও হাতে ঘটি। কেউ জল তুলছে রান্নার জন্য, কেউ গোসলের জন্য, কেউ গরু-ছাগলের জন্য। কেউ ওজুর জল নিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছে। কুয়োর পাড় যেন গ্রামের লোকেদের একটা ছোট্ট মিলনস্থল।
 
তাছাড়া গ্রামের গুটি কয়েক বাড়ির মতো আমাদের বাড়িতেও একটা নিজস্ব কুয়ো ছিল। আর সেই কুয়োটা ছিল আমার কাছে এক বিশাল রহস্যময় বস্তু।  কুয়োর ভেতরটা এত গভীর কেন? নিচে কতটা জল? বালতি যখন অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে যায়, তখন সেটা কোথায় যায়? জল ভরে উপরে ফিরে আসে কীভাবে?—শিশু মনে কত প্রশ্ন! আর সেই প্রশ্নের চেয়েও বড় ছিল কুয়ো থেকে নিজ হাতে জল তুলে আনার আনন্দ। আমি তক্কে তক্কে থাকতাম। মা বা বাবা কুয়োর দিকে গেলেই ছুটে যেতাম।
—“মা, তুমি সরে যাও, আমি তুলে দিচ্ছি।”
—“বাবা, তোমার জল লাগবে?”
উত্তরের অপেক্ষা করতাম না। যেন জল তোলা আমার জন্মগত দায়িত্ব।
 
কিন্তু কুয়োর সঙ্গে শুধু জল তোলার আনন্দই জড়িয়ে ছিল না; ছিল কোন কিছু হারিয়ে ফেলারও গ্লানি। কোনোদিন হাত ফসকে বালতি তলায় পড়ে যেতো। কোনোদিন গ্লাস। কখনো বাটি, কখনো মগ। একবার আমার হাত থেকে একটা চাকুও পড়ে গিয়েছিল। পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই কুয়োর পাড়ে এসে দাঁড়াত— “কীভাবে পড়ল?”, “কোন পাশে পড়েছে?”, “কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।”  
 
তারপর শুরু হতো খোঁজাখুঁজি। আমাদেরও একটা ‘কাকড়া’ ছিল—লোহার তৈরি এক অদ্ভুত যন্ত্র। দেখতে অনেকটা অঙ্কুশের মতো। চারদিকে ছোট ছোট বাঁকানো লোহার দাঁত। তার সঙ্গে বাঁধা লম্বা দড়ি। কাকড়াটা কুয়োর মধ্যে নামানো হতো। পাশ থেকে তখন লোকজনের শলাপরামর্শ— “ধীরে ধীরে”, “আরও নিচে”, “আরও একটু”, “একটু ডানে”।  
 
তারপর দড়ি ধরে সেটাকে জলের তলায় ঘোরানো হতো। আর উপস্থিত লোকজন বলাবলি করতো— “এইদিকে দাও।”, “না, আরেকটু বাঁদিকে।”, “আস্তে... আস্তে...” সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করত। হঠাৎ দড়িতে টান পড়লে মনে হতো—লেগেছে! তারপর ধীরে ধীরে দড়ি টেনে কাকড়াটা জলের উপরে তোলা হতো। যদি বালতির গায়ে তার কোনো দাঁত আটকে যায়, তাহলে যেন হারানো ধন ফিরে পাওয়া গেল। আর কুয়োর পাড়ে তখন ছোট্ট একটা উৎসবের আনন্দ।
 
তবে কাকড়া দিয়ে সবকিছু তোলা সম্ভব হতো না। তখন কুয়োর গভীরে নামতে হতো হারানো জিনিসের খোঁজে। আমাদের গ্রামেও কয়েকজন মানুষ ছিলেন, যারা জলের তলায় অনেকক্ষণ থাকতে পারতেন। তাঁরা যেন এক একজন ডুবুরি। কুয়োয় কোনো জিনিস পড়ে গেলে তাঁদের খবর দেওয়া হতো। তাঁরা এসে প্রথমে কুয়োর মুখের দিকে তাকাতেন। তারপর দড়ি কিংবা বাঁশের সাহায্যে ধীরে ধীরে নামতে শুরু করতেন। আমরা কুয়োর চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কারও চোখে ভয়। কারও চোখে কৌতূহল। আমি তো চোখের পলক ফেলতাম না।
 
লোকটা একটু একটু করে নিচে নামছেন। তারপর জলের কাছে পৌঁছে গেলেন। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর মাথাটা জলের নিচে অদৃশ্য। চারদিকে নিস্তব্ধতা। অপেক্ষা, ভয় ও কৌতূহল মিলেমিশে একাকার। সবাই মুখে বিড়বিড় করছে “আল্লাহ্‌ রহম করো, আল্লাহ্‌”। তারপর হঠাৎ জলের উপর বুদবুদ উঠতে শুরু করত। আমাদের বুকের ভেতর ধুকপুক। একটু পরেই লোকটা জলের উপর ভেসে উঠতেন। হাতে হয়তো সেই হারানো চাকু, মগ কিংবা অন্য কোনো জিনিস।
 
আমাদের চোখে তখন তিনি যেন কোনো সাধারণ মানুষ নন—একেবারে জলের তলা থেকে ফিরে আসা কোনো বীর।
এই কাজের বিনিময়ে তাঁদেরকে অনেক সময় এক-দুই কিলো চাল দেওয়া হতো। সেই চালই ছিল তাঁদের পারিশ্রমিক, তাঁদের হাদিয়া। আজকের দিনে ভাবলে অদ্ভুত লাগে, কিন্তু তখন এও ছিল গ্রামীণ জীবনের এক ধরনের পেশা।
 
আমাদের বাড়িতে তখন গরু-ছাগলের পাশাপাশি বিড়ালও ছিল অনেক। মেজদি ও ছোড়দি ভীষণ বিড়াল ভালোবাসত। তাদের কোলে নিত, খাওয়াত, গোসল করিয়ে দিত। বিড়ালগুলোও যেন বাড়ির সদস্য হয়ে উঠেছিল। সারাদিন উঠোনে তাদের ছোটাছুটি। কখনো একে অন্যকে তাড়া করছে। কখনো রোদে গা এলিয়ে শুয়ে আছে। কখনো আমাদের পায়ের কাছে এসে লেজ ঘষছে। কুয়োর পাড়টাও তাদের একটা খেলার জায়গা ছিল।
 
একদিন একটি বিড়াল হয়তো সেখানে খেলা করছিল। খেলতে খেলতে এপাশ থেকে ওপাশে লাফ দিতে গিয়ে কোনোভাবে কুয়োতে পড়ে যায়। আমরা কেউই তা টের পাইনি। বেলা গড়িয়ে যায়। তারপর বড়দা আসরের সময় ওজুর জন্য জল তুলতে এসে কুয়োর নিচে তাকিয়ে থমকে গেল—“আরে! কুয়োয় তো একটা বিড়াল!”
 
সবাই ছুটে এল। কুয়োর ভেতর তাকিয়ে দেখা গেল—জলের মধ্যে বিড়ালটি পড়ে আছে। বালতি নামিয়ে কোনোভাবে তাকে উপরে তোলা হলো। কিন্তু ততক্ষণে সে মারা গেছে। সেই মুহূর্তে কুয়োটা যেন হঠাৎ বিষণ্ণ হয়ে গেল। কারণ সেই জলই তো আমরা খাই। রান্না হয়। ওজু করি। ইমাম সাহেবকে খবর দেওয়া হলো। তিনি বিধান দেখে বললেন, বিড়ালটিকে কুয়ো থেকে তুলে ফেলতে হবে এবং চল্লিশ বালতি জল তুলে বাইরে ফেলে দিতে হবে।
 
তারপর গ্রামপঞ্চায়েতে খবর দেওয়া হলো। পঞ্চায়েতের লোকজন এলেন। কুয়োর জলে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দিলেন। কুয়োর চারপাশেও ছড়িয়ে দেওয়া হলো। তারপর যাওয়ার সময় তাঁরা বলে গেলেন, এক-দু’ দিন পর আবার জল ব্যবহার করা যাবে। দু’দিন পর আবার কুয়ো থেকে জল তোলা শুরু হলো। কিন্তু সেই জলে একটা আলাদা গন্ধ ছিল। ব্লিচিং পাউডারের তীব্র গন্ধ। জল হাতে নিলেই নাকে আসত সেই গন্ধ। তবু সেই জলই আমরা খেতাম। কারণ তখন আমাদের কাছে জল বেছে নেওয়ার এত সুযোগ ছিল না।
 
আজ এত বছর পর মনে হয়, সেই কুয়োগুলো শুধু জল ধরে রাখেনি—আমাদের শৈশবটাকেও যেন ধরে রেখেছিল। সেখানে দড়ি ছিল, বালতি ছিল, অন্ধকার ছিল, ঠান্ডা জল ছিল; আর ছিল আমাদের ছোট ছোট হাতের শক্তি পরীক্ষা, দড়ি ছুটে যাওয়ার ভয়, হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ার আনন্দ, ডুবুরি নামার উত্তেজনা, বিড়ালের জন্য মন খারাপ হয়ে যাওয়া—আরও ছিল মানুষের পরস্পরের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকার এক সরল পৃথিবী।
 
আজ আর কুয়োর পাশে দাঁড়ানোর বয়স আমাদের নেই। কুয়োর দড়ি ধরে ঝুলে পড়ার মতো ছোট্ট শরীরও নেই। তাছাড়া কুয়োগুলোও আর নেই। কোনোটা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, কোনোটা আগাছায় ঢেকে গেছে, কোনোটা জলের আধুনিক ব্যবস্থার কাছে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। নতুন ঘর বানাতে গিয়ে আমাদের কুয়োটাকে বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্মৃতির ভেতর কুয়োটা এখনও ঠিক আগের মতোই— রোদে তার পাড় গরম হচ্ছে। দড়ি ঝুলছে। বালতি নিচে নামছে। আমি ছোট্ট দু’ হাতে দড়িটা আঁকড়ে ধরে আছি। মা একটু দূরে দাঁড়িয়ে বলছেন— “আস্তে, পড়ে যাস না আবার!” আমি শুনছি না। আমার সমস্ত মনোযোগ বালতিতে। বালতি উঠছে। আরও একটু... আরও একটু... হঠাৎ দড়িটা আমার হাত থেকে ফসকে গেল—ছপাৎ! কুয়োর অন্ধকারে আবার হারিয়ে গেল বালতিটা। আমি কুয়োর মুখে ঝুঁকে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখছি, কুয়োর জলে কোথাও যেন শৈশবের দিনগুলো আবছা আলোয় ভাসছে।”
 
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মোমিনপুর, কোলকাতা

Wednesday, 7 October 2026

শিকড় থেকে শিখরে - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামার উপক্রম। আমবাগানের গাছপালার ফাঁক দিয়ে রোদের তেজ ধীরে ধীরে কমে আসছে। সারাদিনের খাটাখাটুনিতে ক্লান্ত চার-পাঁচজন শ্রমিক আপনমনে কাজ করে চলেছেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাঁদের কথাবার্তাও চলছে—সংসার, ছেলেমেয়ে, অভাব-অনটন, দেনা-পাওনা, ভবিষ্যৎ ভাবনা নানা বিষয়ে। কথাগুলো হয়তো খুব সাধারণ, কিন্তু প্রতিটি শব্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে জীবনের না-বলা কষ্ট, দীর্ঘশ্বাস ও অপূর্ণতার গল্প। তারই এক ফাঁকে একজন বলে উঠল—
—“হামার বাড়িত আইজ রান্না করিবার মতোন এক মুঠ চাউলও নাই। মহাজন টাকা দিলে চাউল কিনি বাড়িত নিযাম।”  
 
কথাটি তিনি খুব স্বাভাবিকভাবেই বলেছিলেন। আসলে অভাবের সঙ্গে দীর্ঘদিন বসবাস করতে করতে মানুষ নিজের দুঃখকেও খুব সহজভাবে বলতে শিখে যায়। কিন্তু তাঁর সেই কথা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোরের হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে গেল। কিশোরটি ছিল অল্পবয়সি, স্কুলপড়ুয়া। ঘটনাচক্রে সে ছিল ওই আমবাগানের মালিক পরিবারের সন্তান। বয়সে ছোট, কিন্তু তার হৃদয় যেন বয়সের চেয়ে অনেক বড়।
 
গত জুম’আর খুতবায় ইমাম সাহেব বলেছিলেন, “আপনি মোরগ-পোলাও চিবোতে চিবোতে লম্বা লম্বা ঢেকুর তুলেন; আর আপনার পাশের বাড়িতে অভাবে উনুন জ্বলে না, এই আপনার ,মুসলমানিত্ব”—সেই কথা মনে পড়তেই তার গা কাঁটা দিয়ে উঠলো। বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা নামার পালা। শ্রমিকেরা এবার কাজ গুটিয়ে বাড়ি ফিরবেন, ছেলেটি বাড়ির দিকে ছুটে গেল। হেঁসেল থেকে কিছু চাল বের করে একটা গামছায় মুড়ে ছোট্ট একটা পুঁটলি বানাল। তারপর এক মুহূর্তও দেরি না করে পুঁটলি হাতে ছুটল আমবাগানের দিকে। সোজা গিয়ে দাঁড়াল সেই দিনমজুরের সামনে। পুঁটলিটা তাঁর হাতে দিয়ে বলল,
—“কাকা বো, এই চাউললা বাড়িত নি যাও। আইজ রাইতে আন্ধি করে বাড়ির সবাই মিলি পেট ভরি ভাত খাবেন। আর কুনোদিন যুদি এইরম পরিস্থিতি হয়, তাইলে হামার বাড়িত চলি আসিবেন। চাইরটা ভাতের ব্যবস্থা হাঁরা করি দিমোঁ।”  
 
তাঁদের পরিবার ছিল জমিদার-গোছের। এলাকায় তাঁদের প্রচুর জমিজমা ছিল—চৌষা থেকে পুকুরপাড়া পর্যন্ত। লোকজন সেই জমি ইজারা নিত, কেউ ভাগে চাষ করত, কেউ আধিতো। এলাকায় তাঁদের বেশ নামডাক ছিল। বিপদে-আপদে লোকজন সাহায্যের জন্য তাঁদের কাছে ছুটে যেতো। তাই খুব কাছ থেকে সে লোকজনের অভাব-অনটন, দুঃখ-কষ্ট দেখার সুযোগ পেয়েছিল। ফলে ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে জন্ম নিয়েছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক সহজাত প্রবণতা।  
 
তারপর সময় এগিয়ে চলল নিজ নিয়মে। বহু বর্ষা বয়ে গেলো তুলাইয়ের স্রোতে। ছেলেটি ধীরে ধীরে বড় হলো। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দিল মালদায়। কয়েক বছর সেখানে পড়াশোনা করল। তারপর ডিগ্রি সম্পন্ন করে যখন নিজের গ্রামে ফিরে এল, তখন তার সামনে জীবনের এক জটিল প্রশ্ন—এবার কী করবে?
 
সেই সময় সে দেখল—গ্রামের মানুষদেরকে চাল-ডাল, তেল-নুন, মশলাপাতি, সাবান সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে সাপ্তাহিক হাটের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের এই অপেক্ষায় শুধু অসুবিধাই হয় না; বরং দূরত্ব, সময়, দাম এবং প্রাপ্যতার কারণেও তাঁদের নানান সমস্যায় পড়তে হয়।  
 
সে সিদ্ধান্ত নিল—কদমডাঙ্গা মোড়ে একটা বড় মুদিখানার দোকান করবে। এমন একটা দোকান, যেখানে একসঙ্গে চাল-ডাল থেকে শুরু করে তেল, মশলা, সাবান—প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই পাওয়া যাবে। ব্যবসার পাশাপাশি, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস যেন গ্রামের মানুষ হাতের নাগালে পায় এবং ন্যায্য মূল্যে পায়—সেই চেষ্টা থেকেই শুরু হলো তার মুদিখানার ব্যবসা।
 
গ্রামীণ সমাজে কেউ নতুন কিছু করলে যা হয়, তা-ই হলো—সমালোচনা, মন্তব্য, টিটকারি কতকিছু। কেউ কটাক্ষ করে বলল—এসব করার কী দরকার! কিন্তু সে থামল না। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে কাজ করে যেতে লাগল। পাশাপাশি, তাকে পেয়ে বসলো সমাজসেবার নেশা—অসুস্থ মানুষকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া, প্রয়োজনে হাসপাতালে ছুটে যাওয়া, কাউকে ভর্তি করানোর জন্য ছোটাছুটি করা, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার বিষয়ে পরিবারকে সচেতন করা, মানুষকে শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানো ইত্যাদি।
 
মানুষের জন্য সময় দিতে গিয়ে দোকানে সময় দেওয়া কমে গেলো। ফলে তার ব্যবসা স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হলো। কিন্তু জীবনের কিছু ক্ষতি কখনো কখনো অন্য এক ধরনের প্রাপ্তির দরজা খুলে দেয়। মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে তার পরিচিতি বাড়তে লাগল। নানা শ্রেণি, নানা পেশার মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হলো। মানুষ কাছ থেকে তাকে চিনতে শুরু করল। ধীরে ধীরে সেই পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ল। একসময় সেই পরিচয়ের সূত্র ধরেই বিভিন্ন পরিবার থেকে তার জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসতে শুরু করল। শেষে প্রাণসাগরের এক ভদ্রলোক নিজ মেয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠালেন। মেয়েটি শিক্ষিত, চাকরিজীবী। দুই পরিবারের মধ্যে কথাবার্তা হলো, জানাশোনা হলো, ধীরে ধীরে সম্পর্কটি বিবাহবন্ধনে পরিণত হলো।
 
বিয়ের পর তাঁর জীবন এক নতুন পথে বাঁক নিল। স্ত্রীর কর্মস্থলের দরুন তাকে নিজ এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হলো। ফলে মুদিখানার ব্যবসাও ছাড়তে হল। কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নেশা তিনি ছাড়লেন না। বরং নতুন জায়গায় গিয়ে মানুষের সঙ্গে মেলামিশা করে, তাঁদের জীবনযাপন দেখে তাঁর মনে জন্ম নিল—একটা স্কুল গড়ার স্বপ্ন। অতঃপর ২০০১ সালে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন শুরু হলো। শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠা তিনি করলেন বেস আন-নূর মডেল স্কুল।
 
শুরুটা ছিল খুব ছোট পরিসরে। প্রি-নার্সারি, নার্সারি—এই কয়েকটা ক্লাস দিয়ে। কিন্তু স্বপ্ন যখন বড় হয়, তখন ছোট্ট পরিসর বেশিদিন ছোট থাকে না। ধীরে ধীরে স্কুলের পরিধি বাড়ল। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থাও চালু হলো। সেখানকার ছাত্ররা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ভালো স্কুলে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পড়ার সুযোগ পেল।
 
ছোট্ট একটা স্বপ্ন ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। অনেকেই তাঁর সঙ্গে যুক্ত হলেন, স্কুল গড়ে তোলার কাজে অংশ নিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিন্তার পার্থক্য, মতের অমিল—এসবও সামনে এল। একসময় অনেকেই আলাদা পথে চলে গেলেন। ফলে নানা ধরণের সংকট তৈরি হল। কিন্তু তিনি দমে গেলেন না, শক্ত হাতে স্কুলটির হাল ধরলেন। লড়াই জারি রাখলেন। রাতদিন এক করে দিলেন। একের পর এক প্রতিকূলতাকে ডিঙিয়ে নিজ লক্ষ্যে অবিচল থাকলেন।  
 
নার্সারি থেকে শুরু হওয়া সেই প্রতিষ্ঠান বড় হতে হতে একসময় মাধ্যমিক হলো, তারপর উচ্চমাধ্যমিক। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদের জন্য আলাদা শাখা প্রতিষ্ঠিত হলো। কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হলো। পরবর্তীতে বিভিন্ন জেলায় তার শাখা গড়ে উঠতে শুরু করল। আর আজ সেই প্রতিষ্ঠান উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা-পরিসরেও তার একটা উল্লেখযোগ্য স্থান তৈরি হয়েছে।
 
কিন্তু তাঁর স্বপ্ন শুধু শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে থাকেনি। শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও নানা উদ্যোগ নিয়ে চলেছেন তিনি। ঈদ মিলন অনুষ্ঠান, শীতকালে দরিদ্র মানুষদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ, আর্ত ও পীড়িত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো, শিকড়ের টানে গ্রামে ফিরে এলাকাবাসীর সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়া, বন্যা কিংবা অন্য কোনো দুর্যোগে পাশে দাঁড়ানো। এর পাশাপাশি শুরু হল বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক চর্চা। মানুষের মধ্যে নতুন চিন্তা, নতুন চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া; প্রচলিত সামাজিক চিন্তাভাবনাকে কখনও প্রশ্ন করা; সমাজকে আরও মানবিক, শিক্ষিত ও সচেতন পথে এগিয়ে দেওয়া ইত্যাদি।  
 
কিছুদিন আগে, হরিপুরে গার্লস শাখার নতুন ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছিল। প্রচণ্ড রোদ সেদিন। মাথার উপর যেন আগুন ঝরছে। ছাদে রড বাঁধার কাজে ব্যস্ত শ্রমিক ও মিস্ত্রিরা। তীব্র গরমে তারা দরদর করে ঘামছে। তাঁদের শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। তিনি নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কাজকর্ম তদারকির উদ্দেশ্যে একসময় ছাদে উঠলেন। দেখলেন, ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়েও সেই গরম সহ্য করা যাচ্ছে না। অথচ শ্রমিকেরা ছাতা ছাড়াই সেই প্রখর রোদে কাজ করে চলেছেন। বিষয়টি তাঁর মনকে ব্যথিত করল। দ্রুত নিচে নেমে স্কুলের কর্মচারীদের বললেন, শরবতের ব্যবস্থা করতে।
 
গুলকন্ডি ইত্যাদি দিয়ে শরবত তৈরি করা হলো। অন্য কাউকে দিয়ে সেই শরবত তিনি অনায়াসে উপরে পাঠিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তা করলেন না। নিজেই শরবতের বালতি হাতে নিয়ে ছাদে উঠলেন। একে একে শ্রমিক, মিস্ত্রি ও কর্মচারীদের নিজ হাতে শরবত পান করালেন।
 
দৃশ্যটা হয়তো খুব সাধারণ। কিন্তু এই সামান্য দৃশ্যের মধ্যেই যেন বহু বছরের একটা কাহিনী লুকিয়ে আছে। সেদিন আমবাগানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কিশোরের হাতে ছিল এক পুঁটলি চাল আর আজ এত বছর পরে, সেই একই মানুষ নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন এক বালতি শরবত। সময় ও জায়গা বদলেছে। পরিস্থিতিও বদলেছে। ছোট্ট আমবাগানের জায়গায় এক বিশাল শিক্ষাঙ্গন। সেই কিশোর আজ সেই বৃহৎ শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন ও দায়িত্ব বহন করছেন। শুধু বদলায়নি একটা জিনিস—মানুষের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ। তখন একজন শ্রমিকের ঘরে রাতের ভাতের ব্যবস্থা করতে তিনি এক পুঁটলি চাল নিয়ে ছুটেছিলেন। আর আজ শ্রমিকদের তৃষ্ণা মেটাতে নিজেই শরবতের বালতি হাতে ছাদে উঠেছেন। এই দৃশ্য দু’টির মধ্যে ব্যবধান হয়তো কয়েক দশকের। কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব একটুও বাড়েনি।
 
আমরা যারা তাঁর এই দীর্ঘ পথচলার কোনো না কোনো পর্বের সাক্ষী, আমাদের কাছে এই কথাগুলো শুধু একজন ব্যক্তির সাফল্যের গল্প নয়। এ গল্প হল অন্যের জন্য কিছু করার প্রবণতা ও মানসিকতার। একটা ছোট্ট আমবাগান থেকে শুরু হওয়া সেই সফর আজ এক বিশাল শিক্ষাঙ্গনের ছায়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। এক পুঁটলি চাল থেকে হাজার হাজার শিশুর স্বপ্নপূরণের ঠিকানায়। তবে তাঁর শিকড় এখনও মাটির গভীরে—তুলাইয়ের তল্লাটে সেই প্রত্যন্ত গ্রামে, চাষাভুষা দিনমজুরদের মাঝে, আমবাগানের পাতায় লেগে থাকা গোধূলি আলোয়, যেখানে সেদিনের সেই কিশোর, আজকের খাদেমুল ইসলাম প্রথম শিখেছিল— মানুষের পাশে দাঁড়াতে বড় কিছু লাগে না, লাগে শুধু একটা মানবিক মন, একটা সংবেদনশীল হৃদয়। 
 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা 

Saturday, 3 October 2026

নাগালের বাইরে নানুদের উঠোন - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


অগ্রহায়ণের দিন সবে পড়েছে। শীত তখনও পুরোপুরি নামেনি। কাকভোরে উঠে মেজো আব্বা, আব্বা, আমি, সুলতান দা ও আমরুল—আমরা বেরিয়ে পড়লাম মানপারের উদ্দেশ্যে। খানিকটা পথ যেতেই টের পেলাম, ভোরের বাতাসে লেপটে আছে শীতের আগমনী বার্তা। মাঠে ঘাসের ডগায় দু-এক ফোঁটা শিশির বিন্দু। কুয়াশার পাতলা পর্দা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে আর সকালের মিঠে রোদ আস্তে আস্তে মাটির গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
 
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম মানপারে, আমাদের ভিটে জমিগুলোতে। বেগুন ও লঙ্কার চারা রোপণের সময় ঘনিয়ে এসেছে। তার আগে জমিগুলোকে ভালো করে চষে তৈরি করতে হবে। আগাছা পরিষ্কার করতে হবে, জমির বুক নরম করতে হবে, তাকে চারা রোপণের উপয্যক্ত করে তুলতে হবে।  
 
মেজো আব্বা হাল বাইতে আরম্ভ করলেন। আমি তাঁর কাছাকাছি একটা আলের উপর বসে পড়লাম। তখন আমি খুব ছোট; হালচাষের কৌশল, মাটির অর্থনীতির, ফসলের সঙ্গে পরিবারের ভবিষ্যতের কী সম্পর্ক কিছুই জানতাম না। মাঠ মানেই আমার কাছে বিশাল এক খেলার জায়গা। হাল একটা মজার জিনিস। আর গরু দু’টো যেন আমার খেলায় অংশ নেওয়া দু’টো বড় প্রাণী।
 
মেজো আব্বা হাল বাইতে বাইতে আমাকে জ্বিন-পরীদের গল্প শোনাচ্ছিলেন। আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম। শুনতে শুনতে কখনও মাটির ঢেলা এধারওধার ছুঁড়ছিলাম, কখনও গরুগুলোর এক ছন্দে হেঁটে যাওয়া দেখছিলাম, আবার কখনো কথার ফাঁকে ফাঁকে মেজোআব্বাকে এটা-ওটা জিজ্ঞেস করছিলাম। বেলা একটু গড়াতেই কাজের লোকটা লাহারি নিয়ে হাজির হলো। মেজো আব্বা হাল থামিয়ে বললেন,
— “চলো, খিদে পেয়েছে, আগে খাওয়াদাওয়া করে নিই, তারপর না হয় অন্য কাজগুলো হবে।” 
আমরা বসে পড়লাম। খেতে খেতে হঠাৎ মেজো আব্বা আমাকে বললেন,
— “মাতিন, তুমি গিয়ে একবার হালটা ধরো তো বাবা।”
আমি যেন খুব বড় কোনো দায়িত্ব পেয়ে গেলাম। কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছিলো না,
— “আমি ধরবো, আব্বা?!”
— “হ্যাঁ, ধরো। শিখবে না? কী করে খাবে ভবিষ্যতে”
 
আমি দু’ হাতে হালের মুঠিয়াটা ধরে দাঁড়ালাম। তারপর যা হওয়ার তা-ই হলো। দু’ কদম এগোতেই, মুঠিয়াটা বেঁকে গেলো, লাঙল একদিকে কাত হয়ে পড়ল, গরু দু’টোও নিজের মতো করে এগোতে লাগলো। মেজো আব্বা হেসে বললেন,
— “আরে, এভাবে নয়!”
আমি আরও শক্ত করে ধরলাম।
— “আরে, থামো থামো!”
তিনি খেতে-খেতে উঠে আসলেন। আমার হাত ধরে ধীরে ধীরে বুঝিয়ে দিলেন।
— “মুঠিয়াটা এভাবে ধরবে। আস্তে আস্তে হাঁটবে। লাঙলের মাথাটা সোজা রাখবে। হড়বড় করবে না, গরু দুটোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটবে।”
 
তখন বুঝিনি, তাঁর সেই কথার মধ্যেও যে জীবনের একটা শিক্ষা লুকিয়ে ছিল—সবকিছুকে নিজের ইচ্ছেমতো টেনে নেওয়া যায় না; কিছু জিনিসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন,
— “চলে এসো, এবার নাস্তা করো।”
সবাই একসাথে বসে নাস্তা করতে লাগলাম। আমি খাচ্ছি। মেজো আব্বাও খাচ্ছেন। দূরে গরুগুলো দাঁড়িয়ে আছে। সকালের রোদ একটু একটু করে তেজী হচ্ছে। হঠাৎ মেজো আব্বা দূরের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “ওই গ্রামটা দেখতে পাচ্ছো, বাবু?”
 
আমি মুখ তুলে তাকালাম। দূরে একটা গ্রাম। খুব দূরে নয়। আমাদের চোখের নাগালের মধ্যেই। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, কয়েকটা বাড়ির টিনের ছাউনি রোদের আলোয় চকচক করছে। লিকলিকে নারকেল গাছগুলো সকালের হালকা বাতাসে মাথা দুলাচ্ছে। তালগাছ ও আমগাছের মাথাও আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে। মেজো আব্বা আঙুল তুলে বললেন,
— “ওই যে, ওই টিনের দোতলা বাড়িটা দেখতে পাচ্ছো?”
আমি চোখ ছোট করে তাকালাম।
— “ওইটা?”
— “হ্যাঁ, ওইটা।”
তারপর তিনি কাঁচা লংকায় একটা কামড় দিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই বললেন,
— “ওটা তোমার নানুদের বাড়ি।”
আমি খাওয়া থামিয়ে দিলাম।
— “আমার নানুদের বাড়ি?”
— “হ্যাঁ।”
 
আমি আবার তাকালাম। কিন্তু আমার ছোট্ট মাথায় তখন একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে। নানুদের বাড়ি যদি এত কাছে হয়, তাহলে নানুদের এই বাড়ি আমার যাওয়া হয় না কেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— “মেজো আব্বা, আপনি নানুদের বাড়ি যান?”
— “যাই।”
— “তাহলে আমি যাই না কেন?”
মেজো আব্বা একটু হেসে বললেন,
— “ওটা তো আর আমাদের দেশ নয়।”
আমি অবাক হয়ে গেলাম।
— “দেশ নয়?!”
— “ওটা বাংলাদেশ।”
 
বাংলাদেশ। শব্দটা আমার পূর্বপরিচিত। কিন্তু সেদিন শব্দটা যেন নতুন অর্থ নিয়ে আমার সামনে হাজির হল। আমি দূরের বাড়িটার দিকে তাকিয়ে ভাবলাম—এটা তাহলে বাংলাদেশ? কিন্তু দেখতে তো আমাদের গ্রামের মতোই! ওখানেও বাড়ি আছে। গাছ আছে। পুকুর আছে। পাখি আছে। তাহলে আলাদা কী? আমি আবার প্রশ্ন করলাম,
— “মেজো আব্বা, ওখানে কি মানুষ থাকে?”
তিনি হেসে বললেন,
— “থাকে তো! কেন তোমার নানুভাই, নানীমা, তোমার মামারা থাকেন!”
— “আমাদের মতো করে?”
— “হ্যাঁ, আমাদের মতোই।”
 
আমি আরও অবাক হলাম। আমার শিশুমনে তখন দেশ বলতে নিজের পরিচিত গণ্ডির বাইরে আর কিছু ছিল না। আমার কাছে পৃথিবীটা ছিল খুব ছোট—বাড়ি, উঠোন, পাশের বাড়ি, খেলার মাঠ, পুকুর, পাড়ার স্কুল, এলাকার মক্তব, বাজার, আর পরিচিত কিছু মানুষের মুখ। তার বাইরে পৃথিবী কেমন, কোথায় শেষ হয়, আমি জানতাম না। তাই দূরের ওই গ্রামটাকে দেখে আমার মনে হচ্ছিল—এত কাছে থেকেও কী করে অন্য দেশ হয়? আমি মেজো আব্বাকে জিজ্ঞেস করলাম,
— “আব্বা, সেখানে যাবো কীভাবে?”
— “ওখানে যেতে কাগজ লাগে।”
— “কী কাগজ, আব্বা?”
— “পাসপোর্ট।”
 
পাসপোর্ট শব্দটা শুনে একটু থমকালাম। আমার অভিধানে এক নতুন শব্দ এলো। এ নিশ্চয়ই কোনো অদ্ভুত জিনিস।
— “আপনার পাসপোর্ট আছে, আব্বা?”
— “আছে।”
— “তাহলে আপনি গেলে আমাকে নিয়ে যাবেন?”
মেজো আব্বা একটু হাসলেন। বললেন,
—“একদিন নিয়ে যাবো।”
 
তাঁর জবাবের প্রতি আমার তেমন ভ্রুক্ষেপ ছিল না। আমি তখন ভাবছিলাম—নানুদের বাড়ি যেতে হলে কাগজ লাগে! নানুদের বাড়ি মানে নানুদের বাড়িই। সেখানে দেশ কোথা থেকে এলো? আমি দূরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বাড়িটাকে যেন আরও কাছে দেখতে পেলাম। টিনের ছাউনি। নারকেল গাছ। তালগাছ। আমগাছ। সবই তো আমাদের মতো!
 
মনে মনে ভাবতে লাগলাম, নানুভাই এখন কোথায়, বাড়ির উঠোনে নাকি অন্য কোথাও? নানিমা কি এখন হেঁসেলে, রান্নাবান্না করছেন? আচ্ছা আমি যদি খুব জোরে ডাক দিই—“নানু, নানু!” বলে, শব্দটা কি পৌঁছাবে ওপারে…  
মেজো আব্বার ডাকে সম্বিত ফিরে পেলাম, আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
— “কী হল বাবু, খাও।”
আমি আবার খেতে শুরু করলাম। ঠিক তখনই কোথা থেকে দু’টো শালিক উড়ে এলো। এসে লাঙলের মুঠিয়াটার উপর বসল। তাদের কিচিরমিচির ডাকে গরুগুলো নড়েচড়ে উঠতেই লাঙলটা দুলে উঠল। মেজো আব্বা বললেন,
— “বাবু, এই পাখি দু’টোকে তাড়াও। নাহলে গরুগুলো বেশি নড়াচড়া করলে জোয়াল ফসকে লাঙলটা পড়ে যাবে।”
 
আমি মাটির একটা ছোট্ট ঢেলা তুলে বাঁ হাতে শালিক দু’টোর দিকে ছুঁড়ে মারলাম। শালিক দু’টো ভয় পেয়ে উড়ে গেল। আমি রুটি চিবোতে চিবোতে তাকিয়ে রইলাম। পাখি দু’টো প্রথমে আমাদের জমির উপর দিয়ে উড়াল দিল। তারপর পাশের ছোট্ট নালাটার উপর দিয়ে সোজা চলে গেল সেই গ্রামটার দিকে—যে গ্রামে আমার আরেক নানুর বাড়ি; তাদের কাছে কিন্তু ওই জরুরী কাগজটা ছিল না, তবুও। আসলে মানুষের আঁকা সীমারেখা পাখিরা যে পড়তে পারে না। মানচিত্রের ভাগবণ্টন তারা তো বোঝে না। তাদের মানচিত্র হল প্রকৃতি। আর পুরো আকাশটাই তাদের দেশ।
 
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা