Pages

Friday, 6 November 2026

নানীর কানের দুল - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



ক’দিন বাদে শাম্মীর বিয়ে। আর তাই পুরো পরিবার আনন্দে মেতে উঠেছে। একে একে আত্মীয়স্বজন এসে হাজির। ঘরদোর, উঠোন-বারান্দা সবখানেই মানুষের ভিড়; কোথাও যেন তিল ধারণের জায়গাটুকুও নেই। বড়দের কারও হাতে বাজারের ব্যাগ, কেউ রান্নাঘরে জোগাড়যন্ত্রে ব্যস্ত, কেউ বিয়ের আয়োজনের খুঁটিনাটি নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। আর ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের চেঁচামেচি, দৌড়ঝাঁপ, হাসি আর খুনসুটিতে সারা বাড়ি গমগম করছে। মনে হচ্ছিল, কতদিনের নিস্তব্ধতা ঝেড়ে পুরোনো বাড়িটা আবার তার চেনা কোলাহল ও চেনা আনন্দ ফিরে পেয়েছে।
 
শাম্মী আখতার জাহান—বড় মামার মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই সে আমাদের সবার বড্ড আদরের। বড় মামা যখন হঠাৎ স্ট্রোক করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, শাম্মী তখন সবে সতেরো-আঠেরো মাসের শিশু। বাবাকে হারানোর অর্থ বোঝার মতো বয়সও তার হয়নি। সেই থেকেই যেন পরিবারের সবার ভালোবাসা এসে তাকে ঘিরে ধরেছিল। কারও সে ভাগ্নি, কারও নাতনি, কারও ছোট বোন—সবার কাছেই সে ছিল অত্যন্ত আপন।
 
তার বিয়ের খবর শুনে আত্মীয়স্বজন যে যেখানে ছিলেন, ছুটে এসেছেন। এমনকি ছোটখালাও প্রায় সাত-আট বছর পর পাসপোর্ট রিনিউ করে বাংলাদেশ থেকে চলে এসেছেন। তাঁর এই আসাটা উৎসবের আনন্দকে আরও দ্বিগুণ করে তুলেছিল। বহুদিন পর আপনজনের দেখা, তার উপর বাড়িতে বিয়ে; সব মিলিয়ে বাড়ির বাতাসে যেন অন্যরকম এক উষ্ণতা বিরাজ করছিল।
 
বিয়ের বেশির ভাগ বাজার-সদাই আগেই হয়ে গিয়েছিল। যে দু-একটা জিনিস বাকি ছিল আমি আর হুমায়ুন বাইকে করে রায়গঞ্জ গিয়ে সেগুলো কিনে আনলাম। মনে হলো, এবার বুঝি বাজারের পালা শেষ। কিন্তু বিয়েবাড়ির বাজার কি অত সহজে শেষ হয়! পরদিন সকালে উঠে দেখা গেল, আরও কয়েকটা জিনিস বাদ পড়ে গেছে। অগত্যা আবার বাইক নিয়ে বেরোতে হল। এবার গন্তব্য কালিয়াগঞ্জ। বাজার-সদাই সেরে আমরা যখন কালিয়াগঞ্জ থেকে বাড়িতে ফিরলাম, ততক্ষণে গায়ে-হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে।
 
আমরাও আর দেরি করলাম না। প্রথমে শাম্মীকে ক্ষীর খাওয়ালাম, তারপর তার হাতে সামান্য উপহার তুলে দিলাম। চারদিকে তখন হাসি-আনন্দ, কথাবার্তা, হইহুল্লোড় আর নানা ধরণের ব্যস্ততা। হলুদের গন্ধে, মানুষের কোলাহলে আর ছোটদের উচ্ছ্বাসে বাড়িটা যেন উৎসবের এক উজ্জ্বল উঠোন হয়ে উঠেছিল।
 
সবশেষে নানীকে নিয়ে আসা হলো। মা আর ছোটখালা নানীকে ধরে ধরে নিয়ে এলেন। বয়সের ভারে তখন নানীর জন্য চলাফেরা বেশ কষ্টকর। তবু নাতনির গায়ে-হলুদের অনুষ্ঠানে নিজের হাতে হলুদ না মাখিয়ে তিনি কি আর থাকতে পারেন!
 
নানী এসে শাম্মীর সামনে বসলেন। দু’টো আঙুলে সামান্য হলুদ নিলেন। তারপর খুব ধীরে, কাঁপা কাঁপা হাতে শাম্মীর গালে সেই হলুদটুকু ছুঁইয়ে দিলেন। মাত্র দু’টো আঙুলের সামান্য হলুদ। কিন্তু সেই সামান্য হলুদের স্পর্শে যেন কত বছরের স্মৃতি এক লহমায় এসে হাজির হলো! নানীর চোখ ভিজে উঠল। তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁকে কাঁদতে দেখে শাম্মীর চোখেও জল। সে ডুকরে কেঁদে উঠলো। দেখাদেখি চারপাশের অনেকের চোখ ভিজে গেলো। একটু আগেও যে উঠোন হাসি-আনন্দে মুখর ছিল, মুহূর্তের জন্য সেখানে নেমে এল এক গভীর নীরবতা।
 
মনে হলো, নানীর সেই কাঁপা আঙুল শুধু শাম্মীর গালে হলুদ লাগায়নি, ছুঁয়ে দিয়েছে তার শৈশবকে, বড় মামাকে হারানোর সেই পুরোনো দিনগুলোকে, আর আমাদের পরিবারের কত না-বলা স্মৃতিকে। হয়তো নানী সেই মুহূর্তে বর্তমানের শাম্মীকে দেখছিলেন না; তাঁর চোখের সামনে ফিরে এসেছিল সেই ছোট্ট পরীর মতো শিশুটি—যে সেদিন বাবার নিথর দেহের কাছে গিয়ে ‘আব্বা-আব্বা’ বলে ডাকছিল।  
 
পরদিন বিয়ে। যথারীতি ধুমধাম করে সব আয়োজন সম্পন্ন হলো। আত্মীয়স্বজন, অতিথি-আপ্যায়ন, হাসি-আনন্দ, রান্নাবান্না আর ব্যস্ততায় দিনটা কখন যে কেটে গেল, টেরই পেলাম না। দিন-শেষে শাম্মী নতুন জীবনের পথে পা বাড়াল।
 
কিন্তু বিয়ে শেষ হলেই তো ব্যস্ততা শেষ হয় না। বিয়ের পরদিন বিকেলে শাম্মীকে আনতে যাওয়ার পালা। তাই সকাল থেকেই আবার নতুন করে দৌড়ঝাঁপ শুরু। গাড়ি ভাড়া করা হলো, মিষ্টি কেনা হলো। ঠিক হলো—শাম্মীকে আনতে যাবে তার খালা, ফুফু, মামিরা আর বাড়ির কচিকাচারা।  
 
সকালের জল-খাবার খেয়ে সবাই ধীরে ধীরে তৈরি হতে লাগল। কেউ কাপড় বের করছে, কেউ গুছিয়ে নিচ্ছে, কেউ আবার ছোটদের সামলাচ্ছে। বাড়ির এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত সর্বত্র ব্যস্ততা তুঙ্গে। কোথাও হাসি, কোথাও ডাকাডাকি, কোথাও শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
 
আমি আর হুমায়ুন বসে বিয়ের অনুষ্ঠানের খরচপাতির হিসাব মিলাচ্ছি। নানী বসেছিলেন পশ্চিম ঘরের বারান্দায়। হঠাৎ তাঁর চেনা ডাক ভেসে এল— “মহুবা, জারেকা, নূরজাহান, কাবো কুঠি আছেন তোরা? লিলি, জসনুর, এনা, আসো তো বো!”
 
নানীর ডাক শুনে একে একে সবাই তাঁর সামনে হাজির হলো। নানী যেন সবাইকে চোখের সামনে একবার দেখে নিতে চাইছিলেন। তারপর ছোটখালার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“নূরজাহান, মোর কানের দুল দু’টা খুলে দিত।”
ছোটখালা এগিয়ে গিয়ে খুব আস্তে করে দুল দু’টো খুলে দিলেন। দুল দু’টো হাতে নিয়ে নানী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাঁর চোখ তখন স্থির হয়ে আছে সেই ছোট্ট অলংকারের দিকে। মনে হলো, তিনি যেন দুল দেখছেন না—দুলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কত বছরের জীবন, কত মানুষের মুখ, কত আনন্দ-বেদনার দিন দেখতে পাচ্ছেন। তারপর দুল দু’টো ছোটখালার হাতে তুলে দিয়ে ধীর গলায় বললেন—
—“এইলা মুই মাতিনের বউক দিবা চাহেছু। কেহোঁ কুনো দাবি থোয়েন নান, বাপু।”
 
কথাগুলো শুনে আমরা সবাই থমকে গেলাম। তাঁর কথার অর্থ বুঝতে আমাদের এক মুহূর্তও লাগল না। নানী তাঁর কানের দুল দু’টো আমার ভবিষ্যৎ স্ত্রীর জন্য দিয়ে গেলেন। কী আশ্চর্য! নিজের কাছে থাকা সামান্য দু’টি অলংকারও তিনি ধরে রাখলেন না। যেন তাঁর মনে হয়েছিল—জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের জন্য আর কিছু জমিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই; বরং যা আছে, তা আপনজনের হাতে তুলে দেওয়াতেই সুখ।  
 
নানীর সেই সামান্য কথার মধ্যে কত মমতা, কতখানি সঞ্চয় আর কত গভীর আশীর্বাদ লুকিয়ে ছিল! কানের দুল দু’টি শুধু অলংকার ছিল না। তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল নানীর ভালোবাসা, তাঁর সঞ্চয়ের স্মৃতি, তাঁর জীবনের এক টুকরো ইতিহাস এবং পরিবারের এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে এগিয়ে চলা এক অদৃশ্য উত্তরাধিকার।
 
আমরা কেউ কোনো কথা বলতে পারলাম না। শুধু নীরবে তাকিয়ে রইলাম। তখনও আমরা জানতাম না, এই ঘটনাটিই একদিন এক বিশাল বড় স্মৃতি হয়ে ফিরে আসবে। আমরা জানি, সময় তার নিজের নিয়মে এগিয়ে চলে। কারও জন্য সে থেমে থাকে না। মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়; ঘরের উঠোন বদলে যায়, পুরোনো মুখের জায়গায় নতুন মুখ আসে। কিন্তু কিছু জিনিস সময়ের স্রোত অতিক্রম করে নিজেকে ধরে রাখে—কোনো পুরোনো ছবিতে, কখনও কোনো কথায়, আবার কখনও কোনো অলংকারে।
 
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ছোটখালা আবার বাংলাদেশ থেকে এলেন। প্রায় বিয়াল্লিশ বছর পর সঙ্গে খালু আব্বাও এলেন। তাঁদের এই আসাটা আমাদের কাছে ছিল বিশেষ এক ঘটনা। পুজোর ছুটিতে আমিও তখন বাড়িতে। ৬ অক্টোবর আমরা সবাই মেয়ে দেখতে গেলাম। একপর্যায়ে কথাবার্তা পাকা হয়ে গেল। সেদিনই আক্‌দ করার সিদ্ধান্ত হলো। শরিয়ত মোতাবেক মোহরের ব্যবস্থা করা হলো। পঞ্চাশ হাজার টাকা নগদ মোহরের বিনিময়ে আমাদের আক্‌দ সম্পন্ন হলো।
 
ইজাব-কবুলের পর উপস্থিত সবাই একে একে আমাদের দু’আ দিতে লাগলেন। আপনজনেরা যে যার সামর্থ্য ও ভালোবাসা অনুযায়ী আমার স্ত্রীকে উপহার দিচ্ছিলেন। চারপাশে তখন আনন্দ, দোয়া, শুভকামনা আর নতুন সম্পর্কের উষ্ণতা। এমন সময় ছোটখালা আমার স্ত্রীর সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতে ছিল সেই কানের দুল দু’টো। নানীর তুলে দেওয়া সেই দুল—যে দুলের কথা এতদিন ধরে আমাদের স্মৃতির ভাঁজে ছিল। ছোটখালা খুব যত্ন করে দুল দু’টো আমার স্ত্রীর কানে পরিয়ে দিলেন।
 
দুল দু’টো কানে পরানোর সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের সামনে খুলে গেল বহু বছরের পুরোনো একটি দরজা। চোখের সামনে ভেসে উঠল শাম্মীর গায়ে-হলুদের সেই দিন। ভেসে উঠল নানীর কাঁপা কাঁপা হাত, হলুদে রাঙা দু’টো আঙুল, শাম্মীর চোখের জল, আর সেই মুহূর্তে নেমে আসা নিস্তব্ধ উঠোন। তারপর মনে পড়ল পরদিনের সেই সকাল—পশ্চিম ঘরের বারান্দায় বসে থাকা নানী, তাঁর চেনা ডাক, একে একে সবাইকে কাছে ডেকে নেওয়া, কানের দুল খুলে ছোটখালার হাতে তুলে দেওয়া, সাথে কাপা কণ্ঠে ব্যক্ত এক বাসনা—“এইলা মুই মাতিনের বউক দিবা চাহেছু।”
 
কত অল্প কথায় কত বড় একটি ভবিষ্যৎ রেখে গিয়েছিলেন নানী! সেদিন হয়তো তিনি জানতেন না, কখন সেই দুল আমার স্ত্রীর কানে উঠবে। জানতেন না, সেই সময় তিনি নিজে থাকবেন কি না। শুধু জানতেন, তাঁর ভালোবাসার একটি চিহ্ন তিনি তাঁর নাতির সংসারে তুলে দিতে চান।
 
সময়ের কাঁধে চেপে সেই দুল পৌঁছে গেল আমার স্ত্রীর কানে। আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। মনে হলো, নানী যেন দূরে কোথাও বসে আছেন, আর তাঁর সেই কাঁপা হাতের আশীর্বাদ নীরবে এসে ছুঁয়ে গেল আমার নতুন সংসারকে। দুল দু’টি যেন শুধু কানের অলংকার হয়ে রইল না; হয়ে উঠল একটি পরিবারের স্মৃতি থেকে আরেকটি পরিবারের জীবনে পৌঁছে যাওয়া ভালোবাসার নিঃশব্দ সেতু।
 
শাম্মীর গায়ে হলুদ থেকে আমার আক্‌দ—মাঝখানে কেটে গেছে বেশ ক’টা বছর। কত মানুষ বদলে গেছে, কত সম্পর্কের রূপ বদলেছে, কত দিন-কত মাস স্মৃতির ভেতর হারিয়ে গেছে। কিন্তু এক জোড়া ছোট্ট দুল সময়ের হাত ধরে ঠিকই পৌঁছে গেল তার নির্দিষ্ট ঠিকানায়।
 
উত্তরাধিকার সব সময় জমিজমা, টাকাপয়সা কিংবা বড় কোনো অর্থসম্পদ হয় না। কখনও কখনও উত্তরাধিকার মানে এক জোড়া ছোট্ট কানের দুল—যার ভেতরে লুকিয়ে থাকে নানী বা দাদীর মমতা, একটি পরিবারের ইতিহাস, হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া এক নিঃশব্দ আশীর্বাদ।
 
নানী সেই কবেই চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর দেওয়া সেই দুল দু’টি আজও যেন তাঁর হাতের উষ্ণতা বহন করে। সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেও মনে করিয়ে দেয়—মানুষ চলে যায়, দিন ফুরিয়ে যায়, উৎসবের কোলাহল একদিন স্তব্ধ হয়ে যায়; অথচ ভালোবাসা কখনও হারিয়ে যায় না। কখনও হলুদের রঙে, কখনও চোখের জলে, কখনও বা দু’টি ছোট্ট সোনার দুলের আকারে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকে।
 
২২ অক্টোবর ২০২৬
বাঁশকুড়ি, দক্ষিণ দিনাজপুর

Tuesday, 3 November 2026

এক বাটি মাংস, এক টুকরো গ্রাম - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


ফজরের নামাজ শেষ হয়েছে সবে। ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। চারদিকে কুয়াশার হালকা চাদর, গাছের পাতায় রাতের শিশির, আর গ্রামজুড়ে এক শান্ত, স্নিগ্ধ নিস্তব্ধতা। সবুরা বেওয়া ঘুন্ডিয়ার দরজা খুলতেই একে একে হাঁস-মুরগিগুলো ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে, দৌড়ে-লাফিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। কেউ উঠোনের এদিকে, কেউ ওদিকে ছড়িয়ে পড়ল। প্রতিদিনের মতো তাদের ছোটাছুটি দেখতে দেখতে হঠাৎ তাঁর চোখ আটকে গেল ছোট মোরগটার দিকে। অন্যদের সঙ্গে বেরোল বটে, কিন্তু কেমন যেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে।
 
সবুরার মনে খটকা লাগল। তিনি তাড়াতাড়ি বাড়ির দরজাটা বন্ধ করে মোরগটার পেছনে ছুটলেন। বেশ কিছুক্ষণ ছোটাছুটির পর সেটাকে ধরতে পারলেন। হাতে তুলে পা-টা একটু নাড়াচাড়া করতেই বুঝলেন, পা ভেঙে গেছে। কে জানে, আগের দিন হয়তো কেউ ঢিল ছুড়েছিল, সেই আঘাতেই এমন দশা। মোরগটার অসহায় অবস্থা দেখে তাঁর মনটা খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু কী আর করার! এভাবে বেঁচে থাকাটাও তো কঠিন। একটু বেলা হলে তিনি মোরগটাকে মসজিদের মুয়াজ্জিন সাহেবের কাছে নিয়ে গিয়ে জবাই করিয়ে আনলেন।  
 
বহু বছর আগে যখন স্বামী মারা যায়, তখন তাঁদের ছেলেমেয়ে দু’টো একেবারেই ছোট। সেই থেকে একা হাতে সংসারের হাল ধরেছেন। সরকারি সহায়তায় পাওয়া একটি ঘর, মাথার উপর টিনের ছাউনি, আর সামান্য কিছু জমিজিরেত—এই তাঁর সম্বল। জমিতে অল্পস্বল্প চাষবাস হয়। তাতে কি আর সংসার চলে! তাই অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হয়। কখনও কারও মুড়ি ভেজে দেন, কখনও কারও বাড়িতে আত্মীয়স্বজন এলে রান্নাবান্নায় হাত লাগান, কখনও কারও জন্য রান্না করে দেন, আবার কখনও ধান সেদ্ধ করার কাজ করেন। যে বাড়িতে যখন কাজ জোটে, সেখানেই ছুটে যান। দিনের শেষে হাতে যা কয়টা টাকা আসে, তা দিয়েই টেনেটুনে সংসার চালান।
 
অভাব তাঁর সঙ্গী। তবু সেই অভাবের মধ্যেই ছেলেমেয়েকে বড় করেছেন। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে পড়াশোনা করেছে। গ্রাজুয়েশন শেষ করে কাজের সূত্রে বাড়ির বাইরে থাকে। জীবনের কত চাওয়া যে অপূর্ণ থেকে গেছে, তার হিসাব সবুরা বেওয়া কখনও করেননি। বরং ছেলেমেয়েরা একটু ভালো থাকুক, হাসিখুশি থাকুক—এইটুকুই যেন তাঁর বেঁচে থাকার বড় অবলম্বন।
 
বাড়ি ফিরে পালক ছাড়িয়ে মোরগের মাংসটুকু পরিষ্কার করতে করতেই হঠাৎ তাঁর মনে হলো, এখনই রান্না করবেন কেন? কয়েক দিন পর তো মেয়ে, জামাই আর নাতি আসবে। নাতিটা মুরগীর মাংস খেতে কত ভালোবাসে! ওরা এলে রান্না করলে একসঙ্গে সবাই মিলে খেতে পারবে। নাতিটাও পেট ভরে খাবে। ভাবনাটা মনে আসতেই তাঁর মুখে যেন একটু হাসি ফুটল।
 
কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল, মাংসটা রাখবেন কোথায়? তাঁর নিজের তো ফ্রিজ নেই। দু-চার দিন এমনিতেই রেখে দিলে তো নষ্ট হয়ে যাবে। কী করা যায়, ভাবতে ভাবতে আশপাশের কয়েকটি বাড়িতে গেলেন। যদি কেউ একটু ফ্রিজে রাখতে দেন!
 
কিন্তু সেখানেও সুবিধা হলো না। শীতকাল পড়েছে বলে অনেকেই ফ্রিজ বন্ধ করে রেখেছেন। আবার কেউ কেউ বললেন, ‘আমাদের ফ্রিজে তো একটুও জায়গা নেই।’ কেউ জানালেন, তাঁদের ফ্রিজ খারাপ হয়ে পড়ে আছে।  
 
শেষ পর্যন্ত সবুরা বেওয়া এলেন আমাদের বাড়িতে। মায়ের কাছে গিয়ে একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘খালা, একটা কথা ছিল। আজ খুন্ডিয়া ছাড়ার সময় দেখলাম, মুরগাটা খুঁড়িয়ে হাঁটছে। পা-টা বোধহয় ভেঙে গেছিল। তাই জবাই করেছি। ভাবছি, আজ রান্না না করে দু-চার দিন পরে রান্না করব। মেয়ে, জামাই আর নাতিটা আসবে! নাতিটা মুরগীর মাংস খেতে খুব ভালোবাসে। তাই ভাবছিলাম, তত দিন যদি মাংসটুকু আপনাদের ফ্রিজে একটু রাখা যেত খালাম্মা! আপনারাও কি ফ্রিজ বন্ধ করে দিয়েছেন?’
মা হেসে বললেন, ‘না রে বেটি, আমরা তো ফ্রিজ বন্ধ করি না। তুমি আমাদের ফ্রিজে রেখে দেও।’
তারপর মা-ই বুদ্ধি দিলেন, ‘তবে কাঁচা মাংস এভাবে না রেখে একটু ঝলসে নেও। হালকা মশলা দিয়ে রাখলে ভালো থাকবে, স্বাদও ঠিক থাকবে।’
 
মায়ের কথা শুনে সবুরা বেওয়া বাড়ি ফিরে গেলেন। মাংসটুকু হালকা মশলা দিয়ে ঝলসে ঠান্ডা করলেন। তারপর একটি পাত্রে ভরে আমাদের বাড়িতে এনে ফ্রিজে রেখে গেলেন। মনে হলো, এবার বুঝি নিশ্চিন্ত হলেন। নাতির জন্য যত্ন করে রাখা মাংসটুকু নষ্ট হবে না।
 
দেখতে দেখতে তিন-চার দিন কেটে গেল। একদিন বিকেল বেলা সবুরা বেওয়া আবার এলেন। মাকে বললেন, ‘খালা, নাতিটা তো এখন আসতে পারবে না। ওদের আরও সময় লাগবে। কবে আসবে, তারও ঠিক নেই। আর কত দিনই বা মাংসটা রেখে দেব! ভাবছি, নিয়ে গিয়ে রান্না করে খেয়ে নেব।’
 
মা ফ্রিজ থেকে মাংসটা বের করে দিলেন। কিন্তু সবুরা বেওয়া মাংস নিয়ে সোজা বাড়ি ফিরে গেলেন না। আমাদের রান্নাঘরে ঢুকে বাসন রাখার জায়গা থেকে একটা বাটি তুলে নিলেন। তারপর সেই মাংস থেকে খানিকটা তুলে বাটিতে ভরলেন। বাটিটা মায়ের হাতে দিয়ে বললেন, ‘খালা, বাড়ির বাচ্চাগুলো তো মাংস দেখেছে। এভাবে সবটা নিয়ে চলে গেলে কেমন যেন খারাপ লাগে। এইটুকু ওদের জন্য রাখলাম। আলু-পটল দিয়ে রান্না করে খাওয়াবেন।’
 
মা বাটিটা হাতে নিয়ে একেবারে থমকে গেলেন। কিছুক্ষণ যেন কথাই বলতে পারলেন না। যে মানুষটা নিজের সংসারে দু’ বেলা পেট ভরে খেতে পান কি না, তারই ঠিক নেই, যার সম্বল বলতে সামান্য কিছু জমিজিরেত আর অন্যের বাড়িতে কাজ করে পাওয়া ক’টা টাকা, সেই মানুষটি নিজের সামান্য সম্বল থেকে অন্যের বাড়ির বাচ্চাদের জন্য মাংস দিয়ে গেলেন!
 
একটা ছোট্ট মোরগ, কতটুকুই বা তার মাংস! সেই মাংসেরও কতখানি তিনি নাতির জন্য যত্ন করে তুলে রাখতে চেয়েছিলেন। অথচ শেষ পর্যন্ত সেই মাংস থেকেই অন্যের বাড়ির বাচ্চাদের ভাগ দিতে ভুললেন না। নিজের অভাবের কথা একবারও ভাবলেন না; ভাবলেন, বাচ্চাগুলো মাংস দেখেছে, তাদের জন্য একটু রেখে যাওয়া উচিত।
 
বাটিটা হাতে নিয়ে মা যেন এক মুহূর্তে ফিরে গেলেন পুরোনো দিনের গ্রামে। একসময় গ্রামে এই দেওয়া-নেওয়ার কী সুন্দর রেওয়াজই না ছিল! কারও বাড়িতে পোলাও রান্না হলে এক বাটি পোলাও প্রতিবেশীর বাড়িতে পৌঁছে যেত। মাংস রান্না হলে পাশের বাড়ির বাচ্চাদের জন্যও এক বাটি তুলে রাখা হতো। ঢেঁকিতে চাল কুটলে, পিঠেপুলি তৈরি হলে কিংবা ক্ষীর-পায়েস রান্না হলে, সেখান থেকেও প্রতিবেশীদের ভাগ জুটত। কে কতটা দিল, কে কতটা পেল—এসব নিয়ে কেউ হিসাব কষত না। নিজের বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হলে অন্যের বাড়িতেও তার স্বাদ পৌঁছে দেওয়া যেন ছিল এক সহজাত অভ্যাস।
 
সেসব দেওয়া-নেওয়ার মধ্যে লোকদেখানো সৌজন্য ছিল না, ছিল না কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশা। ছিল আপন করে নেওয়ার আনন্দ, প্রতিবেশীকে আপন ভাবার আন্তরিকতা। কারও বাড়ির বাচ্চারা ভালো কিছু খাবে, আর পাশের বাড়ির বাচ্চারা তা থেকে বঞ্চিত থাকবে—এমন ভাবনা যেন কারও মনেই আসত না। খাবার কম থাকলেও ভাগ করে খাওয়ার মনটা ছিল বড়।
 
কিন্তু সময় বদলেছে। গ্রামের চেহারা বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাপনও। গ্রামের মধ্যে শহুরে মানসিকতার প্রভাব যত বেড়েছে, ততই যেন হারিয়ে যেতে বসেছে সেই পুরোনো রীতিনীতিগুলো। এখন অনেকেই নিজেদের ঘর-সংসার নিয়ে ব্যস্ত। প্রতিবেশীর বাড়িতে কী রান্না হলো, কার বাড়িতে আনন্দ, কার বাড়িতে দুঃখ—এসব খবর রাখার অবকাশ কমে এসেছে। একসময় যে বাড়িগুলোর দরজা একে অপরের জন্য খোলা থাকত, এখন সেখানে যাওয়া-আসাও কমেছে। দেওয়া-নেওয়ার সেই সহজ সম্পর্কের জায়গায় কখন যেন এসে বসেছে দূরত্ব।
 
মা বাটিটা হাতে নিয়ে এসব কথাই ভাবছিলেন। মনে মনে বলছিলেন, সবকিছু কি তবে একেবারেই হারিয়ে গেল? পুরোনো দিনের সেই সহজ-সরল মানসিকতা, সেই ভাগ করে খাওয়ার আনন্দ, সেই প্রতিবেশীকে আপন করে নেওয়ার অভ্যাস—সব কি কেবল স্মৃতির মধ্যেই বেঁচে থাকবে?
 
তারপরই মনে পড়ল সবুরা বেওয়ার কথা। না, সবকিছু হারিয়ে যায়নি। এখনও কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের মধ্যে পুরোনো গ্রামের প্রাণটুকু বেঁচে আছে। যাঁদের ঘরে অভাব আছে, কিন্তু মনে কার্পণ্য নেই। যাঁদের নিজেদের চাহিদা মেটানোই কঠিন, তবু অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর কথা তাঁরা ভুলে যান না।
 
সবুরা বেওয়া সেদিন শুধু এক বাটি মাংস দিয়ে যাননি। দিয়ে গিয়েছিলেন এক হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতির স্মারক, এক টুকরো আন্তরিকতা, এক মুঠো পুরোনো গ্রামের মমতা। তাঁর সেই সামান্য উপহারের মধ্যে মা যেন দেখতে পেয়েছিলেন গ্রামবাংলার সেই চেনা ছবিটা—যে গ্রামে অভাব ছিল, কিন্তু হৃদয়ের দারিদ্র্য ছিল না; খাবার কম ছিল, কিন্তু ভাগ করে খাওয়ার আনন্দ ছিল অফুরন্ত।
 
সেদিন একটা ছোট্ট মোরগের মাংস ঘুরে ঘুরে কত মানুষের মনের কথা বলে গেল! যে মাংসটুকু নাতির জন্য যত্ন করে তুলে রাখা হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত পৌঁছে গেল অন্যের বাড়ির বাচ্চাদের ভাগেও। আর সেই ভাগ করে দেওয়ার মধ্যেই যেন বেঁচে রইল একটা গোটা গ্রামের পুরোনো হৃদয় আর সহজেই পাড়াপড়শিকে আপন করে নেওয়ার স্পন্দন।
 
২৯ অক্টোবর ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা 

Friday, 30 October 2026

বোকা বাক্সে বন্দী শৈশব - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার উপক্রম। পশ্চিম আকাশের শেষ প্রান্তে সূর্যের সোনালি আভাটুকু তখনও মিলিয়ে যায়নি। মাঠ থেকে গরু-ছাগলগুলো নিজ নিজ গোয়ালে ফিরছে, উঠোনে-উঠোনে দিনের শেষ কাজগুলো গুছিয়ে নেওয়ার ব্যস্ততা, কোথাও উনুনের ধোঁয়া, কোথাও সন্ধ্যার রান্নার তোড়জোড়। এরই মধ্যে হঠাৎ করে গোটা গ্রামজুড়ে এক হুলস্থূল কাণ্ড বেঁধে গেল। নিজ নিজ কাজকর্ম দ্রুত সেরে, ছোটরা হাতমুখ ধুয়ে, বড়রা ওজু করে মাগরিবের নামাজ পড়ে, সবাই ছুটলো পুবপাড়ের দিকে। গন্তব্য—সামাদ দা’র বাড়ির বাইরের খোলা জায়গা।  
 
অবশ্য ক’দিন ধরেই এর প্রস্তুতি চলছিল। গ্রামের যুবকেরা উদ্যোগ নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে মুঠো মুঠো চাল তুলেছে। সেই চাল এক জায়গায় জমিয়ে, তার সঙ্গে কিছু টাকা যোগ করে ভাড়া করে আনা হয়েছে একটি ভিসিডি প্লেয়ার আর একটি টেলিভিশন। উদ্দেশ্য, সবাই মিলে সিনেমা দেখা; সে-সময়ের চলতি ও জনপ্রিয় সিনেমা—‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’।
 
মাগরিবের নামাজের পর টেলিভিশন সেট করা হলো, ভিসিডি প্লেয়ারও জুড়ে দেওয়া হলো। বসার জন্য কেউ বাড়ি থেকে মাদুর নিয়ে এসেছে, কেউ ঘরের চাটাই, কেউ খেজুর-পাটি, আবার কেউ খড়ের গাদা থেকে দু-চারটা আঁটি নিয়ে এসেছে। অল্প সময়ের মধ্যেই উঠোনটা যেন কানায় কানায় ভরে উঠল।
 
আমরা শিশুরা একেবারে প্রথম সারিতে গিয়ে বসে পড়লাম। আমাদের পেছনে ডান দিকে বসলেন গ্রামের বয়স্ক পুরুষেরা, আর বাঁ দিকের পুরোটা জুড়ে মহিলাদের বসার ব্যবস্থা হলো। ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সবার চোখ তখন সেই ছোট্ট টেলিভিশনের পর্দায়। সবার মধ্যে এক অদ্ভুত উত্তেজনা! যেন পর্দার ওপারে শুধু একটি সিনেমা নয়, খুলে যেতে চলেছে এক অজানা পৃথিবীর দরজা।
 
কিছুক্ষণ পরেই শুরু হলো ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’। আমাদের কাছে সেটি ছিল একেবারেই নতুন এক অভিজ্ঞতা। পর্দায় কখনও গান, কখনও মজার কৌতুক, কখনও অন্য রকম দৃশ্য—সবকিছুই আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছিলাম। গ্রামের মানুষও বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিলেন সেই অভিনব বিনোদন। কোনো কোনো দৃশ্যে চারদিক থেকে হাততালির শব্দ উঠছিল। আবার সাপুড়ের বাঁশির শব্দ বা সাপের দৃশ্য এলে সবাই খানিকটা চমকে উঠছিলেন, হতচকিত হয়ে তাকিয়ে থাকছিলেন পর্দার দিকে। সেদিনের সেই সন্ধ্যা আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন। উঠোনজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মাদুর-চাটাই, টেলিভিশনের সামনে গাদাগাদি করে বসে থাকা মানুষ, শিশুদের কৌতূহলী চোখ, বড়দের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে সে ছিল এক অন্যরকম আনন্দের সন্ধ্যা।
 
আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, সেই সময় আমাদের এলাকায় বিদ্যুতের সংযোগ ছিল বটে, কিন্তু আশপাশের চার-পাঁচটি গ্রামের কারও বাড়িতে টেলিভিশন ছিল না। তবে বহু বাড়িতে রেডিও ছিল। আর সেই রেডিওই ছিল বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের মাধ্যম। লোকজন রেডিওতে খবর শুনত, নাটক শুনত, নানা অনুষ্ঠান শুনত। ক্রিকেট ও ফুটবলের লাইভ কমেন্ট্রি শুনত। সন্ধ্যা নামলে কোনো কোনো বাড়ির উঠোনে কিংবা বারান্দায় রেডিওকে ঘিরে দু-চারজন মানুষ জটলা করে বসে যেতেন। দূরের কোনো শহর থেকে ভেসে আসা সংবাদ, নাটকের সংলাপ, গান কিংবা ঘোষকের কণ্ঠ—সব মিলিয়ে সেই ছোট্ট যন্ত্রটি আমাদেরকে অচেনা পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিত।
 
এরপর একদিন আমাদের গোটা এলাকায় প্রথম টেলিভিশন এল। কদমডাঙ্গার ইসমাঈল দা কিনলেন। তাঁর বাড়িতে টেলিভিশন আসা মানে চার-পাঁচটি গ্রামের মানুষের কাছে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। সন্ধ্যা নামলেই আশপাশের বিভিন্ন বাড়ি থেকে মানুষ তাঁর বাড়িতে এসে হাজির হতো। কারও হাতে কাজের ক্লান্তি, কারও পরনে দিনের পোশাক—তবু সবার চোখেমুখে একটাই কৌতূহল, আজ টিভিতে কী দেখা যাবে? বিশেষ করে ‘আলিফ লায়লা’ দেখার জন্য মানুষের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। সেই সময় ‘আলিফ লায়লা’ যেন শুধু একটি ধারাবাহিক ছিল না; ছিল সন্ধ্যার এক বিশেষ আকর্ষণ।
 
ইসমাঈল দা’ও যেন বিষয়টি বুঝতেন। প্রতিদিন সময় হলে তিনি টেলিভিশনটি ঘর থেকে বের করে বারান্দায় এনে সেট করতেন। তারপর একে একে লোকজন এসে বারান্দায়, উঠোনে, আশপাশে বসে পড়ত। কেউ মাটিতে, কেউ চাটাইয়ে, কেউ যেখানে একটু জায়গা পেত সেখানেই বসে যেত। ছোট্ট রঙিন পর্দায় তখন খুলে যেত এক অন্য জগৎ—‘আলিফ লায়লা’, কখনও অন্য কোনো সিরিয়াল, আবার কখনও ক্রিকেট কিংবা অন্য কোনো খেলা।
 
ঘটনাচক্রে ইসমাঈল দা’র বড় ছেলে রবি ছিল আমার ক্লাসমেট। সেই সুবাদে আমিও মাঝে মাঝে রবিদের বাড়িতে যেতাম। আর সেই যাওয়াগুলো আমার কাছে ছিল একেকটি বিশেষ সুযোগ। কারণ সেখানে গিয়ে আমি টেলিভিশনে দেখতে পেতাম আমার কল্পনার জগতের একের পর এক চমক—‘চন্দ্রকান্তা’, ‘শক্তিমান’, ‘শাকালাকা বুম বুম’ আরও কত রকম সিরিয়াল!
 
আজ ভাবলে অবাক লাগে, সেই ছোট্ট রঙিন টেলিভিশনের পর্দাটি আমাদের শৈশবের কাছে কত বড় একটি জানালা ছিল! তার ওপারে ছিল এমন এক পৃথিবী, যার সঙ্গে আমাদের গ্রামের বাস্তব জীবনের কোনো মিল ছিল না। অথচ সেই পর্দার সামনে বসে আমরা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। মনে হতো, এই বুঝি পৃথিবীটা আরেকটু বড় হয়ে গেল!
 
এরপর ধীরে ধীরে টেলিভিশন আমাদের এলাকায় আরও বেশ কয়েকটি বাড়িতে পৌঁছে গেল। আমাদের গ্রামে সর্বপ্রথম টেলিভিশন কিনেছিলেন সোলেমান মিয়াভাই। তাঁর বাড়িতে টেলিভিশন আসায় আমাদের বেশ সুবিধাই হলো। আমাদের মতো ছোটদের জন্য টেলিভিশন দেখা যেন অনেকটাই সহজ হয়ে গেল। রবিবার এলেই তখন আমাদের মনে আলাদা একটা অপেক্ষা তৈরি হতো। দূরদর্শনে সকালে চিত্রাহার আর সন্ধ্যায় কোনো হিন্দি সিনেমা। তার জন্য মনটা আগে থেকেই ছটফট করত। আবার শুক্রবারে বিটিভিতে বাংলা সিনেমা। তার সঙ্গে ক্রিকেট খেলা তো ছিলই। ব্যাট-বলের সেই লড়াই দেখার জন্যও আমাদের আগ্রহের অন্ত ছিল না।
 
আত্মীয়তার সুবাদে সলেমান মিয়াভাইর বাড়িতে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের, বিশেষ করে আমার, তেমন কোনো অসুবিধা ছিল না। বরং সেখানে যাওয়ার মধ্যে একটা বাড়তি আনন্দই ছিল। দিদি আমাদের দেখলে বেশ আদর করতেন, খাওয়া-দাওয়াও দিতেন। তারপর আমরা নিশ্চিন্তে বসে টেলিভিশন দেখতাম। দিদির স্নেহ, বাড়ির পরিচিত পরিবেশ, আপনজনের মতো বসে থাকা, কিছু খেয়ে নেওয়া, তারপর একসঙ্গে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে থাকা—শৈশবের সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো তখন হয়তো এত বড় মনে হতো না। কিন্তু সময় যত পেরিয়েছে, ততই বুঝেছি, জীবনের আসল সম্পদ বোধহয় সেই ছোট ছোট আনন্দমুখর মুহূর্তগুলিই।
 
তারপর একে একে আরও কত বাড়িতে টেলিভিশন সেঁধিয়ে গেল—মুনির দা, আজিজ দা, সামাদ দা, আরও কতজনের। আর আমরাও সুযোগ বুঝে কখনও এ বাড়ি, কখনও ও বাড়ি, টেলিভিশন দেখে বেড়াতাম। যে বাড়িতে যে দিন যে অনুষ্ঠান বা খেলা চলছে, সেদিন আমাদের গন্তব্যও যেন ঠিক হয়ে যেত সেই বাড়ি।
 
তবে টেলিভিশন দেখা যে সবসময় সহজ ছিল, তা নয়। অনেক সময় টেলিভিশন দেখার জন্য আমাদেরকে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হতো। কখনও বলা হতো—“তোরা তো ছোট বাচ্চা, বের হয়ে যা।” কখনও সিনেমা চলার সময় ধমক দিয়ে বলা হতো—“যা পড়তে বস।” আবার ক্রিকেট খেলা চললে শুনতে হতো—“তোরা ক্রিকেট কী বুঝিস?”
 
আমরাও এত সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিলাম না। ছোট ছিলাম, কিন্তু টেলিভিশন দেখার ব্যাপারে আমাদের জেদও ছিল প্রবল। মনে মনে যেন পণ করে বসেছিলাম—টেলিভিশন আমরা দেখবই। তাই ঘর থেকে বের করে দিলে আমরা বেরিয়ে আসতাম। কিন্তু বাইরে এসে প্রথমে খুঁজতাম জানালা খোলা আছে কি না। জানালা খোলা থাকলে জানালার কাছে বসেই দেখতাম। বাড়ির লোকজন টের পেলে জানালাটাও বন্ধ করে দিত।
 
তাতেও কি আমরা দমে যেতাম? না। বন্ধ জানালার গায়ে কোথাও কোনো ছোট ছিদ্র আছে কি না, কাঠের ফাঁকে কোথাও সামান্য চিড় আছে কি না—আমরা খুঁজে বের করতাম। সেই সামান্য ফাঁক দিয়ে যদি টেলিভিশনের পর্দার একটুখানি আলো দেখা যায়, তাহলেই হলো। তারপর সেই ফাঁকটুকুতে এক চোখ গুঁজে দিয়ে শুরু হতো আমাদের গোপনে টেলিভিশন দর্শন।
 
ভেতরের লোকজন ভাবত, আমরা বুঝি চলে গেছি। অথচ জানালার ওপাশে আমরা এক চোখে গোটা পৃথিবীটাকে আটকে রেখেছি। কখনও সিনেমা, কখনও চিত্রহার, কখনও ক্রিকেট যা-ই চলুক, আমাদের চোখ আর সরে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একইভাবে জানালার ফাঁকে চোখ রেখে আমরা দেখে যেতাম। এক চোখে পর্দা, অন্য চোখে অন্ধকার। এইভাবেই কখনও পুরো সিনেমা, কখনও পুরো খেলা শেষ করে তবেই বাড়ি ফিরতাম।
 
আর যখন ভেতরের লোকজন আমাদের কৌশল ধরে ফেলত, জানালার সেই ফাঁক বন্ধ করে দিতো, কখনও এমনভাবে জানালায় পর্দা টেনে দিতো যাতে বাইরে থেকে আর কিছুই দেখা না যায়। কিন্তু আমরাও ছিলাম নাছোড়বান্দা। তারা এক কৌশল নিলে আমরা আরেক কৌশল বের করতাম। আমাদের মাঝখানে যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধ চলত। ওরা চাইত আমাদের দূরে রাখতে, আর আমরা চাইতাম যেভাবেই হোক পর্দার একটু আলো চোখে মাখতে।
 
আজ সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে হাসি পায়। একটা সিনেমা বা খেলা দেখার জন্য এত লুকোচুরি, এত কৌশল, এত অপেক্ষা, এত জেদ—আজকের দিনে যেন ভাবাই কঠিন। কিন্তু তখন সেই সামান্য আনন্দটুকুর জন্য কত দৌড়ঝাঁপ, কত বুদ্ধি আর কত অপেক্ষা। সেই জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা টেলিভিশনের পর্দাটুকুই তখন আমাদের কাছে ছিল এক বিশাল পৃথিবীর জানালা।
 
তারপর ধীরে ধীরে সময় পাল্টাল। যে টেলিভিশন একদিন আমাদের কাছে ছিল দুর্লভ, সেটিই এখন প্রায় প্রতিটি বাড়ির নিত্যসঙ্গী। এক সময় বাড়িতে টিভি আসা মানেই ছিল পাড়া-প্রতিবেশীর মধ্যে নতুন এক আনন্দের খবর, আজ সেই টিভি প্রায় প্রতিটি ঘরেই নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—টেলিভিশন যত সহজলভ্য হয়েছে, তাকে দেখার মানুষ যেন তত কমে গেছে। এখন আর আগের মতো টেলিভিশনের সামনে সবাইকে একসঙ্গে বসে থাকতে দেখা যায় না। কোনো বিশেষ উপলক্ষে কখনও খেলা, কখনও কোনো গুরুত্বপূর্ণ খবর—এসব একসঙ্গে বসে দেখা হয়। তারপর আবার যে যার নিজের জগতে ফিরে যায়। ঘরের এক কোণে টেলিভিশনটি নীরবে পড়ে থাকে।
 
টেলিভিশনটাও যেন এখন একা হয়ে গেছে। একসময় তাকে ঘিরে কত মানুষের ভিড় ছিল! কত কোলাহল, কত হাসি, কত অপেক্ষা! সন্ধ্যা নামলেই তাকে ঘর থেকে বারান্দায় বের করে আনতে হতো। মানুষ এসে জড়ো হতো। শিশুরা সামনে বসার জন্য ঠেলাঠেলি করত। বড়রা পেছনে বসতেন। কোনো দৃশ্যে হাসির রোল উঠত, কোনো দৃশ্যে হাততালি পড়ত। আর এখন সেই টেলিভিশনই যেন আমাদের অপেক্ষায় থাকে। কারণ মানুষের হাতে হাতে এখন মুঠোফোন। আঙুলের সামান্য স্পর্শেই খুলে যায় তার পর্দা। স্ক্রোল করলেই সামনে চলে আসে নতুন সিনেমা, গান, খবর কিংবা রিল। একটা শেষ হওয়ার আগেই আরেকটা এসে হাজির হয়। কোনো অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। বিনোদন এখন আর অপেক্ষার জিনিস নয়; বরং আমরা যখন চাই, তখনই আমাদের সামনে হাজির হয়ে যায়।
 
আর এখানেই আমাদের শৈশবের সঙ্গে আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় পার্থক্য। তখন আমরা অপেক্ষা করতাম—কখন টেলিভিশন চালু হবে, কখন সিনেমা শুরু হবে, কখন ক্রিকেট খেলা দেখব। কখনও পুরো সপ্তাহ অপেক্ষা করতাম একটা সিনেমার জন্য। সিনেমা শুরু হয়ে গেলে মাঝপথে উঠে যাওয়ার প্রশ্নই ছিল না। কারণ জানতাম, আবার কখন এমন সুযোগ আসবে কে জানে! আর এখন? সবকিছু হাতের মুঠোয়। অপেক্ষা নেই। অভাব নেই। খুঁজে পাওয়ার কষ্ট নেই। তবু কোথাযও যেন সেই আনন্দটা নেই।
 
আজ প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে টেলিভিশন আছে। তবে টেলিভিশনের সামনে মানুষ নেই। আর তাই কখনও বাড়ির কোণে নীরবে পড়ে থাকা টেলিভিশনটির দিকে তাকালে মনে হয়—সে শুধু একটি যন্ত্র নয়; সে যেন আমাদের ফেলে আসা শৈশবেরও এক নীরব সাক্ষী। একদিন তার পর্দার দিকে তাকানোর জন্য আমরা কতটা ব্যাকুল ছিলাম। ঘর থেকে বের করে দেওয়ার পরও জানালার ফাঁক খুঁজে নিতাম। বন্ধ জানালার গায়ে চোখ রেখে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতাম। একটি সিনেমা দেখার জন্য কতটা পথ দৌড়ে যেতাম, কত অপেক্ষা করতাম। একটি ছোট্ট রঙিন পর্দা কীভাবে আমাদের শৈশবকে রঙিন করে দিয়েছিল! আজ সেই একই পর্দা ঘরের এক কোণে নীরবে পড়ে আছে। হয়তো কোনো অভিমান, কোনো অভিযোগ ছাড়াই। কখনো মনে হয়, সে যেন আমাদের ফেরার অপেক্ষায় আছে। কিন্তু আমাদের চোখ এখন ছোট্ট মুঠোফোনের পর্দায় বন্দী। যদিও আমাদের শৈশব পড়ে আছে সেই পুরোনো টেলিভিশনের সামনে—মাটির উঠোনে, মাদুরের ওপর, বারান্দার এক কোণে, কিংবা বন্ধ জানালার গায়ে এক চোখ গুঁজে।
 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা