Pages

Wednesday, 7 October 2026

শিকড় থেকে শিখরে - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামার উপক্রম। আমবাগানের গাছপালার ফাঁক দিয়ে রোদের তেজ ধীরে ধীরে কমে আসছে। সারাদিনের খাটাখাটুনিতে ক্লান্ত চার-পাঁচজন শ্রমিক আপনমনে কাজ করে চলেছেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাঁদের কথাবার্তাও চলছে—সংসার, ছেলেমেয়ে, অভাব-অনটন, দেনা-পাওনা, ভবিষ্যৎ ভাবনা নানা বিষয়ে। কথাগুলো হয়তো খুব সাধারণ, কিন্তু প্রতিটি শব্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে জীবনের না-বলা কষ্ট, দীর্ঘশ্বাস ও অপূর্ণতার গল্প। তারই এক ফাঁকে একজন বলে উঠল—
—“হামার বাড়িত আইজ রান্না করিবার মতোন এক মুঠ চাউলও নাই। মহাজন টাকা দিলে চাউল কিনি বাড়িত নিযাম।”  
 
কথাটি তিনি খুব স্বাভাবিকভাবেই বলেছিলেন। আসলে অভাবের সঙ্গে দীর্ঘদিন বসবাস করতে করতে মানুষ নিজের দুঃখকেও খুব সহজভাবে বলতে শিখে যায়। কিন্তু তাঁর সেই কথা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোরের হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে গেল। কিশোরটি ছিল অল্পবয়সি, স্কুলপড়ুয়া। ঘটনাচক্রে সে ছিল ওই আমবাগানের মালিক পরিবারের সন্তান। বয়সে ছোট, কিন্তু তার হৃদয় যেন বয়সের চেয়ে অনেক বড়।
 
গত জুম’আর খুতবায় ইমাম সাহেব বলেছিলেন, “আপনি মোরগ-পোলাও চিবোতে চিবোতে লম্বা লম্বা ঢেকুর তুলেন; আর আপনার পাশের বাড়িতে অভাবে উনুন জ্বলে না, এই আপনার ,মুসলমানিত্ব”—সেই কথা মনে পড়তেই তার গা কাঁটা দিয়ে উঠলো। বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা নামার পালা। শ্রমিকেরা এবার কাজ গুটিয়ে বাড়ি ফিরবেন, ছেলেটি বাড়ির দিকে ছুটে গেল। হেঁসেল থেকে কিছু চাল বের করে একটা গামছায় মুড়ে ছোট্ট একটা পুঁটলি বানাল। তারপর এক মুহূর্তও দেরি না করে পুঁটলি হাতে ছুটল আমবাগানের দিকে। সোজা গিয়ে দাঁড়াল সেই দিনমজুরের সামনে। পুঁটলিটা তাঁর হাতে দিয়ে বলল,
—“কাকা বো, এই চাউললা বাড়িত নি যাও। আইজ রাইতে আন্ধি করে বাড়ির সবাই মিলি পেট ভরি ভাত খাবেন। আর কুনোদিন যুদি এইরম পরিস্থিতি হয়, তাইলে হামার বাড়িত চলি আসিবেন। চাইরটা ভাতের ব্যবস্থা হাঁরা করি দিমোঁ।”  
 
তাঁদের পরিবার ছিল জমিদার-গোছের। এলাকায় তাঁদের প্রচুর জমিজমা ছিল—চৌষা থেকে পুকুরপাড়া পর্যন্ত। লোকজন সেই জমি ইজারা নিত, কেউ ভাগে চাষ করত, কেউ আধিতো। এলাকায় তাঁদের বেশ নামডাক ছিল। বিপদে-আপদে লোকজন সাহায্যের জন্য তাঁদের কাছে ছুটে যেতো। তাই খুব কাছ থেকে সে লোকজনের অভাব-অনটন, দুঃখ-কষ্ট দেখার সুযোগ পেয়েছিল। ফলে ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে জন্ম নিয়েছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক সহজাত প্রবণতা।  
 
তারপর সময় এগিয়ে চলল নিজ নিয়মে। বহু বর্ষা বয়ে গেলো তুলাইয়ের স্রোতে। ছেলেটি ধীরে ধীরে বড় হলো। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দিল মালদায়। কয়েক বছর সেখানে পড়াশোনা করল। তারপর ডিগ্রি সম্পন্ন করে যখন নিজের গ্রামে ফিরে এল, তখন তার সামনে জীবনের এক জটিল প্রশ্ন—এবার কী করবে?
 
সেই সময় সে দেখল—গ্রামের মানুষদেরকে চাল-ডাল, তেল-নুন, মশলাপাতি, সাবান সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে সাপ্তাহিক হাটের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের এই অপেক্ষায় শুধু অসুবিধাই হয় না; বরং দূরত্ব, সময়, দাম এবং প্রাপ্যতার কারণেও তাঁদের নানান সমস্যায় পড়তে হয়।  
 
সে সিদ্ধান্ত নিল—কদমডাঙ্গা মোড়ে একটা বড় মুদিখানার দোকান করবে। এমন একটা দোকান, যেখানে একসঙ্গে চাল-ডাল থেকে শুরু করে তেল, মশলা, সাবান—প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই পাওয়া যাবে। ব্যবসার পাশাপাশি, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস যেন গ্রামের মানুষ হাতের নাগালে পায় এবং ন্যায্য মূল্যে পায়—সেই চেষ্টা থেকেই শুরু হলো তার মুদিখানার ব্যবসা।
 
গ্রামীণ সমাজে কেউ নতুন কিছু করলে যা হয়, তা-ই হলো—সমালোচনা, মন্তব্য, টিটকারি কতকিছু। কেউ কটাক্ষ করে বলল—এসব করার কী দরকার! কিন্তু সে থামল না। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে কাজ করে যেতে লাগল। পাশাপাশি, তাকে পেয়ে বসলো সমাজসেবার নেশা—অসুস্থ মানুষকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া, প্রয়োজনে হাসপাতালে ছুটে যাওয়া, কাউকে ভর্তি করানোর জন্য ছোটাছুটি করা, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার বিষয়ে পরিবারকে সচেতন করা, মানুষকে শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানো ইত্যাদি।
 
মানুষের জন্য সময় দিতে গিয়ে দোকানে সময় দেওয়া কমে গেলো। ফলে তার ব্যবসা স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হলো। কিন্তু জীবনের কিছু ক্ষতি কখনো কখনো অন্য এক ধরনের প্রাপ্তির দরজা খুলে দেয়। মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে তার পরিচিতি বাড়তে লাগল। নানা শ্রেণি, নানা পেশার মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হলো। মানুষ কাছ থেকে তাকে চিনতে শুরু করল। ধীরে ধীরে সেই পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ল। একসময় সেই পরিচয়ের সূত্র ধরেই বিভিন্ন পরিবার থেকে তার জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসতে শুরু করল। শেষে প্রাণসাগরের এক ভদ্রলোক নিজ মেয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠালেন। মেয়েটি শিক্ষিত, চাকরিজীবী। দুই পরিবারের মধ্যে কথাবার্তা হলো, জানাশোনা হলো, ধীরে ধীরে সম্পর্কটি বিবাহবন্ধনে পরিণত হলো।
 
বিয়ের পর তাঁর জীবন এক নতুন পথে বাঁক নিল। স্ত্রীর কর্মস্থলের দরুন তাকে নিজ এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হলো। ফলে মুদিখানার ব্যবসাও ছাড়তে হল। কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নেশা তিনি ছাড়লেন না। বরং নতুন জায়গায় গিয়ে মানুষের সঙ্গে মেলামিশা করে, তাঁদের জীবনযাপন দেখে তাঁর মনে জন্ম নিল—একটা স্কুল গড়ার স্বপ্ন। অতঃপর ২০০১ সালে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন শুরু হলো। শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠা তিনি করলেন বেস আন-নূর মডেল স্কুল।
 
শুরুটা ছিল খুব ছোট পরিসরে। প্রি-নার্সারি, নার্সারি—এই কয়েকটা ক্লাস দিয়ে। কিন্তু স্বপ্ন যখন বড় হয়, তখন ছোট্ট পরিসর বেশিদিন ছোট থাকে না। ধীরে ধীরে স্কুলের পরিধি বাড়ল। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থাও চালু হলো। সেখানকার ছাত্ররা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ভালো স্কুলে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পড়ার সুযোগ পেল।
 
ছোট্ট একটা স্বপ্ন ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। অনেকেই তাঁর সঙ্গে যুক্ত হলেন, স্কুল গড়ে তোলার কাজে অংশ নিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিন্তার পার্থক্য, মতের অমিল—এসবও সামনে এল। একসময় অনেকেই আলাদা পথে চলে গেলেন। ফলে নানা ধরণের সংকট তৈরি হল। কিন্তু তিনি দমে গেলেন না, শক্ত হাতে স্কুলটির হাল ধরলেন। লড়াই জারি রাখলেন। রাতদিন এক করে দিলেন। একের পর এক প্রতিকূলতাকে ডিঙিয়ে নিজ লক্ষ্যে অবিচল থাকলেন।  
 
নার্সারি থেকে শুরু হওয়া সেই প্রতিষ্ঠান বড় হতে হতে একসময় মাধ্যমিক হলো, তারপর উচ্চমাধ্যমিক। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদের জন্য আলাদা শাখা প্রতিষ্ঠিত হলো। কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হলো। পরবর্তীতে বিভিন্ন জেলায় তার শাখা গড়ে উঠতে শুরু করল। আর আজ সেই প্রতিষ্ঠান উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা-পরিসরেও তার একটা উল্লেখযোগ্য স্থান তৈরি হয়েছে।
 
কিন্তু তাঁর স্বপ্ন শুধু শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে থাকেনি। শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও নানা উদ্যোগ নিয়ে চলেছেন তিনি। ঈদ মিলন অনুষ্ঠান, শীতকালে দরিদ্র মানুষদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ, আর্ত ও পীড়িত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো, শিকড়ের টানে গ্রামে ফিরে এলাকাবাসীর সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়া, বন্যা কিংবা অন্য কোনো দুর্যোগে পাশে দাঁড়ানো। এর পাশাপাশি শুরু হল বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক চর্চা। মানুষের মধ্যে নতুন চিন্তা, নতুন চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া; প্রচলিত সামাজিক চিন্তাভাবনাকে কখনও প্রশ্ন করা; সমাজকে আরও মানবিক, শিক্ষিত ও সচেতন পথে এগিয়ে দেওয়া ইত্যাদি।  
 
কিছুদিন আগে, হরিপুরে গার্লস শাখার নতুন ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছিল। প্রচণ্ড রোদ সেদিন। মাথার উপর যেন আগুন ঝরছে। ছাদে রড বাঁধার কাজে ব্যস্ত শ্রমিক ও মিস্ত্রিরা। তীব্র গরমে তারা দরদর করে ঘামছে। তাঁদের শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। তিনি নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কাজকর্ম তদারকির উদ্দেশ্যে একসময় ছাদে উঠলেন। দেখলেন, ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়েও সেই গরম সহ্য করা যাচ্ছে না। অথচ শ্রমিকেরা ছাতা ছাড়াই সেই প্রখর রোদে কাজ করে চলেছেন। বিষয়টি তাঁর মনকে ব্যথিত করল। দ্রুত নিচে নেমে স্কুলের কর্মচারীদের বললেন, শরবতের ব্যবস্থা করতে।
 
গুলকন্ডি ইত্যাদি দিয়ে শরবত তৈরি করা হলো। অন্য কাউকে দিয়ে সেই শরবত তিনি অনায়াসে উপরে পাঠিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তা করলেন না। নিজেই শরবতের বালতি হাতে নিয়ে ছাদে উঠলেন। একে একে শ্রমিক, মিস্ত্রি ও কর্মচারীদের নিজ হাতে শরবত পান করালেন।
 
দৃশ্যটা হয়তো খুব সাধারণ। কিন্তু এই সামান্য দৃশ্যের মধ্যেই যেন বহু বছরের একটা কাহিনী লুকিয়ে আছে। সেদিন আমবাগানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কিশোরের হাতে ছিল এক পুঁটলি চাল আর আজ এত বছর পরে, সেই একই মানুষ নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন এক বালতি শরবত। সময় ও জায়গা বদলেছে। পরিস্থিতিও বদলেছে। ছোট্ট আমবাগানের জায়গায় এক বিশাল শিক্ষাঙ্গন। সেই কিশোর আজ সেই বৃহৎ শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন ও দায়িত্ব বহন করছেন। শুধু বদলায়নি একটা জিনিস—মানুষের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ। তখন একজন শ্রমিকের ঘরে রাতের ভাতের ব্যবস্থা করতে তিনি এক পুঁটলি চাল নিয়ে ছুটেছিলেন। আর আজ শ্রমিকদের তৃষ্ণা মেটাতে নিজেই শরবতের বালতি হাতে ছাদে উঠেছেন। এই দৃশ্য দু’টির মধ্যে ব্যবধান হয়তো কয়েক দশকের। কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব একটুও বাড়েনি।
 
আমরা যারা তাঁর এই দীর্ঘ পথচলার কোনো না কোনো পর্বের সাক্ষী, আমাদের কাছে এই কথাগুলো শুধু একজন ব্যক্তির সাফল্যের গল্প নয়। এ গল্প হল অন্যের জন্য কিছু করার প্রবণতা ও মানসিকতার। একটা ছোট্ট আমবাগান থেকে শুরু হওয়া সেই সফর আজ এক বিশাল শিক্ষাঙ্গনের ছায়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। এক পুঁটলি চাল থেকে হাজার হাজার শিশুর স্বপ্নপূরণের ঠিকানায়। তবে তাঁর শিকড় এখনও মাটির গভীরে—তুলাইয়ের তল্লাটে সেই প্রত্যন্ত গ্রামে, চাষাভুষা দিনমজুরদের মাঝে, আমবাগানের পাতায় লেগে থাকা গোধূলি আলোয়, যেখানে সেদিনের সেই কিশোর, আজকের খাদেমুল ইসলাম প্রথম শিখেছিল— মানুষের পাশে দাঁড়াতে বড় কিছু লাগে না, লাগে শুধু একটা মানবিক মন, একটা সংবেদনশীল হৃদয়। 
 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা 

Saturday, 3 October 2026

নাগালের বাইরে নানুদের উঠোন - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


অগ্রহায়ণের দিন সবে পড়েছে। শীত তখনও পুরোপুরি নামেনি। কাকভোরে উঠে মেজো আব্বা, আব্বা, আমি, সুলতান দা ও আমরুল—আমরা বেরিয়ে পড়লাম মানপারের উদ্দেশ্যে। খানিকটা পথ যেতেই টের পেলাম, ভোরের বাতাসে লেপটে আছে শীতের আগমনী বার্তা। মাঠে ঘাসের ডগায় দু-এক ফোঁটা শিশির বিন্দু। কুয়াশার পাতলা পর্দা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে আর সকালের মিঠে রোদ আস্তে আস্তে মাটির গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
 
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম মানপারে, আমাদের ভিটে জমিগুলোতে। বেগুন ও লঙ্কার চারা রোপণের সময় ঘনিয়ে এসেছে। তার আগে জমিগুলোকে ভালো করে চষে তৈরি করতে হবে। আগাছা পরিষ্কার করতে হবে, জমির বুক নরম করতে হবে, তাকে চারা রোপণের উপয্যক্ত করে তুলতে হবে।  
 
মেজো আব্বা হাল বাইতে আরম্ভ করলেন। আমি তাঁর কাছাকাছি একটা আলের উপর বসে পড়লাম। তখন আমি খুব ছোট; হালচাষের কৌশল, মাটির অর্থনীতির, ফসলের সঙ্গে পরিবারের ভবিষ্যতের কী সম্পর্ক কিছুই জানতাম না। মাঠ মানেই আমার কাছে বিশাল এক খেলার জায়গা। হাল একটা মজার জিনিস। আর গরু দু’টো যেন আমার খেলায় অংশ নেওয়া দু’টো বড় প্রাণী।
 
মেজো আব্বা হাল বাইতে বাইতে আমাকে জ্বিন-পরীদের গল্প শোনাচ্ছিলেন। আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম। শুনতে শুনতে কখনও মাটির ঢেলা এধারওধার ছুঁড়ছিলাম, কখনও গরুগুলোর এক ছন্দে হেঁটে যাওয়া দেখছিলাম, আবার কখনো কথার ফাঁকে ফাঁকে মেজোআব্বাকে এটা-ওটা জিজ্ঞেস করছিলাম। বেলা একটু গড়াতেই কাজের লোকটা লাহারি নিয়ে হাজির হলো। মেজো আব্বা হাল থামিয়ে বললেন,
— “চলো, খিদে পেয়েছে, আগে খাওয়াদাওয়া করে নিই, তারপর না হয় অন্য কাজগুলো হবে।” 
আমরা বসে পড়লাম। খেতে খেতে হঠাৎ মেজো আব্বা আমাকে বললেন,
— “মাতিন, তুমি গিয়ে একবার হালটা ধরো তো বাবা।”
আমি যেন খুব বড় কোনো দায়িত্ব পেয়ে গেলাম। কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছিলো না,
— “আমি ধরবো, আব্বা?!”
— “হ্যাঁ, ধরো। শিখবে না? কী করে খাবে ভবিষ্যতে”
 
আমি দু’ হাতে হালের মুঠিয়াটা ধরে দাঁড়ালাম। তারপর যা হওয়ার তা-ই হলো। দু’ কদম এগোতেই, মুঠিয়াটা বেঁকে গেলো, লাঙল একদিকে কাত হয়ে পড়ল, গরু দু’টোও নিজের মতো করে এগোতে লাগলো। মেজো আব্বা হেসে বললেন,
— “আরে, এভাবে নয়!”
আমি আরও শক্ত করে ধরলাম।
— “আরে, থামো থামো!”
তিনি খেতে-খেতে উঠে আসলেন। আমার হাত ধরে ধীরে ধীরে বুঝিয়ে দিলেন।
— “মুঠিয়াটা এভাবে ধরবে। আস্তে আস্তে হাঁটবে। লাঙলের মাথাটা সোজা রাখবে। হড়বড় করবে না, গরু দুটোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটবে।”
 
তখন বুঝিনি, তাঁর সেই কথার মধ্যেও যে জীবনের একটা শিক্ষা লুকিয়ে ছিল—সবকিছুকে নিজের ইচ্ছেমতো টেনে নেওয়া যায় না; কিছু জিনিসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন,
— “চলে এসো, এবার নাস্তা করো।”
সবাই একসাথে বসে নাস্তা করতে লাগলাম। আমি খাচ্ছি। মেজো আব্বাও খাচ্ছেন। দূরে গরুগুলো দাঁড়িয়ে আছে। সকালের রোদ একটু একটু করে তেজী হচ্ছে। হঠাৎ মেজো আব্বা দূরের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “ওই গ্রামটা দেখতে পাচ্ছো, বাবু?”
 
আমি মুখ তুলে তাকালাম। দূরে একটা গ্রাম। খুব দূরে নয়। আমাদের চোখের নাগালের মধ্যেই। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, কয়েকটা বাড়ির টিনের ছাউনি রোদের আলোয় চকচক করছে। লিকলিকে নারকেল গাছগুলো সকালের হালকা বাতাসে মাথা দুলাচ্ছে। তালগাছ ও আমগাছের মাথাও আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে। মেজো আব্বা আঙুল তুলে বললেন,
— “ওই যে, ওই টিনের দোতলা বাড়িটা দেখতে পাচ্ছো?”
আমি চোখ ছোট করে তাকালাম।
— “ওইটা?”
— “হ্যাঁ, ওইটা।”
তারপর তিনি কাঁচা লংকায় একটা কামড় দিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই বললেন,
— “ওটা তোমার নানুদের বাড়ি।”
আমি খাওয়া থামিয়ে দিলাম।
— “আমার নানুদের বাড়ি?”
— “হ্যাঁ।”
 
আমি আবার তাকালাম। কিন্তু আমার ছোট্ট মাথায় তখন একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে। নানুদের বাড়ি যদি এত কাছে হয়, তাহলে নানুদের এই বাড়ি আমার যাওয়া হয় না কেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— “মেজো আব্বা, আপনি নানুদের বাড়ি যান?”
— “যাই।”
— “তাহলে আমি যাই না কেন?”
মেজো আব্বা একটু হেসে বললেন,
— “ওটা তো আর আমাদের দেশ নয়।”
আমি অবাক হয়ে গেলাম।
— “দেশ নয়?!”
— “ওটা বাংলাদেশ।”
 
বাংলাদেশ। শব্দটা আমার পূর্বপরিচিত। কিন্তু সেদিন শব্দটা যেন নতুন অর্থ নিয়ে আমার সামনে হাজির হল। আমি দূরের বাড়িটার দিকে তাকিয়ে ভাবলাম—এটা তাহলে বাংলাদেশ? কিন্তু দেখতে তো আমাদের গ্রামের মতোই! ওখানেও বাড়ি আছে। গাছ আছে। পুকুর আছে। পাখি আছে। তাহলে আলাদা কী? আমি আবার প্রশ্ন করলাম,
— “মেজো আব্বা, ওখানে কি মানুষ থাকে?”
তিনি হেসে বললেন,
— “থাকে তো! কেন তোমার নানুভাই, নানীমা, তোমার মামারা থাকেন!”
— “আমাদের মতো করে?”
— “হ্যাঁ, আমাদের মতোই।”
 
আমি আরও অবাক হলাম। আমার শিশুমনে তখন দেশ বলতে নিজের পরিচিত গণ্ডির বাইরে আর কিছু ছিল না। আমার কাছে পৃথিবীটা ছিল খুব ছোট—বাড়ি, উঠোন, পাশের বাড়ি, খেলার মাঠ, পুকুর, পাড়ার স্কুল, এলাকার মক্তব, বাজার, আর পরিচিত কিছু মানুষের মুখ। তার বাইরে পৃথিবী কেমন, কোথায় শেষ হয়, আমি জানতাম না। তাই দূরের ওই গ্রামটাকে দেখে আমার মনে হচ্ছিল—এত কাছে থেকেও কী করে অন্য দেশ হয়? আমি মেজো আব্বাকে জিজ্ঞেস করলাম,
— “আব্বা, সেখানে যাবো কীভাবে?”
— “ওখানে যেতে কাগজ লাগে।”
— “কী কাগজ, আব্বা?”
— “পাসপোর্ট।”
 
পাসপোর্ট শব্দটা শুনে একটু থমকালাম। আমার অভিধানে এক নতুন শব্দ এলো। এ নিশ্চয়ই কোনো অদ্ভুত জিনিস।
— “আপনার পাসপোর্ট আছে, আব্বা?”
— “আছে।”
— “তাহলে আপনি গেলে আমাকে নিয়ে যাবেন?”
মেজো আব্বা একটু হাসলেন। বললেন,
—“একদিন নিয়ে যাবো।”
 
তাঁর জবাবের প্রতি আমার তেমন ভ্রুক্ষেপ ছিল না। আমি তখন ভাবছিলাম—নানুদের বাড়ি যেতে হলে কাগজ লাগে! নানুদের বাড়ি মানে নানুদের বাড়িই। সেখানে দেশ কোথা থেকে এলো? আমি দূরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বাড়িটাকে যেন আরও কাছে দেখতে পেলাম। টিনের ছাউনি। নারকেল গাছ। তালগাছ। আমগাছ। সবই তো আমাদের মতো!
 
মনে মনে ভাবতে লাগলাম, নানুভাই এখন কোথায়, বাড়ির উঠোনে নাকি অন্য কোথাও? নানিমা কি এখন হেঁসেলে, রান্নাবান্না করছেন? আচ্ছা আমি যদি খুব জোরে ডাক দিই—“নানু, নানু!” বলে, শব্দটা কি পৌঁছাবে ওপারে…  
মেজো আব্বার ডাকে সম্বিত ফিরে পেলাম, আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
— “কী হল বাবু, খাও।”
আমি আবার খেতে শুরু করলাম। ঠিক তখনই কোথা থেকে দু’টো শালিক উড়ে এলো। এসে লাঙলের মুঠিয়াটার উপর বসল। তাদের কিচিরমিচির ডাকে গরুগুলো নড়েচড়ে উঠতেই লাঙলটা দুলে উঠল। মেজো আব্বা বললেন,
— “বাবু, এই পাখি দু’টোকে তাড়াও। নাহলে গরুগুলো বেশি নড়াচড়া করলে জোয়াল ফসকে লাঙলটা পড়ে যাবে।”
 
আমি মাটির একটা ছোট্ট ঢেলা তুলে বাঁ হাতে শালিক দু’টোর দিকে ছুঁড়ে মারলাম। শালিক দু’টো ভয় পেয়ে উড়ে গেল। আমি রুটি চিবোতে চিবোতে তাকিয়ে রইলাম। পাখি দু’টো প্রথমে আমাদের জমির উপর দিয়ে উড়াল দিল। তারপর পাশের ছোট্ট নালাটার উপর দিয়ে সোজা চলে গেল সেই গ্রামটার দিকে—যে গ্রামে আমার আরেক নানুর বাড়ি; তাদের কাছে কিন্তু ওই জরুরী কাগজটা ছিল না, তবুও। আসলে মানুষের আঁকা সীমারেখা পাখিরা যে পড়তে পারে না। মানচিত্রের ভাগবণ্টন তারা তো বোঝে না। তাদের মানচিত্র হল প্রকৃতি। আর পুরো আকাশটাই তাদের দেশ।
 
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা

Sunday, 27 September 2026

এক হাতে টর্চ, অন্য হাতে কোঁচা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



রাতের প্রথম প্রহর। চারদিক গভীর অন্ধকারে ডুবে। আকাশ ভেঙে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামছে। মুষলধার বৃষ্টির শব্দে চারপাশে যেন এক অদৃশ্য সুর বেজে চলেছে। সেই ভারী বর্ষণকে উপেক্ষা করে এক স্কুলপড়ুয়া কিশোর নিঃশব্দে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। এক হাতে তার কোঁচা, অন্য হাতে একটি টর্চ। গন্তব্য বাটুয়া দীঘির নালা। ধীরে ধীরে সে গিয়ে দাঁড়াল নালার মুখে। দেখল, বৃষ্টির জল পুকুরের পানিতে মিশে এক অন্য রকম আবহ তৈরি করেছে। নতুন জলের স্বাদ পেয়ে পুকুরের মাছেরা যেন উৎসবে মেতে উঠেছে। একে একে তারা গভীর জল ছেড়ে নালার দিকে উঠে আসছে।  
 
কিশোরটি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে মাছেদের খেলা। এক হাতে তার কোঁচা (যাকে বিভিন্ন অঞ্চলে টেঁটা, কোচ ও শলাকা বলা হয়), আর অন্য হাতে টর্চ। টর্চের আলোয় জলের বুক চিরে মাছেদের আসা-যাওয়া সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছে। কাছে আসা কয়েকটি মাগুরকে সাবধানে ধরে থলেতে ভরলো। মাছ ধরার আনন্দের চেয়েও তখন যেন তার কাছে বড় হয়ে উঠলো মাছেদের এই রহস্যময় জগৎকে কাছ থেকে দেখা।
 
এভাবে কেটে গেল প্রায় দেড়-দু ঘণ্টা। হঠাৎ সেই রাতটিকে আরও স্মরণীয় করে তুলল আরেক অতিথি। একটি মাছোয়া সাপ—সেও এসেছে তার রাতের শিকারে। অন্ধকারের মধ্যে নিঃশব্দে, ধীর শরীরে বেঁকে বেঁকে, সাপটি এগিয়ে এসে একসময় কিশোরটির ডান পায়ের উপর উঠে পড়ল। যখন সে টের পেল, মুহূর্তের জন্য তার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন হিম হয়ে গেল। সামান্য নড়াচড়া করলেই সাপটি ভয় পেয়ে যাবে; আর ভয় পেলেই ছোবল দেবে। তাই সে স্থির হয়ে গেল। একেবারে গাছের মতো। পাথরের মতো। নিঃশ্বাসটুকুও যেন হিসেব করে নিতে লাগল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ তার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। টর্চের আলোর প্রতিফলন যে দিকে পড়ছিল, সে লক্ষ করল—সাপটির দৃষ্টি সেদিকেই নিবদ্ধ। কিশোরটি খুব ধীরে, অত্যন্ত সাবধানে টর্চের আলো সরাতে শুরু করল। আলো একটু সরল। সাপটিও একটু সরল। আলো আরও দূরে গেল। সাপটিও তার পায়ের ওপর থেকে ধীরে ধীরে নেমে গেল। তারপর, আরও একটু দূরে, আরও একটু দূরে—শেষ পর্যন্ত অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
 
কিশোরটি তখনও ঠাই দাঁড়িয়ে। আরও কিছুক্ষণ সে মাছেদের সেই খেলা দেখল। তারপর থলেতে রাখা মাছগুলো নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো। তবে সে জানত না—সেই রাতে শুধু কয়েকটি মাছই তার থলেতে ওঠেনি; তার জীবনের ভেতরেও উঠে এসেছিল এক অদ্ভুত ভালোবাসা। মাছের প্রতি ভালোবাসা। জলের প্রতি ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসাই একদিন তাকে যে অনেক দূর নিয়ে যাবে—সে কথা তখনও সে জানত না।
 
পড়াশোনার জন্য একসময় তাকে পার্শ্ববর্তী ছোট্ট শহর কালিয়াগঞ্জে যেতে হলো। সেখানে একটি হিন্দু বাড়িতে ভাড়া থাকতে লাগলো। পড়াশোনার পাশাপাশি তার কৌতূহল তখন ক্রমশ এক অদ্ভুত দিকে মোড় নিতে লাগলো। অবসর পেলেই সে চলে যেত কাছের মাছবাজারে। কখনো মাছের আড়তে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখত মাছ ওঠানামা করছে, দরদাম হচ্ছে, ব্যবসায়ীরা হিসাব করছে। শুধু দেখা নয়—সে প্রশ্ন করত। এই মাছের দাম এত বেশি কেন? এই মাছের চাহিদা বেশি কেন? কোন মাছ কত দ্রুত বাড়ে? কোন মাছের খাদ্য কী? কোন মাছ কোথায় ভালো হয়? ইত্যাদি।
 
আড়তদারদের কাছ থেকে সে জানতে চাইত মাছের বাজার, দরদাম, মুনাফা—সবকিছু। মাছ বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে তাদের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার থেকেও সে শিখে নিত অজস্র কথা। আর যে বাড়িতে সে ভাড়া থাকত, সেই বাড়ির ভদ্রমহিলাকেও সে ছাড়ত না। সস্নেহে যাঁকে সে ‘জেঠিমা’ বলে ডাকত, তাঁর কাছেও ছিল তার অগণিত প্রশ্ন। কোন মাছ দিয়ে কোন পদ ভালো হয়? কীভাবে মাছ রান্না করলে স্বাদ বাড়ে? কোন মাছ কীভাবে পরিষ্কার করতে হয়? কোন মাছের সঙ্গে কোন মশলা মানায়? মাছ যেন তার কাছে শুধু একটি খাদ্য ছিল না। মাছ হয়ে উঠেছিল একটি বিস্তৃত জগৎ—যার মধ্যে বাজার আছে, বিজ্ঞান আছে, অর্থনীতি আছে, রান্না আছে, প্রকৃতি আছে; আর আছে মানুষের বহু পুরোনো জীবনযাত্রার ইতিহাস। তার কৌতূহল দিন দিন গভীরতর হতে লাগল।
 
গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে সে বাড়ি ফিরে এল। ফিরেই ভাবতে শুরু করল—নিজেদের পুকুরে মাছ চাষ করা যায় কি না। শুরু হলো ছোট্ট করে। নিজের পুকুরে টুকটাক মাছ চাষ। বইপত্র ঘাঁটা। অভিজ্ঞ মানুষদের সঙ্গে কথা বলা। মাছের খাদ্য, পানির গুণমান, পোনা ছাড়ার সময়, প্রজাতি নির্বাচন—সবকিছু বোঝার চেষ্টা। কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই সে বুঝে গেল—শুধু আগ্রহ দিয়ে মাছ চাষ করা যায় না। এর পেছনে বিজ্ঞান আছে, প্রযুক্তি আছে, নিয়ম আছে, গবেষণা আছে।
 
তখনই তার মনে হলো—মাছ নিয়ে আরও পড়াশোনা করা দরকার। শুরু হলো খোঁজখবর। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে বেড়ানো। তথ্য সংগ্রহ। নানা মানুষের সঙ্গে কথা বলা। অবশেষে জানতে পারল, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মৎস্যবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। সুযোগ পাওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু যে মানুষটির কাছে মাছ তখন আর নিছক শখ নয়, মাছ নেশা ও ভালোবাসা—তার কাছে কঠিন পথও তখন আর কঠিন হয়ে থাকল না।
 
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে শেষ পর্যন্ত সে সুযোগ পেল। প্রায় চার বছর কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে মাছ নিয়ে পড়াশোনা করল। তবে তার পড়াশোনার উদ্দেশ্য ছিল অন্যরকম। অন্যরা হয়তো ডিগ্রি নিয়ে চাকরির বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তার চোখে তখন চাকরি ছিল না। ছিল মাছ। ছিল মাছকে বোঝার চেষ্টা। ছিল মাছ চাষকে বৈজ্ঞানিকভাবে জানার আকাঙ্ক্ষা। মাছের বৈজ্ঞানিক নাম থেকে শুরু করে তাদের খাদ্যাভ্যাস, বৃদ্ধি, প্রজনন, জলজ পরিবেশ, চাষের আধুনিক পদ্ধতি—একটার পর একটা বিষয় সে শিখতে লাগল। সে পড়াশোনা করছিল চাকরি পাওয়ার জন্য নয়; শেখার জন্য। মাছকে ভালোবেসে। মাছ চাষকে ভালোবেসে। আর একদিন নিজের হাতে শেখা জ্ঞানকে মাটির সঙ্গে, জলের সঙ্গে, বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে—এই স্বপ্নে।
 
কোর্স শেষ হলো। সে আবার বাড়ি ফিরল। এবার আর আগের সেই তরুণটি নয়। এবার তার হাতে অভিজ্ঞতা, মাথায় বিজ্ঞান, আর বুকের মধ্যে বহুদিনের স্বপ্ন। নতুন উদ্যোগে শুরু হলো মাছ চাষ। প্রচলিত পদ্ধতির সঙ্গে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান মিলিয়ে একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে লাগল সে। মাছের খাবার নিয়ে ভাবল, পানির গুণমান নিয়ে পরীক্ষা করল, মাছের বৃদ্ধির হার পর্যবেক্ষণ করল। নিজের হাতে তৈরি করতে লাগল জৈব পদ্ধতিতে মাছের খাবার। কখনো নৌকা নিয়ে পুকুরের মাঝখানে চলে যেত। সেখান থেকে বিশেষ কৌশলে মাছের খাবার ছড়িয়ে দিত। আর মানুষ পাড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখত।
 
একসময় যে ছেলেটিকে মাছ ধরতে দেখে মানুষ বলত, নিছক শখের ছলে করছে; এবার সেই ছেলেটির কাজ দেখতে মানুষ আগ্রহ নিয়ে ভিড় করতে শুরু করল। তার পরিশ্রম ধীরে ধীরে ফল দিতে লাগল। অল্প সময়ে ছোট্ট কাতলা বড় হতে হতে চার-পাঁচ কিলোর মাছ হয়ে উঠতে লাগল। পুকুরে শুরু হলো চিতল মাছের চাষ। একেকটি চিতল দশ কিলো, বারো কিলো, পনেরো কিলো—এমনকি তারও বেশি ওজনের হতে লাগল। মাছ বড় হচ্ছে। উৎপাদন বাড়ছে। মুনাফা আসছে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে তার স্বপ্নও।
 
ঠিক তখনই তার সামনে এলো আরেকটি পথ। তার ডিগ্রি, ভালো ফলাফল এবং মৎস্যচাষে দক্ষতার কারণে চাকরির সুযোগ এল। বাড়ির লোকজন বোঝাতে লাগলেন— চাকরিটা নিয়ে নাও। স্থায়ী চাকরি। সম্মান আছে। নিরাপত্তা আছে। আত্মীয়স্বজন, পাড়াপড়শি এমনকি বন্ধুরাও বলল। কিন্তু সে রাজি হলো না। তার উত্তর ছিল একটাই— “আমি চাকরি করার জন্য এই ডিগ্রি করিনি।” আরও বলল, “আমি মাছকে ভালোবেসে এসব পড়াশোনা করেছি। মাছ চাষকে ভালোবেসে শিখেছি। আমি জানতে চেয়েছি, এই জ্ঞান দিয়ে নতুন কিছু করা যায় কি না। ডিগ্রিটা আমার কাছে চাকরির দরজা খোলার চাবি নয়; ডিগ্রিটা আমার শেখার পথ।” সে চাকরি নিল না। সবাই যখন নিরাপদ পথের দিকে যেতে বলছে, তখন সে বেছে নিল অনিশ্চিত পথকে। কারণ তার কাছে স্বপ্নের মূল্য চাকরির নিরাপত্তার চেয়েও বেশি।
 
তারপর শুরু হলো বিস্তারের গল্প। একটার পর একটা পুকুর। প্রথমে নিজের পুকুর। তারপর পাশের একটা। তারপর আরও একটা। প্রতি বছর নতুন পুকুর ইজারা নিতে লাগল সে। একসময় তার অধীনে প্রায় চল্লিশ হেক্টরের মতো জলাশয় চলে এল। তার মাছ চাষ তখন আর পারিবারিক পর্যায়ের কাজ নয়—একটি বড় উদ্যোগ। খবরের কাগজে তাকে নিয়ে লেখা শুরু হলো। ব্লক স্তর থেকে জেলা, জেলা থেকে রাজ্য—বিভিন্ন পর্যায়ে সে পুরস্কৃত হলো। মৎস্য দপ্তর তাকে উৎসাহ দিল। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সহায়তা এল। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ঋণের ব্যবস্থাও হলো।
 
সে আর থামল না। একসময় একে একে বড় বড় ঐতিহাসিক দিঘিও তার মাছ চাষের আওতায় এল—মহিপাল দিঘি, ঢোল দিঘি, কাল দিঘি, মালিয়ান দিঘির মতো বিশাল বিশাল জলাশয়। তার কাজ তখন শুধু ব্যবসায়ীদের চোখে নয়, বিজ্ঞানীদের চোখেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। বিভিন্ন মৎস্যবিজ্ঞানী তার চাষের পদ্ধতি দেখতে এলেন। তার কাজ নিয়ে গবেষণা হলো। কেউ প্রবন্ধ লিখলেন। কেউ তার পদ্ধতি নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেন। কেউ ব্যক্তিগতভাবে ডেকে তার অভিজ্ঞতা শুনলেন। একসময় যে ছেলেটি মাছ ধরতে গিয়ে মাছের দিকে তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত, তার মাছ চাষের পদ্ধতি নিয়ে বিজ্ঞানীরা আগ্রহী হয়ে উঠলেন। জীবন কখনো কখনো এভাবেই বৃত্ত সম্পূর্ণ করে।
 
কিন্তু তার স্বপ্ন এখানেই থেমে থাকেনি। বরং এখান থেকেই তার স্বপ্নের আরেকটি অধ্যায় শুরু হলো। সে বুঝতে পারল—একের পর এক পুকুর ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করা তার চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। তাই একসময় নতুন পুকুর ইজারা নেওয়া বন্ধ করে দিল। যে পুকুরগুলো আগে ইজারা নিয়েছিল, সেগুলোও ধীরে ধীরে ছেড়ে দিতে শুরু করল। মানুষ অবাক হলো। এত বড় ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছে, কেন?
 
কিন্তু সে জানত, সে পিছিয়ে যাচ্ছে না। সে এগিয়ে যাচ্ছে। নিজের স্বপ্নের দিকে। তুলাই নদীর তীরে ধীরে ধীরে জমি কিনতে শুরু করল। একসময় প্রায় সত্তর-বাহাত্তর বিঘার মতো বিশাল একটা প্লট তার মালিকানায় এলো। সেখানেই শুরু হলো নতুন স্বপ্নের নির্মাণ। জমি কেটে তৈরি হলো একাধিক পুকুর। প্রতিটি পুকুরে আলাদা আলাদা মাছ। কোথাও কই। কোথাও শিঙি। কোথাও মাগুর। কোথাও চিতল। কোথাও কাতল। কোথাও পাবদা। কোথাও ট্যাংরা। এক-একটা পুকুর যেন এক-একটা আলাদা গবেষণাগার। প্রতিটি জলাশয় যেন তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার নতুন পরীক্ষা।
 
তুলাই নদীর গা ঘেঁষে তৈরি করল বিশাল এক বাঁধ। সেই বাঁধ শুধু মাটির বাঁধ নয়—তার স্বপ্নেরও এক প্রান্তরেখা। বাঁধের গায়ে লাগালো নানা ধরনের সবজি। ফুলের গাছ। বিভিন্ন জাতের তুলসী। কালাইসহ নানা ধরনের গাছপালা। প্রতিটি পুকুরের পাড়েও লাগিয়েছে ছোট ছোট গাছ। জল আর মাটির মাঝখানে সে যেন তৈরি করেছে নিজের একটি সবুজ পৃথিবী। সন্ধ্যাবেলা সেখানে দাঁড়ালে মনে হয় অন্য এক জগতে চলে এসেছি। বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে। পেছনে বয়ে চলে তুলাই নদী। সূর্যের শেষ আলো এসে নদীর জলে মিশে যায়। জল তখন সোনালি হয়ে ওঠে। হালকা বাতাস বয়ে যায়। গাছের পাতাগুলো দুলতে থাকে। ফুলের গন্ধ বাতাসে মিশে যায়। আর সেই মানুষটি দাঁড়িয়ে থাকে বাঁধের ওপর। চোখের সামনে তার পুকুরগুলো। পেছনে নদী। চারদিকে সবুজ। মাঝখানে মাছের জলজ পৃথিবী। আর তার চোখের সামনে তখন বাস্তবের দৃশ্যের সঙ্গে মিশে যায় ভবিষ্যতের এক স্বপ্ন।
 
সে স্বপ্ন দেখে—একদিন হয়তো এই পুকুরগুলোকে আরও পরিকল্পিত আকারে সাজাবে। তুলাই নদীর জল একদিক দিয়ে এসে প্রবেশ করবে। নদীর স্বচ্ছ জল পুকুরগুলোর সঙ্গে মিশে যাবে। মাছেরা সেই জলে সাঁতার কাটবে। আর যখন জল অতিরিক্ত হয়ে উঠবে, অন্য দিক দিয়ে তা বেরিয়ে মিশে যাবে নদীর স্রোতে। নদী থেকে জল আসবে, পুকুরে মাছ বেড়ে উঠবে, অতিরিক্ত জল আবার নদীতে ফিরে যাবে—একটি স্বাভাবিক জলচক্রের মতো, প্রকৃতি আর বিজ্ঞান হাত ধরাধরি করে চলবে। এখনও সেই স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তব হয়নি। মাটি আছে। পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতা আছে। অনেক কাজ বাকি। কিন্তু স্বপ্ন তো সবসময় বাস্তবের আগে জন্ম নেয়।
 
আমি যখন তাকে নিয়ে ভাবি, কখনো কখনো মনে হয়, সেই বৃষ্টির রাতে পুকুরের নালায় দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরটি আর আজকের এই মানুষটি যেন একই মানুষ নয়। কিন্তু আসলে তারা একই। সেদিন তার এক হাতে ছিল কোঁচা, আর অন্য হাতে টর্চ। আজ এক হাতে বিজ্ঞান, অন্য হাতে স্বপ্ন। সেদিন সে মাছ ধরতে পুকুরের ধারে দাঁড়িয়েছিল। আজ সে মাছকে বাঁচিয়ে, মাছকে বুঝে, মাছকে ভালোবেসে একটি পৃথিবী গড়ে তুলেছে।
 
আজ যখন তুলাই নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সে তার পুকুরগুলোর দিকে তাকায়, তখন হয়তো তার চোখে শুধু মাছেদের নানা রকম ক্রীড়াকৌতুক দেখা যায় না। তখন তাঁর চোখে দেখা যায়—
বর্ষার সেই রাত।
টর্চের ক্ষীণ আলো।
পায়ের ওপর উঠে আসা এক বিষধর সাপ।
শহরের মাছবাজার।
আড়তদারদেরকে করা অজস্র প্রশ্ন।
জেঠিমার রান্নাঘর।
কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর।  
চাকরি ছেড়ে দেওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত।
ইজারা নেওয়া একের পর এক পুকুর।
পুরস্কার, সম্মান, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, বিজ্ঞানীদের আগ্রহ।
আর সবশেষে দেখা যায়—তুলাই নদীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক মাঝবয়সী মানুষকে, যে এখনও স্বপ্ন দেখে। কারণ অনেকে মাছ চাষ করে শুধু জীবিকা নির্বাহের জন্য। আর সে মাছ চাষ করে ভালোবেসে। তার কাছে পুকুর শুধু একটি জলাশয় নয়। মাছ কেবল উৎপাদনের জিনিস নয়। মাটি শুধু জমি নয়। আর নদী শুধুই নদী নয়। এসবই যেন তার জীবন। আর সেই জীবনের গভীরে, খুব গোপনে, আজও বৃষ্টিভেজা সেই রাতের কিশোরটি দাঁড়িয়ে আছে—এক হাতে কোঁচা ও অন্য হাতে টর্চ নিয়ে; জলের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে দেখছে, কী আশ্চর্য এক পৃথিবী তার সামনে ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে…  
 
সেদিনের সেই কিশোরটি আজকের পশ্চিমবঙ্গ খ্যাত মৎস্যচাষি, তুলাইয়ের তল্লাটে বেড়ে ওঠা এক কৃতি সন্তান— আনিসুর রহমান।
 
৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা