বৈঠকখানার সামনে বসে আমি আপন মনে খেলা করছিলাম। হঠাৎ একটা
কান্নার রোল কানে ভেসে আসলো। হুড়মুড় করে সবাই
সেদিকে ছুটছে দেখে আমিও ছোট ছোট পায়ে গুটি গুটি কদমে এগিয়ে গেলাম। দেখি, জাহানারা
চাচি হাউমাউ করে কাঁদছেন। আর থেকে থেকে বুক চাপড়াচ্ছেন। প্রায় মূর্ছা
যাওয়ার মতো অবস্থা তাঁর। এমন আহাজারির কারণ, তাঁর দুধেল গাইটা আজ হঠাৎ করে মারা
গেছে। সেটাই ছিল তাঁর একমাত্র সম্বল। ওই গাইয়ের দুধ বিক্রি করে যে দু’ পয়সা ঘরে আসত তা দিয়েই তাঁর সংসার চলতো। তাই এবার এক্কেবারে
পথে বসেছেন তিনি। সম্পূর্ণ রূপে নিঃস্ব ও অসহায় হয়ে পড়েছেন।
আমার যতদূর মনে পড়ে, ওই ক’বছর আমাদের
গ্রামে এক অদ্ভুত রকমের মসিবত নেমে এসেছিল। হঠাৎ হঠাৎ গরু মরে যেতো—কখনো পোষানি গরু, কখনো হালের, কখনো দুধেল গাই, কখনো বা বাছুর।
আজ এ বাড়ি তো কাল ও বাড়ি—কার ঘরে কখন যে
বিপদ ঢুকে পড়ে সেঁধিয়ে যায়, কেউই জানে না। আমাদের
ঘরও সেই অদৃশ্য ছায়ার বাইরে ছিল না। একদিন গোধূলি বেলায় আমাদের গাভীটাও আমাদের
সবাইকে ছেড়ে পাড়ি জমায় না-ফেরার দেশে।
আমি তখন খুব ছোট। প্রাইমারী স্কুলের পাশাপাশি গ্রামের
মক্তবে পড়ি। শরীরটা ছিল বেশ নরমসরম, রোগা-পাতলা। সেই কারণেই যখন আমাদের
বাড়ির গাভীটা মারা গেল, বাবা আমার জন্য আলাদা করে দুধের ব্যবস্থা করলেন। গ্রামের
এক পরিচিত ভরসাযোগ্য লোকের বাড়ি থেকে রোজ আধ সের দুধ আসত—শুধু আমার জন্য। কেননা তখন
গ্রামে প্রায় দুধের আকাল চলছে।
আর পাঁচটা দিনের মতো সেদিনও দুধ এনে রাখা হয়েছিল
হেঁশেলের পাশে একটা হাঁড়িতে। বাবা বাইরে
কোথাও কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আমি উঠোনে খেলছিলাম—ছোটদের খেলা যেমন হয়, কখনো দৌড়চ্ছি, কখনো লাফাচ্ছি,
এটা ধরছি, ওটা ছুঁড়ছি। খেলতে খেলতেই অসাবধানতায় আমার পা
লেগে গেল দুধের হাঁড়িতে। মুহূর্তের মধ্যে ছলাৎ করে সব দুধ মাটিতে পড়ে গেল। ঝুকে দেখলাম, হাঁড়িতে
এক ফোঁটাও নেই। আমি স্থির দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। হতবাক। বুকের ভেতরটা
কেঁপে উঠল। ভয় আর অপরাধবোধ একসাথে চেপে বসল মনে। ঠিক তখনই বাবা
বাড়ি ফিরলেন। উঠোনে ঢুকেই তাঁর চোখ পড়ল খালি হাঁড়ির দিকে। একটু থেমে বললেন,
—“দুধলা কী হলি?”
কণ্ঠে রাগের চেয়ে উৎকণ্ঠাই বেশি ছিল বোধ করি। আমি কিছু বলার
আগেই মা এগিয়ে এলেন। তাঁর চোখেমুখে তখন অদ্ভুত এক তাড়াহুড়ো, যেন সময়ের সঙ্গে
পাল্লা দিয়ে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে তাঁকে। বাবা আবার বললেন,
—“মাতিন আইজ কী
খাবি? দুধ না খাইলে ওর
শরীর চলবি কেমন করি?”
মা এক মুহূর্ত থেমে খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন,
—“মোর হাত লাগি
পড়ি গেইছে। হাঁড়িটা সরাবা যাই উল্টেই ফেলেইছু।”
আমি অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকালাম। মা চোখ ফেরালেন। খুব নিচু স্বরে
বললেন,
—“চুপ করি থাক।”
বাবার রাগ তখন দুধের ওপর নয়, নিয়তির ওপর। আপন
মনে বিড়বিড় করতে লাগলেন,
—“গাইটা মরি গেল, মাইনষের বাড়ি
থাকি দুধ আইন্ছু, সেইটাও পড়ি
গেল! ছোয়ালটা মোর খাবি কী? কপালত যে কী আছে...!”
মা জানতেন, সত্যিটা যদি বলে দেন— “মাতিন ফেলেই দিছে”, এই ক্ষোভের
মুহূর্তে বাবার হাতও উঠতে পারে। সন্তানের গায়ে আঁচড় লাগুক, এটা তিনি
কোনোভাবেই চাননি। কোনো মা-ই চাইতেন না। তাই নিজের কাঁধেই তুলে নিলেন দোষটা।
কিন্তু বাবার উৎকণ্ঠা কমল না।
—“এনা সাবধানে
থাকিবু তো। এই ছোয়ালটার
দুধেই তো এখন ভরসা!”
মা এবার সংযত কণ্ঠে বললেন,
—“মাইনষেরই তো ভুল
হয়। ইচ্ছা করি তো আর ফেলাওনি।”
কথার পিঠে কথা জমতে জমতে দুশ্চিন্তা রূপ নিল
বিরক্তিতে, বিরক্তি রূপ নিল
ঝগড়ায়। আবেগ, উৎকণ্ঠা, নিয়তি ও অসহায়ত্ব একে অপরকে ধাওয়া করছে। আমি এক পাশে
দাঁড়িয়ে, হতবুদ্ধি ও নির্বাক। ঝগড়ার কেন্দ্রে
আমি—যার জন্য দুধ, যার জন্য রাগ, যার জন্য মিথ্যে, যার জন্য এই
সমস্ত অশান্তি।
সেদিন কেউ আমাকে মারেনি। কিন্তু দুজনের
বুকই কেঁপে উঠছিল আমার জন্য। দুজনেরই উৎকণ্ঠা আমাকে ঘিরে। আজ অনেক বড় হয়ে
বুঝি— ওটা আসলে ঝগড়া
ছিল না। ওটা ছিল
ভালোবাসার দু’ রকম প্রকাশ। ভিন্ন রকমের দুটি অভিব্যক্তি। একজন বাবার কঠিন
কণ্ঠের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অসহায় প্রশ্ন— “ছেলে আজ কী খাবে?” আর একজন মায়ের
নীরব আত্মত্যাগ— যেখানে সত্য নয়, সন্তানের
নিরাপত্তাই সবচেয়ে বড় সত্য।
সেদিন উঠোনের মাটিতে ওই আধ সের দুধ অল্প
কিছুক্ষণের মধ্যেই শুকিয়ে গেছিল, কিন্তু সেই স্মৃতি আজও আমার মানসপটে ভেজা। সেখানে সেদিন
মায়ের মিথ্যায় কোনো ছলনা ছিল না, বাবার রাগ ও উৎকণ্ঠায় নির্মমতা ছিল না, ছিল নিখাদ ভালোবাসা,
যে-ভালোবাসা এই পার্থিব জীবনে মা-বাবা ছাড়া আর কেউ দিতে পারে কি না, আমার জানা নেই।
০৩/০২/২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা



.png)
