কলেজের কাজে সেদিন ছাত্রীদের নিয়ে পার্শ্ববর্তী একটি
হাসপাতালে গিয়েছিলাম। কাজের ফাঁকে হাসপাতালের এক পাশে বসে থাকা এক বৃদ্ধের দিকে
হঠাৎ চোখ আটকে গেল। কোলে ছোট্ট নাতি। বৃদ্ধের হাতে কয়েকটা বিস্কুট। পরম মমতায় একটি
বিস্কুট ভেঙে নাতির মুখে তুলে দিচ্ছেন তিনি। নাতিও কম যায় না। নিজের ছোট্ট হাত
দিয়ে বিস্কুটের খানিকটা ভেঙে দাদুর মুখের সামনে ধরছে। দাদু মুখ বাড়িয়ে নাতির দেওয়া
সেই টুকরোটা খেয়ে নিচ্ছেন। তারপর দু’জনের মুখে হাসি। কী আশ্চর্য এক দৃশ্য! কয়েক
টুকরো বিস্কুটের মধ্যে দিয়ে আদানপ্রদান হচ্ছে নিখাদ ভালোবাসা।
বৃদ্ধের কোলে নাতির নিশ্চিন্ত আশ্রয়, নাতির ছোট্ট
হাতে দাদুর মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চেষ্টা, আর দু’জনের চোখেমুখে ছড়িয়ে থাকা
অনাবিল আনন্দ—সব মিলিয়ে
দৃশ্যটা আমার বুকের কোথায় যেন আলতো করে নাড়া দিল। কত সাধারণ একটা মুহূর্ত, অথচ তার মধ্যে
কী গভীর মায়া! মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত
সম্পদ বুঝি এমন কিছু মুহূর্তের কাছে তুচ্ছ।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলাম। তারপর কখন যে
হাসপাতালের সেই দৃশ্য পেরিয়ে আমার মন ফিরে গেল বহু বছর আগের আমাদের গ্রামে, টেরই পেলাম না।
চোখের সামনে ভেসে উঠল আমাদের বাড়ির উঠোন, চেনা মেঠোপথ, মাদ্রাসা মোড়ের
দোকান, আর একজন মানুষের
মুখ—আমার বাবা। আমার
সন্তানদের দাদু।
দাদু-নাতির সম্পর্কটা বড় অদ্ভুত! সেখানে ভালোবাসা
প্রকাশের জন্য খুব বেশি আয়োজন লাগে না। একটা বিস্কুটের অর্ধেক, একমুঠো মুড়ি, চায়ের দোকানে
পাশাপাশি বসে থাকা, কিংবা হাত ধরে
পাড়ার পথ ধরে একটু ঘুরে আসা—এই সামান্য জিনিসগুলোর মধ্যেই তৈরি হয় এমন এক মায়ার জগৎ, যার গভীরতা
মাপার সাধ্য কারও নেই। সেই জগতে খুনসুটি আছে, অভিমান আছে, ছোট্টখাটো
রাগারাগি আছে; আবার মুহূর্তেই
সব ভুলে গিয়ে একে অপরের গায়ে গা লাগিয়ে বসে থাকার পরম শান্তিও আছে। দাদু আর নাতির
মধ্যে যেন একটা নিজস্ব ভাষা তৈরি হয়, যে ভাষার ব্যাকরণ ভালোবাসা, আর যার প্রতিটি
শব্দের অর্থ—আপন।
আমাদের বাড়ির প্রথম সন্তান পারভেজ। আমার বাবার চোখের
মণি, তাঁর প্রাণের
ধন। নিজের জন্য একটা বিস্কুট আনলেও সেটাকে অর্ধেক ভেঙে নাতির হাতে তুলে দেওয়া ছিল
তাঁর স্বভাব। বিস্কুটটা ছোট হোক কিংবা বড়, নাতির ভাগটা ঠিকই থাকত। বরং অনেক
সময় মনে হতো, বিস্কুটটা যেন
কেনাই হয়েছে নাতির জন্য; দাদু কেবল তার
ভাগটুকুতে একটু ভাগ বসান!
জানুর দোকান হোক কিংবা পচুর দোকান—সকাল-বিকেলের
চায়ের সঙ্গী ছিল সেই নাতি। বাবার পায়ের শব্দ পেলেই পারভেজের যেন আর তর সইত না।
দাদু যেদিকে যেতেন, সেদিকেই তার
ছুটে চলা। দাদু দোকানে বসলে সেও পাশে বসত, দাদু চা খেলে সে বিস্কুটে ভাগ
বসাত। হয়তো তখন তার বয়স এতই কম যে এই সম্পর্কের গভীরতা বোঝার কথা নয়। কিন্তু
শিশুরা কি ভালোবাসার হিসাব বোঝে? তারা কেবল অনুভব করে, কে তাদের কাছে
থাকলে পৃথিবীটা নিরাপদ হয়ে ওঠে, কার কোলে মাথা রাখলে সমস্ত ভয় কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। পারভেজের কাছে
সেই মানুষটি ছিলেন তার দাদু।
তারও প্রায় তিন বছর পর আমাদের ঘরে এল এক কন্যাসন্তান—তাহিনা। বাবা
আদর করে ডাকতেন, ‘কালঠি বু’, অর্থাৎ আমার ছোট
পিসি। তাহিনাকেও তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন। এবার ছবিটা একটু বদলে গেল। বাবার দু’টো
হাতের দু’টো আঙুল আঁকড়ে ধরে নাতি-নাতনি দু’জন তাঁর সঙ্গে পাড়া ঘুরে বেড়াত। কখনও
জানুর দোকান, কখনও পচুর দোকান, কখনও বা গ্রামের
এদিক-ওদিক। চা-বিস্কুটের আসরে দু’জনেরই ভাগ থাকত। দাদুর মুখে গল্প, নাতি-নাতনির
মুখে হাসি—এভাবেই সাধারণ
দিনের মধ্যে অসাধারণ কিছু মুহূর্ত জমা হতে থাকত।
বাবা হয়তো বুঝতেই পারেননি, তাঁর হাতের আঙুল
আঁকড়ে ধরে হাঁটা সেই ছোট্ট দু’টো প্রাণের কাছে তিনি কত বড় এক পৃথিবী।
নাতি-নাতনিরাও তখন জানত না, একদিন এই হাতটাই
আর ছুঁতে পারবে না তারা; এই আঙুল ধরে
হাঁটার স্মৃতিই একসময় হয়ে উঠবে জীবনের অমূল্য সম্পদ।
আরও প্রায় পাঁচ-ছয় বছর পর ঘরে এল আরেক কন্যা—সাদিয়া। তত দিনে
বাবার শরীর আর আগের মতো ছিল না। হাঁটাচলা করতে কষ্ট হতো, শরীর অনেকটাই
ভেঙে পড়েছিল। আগের মতো নাতি-নাতনিদের নিয়ে পাড়া ঘুরে বেড়ানোর শক্তি আর তাঁর ছিল
না। তাই চেয়ারে বসেই সাদিয়াকে কোলে নিয়ে কাটত তাঁর অনেকটা সময়।
শরীর দুর্বল হয়েছিল, কিন্তু ভালোবাসার হাত দু’টো তখনও
ক্লান্ত হয়নি। নিজের ভাগের
মুড়ি কিংবা বিস্কুট ভেঙে সাদিয়ার গালে পুরে দেওয়া যেন তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে
দাঁড়িয়েছিল। সাদিয়াও ছিল দাদু-অন্তপ্রাণ। দাদুর কোল, দাদুর বুক, দাদুর হাত—ওর ছোট্ট পৃথিবী
যেন এই কয়েকটি আশ্রয়কে ঘিরেই আবর্তিত হতো। চেয়ারে বসা দাদুর কাছে গিয়ে বসা, হাতল ধরে দাদুর
গা ঘেঁষে থাকা—এসবের মধ্যেই ওর
কত আনন্দ ছিল!
সাদিয়া যখন একটু একটু করে বড় হতে লাগল, তখন ঘরটাও যেন
নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল। কখনও সে বসতে শিখছে, কখনও হামাগুড়ি দিচ্ছে, কখনও টলমল পায়ে
হাঁটছে। তারপর একদিন সেই টলমল পা-ই ছুটতে শিখল। দৌড়ে এসে দাদুর চেয়ারের হাতলে বসে
পড়ত, কখনও দোল খেত, কখনও তাঁর গায়ে
হেলান দিত। বাবা হয়তো তাকে সামলাতে গিয়ে একটু বিরক্তির ভান করতেন, কিন্তু সেই
বিরক্তির আড়ালে যে কী গভীর প্রশ্রয় লুকিয়ে থাকত, তা বুঝতে কারও অসুবিধা হতো না।
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া একজন মানুষ আর তার কোলে আশ্রয়
নেওয়া এক ছোট্ট শিশু—দু’জনের শরীরের
শক্তি এক ছিল না, কিন্তু
ভালোবাসার টানে তাদের দূরত্ব ছিল না বললেই চলে। দাদুর কোলে সাদিয়া যেমন নিশ্চিন্ত
ছিল, তেমনই সাদিয়ার
উপস্থিতিতে বাবার ক্লান্ত দিনগুলোও যেন একটু আলো পেত।
এরই মধ্যে আরেকটা সুখবর এল—ঘরে আরও এক নতুন
অতিথি আসবে। খবরটা শুনে বাবা খুব খুশি হয়েছিলেন। নতুন নাতি কিংবা নাতনিকে কোলে
নেওয়ার স্বপ্ন নিশ্চয়ই তাঁর মনেও দানা বেঁধেছিল। হয়তো মনে মনে ভেবেছিলেন, আবার একটা ছোট্ট
প্রাণ তাঁর আঙুল আঁকড়ে ধরবে, আবার তাঁর ভাগের বিস্কুটে কেউ ভাগ বসাবে, আবার ঘরের মধ্যে শিশুর হাসি ছড়িয়ে
পড়বে।
কিন্তু জীবন তো সব স্বপ্নকে পূর্ণ হওয়ার অবকাশ দেয়
না। দিন গড়াতে থাকল।
আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাবার শরীরও ক্রমশ ভেঙে পড়তে লাগল। শেষ পর্যন্ত এক
ডিসেম্বরের সকালে, কোনো পূর্বাভাস
ছাড়াই, নিঃশব্দে তিনি
আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। ঘরের পরিচিত মানুষটি হঠাৎ করেই অনুপস্থিত হয়ে গেলেন। যে
মানুষটিকে ঘিরে বাড়ির এতগুলো সকাল-বিকেল কাটত, তাঁর চলে যাওয়ার পর সেই বাড়িতেই
যেন কোথাও একটা নীরবতা স্থায়ীভাবে বসে গেল। বাবার চলে যাওয়ার প্রায় তিন মাস পর
পৃথিবীর আলো দেখল সেই প্রতীক্ষিত অতিথি—ফাওজান।
ফাওজান কখনও তার দাদুকে দেখেনি। দাদুর কোলে চড়ার
সৌভাগ্য তার হয়নি, দাদুর হাত ধরে
পাড়ায় ঘোরার অভিজ্ঞতা তার নেই। দাদুর ভাগের বিস্কুটে ভাগ বসানো, চায়ের দোকানে
পাশে বসে থাকা কিংবা নিজের ছোট্ট হাতে বিস্কুট ভেঙে দাদুর মুখে তুলে দেওয়ার কোনো
স্মৃতিও তার জীবনে নেই। তার কাছে ‘দাদু’ কেবল একটি শব্দ—বড়দের মুখে শোনা, গল্পের মধ্যে
পাওয়া একটি সম্পর্কের নাম।
আমার জীবনও বাবাকে ছাড়াই চলতে থাকল। দিন পেরোল, সপ্তাহ পেরোল, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর।
মানুষ বোধ হয় শোকের সঙ্গেও একসময় বসবাস করতে শিখে যায়। কিন্তু ভুলে যেতে পারে না।
প্রতিদিনের কাজকর্মের ভিড়ে প্রিয়জনের অনুপস্থিতি কখনও চাপা পড়ে থাকে, আবার কোনো একটি
দৃশ্য, কোনো একটি গন্ধ, কোনো একটি
সামান্য ঘটনা হঠাৎ সেই শূন্যতার দরজাটা খুলে দেয়। তখন মনে হয়, এত বছর পরেও
মানুষটা বুঝি এই তো পাশের ঘরে আছেন, একটু পরেই ডাক দেবেন।
বাবা চলে যাওয়ার প্রায় এগারো বছর পর জন্মাল আমার মেয়ে—সাবা। ‘সাবা’ শব্দের অর্থ
সকালের মৃদুমন্দ বাতাস। নামটি বাবার খুব পছন্দের হতো বলেই আমার ধারণা। বাবা যখন সুস্থ
ছিলেন, ফজরের নামাজ পড়ে
খালি পায়ে মেঠোপথ ধরে হাঁটতে বেরিয়ে পড়তেন। পূব দিক থেকে বয়ে আসা ভোরের বাতাসে মন
ভিজিয়ে নিতেন। ভোরের স্নিগ্ধতা, গ্রামের পথ, শিশিরভেজা মাটি
আর বাতাসের কোমল স্পর্শ—এসবের সঙ্গে
তাঁর ছিল এক নিবিড় সম্পর্ক।
কখনও কখনও মনে হয়, সাবা যদি বাবার জীবদ্দশায় জন্মাত, তবে তিনি কি ওকে
কোলে নিয়ে সেই ভোরের বাতাসে হাঁটতে বেরোতেন? ওর ছোট্ট হাতটা নিজের আঙুলের মধ্যে
রেখে মেঠোপথ ধরে এগিয়ে যেতেন? হয়তো ওর গালে হাত বুলিয়ে আদরের কোনো নাম দিতেন। হয়তো নিজের ভাগের বিস্কুটটা
ভেঙে ওর মুখে তুলে দিয়ে অপেক্ষা করতেন, কখন ও-ও একটুখানি ভেঙে দাদুর মুখে
তুলে দেবে।
এসব ভাবনা বাস্তব নয়, তবু মন বারবার সেই অসম্ভব
দৃশ্যগুলোই কল্পনা করে। যে মানুষটি নেই, তাকে ঘিরেই কখনও কখনও সবচেয়ে বেশি
জীবন্ত হয়ে ওঠে আমাদের কল্পনার পৃথিবী।
সাবার জন্মের প্রায় আড়াই বছর পর আমাদের বাড়িতে এল
সর্বকনিষ্ঠ সদস্য—সাওবান। ঘর আবার
শিশুর কোলাহলে ভরে উঠল। ছোট্ট পায়ে দৌড়ঝাঁপ, আধো আধো কথা, আবদার, কান্না, হাসি—সব মিলিয়ে সংসার
তার নিজস্ব ছন্দে চলতে থাকল। কিন্তু এই নতুন প্রাণের কোলাহলের মধ্যেও কোথাও একটা
অপূর্ণতা রয়ে গেল। ঘরে শিশু আছে, অথচ তাদের দাদু নেই। তাদের মাথায় স্নেহের হাত রাখার মানুষটি নেই। তাদের দুষ্টুমিতে
মিথ্যে রাগ দেখিয়ে পরক্ষণেই বুকে টেনে নেওয়ার মানুষটি নেই।
আমাদের পরিবারের প্রথম তিন সন্তান—পারভেজ, তাহিনা আর
সাদিয়া—দাদুকে পেয়েছে।
দাদুর কোলে-কাঁধে চড়েছে, তাঁর হাত ধরে
পাড়া ঘুরেছে, জানুর দোকান আর
পচুর দোকানে গিয়ে চা-বিস্কুটের আসরে ভাগ বসিয়েছে। দাদুর ভাগের মুড়ি, বিস্কুট, এমনকি ভাতেও
তাদের অধিকার ছিল। তারা জানে, দাদুর কোলে মাথা রাখলে কেমন লাগে, দাদুর হাতের স্পর্শ কতটা
নিশ্চিন্তির, আর দাদুর মুখে
নিজের জন্য আদরের ডাক শুনতে কেমন আনন্দ হয়।
কিন্তু পরের তিনজন—ফাওজান, সাবা আর সাওবান—তাদের কারও
কপালে সেই সৌভাগ্য জোটেনি। তারা দাদুকে দেখেনি, তাঁর কণ্ঠস্বর শোনেনি, তাঁর হাতের
স্পর্শ পায়নি। দাদু শব্দটা তারা শিখেছে আর পাঁচটা শব্দের মতো করেই। তাদের কাছে
দাদু এমন এক মানুষ, যাঁর কোনো ছবি
হয়তো আছে, কিছু গল্প আছে, অন্যদের
স্মৃতিতে যাঁর উপস্থিতি আছে; কিন্তু তাদের নিজের জীবনে যাঁর কোনো প্রত্যক্ষ অস্তিত্ব নেই। তাদের দাদু
বেঁচে আছেন গল্পে, পুরোনো স্মৃতিতে, পরিবারের
কথোপকথনে, আর আমার বুকের
গভীরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসে।
মাঝেমধ্যে এই কথাটা ভাবলে বুকের মধ্যে কেমন একটা
হাহাকার ওঠে। একই পরিবারের ছয়টি শিশুর মধ্যে তিনজন দাদুর আদর পেয়েছে, আর বাকি তিনজন
সেই আদরের কথা কেবল শুনেই বড় হচ্ছে। প্রথম তিনজনের স্মৃতিতে দাদু রক্তমাংসের মানুষ; পরের তিনজনের
কাছে তিনি স্মৃতিরও আগের এক অনুপস্থিতি। তাঁরা জানে, তাদেরও একজন দাদু ছিলেন; কিন্তু সেই দাদু
কেমন করে হাসতেন, কীভাবে কোলে
তুলে নিতেন, রাগ করলে কী বলে
মানাতেন—এসব জানার কোনো
উপায় তাদের নেই।
আর আমার? আমি তো জানি, সেই মানুষটি
কেমন ছিলেন। তাঁর ভালোবাসার ধরন জানি, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে তাঁর মধুর
সম্পর্কের গল্পগুলো জানি। তাই হয়তো আমার আক্ষেপটা আরও বেশি। আমি জানি, আমার সন্তানদের
জন্য তিনি কতটা আদরের মানুষ হতে পারতেন। অথচ সেই সম্ভাবনার পৃথিবীটুকু তাঁদের জন্য
চিরকাল বন্ধ হয়ে রইল।
সাবা ইদানীং খুব প্রশ্ন করতে শিখেছে। এই বয়সে
বাচ্চারা যেমন হয়—যা দেখে, যা শোনে, যা বোঝে না, সবকিছুর উত্তর
জানতে চায়। মাঝেমধ্যে হঠাৎ এসে জিজ্ঞেস করে,
—আব্বা, তোমার বাবা কোথায়?
আমি কখনও সহজ করে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু ওর
প্রশ্ন থামে না।
—তোমার বাবা নেই, না?
কখনও আবার নিজেই নিজের মতো করে একটা উত্তর খুঁজে নেয়—
—তোমার বাবা কি
অসুস্থ? তোমার বাবা মারা
গেছে?
তারপর একদিন এমন কথাও বলে বসে, যা শুনে আমার
বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে ওঠে—
—আমি তোমার
বাবাকে ওষুধ দেব। তাহলে তোমার বাবা ভালো হয়ে যাবে?
কী অদ্ভুত শিশুমন! মৃত্যু যে একবার কাউকে নিয়ে গেলে
তাকে আর ফিরিয়ে আনা যায় না, তা সে জানে না।
তার কাছে অসুস্থতা মানেই ওষুধ, আর ওষুধ মানেই সুস্থ হয়ে ওঠা। তাই সে ভাবে, দাদু অসুস্থ হয়ে কোথাও পড়ে আছেন
হয়তো; ওষুধ দিলেই ভালো
হয়ে যাবেন, আবার ফিরে
আসবেন। আবার আব্বার কাছে আসবেন। হয়তো কোলে নেবেন তাকেও।
ওর এই কথাগুলো শুনে আমি কী বলব বুঝে উঠতে পারি না। ওর
নিষ্পাপ বিশ্বাসটুকু ভেঙে দিতে ইচ্ছে করে না। আবার মিথ্যে আশ্বাসও দিতে পারি না।
শুধু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে হয়, ইশ্! সত্যিই যদি কোনো ওষুধ থাকত!
এমন কোনো ওষুধ, যা খাইয়ে মৃত
মানুষকে ফিরিয়ে আনা যায়; এমন কোনো
চিকিৎসা, যা সময়ের
ব্যবধান মুছে দিয়ে একটি শিশুর সঙ্গে তার না-দেখা দাদুর পরিচয় করিয়ে দিতে পারে!
সাবার এই প্রশ্নগুলো আমার কাছে নিছক কৌতূহল নয়। এগুলো
ভালোবাসার এক নিষ্পাপ প্রকাশ—না-দেখা একজন মানুষকে আপন করে নেওয়ার সহজাত আকুলতা। সে তার আব্বাকে ভালোবাসে, তাই আব্বার
বাবাকেও ভালোবাসতে চায়। সে মানুষটিকে কোনো দিন দেখেনি; তাঁর সঙ্গে তার কোনো
স্মৃতি নেই। তবু আব্বার জীবনের সেই মানুষটিকে সে নিজের মতো করে আপন করে নিতে চায়।
শিশুমনের এই ভালোবাসা যেন রক্তের সম্পর্কেরও আগে পৌঁছে যায়—স্মৃতির সীমানা
পেরিয়ে, সময়ের ব্যবধান
অতিক্রম করে।
ওর প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমি ক্রমশ হারিয়ে যাই
অতীতের পথে। ফিরে যাই জানুর দোকানে, বা পচুর দোকানের
সেই চেনা চালায়। মনে পড়ে চায়ের ধোঁয়া, বিস্কুটের গন্ধ, বাবার পাশে বসে
থাকা পারভেজ, তাঁর আঙুল ধরে
হাঁটা তাহিনা, চেয়ারের হাতলে
বসে দোল খাওয়া সাদিয়া। চোখের সামনে ভেসে ওঠে শাটিমারী, আঙ্গারিবন, উদয়পুর হাটের
পথ। মনে হয়, দাদুর হাত ধরে
নাতি-নাতনিরা এখনও বুঝি হেঁটে চলেছে সেই পথ ধরে। সময় সেখানে থমকে আছে; বাবার হাতের
আঙুলগুলো এখনও ছোট ছোট হাতের মুঠোয় ধরা।
কিন্তু কল্পনার সেই দৃশ্য যতই স্পষ্ট হোক, বাস্তবের কাছে
ফিরে আসতেই হয়। জানি, বাবা আর ফিরবেন
না। জানি, সাবা কিংবা
সাওবানের ছোট্ট হাত তাঁর হাত ছুঁতে পারবে না। তারা কখনও দাদুর কোলে বসে বিস্কুট
খেতে খেতে হাসবে না, তাঁর মুখে আদরের
ডাক শুনবে না। আর আমি কোনো দিন তাদের নিয়ে বাবার কাছে গিয়ে বলতে পারব না—‘দেখো বাবা, এরা তোমার
নাতি-নাতনি। তোমার বিস্কুটে এদেরও একটু ভাগ দাও।’ এই না-পারার কষ্টটুকুই বোধ হয়
সবচেয়ে গভীর।
আজও যখন বাবার কথা মনে পড়ে, তখন তাঁর জন্য
কেবল চোখ ভিজে ওঠে না; মনে হয়, তাঁর কাছে আমার
সন্তানদেরও কিছু পাওনা রয়ে গেল। যে আদর তিনি পারভেজ, তাহিনা আর সাদিয়াকে উজাড় করে
দিয়েছিলেন, তার কিছুটা যদি
ফাওজান, সাবা আর সাওবানও
পেত! তাঁর বিস্কুটে ওরাও যদি একদিন ভাগ বসাতে পারত! হয়তো সেই সামান্য বিস্কুটের
টুকরোর মধ্যেই ওরা খুঁজে পেত এমন এক ভালোবাসা, যার কোনো বিকল্প পৃথিবীতে নেই।
হাসপাতালের সেই বৃদ্ধ হয়তো এখনও তাঁর নাতিকে নিয়ে
কোথাও বসে বিস্কুট ভাগ করে খাচ্ছেন। আর আমার বাবার বিস্কুটটুকু পড়ে আছে স্মৃতির
থালায়—অর্ধেক ভাঙা, অর্ধেক খাওয়া, অথচ তার মায়া আজও
অক্ষত। আমার সন্তানরা
কোনো দিন সেই বিস্কুটের স্বাদ পাবে না। তারা শুধু আমার মুখে দাদুর গল্প শুনবে। আর
আমি গল্প বলতে বলতে হয়তো একসময় থেমে যাব—কারণ, কিছু ভালোবাসার
কথা বলতে গেলে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে; কিছু অনুপস্থিতির কথা বোঝাতে গেলে শব্দ ফুরিয়ে যায়। তখন হয়তো সাবা
আবার জিজ্ঞেস করবে, ‘আব্বা, তোমার বাবা
কোথায়?’
আমি তার মাথায় হাত রেখে আকাশের দিকে তাকাব। মনে মনে
বলব, বাবা, তুমি যেখানেই
থাকো, তোমার
নাতি-নাতনিদের জন্য একটু দোয়া কোরো। ওরা তোমাকে দেখেনি, তোমার কোলে
ওঠেনি, তোমার হাতের
স্পর্শ পায়নি—তবু ওদের জীবনের
গল্পে তুমি আছ। আমার স্মৃতিতে তুমি আছ। আমার প্রতিটি আক্ষেপে, প্রতিটি
দীর্ঘশ্বাসে তুমি আছ। আর আমার বুকের এক নিভৃত কোণে আজও একটি ছোট্ট শিশু অপেক্ষা
করে আছে—যে শিশুটি তার
বাবাকে হারিয়েছে, অথচ নিজের
সন্তানদের দাদুকে একবার দেখানোর আকাঙ্ক্ষা থেকে কোনো দিন মুক্ত হতে পারেনি।
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মোমিনপুর, কোলকাতা


