Pages

Monday, 31 December 2018

মাহমুদ দারবিশঃ রিতা ও রাইফেল


রিতা ও রাইফেল

মাহ্‌মুদ দার্‌বিশ, ফিলিস্তিন
অনুবাদ- আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 

রিতা আর আমার চোখের মাঝে
একখানা রাইফেল।

যারাই চেনে রিতাকে
বসে হাঁটু গেড়ে
আর প্রার্থনা করে
ঈশ্বরের নিকট; মায়াময় চোখে 

আমি চুমু খেয়েছি রিতাকে...!
যখন সে ছিল এক টগবগে-তরুণী;
আমার এখনো মনে পড়ে-  
কীভাবে এগিয়ে এসেছিল সে
কীভাবে ঢেকে গেছিল তাঁর সুন্দর খোঁপা
আমার তালুতে।
আমি স্মরণ করি রিতাকে
যেমনভাবে স্মরণ করে চড়ুইপাখি
নিজ জলাধারকে।
আহ্‌... রিতা !
আমাদের শত-সহস্র চড়ুই আর দৃশ্যকল্প
আন্‌গিনাত ওয়াদে, সব  
ছাই হয়ে গেল..., রাইফেলের আগুনে।


রিতার নাম আমার মুখে
বারবার আসে, ঈদের আবহ নিয়ে;
আর তাঁর শরীর আমার রক্তে
বইয়ে দেয় বাসর রাতের অনুভূতি।
আমি দুদুটো বছর মজে ছিলাম রিতাতে
আর সেই-দুবছর সে
ঘুমিয়ে ছিল আমার বাহুতে;
আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম
উৎকৃষ্ট পেয়ালার পরে
আর ছুঁয়ে ছিলাম আঙুর-সুরা দুঠোঁটে; 
মনে হয়েছিল, আমরা
দ্বিতীয়বার জন্মালাম।

আহ্‌ রিতা, কে পেরেছে
তোমার চোখ থেকে আমার চোখকে সরাতে
দুটো ভাতঘুম ও মধু-রঙা সেই বাদল ছাড়া;
এই রাইফেল-নিক্ষেপিত স্ফুলিঙ্গের পূর্বে...!

একদিন সকালে
হে গোধূলির নৈঃশব্দ
আমার চাঁদ দেশান্তরী হল বহু দূরে
মধু-রঙা চোখে;
আর শহর, ঝেড়ে ফেলে দিল
সকল গায়ক ও রিতাকে। 

রিতা আর আমার চোখের মাঝে
একখানা রাইফেল।

  

ريتا والبندقية
محمود درويش - فلسطين


بين ريتا وعيوني ... بندقية
والذي يعرف ريتا، ينحني
ويصلي
لإله في العيون العسلية

وأنا قبَّلت ريتا...
عندما كانت صغيرة
وأنا أذكر كيف التصقت
بي، وغطت ساعدي أحلى ضفيرة
وأنا أذكر ريتا
مثلما يذكر عصفورٌ غديره
آه... ريتا
بينما مليون عصفور وصورة
ومواعيد كثيرة
أطلقت ناراً عليها ... بندقية

اسم ريتا كان عيداً في فمي
جسم ريتا كان عرساً في دمي
وأنا ضعت بريتا ... سنتين
وهي نامت فوق زندي سنتين
وتعاهدنا على أجمل كأس ، واحترقنا
في نبيذ الشفتين
ووُلدنا مرتين
آه... ريتا
أي شيء ردَّ عن عينيك عينيَّ
سوى إغفاءتين
وغيوم عسلية
قبل هذي البندقية!

كان يا ما كان
يا صمت العشيّة
قمري هاجر في الصبح بعيداً
في العيون العسلية
والمدينة
كنست كل المغنين، وريتا
بين ريتا وعيوني... بندقية. 

মালালাঃ কিছু কথা কিছু ভাবনা

Image result for malala
মালালাঃ কিছু কথা কিছু ভাবনা 
['আই অ্যাম মালালা' থেকে]

"গ্রামে অতি ভোরে দিন শুরু হয়ে যায়। আমি এমনিতে দেরি করে উঠি। কিন্তু গ্রামে গেলে ভোরের আলো ফোটার সময় মোরগের বাক এবং নাস্তা বানানোর জন্য মহিলাদের থালাবাসন মাজার শব্দে উঠে যেতাম। ভোর বেলায় সূর্যের আলো তোরঘার পাহাড়ের চূড়ায় প্রতিফলিত হতো। ফজরের নামায পড়ার জন্য ঘুম থেকে জেগে দেখতাম স্পিনঘারের তুষার চূড়ায় সূর্যের প্রথম রশ্মি জ্বলজ্বল করছে। মনে হতো যেন এক ফর্সা নারী কপালে জুমার টিকা (এক ধরণের স্বর্ণালঙ্কার) পড়ে বসে আছে।"  [পৃষ্ঠা- ৬৫]




পাঠ ও সংগ্রহ- আব্দুল মাতিন ওয়াসিম 

আর-রাবেতাতু আল-কালামিয়্যাহঃ একটি প্রবাসী সাহিত্য সংগঠন


আর্-রাবেত়াতু আল্‌-ক়ালামিয়্যাহ

পরিচয়
এটি ছিল আমেরিকায় আরবী সাহিত্যের একটি সংগঠন। আমেরিকার প্রবাসী আরবীয় সাহিত্যিকগণ এই সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা করেন। সাহিত্য রচনার বিষয়বস্তু এবং পদ্ধতিগত ক্ষেত্রে তারা আমূল পরিবর্তন সাধন করেন। তার সংগঠকদের মধ্যে কয়েকজন বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন। বিশেষ করে এই সংগঠনের প্রাণপুরুষ জুবরান খালীল জুবরান ছিলেন একজন বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক।

প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
এই সংগঠনের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা শুরু হয় ১৯১৬ খৃষ্টাব্দে, কিন্তু তা সরকারী ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২০ সালে, নিউইয়র্কে। কয়েকজন নির্বাচিত সাহিত্যিকদের হাত ধরে এর পথ চলা শুরু। মিখাইল নুয়াইমা তাঁর “জীব্‌রান – হ়ায়াতুহু, মাওতুহু, আদাবুহু, ফান্নুহু” নামক বইটিতে লেখেন যে— “এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয় দু’টি আলোচনা সভার পর। তার মধ্যে প্রথমটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল আব্দুল মাসীহ আল-হাদ্দাদ-এর বাড়ীতে।” আর হাদ্দাদ ছিলেন নিউইয়র্ক থেকে আরবী ভাষায় প্রকাশিত একটি পত্রিকার সম্পাদক ও পৃষ্ঠপোষক।

প্রথম মিটিংয়ের দিনটি ছিল ২০শে এপ্রিল, ১৯২০। এই মিটিং থেকে যে আলোচনা উঠে এসেছিল তা অত্যন্ত যত্ন সহকারে মিখাইল নুয়াইমা একত্রিত করেন। আলোচনার মূল নির্যাস ছিল— তাঁদের মধ্য থেকে একজন মন্তব্য করলেন যে, প্রবাসী কবিসাহিত্যিকদের একটি সংগঠন থাকা দরকার। যে সংগঠনটি তাঁদের সকলকে একত্রিত করবে। আরবি ভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধনের ক্ষেত্রে তাঁদের প্রয়াসগুলোকে সংগ্রহ ও সংকলন করে রাখবে।

এই প্রস্তাবটী উপস্থিত বিদগ্ধ সাহিত্যিকদের প্রশংসা ও সমর্থনে সিদ্ধান্তের রূপ পায়। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ক’জন হলেন— জিব্‌রান খালিল জিব্‌রান, নাসীব উরাইজাহ্‌, উইলিয়াম ক্যাটস্ফিলস, রাশীদ আইয়ুব, আব্দুল মাসীহ হাদ্দাদ, নুদরাহ হাদ্দাদ, মিখাইল নুয়াইমাহ, ইলিয়াহ আবু মাযী প্রমুখ।

ওই মাসেরই ২৮ তারিখে দ্বিতীয় তথা চূড়ান্ত মিটিংটি আয়োজিত হয় জিবরান খালিল জিবরানের বাস ভবনে। এখানে প্রথম মিটিংয়ের সদস্যগণ সহ ইলিয়াস আতাউল্লাহ যোগদান করেন। সংগঠনের গৃহীত সিদ্ধান্তের উপর সকলে সহমত পোষন করেন। অন্যান্য সদস্যদের সমর্থনে সভাপতি নিযুক্ত হন জিব্‌রান। মিখাইলকে উপদেষ্টা এবং উইলিয়ামকে কোষ্যাধ্যক্ষ করা হয়। সংগঠনের নিয়মাবলী রচনার দায়িত্ব দেওয়া হয় মিখাইল নুয়াইমাকে। ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠন ১২ বছর স্বমহিমায় ব্বিরাজ করে। অতঃপর ১৯৩২ সালে সভাপতি জিব্‌রানের মৃত্যুর সাথে অস্তমিত হয়।

সংগঠনের উদ্দেশ্য
এই সংগঠনটির উদ্দেশ্য ছিল আরবী ভাষার সংরক্ষণ, দীর্ঘকালীন স্থাবরতা থেকে এর মুক্তি, ভাষার বৈশিষ্ট সমূহের উন্নতিকরণ, নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরী করা, আরবি গদ্য ও পদ্যের নবজাগরণের উন্মেষ ঘটানো ইত্যাদি। তারা গতানুগতিক অন্ধ অনুকরণ ছেড়ে চিন্তাভাবনায় নতুনত্ব নিয়ে আসেন। তবে এসব করতে গিয়ে তারা প্রাচীন সাহিত্যের ধ্যানধারণাকে কোনোভাবেই কোনোরকম অবহেলা করেননি, বরং সেগুলিকে কেন্দ্র করেই তাদের চিন্তাভাবনা আবর্তিত হতো।

সংগঠনের কর্মকান্ড
জীবন সম্বন্ধে ভাবনাচিন্তা, অস্তিত্বের রহস্য, মানব চরিত্রের বোধের গভীরতা, মানব সমাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর উদারতা, আরবদেশ সম্পর্কিত বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ, মত প্রকাশের ক্ষেত্রে ইঙ্গিত ব্যবহারের বাহুল্য- ইত্যাদি দৃষ্টিকোণ থেকে এদের সাহিত্যকর্ম শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল।এর সদস্যরা সম্মিলিত ভাবে এই প্রবাসমুলুকে কয়েকটি আরবী সাময়িকী এবং পত্রিকা প্রকাশ করেন। তার মধ্যে কয়েকটি হলো— (ক) মাজাল্লাতু আল্‌-ফুনূনঃ এর উদ্দেশ্য ছিল নিছক সাহিত্যচর্চা, এর সম্পাদক ছিলেন নাসীব উরাইযাহ। (খ) জারীদাতু আস্‌-সায়েহ়ঃ এর উদ্দেশ্য ছিল প্রবাসী আরবীয়দের অবস্থাকে তুলে ধরা। এর সম্পাদক ছিলেন আব্দুল মাসীহ আল-হাদ্দাদ। (গ) মাজাল্লাতু আস্‌-সামীরঃ ইলিয়া আবু মাযী সম্পাদিত এই পত্রিকার উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকায় আরবী চর্চা। এটা সপ্তাহে পাঁচদিন প্রকাশিত হতো। সংগঠকদের মৃত্যুর পর এর যবনিকা পতন ঘটে।

-আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

আরেকবার বকবে বাবা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



অনেক দিন হয়ে গেল, তোমার সঙ্গে আমার দেখা নেই। কথাও হয়নি কতকাল। সময়ের স্রোত বয়ে গেছে নিজের মতো করে, ঋতু বদলেছে, মানুষ বদলেছে, আমিও বদলেছি। জানো বাবা, এখন আমি আগের চেয়েও অনেক বেশি উশৃঙ্খল, অনেক বেশি দুরন্ত হয়ে উঠেছি। তবে সেই দুরন্তপনা আর তেঁতুলগাছের ডালে ডালে উড়ে বেড়ানো কোনো কিশোরের নয়; জীবন নামের এক অদৃশ্য ঝড়ের পেছনে ছুটতে থাকা এক ক্লান্ত পথিকের  

 

তোমার কি মনে পড়ে, পাড়ার দক্ষিণ প্রান্তের সেই বিশাল তেঁতুলগাছটার কথা? বিকেল হলেই আমি ছুটে যেতাম সেখানে। এ ডাল থেকে সে ডালে লাফিয়ে বেড়াতাম, বাদুড়ের মতো উল্টো হয়ে ঝুলে থাকতাম সরু ডালের গায়ে। খবর পেয়ে তুমি ছুটে আসতে হাঁপাতে হাঁপাতে। হাতে ছড়ি, মুখে শাসন, অথচ বুকভরা উৎকণ্ঠা। রাগ দেখিয়ে নামিয়ে আনতে, কিন্তু আজ বুঝি, সেই রাগের ভেতর কতখানি মমতা লুকিয়ে ছিল।

 

ক্লাস টুতে পড়ার সময় একদিন তুলাই নদীতে স্নান করতে গিয়েছিলাম। যে নদীটা আমাদের প্রাইমারি স্কুলের পাশ ঘেঁষে বয়ে যেত, মিয়াঁদের আমবাগানের ছায়া মেখে নেচে নেচে গিয়ে মিশত টাঙনের বুকে। সেদিন মেজদা খুব রেগে গিয়েছিল। পা ধরে ছুড়ে দিয়েছিল পুকুরের মাঝখানে। আমি যখন ডুবতে ডুবতে প্রাণপণে হাত-পা ছুড়ছি, তখন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল হালি দি। কোলে করে তুলে এনেছিল পাড়ে। তুমিও বকেছিলে আমাকে। কিন্তু আজ মনে হয়, সেই বকুনিগুলো আসলে ছিল ভালোবাসার অন্য এক ভাষা।

 

মাগরিবের আজান হলেই তুমি হাত ধরে মসজিদে নিয়ে যেতে। একদিন বলেছিলে, “চল, নামাজ পড়ে আসি।আমি যাইনি। মাঠে ফুটবল খেলছিলাম। খেলতে খেলতেই কীভাবে বুড়ো আঙুলটা ভেঙে ফেলেছিলাম, আজ আর মনে নেই। কিন্তু স্পষ্ট মনে আছে, সেদিন রাতভর তুমি আর মা আমার পাশে জেগে ছিলে। ব্যথায় কুঁকড়ে থাকা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলে নীরবে। সেদিন তুমি বকোনি। হয়তো সন্তানের কষ্টের সামনে সব শাসনই হার মেনে যায়।

 

গ্রামের আর পাঁচটা ছেলের মতো আমিও সারা গ্রাম চষে বেড়াতাম। পুন্যা দীঘির পাঁকে মাছ ধরতাম, অন্যের গাছে ঢিল ছুড়তাম, আম-জাম-কুল পেড়ে পকেট ভরে ফিরতাম। বেসুরো গলায় কখনো গান, কখনো গজল, কখনো সূরা, কখনো আজানযা মনে আসত, তাই বিড়বিড় করতাম। কিন্তু বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হলেই তুমি অস্থির হয়ে উঠতে। পাড়ার কারও হাতে খবর পাঠাতে, কখনো নিজেই খুঁজতে বেরিয়ে পড়তে। তখন বুঝিনি, এখন বুঝিসন্তানের জন্য অপেক্ষা করা একজন বাবার হৃদয় কতটা অস্থির হতে পারে।

 

বাবা, বাঁশকুড়ি, কদমডাঙা, চণ্ডীপুর আর মহিপালের সেই চেনা পৃথিবী পেরিয়ে এখন আমি থাকি এক অচেনা শহরেকলকাতায়। এখানে অনেক মানুষ, অনেক রাস্তা, অনেক আলো। অলিগলির মোড়ে মোড়ে অসংখ্য চায়ের দোকান। ভিড়ও হয় খুব। মাঝে মাঝে সেই ভিড়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। অকারণেই। মনে হয়, যদি হঠাৎ তোমাকে দেখতে পাই! যদি কোনো এক কোণে বসে থাকতে দেখতাম, সেই চেনা চোখদুটো নিয়ে!

 

কিন্তু এখানে কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দেয় না। সবাই ছুটছে। কেউ কাজের পেছনে, কেউ কাজের খোঁজে। এখানে মানুষের সময় আছে, অথচ সময় নেই।

 

এখানেও অনেক গাছ আছে, বাবা। তবে সেগুলো আমাদের গ্রামের গাছের মতো নয়। এদের শিকড় মাটির গভীরে নয়, কংক্রিটের ভেতরে। ডালপালাগুলো কাচ, লোহা আর ফাইবারের। ফলের বদলে ঝরে পড়ে বিজ্ঞাপন, আলো আর প্রলোভন। এই শহরও এক জঙ্গলকংক্রিটের জঙ্গল। এখানে পশুরাও আছে, মানুষের ছদ্মবেশে। আবার কিছু মানুষও আছে, যারা এখনো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

 

সারাদিন ছুটে বেড়াই। চেতনা আর অবচেতনার মাঝখানে নিজেকে জড়িয়ে রাখি। চাকরি, দায়িত্ব, স্বপ্ন আর অপূর্ণতার ভার কাঁধে নিয়ে প্রতিদিন হেঁটে যাই এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রের ভেতর দিয়ে। সময়মতো খাওয়া হয় না, ঘুম হয় না, পড়াশোনাটাও আর আগের মতো হয় না। আয়নায় তাকালে নিজেকেই চিনতে কষ্ট হয় কখনো কখনো।

 

বড্ড রোগা হয়ে গেছি, বাবা।

 

কিন্তু জানো, এই শহরে আমাকে আর কেউ বকে না। বড়দা না, মেজদা না, মা-ও না। হাজার মানুষের ভিড়ে থেকেও কখনো কখনো মনে হয়, আমি ভীষণ একা। তখন খুব ইচ্ছে করে, তুমি একবার এসে বলো

এই ছেলে, এত রাত পর্যন্ত জেগে আছিস কেন? ঠিকমতো খেয়েছিস? শরীরটা দেখেছিস আয়নায়?”

 

আমি হয়তো আবার আগের মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকব। আর মনে মনে বলব

অনেক দিন হয়ে গেল, কেউ আর আমাকে বকে না। তুমি আমায় আরেকবার বকবে, বাবা...

 

বাঁশকুড়ি, দক্ষিণ দিনাজপুর

২৫ ডিসেম্বর ২০১৮

Friday, 21 December 2018

যুহায়ের বিন আবু সুল্‌মা

যুহায়ের বিন আবু সুল্‌মা

(৫২৫-৬০৯ খ্রিঃ)

আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 

পরিচিতি ও জন্মঃ

মু’আল্লাকা কবিগোষ্ঠীর এক অনন্য ও উল্যেখযোগ্য নাম কবি যুহায়েরের। তাঁর কবিতায় জ্ঞান ও দর্শনের আধিক্যকে প্রত্যক্ষ করে ঐতিহাসিকরা তাঁকে আশ্‌-শা’য়েরুল্‌ হ়াকীম (প্রজ্ঞাময় কবি) উপাধিতে ভূষিত করেছেন। আরবি সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি একমাত্র কবি, যার পুরো পরিবার কাব্য সাধক ছিল। নাম যুহায়ের, পিতার নাম রাবী’আহ্‌, উপনাম আবু সুল্‌মা, পিতামহের নাম রেবাহ়। মাতা ছিলেন জ়ুব্‌ইয়ান গোত্রের বিখ্যাত জাহেলী কবি বাশামাহ্‌ বিন্‌ আল্‌-গ়াদীর-এর ভাগ্নি। কবি যুহায়ের নাজদ প্রদেশের হ়াজিয নামক স্থানে মুযাইনাহ্‌ গোত্রের প্রায় ৫২৫ খ্রিস্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পুরো পরিবার কাব্যসাধনায় মগ্ন ছিল। তাঁর পিতা, মামা, ভগ্নীদ্বয় ও পুত্রদ্বয় সকলেই কবি ছিলেন।

 

বাল্যজীবনঃ

তিনি বাশামাহ্‌ বিন্‌ আল্‌-গ়াদীর-এর ছত্রছায়ায় লালিত-পালিত হন। ফলে তাঁর জ্ঞান, অভিমত, কাব্য ও অভিজ্ঞতা হতে অনেক কিছুর শিক্ষা লাভ করেন। পিতার মৃত্যুর পর তাঁর মাতা প্রখ্যাত জাহেলী কবি আউস বিন্‌ হুজ্‌র-এর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কবি আউস তাঁকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন, তাই তাঁকে নিজের রাবী (বর্ণনাকারী) নিযুক্ত করেন

 

বৈবাহিক জীবনঃ

কবি সর্ব প্রথম উম্মে আওফ়া নামক এক মহিলাকে বিয়ে করেন, যার প্রকৃত নাম অনেকের মতে লায়লা ছিল। তার থেকে অনেকগুলো সন্তান জন্মলাভ করেছিল, কিন্তু সকলেই শিশু অবস্থায় মৃত্যু বরন করে। যেহেতু কবিও আর পাঁচটা মানুষের মতো সন্তানের জন্য লালায়িত ছিলেন, তাই তাকে তালাক দিয়ে কাব্‌শাহ্‌ বিন্‌তু ‘আম্মার-কে বিয়ে করেন এবং তার থেকে কা’আব, বুজায়ের ও সালিম নামের তিনটি সন্তান লাভ করেন। তবে তাঁদের মধ্যে সালিম শিশুবেলায় মারা যায়। আর বাকি দু’জন পরবর্তীতে বিখ্যাত কবি রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। কিন্তু কাব্‌শাহ্‌ ছিল ভোঁতা মাথার, তাঁর উপর অমিতব্যয়ী; তাই বিশ বছর পর কবি আবার উম্মে আওফাকে গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সে রাজি হয়নি। সেজন্যই কবি তাঁর বহু কবিতায় উম্মে আওফার উল্লেখ করে নিজ মনের কথা তুলে ধরেছেন। এমনকি তাঁর বিখ্যাত মু’আল্লাকার সূচনা উম্মে আওফার বাস্তুভিটার স্মৃতিচারণা দিয়ে করেছেন।  

 

নবী(সাঃ)- সাক্ষাতের বাসনাঃ

ইব্‌নুল্‌ আসীর ও ইব্‌নু হাজার বলেন কবি আহ্‌লে কিতাবদের (ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের) সঙ্গে মিশতেন। তাঁদের কাছ থেকে শেষ নবীর আবির্ভাবের কথা জানতে পারেন। সেই থেকে আন্তরিক ভাবে তাঁর সাক্ষাৎ কামনা করতেন। কিন্তু ব্যর্থ  হন। নবীর (সাঃ) আবির্ভাবের এক বছর পূর্বেই ইহলোক ত্যাগ করেন।

 

অসিয়ত ও পরলোকগমনঃ 

একদা তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, আকাশ থেকে একটা সিঁড়ি নেমে এসেছে। কিন্তু হাত বাড়িয়ে তিনি তা ধরতে পারলেন না। তিনি বুঝে গেলেন। তাই সন্তানদের নিকট দুঃখ প্রকাশ করে তাঁদেরকে অসিয়ত করলেন যে, তাঁরা যদি সাক্ষাৎ লাভ করে, তাঁরা যেন অবশ্যই ইসলাম গ্রহণ করে। এই বিদগ্ধ মনীষা কবি যুহায়ের নবুয়তের এক বছর পূর্বে ৬০৯ খ্রিস্টাব্দে প্রায় ৯০ বছরে উপনীত হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন।

 

কাব্য প্রতিভাঃ

তিনি জাহেলী কবিদের প্রথম স্তরের একজন প্রতিভাধর কবি। অনেকে তাঁকে অন্য দু’জন প্রথম স্তরীয় কবি ইম্‌রাউল কায়েস ও নাবিগাহ্‌-এর উপর প্রাধান্য দিয়েছে, তাঁর সুন্দর-সাবলীল চিত্রায়ন ও অকৃত্রিম বর্ণনাশৈলীর কারণে। ঐতিহাসিকদের ধারণা, তিনি চারমাসে একটি কবিতা রচনা করতেন, পরবর্তী চারমাসে নিজেই তার সংযোজন ও বিয়োজন করতেন। অতঃপর পরবর্তী চারমাসে পরিমার্জনার জন্য কবি মনীষাদের নিকট তা উপস্থাপন করতেন। প্রায় এক বছর সময় নিয়ে তাঁর রচিত কবিতাকে জনসমক্ষে নিয়ে আসতেন। আর তাই তাঁর এ ধরণের কবিতাগুলি হ়াওলিয়াত (বাৎসরিক কবিতা) নামে পরিচিত।

 

কাব্যিক বৈশিষ্টাবলীঃ

তিনি অপরিচিত শব্দ, অতিরঞ্জন ও অস্পষ্টতা থেকে দূরে থাকতেন। প্রেমাবেগ তাড়িত সঙ্গীত ও গুণগান বর্ণনায় এবং সৌন্দর্যের চিত্রায়নে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাঁর কবিতায় প্রাঞ্জল ভাষা ও মধুর সঙ্গীতের সূরের যোজনা পরিলক্ষিত হয়। তাঁর কবিতাসমূহ যেন তাঁর সত্যবাদিতার প্রতিচ্ছবি।

 

মু’আল্লাকা রচনাঃ

তিনি তাঁর মু’আল্লাকায় আল্‌-হারিস বিন্‌ ‘আউফ ও হারাম বিন্‌ সিনান-এর চরম প্রশংসা করেছেন। কেননা এই দুই নেতা দীর্ঘ দাহ়িস ওয়াল্‌ গ়াব্‌রা যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে যুদ্ধরত ‘আবাস ও জ়ুব্‌ইয়ান গোত্রদ্বয়ের মধ্যে সন্ধির মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে তিনিও জাহেলী প্রথানুসারে প্রেমিকার বাস্তুভিটার স্মৃতিচারণার মাধ্যমে নিজ মু’আল্লাকার সূচনা করেছেন।

 

কবিতার নমুনাঃ

তিনি হারেস ও হারেমের প্রশংসায় বলেছেন—

আমি শপথ করে বলতে পারি সুখে দুঃখে সর্ব অবস্থায় তোমাদের মধ্যে দু’জন মহান নেতাকে পাওয়া গেছে।[1]

 

তিনি যুদ্ধের অপকারিতার চিত্রায়ন সুনিপুণ ভাবে করেছেন—

যখন তোমরা তাকে উস্কানি দাও, নিন্দনীয়ভাবেই তা করো, যখন তোমরা তার আগুন জ্বালিয়ে দাও, তা জ্বলে ওঠে আর সব কিছু পুড়িয়ে দেয়।

যাঁতা কলের নীচে যেমন চামড়া পিষ্ট হয়, তা তোমাদেরকে অনুরূপভাবে পিষ্ট করে দেবে, প্রসবের পরক্ষনেই তা পুনরায় গর্ভ ধারণ করবে এবং যমজ সন্তান প্রসব করবে।[2]

 

তিনি জীবন সম্বন্ধে নিজ অভিজ্ঞতাকে এভাবে ব্যক্ত করেছেন—

যুবকের জিহ্বা (ভাষা) হচ্ছে অর্ধেক, বাকি অর্ধেক তাঁর হৃদয় (ভাবনা); এ দুটো ছাড়া যুবক (মানুষ) হচ্ছে মাংস ও রক্তের একটা পুতলা।[3]

 

আর সৌন্দরয্যের চিত্রায়ন তিনি এভাবে করেছেন—

তাঁদের মধ্যে বিনোদন রয়েছে প্রত্যেক দর্শনেচ্ছু ব্যাক্তির জন্য আর প্রত্যেক নিরীক্ষণকারী দর্শক চক্ষুর জন্য মনোরম দৃশ্য।[4] 



[1]

يميناً لنعم السيدان وُجدتما     على كل حال من سحيل ومبرم

[2]

متى تبعثوها تبعثوها ذميمة     وتضرّ إذ ضربتموها فتضرم

فتعرككم عرك الرحا بثفالها     وتلفح كشافا ثم تحمل فتتئم

[3]

لسان الفتى نصف ونصف فؤاده     فلم يبق إلا صورة اللحم والدم

[4]

وفيهن ملهى للصديق ومنظر     أنيق لعين الناظر المتوسّم

মাহমুদ দারবিশঃ আমার মায়ের প্রতি

   
 আমার মায়ের প্রতি 
মূল - মাহমুদ দারবিশ, ফিলিস্তিন 
অনুবাদ- আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

[মাহমুদ দারবিশ ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি। নিজ কবিতা দ্বারা তিনি সংগ্রামের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। জন্ম ১৯৪১- ১৩ই মার্চ পশ্চিম প্যালেস্টাইনের আল-বিরবা গ্রামে। যে গ্রামটিকে ইসরাইল ১৯৪৮ সালেই ধূলিস্মাৎ করে দিয়েছে

আবাবিল। কুরআনে ব্যবহৃত একটি শব্দ। এর প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে, ভাষাবিদদের। অনেকে মনে করেন, ছোট ছোট পাখীর ঝাঁক। কেউ আবার মনে করেন, আবাবিল এক বিশেষ প্রকৃতির পাখী। কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, ইয়েমেনের শাসক আব্‌রাহা যখন পবিত্র কাবা-ঘর ধ্বংস করতে এসেছিল, তখন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখী এসে পাথর নিক্ষেপ করেছিল তাদের উপর। যার কারণে, আব্‌রাহা ও তার সেনাবাহিনী সেখান থেকে পালাতে বাধ্য হয়।
কবি এখানে আবাবিল বলে ফিলিস্তিনি শিশুদের বুঝিয়েছেন। যারা নিজ মাতৃভূমি রক্ষা করার জন্য দলে দলে হাতে পাথরের টুকরো নিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় ইজরাইলি ট্যাংকের সম্মুখে। নুড়ি পাথর দিয়ে মুকাবেলা করে বারুদের। দু'চোখে একটাই স্বপ্ন তাঁদের, নিজ মাতৃভূমিকে রক্ষা করা। নিজেদের খেত-খামার, গম, জলপাই, খেজুর ইত্যাদিকে বাঁচানো, ভাবী প্রজন্মের জন্য!]

মার মন কাঁদে।

তোমার বানানো রুটির জন্য,
তোমার হাতের কফির জন্যে,
আর স্নেহের পরশের জন্যে,
মন আমার কাঁদে-

মনের ক্যানভাসে
ছেলেবেলার দিন-
যেন টুকরো ছবি।

আমি জীবন ভালোবাসি। 
মৃত্যু হানার পূর্বেই 
আমি হব-ই যোগ্য;
তোমার অশ্রুজলের।

যদি ফিরে আসি কোনোদিন, 
গ্রহণ করো আমায়,
তোমার চোখের পাতায়
আচ্ছাদনরূপে।
মুড়ে দিও ঘাসে
আমার দেহের, কঙ্কালটিকে
তোমার চরণতলে।   
চুলের গোছায়
আমাকে বেঁধে নিও।
সেই গোছা; যা নেমেছে 
শাড়ির আঁচল বেয়ে
কাপড়ের সুতো ছুঁয়ে।

যদি স্পর্শ করি,
তোমার হৃদয়ের গভীরতা-
তবে, নিঃসন্দেহে
আমি হব অমর
হব দেবতা। 

আবারও যদি আসি,
তবে হব-ই আমি
তোমার উনুনের চেলাকাঠ,
চিলেকোঠার দড়ি,
কাপড় শুকোবে তুমি।
অক্ষম আমি
আমি বলহীন
দাঁড়াতে না-পারি, 
তোমার আশিস মাগি,
মাগো, তোমার আশিস মাগি আমি।

আজ বৃদ্ধ আমি
ফিরে যাচি ছেলেবেলা;
তারার সেই মানচিত্রটি।

শরীক হতে চাই আমি 
ক্ষুদে আবাবিলদের,
পাড়ি জমাবো সেই
অপেক্ষার নীড়ে।



أحنُّ إلى خبزِ أمّي
وقهوةِ أمّي
ولمسةِ أمّي
وتكبرُ فيَّ الطفولةُ
يوماً على صدرِ يومِ
وأعشقُ عمري لأنّي
إذا متُّ
أخجلُ من دمعِ أمّي

خذيني، إذا عدتُ يوماً
وشاحاً لهُدبكْ
وغطّي عظامي بعشبِ
تعمّد من طُهرِ كعبكْ
وشدّي وثاقي..
بخصلةِ شَعر..
بخيطٍ يلوّحُ في ذيلِ ثوبكْ
عساني أصيرُ إلهاً
إلهاً أصير..
إذا ما لمستُ قرارةَ قلبكْ!

ضعيني، إذا ما رجعتُ
وقوداً بتنّورِ ناركْ
وحبلِ الغسيلِ على سطحِ دارِكْ
لأني فقدتُ الوقوفَ
بدونِ صلاةِ نهارِكْ
هرِمتُ، فرُدّي نجومَ الطفولة
حتّى أُشارِكْ
صغارَ العصافيرِ
دربَ الرجوع
لعشِّ انتظاركْ..

[শব্দের মিছিল, মে ০৯, ২০১৭-তে প্রকাশিত]