Pages

Showing posts with label স্মৃতিচারণ. Show all posts
Showing posts with label স্মৃতিচারণ. Show all posts

Monday, 27 April 2026

পয়লা মোলাকাতে - ড. ওবাইদুর রাহমান বুখারি



সাল ২০১২। আমি তখন স্নাতক তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। জীবনের এক ব্যস্ত অথচ স্বপ্নময় সময়। সেদিনও অন্য দিনের মতোই একটি বেসরকারি মাদ্রাসায় পড়িয়ে বিকেল প্রায় পাঁচটার সময় ফিরেছি। ক্লান্ত শরীর নিয়ে হোস্টেলে ঢুকতেই হঠাৎ আমার সেই সাধারণ কীপ্যাড ফোনটা বেজে উঠল। ওপাশ থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠ— “ওবাইদ! পার্ক সার্কাস আসতে পারবে?”
 
আমি কিছুটা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম—“কোথায়? আর কতক্ষণের মধ্যে?” উত্তর এল—“আধা ঘণ্টার মধ্যে, দিলখুশা নার্সিংহোমের পাশে।
 
আর দেরি করিনি। সঙ্গে সঙ্গে হোস্টেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম। মনে অজানা এক উত্তেজনা, কৌতূহল আর হালকা উদ্বেগ। ঠিক সময়েই পৌঁছে গেলাম নির্ধারিত স্থানে।
 
গিয়ে যা দেখলাম, তা যেন এক অন্য জগত! সুঠামদেহী, গাম্ভীর্যে পরিপূর্ণ, ব্যক্তিত্বময় একজন মানুষকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন একঝাঁক প্রফেসর ও স্কলারযাদের সামনে দাঁড়ানোর সাহসও আমাদের মতো ছাত্রদের সচরাচর হয় না। আমি দূরে দাঁড়িয়ে রইলাম, হৃদয়ে এক অদ্ভুত কম্পন নিয়ে।
 
কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে রওনা দেওয়ার সময় আমাকে উদ্দেশ্য করে বলা হলো— “কমপক্ষে ২০ মিটার দূরত্ব বজায় রেখে আমাদের ফলো করবে।
 
নির্বাকভাবে সেই নির্দেশ মেনে চলতে শুরু করলাম। প্রায় দশ মিনিট হাঁটার পর পৌঁছলাম একটি লাল রঙের পাঁচতলা ভবনের সামনে। সেখানে কিছুক্ষণ আলোচনা শেষে সবাই বিদায় নিলেন। আর আমি থেকে গেলাম সেই মহান ব্যক্তির সঙ্গে।
 
ভয়, সংশয় আর অজানা অনুভূতিকে সঙ্গে নিয়েই তাঁর সঙ্গে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাম। পাঁচতলায় পৌঁছে তিনি আমাকে ডাইনিং টেবিলে বসতে বললেন। মিষ্টি ও জলখাবার খাওয়ানোর পর তিনি নানা বইপত্র এনে সামনে রাখলেন এবং একে একে আমাকে সেসব দেখাতে শুরু করলেন।
 
অদ্ভুত এক পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম তাঁর মধ্যেসেই গাম্ভীর্যের আড়ালে যেন এক স্নেহময়, আন্তরিক মানুষ। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি আমাকে আপন করে নিলেন। আমার সব ভয়, সংকোচ যেন কোথায় মিলিয়ে গেল। তিনি আমার সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করলেন, আমার কথা আগ্রহভরে শুনলেন।
 
তারপর একটি বই এবং ইংরেজিতে হাতে লেখা একটি প্রবন্ধ আমাকে দিয়ে বললেন— “এগুলো কম্পোজ করে দিতে হবে”। আমি সময় নিলাম তিন-চার দিন। নিষ্ঠার সঙ্গে টাইপ করে আবার তাঁর কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি তা মনোযোগ দিয়ে সংশোধন করতে লাগলেন। আর সেই ফাঁকে আমাকে শেখাতে লাগলেন অনেক নতুন বিষয়। আর যেন আমার জীবনে জ্ঞানের এক নতুন দুয়ার খুলে গেল। চিন্তার পরিধি প্রসারিত হতে লাগলো, শেখার আগ্রহ বহুগুণে বেড়ে গেল।
 
এর আগে অবশ্য তাঁর সঙ্গে একবার দেখা হয়েছিলযখন আমি স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়ি। তখন মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পরীক্ষায় কোয়ালিফা করেছিলাম। সেই সময় আমার বড় ভাইয়ের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, তবে সেটি ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত, প্রায় অপরিচয়ের মতোই।
 
যাই হোক, ধীরে ধীরে যখন তাঁর সান্নিধ্যে আসতে শুরু করলাম, ঠিক সেই সময় কোলকাতায় রাবেতাতুল আদাব-ইসলামির পক্ষ থেকে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করা হলো পার্ক সার্কাস হাজ হাউসে, জিবরিল ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সহযোগিতায়  
 
সেমিনারের বিষয়বস্তুগুলো দেখে আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগলপশ্চিমবঙ্গে এমন একটি সেমিনার, অথচ বাংলার ওপর আরবি ভাষার প্রভাব নিয়ে কোনো আলোচনা নেই! এই ভাবনা থেকেই হঠাৎ করেই এক ধরণের সাহস জন্ম নিল। তড়িঘড়ি করে আব্দুল মাতিন ভাইয়ের টিউশন রুমে বসে একটা প্রবন্ধ প্রস্তুত করলাম।
 
প্রবন্ধটি যখন সেই মহান ব্যক্তিকে দেখালাম, তিনি আগের মতোই যত্নসহকারে তা সংশোধন করে দিলেন। শুধু তাই নয়, সেমিনারে তা উপস্থাপন করার জন্য আমাকে সাহস জোগালেন। তাঁর সেই উৎসাহ, সেই প্রেরণাআজও আমার হৃদয়ে অনুরণিত হয়।
 
যার ফোনে সেদিন আমি পার্কসার্কাস ছুটে গিয়েছিলাম, তিনি হলেন প্রোফেসর মহম্মদ মসিহুর রহমানতৎকালীন বিভাগীয় প্রধান, আরবি বিভাগ, মাওলানা আজাদ কলেজ, কোলকাতা। আর যাঁর কথা এতক্ষণ বলছিলামতিনি আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় শিক্ষক বি.আর. স্যার, অর্থাৎ প্রোফেসর বদিউর রহমান, রাহিমাহুল্লাহু তা’আলা!  
 
সেদিনের সেই প্রথম দেখাশুধু একটি সাক্ষাৎ নয়, বরং আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক আলোকময় মোলাকাত। তাঁর সান্নিধ্য আমাকে শিখিয়েছেজ্ঞান শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা একজন মানুষের আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুপ্রেরণার মধ্যেও বিকশিত হয়।
 
রাজারহাট, কোলকাতা
১৯ এপ্রিল ২০২৬

Monday, 9 May 2022

নিদা ফাজলিঃ পিতার মৃত্যুতে



পিতার মৃত্যুতে
মূল- নিদা ফাজ়লি
অনুবাদ- আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
 
আমি তোমার কবর জ়িয়ারত করতে আসিনি
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তুমি আমায় ছেড়ে যেতে পারো না
তোমার মৃত্যুর খবর যে রটিয়েছে সে মিথ্যুক
যে মারা গেছে, বাবা তুমি সেই ব্যক্তি নও!
একটা শুকনো পাতা হাওয়ায় দোল খেতে খেতে
ঝরে পড়েছে মূল থেকে ছিন্ন হয়ে
আমার দৃষ্টিশক্তি এখনো তোমার নানা দৃশ্যে বন্দী
আমি আজও যা কিছু ভাবি, যা কিছু দেখি
সবই তোমাকে ঘিরে, আমার সবই
তোমার সুখ্যাতি ও কুখ্যাতির পৃথিবী থেকে থেকে নেওয়া
কোথাও কোনো পরিবর্তন হয়নি
আমার আঙুলে তোমার হাত নিশ্বাস ফেলে এখনো
লেখার জন্য আমি যখনই কলম খাতা হাতে নিই
আমি দেখি, তুমি আমার চেয়ারে বসে
আমার শরীরে যত রক্ত
তোমার ব্যর্থতা ও পদস্খলনের সাথে আবর্তিত
আমার কন্ঠে তোমার কথা
আমার অসুস্থতায় তুমি
আমার ব্যর্থতায় তুমি
আমার অক্ষমতায় তুমি
কবরের উপর তোমার নাম লিখেছে যে সে মিথ্যুক
তোমার কবরে আমিই শুয়ে
আর তুমি আমার ভেতরে জীবিত
কখনো সময় সুযোগ পেলে
এসো আমার কবর জ়িয়ারত করতে।
 
৩ মে ২০২২, ঈদুল ফিতর
বাঁশকুড়ি, দঃ দিনাজপুর 



والد کی وفات پر
ندا  فاضلی

تمہاری قبر پر
میں فاتحہ پڑھنے نہیں آیا
مجھے معلوم تھا
تم مر نہیں سکتے
تمہاری موت کی سچی خبر جس نے اڑائی تھی
وہ جھوٹا تھا
وہ تم کب تھے
کوئی سوکھا ہوا پتہ ہوا سے مل کے ٹوٹا تھا
مری آنکھیں
تمہارے منظروں میں قید ہیں اب تک 
میں جو بھی دیکھتا ہوں
سوچتا ہوں
وہ وہی ہے
جو تمہاری نیک نامی اور بد نامی کی دنیا تھی 
کہیں کچھ بھی نہیں بدلا
تمہارے ہاتھ میری انگلیوں میں سانس لیتے ہیں 
میں لکھنے کے لیے 
جب بھی قلم کاغذ اٹھاتا ہوں 
تمہیں بیٹھا ہوا میں اپنی ہی کرسی میں پاتا ہوں
بدن میں میرے جتنا بھی لہو ہے 
وہ تمہاری 
لغزشوں ناکامیوں کے ساتھ بہتا ہے
مری آواز میں چھپ کر
تمہارا ذہن رہتا ہے
مری بیماریوں میں تم 
مری لاچاریوں میں تم 
تمہاری قبر پر جس نے تمہارا نام لکھا ہے 
وہ جھوٹا ہے
تمہاری قبر میں میں دفن ہوں
تم مجھ میں زندہ ہو
کبھی فرصت ملے تو فاتحہ پڑھنے چلے آنا

Thursday, 20 May 2021

আব্দুল মাতিন ওয়াসিমঃ মা-বাবা’র সাথে খুনসুটি


 
মা-বাবা’র সাথে খুনসুটি
 
আমি তখন খুব ছোট কত ছোট বা বয়স কত হবে, তা মনে নেই একদিন হঠাৎ করে আব্বা অসুস্থ হয়ে পড়লেন একেবারে বিছানা ধরে নিলেন বাবার একটা হাত একটা পা প্যারালাইজড হয়ে গেল ফলে পুরো সংসারের দায়িত্ব এসে পড়লো বড়দার কাঁধে সে তখন টুয়েলভে পড়ে স্বাভাবিক ভাবেই তার পড়াশুনোর বেশ ক্ষতি হল তার আর টুয়েলভ পাশ করা হল না সেই থেকে সে সংসার সামলাতে আরম্ভ করলো দিনমান মাঠে খাটে চাষ করে ফসল তোলে আর তা দিয়েই সংসার চলে আমাদের দু ভাইয়ের পড়াশুনোর খরচও চলে
 
বাবা ধীরে ধীরে সুস্থ হলেন অনেকটা স্বাভাবিক জীবন-ছন্দে ফিরলেন তবে আগের মতো খাটাখাটুনি সম্ভব হচ্ছিল না যেটুকু পারতেন দাদাকে চাষের কাজে সাহায্য করতেন সময় দ্রুত ছুটতে লাগলো আমরাও ধীরে ধীরে বড় হয়ে গেলাম এরই মধ্যে মেজদাও ডিগ্রি কমপ্লিট না করেই জমি-জায়গায় দেখাশোনায় লেগে গেলেন সত্যি বলতে, কৃষকের সংসার কি সেকাল, কি একাল সব সময় টেনেটুনেই চলে ওই যে নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা তবে আমার পড়াশুনো কখনও থামেনি কারণ, বাবা-মা দুই দাদা সবাই চাইতেন, আমি মন দিয়ে পড়াশুনো করি জীবনে কিছু করি তাই তাঁদের পক্ষে যতটা সম্ভব তাঁরা আমার জন্য করতেন এরই মাঝে সংসারে আরও কিছু বিড়ম্বনা দেখা দিলো আমি বেনারস ছেড়ে বাড়ি ফিরলাম পড়াশুনোর পাশাপাশি টিউশন আরম্ভ করলাম কিছুদিন পর একটা মাদ্রাসায় পড়াতে আরম্ভ করলাম পড়া পড়ানো দুটোই চলতে থাকলো
 
আমি যখন থেকে রোজগার করতে আরম্ভ করেছি, একটা জিনিস ঠিক করেছিলাম, প্রতি মাসে কিছু টাকা বাবার হাতে তুলে দেবো তিনি তাঁর মতো করে খরচ করবেন সামান্য হলেও দেবো দিতামও সেই টাকা হাতে নিয়ে বাবা খুব খুশী হতেন ওই টাকার দিকে তাকিয়ে বাবার মুখে এক নির্মল হাসি ছড়িয়ে পড়তো এক অদ্ভুত তৃপ্তির রেখা লক্ষ্য করতাম বাবার কপালের রেখায় মাঝে মাঝে বাড়ি ফেরার সময় বাবার জন্য বাবার পছন্দ মতো কিছু খাবার এবং মায়ের জন্য মায়ের পছন্দ মতো কিছু খাবার কিনে আনতাম একদিন কিছু খাবার কিনে এনেছি, কী খাবার ছিল তা আজ আর মনে নেই সবাই মিলে বিকেলে বসে সেই খাবার খাচ্ছি বাবার খুব পছন্দের খাবার ছিল, তাই বাবাকে একটু বেশিই দিয়েছিলাম সবাই পাশাপাশি বসে যে যার মতো করে খাচ্ছি খাচ্ছি আর এটা-সেটা নিয়ে গল্পগুজব করছি এমন সময় হঠাৎ আমার দৃষ্টি গেলো বাবার দিকে দেখলাম, বাবা খানিকটা আড়াল করেই কিছু খাবার তাঁর থালা থেকে তুলে মায়ের থালায় দিচ্ছেন আর মা হাত দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছেন এবং বাবাকেই তা খেতে বলছেন বাবা যখন লক্ষ্য করলেন যে আমি দেখে ফেলেছি, জোর করে মায়ের থালায় খাবারটুকু রেখে দিলেন সেই সুযোগে আমিও খুনসুটি করে বাবাকে বললাম, “বেশ তো আমার আনা খাবার দিয়েই প্রেম চলছে তাহলে আমার কথা শুনে বাবা ফিক করে হেসে উঠলেন, আর মা লজ্জায় আঁচল টানলেন ওই নির্মল হাসি দিয়ে বাবা আমার দিকে তাকালেন, শিশুর মতো নিষ্পাপ দৃষ্টিতে, যেন কোনো আবদার তাঁর চোখের পাতায় ভেসে উঠেছে যেন কোনো সন্তান বাবার কাছে কিছু চাইছে যেন কোনো শিশু কিছু নেবে বলে বায়না ধরেছে মায়ের কাছে আমার জীবনের অন্যতম প্রাপ্তি বাবার সেদিনের সেই নির্মল হাসি   
 
প্রায় দশ বছর হতে চলল, বাবাকে হারিয়েছি সেই চেনা কণ্ঠ শুনিনি বহু বছর ফজরের পর তাঁর সেই দরাজ কণ্ঠে কুরআনের তেলাওয়াত শুনিনি বহু দিন বাবা, কত দিন, কত দিন দেখি না তোমায়!
 
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
১৯-০৫-২০২১
বাঁশকুড়ি, মহিপাল, দঃ দিনাজপুর

Monday, 31 December 2018

আরেকবার বকবে বাবা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



অনেক দিন হয়ে গেল, তোমার সঙ্গে আমার দেখা নেই। কথাও হয়নি কতকাল। সময়ের স্রোত বয়ে গেছে নিজের মতো করে, ঋতু বদলেছে, মানুষ বদলেছে, আমিও বদলেছি। জানো বাবা, এখন আমি আগের চেয়েও অনেক বেশি উশৃঙ্খল, অনেক বেশি দুরন্ত হয়ে উঠেছি। তবে সেই দুরন্তপনা আর তেঁতুলগাছের ডালে ডালে উড়ে বেড়ানো কোনো কিশোরের নয়; জীবন নামের এক অদৃশ্য ঝড়ের পেছনে ছুটতে থাকা এক ক্লান্ত পথিকের  

 

তোমার কি মনে পড়ে, পাড়ার দক্ষিণ প্রান্তের সেই বিশাল তেঁতুলগাছটার কথা? বিকেল হলেই আমি ছুটে যেতাম সেখানে। এ ডাল থেকে সে ডালে লাফিয়ে বেড়াতাম, বাদুড়ের মতো উল্টো হয়ে ঝুলে থাকতাম সরু ডালের গায়ে। খবর পেয়ে তুমি ছুটে আসতে হাঁপাতে হাঁপাতে। হাতে ছড়ি, মুখে শাসন, অথচ বুকভরা উৎকণ্ঠা। রাগ দেখিয়ে নামিয়ে আনতে, কিন্তু আজ বুঝি, সেই রাগের ভেতর কতখানি মমতা লুকিয়ে ছিল।

 

ক্লাস টুতে পড়ার সময় একদিন তুলাই নদীতে স্নান করতে গিয়েছিলাম। যে নদীটা আমাদের প্রাইমারি স্কুলের পাশ ঘেঁষে বয়ে যেত, মিয়াঁদের আমবাগানের ছায়া মেখে নেচে নেচে গিয়ে মিশত টাঙনের বুকে। সেদিন মেজদা খুব রেগে গিয়েছিল। পা ধরে ছুড়ে দিয়েছিল পুকুরের মাঝখানে। আমি যখন ডুবতে ডুবতে প্রাণপণে হাত-পা ছুড়ছি, তখন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল হালি দি। কোলে করে তুলে এনেছিল পাড়ে। তুমিও বকেছিলে আমাকে। কিন্তু আজ মনে হয়, সেই বকুনিগুলো আসলে ছিল ভালোবাসার অন্য এক ভাষা।

 

মাগরিবের আজান হলেই তুমি হাত ধরে মসজিদে নিয়ে যেতে। একদিন বলেছিলে, “চল, নামাজ পড়ে আসি।আমি যাইনি। মাঠে ফুটবল খেলছিলাম। খেলতে খেলতেই কীভাবে বুড়ো আঙুলটা ভেঙে ফেলেছিলাম, আজ আর মনে নেই। কিন্তু স্পষ্ট মনে আছে, সেদিন রাতভর তুমি আর মা আমার পাশে জেগে ছিলে। ব্যথায় কুঁকড়ে থাকা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলে নীরবে। সেদিন তুমি বকোনি। হয়তো সন্তানের কষ্টের সামনে সব শাসনই হার মেনে যায়।

 

গ্রামের আর পাঁচটা ছেলের মতো আমিও সারা গ্রাম চষে বেড়াতাম। পুন্যা দীঘির পাঁকে মাছ ধরতাম, অন্যের গাছে ঢিল ছুড়তাম, আম-জাম-কুল পেড়ে পকেট ভরে ফিরতাম। বেসুরো গলায় কখনো গান, কখনো গজল, কখনো সূরা, কখনো আজানযা মনে আসত, তাই বিড়বিড় করতাম। কিন্তু বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হলেই তুমি অস্থির হয়ে উঠতে। পাড়ার কারও হাতে খবর পাঠাতে, কখনো নিজেই খুঁজতে বেরিয়ে পড়তে। তখন বুঝিনি, এখন বুঝিসন্তানের জন্য অপেক্ষা করা একজন বাবার হৃদয় কতটা অস্থির হতে পারে।

 

বাবা, বাঁশকুড়ি, কদমডাঙা, চণ্ডীপুর আর মহিপালের সেই চেনা পৃথিবী পেরিয়ে এখন আমি থাকি এক অচেনা শহরেকলকাতায়। এখানে অনেক মানুষ, অনেক রাস্তা, অনেক আলো। অলিগলির মোড়ে মোড়ে অসংখ্য চায়ের দোকান। ভিড়ও হয় খুব। মাঝে মাঝে সেই ভিড়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। অকারণেই। মনে হয়, যদি হঠাৎ তোমাকে দেখতে পাই! যদি কোনো এক কোণে বসে থাকতে দেখতাম, সেই চেনা চোখদুটো নিয়ে!

 

কিন্তু এখানে কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দেয় না। সবাই ছুটছে। কেউ কাজের পেছনে, কেউ কাজের খোঁজে। এখানে মানুষের সময় আছে, অথচ সময় নেই।

 

এখানেও অনেক গাছ আছে, বাবা। তবে সেগুলো আমাদের গ্রামের গাছের মতো নয়। এদের শিকড় মাটির গভীরে নয়, কংক্রিটের ভেতরে। ডালপালাগুলো কাচ, লোহা আর ফাইবারের। ফলের বদলে ঝরে পড়ে বিজ্ঞাপন, আলো আর প্রলোভন। এই শহরও এক জঙ্গলকংক্রিটের জঙ্গল। এখানে পশুরাও আছে, মানুষের ছদ্মবেশে। আবার কিছু মানুষও আছে, যারা এখনো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

 

সারাদিন ছুটে বেড়াই। চেতনা আর অবচেতনার মাঝখানে নিজেকে জড়িয়ে রাখি। চাকরি, দায়িত্ব, স্বপ্ন আর অপূর্ণতার ভার কাঁধে নিয়ে প্রতিদিন হেঁটে যাই এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রের ভেতর দিয়ে। সময়মতো খাওয়া হয় না, ঘুম হয় না, পড়াশোনাটাও আর আগের মতো হয় না। আয়নায় তাকালে নিজেকেই চিনতে কষ্ট হয় কখনো কখনো।

 

বড্ড রোগা হয়ে গেছি, বাবা।

 

কিন্তু জানো, এই শহরে আমাকে আর কেউ বকে না। বড়দা না, মেজদা না, মা-ও না। হাজার মানুষের ভিড়ে থেকেও কখনো কখনো মনে হয়, আমি ভীষণ একা। তখন খুব ইচ্ছে করে, তুমি একবার এসে বলো

এই ছেলে, এত রাত পর্যন্ত জেগে আছিস কেন? ঠিকমতো খেয়েছিস? শরীরটা দেখেছিস আয়নায়?”

 

আমি হয়তো আবার আগের মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকব। আর মনে মনে বলব

অনেক দিন হয়ে গেল, কেউ আর আমাকে বকে না। তুমি আমায় আরেকবার বকবে, বাবা...

 

বাঁশকুড়ি, দক্ষিণ দিনাজপুর

২৫ ডিসেম্বর ২০১৮