নিজ অজান্তেই পা বাড়ালেন মসজিদের
দিকে। কয়েক কদম যেতেই তাঁর মোলাকাত হল হযরত উমর (রাঃ)-এর সাথে। উমর (রাঃ) তাঁকে
দেখে খানিকটা বিস্মিত হলেন। এমন গনগনে দুপুরে আবু বকর (রাঃ) বাড়ির বাইরে, কারণ কী? জিজ্ঞেস করলেন,
—এই অবেলায় বেরিয়েছেন! কী ব্যাপার?
আবু বকর (রাঃ) একটু থেমে মৃদু
স্বরে বললেন,
—সত্যি বলতে কী, বাধ্য হয়েই বেরিয়েছি। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। আর বাড়িতে তেমন কিছুই নেই।
উমর (রাঃ) যেন নিজের কথাই শুনতে পেলেন।
বললেন,
—আমিও ঠিক একই কারণে বেরিয়েছি।
দু’জনের চোখে তখন ক্ষুধার ক্লান্তি, তবে মুখে কোনো
অভিযোগ নেই। তাঁরা পাশাপাশি হাঁটতে লাগলেন মসজিদের দিকে। কিছুদূর এগোতেই
সামনে দেখা মিলল প্রিয় নবীজির (সাঃ)। নবীজিও (সাঃ)
তাঁদের দেখে অবাক হলেন— এমন দহন-দুপুরে তাঁরা দু’জনেই কেন ঘরের বাইরে?! জিজ্ঞেস করলেন,
—তোমরা এই অবেলায় বাড়ি থেকে বেরিয়েছ! রোদে তো পথঘাট সব তেতে আছে। কী ব্যাপার?
আবু বকর ও উমর (রাঃ) দু’জনেই প্রায়
একই সঙ্গে বলে উঠলেন,
—ইয়া রাসূলাল্লাহ (হে আল্লাহ্র রাসুল)! প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। বাড়িতে খাবার মতো
কিছুই নেই। ক্ষুধার জ্বালায় বাধ্য হয়েই বেরিয়েছি।
নবীজি (সাঃ) একটু মুচকি হাসলেন।
যেন তাঁদের কষ্টের সঙ্গে নিজের কষ্টটাও মিশে আছে। বললেন,
—আমিও তো ওই একই কারণে এই অবেলায় ঘর থেকে বেরিয়েছি। চলো, তোমরা আমার সঙ্গে চলো।
তিনজন মানুষ—তিনজনই ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত, অথচ হৃদয়ে পরস্পরের জন্য অফুরান মায়া, হাঁটতে লাগলেন একসাথে। হাঁটতে হাঁটতে তাঁরা এসে পৌঁছলেন আবু আইয়ুব আনসারি (রাঃ)-এর বাড়ির সামনে। আবু আইয়ুব (রাঃ)-এর ঘরে নবীজির (সাঃ) জন্য এক বিশেষ জায়গা ছিল—শুধু ঘরের কোনো কোণে নয়, তাঁর হৃদয়ের একেবারে গভীরে। তিনি প্রতিদিন নবীজির জন্য কিছু খাবার তুলে রাখতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, হয়তো আজও প্রিয় অতিথি আসবেন। তাই খাবার আলাদা করে রেখে দিতেন। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলে যখন বুঝতেন, আজ আর নবীজি আসবেন না, তখন সেই খাবার পরিবারের লোকেদের দিয়ে দিতেন।
সেদিনও হয়তো তিনি তা-ই করেছিলেন।
তবে ভাবতেও পারেননি যে, আজ তাঁর দরজায় এসে দাঁড়াবেন নবীজি, সাথে তাঁর প্রিয় দুই সহচর। নবীজি (সাঃ) দরজায়
কড়া নাড়লেন। ভেতর থেকে শব্দ পেয়ে উম্মু আইয়ুব (রাঃ) দ্রুত বেরিয়ে এলেন। দরজা খুলতেই তাঁর
চোখ বড় হয়ে গেল—দরজার সামনে স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! সঙ্গে আবু বকর ও উমর (রাঃ)। আনন্দে
তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি বললেন,
—মারহাবান বি-রাসুলিল্লাহি ওয়া বিমান মা‘আহু (আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সঙ্গীদের
সাদর অভ্যর্থনা ও অভিনন্দন)!
নবীজি (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন,
—আবু আইয়ুব কোথায়?
উম্মু আইয়ুব (রাঃ) বললেন, তিনি পাশের খেজুরবাগানে কাজ করছেন।
নবীজির কণ্ঠ শুনতে পেয়ে আবু আইয়ুব
(রাঃ) ছুটে এলেন। নবীজিকে সামনে দেখে তাঁর চোখেমুখে আনন্দের ঢেউ। স্বাগত জানিয়ে তিনি বললেন,
—ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই অবেলায়! এটা তো আপনার আসার সময় নয়!
নবীজি (সাঃ) মৃদু হেসে বললেন,
—তুমি ঠিকই বলেছ, আবু আইয়ুব। খানিকটা বাধ্য হয়েই এসেছি।
কথাটুকুই যথেষ্ট ছিল। আবু আইয়ুব (রাঃ) আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। অতিথির মুখের ভাষার আগেই যেন মনের
ভাষা পড়ে ফেলেছিলেন। তিনি ছুটে গেলেন বাগানের দিকে।
একটা খেজুরগাছ থেকে একটি কাঁদি কাটলেন। তাতে কাঁচা, ডাগর ও পাকা—সব ধরনের খেজুর
ছিল। কাঁদিটি নিয়ে দ্রুত নবীজির খিদমতে হাজির হলেন। নবীজি (সাঃ) খেজুরের কাঁদিটি
দেখে বললেন,
—পুরো কাঁদিটা কাটার প্রয়োজন ছিল না। তুমি তো কাঁদি থেকে কিছু খেজুর পেড়ে আনতে
পারতে!
আবু আইয়ুব (রাঃ) বিনয়ের সঙ্গে
বললেন,
—ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কাঁচা, ডাগর ও পাকা—সব ধরনের খেজুর খেতে পছন্দ করেন। তাই ভাবলাম, সবগুলোই যদি আপনার সামনে থাকে! আর আপনি যদি নিজ পছন্দ মতো খান, তাতে তো আমার পরম আনন্দ।
কথার শেষে যেন তাঁর ভালোবাসার
সমস্ত দরজা খুলে গেল; বললেন,
—আজ আপনার জন্য আমি একটি মেষ জবাই করব।
নবীজি (সাঃ) বললেন,
—শোনো, যদি জবাই করো, তবে কোনো দুগ্ধবতী মেষ জবাই করো না।
আবু আইয়ুব (রাঃ) নবীজির কথা মেনে
একটি ছাগশিশু ধরে জবাই করলেন। তারপর স্ত্রীকে ডাকলেন,
—আইয়ুবের মা! তুমি তো খুব ভালো রুটি বানাতে পারো। আজ আমাদের জন্য ক’টা রুটি বানাবে গো?
উম্মু আইয়ুব (রাঃ) কাজে লেগে গেলেন। ঘরের একদিকে রুটি তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে মাংস রান্না হচ্ছে। আবু
আইয়ুব (রাঃ) মাংসের অর্ধেক রান্না করলেন, আর বাকি অর্ধেক ভুনা করলেন। একসময় রান্নার সব কাজ শেষ হলো। ঘর ভরে উঠল খাবারের ঘ্রাণে। দস্তরখান বিছানো হলো। সামনে বসলেন নবীজি (সাঃ)। তাঁর দুই পাশে দুই সহচর আবু বকর ও উমর (রাঃ)। রুটি ও মাংসের
পদগুলো দস্তরখানে সাজিয়ে দেওয়া হলো। নবীজি (সাঃ) একটি রুটি নিলেন। তাতে
ক’টা মাংসের টুকরো রাখলেন। তারপর আবু আইয়ুব (রাঃ)-এর দিকে তাকিয়ে বললেন,
—আবু আইয়ুব, আমার একটা কাজ করে দেবে?
—জী, ইয়া রাসুলাল্লাহ!
নবীজি (সাঃ) বললেন,
—এই একটা রুটি আর ক’পিস মাংস ফাতেমার কাছে দিয়ে আসবে...?
একটু থামলেন তিনি। তারপর এমন একটি কথা বললেন, যা শুধু একজন পিতার হৃদয় থেকেই বের
হতে পারে,
—মেয়েটা আমার অনেক দিন ধরে এমন ভালো খাবার খায়নি গো।
[তথ্যসূত্র: সাহীহ ইবনু
হিব্বান, কিতাবুল আত‘ইমাহ, বাবু আদাবিল আক্ল, হাদিস নং ৫২১৬]

