সাল ২০১২। আমি তখন স্নাতক তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। জীবনের এক ব্যস্ত অথচ স্বপ্নময়
সময়। সেদিনও অন্য দিনের মতোই একটি বেসরকারি মাদ্রাসায় পড়িয়ে বিকেল প্রায় পাঁচটার
সময় ফিরেছি। ক্লান্ত শরীর নিয়ে হোস্টেলে ঢুকতেই হঠাৎ আমার সেই সাধারণ কীপ্যাড
ফোনটা বেজে উঠল। ওপাশ থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠ— “ওবাইদ! পার্ক সার্কাস আসতে পারবে?”
আমি কিছুটা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম—“কোথায়? আর কতক্ষণের মধ্যে?”
উত্তর এল—“আধা ঘণ্টার মধ্যে, দিলখুশা নার্সিংহোমের পাশে।”
আর দেরি করিনি। সঙ্গে সঙ্গে হোস্টেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম। মনে অজানা এক উত্তেজনা, কৌতূহল আর হালকা উদ্বেগ। ঠিক সময়েই পৌঁছে গেলাম নির্ধারিত স্থানে।
গিয়ে যা দেখলাম,
তা যেন এক অন্য জগত! সুঠামদেহী, গাম্ভীর্যে পরিপূর্ণ,
ব্যক্তিত্বময় একজন মানুষকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন একঝাঁক
প্রফেসর ও স্কলার—যাদের সামনে দাঁড়ানোর সাহসও আমাদের মতো ছাত্রদের সচরাচর হয় না। আমি দূরে
দাঁড়িয়ে রইলাম,
হৃদয়ে এক অদ্ভুত কম্পন নিয়ে।
কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে রওনা দেওয়ার সময় আমাকে উদ্দেশ্য করে বলা হলো— “কমপক্ষে ২০ মিটার দূরত্ব বজায় রেখে আমাদের ফলো করবে।”
নির্বাকভাবে সেই নির্দেশ মেনে চলতে শুরু করলাম। প্রায় দশ মিনিট হাঁটার পর পৌঁছলাম
একটি লাল রঙের পাঁচতলা ভবনের সামনে। সেখানে কিছুক্ষণ আলোচনা শেষে সবাই বিদায়
নিলেন। আর আমি থেকে গেলাম সেই মহান ব্যক্তির সঙ্গে।
ভয়,
সংশয় আর অজানা অনুভূতিকে সঙ্গে নিয়েই তাঁর সঙ্গে সিঁড়ি বেয়ে
উপরে উঠতে লাগলাম। পাঁচতলায় পৌঁছে তিনি আমাকে ডাইনিং টেবিলে বসতে বললেন। মিষ্টি ও জলখাবার খাওয়ানোর পর তিনি নানা বইপত্র এনে সামনে রাখলেন এবং একে একে আমাকে সেসব দেখাতে শুরু করলেন।
অদ্ভুত এক পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম তাঁর মধ্যে—সেই গাম্ভীর্যের আড়ালে যেন এক স্নেহময়, আন্তরিক মানুষ।
মুহূর্তের মধ্যেই তিনি আমাকে আপন করে নিলেন। আমার সব ভয়, সংকোচ যেন কোথায় মিলিয়ে গেল। তিনি আমার সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করলেন, আমার কথা আগ্রহভরে শুনলেন।
তারপর একটি বই এবং ইংরেজিতে হাতে লেখা একটি প্রবন্ধ আমাকে দিয়ে বললেন— “এগুলো কম্পোজ করে দিতে হবে”। আমি সময় নিলাম তিন-চার দিন। নিষ্ঠার সঙ্গে টাইপ করে আবার
তাঁর কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি তা মনোযোগ দিয়ে সংশোধন করতে লাগলেন। আর সেই ফাঁকে
আমাকে শেখাতে লাগলেন অনেক নতুন বিষয়। আর যেন আমার জীবনে জ্ঞানের এক নতুন দুয়ার খুলে গেল। চিন্তার পরিধি প্রসারিত হতে লাগলো, শেখার আগ্রহ বহুগুণে বেড়ে গেল।
এর আগে অবশ্য তাঁর সঙ্গে একবার দেখা হয়েছিল—যখন আমি স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়ি। তখন মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের
আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পরীক্ষায় কোয়ালিফাই করেছিলাম। সেই সময় আমার বড় ভাইয়ের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, তবে সেটি ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত, প্রায় অপরিচয়ের মতোই।
যাই হোক,
ধীরে ধীরে যখন তাঁর সান্নিধ্যে আসতে শুরু করলাম, ঠিক সেই সময় কোলকাতায় রাবেতাতুল আদাব আল-ইসলামি’র পক্ষ থেকে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করা হলো পার্ক সার্কাস হাজ হাউসে, জিবরিল ইন্টারন্যাশনাল
স্কুলের সহযোগিতায়।
সেমিনারের বিষয়বস্তুগুলো দেখে আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগল—পশ্চিমবঙ্গে এমন একটি সেমিনার, অথচ বাংলার ওপর
আরবি ভাষার প্রভাব নিয়ে কোনো আলোচনা নেই! এই ভাবনা থেকেই হঠাৎ করেই এক ধরণের সাহস জন্ম নিল। তড়িঘড়ি করে আব্দুল মাতিন ভাইয়ের টিউশন রুমে বসে একটা প্রবন্ধ প্রস্তুত করলাম।
প্রবন্ধটি যখন সেই মহান ব্যক্তিকে দেখালাম, তিনি আগের মতোই
যত্নসহকারে তা সংশোধন করে দিলেন। শুধু তাই নয়, সেমিনারে তা
উপস্থাপন করার জন্য আমাকে সাহসও জোগালেন। তাঁর সেই উৎসাহ, সেই প্রেরণা—আজও আমার হৃদয়ে অনুরণিত হয়।
যার ফোনে সেদিন আমি পার্কসার্কাস ছুটে গিয়েছিলাম, তিনি হলেন প্রোফেসর মহম্মদ মসিহুর রহমান—তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান, আরবি বিভাগ, মাওলানা আজাদ কলেজ,
কোলকাতা। আর যাঁর কথা এতক্ষণ বলছিলাম—তিনি আমাদের সকলের
শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় শিক্ষক
বি.আর. স্যার, অর্থাৎ প্রোফেসর বদিউর রহমান, রাহিমাহুল্লাহু তা’আলা!
সেদিনের সেই প্রথম দেখা—শুধু একটি সাক্ষাৎ নয়, বরং আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক আলোকময় মোলাকাত। তাঁর সান্নিধ্য
আমাকে শিখিয়েছে—জ্ঞান শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা একজন
মানুষের আচরণ,
দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুপ্রেরণার মধ্যেও বিকশিত হয়।
রাজারহাট, কোলকাতা
১৯ এপ্রিল ২০২৬

No comments:
Post a Comment