অনেক দিন হয়ে গেল,
তোমার সঙ্গে আমার দেখা নেই। কথাও হয়নি কতকাল। সময়ের স্রোত
বয়ে গেছে নিজের মতো করে,
ঋতু বদলেছে, মানুষ বদলেছে, আমিও বদলেছি। জানো বাবা, এখন আমি আগের চেয়েও
অনেক বেশি উশৃঙ্খল,
অনেক বেশি দুরন্ত হয়ে উঠেছি। তবে সেই দুরন্তপনা আর
তেঁতুলগাছের ডালে ডালে উড়ে বেড়ানো কোনো কিশোরের নয়; জীবন নামের এক অদৃশ্য ঝড়ের পেছনে ছুটতে থাকা এক ক্লান্ত পথিকের।
তোমার কি মনে পড়ে,
পাড়ার দক্ষিণ প্রান্তের সেই বিশাল তেঁতুলগাছটার কথা? বিকেল হলেই আমি ছুটে যেতাম সেখানে। এ ডাল থেকে সে ডালে লাফিয়ে বেড়াতাম, বাদুড়ের মতো উল্টো হয়ে ঝুলে থাকতাম সরু ডালের গায়ে। খবর পেয়ে তুমি ছুটে
আসতে হাঁপাতে হাঁপাতে। হাতে ছড়ি, মুখে শাসন, অথচ বুকভরা উৎকণ্ঠা। রাগ দেখিয়ে নামিয়ে আনতে, কিন্তু আজ বুঝি,
সেই রাগের ভেতর কতখানি মমতা লুকিয়ে ছিল।
ক্লাস টুতে পড়ার সময় একদিন তুলাই নদীতে স্নান করতে গিয়েছিলাম। যে নদীটা
আমাদের প্রাইমারি স্কুলের পাশ ঘেঁষে বয়ে যেত, মিয়াঁদের
আমবাগানের ছায়া মেখে নেচে নেচে গিয়ে মিশত টাঙনের বুকে। সেদিন মেজদা খুব রেগে
গিয়েছিল। পা ধরে ছুড়ে দিয়েছিল পুকুরের মাঝখানে। আমি যখন ডুবতে ডুবতে প্রাণপণে
হাত-পা ছুড়ছি,
তখন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল হালি দি। কোলে করে তুলে এনেছিল পাড়ে।
তুমিও বকেছিলে আমাকে। কিন্তু আজ মনে হয়, সেই বকুনিগুলো
আসলে ছিল ভালোবাসার অন্য এক ভাষা।
মাগরিবের আজান হলেই তুমি হাত ধরে মসজিদে নিয়ে যেতে। একদিন বলেছিলে, “চল,
নামাজ পড়ে আসি।” আমি যাইনি।
মাঠে ফুটবল খেলছিলাম। খেলতে খেলতেই কীভাবে বুড়ো আঙুলটা ভেঙে ফেলেছিলাম, আজ আর মনে নেই। কিন্তু স্পষ্ট মনে আছে, সেদিন রাতভর
তুমি আর মা আমার পাশে জেগে ছিলে। ব্যথায় কুঁকড়ে থাকা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে
ছিলে নীরবে। সেদিন তুমি বকোনি। হয়তো সন্তানের কষ্টের সামনে সব শাসনই হার মেনে
যায়।
গ্রামের আর পাঁচটা ছেলের মতো আমিও সারা গ্রাম চষে বেড়াতাম। পুন্যা দীঘির
পাঁকে মাছ ধরতাম,
অন্যের গাছে ঢিল ছুড়তাম, আম-জাম-কুল পেড়ে পকেট ভরে ফিরতাম। বেসুরো গলায় কখনো গান, কখনো গজল,
কখনো সূরা, কখনো আজান—যা মনে আসত,
তাই বিড়বিড় করতাম। কিন্তু বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হলেই
তুমি অস্থির হয়ে উঠতে। পাড়ার কারও হাতে খবর পাঠাতে, কখনো নিজেই খুঁজতে বেরিয়ে পড়তে। তখন বুঝিনি, এখন বুঝি—সন্তানের জন্য অপেক্ষা করা একজন বাবার হৃদয় কতটা অস্থির হতে পারে।
বাবা,
বাঁশকুড়ি, কদমডাঙা, চণ্ডীপুর আর মহিপালের সেই চেনা পৃথিবী পেরিয়ে এখন আমি থাকি এক অচেনা শহরে—কলকাতায়। এখানে অনেক মানুষ, অনেক রাস্তা, অনেক আলো। অলিগলির মোড়ে মোড়ে অসংখ্য চায়ের দোকান। ভিড়ও হয় খুব। মাঝে মাঝে
সেই ভিড়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। অকারণেই। মনে হয়, যদি হঠাৎ তোমাকে দেখতে পাই! যদি কোনো এক কোণে বসে থাকতে দেখতাম, সেই চেনা চোখদুটো নিয়ে!
কিন্তু এখানে কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দেয় না। সবাই ছুটছে। কেউ কাজের পেছনে, কেউ কাজের খোঁজে। এখানে মানুষের সময় আছে, অথচ সময় নেই।
এখানেও অনেক গাছ আছে,
বাবা। তবে সেগুলো আমাদের গ্রামের গাছের মতো নয়। এদের শিকড়
মাটির গভীরে নয়,
কংক্রিটের ভেতরে। ডালপালাগুলো কাচ, লোহা আর ফাইবারের। ফলের বদলে ঝরে পড়ে বিজ্ঞাপন, আলো আর প্রলোভন। এই শহরও এক জঙ্গল—কংক্রিটের
জঙ্গল। এখানে পশুরাও আছে,
মানুষের ছদ্মবেশে। আবার কিছু মানুষও আছে, যারা এখনো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
সারাদিন ছুটে বেড়াই। চেতনা আর অবচেতনার মাঝখানে নিজেকে জড়িয়ে রাখি। চাকরি, দায়িত্ব,
স্বপ্ন আর অপূর্ণতার ভার কাঁধে নিয়ে প্রতিদিন হেঁটে যাই এক
অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রের ভেতর দিয়ে। সময়মতো খাওয়া হয় না, ঘুম হয় না,
পড়াশোনাটাও আর আগের মতো হয় না। আয়নায় তাকালে নিজেকেই
চিনতে কষ্ট হয় কখনো কখনো।
বড্ড রোগা হয়ে গেছি,
বাবা।
কিন্তু জানো,
এই শহরে আমাকে আর কেউ বকে না। বড়দা না, মেজদা না,
মা-ও না। হাজার মানুষের
ভিড়ে থেকেও কখনো কখনো মনে হয়, আমি ভীষণ একা। তখন খুব ইচ্ছে করে,
তুমি একবার এসে বলো—
“এই ছেলে,
এত রাত পর্যন্ত জেগে আছিস কেন? ঠিকমতো খেয়েছিস?
শরীরটা দেখেছিস আয়নায়?”
আমি হয়তো আবার আগের মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকব। আর মনে মনে বলব—
“অনেক দিন হয়ে গেল, কেউ আর আমাকে বকে না। তুমি আমায় আরেকবার বকবে, বাবা...”
বাঁশকুড়ি, দক্ষিণ দিনাজপুর
২৫ ডিসেম্বর ২০১৮

No comments:
Post a Comment