Pages

Showing posts with label পিতৃস্নেহ. Show all posts
Showing posts with label পিতৃস্নেহ. Show all posts

Wednesday, 8 July 2026

এক লা-জবাব পথ্য - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



পুরোনো বাড়ি ছেড়ে নতুন বাড়িতে এসে উঠেছি মাস ছয়েক হবে। নতুন বাড়ি মানেই তো নতুন করে গুছিয়ে নেওয়া জীবন, কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে তা হয়নি। নতুন ঘরদোরের তো কোন বালাই ছিল নাআগে যেগুলো আমাদের বৈঠকখানা ছিল, সেগুলোই আমাদের থাকার ঘর হল আর তার একটাতে আব্বা থাকতে আরম্ভ করলেন, একটাতে মা আমি, আরেকটাতে বড়দা ও মেজদা 
 
আষাঢ় মাসের দিন সবে পড়েছে। আকাশে-বাতাসে বর্ষার গন্ধ, মাটিতে সোঁদা সোঁদা আর্দ্রতা, আর আমার শরীরে সিজিনাল জ্বরের ছায়া। টানা দুদিনের প্রবল জ্বরে কাহিল হয়ে পড়েছিলাম। কখনো কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে, তো কখনো শরীর ভেঙে যাচ্ছে অবসাদে। ডাক্তার ওষুধ দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু সেই ওষুধ খেয়ে মুখ এমন তেঁতো হয়ে গেছিল যে জল পর্যন্ত গিলতে কষ্ট হচ্ছিল। সবকিছুই বিস্বাদ ও অরুচিকর ঠেকছিলজ্বর যেন শুধু শরীরকেই নাকাল করে দেয়নি, মুখের স্বাদও কেড়ে নিয়েছিল
 
সেদিন বিকেলে হঠাৎ করেই আকাশ কালো হয়ে এলো। দূরে কোথাও মেঘ গর্জাচ্ছেদাদারা তখন উঠোনে ছুটোছুটি করছে, গরু-ছাগলগুলোকে তাড়াতাড়ি গোয়ালে তুলতে হবে। মা ব্যস্ত হয়ে জ্বালুনখড়ি হেঁসেলে গুছিয়ে রাখছেন, বৃষ্টি নামলে আর বাইরে যাওয়া যাবে না। আর আমি তখন নিঢাল শরীর নিয়ে বাবার ঘরে শুয়ে আছি। মাথাটা পাথরের মতো ভার, শরীর জ্বরের আগুনে ঝলসে যাচ্ছে আর বাবা শিয়রে বসে আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।  
 
বাবার সেই হাতের স্পর্শ আজও যেন আমার কপালে লেগে আছে। কত মমতা, কত স্নেহ, কত নির্ভরতা ছিল সেই স্পর্শে! তিনি আমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে হজরত আইয়ুব (আঃ)-এর কাহিনি শোনাচ্ছিলেন। অসুস্থতার মধ্যেও বাবার কণ্ঠে গল্প শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, জ্বরের কষ্ট যেন একটু একটু করে কমে আসছে। হঠাৎ বাবা স্নেহমাখা গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
—“কিছু খাবে বাবুবলো কী খেতে ইচ্ছে করছে তোমার?”
আমি কষ্ট করে বললাম,
—“কিছুই ভালো লাগছে না, বাবাযা খাচ্ছি সবই কেমন তেঁতো লাগছে।
বাবা একটু ভেবে বললেন,
—“মিষ্টি খাবে? মজিদকে আনতে বলবো?”
আমি মাথা নেড়ে বললাম,
—“না বাবা, কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না।
বাবা তখন আরেকটু ঝুঁকে মমতা জড়ানো কণ্ঠে বললেন,
—“আচ্ছা, মাছ-ভাত খাবে?”
আমি যেন অনেক কষ্টে মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ইচ্ছেটুকু খুঁজে পেলামআস্তে করে বললাম,
—“মাগুর মাছ আর মুসুর ডালের বড়া খাবো, বাবা।
বাবা একগাল মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে ছিল আশ্বাস, ছিল স্নেহ, ছিল এমন এক নিশ্চিন্ততা, যেন আমি যা চাইছি, তা তিনি এনে দেবেনই। তিনি শুধু বললেন,
—“আচ্ছা।
 
কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। টিনের চাল, উঠোন, গাছের পাতা সব একসঙ্গে বৃষ্টির তালে মুখর হয়ে উঠল। বাবা একটি পাতলা খেন্দা মানে কাঁথা আমার গায়ে জড়িয়ে দিয়ে বললেন,
—“তুমি একটু ঘুমাও
 
এই বলে তিনি বাইরে চলে গেলেন। কখন যে বৃষ্টির শব্দে, শরীরের ক্লান্তিতে, আর বাবার হাতের উষ্ণতা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, তা টের পাইনি। ঘুম ভাঙল হৈহট্টগোল শুনেচোখ খুলে দেখি, চাদিক আবছা অন্ধকারে ঢেকে গেছে। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ঠিক তখনই বাতাস ভেদ করে মাগরিবের আজান ভেসে এলো। আমার সাড়া পেয়ে বাবা ঘরে ঢুকলেন। তাঁকে দেখে আমি অবাকভিজে একেবারে যবুথবু! গায়ের কাপড় চুপচুপে, চুল ভিজে কপালে লেগে আছে। কিন্তু তাঁর মুখে কী অপার উচ্ছ্বাস! একগাল হেসে বললেন,
—“বাবু, বাইরে আসো, দেখো কী কাণ্ড হয়েছে!
 
আমি কোনোরকমে উঠে বাইরে গেলাম। গিয়ে দেখি, একটা হাঁড়িতে অনেকগুলো মাগুর মাছ কিলবিল করছে। বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলাম,
—“বাবা, এতগুলো মাগুর মাছ! কোথায় পেলে?”
বাবা ছোট্ট ছেলের মতো আনন্দ নিয়ে বললেন,
—“আমি আর তোমার মেজদা পুন্যা দীঘির নালায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামায় মাছগুলো ডাঙায় উঠে আসছিল। আমরা জাল নিয়ে তৈরি ছিলামব্যাস, ধরতে শুরু করলাম!
আমি আরও কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
—“কতগুলো ধরলে, বাবা?”
বাবা হেসে বললেন,
—“ওই, চল্লিশটার মতো হবে। আমাদের মাছ ধরতে দেখে তোমার বারি দাগেছিল। ওকেটা দিয়েছি।
 
মাগরিবের নামাজ শেষে বাবা আদা-চা আর মুড়ি নিয়ে বসলেন। আমাকেও এক মুঠ করে মুড়ি খাইয়ে দিচ্ছিলেন। পাশাপাশি গল্প শোনাচ্ছিলেনঠাকুমার ঝুলি, শেয়াল পণ্ডিত, আরও নানা রকম মজার কাহিনি। জ্বরের ঘোরে, আধো ঘুমে-আধো জাগরণে আমি বাবার থেকে গল্প শুনছিলাম; মনে হচ্ছিল, বাইরের অন্ধকার, বৃষ্টি, জ্বর সবকিছুর ভেতরেও এক অদ্ভুত নিরাপদ আশ্রয়ে আছি আমি। সেই আশ্রয়ের নামবাবা।
 
ক’দিনের জ্বরে শরীরটা এক্কেবারে কাহিল হয়ে গেছিল। ফলে কিছুক্ষণ পর আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম, জানা নেই। হঠাৎ বাবার ডাকে ঘুম ভাঙল
—“বাবু, ওঠো, ভাত খাবে চলো তোমার মা তোমাদের জন্য খাবার নিয়ে বসে আছে
 
বাইরে তখন বেশ গাঢ় অন্ধকার। আমি উঠে কুলি করে, মুখে-হাতে জল দিয়ে হেঁশেলে গেলাম। গিয়ে দেখি, মা গরম গরম ভাত বেড়ে বসে আছেন। আমরা সবাই সার বেঁধে বসলামমা আর বাবার মাঝখানে আমি। মা বাটিতে করে আমার সামনে রাখলেন মাগুর মাছের মাথা, একটা গাদা আর ঝোল, সঙ্গে দুটো মুসুর ডালের বড়া আর একটা শুকনো বড়াসেই খাবার দেখে আমার চোখ-মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। যেন জ্বর, তেতো মুখ, অরুচি সব মুহূর্তে কোথা মিলিয়ে গেল!
 
খেতে শুরু করলাম। তিন-চার দিন পর সেদিনই প্রথম পেট ভরে ভাত খেলাম। গরম ভাতের সাথে মাগুর মাছের ঝোল, ডালের বড়া, কী সুস্বাদু! শেষে মাগুর মাছের মাথাটা খুব তৃপ্তি করে, তারিয়ে তারিয়ে খেলাম। আমার খাওয়া দেখে মা-বাবার মুখে যে আনন্দ ফুটে উঠেছিল, তা আজও চোখে ভাসে। মায়ের চোখ চিকচিক করে উঠেছিল; যেন আমার সুস্থ হয়ে ওঠার প্রথম আলামত দেখে তাঁর বুকটা হালকা হয়ে গেছিল। আর বাবা হয়তো মনে মনে ভাবছিলেন, তাঁর বৃষ্টিভেজা পরিশ্রম সার্থক হয়েছে অন্যদিকে আমার খাওয়া দেখে মেজদা খুনসুটির ভঙ্গিতে বলে উঠল,
—“এইলা, মিছামিছি জ্বর, মা! মাগুর মাছ দেখি ভালো হই গেল! খামাখা ডাক্তার দেখাবা হলি!
 
এই কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠল। আর আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে রইলামআজ বহু বছর পর ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, সেদিনের সেই আষাঢ়ের সন্ধ্যা আমার শৈশবের এক গভীর আশ্রয়ের স্মৃতি। সেখানে ছিল বাবার ভেজা কাপড়ে লুকিয়ে থাকা সীমাহীন ভালোবাসা, মায়ের নিঃশব্দ উদ্বেগ, দাদাদের হাসি-ঠাট্টা, আর এক অসুস্থ শিশুর মন ভালো করে দেওয়ার জন্য একটি পরিবারের সম্মিলিত প্রয়াস। আষাঢ়ের সেই বৃষ্টি, কিলবিল করা মাগুর মাছ, মায়ের হাতের গরম ভাত, আর বাবার বাবুডাক সব মিলিয়ে তা ছিল আমার জীবনের এক অমলিন, উষ্ণ, ভালোবাসায়-ভেজা সন্ধ্যা, যার পরশ এখনো হৃদয়ের কোণে কোথাও লেগে আছে।  
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
৪ জুলাই ২০২৬

Saturday, 2 July 2022

মায়ার কানন - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


দুপুরের আকাশ যেন চারপাশে আগুনের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। সূর্যের তাপে মদিনার পথঘাট সব তেতে উঠেছে। বাতাসেও যেন উত্তাপের দীর্ঘশ্বাস। এমন রোদজ্বলা দুপুরে সাধারণত কেউই ঘর থেকে বের হতে চায় না। অথচ বাড়ির দরজা পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন হযরত আবু বকর (রাঃ)। কিন্তু কোথায় যাবেন তিনি...?

নিজ অজান্তেই পা বাড়ালেন মসজিদের দিকেকয়েক কদম যেতেই তাঁর মোলাকাত হল হযরত উমর (রাঃ)-এর সাথেউমর (রাঃ) তাঁকে দেখে খানিকটা বিস্মিত হলেন। এমন গনগনে দুপুরে আবু বকর (রাঃ) বাড়ির বাইরে, কারণ কী? জিজ্ঞেস করলেন,

এই অবেলায় বেরিয়েছেন! কী ব্যাপার?

আবু বকর (রাঃ) একটু থেমে মৃদু স্বরে বললেন,

সত্যি বলতে কী, বাধ্য হয়েই বেরিয়েছি। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। আর বাড়িতে তেমন কিছুই নেই।

উমর (রাঃ) যেন নিজের কথাই শুনতে পেলেন। বললেন,

আমিও ঠিক একই কারণে বেরিয়েছি।

দু’জনের চোখে তখন ক্ষুধার ক্লান্তি, তবে মুখে কোনো অভিযোগ নেই। তাঁরা পাশাপাশি হাঁটতে লাগলেন মসজিদের দিকে। কিছুদূর এগোতেই সামনে দেখা মিলল প্রিয় নবীজির (সাঃ) নবীজিও (সাঃ) তাঁদের দেখে অবাক হলেন— এমন দহন-দুপুরে তাঁরা দু’জনেই কেন ঘরের বাইরে?! জিজ্ঞেস করলেন,

তোমরা এই অবেলায় বাড়ি থেকে বেরিয়েছ! রোদে তো পথঘাট সব তেতে আছে। কী ব্যাপার?

আবু বকর ও উমর (রাঃ) দু’জনেই প্রায় একই সঙ্গে বলে উঠলেন,  

ইয়া রাসূলাল্লাহ (হে আল্লাহ্‌র রাসুল)! প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। বাড়িতে খাবার মতো কিছুই নেই। ক্ষুধার জ্বালায় বাধ্য হয়েই বেরিয়েছি।

নবীজি (সাঃ) একটু মুচকি হাসলেন। যেন তাঁদের কষ্টের সঙ্গে নিজের কষ্টটাও মিশে আছে। বললেন,

আমিও তো ওই একই কারণে এই অবেলায় ঘর থেকে বেরিয়েছি। চলো, তোমরা আমার সঙ্গে চলো।

তিনজন মানুষতিনজনই ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত, অথচ হৃদয়ে পরস্পরের জন্য অফুরান মায়া, হাঁটতে লাগলেন একসাথে। হাঁটতে হাঁটতে তাঁরা এসে পৌঁছলেন আবু আইয়ুব আনসারি (রাঃ)-এর বাড়ির সামনে। আবু আইয়ুব (রাঃ)-এর ঘরে নবীজির (সাঃ) জন্য এক বিশেষ জায়গা ছিলশুধু ঘরের কোনো কোণে নয়, তাঁর হৃদয়ের একেবারে গভীরে। তিনি প্রতিদিন নবীজির জন্য কিছু খাবার তুলে রাখতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, হয়তো আজও প্রিয় অতিথি আসবেন। তাই খাবার আলাদা করে রেখে দিতেন। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলে যখন বুঝতেন, আজ আর নবীজি আসবেন না, তখন সেই খাবার পরিবারের লোকেদের দিয়ে দিতেন।

সেদিনও হয়তো তিনি তা-ই করেছিলেন। তবে ভাবতেও পারেননি যে, আজ তাঁর দরজায় এসে দাঁড়াবেন নবীজি, সাথে তাঁর প্রিয় দুই সহচর। নবীজি (সাঃ) দরজায় কড়া নাড়লেন। ভেতর থেকে শব্দ পেয়ে উম্মু আইয়ুব (রাঃ) দ্রুত বেরিয়ে এলেন। দরজা খুলতেই তাঁর চোখ বড় হয়ে গেলদরজার সামনে স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! সঙ্গে আবু বকর ও উমর (রাঃ)। আনন্দে তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি বললেন,

মারহাবান বি-রাসুলিল্লাহি ওয়া বিমান মাআহু (আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সঙ্গীদের সাদর অভ্যর্থনা ও অভিনন্দন)!

নবীজি (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন,

আবু আইয়ুব কোথায়?

উম্মু আইয়ুব (রাঃ) বললেন, তিনি পাশের খেজুরবাগানে কাজ করছেন।

নবীজির কণ্ঠ শুনতে পেয়ে আবু আইয়ুব (রাঃ) ছুটে এলেন। নবীজিকে সামনে দেখে তাঁর চোখেমুখে আনন্দের ঢেউ। স্বাগত জানিয়ে তিনি বললেন,

ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই অবেলায়! এটা তো আপনার আসার সময় নয়!

নবীজি (সাঃ) মৃদু হেসে বললেন,

তুমি ঠিকই বলেছ, আবু আইয়ুব। খানিকটা বাধ্য হয়েই এসেছি।

কথাটুকুই যথেষ্ট ছিল। আবু আইয়ুব (রাঃ) আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। অতিথির মুখের ভাষার আগেই যেন মনের ভাষা পড়ে ফেলেছিলেন। তিনি ছুটে গেলেন বাগানের দিকে। একটা খেজুরগাছ থেকে একটি কাঁদি কাটলেনতাতে কাঁচা, ডাগর ও পাকাসব ধরনের খেজুর ছিল। কাঁদিটি নিয়ে দ্রুত নবীজির খিদমতে হাজির হলেন। নবীজি (সাঃ) খেজুরের কাঁদিটি দেখে বললেন,

পুরো কাঁদিটা কাটার প্রয়োজন ছিল না। তুমি তো কাঁদি থেকে কিছু খেজুর পেড়ে আনতে পারতে!

আবু আইয়ুব (রাঃ) বিনয়ের সঙ্গে বললেন,

ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কাঁচা, ডাগর ও পাকাসব ধরনের খেজুর খেতে পছন্দ করেন। তাই ভাবলাম, সবগুলোই যদি আপনার সামনে থাকে! আর আপনি যদি নিজ পছন্দ মতো খান, তাতে তো আমার পরম আনন্দ।

কথার শেষে যেন তাঁর ভালোবাসার সমস্ত দরজা খুলে গেল; বললেন,

আজ আপনার জন্য আমি একটি মেষ জবাই করব।

নবীজি (সাঃ) বললেন,

শোনো, যদি জবাই করো, তবে কোনো দুগ্ধবতী মেষ জবাই করো না।

আবু আইয়ুব (রাঃ) নবীজির কথা মেনে একটি ছাগশিশু ধরে জবাই করলেন। তারপর স্ত্রীকে ডাকলেন,

আইয়ুবের মা! তুমি তো খুব ভালো রুটি বানাতে পারো। আজ আমাদের জন্য ক’টা রুটি বানাবে গো?  

উম্মু আইয়ুব (রাঃ) কাজে লেগে গেলেন। ঘরের একদিকে রুটি তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে মাংস রান্না হচ্ছে। আবু আইয়ুব (রাঃ) মাংসের অর্ধেক রান্না করলেন, আর বাকি অর্ধেক ভুনা করলেন। একসময় রান্নার সব কাজ শেষ হলো। ঘর ভরে উঠল খাবারের ঘ্রাণে। দস্তরখান বিছানো হলো। সামনে বসলেন নবীজি (সাঃ)তাঁর দুই পাশে দুই সহচর আবু বকর ও উমর (রাঃ)। রুটি ও মাংসের পদগুলো দস্তরখানে সাজিয়ে দেওয়া হলো। নবীজি (সাঃ) একটি রুটি নিলেন। তাতে ক’টা মাংসের টুকরো রাখলেন। তারপর আবু আইয়ুব (রাঃ)-এর দিকে তাকিয়ে বললেন,

আবু আইয়ুব, আমার একটা কাজ করে দেবে?

জী, ইয়া রাসুলাল্লাহ!

নবীজি (সাঃ) বললেন,

এই একটা রুটি আর ক’পিস মাংস ফাতেমার কাছে দিয়ে আসবে...?

একটু থামলেন তিনি। তারপর এমন একটি কথা বললেন, যা শুধু একজন পিতার হৃদয় থেকেই বের হতে পারে,

মেয়েটা আমার অনেক দিন ধরে এমন ভালো খাবার খায়নি গো।

[তথ্যসূত্র: সাহীহ ইবনু হিব্বান, কিতাবুল আতইমাহ, বাবু আদাবিল আক্‌ল, হাদিস নং ৫২১৬]

Thursday, 20 May 2021

আব্দুল মাতিন ওয়াসিমঃ মা-বাবা’র সাথে খুনসুটি


 
মা-বাবা’র সাথে খুনসুটি
 
আমি তখন খুব ছোট কত ছোট বা বয়স কত হবে, তা মনে নেই একদিন হঠাৎ করে আব্বা অসুস্থ হয়ে পড়লেন একেবারে বিছানা ধরে নিলেন বাবার একটা হাত একটা পা প্যারালাইজড হয়ে গেল ফলে পুরো সংসারের দায়িত্ব এসে পড়লো বড়দার কাঁধে সে তখন টুয়েলভে পড়ে স্বাভাবিক ভাবেই তার পড়াশুনোর বেশ ক্ষতি হল তার আর টুয়েলভ পাশ করা হল না সেই থেকে সে সংসার সামলাতে আরম্ভ করলো দিনমান মাঠে খাটে চাষ করে ফসল তোলে আর তা দিয়েই সংসার চলে আমাদের দু ভাইয়ের পড়াশুনোর খরচও চলে
 
বাবা ধীরে ধীরে সুস্থ হলেন অনেকটা স্বাভাবিক জীবন-ছন্দে ফিরলেন তবে আগের মতো খাটাখাটুনি সম্ভব হচ্ছিল না যেটুকু পারতেন দাদাকে চাষের কাজে সাহায্য করতেন সময় দ্রুত ছুটতে লাগলো আমরাও ধীরে ধীরে বড় হয়ে গেলাম এরই মধ্যে মেজদাও ডিগ্রি কমপ্লিট না করেই জমি-জায়গায় দেখাশোনায় লেগে গেলেন সত্যি বলতে, কৃষকের সংসার কি সেকাল, কি একাল সব সময় টেনেটুনেই চলে ওই যে নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা তবে আমার পড়াশুনো কখনও থামেনি কারণ, বাবা-মা দুই দাদা সবাই চাইতেন, আমি মন দিয়ে পড়াশুনো করি জীবনে কিছু করি তাই তাঁদের পক্ষে যতটা সম্ভব তাঁরা আমার জন্য করতেন এরই মাঝে সংসারে আরও কিছু বিড়ম্বনা দেখা দিলো আমি বেনারস ছেড়ে বাড়ি ফিরলাম পড়াশুনোর পাশাপাশি টিউশন আরম্ভ করলাম কিছুদিন পর একটা মাদ্রাসায় পড়াতে আরম্ভ করলাম পড়া পড়ানো দুটোই চলতে থাকলো
 
আমি যখন থেকে রোজগার করতে আরম্ভ করেছি, একটা জিনিস ঠিক করেছিলাম, প্রতি মাসে কিছু টাকা বাবার হাতে তুলে দেবো তিনি তাঁর মতো করে খরচ করবেন সামান্য হলেও দেবো দিতামও সেই টাকা হাতে নিয়ে বাবা খুব খুশী হতেন ওই টাকার দিকে তাকিয়ে বাবার মুখে এক নির্মল হাসি ছড়িয়ে পড়তো এক অদ্ভুত তৃপ্তির রেখা লক্ষ্য করতাম বাবার কপালের রেখায় মাঝে মাঝে বাড়ি ফেরার সময় বাবার জন্য বাবার পছন্দ মতো কিছু খাবার এবং মায়ের জন্য মায়ের পছন্দ মতো কিছু খাবার কিনে আনতাম একদিন কিছু খাবার কিনে এনেছি, কী খাবার ছিল তা আজ আর মনে নেই সবাই মিলে বিকেলে বসে সেই খাবার খাচ্ছি বাবার খুব পছন্দের খাবার ছিল, তাই বাবাকে একটু বেশিই দিয়েছিলাম সবাই পাশাপাশি বসে যে যার মতো করে খাচ্ছি খাচ্ছি আর এটা-সেটা নিয়ে গল্পগুজব করছি এমন সময় হঠাৎ আমার দৃষ্টি গেলো বাবার দিকে দেখলাম, বাবা খানিকটা আড়াল করেই কিছু খাবার তাঁর থালা থেকে তুলে মায়ের থালায় দিচ্ছেন আর মা হাত দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছেন এবং বাবাকেই তা খেতে বলছেন বাবা যখন লক্ষ্য করলেন যে আমি দেখে ফেলেছি, জোর করে মায়ের থালায় খাবারটুকু রেখে দিলেন সেই সুযোগে আমিও খুনসুটি করে বাবাকে বললাম, “বেশ তো আমার আনা খাবার দিয়েই প্রেম চলছে তাহলে আমার কথা শুনে বাবা ফিক করে হেসে উঠলেন, আর মা লজ্জায় আঁচল টানলেন ওই নির্মল হাসি দিয়ে বাবা আমার দিকে তাকালেন, শিশুর মতো নিষ্পাপ দৃষ্টিতে, যেন কোনো আবদার তাঁর চোখের পাতায় ভেসে উঠেছে যেন কোনো সন্তান বাবার কাছে কিছু চাইছে যেন কোনো শিশু কিছু নেবে বলে বায়না ধরেছে মায়ের কাছে আমার জীবনের অন্যতম প্রাপ্তি বাবার সেদিনের সেই নির্মল হাসি   
 
প্রায় দশ বছর হতে চলল, বাবাকে হারিয়েছি সেই চেনা কণ্ঠ শুনিনি বহু বছর ফজরের পর তাঁর সেই দরাজ কণ্ঠে কুরআনের তেলাওয়াত শুনিনি বহু দিন বাবা, কত দিন, কত দিন দেখি না তোমায়!
 
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
১৯-০৫-২০২১
বাঁশকুড়ি, মহিপাল, দঃ দিনাজপুর