Pages

Showing posts with label বাবা. Show all posts
Showing posts with label বাবা. Show all posts

Sunday, 23 February 2020

আব্দুল মাতিন ওয়াসিমঃ বাবা...!



বাবা...!
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

সেদিন বিকেলে ওর ফোনটা আমাকে থামিয়ে দিয়ে
ও বেরিয়ে গেল রুম থেকে
হয়তো বিশেষ কোনো কাজে
আমি তখনো সেখানেই বসে একই রকম ভাবে
আর ওর ফোনটা আমার বাম হাতে
হঠাৎ কেঁপে উঠলো হাতটা
বুঝতে পারলাম ভাইব্রেট করছে ফোনটা
দেখলাম একটা কল এসেছে
স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে “বাবা”;
বুকের ভেতরটা কেমন চিনচিন করে উঠলো
স্বাভাবিক নিঃশ্বাস একটু ঘন হয়ে
বেরিয়ে এল দীর্ঘশ্বাস রূপে
চিকচিক করে উঠলো দু’চোখের কোণ
আজ আট বছর পেরিয়ে গেল
এই নামে কোনো কল আসে না আমার ফোনে
আর কোনোদিন আসবে না, ভেসে উঠবে না
ওই শব্দটা অমন ভাবে আমার ফোনের স্ক্রিনে।


২৩-০২-২০২০
কোলকাতা- ৭০০০৩৯

Monday, 31 December 2018

আরেকবার বকবে বাবা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



অনেক দিন হয়ে গেল, তোমার সঙ্গে আমার দেখা নেই। কথাও হয়নি কতকাল। সময়ের স্রোত বয়ে গেছে নিজের মতো করে, ঋতু বদলেছে, মানুষ বদলেছে, আমিও বদলেছি। জানো বাবা, এখন আমি আগের চেয়েও অনেক বেশি উশৃঙ্খল, অনেক বেশি দুরন্ত হয়ে উঠেছি। তবে সেই দুরন্তপনা আর তেঁতুলগাছের ডালে ডালে উড়ে বেড়ানো কোনো কিশোরের নয়; জীবন নামের এক অদৃশ্য ঝড়ের পেছনে ছুটতে থাকা এক ক্লান্ত পথিকের  

 

তোমার কি মনে পড়ে, পাড়ার দক্ষিণ প্রান্তের সেই বিশাল তেঁতুলগাছটার কথা? বিকেল হলেই আমি ছুটে যেতাম সেখানে। এ ডাল থেকে সে ডালে লাফিয়ে বেড়াতাম, বাদুড়ের মতো উল্টো হয়ে ঝুলে থাকতাম সরু ডালের গায়ে। খবর পেয়ে তুমি ছুটে আসতে হাঁপাতে হাঁপাতে। হাতে ছড়ি, মুখে শাসন, অথচ বুকভরা উৎকণ্ঠা। রাগ দেখিয়ে নামিয়ে আনতে, কিন্তু আজ বুঝি, সেই রাগের ভেতর কতখানি মমতা লুকিয়ে ছিল।

 

ক্লাস টুতে পড়ার সময় একদিন তুলাই নদীতে স্নান করতে গিয়েছিলাম। যে নদীটা আমাদের প্রাইমারি স্কুলের পাশ ঘেঁষে বয়ে যেত, মিয়াঁদের আমবাগানের ছায়া মেখে নেচে নেচে গিয়ে মিশত টাঙনের বুকে। সেদিন মেজদা খুব রেগে গিয়েছিল। পা ধরে ছুড়ে দিয়েছিল পুকুরের মাঝখানে। আমি যখন ডুবতে ডুবতে প্রাণপণে হাত-পা ছুড়ছি, তখন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল হালি দি। কোলে করে তুলে এনেছিল পাড়ে। তুমিও বকেছিলে আমাকে। কিন্তু আজ মনে হয়, সেই বকুনিগুলো আসলে ছিল ভালোবাসার অন্য এক ভাষা।

 

মাগরিবের আজান হলেই তুমি হাত ধরে মসজিদে নিয়ে যেতে। একদিন বলেছিলে, “চল, নামাজ পড়ে আসি।আমি যাইনি। মাঠে ফুটবল খেলছিলাম। খেলতে খেলতেই কীভাবে বুড়ো আঙুলটা ভেঙে ফেলেছিলাম, আজ আর মনে নেই। কিন্তু স্পষ্ট মনে আছে, সেদিন রাতভর তুমি আর মা আমার পাশে জেগে ছিলে। ব্যথায় কুঁকড়ে থাকা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলে নীরবে। সেদিন তুমি বকোনি। হয়তো সন্তানের কষ্টের সামনে সব শাসনই হার মেনে যায়।

 

গ্রামের আর পাঁচটা ছেলের মতো আমিও সারা গ্রাম চষে বেড়াতাম। পুন্যা দীঘির পাঁকে মাছ ধরতাম, অন্যের গাছে ঢিল ছুড়তাম, আম-জাম-কুল পেড়ে পকেট ভরে ফিরতাম। বেসুরো গলায় কখনো গান, কখনো গজল, কখনো সূরা, কখনো আজানযা মনে আসত, তাই বিড়বিড় করতাম। কিন্তু বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হলেই তুমি অস্থির হয়ে উঠতে। পাড়ার কারও হাতে খবর পাঠাতে, কখনো নিজেই খুঁজতে বেরিয়ে পড়তে। তখন বুঝিনি, এখন বুঝিসন্তানের জন্য অপেক্ষা করা একজন বাবার হৃদয় কতটা অস্থির হতে পারে।

 

বাবা, বাঁশকুড়ি, কদমডাঙা, চণ্ডীপুর আর মহিপালের সেই চেনা পৃথিবী পেরিয়ে এখন আমি থাকি এক অচেনা শহরেকলকাতায়। এখানে অনেক মানুষ, অনেক রাস্তা, অনেক আলো। অলিগলির মোড়ে মোড়ে অসংখ্য চায়ের দোকান। ভিড়ও হয় খুব। মাঝে মাঝে সেই ভিড়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। অকারণেই। মনে হয়, যদি হঠাৎ তোমাকে দেখতে পাই! যদি কোনো এক কোণে বসে থাকতে দেখতাম, সেই চেনা চোখদুটো নিয়ে!

 

কিন্তু এখানে কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দেয় না। সবাই ছুটছে। কেউ কাজের পেছনে, কেউ কাজের খোঁজে। এখানে মানুষের সময় আছে, অথচ সময় নেই।

 

এখানেও অনেক গাছ আছে, বাবা। তবে সেগুলো আমাদের গ্রামের গাছের মতো নয়। এদের শিকড় মাটির গভীরে নয়, কংক্রিটের ভেতরে। ডালপালাগুলো কাচ, লোহা আর ফাইবারের। ফলের বদলে ঝরে পড়ে বিজ্ঞাপন, আলো আর প্রলোভন। এই শহরও এক জঙ্গলকংক্রিটের জঙ্গল। এখানে পশুরাও আছে, মানুষের ছদ্মবেশে। আবার কিছু মানুষও আছে, যারা এখনো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

 

সারাদিন ছুটে বেড়াই। চেতনা আর অবচেতনার মাঝখানে নিজেকে জড়িয়ে রাখি। চাকরি, দায়িত্ব, স্বপ্ন আর অপূর্ণতার ভার কাঁধে নিয়ে প্রতিদিন হেঁটে যাই এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রের ভেতর দিয়ে। সময়মতো খাওয়া হয় না, ঘুম হয় না, পড়াশোনাটাও আর আগের মতো হয় না। আয়নায় তাকালে নিজেকেই চিনতে কষ্ট হয় কখনো কখনো।

 

বড্ড রোগা হয়ে গেছি, বাবা।

 

কিন্তু জানো, এই শহরে আমাকে আর কেউ বকে না। বড়দা না, মেজদা না, মা-ও না। হাজার মানুষের ভিড়ে থেকেও কখনো কখনো মনে হয়, আমি ভীষণ একা। তখন খুব ইচ্ছে করে, তুমি একবার এসে বলো

এই ছেলে, এত রাত পর্যন্ত জেগে আছিস কেন? ঠিকমতো খেয়েছিস? শরীরটা দেখেছিস আয়নায়?”

 

আমি হয়তো আবার আগের মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকব। আর মনে মনে বলব

অনেক দিন হয়ে গেল, কেউ আর আমাকে বকে না। তুমি আমায় আরেকবার বকবে, বাবা...

 

বাঁশকুড়ি, দক্ষিণ দিনাজপুর

২৫ ডিসেম্বর ২০১৮

Thursday, 17 November 2016

আব্দুল মাতিন ওয়াসিমঃ বাবা, তুমি কি ডাকো আমায়



বাবা, তুমি কি ডাকো আমায়  
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

আজ আরও এক ধাপ উঁচু হয়ে গেল
আমাদের মাঝের দেওয়ালটি
ব্যবধানের রেখাটি আরও একটু চওড়া হল 
প্রকৃতির অমোঘ পার্টিশনের
একপ্রান্তে তুমি অপর প্রান্তে আমি
আজ তুমি কেমন আছো, জানি না
কিন্তু কেমন ছিলে, আজ বড্ড বেশি মনে পড়ে। 

যতদূর মনে পড়ে সেই ছোটবেলার কথা
তুমি খুব বেশি দিন আমায় স্কুলে ছাড়তে যাওনি
হতে পারে তোমার ব্যস্ততার দরুন
আবার এও হতে পারে, তুমি আমায় বড্ড বেশি ভালবাসতে
তাই স্কুলে রেখে আসতে কষ্ট হবে ভেবে যাওনি, থাক সে কথা
কিন্তু বাকি দুই ভাইয়ের চেয়ে তুমি যে আমায় বেশি ভালোবাসোতে
তা আমি হলফ করে বলতে পারি।

একবার তোমার চরম অসুখ করেছিল
বিছানায় শুয়েই আমার মাথা হাত বোলাতে
আমাকে জীবনে কি করা উচিৎ কি উচিৎ নয় বোঝাতে
স্কুল থেকে ফিরে আমি ছুটে যেতাম তোমার ঘরে
পাশে বসিয়ে আমায় ভালো মানুষ হওয়ার দীক্ষা দিতে
সেই স্মৃতিগুলি আজ আবছা আবছা মনে পড়ে

কিছু দিন পর তোমার অসুখ সেরে গেল
কিন্তু আগের মতো সংসারকর্ম আর সম্ভব হচ্ছিল না তোমার পক্ষে 
সারাক্ষণ শুধু বাবু বাবু করে সমস্ত বাড়ি মাথায় তুলে রাখতে
মুহূর্তের জন্য তোমার চোখের আড়াল হলে
সারা পাড়া চষে বেড়াতে আমার খোঁজে।

একদিন আমি পুকুরে স্নান করছি
তুমি সেখানে পৌঁছে পুকুর পাড়ে বসে থাকলে
স্নান শেষে আমায় হাত ধরে পাড়ে টেনে তুললে
গামছা দিয়ে মাথা মুছিয়ে বাড়ি নিয়ে গেলে।
জানো বাবা, এই কনকনে শীতে
আজ পুকুরে নামতে বড্ড ইচ্ছে করছে;
যদি তুমি আসো, হাত ধরে পাড়ে টেনে তোলো
মাথায় হাত বুলিয়ে শীতে জলে নামতে বারণ করো, এই আশায়।
তুমি কি পারো না প্রকৃতির এই অমোঘ পার্টিশনকে ভেঙে
একবার আসতে, আমায় একবার দেখে যেতে
কেমন আছি? কত বড় হয়েছি?
এসব জানতে ইচ্ছে করে না তোমার!

পুনশ্চঃ তুমি ও মা আমায় বাবু বলে ডাকতে
চার বছর হল ওই ডাক শুনিনি
মাও আজ আর ডাকে না ওই নামে
তুমি কি ডাকো? কই আমি শুনতে পাই না তো!
 
২৪/১২/২০১৫ ইং
তপসিয়া, কোলকাতা