Pages

Monday, 21 September 2026

আমার ছোট ভাই - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 
শীত চলে গেছেবেশ কয়েক সপ্তাহ আগেবে বসন্ত তখনও এসে পৌঁছায়নি। ঋতুর খাতায় শীতের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার শেষটুকু যেন খনও বাতাসের শরীরে লেগে আছে। ভোরের হাওয়ায় তখনও একটা হালকা শীতশীত ভাব, সকালের চাদরে তখনও কুয়াশার স্মৃতি আর নিস্তব্ধতার এক অদ্ভুত আবেশমনে হচ্ছিল, শীত বিদায় নিয়েছে বটে, কিন্তু যাওয়ার আগে তার কিছু স্মৃতি বাতাসের কাঁধে রেখে গেছে।
 
সেই রকমই এক কাকভোরে খাদেমুল দা বাড়ি থেকে বেরোলেন। ভোর তখনও পুরোপুরি ভোর হয়ে ওঠেনি। চারদিকের অন্ধকার ধীরে ধীরে পাতলা হচ্ছে, কিন্তু দিনের আলো খনও দিগন্তের ওপারে। ঘরের মানুষজন ঘুমিয়ে। উঠোন নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও দু-একটা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। খাদেমুল দা চুপচাপ জামাকাপড় পরে নিলেনসঙ্গে একটা ছোট্ট ব্যাগ, ব্যাগটা খুব ভারী নয়তাতে প্রয়োজনের সামান্য কিছু জিনিস; আর কিছু অদৃশ্য চিন্তা সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
 
মোড়ে এসে দেখলেন, কয়েকজন মানুষ ইতিমধ্যে হাটাহাটি করছে। কেউ কাজে বেরোবে, কেউ হয়তো বাজারের দিকে যাবেকিন্তু তখনকার দিনে এমন ভোরবেলায় যানবাহনের এত সহজলভ্যতা ছিল না। ইচ্ছা করলেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ি পাওয়া যেত না। তাই আগের রাতেই পাশের গ্রামের এক রিকশাওয়ালাকে বলে রেখেছিলেন। বে তার আসতে একটু দেরি হচ্ছিল দেখে খাদেমুল দা অপেক্ষা করতে লাগলেন।
 
অবশেষে কিছুক্ষণ পর রিকশাওয়ালা এসে হাজির। খাদেমুল দা রিকশায় উঠলেন। রিকশা চলতে লাগলো। ভোরের ঠান্ডা বাতাস শিরশির করে যেন বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধছিলরিকশার চাকার কর্‌কর্‌ শব্দে নিস্তব্ধ রাস্তা যেন ধীরে ধীরে জেগে উঠছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁরা পৌঁছে গেলেন মহিপাল বাসস্ট্যান্ডে। বাস ছাড়তে তখনও প্রায় কুড়ি মিনিট বাকি। এই সামান্য সময়টুকুও তিনি নষ্ট করতে চাইলেন না। তাই রিকশাওয়ালাকে সঙ্গে নিয়ে চায়ের দোকানে বসলেন। দুজনের জন্য চা-বিস্কুট নিলেন। নিজেও খেলেন, রিকশাওয়ালাকেও খাওয়ালেন। তারপর তার প্রাপ্য ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে বললেনহাঁ বো কাকা, তোরা বার বাড়িযাও।
 
রিকশাওয়ালা চলে গেল। খাদেমুল দা বাসে উঠে জানালার ধারের একটা সিটে বসে পড়লেন। বাস ছাড়ল প্রায় দশ মিনিট দেরীতে জানালার বাইরে তখন ভোরের আলো ধীরে ধীরে সকাল হয়ে উঠছে। পরিচিত গ্রাম, মাঠ, গাছপালা, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষসবকিছু পেছনে পড়ে যাচ্ছে। খাদেমুল দা চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে সেসব দেখছিলেন। তাঁর এই যাত্রা কেবল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার যাত্রা ছিল না; এর মধ্যে ছিল দেখা করার আকাঙ্ক্ষা, কিছু কথা বলার প্রয়োজন, আর নিজের ভেতরে জমে থাকা কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা।
 
প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর বাস পৌঁছাল কুশমুণ্ডিতে। সেখানে নেমে তাঁর কিছু টুকিটাকি জরুরি কাজ ছিল। সেগুলো সেরে আবার একটা বাস ধরলেন। এবার গন্তব্য দোমোহনা। দোমোহনা থেকে ট্রেকার। তারপর ট্রেকার বদলে অবশেষে পৌঁছালেন গোয়ালপোখরে।
 
দীর্ঘ পথ। একের পর এক যানবাহন। একের পর এক রাস্তা। তবু খাদেমুল দার মনে কোনো ক্লান্তি ছিল না। কারণ মানুষের কোনো কোনো যাত্রা শরীরের ক্লান্তিকে অতিক্রম করে যায়গন্তব্যের মানুষটি যখন হৃদয়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন পথের দূরত্ব আর দূরত্ব বলে মনে হয় না
 
গোয়ালপোখরে তাঁর গন্তব্য ছিল অশোক দার বাড়ি। অশোক দা আমাদের এলাকার একজন কৃতী সন্তানতখন তিনি মৎস্য দপ্তরের একজন কর্মরত অফিসার হিসেবে গোয়ালপোখরে পোস্টেড। আমাদের এলাকার তরুণদের কাছে তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণাঅনেকেই তাঁর কাছে পরামর্শ নিতে যেতেন। কারও পড়াশোনা নিয়ে সমস্যা, কারও চাকরি নিয়ে সংশয়, কারও ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধাঅশোক দা নিজের মতো করে সবাইকে কিছু না কিছু পথ দেখাতেন। শুধু উপদেশ দিতেন না, অনেক সময় পাশে দাঁড়াতেন, সাহস জোগাতেন, এবং সাহায্যও করতেন।
 
খাদেমুল দারও তাঁর সঙ্গে কিছু আলাপ-আলোচনা করার ছিল। আগেই কথা হয়েছিল। তাই গোয়ালপোখরে পৌঁছেই তিনি অশোক দার অফিসে গেলেন। কিন্তু অশোক দার তখন কিছু জরুরি কাজ চলছিল। তিনি বেয়ারাকে ডেকে খাদেমুল দাকে বাইরে চা-বিস্কুট দিয়ে বসাতে বললেন; এবং বললেন, কাজ শেষ হলেই বেরিয়ে আসবেন।
 
খাদেমুল দা অপেক্ষা করতে লাগলেন। অবশেষে কাজ শেষ হলো। দুজন একসঙ্গে অফিস থেকে বেরোলেন। ততক্ষণে দিনের আলো অনেকটাই ফুরিয়ে এসেছে। বাড়িতে বাড়িতে সন্ধ্যার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আর তাঁদের গ্রামের  বাড়ি তো গোয়ালপোখর থেকে অনেক দূরেসেই রাতে খাদেমুল দা পক্ষে বাড়ি ফেরা যে সম্ভব নয়এটা অশোক দাও ভালোভাবেই জানতেন তাই খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন খাদেমুল, আজ তুমি আমার সঙ্গে চলো। রাতে আমার কাছেই থেকো। কাল সকালে বাড়ি চলে যেও।
 
খাদেমুল দা আর কী করবেন! রাজি হয়ে গেলেন। অশোক দা যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন, সেটা ছিল একজন বয়স্ক মহিলামহিলা স্বভাবের দিক থেকে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। কিছু বিষয়ে তাঁর নিয়মকানুন ছিল বেশ কড়া। অশোক দা ব্যাপারটি জানতেন। তাই বাড়িতে ঢোকার আগে তিনি খাদেমুল দাকে একটু সাবধান করে দিলেন। বললেন,
—“খাদেমুল, একটা কথা মনে রেখো। বাড়ির মালকিন ভদ্র মহিলা যদি তোমার নাম জিজ্ঞেস করেন, তুমি খাদেমুলবলবে না। বলবেঅমল
খাদেমুল দা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারলেন না। কিছুক্ষণ অশোক দার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন।
—“কেন?”
অশোক দা তখন বিস্তারিত কিছু বললেন না। শুধু বললেন,
—“ভেতরে গেলে বুঝবে।
অশোক দা এগিয়ে গিয়ে বেল বাজালেন। দরজা খুলেই ভদ্র মহিলা রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করলেনএ কে, কী নাম?
আমার ছোট ভাই, মাসিমা। ওর নাম অমল। 
 
তারপর তাঁরা বাড়িতে ঢুকলেন। সেই রাতটা সেখানেই কাটল। দুনে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করলেন। গল্পগুজব হলো। হাবিজাবি নানান রকমের আলাপআলোচনা হলো। আর এভাবেই দিনের ক্লান্তি ধীরে ধীরে কথার মধ্যে গলে যেতে থাকলো। কিন্তু খাদেমুল দার মনে তখনও একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলকেন নিজের নাম লুকিয়ে অন্য একটা নাম বলতে হলো? রাতে সুযোগ পেয়ে অশোক দাকে জিজ্ঞেস করলেন—“আচ্ছা, আমার নামটা বদলে বলতে বললে কেন?”
 
এবার অশোক দা একটু হেসে, একটু গম্ভীর হয়ে আসল কথাটা বললেন। ওই ভদ্র মহিলা শুচিবাইর শিকারতোমার নাম যদি খাদেমুলশুনতেন, তাহলে হয়তো তোমাকে ঘরে ঢুকতে দিতেন না। শুধু তোমাকেই নয়আমাকেও নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হতো। হয়তো তোমার সামনে এমন সব কাণ্ডকারখানা করতেন, যেগুলো তোমারও খারাপ লাগত, আমারও খারাপ লাগত। তাই তোমাকে আগে থেকেই সাবধান করে দিয়েছিলাম।
 
খাদেমুল দা এবার ব্যাপারটা বুঝলেন। কিন্তু তাঁর ভেতরে যেন অন্যরকম একটা অনুভূতি জন্ম নিল। একজন মানুষকে তার নিজের নাম পর্যন্ত গোপন করতে হলোশুধু একজনের বাড়িতে রাত কাটানোর জন্য! কী অদ্ভুত! একটা নামকখনও পরিচয়, কখনও পরিচয়ের বোঝা। একটা নামকখনও দরজা খুলে দেয়, আবার কখনও দরজা বন্ধ করে দেয়। মানুষের পরিচয় যে কত বিচিত্রভাবে মানুষের ভাগ্য, সম্পর্ক ও আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই রাতে খাদেমুল দা যেন তার একটা ছোট্ট উদাহরণ চোখের সামনে দেখতে পেলেন।
 
পরদিন সকালে খাদেমুল দার বাড়ি ফেরার কথা। অশোক দা তাঁকে একা ছেড়ে দিলেন না। সকালে একটু তাড়াতাড়িই বেরিয়ে তাঁকে নিজে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন। অশোক দা নিয়মিত যাতায়াত করতেন বলে সেখানকার স্টেট বাসের কন্ডাক্টারও তাঁকে চিনতেন। অশোক দা কন্ডাক্টারকে ডেকে বললেন— “কাকা, এ আমার ছোট ভাই। ওকে রায়গঞ্জে নামিয়ে দিও।
 
খাদেমুল দা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। অশোক দা শুধু মুখে তাঁকে ছোট ভাইবলেই থেমে থাকলেন না। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে তাঁকে কিছু নাস্তা কিনে দিলেন, সঙ্গে পানির বোতলও। এমনকি তাঁর বাসভাড়াটাও কন্ডাক্টরের হাতে দিয়ে বললেন— “খেয়াল রেখো, আমার ছোট ভাই। রায়গঞ্জে ঠিকমতো নামিয়ে দেবে।
 
বাস ছাড়ল। ধীরে ধীরে বাসের চাকা গড়াতে লাগলো। অশোক দা ঠাই দাঁড়িয়ে রইলেন বাসস্ট্যান্ডে যতক্ষণ না বাসটা তাঁর চোখের আড়ালে চলে যায়। আর ওদিকে খাদেমুল দা জানালার পাশের সিটে বসে তাকিয়ে ছিলেন। জানালার কাচের ওপারে অশোক দার অবয়ব ক্রমশ ছোট হয়ে আসতে লাগল। খাদেমুল দা অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর একসময় অশোক দাকে আর দেখা গেল না। শুধু রয়ে গেল রাস্তা, রাস্তার ধুলো; আর বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি।
 
জানালার বাইরে দৃশ্য ক্রমশ বদলাচ্ছিলমাঠ, গাছ, বাজার, পথের ধারের দোকান, মানুষের আসা-যাওয়া। কিন্তু তাঁর চোখ দুটো যেন বাইরের কোনো দৃশ্য দেখছিল না। তিনি ফিরে যাচ্ছিলেন বারবার রাত থেকে সকালের সফরে একটা বাড়িতে ঢোকার জন্য তাঁকে নিজের নাম বদলাতে হয়েছিল। খাদেমুলনামটি সেখানে যেন একটি অদৃশ্য দেওয়াল। অথচ সেই একই মানুষকে পরদিন আর একজন মানুষ সবার সামনে বললেন— “এ আমার ছোট ভাই।
 
বাস তখন অনেক দূর চলে এসেছে। খাদেমুল দা ব্যাগ থেকে অশোক দার কিনে দেওয়া নাস্তাটুকু বের করলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলেন সেটার দিকে। সামান্য কিছু খাবারতার দাম হয়তো খুব বেশি নয়। জলের বোতলটার দামও সামান্য। বাসভাড়াটুকুও এমন কিছু নয়, যা হিসাবের খাতায় বড় অঙ্ক হয়ে দাঁড়াবে। তবে সবটাই ভালোবেসে, সাচ্চা মন থেকে দেওয়াএকজন বড় ভাই হিসেবে ছোট ভাইকে দেওয়া। খাদেমুল দা ওই নাস্তা হাতে ক্ষণিকের জন্য চোখদুটো বন্ধ করলেন। মনের চোখ দিয়ে তখন তিনি যেন দেখতে পাচ্ছিলেন, ঘৃণা ও বিদ্বেষের রাত ধীরে ধীরে সরে গিয়ে ভোরের আলো ফুটছে 
 
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা 

No comments:

Post a Comment