Pages

Friday, 6 November 2026

নানীর কানের দুল - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



ক’দিন বাদে শাম্মীর বিয়ে। আর তাই পুরো পরিবার আনন্দে মেতে উঠেছে। একে একে আত্মীয়স্বজন এসে হাজির। ঘরদোর, উঠোন-বারান্দা সবখানেই মানুষের ভিড়; কোথাও যেন তিল ধারণের জায়গাটুকুও নেই। বড়দের কারও হাতে বাজারের ব্যাগ, কেউ রান্নাঘরে জোগাড়যন্ত্রে ব্যস্ত, কেউ বিয়ের আয়োজনের খুঁটিনাটি নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। আর ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের চেঁচামেচি, দৌড়ঝাঁপ, হাসি আর খুনসুটিতে সারা বাড়ি গমগম করছে। মনে হচ্ছিল, কতদিনের নিস্তব্ধতা ঝেড়ে পুরোনো বাড়িটা আবার তার চেনা কোলাহল ও চেনা আনন্দ ফিরে পেয়েছে।
 
শাম্মী আখতার জাহান—বড় মামার মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই সে আমাদের সবার বড্ড আদরের। বড় মামা যখন হঠাৎ স্ট্রোক করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, শাম্মী তখন সবে সতেরো-আঠেরো মাসের শিশু। বাবাকে হারানোর অর্থ বোঝার মতো বয়সও তার হয়নি। সেই থেকেই যেন পরিবারের সবার ভালোবাসা এসে তাকে ঘিরে ধরেছিল। কারও সে ভাগ্নি, কারও নাতনি, কারও ছোট বোন—সবার কাছেই সে ছিল অত্যন্ত আপন।
 
তার বিয়ের খবর শুনে আত্মীয়স্বজন যে যেখানে ছিলেন, ছুটে এসেছেন। এমনকি ছোটখালাও প্রায় সাত-আট বছর পর পাসপোর্ট রিনিউ করে বাংলাদেশ থেকে চলে এসেছেন। তাঁর এই আসাটা উৎসবের আনন্দকে আরও দ্বিগুণ করে তুলেছিল। বহুদিন পর আপনজনের দেখা, তার উপর বাড়িতে বিয়ে; সব মিলিয়ে বাড়ির বাতাসে যেন অন্যরকম এক উষ্ণতা বিরাজ করছিল।
 
বিয়ের বেশির ভাগ বাজার-সদাই আগেই হয়ে গিয়েছিল। যে দু-একটা জিনিস বাকি ছিল আমি আর হুমায়ুন বাইকে করে রায়গঞ্জ গিয়ে সেগুলো কিনে আনলাম। মনে হলো, এবার বুঝি বাজারের পালা শেষ। কিন্তু বিয়েবাড়ির বাজার কি অত সহজে শেষ হয়! পরদিন সকালে উঠে দেখা গেল, আরও কয়েকটা জিনিস বাদ পড়ে গেছে। অগত্যা আবার বাইক নিয়ে বেরোতে হল। এবার গন্তব্য কালিয়াগঞ্জ। বাজার-সদাই সেরে আমরা যখন কালিয়াগঞ্জ থেকে বাড়িতে ফিরলাম, ততক্ষণে গায়ে-হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে।
 
আমরাও আর দেরি করলাম না। প্রথমে শাম্মীকে ক্ষীর খাওয়ালাম, তারপর তার হাতে সামান্য উপহার তুলে দিলাম। চারদিকে তখন হাসি-আনন্দ, কথাবার্তা, হইহুল্লোড় আর নানা ধরণের ব্যস্ততা। হলুদের গন্ধে, মানুষের কোলাহলে আর ছোটদের উচ্ছ্বাসে বাড়িটা যেন উৎসবের এক উজ্জ্বল উঠোন হয়ে উঠেছিল।
 
সবশেষে নানীকে নিয়ে আসা হলো। মা আর ছোটখালা নানীকে ধরে ধরে নিয়ে এলেন। বয়সের ভারে তখন নানীর জন্য চলাফেরা বেশ কষ্টকর। তবু নাতনির গায়ে-হলুদের অনুষ্ঠানে নিজের হাতে হলুদ না মাখিয়ে তিনি কি আর থাকতে পারেন!
 
নানী এসে শাম্মীর সামনে বসলেন। দু’টো আঙুলে সামান্য হলুদ নিলেন। তারপর খুব ধীরে, কাঁপা কাঁপা হাতে শাম্মীর গালে সেই হলুদটুকু ছুঁইয়ে দিলেন। মাত্র দু’টো আঙুলের সামান্য হলুদ। কিন্তু সেই সামান্য হলুদের স্পর্শে যেন কত বছরের স্মৃতি এক লহমায় এসে হাজির হলো! নানীর চোখ ভিজে উঠল। তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁকে কাঁদতে দেখে শাম্মীর চোখেও জল। সে ডুকরে কেঁদে উঠলো। দেখাদেখি চারপাশের অনেকের চোখ ভিজে গেলো। একটু আগেও যে উঠোন হাসি-আনন্দে মুখর ছিল, মুহূর্তের জন্য সেখানে নেমে এল এক গভীর নীরবতা।
 
মনে হলো, নানীর সেই কাঁপা আঙুল শুধু শাম্মীর গালে হলুদ লাগায়নি, ছুঁয়ে দিয়েছে তার শৈশবকে, বড় মামাকে হারানোর সেই পুরোনো দিনগুলোকে, আর আমাদের পরিবারের কত না-বলা স্মৃতিকে। হয়তো নানী সেই মুহূর্তে বর্তমানের শাম্মীকে দেখছিলেন না; তাঁর চোখের সামনে ফিরে এসেছিল সেই ছোট্ট পরীর মতো শিশুটি—যে সেদিন বাবার নিথর দেহের কাছে গিয়ে ‘আব্বা-আব্বা’ বলে ডাকছিল।  
 
পরদিন বিয়ে। যথারীতি ধুমধাম করে সব আয়োজন সম্পন্ন হলো। আত্মীয়স্বজন, অতিথি-আপ্যায়ন, হাসি-আনন্দ, রান্নাবান্না আর ব্যস্ততায় দিনটা কখন যে কেটে গেল, টেরই পেলাম না। দিন-শেষে শাম্মী নতুন জীবনের পথে পা বাড়াল।
 
কিন্তু বিয়ে শেষ হলেই তো ব্যস্ততা শেষ হয় না। বিয়ের পরদিন বিকেলে শাম্মীকে আনতে যাওয়ার পালা। তাই সকাল থেকেই আবার নতুন করে দৌড়ঝাঁপ শুরু। গাড়ি ভাড়া করা হলো, মিষ্টি কেনা হলো। ঠিক হলো—শাম্মীকে আনতে যাবে তার খালা, ফুফু, মামিরা আর বাড়ির কচিকাচারা।  
 
সকালের জল-খাবার খেয়ে সবাই ধীরে ধীরে তৈরি হতে লাগল। কেউ কাপড় বের করছে, কেউ গুছিয়ে নিচ্ছে, কেউ আবার ছোটদের সামলাচ্ছে। বাড়ির এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত সর্বত্র ব্যস্ততা তুঙ্গে। কোথাও হাসি, কোথাও ডাকাডাকি, কোথাও শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
 
আমি আর হুমায়ুন বসে বিয়ের অনুষ্ঠানের খরচপাতির হিসাব মিলাচ্ছি। নানী বসেছিলেন পশ্চিম ঘরের বারান্দায়। হঠাৎ তাঁর চেনা ডাক ভেসে এল— “মহুবা, জারেকা, নূরজাহান, কাবো কুঠি আছেন তোরা? লিলি, জসনুর, এনা, আসো তো বো!”
 
নানীর ডাক শুনে একে একে সবাই তাঁর সামনে হাজির হলো। নানী যেন সবাইকে চোখের সামনে একবার দেখে নিতে চাইছিলেন। তারপর ছোটখালার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“নূরজাহান, মোর কানের দুল দু’টা খুলে দিত।”
ছোটখালা এগিয়ে গিয়ে খুব আস্তে করে দুল দু’টো খুলে দিলেন। দুল দু’টো হাতে নিয়ে নানী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাঁর চোখ তখন স্থির হয়ে আছে সেই ছোট্ট অলংকারের দিকে। মনে হলো, তিনি যেন দুল দেখছেন না—দুলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কত বছরের জীবন, কত মানুষের মুখ, কত আনন্দ-বেদনার দিন দেখতে পাচ্ছেন। তারপর দুল দু’টো ছোটখালার হাতে তুলে দিয়ে ধীর গলায় বললেন—
—“এইলা মুই মাতিনের বউক দিবা চাহেছু। কেহোঁ কুনো দাবি থোয়েন নান, বাপু।”
 
কথাগুলো শুনে আমরা সবাই থমকে গেলাম। তাঁর কথার অর্থ বুঝতে আমাদের এক মুহূর্তও লাগল না। নানী তাঁর কানের দুল দু’টো আমার ভবিষ্যৎ স্ত্রীর জন্য দিয়ে গেলেন। কী আশ্চর্য! নিজের কাছে থাকা সামান্য দু’টি অলংকারও তিনি ধরে রাখলেন না। যেন তাঁর মনে হয়েছিল—জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের জন্য আর কিছু জমিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই; বরং যা আছে, তা আপনজনের হাতে তুলে দেওয়াতেই সুখ।  
 
নানীর সেই সামান্য কথার মধ্যে কত মমতা, কতখানি সঞ্চয় আর কত গভীর আশীর্বাদ লুকিয়ে ছিল! কানের দুল দু’টি শুধু অলংকার ছিল না। তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল নানীর ভালোবাসা, তাঁর সঞ্চয়ের স্মৃতি, তাঁর জীবনের এক টুকরো ইতিহাস এবং পরিবারের এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে এগিয়ে চলা এক অদৃশ্য উত্তরাধিকার।
 
আমরা কেউ কোনো কথা বলতে পারলাম না। শুধু নীরবে তাকিয়ে রইলাম। তখনও আমরা জানতাম না, এই ঘটনাটিই একদিন এক বিশাল বড় স্মৃতি হয়ে ফিরে আসবে। আমরা জানি, সময় তার নিজের নিয়মে এগিয়ে চলে। কারও জন্য সে থেমে থাকে না। মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়; ঘরের উঠোন বদলে যায়, পুরোনো মুখের জায়গায় নতুন মুখ আসে। কিন্তু কিছু জিনিস সময়ের স্রোত অতিক্রম করে নিজেকে ধরে রাখে—কোনো পুরোনো ছবিতে, কখনও কোনো কথায়, আবার কখনও কোনো অলংকারে।
 
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ছোটখালা আবার বাংলাদেশ থেকে এলেন। প্রায় বিয়াল্লিশ বছর পর সঙ্গে খালু আব্বাও এলেন। তাঁদের এই আসাটা আমাদের কাছে ছিল বিশেষ এক ঘটনা। পুজোর ছুটিতে আমিও তখন বাড়িতে। ৬ অক্টোবর আমরা সবাই মেয়ে দেখতে গেলাম। একপর্যায়ে কথাবার্তা পাকা হয়ে গেল। সেদিনই আক্‌দ করার সিদ্ধান্ত হলো। শরিয়ত মোতাবেক মোহরের ব্যবস্থা করা হলো। পঞ্চাশ হাজার টাকা নগদ মোহরের বিনিময়ে আমাদের আক্‌দ সম্পন্ন হলো।
 
ইজাব-কবুলের পর উপস্থিত সবাই একে একে আমাদের দু’আ দিতে লাগলেন। আপনজনেরা যে যার সামর্থ্য ও ভালোবাসা অনুযায়ী আমার স্ত্রীকে উপহার দিচ্ছিলেন। চারপাশে তখন আনন্দ, দোয়া, শুভকামনা আর নতুন সম্পর্কের উষ্ণতা। এমন সময় ছোটখালা আমার স্ত্রীর সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতে ছিল সেই কানের দুল দু’টো। নানীর তুলে দেওয়া সেই দুল—যে দুলের কথা এতদিন ধরে আমাদের স্মৃতির ভাঁজে ছিল। ছোটখালা খুব যত্ন করে দুল দু’টো আমার স্ত্রীর কানে পরিয়ে দিলেন।
 
দুল দু’টো কানে পরানোর সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের সামনে খুলে গেল বহু বছরের পুরোনো একটি দরজা। চোখের সামনে ভেসে উঠল শাম্মীর গায়ে-হলুদের সেই দিন। ভেসে উঠল নানীর কাঁপা কাঁপা হাত, হলুদে রাঙা দু’টো আঙুল, শাম্মীর চোখের জল, আর সেই মুহূর্তে নেমে আসা নিস্তব্ধ উঠোন। তারপর মনে পড়ল পরদিনের সেই সকাল—পশ্চিম ঘরের বারান্দায় বসে থাকা নানী, তাঁর চেনা ডাক, একে একে সবাইকে কাছে ডেকে নেওয়া, কানের দুল খুলে ছোটখালার হাতে তুলে দেওয়া, সাথে কাপা কণ্ঠে ব্যক্ত এক বাসনা—“এইলা মুই মাতিনের বউক দিবা চাহেছু।”
 
কত অল্প কথায় কত বড় একটি ভবিষ্যৎ রেখে গিয়েছিলেন নানী! সেদিন হয়তো তিনি জানতেন না, কখন সেই দুল আমার স্ত্রীর কানে উঠবে। জানতেন না, সেই সময় তিনি নিজে থাকবেন কি না। শুধু জানতেন, তাঁর ভালোবাসার একটি চিহ্ন তিনি তাঁর নাতির সংসারে তুলে দিতে চান।
 
সময়ের কাঁধে চেপে সেই দুল পৌঁছে গেল আমার স্ত্রীর কানে। আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। মনে হলো, নানী যেন দূরে কোথাও বসে আছেন, আর তাঁর সেই কাঁপা হাতের আশীর্বাদ নীরবে এসে ছুঁয়ে গেল আমার নতুন সংসারকে। দুল দু’টি যেন শুধু কানের অলংকার হয়ে রইল না; হয়ে উঠল একটি পরিবারের স্মৃতি থেকে আরেকটি পরিবারের জীবনে পৌঁছে যাওয়া ভালোবাসার নিঃশব্দ সেতু।
 
শাম্মীর গায়ে হলুদ থেকে আমার আক্‌দ—মাঝখানে কেটে গেছে বেশ ক’টা বছর। কত মানুষ বদলে গেছে, কত সম্পর্কের রূপ বদলেছে, কত দিন-কত মাস স্মৃতির ভেতর হারিয়ে গেছে। কিন্তু এক জোড়া ছোট্ট দুল সময়ের হাত ধরে ঠিকই পৌঁছে গেল তার নির্দিষ্ট ঠিকানায়।
 
উত্তরাধিকার সব সময় জমিজমা, টাকাপয়সা কিংবা বড় কোনো অর্থসম্পদ হয় না। কখনও কখনও উত্তরাধিকার মানে এক জোড়া ছোট্ট কানের দুল—যার ভেতরে লুকিয়ে থাকে নানী বা দাদীর মমতা, একটি পরিবারের ইতিহাস, হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া এক নিঃশব্দ আশীর্বাদ।
 
নানী সেই কবেই চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর দেওয়া সেই দুল দু’টি আজও যেন তাঁর হাতের উষ্ণতা বহন করে। সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেও মনে করিয়ে দেয়—মানুষ চলে যায়, দিন ফুরিয়ে যায়, উৎসবের কোলাহল একদিন স্তব্ধ হয়ে যায়; অথচ ভালোবাসা কখনও হারিয়ে যায় না। কখনও হলুদের রঙে, কখনও চোখের জলে, কখনও বা দু’টি ছোট্ট সোনার দুলের আকারে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকে।
 
২২ অক্টোবর ২০২৬
বাঁশকুড়ি, দক্ষিণ দিনাজপুর

No comments:

Post a Comment