ফজরের নামাজ শেষ হয়েছে সবে। ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। চারদিকে
কুয়াশার হালকা চাদর,
গাছের পাতায় রাতের শিশির, আর গ্রামজুড়ে এক শান্ত, স্নিগ্ধ
নিস্তব্ধতা। সবুরা বেওয়া ঘুন্ডিয়ার দরজা খুলতেই একে একে হাঁস-মুরগিগুলো ডানা
ঝাপটাতে ঝাপটাতে,
দৌড়ে-লাফিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। কেউ উঠোনের এদিকে, কেউ ওদিকে ছড়িয়ে পড়ল। প্রতিদিনের মতো তাদের ছোটাছুটি
দেখতে দেখতে হঠাৎ তাঁর চোখ আটকে গেল ছোট মোরগটার দিকে। অন্যদের সঙ্গে বেরোল বটে, কিন্তু কেমন যেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে।
সবুরার মনে খটকা লাগল। তিনি তাড়াতাড়ি বাড়ির দরজাটা বন্ধ করে মোরগটার পেছনে
ছুটলেন। বেশ কিছুক্ষণ ছোটাছুটির পর সেটাকে ধরতে পারলেন। হাতে তুলে পা-টা একটু
নাড়াচাড়া করতেই বুঝলেন,
পা ভেঙে গেছে। কে জানে, আগের দিন হয়তো কেউ ঢিল ছুড়েছিল, সেই আঘাতেই এমন দশা। মোরগটার অসহায় অবস্থা দেখে তাঁর মনটা খারাপ হয়ে গেল।
কিন্তু কী আর করার! এভাবে বেঁচে থাকাটাও তো কঠিন। একটু বেলা হলে তিনি মোরগটাকে মসজিদের মুয়াজ্জিন সাহেবের
কাছে নিয়ে গিয়ে জবাই করিয়ে আনলেন।
বহু বছর আগে যখন স্বামী মারা যায়, তখন তাঁদের ছেলেমেয়ে দু’টো একেবারেই ছোট। সেই থেকে একা হাতে সংসারের হাল ধরেছেন। সরকারি সহায়তায়
পাওয়া একটি ঘর,
মাথার উপর টিনের ছাউনি, আর সামান্য কিছু জমিজিরেত—এই তাঁর সম্বল।
জমিতে অল্পস্বল্প চাষবাস হয়। তাতে কি আর সংসার চলে! তাই অন্যের বাড়িতে কাজ করতে
হয়। কখনও কারও মুড়ি ভেজে দেন, কখনও কারও বাড়িতে আত্মীয়স্বজন এলে রান্নাবান্নায় হাত লাগান, কখনও কারও জন্য রান্না করে দেন, আবার কখনও ধান সেদ্ধ করার কাজ করেন। যে বাড়িতে যখন কাজ
জোটে,
সেখানেই ছুটে যান। দিনের শেষে হাতে যা কয়টা টাকা আসে, তা দিয়েই টেনেটুনে সংসার চালান।
অভাব তাঁর সঙ্গী। তবু সেই অভাবের মধ্যেই ছেলেমেয়েকে বড় করেছেন। মেয়ের বিয়ে
দিয়েছেন। ছেলে পড়াশোনা করেছে।
গ্রাজুয়েশন শেষ করে কাজের সূত্রে বাড়ির বাইরে থাকে। জীবনের কত চাওয়া যে অপূর্ণ থেকে
গেছে,
তার হিসাব সবুরা বেওয়া কখনও করেননি। বরং ছেলেমেয়েরা একটু
ভালো থাকুক, হাসিখুশি থাকুক—এইটুকুই যেন তাঁর বেঁচে থাকার বড় অবলম্বন।
বাড়ি ফিরে পালক ছাড়িয়ে মোরগের মাংসটুকু পরিষ্কার করতে করতেই হঠাৎ তাঁর মনে হলো, এখনই রান্না করবেন কেন? কয়েক দিন পর তো মেয়ে,
জামাই আর নাতি আসবে। নাতিটা মুরগীর মাংস খেতে কত
ভালোবাসে! ওরা এলে রান্না করলে একসঙ্গে সবাই মিলে খেতে পারবে। নাতিটাও পেট ভরে খাবে। ভাবনাটা মনে আসতেই তাঁর
মুখে যেন একটু হাসি ফুটল।
কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল, মাংসটা রাখবেন
কোথায়?
তাঁর নিজের তো ফ্রিজ নেই। দু-চার দিন এমনিতেই রেখে দিলে তো নষ্ট হয়ে যাবে। কী করা যায়,
ভাবতে ভাবতে আশপাশের কয়েকটি বাড়িতে গেলেন। যদি কেউ একটু
ফ্রিজে রাখতে দেন!
কিন্তু সেখানেও সুবিধা হলো না। শীতকাল পড়েছে বলে অনেকেই ফ্রিজ বন্ধ করে
রেখেছেন। আবার কেউ কেউ বললেন,
‘আমাদের ফ্রিজে তো একটুও জায়গা নেই।’
কেউ জানালেন, তাঁদের ফ্রিজ খারাপ হয়ে পড়ে আছে।
শেষ পর্যন্ত সবুরা বেওয়া এলেন আমাদের বাড়িতে। মায়ের কাছে গিয়ে একটু ইতস্তত
করে বললেন,
‘খালা, একটা কথা ছিল। আজ খুন্ডিয়া ছাড়ার সময় দেখলাম, মুরগাটা খুঁড়িয়ে হাঁটছে। পা-টা বোধহয়
ভেঙে গেছিল। তাই জবাই করেছি। ভাবছি, আজ রান্না না করে
দু-চার দিন পরে রান্না করব। মেয়ে, জামাই আর নাতিটা আসবে! নাতিটা মুরগীর মাংস খেতে খুব ভালোবাসে। তাই ভাবছিলাম, তত দিন যদি মাংসটুকু আপনাদের ফ্রিজে একটু রাখা যেত খালাম্মা! আপনারাও কি ফ্রিজ বন্ধ করে দিয়েছেন?’
মা হেসে বললেন,
‘না রে বেটি, আমরা তো ফ্রিজ বন্ধ করি না। তুমি আমাদের ফ্রিজে রেখে দেও।’
তারপর মা-ই বুদ্ধি দিলেন, ‘তবে কাঁচা মাংস
এভাবে না রেখে একটু ঝলসে নেও। হালকা মশলা দিয়ে রাখলে ভালো থাকবে, স্বাদও ঠিক থাকবে।’
মায়ের কথা শুনে সবুরা বেওয়া বাড়ি ফিরে গেলেন। মাংসটুকু হালকা মশলা দিয়ে
ঝলসে ঠান্ডা করলেন। তারপর একটি পাত্রে ভরে আমাদের বাড়িতে এনে ফ্রিজে রেখে গেলেন।
মনে হলো,
এবার বুঝি নিশ্চিন্ত হলেন। নাতির জন্য যত্ন করে রাখা
মাংসটুকু নষ্ট হবে না।
দেখতে দেখতে তিন-চার দিন কেটে গেল। একদিন বিকেল বেলা সবুরা বেওয়া আবার এলেন। মাকে বললেন, ‘খালা,
নাতিটা তো এখন আসতে পারবে না। ওদের আরও সময় লাগবে। কবে
আসবে,
তারও ঠিক নেই। আর কত দিনই বা মাংসটা রেখে দেব! ভাবছি, নিয়ে গিয়ে রান্না করে খেয়ে নেব।’
মা ফ্রিজ থেকে মাংসটা বের করে দিলেন। কিন্তু সবুরা বেওয়া মাংস নিয়ে সোজা
বাড়ি ফিরে গেলেন না। আমাদের রান্নাঘরে ঢুকে বাসন রাখার জায়গা থেকে একটা বাটি
তুলে নিলেন। তারপর সেই মাংস থেকে খানিকটা তুলে বাটিতে ভরলেন। বাটিটা মায়ের হাতে দিয়ে বললেন, ‘খালা, বাড়ির
বাচ্চাগুলো তো মাংস দেখেছে। এভাবে সবটা নিয়ে চলে গেলে কেমন যেন খারাপ লাগে।
এইটুকু ওদের জন্য রাখলাম। আলু-পটল দিয়ে রান্না করে খাওয়াবেন।’
মা বাটিটা হাতে নিয়ে একেবারে থমকে গেলেন। কিছুক্ষণ যেন কথাই বলতে পারলেন না। যে মানুষটা নিজের সংসারে
দু’ বেলা পেট ভরে খেতে পান কি না, তারই ঠিক নেই, যার সম্বল বলতে সামান্য কিছু জমিজিরেত আর অন্যের বাড়িতে
কাজ করে পাওয়া ক’টা টাকা, সেই মানুষটি
নিজের সামান্য সম্বল থেকে অন্যের বাড়ির বাচ্চাদের জন্য মাংস দিয়ে গেলেন!
একটা ছোট্ট মোরগ,
কতটুকুই বা তার মাংস! সেই মাংসেরও কতখানি তিনি নাতির জন্য
যত্ন করে তুলে রাখতে চেয়েছিলেন। অথচ শেষ পর্যন্ত সেই মাংস থেকেই অন্যের বাড়ির
বাচ্চাদের ভাগ দিতে ভুললেন না। নিজের অভাবের কথা একবারও ভাবলেন না; ভাবলেন, বাচ্চাগুলো মাংস
দেখেছে,
তাদের জন্য একটু রেখে যাওয়া উচিত।
বাটিটা হাতে নিয়ে মা যেন এক মুহূর্তে ফিরে গেলেন পুরোনো দিনের গ্রামে। একসময় গ্রামে এই দেওয়া-নেওয়ার কী সুন্দর রেওয়াজই না
ছিল! কারও বাড়িতে পোলাও রান্না হলে এক বাটি পোলাও প্রতিবেশীর বাড়িতে পৌঁছে যেত।
মাংস রান্না হলে পাশের বাড়ির বাচ্চাদের জন্যও এক বাটি তুলে রাখা হতো। ঢেঁকিতে চাল
কুটলে,
পিঠেপুলি তৈরি হলে কিংবা ক্ষীর-পায়েস রান্না হলে, সেখান থেকেও প্রতিবেশীদের ভাগ জুটত। কে কতটা দিল, কে কতটা পেল—এসব নিয়ে কেউ হিসাব কষত না। নিজের বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হলে অন্যের
বাড়িতেও তার স্বাদ পৌঁছে দেওয়া যেন ছিল এক সহজাত অভ্যাস।
সেসব দেওয়া-নেওয়ার মধ্যে লোকদেখানো সৌজন্য ছিল না, ছিল না কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশা। ছিল আপন করে নেওয়ার
আনন্দ,
প্রতিবেশীকে আপন ভাবার আন্তরিকতা। কারও বাড়ির বাচ্চারা ভালো কিছু খাবে, আর পাশের বাড়ির বাচ্চারা তা থেকে বঞ্চিত থাকবে—এমন ভাবনা যেন কারও মনেই আসত না। খাবার কম থাকলেও ভাগ করে
খাওয়ার মনটা ছিল বড়।
কিন্তু সময় বদলেছে। গ্রামের চেহারা বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাপনও। গ্রামের মধ্যে শহুরে মানসিকতার প্রভাব যত বেড়েছে, ততই যেন হারিয়ে যেতে বসেছে সেই পুরোনো রীতিনীতিগুলো। এখন
অনেকেই নিজেদের ঘর-সংসার নিয়ে ব্যস্ত। প্রতিবেশীর বাড়িতে কী রান্না হলো, কার বাড়িতে আনন্দ, কার বাড়িতে দুঃখ—এসব খবর রাখার অবকাশ কমে এসেছে। একসময় যে বাড়িগুলোর দরজা
একে অপরের জন্য খোলা থাকত,
এখন সেখানে যাওয়া-আসাও কমেছে। দেওয়া-নেওয়ার সেই সহজ
সম্পর্কের জায়গায় কখন যেন এসে বসেছে দূরত্ব।
মা বাটিটা হাতে নিয়ে এসব কথাই ভাবছিলেন। মনে মনে বলছিলেন, সবকিছু কি তবে একেবারেই হারিয়ে গেল? পুরোনো দিনের সেই সহজ-সরল মানসিকতা, সেই ভাগ করে খাওয়ার আনন্দ, সেই প্রতিবেশীকে আপন করে নেওয়ার অভ্যাস—সব কি কেবল স্মৃতির মধ্যেই বেঁচে থাকবে?
তারপরই মনে পড়ল সবুরা বেওয়ার কথা। না,
সবকিছু হারিয়ে যায়নি। এখনও কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের মধ্যে পুরোনো গ্রামের প্রাণটুকু বেঁচে আছে। যাঁদের
ঘরে অভাব আছে,
কিন্তু মনে কার্পণ্য নেই। যাঁদের নিজেদের চাহিদা মেটানোই
কঠিন,
তবু অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর কথা তাঁরা ভুলে যান না।
সবুরা বেওয়া সেদিন শুধু এক বাটি মাংস দিয়ে যাননি। দিয়ে গিয়েছিলেন এক
হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতির স্মারক, এক টুকরো আন্তরিকতা,
এক মুঠো পুরোনো গ্রামের মমতা। তাঁর সেই সামান্য উপহারের
মধ্যে মা যেন দেখতে পেয়েছিলেন গ্রামবাংলার সেই চেনা ছবিটা—যে গ্রামে অভাব ছিল, কিন্তু হৃদয়ের দারিদ্র্য ছিল না; খাবার কম ছিল,
কিন্তু ভাগ করে খাওয়ার আনন্দ ছিল অফুরন্ত।
সেদিন একটা ছোট্ট মোরগের মাংস ঘুরে ঘুরে কত মানুষের মনের কথা বলে গেল! যে
মাংসটুকু নাতির জন্য যত্ন করে তুলে রাখা হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত পৌঁছে গেল অন্যের বাড়ির বাচ্চাদের ভাগেও। আর সেই ভাগ করে
দেওয়ার মধ্যেই যেন বেঁচে রইল একটা গোটা গ্রামের পুরোনো হৃদয় আর সহজেই পাড়াপড়শিকে আপন করে
নেওয়ার স্পন্দন।
২৯ অক্টোবর ২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা

No comments:
Post a Comment