Pages

Thursday, 2 April 2026

ঈদে নতুন জামা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 


ঈদের আর মাত্র দু’-তিন দিন বাকি। মোড়ে মোড়ে, মুখে মুখে জোর জল্পনা—কবে চাঁদের দেখা মিলবে তা নিয়ে। আমি তখন খুব ছোট। আমার ছোট্ট মনটাও ঈদের আনন্দ ও উত্তেজনায় টইটম্বুর। চারপাশে উৎসবের এক অদৃশ্য ঢেউ বইছে। বাড়ির ভেতরে-বাইরে ব্যস্ততা, মায়েদের তাড়াহুড়ো, বাবাদের হিসেব-নিকেশ, আর ছোটদের চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক। বাজারে গেলে মনে হয়, পুরো পৃথিবীটাই যেন হঠাৎ করে রঙিন হয়ে উঠেছে। দোকানের সামনে ঝোলানো নানা রঙের কাপড়, বাতাসে নতুন কাপড়ের ঘ্রাণ, মানুষের কোলাহল—সব মিলিয়ে এক প্রীতিকর আবেশ। যতদূর মনে পড়ে, ওটা আমার স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠা প্রথম ঈদ।  
 
সেদিন অলস দুপুর সবে গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। বাবা হঠাৎ আমায় ডেকে বললেন, “তোমার জন্য এবার একটা পাঞ্জাবী কিনবো, ঠিক করেছি।” তাঁর এই একটিমাত্র বাক্য যেন আমার ছোট্ট পৃথিবীটাকে আনন্দে ভরিয়ে দিল। সেই মুহূর্ত থেকে আমার দিন-রাতের একটাই স্বপ্ন—নতুন পাঞ্জাবী। কেমন হবে সেটা? সাদা? নীল? নাকি হালকা কাজ করা? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে কল্পনা করতাম—আমি নতুন পাঞ্জাবী পরে ঈদগাহে যাচ্ছি। সেই কল্পনাতেই কতবার যে চোখেমুখে হাসির রেখা ছড়িয়েছে, তার হিসেব নেই।
 
কিন্তু বাস্তব অতটাও সহজ ছিল না। টানা দু’দিন বাবা আমাকে নিয়ে বাজারে ঘুরলেন। এক দোকান থেকে আরেক দোকান। কোথাও মাপ মিলছে না, কোথাও কাপড় ভালো লাগছে না, কোথাও আবার দাম শুনে বাবা নিঃশব্দে সরে আসছেন। তখন এত কিছু বুঝতাম না, শুধু এটুকুই বুঝতাম—আমার পাঞ্জাবীটা এখনও কেনা হয়নি। ছোট্ট মনটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, হয়তো এবারের ঈদে আমার নতুন জামা হবে না। অন্য বাচ্চাদের মতো আমি নতুন কাপড় পরে বেরোতে পারবো না। সেই কষ্টটা ছিল খুব নিঃশব্দ, কিন্তু গভীর। শিশুমনের নির্ভেজাল দুঃখগুলো যেমন হয় আরকি।   
 
অবশেষে ঈদের আগের দিন বিকেলে বাবা আমাকে নিয়ে আবার বেরোলেন। এলাকার ব্যস্ত এক বাজারে। চৌরঙ্গীর এক দোকানে ঢুকলাম। দোকানটা যেন আলোয় ঝলমল করছে, চারিদিকে সারি সারি পাঞ্জাবী ঝুলছে—সাদা, ক্রিম, হালকা নীল, কোথাও সূক্ষ্ম কারুকাজ। দোকানদার একের পর এক পাঞ্জাবী নামিয়ে দেখাচ্ছেন। বাবা বারবার বলছেন, “আরেকটু ছোট সাইজ আছে?” 

অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে একটা পাঞ্জাবী পাওয়া গেল। একেবারে মাপ মতো নয়, একটু ঢিলেঢালা, হাতাটা সামান্য বড়। কিন্তু তখন সেটাই আমার কাছে যেন জান্নাত থেকে নামা মান্না-সালওয়ার মতো কোনো উপহার। আমি সেটা গায়ে দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। নিজেকে দেখে মনে হলো, আমি যেন হঠাৎ করেই বড় হয়ে গেছি। বাবার চোখের কোণে তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি, ঠোঁটে মৃদু হাসি, কপালে আনন্দের রেখা। দাম মিটিয়ে তিনি যখন পাঞ্জাবীটা ভাঁজ করে হাতে নিলেন, তখন বুঝিনি—ওই ভাঁজের ভেতর শুধু একটা কাপড় নয়, লুকিয়ে আছে তাঁর অগণিত না-পাওয়া, না-কেনা ইচ্ছেগুলো।
 
ঈদের দিন সকালে সেই পাঞ্জাবীটা গায়ে দিয়ে আনন্দে আমি যেন হাওয়ায় উড়ছিলাম। ঈদগাহে যাওয়ার পথে লাফাতে লাফাতে এগোচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটা বুঝি আমি। চারিদিকে তাকবিরের ধ্বনি, লোকজন সালাম-মুসাফাহ করছে, দীর্ঘ দিন পর যাদের দেখা কোলাকুলি করছে, মানুষের মুখে অমলিন হাসি। সব মিলিয়ে এক অপার্থিব আনন্দ। সেই আনন্দের রেশ আজও বুকের ভেতরে কোথাও নরম হয়ে লেগে আছে।
 
কিন্তু তখন একটা জিনিস বুঝিনি, বা বলা ভালো বোঝার ক্ষমতাই হয়নি—বাবা সেই ঈদে নিজের জন্য কেন কিছুই কেনেননি। মনে হয়েছিল, হয়তো তাঁর দরকার নেই। কিন্তু আজ বুঝি, ভালো রকম ভাবেই বুঝি—দরকার ছিল, হয়তো ইচ্ছেও ছিল; কিন্তু তিনি নিঃশব্দে সেগুলো সরিয়ে রেখেছিলেন। সন্তানের হাসিটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় ঈদী।
 
আজ পঁচিশ-তিরিশ বছর পরে, এখন আমিও দু’ সন্তানের বাবা। সেই পুরনো দিনের ছবিগুলো এখন নতুন করে অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে আমার কাছে। ঈদের আগে আমিও এখন বাজারে যাই। নিউ মার্কেট-বড়বাজার ঘুরি, এক দোকান থেকে আরেক দোকান, এই শপিংমল থেকে ওই শপিংমলে। সন্তানের জন্য সবচেয়ে ভালোটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। তারপর তাদের চোখে যখন নতুন জামা পাওয়ার আনন্দের ঝিলিক দেখি, তখন নিজের ক্লান্তি, নিজের চাওয়াপাওয়া সব যেন কোথায় মিলিয়ে যায়। কখন যে নিজের জন্য কিছু কেনার সময় ও সামর্থ্য দুটোই ফুরিয়ে যায়, বুঝতেই পারি না। কখনো বা চুপিচুপি একটা সাধারণ কিছু কিনে নিই, নিজের মনের পাশাপাশি বাড়ির সবাইকে বোঝানোর জন্য—ঈদে আমিও কিছু নিয়েছি।
 
আসলে এটা শুধু আমার গল্প নয়, এটা আমাদের চারপাশের অসংখ্য পরিবারের গল্প। মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের অগণিত বাবার গল্প। তারা হয়তো বছরের পর বছর একই পাঞ্জাবী যত্ন করে পরে, কেউ খেয়ালই করে না। বাইরে থেকে তাদের জীবন স্বাভাবিক মনে হয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেদের স্বপ্নগুলোকে বিদায় জানায়।
 
কখনো মনে হয়, এরা সবাই নিঃশব্দ যোদ্ধা। আবার অন্যভাবে ভাবলে, এরা যেন একেকজন খুনি। এরা নিঃশব্দে খুন করে। তবে এদের হাতে কোনো রক্ত নেই; এরা হত্যা করে নিজেদের ইচ্ছেগুলোকে, নিজেদের ছোট ছোট স্বপ্নগুলোকে, নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলোকে।  
 
হয়তো আমিও আজ সেই দলে মিশে গেছি। তবে আশ্চর্যের বিষয়, এই হারানোর মাঝেও এক অদ্ভুত পাওয়া লুকিয়ে থাকে। যখন সন্তানের মুখে নতুন জামা পরে সেই নির্ভেজাল হাসিটা দেখি, তখন মনে হয় আমি কিছুই হারাইনি, বরং নিজের ভেতরের সবচেয়ে সুন্দর মানুষটাকে খুঁজে পেয়েছি। হয়তো এটাই জীবনের সবচেয়ে গভীর সত্য—নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়েই মানুষ সবচেয়ে পূর্ণ হয়ে ওঠে।
 
বাঁশকুড়ি, দক্ষিণ দিনাজপুর
২০ মার্চ ২০২৬

No comments:

Post a Comment