আমাদের গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে তুলাইয়ের পাড় ঘেঁষে একটা ছোট্ট গ্রাম— নাম কদমডাঙ্গা। গুটি কয়েক বাড়ির বসত সেখানে। একসময় সেই ছোট্ট গ্রামটিই ছিল এলাকার বহু মানুষের ভরসার জায়গা।
সেই গ্রামেই থাকতেন তিন ভাই—জাকারিয়া মিয়াঁ,
এহ্ইয়া মিয়াঁ ও ইউসুফ মিয়াঁ। লোকে অবশ্য তাঁদেরকে আসল নামের চেয়ে বেশি
চিনত ও ডাকতো বড় মিয়াঁ, মেজো মিয়াঁ এবং ছোট মিয়াঁ নামে।
তাঁরা তিন ভাই ছিলেন জমিদার গোছের মানুষ। পুকুরপাড়া থেকে শুরু করে চৌষা অবধি বিস্তৃত ছিল তাঁদের জমিজায়গা।
আশ্বিন-কার্তিক মাসে যখন মাঠ ভরে উঠতো সোনালি ধানে, আর ধানের ঘ্রাণে মেতে উঠতো আশপাশের গ্রামগুলো, তখন তা দেখে এলাকার গরীবদুঃখীদের
মলিন মুখগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠতো। কিন্তু এত শয়সম্পত্তি, জমিজমা ও অর্থসম্পদ সত্ত্বেও তাঁরা কখনো অহংকারী হয়ে ওঠেননি। বিশেষ করে—ইউসুফ মিয়াঁ। তিনি ছিলেন একেবারেই
আলাদা প্রকৃতির মানুষ, খাঁটি অর্থেই মাটির মানুষ।
সকলের খুব কাছের মানুষও ছিলেন তিনি। সকালে কিংবা বিকেলে তাঁকে দেখা যেত গ্রামের পথ ধরে হেঁটে
চলেছেন, হাঁটতে হাঁটতে থামছেন কারও সাথে কথা
বলতে,
কারও খোঁজ নিতে, আবার হাঁটছেন। কারো মুখে অভাবের কথা শুনলে তিনি শুধু ‘আল্লাহ ভরসা’
বলে পাশ কাটিয়ে যেতেন না। অনেক সময় কাউকে না জানিয়ে বস্তায়
করে লোক মারফত
চাল-ডাল পাঠিয়ে দিতেন সোজা তার বাড়িতে। কোনো দরিদ্র মানুষ
যেন লজ্জা না পায়,
সে দিকটা তিনি সব সময় খেয়াল রাখতেন।
গ্রামে কেউ যদি কোনো
ছোটোখাটো ব্যবসাবাণিজ্য করতে চাইতো,
তিনি নিজেই জায়গা দেখিয়ে দিতেন—রাস্তার ধারে একটু
খালি জমি। তারপর পুঁজির জন্য কখনো ধার স্বরূপ, তো কখনো এককালীন কিছু টাকা
হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলতেন,
“কাজ শুরু করো, আল্লাহ বরকত
দেবে।”
শিক্ষার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ আর দায়িত্ববোধ ছিল অন্য
রকম। তিনি বিশ্বাস করতেন—জমিজমা একদিন
শেষ হয়ে যেতে পারে, অনেকের
ক্ষেত্রে তা হতেও দেখা যায়, কিন্তু শিক্ষা
কখনো নিঃস্ব করে না। তাই প্রথমে নিজের ঘর দিয়ে শুরু করলেন, মেজো ভাইয়ের ছেলে মানিক
মিয়াঁ পড়াশোনায় খুব একটা আগ্রহী ছিল না, আর পাঁচটা ছেলের মতোই। গ্রামে থেকেই
কোনো রকমে দিন কাটাতে চাইত। কিন্তু তিনি তা
মানতে রাজি হননি। প্রায় জোর করেই তাকে বাড়ির বাইরে ভালো জায়গায় পড়তে পাঠান। খরচাপাতি, থাকা-খাওয়া—সবই নিজের কাঁধে
তুলে নেন। অনেক সময় মানিক দা অনিচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলতেন, “আজ কষ্ট করবি, কাল বুঝবি এর
দাম কত।”
শুধু ভাইপোই নয়, নিজের শ্যালকদের পড়াশোনার
ব্যাপারেও তিনি ছিলেন সমান দায়িত্বশীল। তাদের বইপত্র, পড়ার খরচ, প্রয়োজনীয়
সহযোগিতা—কিছুই বাদ
রাখতেন না। যেন তারা শিক্ষার পথে পিছিয়ে না পড়ে, সেটাই ছিল তাঁর একমাত্র চিন্তা।
গ্রামের এক মেধাবী ছেলে নজরুল ছিল তাঁর বিশেষ নজরে।
ছেলেটার দু’চোখে ছিল স্বপ্ন, কিন্তু পরিবারে ছিল অভাব। তাই তার সব দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেন—পড়াশোনা থেকে
শুরু করে যাবতীয় খরচ। নজরুলকে তিনি শুধু সাহায্যই করেননি, সাহসও
জুগিয়েছিলেন—নিজের ওপর
বিশ্বাস রাখতে শিখিয়েছিলেন।
সময় গড়িয়ে যায়, তুলাইয়ের জলের মতো করে। যাদেরকে হাত ধরে
তিনি পড়াশোনার পথে এগিয়ে দিয়েছিলেন, তারা একে একে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু
করে। কেউ শিক্ষক হয়, কেউ সরকারি
আধিকারিক, কেউবা
শিক্ষাকর্মী হিসেবে সমাজের সেবায় নিজেকে যুক্ত করে। তাদের প্রত্যেকের জীবনের ভেতরে
কোথাও না কোথাও লেখা আছে ইউসুফ বড় আব্বার নিঃস্বার্থ অবদান।
তবে জীবন তো আর থেমে থাকে
না। এক গভীর রাতে, হঠাৎ করেই স্ট্রোক করে ইউসুফ বড় আব্বা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই। খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো এলাকা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। মানুষ বিশ্বাসই করতে পারছিল না—যিনি বিপদআপদে মানুষের পাশে দাঁড়ান,
তিনি হঠাৎ এভাবে চলে যাবেন! বড়আব্বা জানতেন এক নতুন অতিথি আসছে, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে মনে মনে স্বপ্নও বুনেছিলেন হয়তো। কিন্তু সেই সন্তানের মুখ তাঁর আর দেখা হলো না। বাবা-ছেলের আর কোনোদিন দেখা হয়নি। মুখ ফুটে ‘আব্বা’ ডাকার সাধ অধরাই
রয়ে গেল মোমিন দা’র আজীবন।
পরেরদিন গ্রামের আকাশ ভারী হয়ে উঠল শোকের মেঘে। যাঁর ঘরে অভাবী মানুষ আশ্রয় পেত, যাঁর হাতে বহু জীবন নতুন করে গড়া শুরু হয়েছিল—তাঁকে শেষ
বিদায় জানাতে এসেছিল অগণিত মানুষ। ছোট্ট সেই গ্রামের রাস্তাঘাট সেদিন ভরে গেছিল নীরব কান্না আর
গভীর কৃতজ্ঞতায়।
সেদিন গ্রামের মানুষ শুধু একজন ‘বড়লোক’ হারায়নি, হারিয়েছিল একজন অভিভাবক, একজন শুভাকাঙ্ক্ষী, একজন শিক্ষানুরাগী মানুষকে।
ইউসুফ বড় আব্বা চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর দয়া, তাঁর মানবিকতা আর নিঃশব্দ ভালোবাসা আজও বেঁচে আছে মানুষের মুখে মুখে—গল্প হয়ে, স্মৃতি হয়ে। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর ছায়া আজও রয়ে গেছে—প্রতিষ্ঠিত সেই মানুষগুলোর জীবনে, তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি খাদেমুল দা’র কর্মযজ্ঞে, গ্রামের মানুষের কৃতজ্ঞ স্মৃতিতে, আর এই গল্পের
প্রতিটি লাইন, প্রতিটা পরত ও প্রতিটা হরফে।
হেস্টিংস, কোলকাতা
২৮/০১/২০২৬
.png)
No comments:
Post a Comment