Pages

Showing posts with label ঈদ. Show all posts
Showing posts with label ঈদ. Show all posts

Thursday, 2 April 2026

ঈদে নতুন জামা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 


ঈদের আর মাত্র দু’-তিন দিন বাকি মোড়ে মোড়ে, মুখে মুখে জোর জল্পনাকবে চাঁদের দেখা মিলবে তা নিয়ে আমি তখন খুব ছোটআমার ছোট্ট মনটাও ঈদের আনন্দ ও উত্তেজনায় টইটম্বুরচারপাশে উৎসবের এক অদৃশ্য ঢেউ বইছেবাড়ির ভেতরে-বাইরে ব্যস্ততা, মায়েদের তাড়াহুড়ো, বাবাদের হিসেব-নিকেশ, আর ছোটদের চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক। বাজারে গেলে মনে হ, পুরো পৃথিবীটাই যেন হঠাৎ করে রঙিন হয়ে উঠেছেদোকানের সামনে ঝোলানো নানা রঙের কাপড়, বাতাসে নতুন কাপড়ের ঘ্রাণ, মানুষের কোলাহলসব মিলিয়ে এক প্রীতিকর আবেশ। যতদূর মনে পড়ে, ওটা আমার স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠা প্রথম ঈদ।  
 
সেদিন অলস দুপুর সবে গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। বাবা হঠাৎ আমায় ডেকে বললেন, “তোমার জন্য এবার একটা পাঞ্জাবী কিনবো, ঠিক করেছিতাঁর এই একটিমাত্র বাক্য যেন আমার ছোট্ট পৃথিবীটাকে আনন্দে ভরিয়ে দিল। সেই মুহূর্ত থেকে আমার দিন-রাতের একটাই স্বপ্ননতুন পাঞ্জাবী। কেমন হবে সেটা? সাদা? নীল? নাকি হালকা কাজ করা? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে কল্পনা করতামআমি নতুন পাঞ্জাবী পরে ঈদগাহে যাচ্ছি। সেই কল্পনাতেই কতবার যে চোখেমুখে হাসির রেখা ছড়িয়েছে, তার হিসেব নেই।
 
কিন্তু বাস্ত টাও সহজ ছিল না। টানা দুদিন বাবা আমাকে নিয়ে বাজারে ঘুরলেন। এক দোকান থেকে আরেক দোকানকোথাও মাপ মিলছে না, কোথাও কাপড় ভালো লাগছে না, কোথাও আবার দাম শুনে বাবা নিঃশব্দে সরে আসছেনতখন এত কিছু বুঝতাম না, শুধু এটুকুই বুঝতামআমার পাঞ্জাবীটা এখনও কেনা হয়নি। ছোট্ট মনটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, হয়তো এবারের ঈদে আমার নতুন জামা হবে না। অন্য বাচ্চাদের মতো আমি নতুন কাপড় পরে বেরোতে পারবো না সেই কষ্টটা ছিল খুব নিঃশব্দ, কিন্তু গভীর শিশুমনের নির্ভেজাল দুঃখগুলো যেমন হয় আরকি   
 
অবশেষে ঈদের আগের দিন বিকেলে বাবা আমাকে নিয়ে আবার বেরোলেন। এলাকার ব্যস্ত এক বাজারেচৌরঙ্গীর এক দোকানে ঢুকলাম। দোকানটা যেন আলোয় ঝলমল করছে, চারিদিকে সারি সারি পাঞ্জাবী ঝুলছেসাদা, ক্রিম, হালকা নীল, কোথাও সূক্ষ্ম কারুকাজ। দোকানদার একের পর এক পাঞ্জাবী নামিয়ে দেখাচ্ছেন। বাবা বারবার বলছেন, “আরেকটু ছোট সাইজ আছে?” 

অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে একটা পাঞ্জাবী পাওয়া গেল। একেবারে মাপ মতো নয়, একটু ঢিলেঢালা, হাতাটা সামান্য বড়। কিন্তু তখন সেটা আমার কাছে যেন জান্নাত থেকে নামা মান্না-সালওয়ার মতো কোনো উপহার। আমি সেটা গায়ে দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালামনিজেকে দেখে মনে হলো, আমি যেন হঠাৎ করেই বড় হয়ে গেছি। বাবার চোখের কোণে তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি, ঠোঁটে মৃদু হাসি, কপালে আনন্দের রেখাদাম মিটিয়ে তিনি যখন পাঞ্জাবীটা ভাঁজ করে হাতে নিলেন, তখন বুঝিনিওই ভাঁজের ভেতর শুধু একটা কাপড় নয়, লুকিয়ে আছে তাঁর অগণিত না-পাওয়া, না-কেনা ইচ্ছেগুলো।
 
ঈদের দিন সকালে সেই পাঞ্জাবীটা গায়ে দিয়ে আনন্দে আমি যেন হাওয়ায় উড়ছিলাম। ঈদগাহে যাওয়ার পথে লাফাতে লাফাতে এগোচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটা বুঝি আমি। চারিদিকে তাকবিরের ধ্বনি, লোকজন সালাম-মুসাফাহ করছে, দীর্ঘ দিন পর যাদের দেখা কোলাকুলি করছে, মানুষের মুখে অমলিন হাসিসব মিলিয়ে এক অপার্থিব আনন্দ। সেই আনন্দের রেশ আজও বুকের ভেতরে কোথাও নরম হয়ে লেগে আছে।
 
কিন্তু তখন একটা জিনিস বুঝিনি, বা বলা ভালো বোঝার ক্ষমতাই হয়নিবাবা সেই ঈদে নিজের জন্য কেন কিছুই কেনেননি। মনে হয়েছিল, হয়তো তাঁর দরকার নেই। কিন্তু আজ বুঝি, ভালো রকম ভাবেই বুঝিদরকার ছিল, হয়তো ইচ্ছেও ছিল; কিন্তু তিনি নিঃশব্দে সেগুলো সরিয়ে রেখেছিলেন। সন্তানের হাসিটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় ঈদী
 
আজ পঁচিশ-তিরিশ বছর পরে, খন আমিও দুসন্তানের বাবা সেই পুরনো দিনের ছবিগুলো এখন নতুন করে অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে আমার কাছেঈদের আগে আমিও এখন বাজারে যাইনিউ মার্কেট-বড়বাজার ঘুরি, এক দোকান থেকে আরেক দোকান, এই শপিংমল থেকে ওই শপিংমলেসন্তানের জন্য সবচেয়ে ভালোটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করিতারপর তাদের চোখে যখন নতুন জামা পাওয়ার আনন্দের ঝিলিক দেখি, তখন নিজের ক্লান্তি, নিজের চাওয়াপাওয়া সব যেন কোথায় মিলিয়ে যায়। কখন যে নিজের জন্য কিছু কেনার সময় ও সামর্থ্য দুটোই ফুরিয়ে যায়, বুঝতেই পারি না। কখনো বা চুপিচুপি একটা সাধারণ কিছু কিনে নিই, নিজের মনের পাশাপাশি বাড়ির সবাইকে বোঝানোর জন্যঈদে আমিও কিছু নিয়েছি।
 
আসলে এটা শুধু আমার গল্প নয়, এটা আমাদের চারপাশের অসংখ্য পরিবারের গল্প। মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের অগণিত বাবার গল্প। তারা হয়তো বছরের পর বছর একই পাঞ্জাবী যত্ন করে পরে, কেউ খেয়ালই করে না। বাইরে থেকে তাদের জীবন স্বাভাবিক মনে হয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেদের স্বপ্নগুলোকে বিদায় জানায়।
 
কখনো মনে হয়, এরা সবাই নিঃশব্দ যোদ্ধা। আবার অন্যভাবে ভাবলে, এরা যেন একেকজন খুনি এরা নিঃশব্দে খুন করে। তবে দের হাতে কোনো রক্ত নেই; এরা হত্যা করে নিজেদের ইচ্ছেগুলোকে, নিজেদের ছোট ছোট স্বপ্নগুলোকে, নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলোকে  
 
হয়তো আমিও আজ সেই দলে মিশে গেছি। বে আশ্চর্যের বিষয়, এই হারানোর মাঝেও এক অদ্ভুত পাওয়া লুকিয়ে থাকে। যখন সন্তানের মুখে নতুন জামা পরে সেই নির্ভেজাল হাসিটা দেখি, তখন মনে হয় আমি কিছু হারাইনি, বরং নিজের ভেতরের সবচেয়ে সুন্দর মানুষটাকে খুঁজে পেয়েছি। হয়তো এটাই জীবনের সবচেয়ে গভীর সত্যনিজেকে নিঃশেষ করে দিয়েই মানুষ সবচেয়ে পূর্ণ হয়ে ওঠে।
 
বাঁশকুড়ি, দক্ষিণ দিনাজপুর
২০ মার্চ ২০২৬

Friday, 9 November 2018

ঈদ মীলাদুন নবীঃ কিছু কথা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



আমাদের উপমহাদেশে, হিজরি সনের তৃতীয় মাস, রবিউল্‌ আউয়াল-এর বারো তারিখের রাতটি বেশ আড়ম্বরের সাথে উদযাপিত হয়। এ রাতে খাওয়া-দাওয়া, আনন্দ-উৎসব, জালসা-মহফিলে মুখরিত হয়ে ওঠে অনেক পাড়া-মহল্লা। কোথাও আবার দেওয়াল-লিখনের পাশাপাশি ঠোঁটেও উচ্চারিত হতে থাকে- সকল ঈদের সেরা ঈদ, ঈদ-ই-মিলাদ
এসব দেখে-শুনে মাথার মধ্যে কিলবিল করে কিছু প্রশ্ন- ঈদ-এর অর্থ কী? মিলাদুন্‌ নবি বলতে কী বোঝায়? ইসলামে ঈদ আসলে ক’টি? নির্ভরযোগ্য তত্ত্ব ও তথ্যের ভিত্তিতে নবি (সা)-র প্রকৃত জন্মদিন কোনটি? নবি (সা) বা তাঁর অনুগামীরা কি এদিনটিকে উদযাপন করতেন! করলে কীভাবে করতেন? শরিয়তের দৃষ্টিতে এসব রীতিরেওয়াজের বিধানই বা কী? এধরণের প্রশ্নগুলো মাঝে মাঝেই মনকে জারণ করে।
ঈদ একটি আরবি শব্দ। অর্থ উৎসব, এমন উৎসব যা ফিরে আসে বারবার। আর মিলাদ শব্দের অর্থ জন্ম বা জন্মতিথি। তাই, মিলাদুন্‌ নবি বলে নবি (স)-এর জন্মদিনকে বোঝানো হয়।   
নবি মুহাম্মদ (সা)-এর জন্ম কোন দিনে?- তা সবার জানা, সোমবারে। কিন্তু, কত তারিখে?- তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে রয়েছে বিস্তর মতভেদ অনেকের মতে তাঁর জন্ম ১২ই রবিউল আউয়াল। আবার অনেকের মতে ৯ই রবিউল আউয়াল। তবে বিশ্ববরেণ্য ও বিশুদ্ধতম সিরাত-গ্রন্থ আর্‌-রাহীক্বুল্‌ মাখতূম-এ বলা হয়েছে রাসূল (সা) ৫৭১ খ্রিস্টাব্দে ৯ই রবিউল আউয়াল, মোতাবেক ২০শে এপ্রিল সোমবার প্রত্যুষে জন্ম গ্রহণ করেন (পৃ-৪৫)একই অভিমত বিখ্যাত ইসলামি বিদ্বান আল্লামা মুহাম্মদ সুলাইমান সাল্‌মান মানসূরপুরি (রাহ্‌মাতুল্‌ লিল্‌-‘আলামীন পৃ-৩৪) ও মিশরের প্রখ্যাত জোতির্বিজ্ঞানী মাহমূদ পাশা’র আল্লামা শিবলি নোমানি ও সাইয়েদ সুলাইমান নাদভি তাঁদের সীরাতুন্‌ নাবী গ্রন্থে লিখেছেন- নবি (সা)-এর জন্মদিন সম্পর্কে মিশরের বিখ্যাত জোতির্বিজ্ঞানী মাহমূদ পাশা একটি পুস্তিকা রচনা করেছেন। তাতে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, নবি (সা)-এর জন্ম ৯ই রবিউল আউয়াল, রোজ সোমবার, মোতাবেক ২০শে এপ্রিল ৫৭১ খ্রিস্টাব্দে’ (১ম খণ্ড, পৃ-১৩৬, ১৩৭) বহু সহিহ হাদিসে নবি (সা) নিজেই বলেছেন যে, তাঁর জন্ম সোমবারে হয়েছে (মুসলিম ১১৬২)এই তথ্যকে ভিত্তি করে মাহমূদ পাশা গবেষণা ও হিসেব করে দেখিয়েছেন যে, সে-বছর ১২ই রবিউল আউয়াল পড়েছিল বৃহস্পতিবার। আর সোমবার ছিল ৯ই রবিউল আউয়াল (সীরাতুন্‌ নাবী ১/১৩৭) পাশার এই গবেষণালব্ধ অভিমতকে এখনো কেউ খণ্ডন করতে পারেনি। বরং বর্তমানে অনেকেই এই মতকে গ্রহণ করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, নবি (সা)-এর জীবনাবসান হয়েছিল সর্বসম্মতভাবে ১২ই রবিউল আউয়াল-এ।  
তাছাড়া, জন্মদিন পালন করা ইসলামের কোন বিধিবদ্ধ নিয়ম নয়। এমনকি অধিকাংশের মতে, জন্মদিন পালন ইসলামি সংস্কৃতির পরিপন্থী একটি রীতি। তাই কারো জন্মদিন পালন করা-কে ইসলাম অনুমোদন করে না। ইসলামের ইতিহাস ও হাদিস অধ্যয়নে আরও স্পষ্ট হয় যে, নবি (সা) নিজে তাঁর জন্মদিন পালন করেননি। এমনকি তাঁর সাহাবারাও (অনুগামী) না। অথচ তাঁরা নবি-প্রেমের বহু অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁদের সামনেই খ্রিষ্টানেরা ঈসা (যীশু) (আ)-এর জন্মদিন (বড়দিন) উদযাপন করত। কিন্তু তাঁরা কখনো নবি (সা)-এর জন্মদিনে ঈদ বা অনুষ্ঠান করেননি। তাই ইসলামি শাস্ত্রের পণ্ডিতেরা একে একটি ‘নব আবিষ্কৃত রীতি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, উমার (রা) একদিন সকল সাহাবাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন, একটি নতুন বর্ষগণনা-পদ্ধতি প্রবর্তন করার উদ্দেশ্যে। কেউ কেউ পরামর্শ দেন, নবি (সা)-এর জন্ম তারিখ থেকে সন গণনা শুরু করা হোকআবার কেউ বলেন, তাঁর (সা) মৃত্যুদিন থেকেউমর (রা) তৎক্ষণাৎ এসব প্রস্তাব বাতিল করে বলেন, এ পদ্ধতি খ্রিষ্টানদের। অতঃপর, কিছুক্ষণ আলাপ-আলোচনার পর সর্বসম্মতিক্রমে হিজরতের দিন থেকে ইসলামি সন গণনা আরম্ভ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় (বুখারি ৩৯৩৪, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, ইবনু কাসির ৪/৫১০-৫১২)
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, জন্মদিবস কেন্দ্রিক উৎসব-অনুষ্ঠান অ-মুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রীতি। যেমন- বড়দিন, জন্মাষ্ঠমী, বৌদ্ধপূর্ণিমা ইত্যাদি। আর এ মর্মে মনে রাখতে হবে, যে ব্যক্তি অন্য কোনো জাতির সাদৃশ্যতা গ্রহণ করবে সে তাদেরই অন্তর্ভূক্ত বলে গণ্য হবে। (আবু দাউদ ৩৫১২, সহিহ আবু দাউদ, আল্‌বানি ৩৪০১) উল্লেখ্য যে, এ কারণেই আযান প্রচলনের ঘটনায় নবি (সা) আগুন জ্বালানো (পারসিক), ঘণ্টা ধ্বনি (খ্রিষ্টান), বাঁশি বাজানো (ইহুদি)-র প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন (তিরমিযি ১৮৯, আবু দাউদ ৪৯৯, ইবনু মাজাহ্‌ ৭০৬)   
এবার প্রশ্ন, ইসলামে ঈদ ক’টি? কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে, ইসলামে ঈদ হল দু’টি- ঈদুল্‌ ফিত্‌র ও ঈদুল্‌ আয্‌হা। আর এ কথা নবি (সা) মদিনা-জীবনের শুরুতেই ঘোষণা করেছেন। তিনি মদিনায় পৌঁছে দেখলেন, বছরের দু’টি দিন মদিনাবাসীরা বেশ আনন্দ-ফুর্তি করছে। এবং প্রাক-ইসলামি যুগ থেকেই এ দু’দিন তারা আনন্দ-ফুর্তি করে আসছে। নবি (সা) তাঁদেরকে সম্বোধন করে বললেন, মহান আল্লাহ্‌ এ দুদিনের পরিবর্তে এর চেয়ে উত্তম দু’টি দিন তোমাদেরকে দিয়েছেন। তা হল ঈদুল্‌ আয্‌হা ও ঈদুল্‌ ফিত্‌র” (আবু দাউদ ১১৩৪) আর এ বিষয়টি (ইসলামে ঈদ দুটি) যেমন সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, ঠিক তেমনই ‘ইজ্‌মা-য়ে উম্মাত’ দ্বারাও প্রতিষ্ঠিত। অতএব কোনো তৃতীয় ঈদের প্রচলন কখনই বিধিবদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হবে না বলে আমার বিশ্বাস কারণ, আমাদের এই দ্বীনে যে নতুন কোনো বিষয়ের প্রচলন করবে সে প্রত্যাখ্যাত হবে” (বুখারি ২৬৯৭, মুসলিম ৪৪৯২)এবং “নব-প্রবর্তিত প্রতিটি বিষয়ই বিদ‘আত (ধর্মীয়-অনুশীলন বিষয়ক নতুন রীতি) আর প্রতিটি বিদ‘আতই পথভ্রষ্টতা” (আবু দাউদ ৪০৬৭)   
এ মর্মে এও উল্লেখ্য যে, নবি (সা) জীবনভর সোমবার ও বৃহস্পতিবার নফল (ঐচ্ছিক) রোযা রেখেছেন। তাই অনেকে মনে করেন, জন্মদিন উপলক্ষে তিনি (সা) সোমবারে রোযা রাখতেন। আর প্রমাণস্বরূপ তারা উল্লেখ করেন, একবার নবি (সা)-কে সোমবারের সিয়াম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন- “এ দিনে আমার জন্ম এ দিনেই আমি নবুওয়াত (নবিত্ব) লাভ করেছি এবং এ দিনেই আমার উপর প্রথম অহি (সুরাতু আল্‌-আলাক্ব-এর প্রথম পাঁচ আয়াত) অবতীর্ণ হয়েছিল” (মুসলিম ১১৬২) এ হাদিস উল্লেখ করে তারা বলতে চেয়েছেন যে, ঐ দিনে রোযা পালন করে তিনি (সা) জন্মদিন উদযাপন করেছেন। অতএব ঈদ-ই-মিলাদ সুন্নত। কিন্তু তারা বেমালুম ভুলে যান যে, খুদ সে-হাদিসেই আরও কয়েকটি কারণের উল্লেখ রয়েছে। তাছাড়া নবি (সা) সোমবার ছাড়া বৃহস্পতিবারও রোযা রাখতেন। এবং এ বিষয়ে তাঁর (সা) স্পষ্ট বিবৃতিও রয়েছে, ,“সোমবার ও বৃহস্পতিবার মানুষের সম্পাদিত কর্মসমূহ আল্লাহ্‌র নিকট পেশ করা হয়। কাজেই আমি পছন্দ করি, যখন আমার আমলসমূহ পেশ করা হবে তখন যেন আমি রোযা অবস্থায় থাকি” (সাহিহুল্‌ জামে’, আল্‌বানি ১৫৮৩)আরও একটা কথা মনে রাখা দরকার যে, তিনি ঐ দিনে রোযা রেখেছেন। আর ঈদ আসে রোযার শেষে; ঈদের দিন রোযা হয় না আর রোযার দিন ঈদও হয় না। তাছাড়া, এক লহমার জন্য যদি মেনে নেওয়া হয় যে, সোমবারে রোযা রাখার মাধ্যমে তিনি (সা) জন্মদিন পালন করেছেন, তাহলে তো প্রতি সোমবারে আমাদের ঈদ-ই-মিলাদ উদযাপন করতে হয়; আর তা হতে হবে সিয়াম পালনের মাধ্যমে; খেয়ে-দেয়ে, নানা রকমের আলোকসজ্জার মাধ্যমে কখনই নয়!
বরং আমি মনে করি, সারা বছর ধরে তাঁর (সা) জীবন ও কর্ম নিয়ে আলাপ-আলোচনা, সমাজে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য কর্মসূচী গ্রহণ, নিজ আচার-আচরণ ও দৈনন্দিন কাজকর্মে তাঁর বিধি-নিষেধ মেনে চলা-ই হবে তাঁর (সা) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন।
[পূবের কলম, ৯ নভেম্বর ২০১৮-তে প্রকাশিত]

Tuesday, 20 June 2017

ঈদের শপিং ও খলীফা উমার (রাঃ)



ঈদের শপিং ও খলীফা উমার (রাঃ) 

উমার (রাঃ)। ইসলামি ইতিহাসের দ্বিতীয় খলিফা। পৃথিবীর ইতিহাসে এক দক্ষ প্রশাসক। তাঁর প্রশাসন-নীতি অনুপ্রাণিত করেছে বহু রাষ্ট্রনায়ককে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে। ইতিহাসও যুগ যুগ ধরে সাক্ষ্য বহন করে চলেছে তাঁর প্রজা-প্রেমের। তিনি ছিলেন প্রায় অর্ধ পৃথিবীর শাসকসে-সময়ে বায়তুল-মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) দেখাশুনা করতেন আবু উবাইদা (রাঃ)। সহজ করে বললে, তিনি উমার-সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন।

কাল বা পরশু ঈদ। চারিদিকে বাতাবরণ উৎসব-মুখর। ঈদের শোপিংয়ে মেতেছে পাড়া। বাচ্চারা সব আনন্দে আত্মহারা। নতুন জামার রং মনে লেগেছে তাদের। নতুন সাজে ছেলেমেয়েদের দেখে নয়ন জুড়াতে সব মায়েরাই চায় তাই বিনয়-জড়ানো কন্ঠে স্ত্রী স্বামী উমার (রাঃ)-কে বললেন- ‘শোনো, এই ঈদে আমাদের জন্য নতুন জামাকাপড় না হলেও চলবে। কিন্তু ছোট ছেলেটা নতুন কাপড়ের জন্য বায়না ধরেছে। রীতিমত কান্নাকাটি আরম্ভ করে দিয়েছে একটু দেখো না, যদি কোনোভাবে সম্ভব হয়।’ 

অর্ধ পৃথিবীর শাসক উমার (রাঃ) অকপট উত্তর দিলেন- ‘আমার যে নতুন কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই!' তবে পরক্ষণেই পিতৃসুলভ দুর্বলতা ও আবেগের কাছে তাঁর প্রতাপ পরাজিত হল। তিনি আবু উবাইদা (রাঃ)-কে চিঠি লিখলেন, এক মাসের অগ্রিম বেতন দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে

খলিফার এই চিঠি দেখে আবু উবাইদা (রাঃ) কেঁদে ফেললেন। আমীনুল্‌ উম্মাহ্‌ বা ‘জাতির বিশ্বস্থ ব্যক্তি’ রূপে পরিচিত তিনি। সজল চোখে উত্তর লিখলেন- ‘হে আমীরুল্‌ মুমেনীন, হে বিশ্বাসীদের নেতা, অগ্রিম বেতন বরাদ্দের বিষয়ে আমার দু’টি জিজ্ঞাস্য আছে। আর আপনাকেই তা বিবেচনা করে দেখতে হবে। বিষয় দু’টি হল- 
(ক) আগামী মাস পর্যন্ত আপনি বেঁচে থাকবেন কি না? 
(খ) বেঁচে থাকলেও, জনগণ আপনাকে খেলাফতের দায়িত্বে বহাল রাখবে কিনা?’ 

উত্তর দেখে উমার (রাঃ) কেঁদে ফেললেন। অশ্রুজলে দাড়ি সিক্ত হয়ে গেল তাঁর। দু’ হাত তুলে মহান প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করলেন, হে আল্লাহ! আবু উবাইদা (রাঃ)-এর প্রতি করুণা করো, তাঁকে দীর্ঘায়ু দান করো!   

[তথ্যসুত্রে- আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ইবনে কাসীর (রহঃ)]

আব্দুল মাতিন ওয়াসিম