Pages

Thursday, 9 April 2026

তুলাই ও টাঙন পেরিয়ে - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



আমি তখন খুব ছোটবয়স দেড় কিংবা দু’ বছর হবেসেই বয়সে আমার ছোট্ট নিষ্পাপ শরীর জুড়ে হঠাৎই একদিন ফুটে উঠল ক’টা দগদগে ঘাপ্রথমে ক্ষুদ্র ফুসকুড়ির মতো তুচ্ছ। কিন্তু কয়েক প্রহর গড়াতেই যেন অশুভ অঙ্কুরের মতো ফুলে-ফেঁপে ঢোল তার উপর কয়েক দিনের মধ্যেই সব ঘা জলে ভরে উঠলো আমি ব্যথায় ছটফট করতে লাগলাম। আর আমার ছোট্ট শরীরটা ক্রমাগত কাঁপতে লাগলো আমার অমন দুরবস্থা দেখে মা-বাবা’র বুকের ভেতর বইতে লাগলো এক অস্থির স্রোতহায় আল্লাহ্‌ এ কোন্‌ রোগ, এ কেমন দুর্দশা!
 
দিনে দিনে পরিস্থিত আরও ভয়াবহ রূপ নিলগ্রাম্য ডাক্তারদের সব শলাপরামর্শ, সকল ওষুধপাতিই ব্যর্থ হতে লাগল। কূলকিনারা না পেয়ে মা-বাবা দু’জনে মিলে সিদ্ধান্ত নিলেনআমাকে ইকড়াকুড়ি গ্রামের বিখ্যাত কাসেম ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন তবে আমাদের গ্রাম থেকে ইকড়াকুড়ির দূরত্ব কমপক্ষে তেরো-চৌদ্দ কিলোমিটার হবে; আর সেই সময় গ্রামীণ পথ-ঘাটে যানবাহন বলতে গরুর গাড়ি বা সাইকেল, নইলে পায়ে হেঁটেই যাত্রা। কথায় আছে, মায়ের ভালোবাসা পাহাড় কেটে পথ বানাতে পারে; সন্তান যখন কাঁদে তখন মায়ের দেহে যে-অদৃশ্য শক্তি নেমে আসে, তা উত্তাল তরঙ্গ হোক বা দুর্গম পর্বতশৃঙ্গ সবকিছুকেই হার মানায়।
 
তা-ই হল। মা-বাবা আমাকে কোলে নিয়ে রওনা দিলেন ইকড়াকুড়ির পথে। মাঝে দু-দু’টো নদী—তুলাই ও টাঙ্গন। তুলাই নদীর উপর তখন বাঁশের তৈরি ধাড়া, ধীর পায়ে সাবধানে তা অতিক্রম করে কিছুটা পথ এগোতেই টাঙ্গনযার স্রোত বর্ষা শেষেও বুনো ঘোড়ার মতো ছুটে চলেছেটাঙ্গনের তীরে গিয়ে তারা দেখল, স্রোত প্রবল, নৌকা ওপারের ঘাটে বাঁধা এবং মাঝির ছায়াও কোথাও নেই। কোলের শিশুকে বাঁচাতে মা তখন কী ভেবে আর কী করে যে সেসব করেছিলেনভাবলে আজও আমার মনে বিস্ময় জাগে   
 
মা শাড়িটা খুলে গায়ে একটা চাদর জড়ালেন। তারপর নেমে পড়লেন উত্তাল স্রোতের মুখোমুখি। মায়ের পেছন পেছন বাবাও জলে নেমে পড়লেন। সন্তানকে আঁকড়ে ধরে, দম ফেলে ফেলে, ধীরে ধীরে, কখনো বুক জলে ডুবে, তো কখনো ঢেউয়ের ধাক্কায় টাল খেয়েআশ্চর্য এক দৃঢ়তায় দু’জনেই নদী পার করলেন। ওপারে উঠে মা ভেজা চাদর ছেড়ে আবার শাড়ি পরলেন; তারপর আমাকে বুকে জড়িয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটা দিলেন কাসেম ডাক্তারের বাড়ির দিকে
 
কাসেম ডাক্তার আমার শরীর জুড়ে সেই দগদগে ঘা দেখে এবং মা-বাবা’র মুখে সব কথা শুনে, কপালের রেখা ঈষৎ সংকুচিত করে বললেন— “বাচ্চার অবস্থা ভালো নয়। আমার যেটুকু বিদ্যেবুদ্ধি তা দিয়েই বলছি, আজই ওষুধ খাওয়াতে হবে, না হলে সামনে বিপদ আছে।
 
ডাক্তারের কথা শুনে উদ্বেগ যেন হঠাৎই আকাশ গুঁড়ো করে নামল মা-বাবা’র মাথায়। সেই ওষুধ যে আশেপাশে কোথাও পাওয়া যাবে না; ডাক্তার বাবু স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন একমাত্র কুশমুণ্ডি বাজারেই পাওয়া যাবে। তাই বাবা সিদ্ধান্ত নিলেনতিনি সেখানেই যাবেন। তবে বাড়ি ফিরে পথে সময় নষ্ট না করে, ডাক্তারখানা থেকেই সেদিকে রওনা দেবেনআর মা আমাকে নিয়ে একা বাড়ি ফিরবেন।  
 
বাবা মাকে জিজ্ঞেস করলেন— “মজিদের মা, এতটা পথ একলায় যাবা পারিবু?”
মা অবিচল, শান্ত গলায় উত্তর দিলেন— “তোরা খালি মোক নদীটা পার করি দেও। বাকিটা মুই একলায় যাবা পারিম 
 
এ যেন মা নামক শক্তিরই এক অন্যরকম দ্যুতি। বাবা মাকে নদীর ওপারে পৌঁছে দিলেন। তারপর তিনি কুশমুণ্ডির পথে দীর্ঘ পদযাত্রা শুরু করলেন; আর মা শুরু করলেন একা পথচলাদুধের শিশুকে বুকে আঁকড়ে ধরে। বিস্তীর্ণ মাগুরাকুড়ির পাথার, চারিদিকে খাঁ খাঁ মাঠ; দুপুরের রোদ যেন মাথায় জ্বালা ধরাচ্ছেএকমাত্র মাঝখানে একটি আমগাছ; তার আগে কোথাও কোনো ছায়া নেইতার উপর রমজান মাসমা রোজাদার। ঘরে ফিরে আবার তাঁকে একা হাতে সব রান্নাবান্না সামলাতে হবে। এসব চিন্তা, শারীরিক কষ্ট, নির্জন মাঠের নীরবতাসব মিলিয়ে মার হাঁটার ভঙ্গি যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। তবুও যথা সম্ভব দ্রুত পায়ে বাড়ির পথে হাটছিলেন। ঠিক তখনই ভাগ্য স্নেহভরে দু’ হাত বাড়িয়ে দিলকিছুটা পথ এগোতেই আল্লাহ্‌র রহমতে গ্রামেরই এক মহিলার সাথে মা’র দেখা হলদুজনে মিলে কথার ভেলায় ক্লান্তি ভুলে ধীরে ধীরে পৌঁছে গেলেন বাঁশকুড়ি  
 
অন্যদিকে, বাবা একাই মাইলের পর মাইল হেঁটে অবশেষে কুশমুণ্ডি পৌঁছলেন। কত ফার্মেসি ঘুরলেন, কত দোকানে জিজ্ঞেস করলেন! শেষে একটা দোকানে ওষুধটা পেলেন। তারপর ওষুধ নিয়ে আবার পায়ে হেঁটে বাড়ির পথে রওনা দিলেন। বাড়ি পৌঁছে মা’কে ধরালেন সেই ওষুধ। আর মা ডাক্তারের নির্দেশ অনুযায়ী ওষুধ-কুসুম, পানিপথ্য সবই প্রয়োগ করলেন। অতঃপর মহান আল্লাহ্‌র অসীম রহমতে আমি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলাম।
 
বহু বছর বাদে, এখন আমি নিজেও দুসন্তানের পিতা যদি কোনোদিন সাবা বা সাওবান একটু অসুস্থ হয়ে পড়ে, আমার স্ত্রীকে দেখি ভীষণ অস্থির হয়ে ওঠে। তার চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত উৎকণ্ঠাছটফট করতে থাকে বারবার ফোন করে ডাক্তারদের; কখনো জামিরুল দাকে, কখনো আনসারিকে, তো কখনো সোহেলকে। একটার পর একটা উপসর্গের কথা বলে, যেন কোনোকিছুই বাদ না পড়ে। তারপর আমি ওষুধ এনে দিলে সে একদম নিয়ম মেনে, ঘড়ি ধরে, যত্ন করে সন্তানের মুখে তুলে দেয় প্রতিটা ওষুধ।
 
অদ্ভুত লাগেসে নিজেও ইদানীং নানা শারীরিক কষ্টে ভুগছে, তবুও তার নিজের যন্ত্রণা যেন সেই মুহূর্তে কোথা মিলিয়ে যায়! সন্তানের সামান্য কষ্টের সামনে নিজের সব ক্লান্তি, সব ব্যথা তুচ্ছ হয়ে পড়ে তার আর এই দৃশ্যগুলো নিঃশব্দে আমার হৃদয়ের ভেতর এক গভীর উপলব্ধির জন্ম দেয়।
 
মনের গহীনে এক অটল বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে—‘মাআসলে আত্মত্যাগের অপর নাম। মাতৃত্ব কোনো সম্পর্ক নয়; এ এক অনন্ত যাত্রা, এক বিস্ময়কর মহাকাব্য। এই যাত্রার প্রতিটা বাঁকে, কী আলো কী অন্ধকার সব ক্ষেত্রেই একজন মা নিজেকে বিলিয়ে দে, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক অবিরাম স্রোতে।
 
হয়তো এই কারণেই মহান প্রতিপালক সতর্ক করে দিয়েছেন—“তোমার মা-বাবা অসন্তুষ্ট হলে আমিও অসন্তুষ্ট হবো; আর তাঁরা সন্তুষ্ট থাকলে আমিও সন্তুষ্ট থাকবো বোধ করি, এই বাণী শুধু উপদেশ নয়, এটি এক চিরন্তন সত্য, এক অপরিবর্তনীয় বিধান, যা মানুষের জীবনকে পথ দেখায়। আমার ধারণা, আজও এই পৃথিবীর সকল আশ্রয়ের শুরু এবং শেষ, দুটোই যেন মায়ের কোলে এসে মিশে যায়। যেই কোলে লুকিয়ে আছে নিরাপত্তার প্রথম স্পর্শ, শান্তির শেষ ঠিকানা, আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক অনন্ত আকাশ।
 
বাঁশকুড়ি, দঃ দিনাজপুর
২৭ ডিসেম্বর ২০২৫  

No comments:

Post a Comment