বড়দি,
মেজোআব্বার বড় মেয়ে। নাম হালিমা বেগম। আমরা ভালোবেসে, আদর করে ‘হালি দি’ ডাকতাম। ছোটবেলা থেকেই ছিল গার্হস্থ্যের কাজে নিপুণ, আচরণে এক
মায়ামাখা কোমলতা ছিল তার, আর ব্যবহারে এমন আন্তরিকতা ছিল যা মানুষকে খুব সহজেই আপন করে নিত। সেই গুণের টানেই একদিন তাকে ঘরের বউ করে নিয়ে
গেলেন আমাদের গ্রামেরই দবিরদ্দীন সাহেব, তাঁর একমাত্র ছেলে সোলেমান মিয়াঁর জন্য, যে কিছুদিন আগেই এলাকারই এক প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছে।
বিয়ের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বড়দি তার স্বভাবসিদ্ধ মাধুর্যে শ্বশুরবাড়ির
সকলের মন জয় করে নিল। শুধু ঘরের মানুষদের নয়, পাড়াপড়শিদেরও মনে
জায়গা করে নিয়েছিল সে। ফলে তার জীবন আপন গতিতে
বইতে লাগল—যেমন করে সূর্যের আলো মেখে তুলাই নদীর জল নীরব স্রোতের ঘাড়ে
চেপে পৌঁছে যায় টাঙনে, তারপর নানা নদনদী হয়ে মিলিয়ে যায় সমুদ্রের বুকে।
আমি যখন কদমডাঙা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, তখন সোলেমান দুলাভাই সেখানকার শিক্ষক। কী স্কুল, কী রাস্তাঘাট, কী বাড়ির উঠোন
যেখানেই আমাকে দেখতেন, সাইকেল থামিয়ে মুচকি হেসে রসিকতা করে ডাক দিতেন—
“অ্যাই শালা, শোন্!” আর তার ডাকে আমি রাগে গজগজ করতাম দেখে
মুচকি হেসে বলতেন, “তুই তো সম্পর্কে আমার শালাই হবি, তাও
আবার কনিষ্ঠতম শালা, আমার পেয়ারা শালা!”
দুলাভাই ছিলেন আগাগোড়া এক রসিক মানুষ। আর আমার ও তাঁর সম্পর্কটা খানিকটা ওই টম এন্ড জেরি’র মতো ছিল। আমি যত ক্ষেপে যেতাম, তিনি ততই ক্ষেপাতেন। ফলে অনেক সময় রেগে গিয়ে আমি
ছোট ভাগ্নিকে,
মানে তাঁর ছোট মেয়ে শিরীনকে ধরে মার দিতাম
আর বলতাম,
“তোর বাপ কেনে মোর সাথে লাগেছে”।
তিনি ভীষণ পরিশ্রমীও ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি জমিজমা দেখাশোনা, ব্যবসাবাণিজ্য সবকিছুই সামলাতেন সমান দক্ষতায়। আগে থেকেই বেশ কিছু জমিজায়গা ছিল,
পরে আরও কিনলেন। ধীরে ধীরে অনেক জমিজমার মালিক হয়েছিলেন। ফলে আষাঢ়-শ্রাবণ এলেই তাঁর জীবন যেন এক অবিরাম কর্মযজ্ঞে
পরিণত হতো। জমি চাষ,
আল কাটা, বীজ তোলা, ধান রোপণ—কাজ যেন শেষই হতো না তাঁর। যেন বর্ষাকালে ধান রোপণের ওই
মহাযজ্ঞে তিনি অকুল দরিয়ায় পড়ে গেছেন।
আর সেই সময়েই দেখা যেত
গ্রামের প্রকৃত রূপ—মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে নিঃস্বার্থভাবে। কেউ এসে বীজ
তুলে দিচ্ছে,
কেউ হাল ধরছে, কেউ আল কাটছে,
কেউ আবার রোপণে হাত লাগাচ্ছে। কোনো পারিশ্রমিক নেই, নেই কোনো চুক্তি। শুধু সম্পর্কের
টান আর
একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধতা। তবে সেই সময় কাজের ফাঁকে ফাঁকে জমে উঠত হাসি,
মশকরা আর খুনসুটির আসর। যেন কোনো উৎসব চলছে—
কেউ বলতো,
—“দুলাভাই, আইজ রাইতে কিন্তু হাঁস খামোঁ, নাইলে কাইল থাকি কাজ বন্দ!”
দুলাভাই হেসে উত্তর দিতেন,
—“হাঁসে তো খাবেন। ক’টা খাবেন, খালি কহো। কম হইলে তোরা আর আসিবেন!”
পাশ থেকে অন্যজন বলতো,
—“এইটা ঠিক কাথা,
চাইরটা হাঁস তো লাগিবিই”
আল কাটতে কাটতে মোসলেম খোঁচা দিয়ে বলতো,
—“অ্যাই মছো, তোর আইলটা বেঁকি যাছে কেনে রে?”
মছোও ছাড়ার পাত্র নয়,
—“আইল বেঁকা হইলেও কী, সোজা হইলেও কী, হাঁসের গোশত সোজা পেটত্ যাবি,
চিন্তা কই না!”
কেউ আবার কাজ ফাঁকি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে সঙ্গে সঙ্গে শোনা যেত,
—“হাঁ হো, তোরা ফের দাঁড়েই আছেন, কেনে তে?”
সে হেসে সহসা উত্তর দিতো,
—“মুই এনা জিরাছু, আর তোরা কীরম কাজ করেছেন তদারকি করেছু!”
এমন সব কথার ফাঁকে মাঠজুড়ে হাসির রোল উঠত। কষ্টকর কাজও তখন আর কঠিন মনে হতো না। সবকিছুই যেন একসাথে
থাকার আনন্দে হালকা মনে
হতো। দিন শেষে থাকত
সেই প্রতীক্ষিত ভোজ—কলাপাতায় গরম ভাত, সাথে হাঁসের কষা মাংস। আর এই ভোজ ও রীতিকে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় বলা হতো—হাওলি দেওয়া।
তবে হাওলি শুধু একটা ভোজ নয়। আমি মনে
করি,
এটা এক ধরণের সম্পর্ক, এটা একটা বন্ধন। যেখানে
মানুষ অর্থের জন্য নয়,
কাজ করত মানুষের জন্য। বিনিময়ে পেত
একসাথে বসে পাত পেড়ে খাওয়ার আনন্দ,
আর হৃদয়ের গভীরে এক অদ্ভুত ও অবর্ণনীয় তৃপ্তি।
কোথাও, কারও জমিতে লোকে হাওলি দিচ্ছে
এই খবরটা কানে এলেই আমরা ছোটরাও আর স্থির থাকতে
পারতাম না। আমি,
পাগলু, দেলোয়ার, আমু,
মাসুম, জুয়েল, রবিউল দা, মোমেন দা, বাবলু কাকু আমরা যেই
শুনতাম,
সঙ্গে সঙ্গে একে অপরকে ডেকে বলতাম— “চলো, হাঁরাও হাওলি দিমোঁ!”
আমাদের সেই ডাকের
মধ্যে ছিল উচ্ছ্বাস,
ছিল বন্ধুত্ব, আর আমাদের ছোট্ট পৃথিবীর এক বিশাল আনন্দ। আমার স্মৃতিতে আজও ভেসে
ওঠে সেই দিনগুলো। আমরা ছোটরা ভারী কাজ করতে পারতাম না, তাই ছোটখাটো কাজে
নিজেদের জুড়ে দিতাম—আমাদের মধ্যে কেউ বীজের আঁটি এগিয়ে দিতো, কেউ
পানির কলসি এনে দিতো, আবার কেউ ভার সাজাতে সাহায্য করতো।
তবে পরবর্তীতে আমরা এই রীতিতে সামান্য একটু পরিবর্তন
করেছিলাম, নিজেদের সুবিধার্থে। হাওলি দিয়ে আমরা হাঁসের গোশতের বদলে অন্য কিছু চাইতাম—কখনো ক্রিকেট বল, কখনো ব্যাট,
কখনো ফুটবল, আবার কখনো ভলিবল। শেষদিকে তো একবার হাওলির বদলে ক’জনের থেকে আমরা একটা ক্যারামবোর্ড চেয়ে বসেছিলাম! তবে সেই চাওয়ার মধ্যেও ছিল একসাথে কিছু পাওয়ার আনন্দ ও একরাশ নিষ্পাপ স্বপ্ন।
আর তাই শুধু সোলেমান দুলাভাইয়ের জন্য নয়,
গ্রামের আরও অনেকের কাজেই আমরা হাওলি দিতাম। কারো ধান
ঝাড়া,
কারো সরিষা কাটা, কারো আলু তোলা—যেখানে দরকার, আমরা সেখানেই হাজির। যেন এই হাওলি দেওয়াটা
আমাদের কাছে একটা উৎসব হয়ে উঠেছিল।
আজ সময় বদলেছে। যন্ত্র এসেছে, পদ্ধতি বদলেছে, মানুষের জীবনও অনেক আধুনিক হয়েছে। সেই সাথে কোথাও যেন হারিয়ে গেছে সেই সহজ, নিঃস্বার্থ, একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি; হারিয়ে গেছে হাওলি দেওয়ার মনমানসিকতা। এখন গ্রামাঞ্চলেও সবকিছুতেই হিসেব, লাভ-ক্ষতি,
স্বার্থের টানাপোড়েন। তবে স্মৃতির ভেতরে আজও বেঁচে আছে সেই
নির্মল ও নিঃস্বার্থ দিনগুলো— হাঁসের কষা মাংসের ঘ্রাণে, কলাপাতায় সাজানো গরম ভাতের ধোঁয়ায়, আর মানুষের প্রতি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসার অনন্ত ও অবিরাম গল্পে।
হেস্টিংস, কোলকাতা
৩১ মার্চ ২০২৬

No comments:
Post a Comment