আমাদের শৈশবের পৃথিবীটা যেন অন্যরকম ছিল। অদ্ভুত এক শান্তিতে
ভরা। বর্ষা নামার আগেই পৃথিবী রঙ বদলাতে শুরু করত। আকাশে মেঘ তখনো পুরোপুরি জমে ওঠেনি, তার আগেই চাষিদের মনে বর্ষার
আগমনী সুর বাজতে শুরু করে দিত। ভোরের আলো ফোটা মাত্রই তারা হাল কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ত। দূর থেকে দেখতাম, কুয়াশা ভেদ করে একে একে এগিয়ে যাচ্ছে মাঠের পথে। কারো কাঁধে লাঙল, কারো কাঁধে মই, কারো হাতে কোদাল,
তো কারো হাতে জোয়াল; আর সবার চোখে সোনালী ধানের নতুন স্বপ্ন।
মাঠজুড়ে তখন এক অপূর্ব দৃশ্য। দলে দলে মানুষ হাল বাইছে। লাঙলের ফাল জমির বুক চিরে দিচ্ছে, নতুন জীবনের জন্য প্রস্তুত করছে তাকে। কেউ আবার চাষের পর জমিতে মই দিচ্ছে, কেউ জমির ঢেলা ভাঙছে। তারপর একটু বেলা বাড়লে সবাই কাজ থামিয়ে বসে পড়ছে আলে। গামছা খুলে পোঁটলা থেকে বার করছে পান্তা ভাত,
সাথে লবণ, কাঁচামরিচ, কাঁচা পেঁয়াজ, বরাত ভালো হলে বাসী তরকারী, কারো আলু ভর্তা, তো কারো তিসীর শানা। সেই সরল আহারেও যেন ছিল এক অন্যরকম তৃপ্তি। মাঝেমধ্যে আমরা ছোটরা বাড়িতে না খেয়ে, বড়দের সাথে মাঠে গিয়ে ওই আলের মাথায় বসে পান্তা
খেতাম। মনে হতো, এ যেন এক উৎসব, মাটির সাথে মানুষের গভীর ভালোবাসার উৎসব।
তারপর যখন সত্যিই বর্ষা নেমে আসত। মুষলধার বর্ষণে ভিজে যেতো মাটির বুক। আর ভেজা মাটির গন্ধে ভরে উঠত চারিদিক। আবার শুরু হতো নতুন করে হালচাষ—দ্বিতীয় দফার। যাদের নিজেদের জমিজমা কম,
তারা নিজেদের জমি চাষ হয়ে গেলে অন্যের জমিতে কাজ
করতে যেত। কেউ হাল দিত, কেউ
মই দিত, আর এভাবেই একটু একটু করে রোজগারের পথ খুলে যেত। সেই দিনগুলোতে জীবন ছিল বহু কষ্টের,
কিন্তু তাতে লোকজনের তেমন কোনো হাহাকার ছিল না। ছিল একধরণের তৃপ্তি, সন্তুষ্টি আর সহজ স্বীকারোক্তি।
বর্ষা যখন পুরোপুরি নেমে আসত, তখন গ্রামটা যেন আরও ব্যস্ত হয়ে উঠত। শুরু হতো বাড়ি বাড়ি দিনমজুরদের আনাগোনা। কেউ ধান লাগানোর কাজ নিত, কেউ বীজ তোলার ঠিকা, কেউ বা আল কাটার।
একেকটা জমি ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে উঠত নতুন চারা রোপণের জন্য। মনে হতো,
পুরো গ্রামটাই যেন একসাথে মিলে কোনো বিশাল বড় ওলিমা’র প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তারপর আরম্ভ হতো ধান লাগানো। যেদিন কোনো বাড়ির প্রথম ধান রোপণ শুরু হতো, সেদিন তারা গোসলপুনা’র আয়োজন করতো। আহামরি কিছু নয়, ভাত, ঠাকুরি কালাই (মাষকলাই)-এর গাঢ় ডাল,
আর কচুর লতি ও শাক একসাথে সেদ্ধ করে বানানো এক বিশেষ তরকারি। সাথে আলু ভর্তা, বা কাঁঠাল বীজের ভর্তা, বা অন্য কোনো সবজি। খুবই সাধারণ আয়োজন। কিন্তু সেই সাধারণ আয়োজনের মধ্যে ছিল এক অসাধারণ স্বাদ। আর তখন তা আমাদের কাছে কোনো রাজকীয় ভোজের মতোই মনে হতো।
যেদিন আমাদের বাড়িতে গোসলপুনা থাকতো,
সেদিনটা ভোর থেকেই অন্যরকম মনে হতো আমার। ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারতাম,
আজ বাড়িতে বিশেষ কিছু আছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসতো খুটখাট শব্দ, মাটির চুলোয় জ্বলন্ত আগুনের কটকট আওয়াজ, মায়ের ব্যস্ত পায়ের শব্দ—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত
উত্তেজনার জন্ম দিতো মনে।
মা সেদিন খুব ভোরেই উঠে পড়তেন। প্রথমে ঠাকুরি কালাইয়ের ডালা নিয়ে বসতেন। গরম তাওয়ার
উপর বালু দিয়ে হালকা করে কলাইগুলো ভেজে নিতেন। আর তখন একটা মৃদু খসরখসর শব্দ বাড়িময় ছড়িয়ে পড়তো, সাথে এক চেনা গন্ধ। তারপর সেই ভাজা কলাইগুলো যাতায় দিয়ে মা ধীরে ধীরে যাতা ঘুরিয়ে ডাল ভাঙতেন। লক্ষ্য করতাম, তাঁর হাত এক অদ্ভুত ছন্দে ঘুরেই চলেছে। এ যেন ধৈর্য,
অভ্যাস আর ভালোবাসার এক নিঃশব্দ প্রকাশ।
ডাল পিষার কাজ শেষ হতেই
মা শাড়ির আঁচল গুটিয়ে পুকুরপাড়ের দিকে রওয়ানা দিতেন। অনেক সময় আমিও মায়ের পিছু পিছু যেতাম। পুন্যাদীঘির
জলনিকাশি-নালায় তখন সারি সারি কচু শাক, সবুজে ভরা এক টুকরো
স্বর্গ যেন। মা খুব যত্ন করে এক একটা লতি তুলতেন, তারপর কাদামাটি ধুয়ে আঁচলে জমাতেন। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো অস্থিরতা নেই। সবকিছুই যেন এক গভীর মনোযোগ আর মমতায় ভরা। পরিমাণ মতো শাক তুলে মা যখন বাড়ি ফিরতেন, তখন তাঁর আঁচল ভরে কচু শাক।
বাড়ি ফিরে মা সেগুলো খুব যত্ন নিয়ে পরিষ্কার করতেন। তারপর শুরু হতো রান্নাবান্নার কাজ। মাটির উনুনের ধোঁয়া,
ফুটন্ত ডালের গন্ধ, আর কচু শাকের
সুবাস—ধীরে ধীরে সারা বাড়ি ছড়িয়ে পড়ত। দুপুর গড়ানোর আগেই বুঝতে পারতাম, আজকের সেই প্রতীক্ষিত স্বাদ আর বেশিক্ষণ দূরে নেই।
রান্নাবান্না হয়ে গেলে, মা বাটিতে করে ডাল আর কচু শাক তুলে দিতেন আমার হাতে। বলতেন, “এইটা তোমার মেজোআব্বার বাড়িতে দিয়ে আসো, এইটা তোমার বড়আব্বার বাড়ি।” আমি দায়িত্ব সহকারে একেকটা বাড়িতে সেই ডাল
ও কচু শাক দিয়ে আসতাম—যেমন করে অন্যদিনে তারা আমাদেরকে দিয়ে গেছিল। আমাদের সেই দেওয়া-নেওয়ার মধ্যে কোনো হিসেব ছিল না, না কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল। ছিল কেবল আন্তরিকতা, সম্পর্কের উষ্ণতা আর একে অপরের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
আমরা ছোটরা গোসলপুনার খবর পেলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। হয়তো ডাক পড়বে, নয়তো কেউ এক বাটি ডাল ও একটু কচু শাকের তরকারি দিয়ে যাবে। সেই আশাতেই বসে থাকতাম। আর যখন সেই খাবার হাতে পেতাম, তখন মনে হতো
এর চেয়ে সুস্বাদু পৃথিবীতে কিছু নেই। ধীরে ধীরে, তারিয়ে তারিয়ে, একেকটা লুকমা উপভোগ করতাম। যেন সেই স্বাদের সাথে মিশে আছে গ্রামের মাটি, মানুষের ভালোবাসা আর আমাদের সোনালী শৈশব।
আজকাল অনেক কিছুই বদলে গেছে। আগের সেই বিশাল মাঠ আর নেই, জমি চাষের সেই
ব্যস্ততাও নেই,
সেই মানুষগুলো অনেকেই আর বেঁচে নেই। তবে ইদানীং কোনোদিন যখন শহরের কোনো রেস্তোরাঁয় বসে কচু-চিংড়ি পাতে তুলে নিই, হঠাৎ করেই মনে পড়ে যায় গোসলপুনার সেই সরল আয়োজন, সেই গাঢ় ডালের
গন্ধ,
আর কচু শাকের অমলিন স্বাদ। স্মৃতির পাতায় এক মায়াবী আলোর
মতো জ্বলজ্বল করে। এখন আমার আর আগের মতো গ্রামের
বাড়ি যাওয়া হয় না। গেলেও দেখি, গ্রামে এখন কেউ আর গোসলপুনা করে
না। সেই রীতি প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার পথে। হয়তো তাই আমার আর কোনোদিন গোসলপুনা
খাওয়া হবে না; তবে ঠাকুরি কালাইয়ের সেই গাঢ় ডাল ও কচু শাকের সেই
মাখামাখা তরকারি রয়ে যাবে আজীবন স্মৃতির ভাঁজে, ঝাপসা আলোর মতো, একটুখানি শান্তি রূপে।
মোমিনপুর, কোলকাতা
৬ মার্চ ২০২৬

No comments:
Post a Comment