Pages

Wednesday, 22 April 2026

ফুটু ভাই - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



ফুটু ভাইতাঁর ভালো নাম কী আমার জানা নেই ছোট থেকেই দেখে আসছি, গ্রামের প্রায় সবাই তাঁকে ফুটু ভাই নামেই ডাকে ছোটোখাটো গড়ন, রোগা-পাতলা শরীর, কাঁচাপাকা চুল, সামান্য নুয়ে পড়া নাকের ডগা, গভীর কোটরে ঢুকে দুটো চোখ আর হাঁটবার সময় সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে হাঁটতেন
 
এমনিতে ফুটু ভাই খুব ভালো মানুষ ছিলেনতবে তাঁর মেজাজটা ছিল তিরিক্ষিহঠাৎ হঠাৎ রেগে যেতেন, আবার ঠাণ্ডাও হয়ে যেতেন খুব তাড়াতাড়িআর এই অনিয়ন্ত্রিত রাগের কারণেতাঁর সংসারজীবন বারবার ভাঙনের সম্মুখীন হয়েছে। শেষ পর্যন্ত একজনই আমৃত্যু তাঁর পাশে থেকেছেন, কখনো তাঁকে ছেড়ে যাননি, তিনি আমাদের কিনি ভাবি অদ্ভুত ভাবে, তাঁরও ভালো নাম আমার জানা নেই
 
কিনি ভাবি মাটির মানুষ। কথাবার্তায় তাঁর নিছক সরলতা খানিকটা ওই গ্রামীণ বোকা গোছের। ওর একটা ঘটনা লোকমুখে ছড়িয়ে আছে, একবার ওদের মাটির ঘরে টিনের ছাউনি দেওয়ার পর আগের টালিগুলো একপাশে তুলে রাখা ছিল। একদিন গ্রামের একজন এসে বলল, তার ঘর ছাওয়ার কাজে টালি কম পড়েছেযদি ক’টা টালি তাকে দেওয়া হয়, তাহলে তার উপকার হয়! কিনি ভাবির জবাব ছিল সোজাসাপ্টা—“মুই এইলা দিবানু। সামনে বাইশ্যা, পানিঝড়ির দিন, অতো জ্বালুনখড়ি কুঠি পাম, তখন এই টালিলা পুড়ি মুই ভাত-তরকারি আন্ধিবা পারিম।
 
দু’ বছর আগে ২০২৫-এর ঈদুল ফিতরের পরের দিন বারান্দায় বসে মোবাইল ঘাঁটছি। এমন সময় কিনি ভাবি আমাদের বাড়িতে আসলেন। জানতে পারলাম, তিনি ফেতরা সংগ্রহ করতে বেরিয়েছেন। এক বাড়ি থেকে কিছু চাল এনে আমাদের বাড়িতে রেখে আবার বেরিয়ে গেলেন আরও চাল সংগ্রহের জন্য। শেষে সব চাল একত্র করে একটা বস্তায় ভরলেন। এবার সেই বস্তা কীভাবে বাড়ি নিয়ে যাবেন, তাই নিয়ে চিন্তিত। কেউ একজন ওর জন্য একটা টোটো ডাকতে রাস্তায় গেল। সেই ফাঁকে মা তাকে ডেকে খোঁজখবর নিতে লাগলেনগল্পের মধ্যেই মা নিঃশব্দে কিছু টাকা তার হাতে গুঁজে দিলেন। কিনি ভাবি বুঝতে পেরে নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না। ছোট মাবলে মাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে আরম্ভ করলেন। বোধ করি, তাঁর সেই কান্নায় ছিল অভাব, ছিল লজ্জা ও কৃতজ্ঞতাআর ছিল এক অসহায় ও অভাবী জীবনযাত্রার দীর্ঘ ক্লান্তি।
 
আমার যতদূর মনে পড়ে, ফুটু ভাই বেশ হুনরীও ছিলেন। নানা রকম হাতের কাজে অসম্ভব দক্ষ ছিলেনখড়, টিন, টালি যা দিয়েই হোক, ঘর ছাওয়ার কাজ নিপুণভাবে করতে পারতেন। তবে তাঁর বিশেষ খ্যাতি ছিল ছাতা মেরামতির কাজেবর্ষা নামারগে দেখতাম, তিনি তাঁর সাজসরঞ্জাম নিয়ে বাঁশকুড়ি মোড়ে কালভার্টের ওপর বসে এক মনে ছাতা সারাইয়ের কাজ করে চলেছেনএকে একে মানুষজন ছাতা নিয়ে আসছেকারও ছেঁড়া কাপড় বদলে দিচ্ছেন, কারও ভাঙা ডান্ডি পালটে নতুন ডান্ডি লাগিয়ে দিচ্ছেন, কারও ভাঙা হুক ঠিক করে দিচ্ছেন। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় ভাঙাচোরা ছাতাগুলো যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে
 
তবে তাঁর রাগ ছিল তীব্র ও আকস্মিক। মাঝসাঝে একটুতেই রেগে যেতেন। একবার গ্রামের কারো একটা ছাতা ঠিক করেছিলেন। কোনোভাবে দুদিন পর সেটা আবার খারাপ হয়ে গেল। তার জন্য গ্রামের কিছু দুষ্টু ছেলে আর কিছু রসিক মানুষ তাঁর পেছনে লেগে গেলতারা তাঁকে খোঁচাতে শুরু কর— “এই যে ফুটু ভাই, তুই কীরম ছাতা ঠিক করলু? দুদিনেই খারাপ হই গেল!কেউ বল— “ফুটু ভাই মনে হয় ঠিকঠাক ছাতার কাজ জানে না!কেউ আবার আরও একধাপ বাড়িয়ে বলল— “ফুটু ভাই কিস্সু জানে নাএই সব শুনে তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়লেন নিজের সমস্ত সরঞ্জাম নয়ঞ্জলিতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, অভিমানভরা পায়ে হন হন করে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন
 
ফুটু ভাই ধর্মভীরুও ছিলেন। গ্রামের আর পাঁচ জনের মতোই নিয়মিত নামাজ পড়তেন। রোজা করতেন। প্রতি রমজানে নিজের বাবা-মায়ের নামে গোর জিয়ারত করতেন। তখন আমাদের গ্রামে একটা রীতি প্রচলিত ছিল রমজান মাসে লোকজন গোর জিয়ারতের দাওয়াত দিত, আসরের নামাজের পর সবাই মিলে কবরস্থানে গিয়ে মা-বাবা ও অন্য সকল মৃতের জন্য দোয়া করতো, তারপর ফিরে এসে যে বা যারা দাওয়াত দিয়েছিল তাদের বাড়িতে ইফতার করএখন সেই রীতি লোপ পেয়েছে। ইদানীং দিন নির্ধারণ করে নয়, বরং যে যার সুবিধা মতো গোরস্থানে যায়, সকল মাইয়েতের জন্য দুআ করে। আর কে কবে ইফতার করাবে, তারাবিহ্‌র নামাজ শেষে দাঁড়িয়ে দাওয়াত দেয়।
 
একবার ফুটু ভাই গোর জিয়ারতের দাওয়াত দিয়েছিলেন। অভাবের সংসার, বে আন্তরিকতায় কোনো খামতি ছিল না। আদা-কালাই দিয়ে ইফতার, তারপর ক্ষীরমুড়ি, শেষে ডিম-ভাতএই ছিল তার সামর্থ্য মাফিক আয়োজন। আমি তখন কিশানগঞ্জ মাদ্রাসার ছাত্র, রমজানে বাড়ি এসেছি। দাওয়াত পেয়ে আমিও গেলাম। ইফতারের সময় হয়ে গেছে, কিন্তু ইমাম সাহেব কেন জানি আসেননি। একটু অপ্রস্তুত হয়ে ফুটু ভাই আমাকে বললেন— “ভাই, মোলবী সাহেব তো আসিলি না, তুই এনা মোর বাপ-মায়ের নাগিন দু করি দিনা
 
আমি তখন ছাত্র, অল্পবিদ্যার মানুষ, তবু যা জানতাম তাই দিয়ে দু’আ শুরু করলাম। দুআর মাঝে যখন রাব্বির হাম্‌হুমাপড়ে, তার অর্থ বাংলায় বিড়বিড় করে বললাম, ফুটু ভাই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। তাঁর কান্না দেখে অনেকের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। হয়তো তখন তাদের চোখে নিজ মৃত মা-বাবারর স্মৃতি ভর করেছিল।  
 
অভাব ফুটু ভাইয়ের চিরসঙ্গী ছিল। ফলে তাঁর সামান্য যেটুকু জমি ছিল, একসময় তিনি সেটাও বিক্রি করেতে বাধ্য হন। তবে তার মধ্য থেকে কিছু টাকা দিয়ে তিনি মসজিদের জন্য একটা লোহার গেট দান করেছিলেন। বহু বছর তাঁর ওই গেট খুলে শত শত নামাজি মসজিদে ঢুকেছে-বেরিয়েছে। তবে কবছর আগে আমাদের গ্রামের মসজিদটা নতুন করে নির্মিত হয়েছেবেশ বড়সড়, সুন্দর, ঝকঝকে-তকতকে, মোজাইক করা। তাতে নতুন একটা কাঠের গেট লাগানো হয়েছে। আর ফুটু ভাইয়ের দান করা সেই লোহার গেটটা পড়ে আছে এক কোণে, সময়ের প্রবাহে পরিত্যক্ত হয়ে। সেদিন রমজানে তারাবিহ্‌র পর মসজিদ থেকে বেরিয়ে আমরা কজন মসজিদের নানা কাজ নিয়ে গল্প করছি। এমন সময় হারুন মামা কাছে এসে ফুটু ভাইয়ের ওই লোহার গেটটার দিকে ইশারা করে বলল— “লোকটা ভালোবেসে গেটটা দান করেছিল, ওটাকে কোথাও কাজে লাগাতে হবে, মামা”  
 
তার ওই কথায় বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় উঠল। মনে হলো, মানুষটা ধীরে ধীরে স্মৃতি থেকেও হারিয়ে যাচ্ছে। আর তাঁর সেই ভালোবাসার দান পড়ে আছে নীরবে, অযত্নে। মুহূর্তেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো, এই তো সেদিনের কথা—আসরের নামাজের পর মসজিদের বারান্দা পেরিয়ে ফুটু ভাই বেরিয়ে যাচ্ছেন, মাথাটা সামান্য ঝুঁকে, চেনা ভঙ্গিতে হন হন করে হাঁটছেন নিজ বাড়ির পথে ফুটু ভাই চলে গেলেন, পেছনে পড়ে থাকলো বিকেলের এক টুকরো আলো, আর কিছু অপূর্ণ অমলিন স্মৃতি।
 
 হেস্টিংস, কোলকাতা
১০ এপ্রিল ২০২৬

No comments:

Post a Comment