Pages

Wednesday, 29 April 2026

ফাঁসিতলা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 

আমরা তখন খুব ছোট। কেউ প্রাইমারীতে, তো কেউ মক্তবে পড়ি। পানিঝড়ির দিনে, কখনো বা মাগরিবের পরে, আবার কখনো সকালের কোমল মিঠা রোদে, আমরা বাড়ির বাচ্চারা ডেড়িতে, মানে আমাদের বৈঠকখানায় গোল হয়ে বসতাম। আর আমাদের মাঝখানে বসতেন মেজো আব্বা। হাতে তাঁর একটা মাঝারি সাইজের হুঁকো। ধোঁয়ার কুণ্ডলী ধীরে ধীরে উপরে উঠতো, আর সেই সঙ্গে উন্মোচিত হতো গল্পের এক অদ্ভুত ও অজানা জগৎ।
 
মেজো আব্বার গল্প মানেই এক রহস্যময় ভুবনে প্রবেশ। কখনো ভূতের গল্প, যা শুনে শরীর শিউরে উঠত আর মনের ভেতরে ডর ঢুকে পড়তো। আবার কখনো পরীদের গল্প, যা মনে স্বপ্নের রঙ ছড়িয়ে দিত। এছাড়া রাজা-বাদশাদের ঐশ্বর্য, বিন্যাকুড়ির ভূত, মোলানিয়ার কালী, পীরপখরিয়ার পীর, কিংবা ফাঁসিতলার সিন্দুক কত গল্প যে শোনাতেন, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আর আমরা প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনতাম, যেন টু শব্দ হলেই গল্পের জাদু ভেঙে যাবে।
 
একদিন মেজো আব্বা বলছিলেন তাঁর ছোটবেলার কথা। তখন তিনি আমাদের মতোই ছোট। দাদুর সঙ্গে, মানে তাঁর বাবার সঙ্গে প্রায় দিন মানপারের জমিতে যেতেন। তখন মানপারে, ফাঁসিতলার আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল অনেক ভগ্নস্তূপ। কোনোটা দোতলা দালানের ধ্বংসাবশেষ, কোনোটা একতলার, আবার কোথাও বড় কোনো ইঁদারার। সময়ের নির্মম আঘাতে সবকিছুই ভেঙে পড়ে ছিল।
 
ফাঁসিতলাকে ঘিরে আমাদের এলাকায় লোকমুখে কত গল্প যে প্রচলিত আছে, তার কোনো হিসেব নেই। পাশের শহর দিনাজপুর, যা এখন বাংলাদেশের অন্তর্গত। সেখানকার রাজা ছিলেন দিনানাজ, কেউ কেউ বলেন দিনানাথ। বলা হয়, তাঁর তিন রানী ছিল, আর তাঁদের তিনজনের জন্য প্রাসাদের তিন পাশে তিনটি পুকুর খনন করা হয়েছিল। অনেকে মনে করেন, সেই রাজার আস্তাবল, আদালত ও কয়েদখানা ছিল আমাদের এই মানপার-ফাঁসিতলা এলাকাতে। যেহেতু এখানে কয়েদখানা ছিল, তাই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের নাকি এখানেই ফাঁসি দেওয়া হতো। সেই থেকেই নাকি এই জায়গার নাম হয়েছে ‘ফাঁসিতলা’।  
 
শুধু ইতিহাসের কৌতূহল নয়, এই জায়গাকে ঘিরে রহস্যেরও অন্ত নেই। এখানে নাকি রাজার গুপ্তধন লুকানো আছে। কতজন যে কত অদ্ভুত গল্প বলে! কেউ বলে, হাল চাষ করতে গিয়ে হঠাৎ লাঙলের ফাল আটকে গেছে। খুঁড়ে দেখে একটা পীতলের ডেকচি, সোনারূপায় ভর্তি। কিন্তু যেই তুলতে যাবে উধাও! কেউ আবার বলে, সে হাল বাইছিল, এমন সময় পার্শ্ববর্তী ঢিবির মাটি হঠাৎ সরে গিয়ে দেখা দিয়েছে একটা দরজা, আস্তে করে দরজাটা খুলে গেছে, ওপারে চোখ ধাঁধানো রত্নভাণ্ডার, মনিমুক্তায় ভরা। কিন্তু হাত বাড়াতে নিমেষেই দরজা বন্ধ হয়ে মাটিতে সব ঢেকে গেছে।
 
এমন হাজারো গল্প গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে আছে। কেউ কেউ তো স্বপ্নে দেখেছে, এই ধনরত্ন নাকি এখনো গচ্ছিত আছে, কাউকে পাওয়ার অপেক্ষায়। যেন কোনো এক বিশেষ মানুষ জন্মাবে, আর এইসব ধনরত্ন তার হস্তগত হবে। শুনতে শুনতে মনে হতো, আমরা যেন আলিফ লায়লা বা সিন্দাবাদের গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়ছি।
 
তবে এসব কল্পকাহিনীর আড়ালে একটা বাস্তব সত্য লুকিয়ে আছে। এই অঞ্চলে কোনো এক সময় নিশ্চয়ই সমৃদ্ধ কোনো সভ্যতা ছিল। হয়তো দিনানাজ রাজার রাজত্ব, কিংবা পাল রাজাদের সুশাসন। আর এর প্রমাণ যেন চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। কাছেই মহিপাল দীঘি—দ্বিতীয় মহিপাল রাজার খনন করা বিশাল জলাধার। তাছাড়া চণ্ডিপুরের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য পুকুর যেন কোনো কৃষিনির্ভর সমৃদ্ধ জনপদের সাক্ষ্য দেয়।
 
শুধু তাই নয়, সময় সময় এই অঞ্চলে মাটি খুঁড়তে গিয়ে, বা কখনো পুকুরে খনন কাজ করতে গিয়ে পাওয়া গেছে বেশ কিছু অমূল্য নিদর্শন। কখনো পাথরের দামী মূর্তি, যার মূল্য কোটির উপরে, যেগুলো বর্তমানে জেলার যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। তো কখনো মাটির কলসি বা হাড়ি, তাতে রুপোর বা সোনার মুদ্রা। আবার কখনো কড়ি ভর্তি মাটির বারিয়া, যা নিয়ে আমরা ছোটবেলায় খেলা করতাম, যেগুলো প্রাচীন কোনো কালে বিনিময়ের মাধ্যম বা মুদ্রা রূপে ব্যবহার হতো। এসব আবিষ্কার যেন কোনোভাবে জানান দেয়—এই মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এক হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস, এক বিস্মৃত সভ্যতা।
 
আমার মনে আছে, ছোটবেলায় একদিন আমি, বাবলু কাকু, আমু আর সাজ্জেত আমরা আমাদের বৈঠকখানার পাশেই টালির খোলা ছোড়াছুঁড়ি খেলছিলাম। খেলাটার নাম আমাদের অঞ্চলে “টাকা-টাকা”। দেশলাইয়ের ছেড়া খাম ছিল আমাদের টাকা। যেখানে খেলছিলাম তার পাশে একটা ছোট্ট মাটির ঢিবি ছিল। হঠাৎ বাবলু কাকু ঢিবির ওপাশে নিজের খোলাটা ছুড়ে দিল, যাতে কেউ তার নাগাল না পায়। খোলাটা গিয়ে পড়ল ঢিবির একটা ফাটলে, আর “ঠক” করে একটা অদ্ভুত আওয়াজ হলো। আমাদের মধ্যে বয়সে সে ছিল সবচেয়ে বড়। তৎক্ষণাৎ বুঝে গেল, এখানে কিছু একটা আছে। তাড়াতাড়ি মাটি সরাতে শুরু করল। আমরা সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকলাম। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলো একটা ছোট মাটির পাইলা। ভেতরেও মাটি ভর্তি। সেটাকে উপুড় করতেই খনৎ করে একটা শব্দ হল। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে সেটা দ্রুত পকেটে পুরে নিল।
 
আরও মনে পড়ে। বাড়ি ভাগ হওয়ার পর আমাদের পুরনো মাটির ঘরগুলো ভাঙা হচ্ছিল। ঘরগুলো কত পুরনো, কেউই জানত না। অনেকেই মনে মনে আশা করেছিল, খননের সময় হয়তো লুকিয়ে থাকা কোনো ধনসম্পদ বেরিয়ে আসবে। সত্যিই তাই হল, পাওয়া গেল কয়েকটা মাটির হাঁড়ি আর কলসি। কিন্তু সেগুলোতে সোনার বা রুপোর কোনো ঝলক ছিল না। একটাতে মিলল ক’টা তামার মুদ্রা, আর বাকিগুলোতে শুধু কড়ি।
 
আজ যখন অতীতের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, মনে হয়—আমাদের শৈশব শুধু গল্পে ভরা ছিল না, ছিল ইতিহাস আর রহস্যের এক অপূর্ব মিশেল। মেজো আব্বার সেই গল্পগুলো হয়তো নিছক কল্পনা ছিল, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল আমাদের মাটির অতীত, আমাদের শিকড়ের কাহিনী। আর তাই সেই গল্পগুলো আজও আমাদের মনে এক অদ্ভুত টান সৃষ্টি করে। আমাদের ইচ্ছে করে ফিরে যেতে সেই ডেড়ির কোণে। হুঁকোর ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে আবার শুনতে ইচ্ছে করে সেই হারিয়ে যাওয়া দিনের কথা।
 
যদিও এই গালগল্পগুলো অধিকাংশই লোককথার আবরণে মোড়া, তবুও তার ভেতরে কোথাও না কোথাও বাস্তবতার ক্ষীণ রেখা যে লুকিয়ে আছে, তা অস্বীকার করা যায় না। আর সেই কারণেই ইদানীং আশঙ্কা হয়— কিছুদিন আগে যেভাবে ‘ছাওয়া’ সিনেমাটা দেখার পর একদল ভক্ত রায়গড় কেল্লার বাইরে টর্চ, কোদাল, ফাওড়া, এমনকি কেউ কেউ হাতে মেটাল ডিটেক্টর নিয়ে হাজির হয়েছিল, গুপ্তধনের খোঁজে মাটি খুঁড়তে। ঠিক তেমনি এইসব গল্পের টানে যদি ওদের আরেক দল কোনো একদিন ফাঁসিতলায় পৌঁছে যায়, সেই একই মোহে, অদেখা গুপ্তধনের খোঁজে…!  
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
৮ এপ্রিল ২০২৬

No comments:

Post a Comment