Pages

Wednesday, 29 December 2021

তুলাইয়ের তল্লাটে - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


আমি তখন সবে কৈশোরে পা দিয়েছে। মনের গহীনে নিত্যদিন নতুন নতুন আবেগের আনাগোনা, খানিকটা আমার অজান্তেই। সেই বেলায় প্রথম দেখাতেই আমি তার প্রেমে পড়েছিলাম। তবে ‘তাকে ভালোবাসি, বা তার প্রেমে পড়েছি’ এমন কোনো শব্দবন্ধনী আমি কোনোদিন উচ্চারণ করিনিকিন্তু তাকে দেখলেই আমার ভেতরে এক নিঃশব্দ আলো জ্বলে উঠত। সেই আলো হয়তো সে কোনোদিন দেখেনি, কিংবা দেখতে চায়নি। দেখা হলেই সে মুখ ফিরিয়ে নিততার চোখেমুখে এমন এক বিরক্তি ফুটে উঠত, যেন আমার উপস্থিতি তার জীবনে এক অপ্রয়োজনীয় ছায়া।
 
একদিন সাহস সঞ্চয় করে, বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের পিড়াপীড়িতে তাকে কিছু বলতে চেয়েছিলাম। পেছন থেকে ডেকেওছিলাম, কিন্তু সে থামেনি। হাঁটতে হাঁটতে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিল, তার শোনার কিছুই নেই। এই সংক্ষিপ্ত প্রত্যাখ্যান বহুদিন ধরে আমার মনে ঘুরে বেড়িয়েছেঅপূর্ণতার মতো, প্রশ্নের মতো।
 
এর কিছুদিন পরেই তার বিয়ে হয়ে গেল এলাকার এক প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে। সম্পদ আর ক্ষমতার দরুন লোকটার বাড়ি সর্বদা লোকে লোকারণ্য হয়ে থাকতোবিয়ের দিন উঠোন কানায় কানায় ভরে উঠেছিল। পাড়ার মানুষ বলাবলি করছিলএমন ঘরে বউ হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার  
 
সেদিন আমি কিছুই বলিনি। বেলা গড়াতেই গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম তুলাই নদীর পাড়ে। বর্ষার নদী ফুলে উঠেছিলস্রোত ছিল অস্থির, শব্দ ছিল তীব্র। নদীর গর্জনের ভেতরেও নিজের বুকের ভারী শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। অপমান, হাহাকার আর অজস্র প্রশ্ন নিঃশব্দে আমাকে গ্রাস করছিল। সন্ধ্যার আগেই স্থির করেছিলামএই পাড়া, এই জনপদ, এই মানুষজন, এমনকি এই নদীকেও পেছনে ফেলে আমি চলে যাবো, দূরে কোথাও  
 
আমি চলে গেছিলাম কাউকে কিছু না জানিয়েদূরের শহরগুলোতে আমি ছিলাম এক নামহীন মানুষকখনো শ্রমিক, কখনো রাজমিস্ত্রী, কখনো জোগাড়ি, কখনো রিকশাওয়ালা, কখনো দোকানের কর্মচারী, কখনো কেবল ভিড়ের অংশ। কেউ কখনো আমার পরিচয় জানতে চাইলে শুধু বলতামনদীর ধারে আমার বাড়ি। এর বেশি কিছু নয়।
 
এভাবেই কেটে গেল দশটি বসন্ত, দশটা বর্ষা। একদিন মনে হলোআর কত দূর, আর কত দিন? তখনই ফেরার ব্যাপারে মনঃস্থির করলাম। এবং একদিন ফিরেও এলাম, ঠিক যেমন করে নিঃশব্দে চলে গেছিলাম। আমার ফেরায় পাড়ায় নতুন করে কৌতূহল জেগে উঠল, লোকজনের মুখে ছিল নানা প্রশ্ন। আমি ধীরে ধীরে এমনভাবে উত্তর দিতে শুরু করলাম, যাতে আর কোনো প্রশ্ন না আসে। শেষে একদিন বলেই ফেললামআমি কোথাও যাইনি, শুরু থেকে এখানেই ছিলাম। লোকজন প্রথমে বিস্মিত হলেও ধীরে ধীরে সেই কথাকেই সত্য বলে মেনে নিল। স্মৃতির দায় ঝেড়ে ফেলা সকলের জন্য সহজ ছিল, বোধ করি  
 
এরপর আমার বিয়ে হলো। স্ত্রীর প্রতি আমার ভালোবাসা ছিল গভীরসন্তান হওয়ার কথা উঠলে আমি নিরুত্তর থাকতাম। পরে জানা গেলসে কোনোদিন মা হতে পারবে না। তবু আমি তাকে ছেড়ে যাইনি। পাড়াপড়শি, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের নানা উপদেশের উত্তরে নীরব থেকেছি, কিংবা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিযা আছে, তাই যথেষ্ট।
 
আমাদের বাড়ির পেছনে ছিল ছোট্ট একটা বাগান। তাতে তিনটা ফলের গাছ ছিলনিয়ম করে আমি ও আমার স্ত্রী সেগুলোর যত্ন নিতাম, কিন্তু কখনো ফল পাড়তাম না। সেগুলোতে কুঁড়ি আসতো, ফল ধরতো, পাকতো, আবার একদিন শুকিয়ে মাটিতে পড়ে যেতোশরৎ আর শীতে মন ভারী হয়ে উঠত আমাদের, বসন্তে কিছুটা হালকা লাগতযেন আবার নতুন করে বাঁচার উপকরণ পেয়েছি
 
কিন্তু একদিন ভোরে ফজরের নামাজ পড়ে ফেরার পথে দেখলামতিনটা গাছই লণ্ডভণ্ড, সব ফল চুরি হয়ে গেছে, ডালপালা ভেঙ্গে তছনছ আর এসব দেখে আমার স্ত্রী হাউমাউ করে কাঁদতে আরম্ভ করলো। তার কান্নাকাটি আমাকে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিয়েছিল। মনে হয়েছিলআমি আবার কোনো সন্তানের মৃত্যু দেখছি।
 
এর কিছুদিন পর, খদ্দের ডেকে অল্প দামে বাড়িটা বিক্রি করে দিলাম। জানতে পেরে পাড়াপড়শি ছুটে এলো, জিজ্ঞেস করতে লাগল—কোথায় যাবে, কী করবে? সেদিন তাদের এসব প্রশ্নের উত্তরে শুধু বলেছিলাম, যেখানে নদী থাকে। তারপর একদিন কাকভোরে স্ত্রীর হাত ধরে বেরিয়ে পড়লাম। পাড়ার শেষ প্রান্তে এসে একটু থামলাম। সামনে তুলাই নদী তখন শান্ত। জল ধীরে ধীরে বয়ে চলেছেযেন সাগরে পৌঁছানোর কোনো তাড়াহুড়ো নেই তার, যেন যাত্রাপথ নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো আশংকাও নেই।
 
আমি এখন তুলাই থেকে বহু দূরে, বাস করি এক পাথুরে উপত্যকায়এখানেও পাশেই একটা নদী আছে, তুলাইয়ের চেয়ে ঢের বড় ও বিশাল, তবে তার স্রোতে ঘৃণার পরিমাণ বেশি, তার উচ্ছ্বাসে বিদ্বেষ উতলে উঠে মুহুর্মুহু। আমার আর কখনো ফেরা হয়নি তুলাইয়ের তল্লাটে লোক মারফৎ জেনেছি, পাড়ার লোকজন কেউ কেউ মাঝে মাঝে আমার কথা বলে। কেউ কেউ আমার নাম শুনে ভ্রূ কুঁচকোয়, যেন কিছুই মনে করতে পারছে না। আবার কেউ কেউ বলে, ও নামের এই এলাকাতেই কেউ ছিল না। কিন্তু তুলাই নদী, নীরবে বয়ে যেতে যেতে হয়তো আজও ভাবেএত এত বিদায়ের শব্দ নদীর জলে তাহলে কে ফেলে গেছে…!  
 
বাঁশকুড়ি, দক্ষিণ দিনাজপুর
২৭ ডিসেম্বর ২০২১

Monday, 20 December 2021

আল-কুরআনের ভাবানুবাদঃ (৭৫) সূরাতু আল-কেয়ামাহ (মহাপ্রলয় ও পুনরুত্থান)



৭৫) সূরাতু আল্‌-ক়েয়ামাহ্‌ (মহাপ্রলয় ও পুনরুত্থান) 

মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত ৪০, রুকু’ ২  

بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيمِ

আল্লাহ্‌র নামে (শুরু করছি); তিনি পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু।
 

لَا أُقْسِمُ بِيَوْمِ الْقِيَامَةِ

আমি শপথ করছি প্রলয় ও পুনরুত্থান দিবসের,

وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ اللَّوَّامَةِ

আরও শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার (যে আত্মা ভুলভ্রান্তির পর নিজের সমালোচনা করে এবং নিজেকে তিরস্কার করে)—

أَيَحْسَبُ الْإِنسَانُ أَلَّن نَجْمَعَ عِظَامَهُ

মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারবো না?

بَلَى قَادِرِينَ عَلَى أَن نُّسَوِّيَ بَنَانَهُ

পরন্তু আমি তো তার আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত সঠিক ভাবে পুনর্বিন্যস্ত ও সন্নিবেশিত করতে সক্ষম।

بَلْ يُرِيدُ الْإِنسَانُ لِيَفْجُرَ أَمَامَهُ

তবুও মানুষ ভবিষ্যত জীবনেও ধৃষ্টতা করতে চায়

يَسْأَلُ أَيَّانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ

সে প্রশ্ন করে— কেয়ামত ও পুনরুত্থান কবে হবে?

فَإِذَا بَرِقَ الْبَصَرُ

(পুনরুত্থান হবে) যখন দৃষ্টি চমকে যাবে,

وَخَسَفَ الْقَمَرُ

চন্দ্র জ্যোতিহীন হয়ে পড়বে,

وَجُمِعَ الشَّمْسُ وَالْقَمَرُ

এবং সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে-

يَقُولُ الْإِنسَانُ يَوْمَئِذٍ أَيْنَ الْمَفَرُّ

সেদিন মানুষ বলবে— আজ পালাবার জায়গা কোথায়?

كَلَّا لَا وَزَرَ

না, কোথাও কোনো আশ্রয়স্থল নেই।

إِلَى رَبِّكَ يَوْمَئِذٍ الْمُسْتَقَرُّ

তোমার প্রভুর কাছেই সেদিন দাঁড়াতে হবে।

يُنَبَّأُ الْإِنسَانُ يَوْمَئِذٍ بِمَا قَدَّمَ وَأَخَّرَ

সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে সামনে কী প্রেরণ করেছে এবং পশ্চাতে কী ছেড়ে এসেছে।

بَلِ الْإِنسَانُ عَلَى نَفْسِهِ بَصِيرَةٌ

বরং মানুষ নিজেই তার নিজের সম্পর্কে চক্ষুষ্মান ও সাক্ষী হবে (অর্থাৎ তার প্রতিটি অঙ্গ তার সম্পাদিত কর্মের খতিয়ান পেশ করবে)।

وَلَوْ أَلْقَى مَعَاذِيرَهُ

যদিও সে (নিজ মিথ্যাচার ও পাপাচারিতা ঢাকতে) তার নানা ধরণের অজুহাত পেশ করতে চাইবে।

لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ

(হে মুহাম্মদ সাঃ) তাড়াতাড়ি শিখে নেওয়ার জন্য তুমি দ্রুত ওহী (অর্থাৎ আল্‌-কুর্‌আন) আবৃত্তি করো না।

إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ

এর সংরক্ষণ ও পাঠ আমারই দায়িত্ব।

فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ

অতঃপর আমি যখন তা পাঠ করি (অর্থাৎ আমার তরফ থেকে জিব্‌রাইল আঃ পাঠ করে), তখন তুমি সেই পাঠের অনুসরণ করো।

ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ

আর এর বিশদ ব্যাখ্যা ও বর্ণনারও দায়িত্ব আমারই।

كَلَّا بَلْ تُحِبُّونَ الْعَاجِلَةَ

কখনই না, বরং তোমরা পার্থিব জীবনকে (অধিক) ভালবাসো

وَتَذَرُونَ الْآخِرَةَ

এবং পরকালকে উপেক্ষা কর।

وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَّاضِرَةٌ

সেদিন অনেক মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে।

إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ

তারা নিজ পালনকর্তার দিকে তাকিয়ে থাকবে।

وَوُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ بَاسِرَةٌ

এবং অনেক মুখমণ্ডল সেদিন উদাস ও বিবর্ণ হবে।

تَظُنُّ أَن يُفْعَلَ بِهَا فَاقِرَةٌ

এই আশঙ্কায় যে, তাদের সাথে কোমর-ভাঙ্গা আচরণ করা হবে।

كَلَّا إِذَا بَلَغَتْ التَّرَاقِيَ

কখনই না, যখন প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে।

وَقِيلَ مَنْ رَاقٍ

এবং বলা হবে, কে (তাকে) রোগমুক্ত করবে (অর্থাৎ কে তাকে মৃত্যু থেকে রক্ষা করতে পারবে)?

وَظَنَّ أَنَّهُ الْفِرَاقُ

এবং সে মনে করবে যে, তার বিদায়ের ক্ষণ এসে গেছে।

وَالْتَفَّتِ السَّاقُ بِالسَّاقِ

এবং পায়ের গোছার সাথে গোছা জড়িয়ে যাবে (অর্থাৎ মৃত্যুযন্ত্রণার সাথে পারলৌকিক জীবনের অনিশ্চয়তার উদ্বেগ তাকে আষ্টেপিষ্টে ধরবে)।

إِلَى رَبِّكَ يَوْمَئِذٍ الْمَسَاقُ

সেদিন, তোমার পালনকর্তার নিকট সবকিছু নিয়ে যাওয়ার দিন।

فَلَا صَدَّقَ وَلَا صَلَّى

সে তো (পার্থিব জীবনে) না বিশ্বাস করেছিল আর না নামায পড়েছিল;

وَلَكِن كَذَّبَ وَتَوَلَّى

পরন্তু (জীবনভর) মিথ্যারোপ করেছে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছে।

ثُمَّ ذَهَبَ إِلَى أَهْلِهِ يَتَمَطَّى

অতঃপর দম্ভ ভরে পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে গেছে।

أَوْلَى لَكَ فَأَوْلَى

এই দুর্ভোগ তোমারই জন্য প্রযোজ্য।

ثُمَّ أَوْلَى لَكَ فَأَوْلَى

হ্যাঁ, তুমিই এর হকদার আর এটাই তোমার প্রাপ্য।

أَيَحْسَبُ الْإِنسَانُ أَن يُتْرَكَ سُدًى

মানুষ কি মনে করে যে, তাকে এমনি নিরর্থক ছেড়ে দেয়া হবে (স্রষ্টার আদেশ মান্য করার পুরস্কার এবং অমান্য করার কোনো শাস্তি তাকে দেওয়া হবে না)?

أَلَمْ يَكُ نُطْفَةً مِّن مَّنِيٍّ يُمْنَى

সে কি (নারী ও পুরুষের) স্খলিত বীর্যের শুক্রবিন্দু ছিল না?

ثُمَّ كَانَ عَلَقَةً فَخَلَقَ فَسَوَّى

অতঃপর সে ছিল রক্তপিণ্ড, তারপর আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন এবং সুঠাম ও সুবিন্যস্ত করেছেন।

فَجَعَلَ مِنْهُ الزَّوْجَيْنِ الذَّكَرَ وَالْأُنثَى

অতঃপর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন জোড়া জোড়া নর ও নারী।

أَلَيْسَ ذَلِكَ بِقَادِرٍ عَلَى أَن يُحْيِيَ الْمَوْتَى

তবুও কি তিনি মৃতদেরকে পুনর্জীবিত করতে সক্ষম নন?! 

ভাবানুবাদ- আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

Sunday, 5 December 2021

জারীর বিন আতিয়্যাহ্‌ আত্‌-তামীমীঃ ছায়া সুনিবিড়

 
ছায়া সুনিবিড়
জারীর বিন আতিয়্যাহ্‌ আত্‌-তামীমী
 
খলিফা উমার বিন আব্দুল আজিজ (রাহঃ ৭১৭ – ৭২০ খ্রি) ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি। তাঁর সততা, সংযমশীলতা, আল্লাহ্‌-ভীতি ও ন্যায়পরায়ণতার কারণে তাঁকে পঞ্চম সৎ খলিফা ও দ্বিতীয় উমার নামে আখ্যায়িত করা হয়। তিনি বায়তুল-মাল (রাজকোষাগার)-এর রক্ষক ছিলেন। মুসলিম রাজস্বের বিন্দু মাত্র অপচয় সহ্য করতেন না। তাই তিনি খেলাফত লাভের পর কবিকূলের পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করে দেন। আর তাঁর এই সিদ্ধান্তে কবিরা অসহায় হয়ে পড়ে। অতঃপর তারা সকলে মিলে তাঁর কার্যালয় ও গৃহের সামনে প্রবেশের অনুমতি লাভের আশায় দীর্ঘ দিন যাপন করে, কিন্তু কোনো সুফল তাঁদের বরাতে জোটেনি। কারণ তিনি কবিদের প্রেমমূলক কবিতা, প্রশংসায় অতিরঞ্জন ইত্যাদি খুবই অপছন্দ করতেন। তাই এমন একটা কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অবশেষে কবি জারির অনুমতি না পেয়ে এই কবিতার মাধ্যমে খলিফার কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছিলেন।
 
ইয়ামামাতে অনেক অভাবী ও এলোকেশী বিধবা রয়েছে এবং এমন অনেক অনাথ রয়েছে, (অভাব-অনাহারে) যাদের কণ্ঠস্বর এবং দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
 
ওই অনাথ ও অসহায় লোকেরা তাদের পিতৃহারার অভাব মেটানোর ক্ষেত্রে আপনাকে যথেষ্ট বলে মনে করে। তারা সেই পক্ষীশাবকের ন্যায়, যে নীড়ে (মায়ের আনা খাবারের অপেক্ষায়) থাকে, ডানা মেলতে পারে না, উড়তেও পারে না।
 
তারা আপনাকে অসহায় ব্যক্তির মতো করে (করুণ স্বরে) ডাকে, যেন তারা জ্বিনের প্রভাবে পাগলপ্রায় অথবা মানুষের চক্রান্তে আক্রান্ত ও দিশেহারা ।
 
(অতঃপর কবি খলিফাকে সম্বোধন করে বলছেন,) যখন মেঘ আশানুরূপ বৃষ্টি বর্ষণ করে না, তখন আমরা খলিফার কাছে আশা করি যে-রূপ অনুগ্রহ আমরা বৃষ্টির কাছে আশা করেছিলাম।
 
তিনি খেলাফতে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, যা তাঁর ভাগ্যে নির্ধারিত ছিল। যেমন মুসা (আঃ) নিজ প্রভুর কাছে এসেছিলেন, যা তাঁর ভাগ্যে (লেখা) ছিল।
 
এই বিধবাদের অভাব, এদের প্রয়োজন সব আপনিই পূরণ করেছেন। তাহলে এই বিপত্নীকের অভাব-অনটনের কথা (আপনি ছাড়া) আর কে মনে রাখবে?! 

অনুবাদ- আব্দুল মাতিন ওয়াসিম 



كم باليمامة من شعثاء
جرير بن عطية التميمي

كم باليمامة من شعثــــــاء أرملة            ومن يتيم ضعيف الصـــــوت والنظر

ممن يَعُدُّك تكفي فقد والده               كالفرخ في العش لم ينهض ولم يطرِ

يدعوك دعوة ملهوف كأن به             خبلاً من الجن أو مساً من البشرِ

إِنا لنرجو إِذا ما الغيث أخلفنا            من الخليفة ما نرجو من المطرِ

أتى الخلافة إِذ كانت له قدراً             كما أتى ربه موسى على قدرِ

هذي الأرامل قد قضيت حاجاتها         فمن لحاجة هذا الأرمل الذكـرِ

Saturday, 4 December 2021

ফারাজদাকঃ সবাই তাঁকে চেনে

 

সবাই তাঁকে চেনে

ফ়ারাজ়্দাক়

[একদা আলি যাইনুল আবেদিন কাবা ঘরের প্রদক্ষিণ করছিলেন। এমন সময় শ্রদ্ধাভরে জনসাধারণ তাঁর পথ প্রশস্ত করে দিচ্ছিল। এসব দেখে খলীফা হিশাম বিন আব্দুল মালিক অবজ্ঞার স্বরে জিজ্ঞেস করেন— ব্যক্তিটি কে? তারই উত্তরে কবি ফ়ারাজ়্দাক় যাইনুল আবেদিনের প্রশংসায় উক্ত কবিতাটি রচনা করেন।]

ইনি সেই ব্যক্তি যার পদক্ষেপকে চেনে (মক্কার) প্রশস্ত উপত্যকা, চেনে (পবিত্র) কাবা শরীফ এবং (মক্কা ও মদিনার) হালাল ও হারাম এলাকাও চেনে।

তিনি সমগ্র সৃষ্টিকূলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি (নবী সাঃ)-এর বংশধর। তিনি আল্লাহভীরু ও সংযমশীল, নির্মল চরিত্রের অধিকারী, পুতঃপবিত্র এবং নেতৃস্থানীয়।

কোরায়েশরা যখন তাঁকে দেখে, তখন তাদের কথক বলে— এঁর মহৎ গুণাবলীর কাছে গিয়ে সমস্ত মাহাত্ম্য শেষ হয়ে গেছে (অর্থাৎ তাঁর মর্যাদার উচ্চতাকে কেউ অতিক্রম করতে পারবে না)।

তিনি সম্মানের এমন উচ্চতায় আরোহণ করেছেন, যে-উচ্চতা অর্জনে আরব-অনারব সকল মুসলিম অক্ষম ও অপারগ হয়ে পড়েছে।

যখন তিনি দূর থেকে (হাজ্‌রে আস্‌ওয়াদকে) চুমু খাওয়ার মনঃস্থির করেন তখন হাতিমের রুকন অর্থাৎ হাজরে ইস্‌মায়িল তার হাতের কল্যাণ (অর্থাৎ তাঁর দানশীলতা)-এর কারণে তাকে সেখানে যেন আটকে রাখে।

তাঁর হাতে কল্যাণের এক উৎস রয়েছে, যার মুনাফা ও কল্যাণ ছড়িয়ে পড়েছে কল্যাণময় হাত থেকেই; আর তাঁর নাকে একটা উঁচু অংশ আছে অর্থাৎ তিনি সম্ভ্রান্ত।

তিনি লজ্জায় দৃষ্টি অবনত রাখেন এবং (তাঁর সামনে) তাঁর ভয়ে দৃষ্টি অবনত রাখা হয় (এবং তাঁর জন্য স্থান প্রশস্ত করে দেওয়া হয়), তিনি মুখে মৃদু হাসি ছাড়া কথা বলেন না।

তাঁর শুভ্র ললাট হতে হেদায়েত ও সুপথের আলো নির্গত হয়ে বেরিয়ে আসে, যেমন সূর্য উদয় হলে মেঘাচ্ছন্ন অন্ধকার কেটে যায়।

তাঁর বংশ লতিকা আল্লাহ্‌র রাসূল (মুহাম্মদ সাঃ) হতে নির্গত হয়েছে। ফলে বংশ কৌলীন্যে ও স্বভাব-চরিত্রে তিনি উত্তম ও উৎকৃষ্ট।

আপনার অবজ্ঞা ভরা প্রশ্ন, ইনি কে? তাঁর কোনো ক্ষতি করবে না, আপনি যাকে চিনতে অস্বীকার করেছেন, তাঁকে আরব-অনারব সকলেই চেনে।

তাঁর উভয় হাতই সাহায্যকারী, তিনি অবিরাম দান করেন, ফলে তাঁর উপকার (সকলকে) ব্যপ্ত হয়েছে, তবে কখনই দারিদ্র্য তাঁর হাতকে স্পর্শ করে না।

স্বভাবগত ভাবে তিনি সহজ সরল, তাঁর থেকে কোনোরকম উগ্র আচরণের আশঙ্কা নেই। দু’টি বিষয় তাঁকে (ও তাঁর ব্যক্তিত্বকে) আরও সুন্দর করে তুলেছে— তাঁর সচ্চরিত্র ও জন্মগত স্বভাব।

তিনি শাহাদাৎ পাঠ করার সময় ছাড়া আর কখনো ‘না’ শব্দটি উচ্চারণ করেননি, যদি তাশাহ্‌হুদ অর্থাৎ শাহাদাৎ পাঠ করার বিষয়টি না থাকতো তাহলে তাঁর ‘না’ শব্দটিও ‘হ্যাঁ’-এ পরিণত হতো।

তাঁর সদয়তা, অনুগ্রহ ও উপকার সমগ্র সৃষ্টিকূলের উপর ব্যপ্ত হয়েছে; আর তাই (তাঁর) সমাজ থেকে অন্ধকার, রিক্ততা ও দারিদ্র্য সব দূরে সরে গেছে।

অনুবাদ- আব্দুল মাতিন ওয়াসিম 

 

هَذا الّذي تَعرِفُ البَطْحاءُ وَطْأتَهُ

الفرزدق همام بن غالب التميمي

قال يمدح سيدنا عليا زين العابدين حين سأل عنه الخليفة هشام بن عبد الملك وقد رآه يطوف بالكعبة ورأى إجلال الناس له فتجاهل معرفته وقال من هذا؟
 
هَذا الّذي تَعرِفُ البَطْحاءُ وَطْأتَهُ          وَالبَيْتُ يعْرِفُهُ وَالحِلُّ وَالحَرَمُ

هذا ابن خير عباد الله كلهم              هذا التّقيّ النّقيّ الطّاهِرُ العَلَمُ

إذا رَأتْهُ قُرَيْشٌ قال قائِلُها:                إلى مَكَارِمِ هذا يَنْتَهِي الكَرَمُ

يُنمى إلى ذروة العزّ التي قصُرتْ        عن نيلها عرب الإسلام والعجم

يَكادُ يُمْسِكُهُ عِرْفانَ رَاحَتِهِ                رُكْنُ الحَطِيمِ إذا ما جَاءَ يَستَلِمُ

بِكَفّهِ خَيْزُرَانٌ رِبْحُهُ عَبِقٌ                 من كَفّ أرْوَعَ، في عِرْنِينِهِ شمَمُ

يُغْضِي حَياءً وَيُغضَى من مَهابَتِه         فَلا يُكَلَّمُ إلاّ حِينَ يَبْتَسِمُ

يَنْشَقّ نور الهدى عن نورِ غرّتِهِ          كالشمس تَنجابُ عن إشرَاقِها الظُّلَمُ

منشقة مِنْ رَسُولِ الله نَبْعَتُهُ               طَابَتْ عناصره والخِيمُ وَالشّيَمُ

وَلَيْسَ قَوْلُكَ: مَن هذا؟ بضَائرِه            العُرْبُ تَعرِفُ من أنكَرْتَ وَالعَجمُ

كِلْتا يَدَيْهِ غِيَاثٌ عَمَّ نَفعُهُمَا               تسْتَوْكَفانِ وَلا يَعرُوهُما عَدَمُ

سَهْلُ الخَلِيقَةِ، لا تُخشى بَوَادِرُهُ            يَزِينُهُ اثنانِ: حُسنُ الخَلقِ وَالشّيمُ

ما قال: لا قطُّ إلاّ في تَشَهُّدِهِ              لَوْلا التّشَهّدُ كانَتْ لاءَهُ نَعَمُ

عَمَّ البَرِيّةَ بالإحسانِ فانْقَشَعَتْ             عَنْها الغَياهِبُ والإمْلاقُ والعَدَمُ 

Wednesday, 1 December 2021

সালিম বিন ওয়াবিসাহঃ যে-পথে শত্রু মিত্র হয়ে যায়


 
যে-পথে শত্রু মিত্র হয়ে যায়
সালিম বিন্‌ ওয়াবিসাহ্‌ (দীওয়ানুল্‌ হামাসাহ্‌)
 
আমার অসৎ বন্ধুদের মধ্যে কিছু এমন নিন্দুক ও হিংসুক আছে, যারা আমার মাংস কেটে কেটে খায় (অর্থাৎ আমার গীবত করে, আমার অনুপস্থিতিতে আমার নিন্দা করে)। আর এই মাংস ভক্ষন তাদেরকে সুস্থ ও তৃপ্ত করে না (অর্থাৎ তাদের কোনো রকম উপকারে আসে না)।
 
যে বুকের গভীরে হিংসা ও বিদ্বেষ (জমে) আছে, তার চিকিৎসা আমি দীর্ঘদিন ধরে (সুকৌশলে) করেছি, যেভাবে আমরা বিনা কাঁচিতে নখ কাটি।
 
আমি তা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে উত্তম পন্থায় সম্পাদন করেছি, এবং তাদের মনে আল্লাহ্‌ভীতি সঞ্চার করেছি যতক্ষন না তারা সুসম্পর্ককে গুরুত্ব দিতে আরম্ভ করে।
 
ফলস্বরূপ, তারা তাদের ধনুক আমি ব্যতীত (অন্যের প্রতি) প্রস্তুত করে রেখেছে (অর্থাৎ এখন তাদের টার্গেট আমি নই, বরং আমার শত্রুরা)। তারা (এখন) প্রকাশ্যে, কোনোরকম রাখঢাক না করেই আমার শত্রুদের প্রতি বাক্যবাণ নিক্ষেপ করে।
 
নিঃসন্দেহে ধৈর্য ও সহনশীলতার মধ্যেও (সুপ্ত) অপমান রয়েছে (অর্থাৎ ধৈর্য রেখেও অপমান করা যায়), তুমি তা (ভালোভাবেই) জানো। আর সক্ষম অবস্থায় সহনশীলতা একটি মহৎ ও শ্রেষ্ঠ গুণ।

অনুবাদ- আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


ونيرب من موالي السوء

سالم بن وابصة (ديوان الحماسة لأبي تمام)


ونيرب من موالي السوء ذي حسد        يقتات لحمي وما يشفيه من قرم

داويت صدراً طويلاً غمره حقداً           منه وقلمت أظفاراً بلا جلم

بالحزم والخير أسديه وألحمه              تقوى الإله وما لم يرع من رحمي

فأصبحت قوسه دوني موترةً              يرمي عدوى جهاراً غير مكتتم

إن من الحلم ذلاً أنت عارفه              والحلم عن قدرة فضل من الكرم