Pages

Showing posts with label জীবন. Show all posts
Showing posts with label জীবন. Show all posts

Monday, 7 September 2026

মাটির ঢিবির ওপারে - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



দিন ধরে বড়আব্বা খুব অসুস্থ। তাই সারাক্ষণ বাড়িতে মানুষের আনাগোনা লেগে আছেডাক্তার আসছেন, ওষুধপত্র চলছে, স্যালাইন ঝুলছে। আত্মীয়স্বজন একে একে খোঁজ নিতে আসছেন। কেউ ফল নিয়ে আসছেন, তো কেউ মিষ্টি নিয়ে; কেউ বড়আব্বার পাশে বসে খবর নিচ্ছেন, তো কেউ নীরবে দোয়া করে ফিরে যাচ্ছেন। বাড়ির বড়দের চোখেমুখে উৎকণ্ঠা, কথাবার্তায় চাপা গাম্ভীর্যসবকিছু মিলিয়ে ঘরের পরিবেশ ছিল অদ্ভুত এক ভারে ভরা।

 

আমি তখন খুবই ছোট। সম্ভবত তখনো আমার স্কুলিং শুরু হয়নি। সবকিছুই খুব আবছা আবছা মনে পড়ে যেহেতু আমরা ছোট ছিলাম, অত শত বুঝতাম না। আমাদের চোখে তখন না অসুস্থতার ভয় ছিল, না মৃত্যুর আশঙ্কাবরং আত্মীয়স্বজনদের আসা-যাওয়ার মধ্যে নতুন নতুন ফল আর মিষ্টি পাওয়াটাই ছিল যেন সবচেয়ে আনন্দের বিষয়। কে কী নিয়ে এল, কোন ফলটা বেশি মিষ্টি, কোন মিষ্টিটা আগে খাওয়া হবেআমাদের ছোট্ট পৃথিবীটা ঘুরপাক খেত এসব নিয়েশিশুমন বোধহয় এমনই; সে মৃত্যুর আগমনী সুর শুনতে পায় না, ভবিষ্যতের শূন্যতা দেখতে পায় না। সে কেবল বর্তমানের সামান্য আনন্দটুকুকেই দুহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে রাখে।

 

তিন-চার দিনের মাথায় একদিন সন্ধ্যাবেলা, মাগরিবের আজানের সময়, বড়আব্বা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আজানের সুমধুর ধ্বনি যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল, ঠিক সেই সময় আমাদের ঘরের ভেতর হঠাৎ কান্নার রোল উঠল। মুহূর্তের মধ্যে যেন সবকিছু বদলে গেল। যে বাড়িতে কিছুক্ষণ আগেও মানুষের আসা-যাওয়া, কথাবার্তা, ব্যস্ততা ছিল; সেখানে আচমকাই নেমে এলো শোকের এক গভীর অন্ধকার। চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে গেল। পাড়াপড়শিরা ছুটে এলেন। আত্মীয়স্বজনদের খবর দেওয়ার তোড়জোড় শুরু হলো। বাড়ির বড়রা একাট্টা হয়ে নানা বিষয়ে আলোচনা করতে লাগলেন। সিদ্ধান্ত হলোপরদিন যোহরের নামাজের পর বড়আব্বাকে দাফন করা হবে।

 

পরদিন সকাল থেকেই আমাদের বাড়িতে যেন মানুষের ঢল নেমে এল। উঠোন, বারান্দা, বৈঠকখানাযেদিকেই তাকাই, শুধু মানুষ আর মানুষ। কারও চোখে পানি, কারও মুখে শোকের ছাপ, কেউ নিচুস্বরে কথা বলছেন, কেউ কুরআন তিলাওয়াত করছেন। আর আমরা ছোটরা সেই বিশাল শোকের ভেতর দাঁড়িয়ে থেকেও যেন পুরো ঘটনাটামানে বুঝতে পারছিলাম না।

 

মেজোআম্মা আমাদেরকে বড় ঘরটায় আগলে রেখেছিলেন। বড়দের কড়া নির্দেশ ছিলছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কেউই গোরস্থানে যাবে না। আমাদের বলা হয়েছিল, বড়রা ফিরে আসা পর্যন্ত আমরা যেন ঘরেই থাকিসেদিন হয়তো প্রথমবারের মতো বুঝতে না পেরেও অনুভব করেছিলামকিছু একটা চিরতরে বদলে গেছে। কিন্তু মৃত্যু যে কীভাবে বড়আব্বাকে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, তা তখনও বুঝিনি।

 

মাঝে কয়েক সপ্তাহ অতিক্রান্ত হয়েছেএকদিন আব্বার সঙ্গে শাটিমারি হাটে গেলাম। ফেরার পথে আমরা কবরস্থানের মাঝ বরাবর রাস্তা দিয়ে আসছিলামহঠাৎ আব্বা থেমে গেলেন। কোনো কথা না বলে নিজের জুতো জোড়া খুললেন। তারপর আমার ছোট্ট জুতোজোড়াও খুলে দিলেন। আমি অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। তিনি আমার হাত ধরে কবরস্থানের ভেতরে এগিয়ে গেলেন। তারপর একটি মাটির ঢিবির সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বললেন

সালাম দাও।

আব্বা’র সাথে সাথে আমিও বললামআসসালামু আলাইকুম ইয়া আহ্‌লাল কুবুর... (হে কবরবাসী, তোমাদের উপর শান্তি ও করুণা বর্ষিত হোক…!)

তারপর আব্বা মাটির ঢিবিটার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত, অথচ কেমন যেন এক ভার গলায় বললেন,

—“এটা তোমার বড়আব্বার কবর। তিনি এখানেই শুয়ে আছেন।

 

আমি মাটির ঢিবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। বড়আব্বা, যিনি আমাকে আদর করতেন, কেউ আমাদের বকা দিলে তিনি পাল্টা তাকেই বকা দিতেন, আমাদের জন্য প্রায় দিন হাট থেকে জিলাপি-শিঙ্গাড়া নিয়ে আসতেন, এই সামান্য মাটির ঢিবির নিচে কীভাবে শুয়ে আছেনআমার শিশুমন কোনোভাবেই তার উত্তর খুঁজে পাচ্ছিল না।

 

আব্বা দুহাত তুলে মোনাজাত শুরু করলেন। বড় ভাইয়ের জন্য তাঁর কণ্ঠে ছিল গভীর আকুতি। কথাগুলো আমি বুঝতাম না, কিন্তু তাঁর কণ্ঠের আকুতি, কান্না ও কম্পন কিছুটা বুঝতে পারছিলাম। আমিও আমার ছোট্ট দুহাত তুলে তাঁর সাথে দুআতে শামিল হলাম আর মাঝে মাঝে বলতে থাকলাম—“আমীন... আমীন...

 

হঠাৎ আমার চোখে পড়লমোনাজাত করতে করতে আব্বার দুগাল বেয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সেই দৃশ্যটি আমার শৈশবের স্মৃতিতে আজও অমলিন। একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে কত গভীরভাবে ভালোবাসতে পারে, তার প্রথম পাঠ আমি সেদিন আমার আব্বার চোখের জল থেকে পেয়েছিলাম।

 

মোনাজাত শেষে আমরা বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটছি আর আমার শিশুমনের ভেতর যেন একের পর এক প্রশ্ন দরজা খুলে হুমড়ি কাটছেবড়আব্বা কি আমার সালাম শুনেছেন? তিনি কি আমাকে দেখতে পেয়েছেন? তিনি আমাকে আদর করলেন না কেন? হাট থেকে আর কোনোদিন কি তিনি আমার জন্য জিলাপি আনবেন না? 

 

আব্বা নীরবে হাঁটছিলেন। হয়তো তাঁর বুকের ভেতর তখনও ভাই হারানোর শোক তাজা। আর তাঁর পাশে আমি হেঁটে চলেছি, মনের ভেতরে একরাশ কিলবিল করা প্রশ্ন নিয়ে। থাকতে না পেরে এক পর্যায়ে আমি জিজ্ঞেস করেই বসলাম,

—“বড়আব্বা মাটির নিচে গেলেন কীভাবে?”

আব্বা একটু থেমে বললেন,

—“কবর খুঁড়ে তাঁকে সেখানে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে।

আমি আবার জানতে চাইলাম,

—“কবর কে খুঁড়ল?”

আব্বা বললেন,

—“তোমার মোজাহার কাকু, মসলেম কাকুআরও কয়েকজন মিলে।

 

আমি চুপ করে গেলাম। হয়তো উত্তরগুলো আমার কৌতূহল কিছুটা মিটিয়েছিল, কিন্তু মৃত্যুকে বুঝতে সাহায্য করেনি। বরং সেদিনের সেই কথাগুলো আমার মনে আরও গভীর এক রহস্যের জন্ম দিয়েছিলমানুষ কোথায় যায়? কেন যায়? আর যে মানুষকে এত ভালোবাসা হয়, সে কীভাবে একদিন শুধু একটি মাটির ঢিবি হয়ে থাকে?

 

আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, সেদিন আমি শুধু বড়আব্বার কবরের সামনে দাঁড়াইনি; অজান্তেই দাঁড়িয়েছিলাম জীবনের এক গভীরতম সত্যের সামনে। বড়আব্বার কবরের সেই মাটির ঢিবি আজ আর শুধু একটি কবর নয়আমার শৈশবের এক টুকরো আকাশ, আব্বার চোখের জলের প্রথম পাঠ, ভালোবাসার প্রথম গভীর উপলব্ধি, আর হারিয়ে ফেলার প্রথম অভিধান।

 

সময় চলে গেছে। মানুষ বদলেছে। শৈশব পেরিয়ে জীবন অনেক দূর এগিয়ে এসেছে। কত মানুষ এসেছে, কত মানুষ চলে গেছে। কিন্তু সেই মাগরিবের আজান, সেই কান্নার শব্দ, আব্বার কাঁপা কণ্ঠ, মাটির ঢিবির সামনে দাঁড়িয়ে বলা—“এটাই তোমার বড়আব্বার কবর”—আর মোনাজাতের ফাঁকে আব্বার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুবিন্দুগুলো আজও আমার স্মৃতির ভেতর অম্লান হয়ে আছে।

 

কখনো কখনো মনে হয়, বড়আব্বা সেদিন শুধু আমাদের ছেড়ে চলে যাননি; আমার শৈশবের একটুকরো সরলতাকেও সঙ্গে করে নিয়ে গেছিলেন। তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমি যে প্রশ্নগুলো করেছিলাম, সেগুলোর উত্তর হয়তো সেদিন পাইনি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছিকিছু প্রশ্নের উত্তর শব্দে দেওয়া যায় না। কিছু উত্তর মানুষকে সময়ের কাছে রেখে দিতে হয়। আর হয়তো সেই কারণেই আজও কোনো কবরের পাশ দিয়ে গেলে আমার পা ধীর হয়ে আসে। মনে পড়ে যায় সেই ছোট্ট শিশুটিকেযে একদিন বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে মাটির একটি ঢিবির দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, বড়আব্বা কি আমার সালাম শুনেছেন?”

 

২৮ জুলাই ২০২৬

হেস্টিংস, কোলকাতা

Sunday, 10 May 2026

জ্বালুন-খড়ি - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে মফঃস্বলের কোনো গ্রামে শৈশবকে উৎরেছি, আমাদের ছেলেবেলার সেই দিনগুলো ছিল ধোঁয়া-ওঠা মাটির উনুনের মতোই সাদামাটা, কষ্টমাখা আমার খুব ভালোভাবেই মনে আছে, তখন শুধু আমাদের গ্রাম কেন, আশেপাশে পুরো এলাকাতেই কোথাও রান্নার গ্যাসের কোনো কানেকশনই ছিল না। প্রতিটি বাড়িতে রান্নাঘরের প্রাণ ছিল মাটির উনুনআমাদের আঞ্চলিক ভাষায় যাকে বলা হয় চুলা ও আখা প্রয়োজন ও সুবিধা মতো গ্রামে কারও ছিল একচুলিয়া, কারও দোচুলিয়া, আবার কারও আলকচুলা। সেই চুলা আগুন জ্বালাতে দরকার হতো শুকনো ডালপালা, খড়কুটো, পাটকাঠি, শুকনো পাতা, ঘুঁটে ইত্যাদির  
আমরা তিন ভাই। বাবা ছিলেন পেশায় চাষি। বড় দুই দাদা বাবার সাথে চাষবাসের কাজ করতেন। আর মা বাড়ির যাবতীয় কাজকর্ম প্রায় একা হাতে সামলাতেনতাঁর দিন শুরু হতো ভোরের আলো ফোটার আগেই, আর শেষ হতো গভীর রাতে। তবু তাঁর মুখে কখনো বিরক্তির ছাপ দেখিনিতাঁর ধর্মই ছিল নিঃশব্দে কাজ করে যাওয়া। মেজদা তখন থেকেই মায়ের ডান হাত হয়ে উঠেছিল। চাষবাসের কাজের পাশাপাশি রান্নাঘরে মাকে সাহায্য করত। ধীরে ধীরে তার রান্নার হাত এমন পাকাপোক্তলো যে, আজও বাড়িতে অতিথি এলে বা কোনো অনুষ্ঠান হলে, আমরা সবাই তার ওপর ভরসা করি
 
আমি তখন খুব ছোট। তবু নিজের মতো করে সংসারের কাজে জুড়ে যেতামকখনো কল থেকে মাকে জল এনে দিচ্ছি, তো কখনো জ্বালানি টেনে রান্নাঘরে পৌঁছে দিচ্ছি, আবার কখনো তেলের শিশি বা নুনের খুঁটি মায়ের হাতে তুলে দিচ্ছি। এই ছোটখাটো কাজগুলো করতে করতে মনে হতো, আমিও যেন মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর কষ্টটা একটু হলেও ভাগ করে নিচ্ছি।
 
রাতের বেলার সেই দৃশ্যগুলো আজও মনের ভেতর জ্বলজ্বল করেরান্নাঘরের এক কোণে হেরাকিনের ম্লান হলুদ আলো ধিকধিক করে জ্বলছে, কখনো বা নম্ফর জ্বলন্ত পলতেটা বাতাসের তোড়ে এধার-ওধার দুলছেমা বসে উনুনে জ্বাল দিচ্ছেন, আর আমি তাঁর পাশে বসে খাতায় হাতের লেখা লিখছি, কখনো বা স্কুলের পড়া করছি কোথাও আটকে গেলে মা বলে দিচ্ছেন। আর মাঝে মাঝে মা কোনো কাজ বললে, বইখাতা বন্ধ করে ছুটে গিয়ে তা করছিসেই ছোট্ট রান্নাঘরটাই যেন ছিল আমার প্রথম পাঠশালা, আর মা আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক।
 
যতদূর মনে পড়ে, আমাদের ছেলেবেলার একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল জ্বালানি সংগ্রহের তৎপরতাকারণ আমরা জানতাম, জ্বালানি ছাড়া উনুনে আগুন জ্বলবে না, আর আগুন না জ্বললে সংসারের চাকা থমকে যাবে। তাই সারা বছর ধরে আমরা বালকবালিকার দল এই জ্বালানি জোগাড়ের কাজে ব্যস্ত থাকতাম বিশেষ করে বর্ষার কথা ভেবে আগেভাগেই মজুত করে রাখতাম জ্বালুন-খড়িখড় ছিল গরু-মোষের খাবার, জ্বালানীর কাজে অধিক খড় ব্যবহার করলে গোরুমোষের খাবারের আকাল দেখা দিত। তাই শুধু খড়ের ওপর নির্ভর করা যেত না, আমাদেরকে অন্য উপায় খুঁজতে হতো।
 
যতদূর মনে পড়ে, অগ্রহায়ণ-পৌষের বিকেলগুলো ছিল আমাদের কাছে উৎসবের মতো। আমরা বাড়ির ছোটছোট ছেলেমেয়েরা স্কুল থেকে ফিরে দল বেঁধে কইদা মানে কাস্তে আর বস্তা নিয়ে মাঠে চলে যেতাম। ধান কাটার পর জমিতে পড়ে থাকা নাড়াগুলো কেটে আমরা এক জায়গায় জমা করতাম। তারপর সেগুলো বস্তায় ভরে মাথায় বা কাঁধে করে বাড়ি নিয়ে আসতাম। তা দেখে মায়ের মুখে ফুটে উঠত এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি। মাথায় হাত বুলিয়ে কপালে চুমু খেয়ে মা বলতেন—“মোর বাপটা আইজকা মেলায় কাজ কইছে!”  
 
কখনো আমরা বিকেলবেলা গাছে উঠে খেলার ছলে শুকনো ডালপালা ভেঙে নিচে ফেলতাম। তারপর আঁটি বেঁধে সেই ডালপালাগুলো মাথায় বা কাঁধে করে বয়ে বাড়ি নিয়ে আসতাম। আবার কখনো ঝড়ো হাওয়ায় তাল গাছের ঢাড্ডা বা নারকেল গাছের শুকনো বাজ্ঝা ভেঙ্গে পড়লে, তা কুড়িয়ে বাড়ি নিয়ে আসতাম। মা সেগুলো যত্ন করে তুলে রাখতেন বর্ষার কথা ভেবে, বা কোনো বিশেষ দিনের রান্নাবান্নার জন্য।
 
আরও মনে পড়ে, আমি, সুনতি দি, ক্ষিত্তি দি, বিমল দা আরও অনেকে, আমরা পার্শ্ববর্তী বাগানে বা পুকুরপাড়ে গাছতলায় যেতাম পাতাড়ি সাটতে গাছের শুকনো পাতাগুলো জড়ো করতাম তারপর সেগুলো বস্তায় ভরে বাড়ি নিয়ে আসতাম। রাস্তায় পরিচিত কারও সাথে দেখা হলে শুকনো পাতায় ভর্তি বস্তাগুলো দেখে সহসা জিজ্ঞেস করতো— “এতো লা জ্বালুন, তোরা কুঠি পাতাড়ি সাটিবা গেইছেনেন তে?!”  
 
এছাড়া গ্রীষ্মের ছুটিতে, কখনো সকালে তো কখনো বিকেলে, আমরা পুকুরপাড়ে গিয়ে নতকল্‌মু মানে কলমি লতা কাটতাম। তবে কোনো পাতায় অদ্ভুত আঁকাবাঁকা দাগ দেখলে সাপের ছবি ভেবে ভয় পেয়ে যেতাম। ক্ষিত্তি দি বলত—“ভাই, এইলা কাটি না। এইটাত মনে হয় মা মনসা ভর কছে।” তা শুনে, ভয়ে আমরা অমন কলমি লতার গায়ে হাত দিতাম না। কাটা হয়ে গেলে কলমি লতাগুলো বাড়ি এনে বটি দিয়ে চিরে রোদে শুকতে দিতাম। শুকিয়ে গেলে পরে আঁটি বেঁধে গোয়ালঘর বা ঘুন্ডিয়া মানে হাঁস-মুরগি রাখার ঘরের উপরে তুলে রাখতাম, বর্ষার দিনের জ্বালানি হিসেবে।
 
যখন আমরা আর একটু বড় হলাম, তখন দল বেঁধে অন্যের জমিতে সরিষা তোলার কাজ করতে যেতাম কোনো পারিশ্রমিক বা টাকাপয়সার লোভে নয়। কেবল এটুকুই যে, সরিষা মাড়াইয়ের পর গাছগুলো আমরা যে যার বাড়ি নিয়ে যেতামতারপর সেগুলোকে যত্ন করে জমিয়ে রাখতাম, সময়মতো জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করার জন্য।
 
তাছাড়া আষাঢ় মাসে পাটের সময় আমরা ছেলেছোকরার দল সকলে মিলে অন্যের পাট ধোয়ার কাজে লেগে যেতাম। নিয়ম ছিলপাট মালিকের, আর পাটকাঠিআমাদের। সেই পাটকাঠিগুলো শুকিয়ে বাড়ি নিয়ে আসতাম। তারপর সেগুলোকে সুন্দর করে আঁটি বেঁধে এমন জায়গায় রাখা হতো, যাতে ঝড়বৃষ্টিতে ভিজে না যায়। কেননা বর্ষার দিনে রান্নাবান্নার ক্ষেত্রে এই পাটকাঠিগুলোই ছিল আমাদের ভরসা।
 
ছেলেবেলার সেই দিনগুলোতে কখনো সকালে, আবার কখনো বিকেলে আমরা গোবর কুড়োতে যেতাম। মাঠে বা রাস্তায় পড়ে থাকা গোবর কুড়িয়ে এনে ঘুঁটে দিতাম। উপলা বানাতাম। তারপর সেগুলো শুকিয়ে বস্তায় ভরে রেখে দিতাম। পরে সেই ঘুঁটেই জ্বলে উঠত চুলার আগুনে, আর সেই আগুনেই রান্না হতো আমাদের ভাত-ডাল-সবজি  
 
আমাদের শৈশবের সেই দিনগুলো হয়তো কষ্টে ভরা, কিন্তু বেশ অর্থবহ ছিল! আমরা ছোটছোট ছেলেমেয়েরা মিলেমিশে এইসব কাজকর্ম করতাম। কাজের ফাঁকে হাসতাম, খেলতামআর এসবের পাশপাশি ধীরে ধীরে দায়িত্ব নিতেও শিখতাম। আমাদের প্রতিটা কাজের মধ্যে ছিল এক ধরণের আনন্দ, বিশেষ করে কোনো কাজের পর যখন মায়ের মুখে তৃপ্তির হাসি দেখতাম। ধোঁয়ায় ভরা রান্নাঘর, জ্বালুন-খড়ির জোগাড়, আর মায়ের স্নেহমাখা হাত এসবই তো আমাদের শৈশবের মূল্যবান স্মৃতি। আজও কখনো চোখ বুজলে মনে হয়, সেই চুলার আগুন এখনো নিভে যায়নি, শুধু সময়ের আড়ালে কোথাও লুকিয়ে ঢিপ ঢিপ করে জ্বলছে।
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
৩০ এপ্রিল ২০২৬

Wednesday, 22 May 2024

জাগাহ জি লাগানে কি দুনিয়া নেহি হ্যায় (কেবল চার দিনের বসন্ত এ দুনিয়া)


 
কেবল চার দিনের বসন্ত দুনিয়া
 মূল- খাজা আজিজুল হাসান মাজযুব 
অনুবাদ- আব্দুল মাতিন ওয়াসিম 
 
রং রঙ্গনের আকারে
বাস্তবে, বিষাক্ত কাঁটার মতো দুনিয়া
মুহূর্তেই এধার থেকে ওধার
কেবল চার দিনের বসন্ত দুনিয়া
কে রেখেছিল এর নামজীবন’?
মৃত্যুর জন্য অপেক্ষার প্রহর দুনিয়া;
চিরস্থায়ী আবাসের জায়গা নয় দুনিয়া
উপদেশ গ্রহনের জায়গা, ভোগ-বিলাসের জায়গা নয় দুনিয়া!  
 
মৃত্যুর হাত থেকে নিস্তার পায়নি, না কিস্রা (ইরানের রাজপরিবার) না দারা (দারাশিকোহ)
আর না বিশ্বজয়ী সেকেন্দার, সেও হয়েছে পরাজিত
ওদের ঠাটবাট-আসবাবপত্র সবই আজ পরিত্যাক্ত
কিছুই সাথে নিয়ে যেতে পারেনি তারা, পরিতাপ আফসোস  ছাড়া;  
চিরস্থায়ী আবাসের জায়গা নয় দুনিয়া
উপদেশ গ্রহনের জায়গা, ভোগ-বিলাসের জায়গা নয় দুনিয়া! 
 
কতশত রাজ-পরিবার মিশে গেছে মাটিতে
বহু জাতি, বহু সম্প্রদায় হয়ে গেছে বিলীন
কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী হয়ে গেছে নিশ্চিহ্ন
তরুণ-যুবকের দল মিলিয়ে গেছে ভূগর্ভে;  
চিরস্থায়ী আবাসের জায়গা নয় দুনিয়া
উপদেশ গ্রহনের জায়গা, ভোগ-বিলাসের জায়গা নয় দুনিয়া! 
 
শৈশব তোমাকে দোল খাইয়েছে তার কোলে
যৌবন তার প্রেমে করেছে পাগল
আর বার্ধক্য দিয়েছে অজস্র যন্ত্রণা
অবশেষে রিক্ত হস্তে পাড়ি দেবে মৃত্যুর সাথে;
চিরস্থায়ী আবাসের জায়গা নয় দুনিয়া
উপদেশ গ্রহনের জায়গা, ভোগ-বিলাসের জায়গা নয় দুনিয়া!
 
তুমি স্বপ্ন দেখো, আমি রবো সবার উর্দ্ধে
আমার সৌন্দর্য হবে অনন্য, ফ্যাশন হবে উন্নত
মরণশীল জেনেও কী করে এমন স্বপ্ন দেখো  
কীভাবে বাহ্যিক সৌন্দর্যের মায়ায় ডুবে থাকো;
চিরস্থায়ী আবাসের জায়গা নয় দুনিয়া
উপদেশ গ্রহনের জায়গা, ভোগ-বিলাসের জায়গা নয় দুনিয়া !
 
নিজ প্রভুকে সন্তুষ্ট করেই ঘুমোতে যেও
কে জানে, তুমি দেখতে পাবে কি না সকালের আলো
হয়তো বা সকালে তুমি থাকবে মাটির তলে;
আর কতদিন তুমি মত্ত থাকবে দুনিয়ায়
আর কতদিন পড়ে থাকবে এই মিথ্যে মায়ায়;
চিরস্থায়ী আবাসের জায়গা নয় দুনিয়া
উপদেশ গ্রহনের জায়গা, ভোগ-বিলাসের জায়গা নয় দুনিয়া! 
 
ভোগ-বিলাসের কেমন অট্টালিকা
যেখানে পাশাপাশি অবস্থান করে মৃত্যু
এবার তো এই অজ্ঞতা হতে বেরিয়ে এসো
এবার তো এই জীবন শৈলী পরিবর্তন করো;
চিরস্থায়ী আবাসের জায়গা নয় দুনিয়া
উপদেশ গ্রহনের জায়গা, ভোগ-বিলাসের জায়গা নয় দুনিয়া!  
 
এই ধ্বংসশীল দুনিয়া কি তোমার এতই প্রিয়
কোন্‌ পার্থিব বিষয়ে তুমি এত প্রভাবিত
তুমি কি বিবেকহীন হয়ে পড়েছ, মাজ্যুব
তোমার কি এখনো বোধোদয় হয় না;
চিরস্থায়ী আবাসের জায়গা নয় দুনিয়া
উপদেশ গ্রহনের জায়গা, ভোগ-বিলাসের জায়গা নয় দুনিয়া!