Pages

Showing posts with label কুরআন. Show all posts
Showing posts with label কুরআন. Show all posts

Sunday, 22 February 2026

প্রতিবাদ ও বিবেকের আহ্বানঃ ইসলামী দৃষ্টিকোণ - ড. আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 

ইসলাম মানুষের ঈমানকে শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। ঈমান মানে কেবল নামাজ, রোজা বা তাসবিহ-তেলাওয়াত নয়; বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ন্যায় ও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো। সমাজে অন্যায়, জুলুম ও অবিচারের মুখোমুখি হলে একজন মানুষ কী অবস্থান নেয়তার মধ্য দিয়েই ঈমানের বাস্তব রূপ প্রকাশ পায়। পবিত্র আল্‌-কুরআন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য প্রদান করোযদিও তা তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেই হয়। [সূরাতু আন্‌-নিসা: ১৩৫] এই আয়াত আমাদের শেখায়ঈমান কখনো সুবিধাবাদী হতে পারে না। ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে হলেও দাঁড়াতে হবে টাই ঈমানের দাবি। এই সত্যটি রাসুল (সাঃ)-এর সেই বিখ্যাত হাদিসে আরও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোনো অন্যায় দেখবে, সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিহত করে; যদি সে তা করতে সক্ষম না হয়, তবে মুখে প্রতিবাদ করে; আর যদি তাও না পারে, তবে অন্তরে তা ঘৃণা করেআর এটাই ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর। [সাহীহ মুসলিম ৪৯] এই হাদিস আমাদের জানিয়ে দেয়ঈমান মানেই দায়িত্বশীল হওয়া। অন্যায়ের সামনে নিশ্চুপ থাকা ঈমানের পূর্ণতা নয়।
 
নীরব নিরপেক্ষতা ঈমানের পরিপন্থী
অনেকেই মনে করেন—“আমি তো কাউকে কষ্ট দিচ্ছি না, তাই আমার কোনো দায় নেই।কিন্তু ইসলাম এই যুক্তিকে গ্রহণ করে না। কারণ অন্যায় দেখেও চুপ থাকা মানে অনেক সময় সেই অন্যায়কে টিকে থাকার সুযোগ দেওয়া। পবিত্র আল্‌-কুরআন পূর্ববর্তী জাতিসমূহের সমালোচনা করে বলেছে তারা একে অপরকে অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করত নাতারা যা করত, তা কতই না নিকৃষ্ট ছিল! [সূরাতু আল্‌-মায়েদাহ্‌: ৭৯] অন্যত্র মহান আল্লাহ আরও বলেন অশান্তি ও বিপর্যয় থেকে বাঁচো, যা বিশেষভাবে শুধু জালিমদের পরই আপতিত হয় না। [সূরাতু আল্‌-আনফাল: ২৫] অর্থাৎ সমাজে অন্যায় ছড়িয়ে পড়লে তার ক্ষতি শুধু জালিমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; নীরব দর্শকরাও এর পরিণতি ভোগ করে। তাই অন্যায় দেখেও চুপ করে থাকা, ক্ষমতা সত্ত্বেও প্রতিবাদ না করা ঈমানের পরিপন্থী।
 
প্রতিবাদ ক্ষমতার প্রয়োগ
প্রতিবাদ সম্পর্কিত হাদিসটিতে উল্লেখিত প্রথম স্তরটি হলহাত দিয়ে প্রতিবাদএই পদ্ধতি মূলত তাঁদের জন্য, যাঁদের হাতে বৈধ ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব রয়েছে। মনে রাখতে হবে, ইসলাম ক্ষমতাকে ভোগের বস্তু নয়, বরং আমানত হিসেবে দেখে। আর আমানত সম্পর্কে পবিত্র আল্‌-কুরআনের নির্দেশনিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আমানত তার প্রাপ্যদের নিকট ফিরিয়ে দিতে আদেশ করেছে; আর যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার করো, তখন ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করো। [সূরাতু আন্‌-নিসা: ৫৮] এবং মর্মে নবীজি (সাঃ) বলেছেন তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং তোমাদের প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। [সাহীহ বুখারী ২৫৫৪সাহীহ মুসলিম ১৮২৯] এখানে হাতবলতে জুলুম বা বলপ্রয়োগ বোঝানো হয়নি। বরং বোঝানো হয়েছে আইনসম্মত, ন্যায়ভিত্তিক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। অন্যায় রোধের নামে অন্যায় করা ইসলামের শিক্ষা নয়। এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, যেখানে তৎক্ষণাৎ হস্তক্ষেপের ফলে ন্যায়সঙ্গতভাবে কোনো অন্যায় প্রতিরোধ সম্ভব সেখানে সাধারণ মানুষেরও হাত দিয়ে প্রতিবাদের জন্য সক্রিয় হওয়া কর্তব্য। কিন্তু যেখানে আইনি প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ থাকবে সেখানে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সক্রিয় হবে। সেখানে সাধারণ মানুষ অন্যায়ের শাস্তি দিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে নাএতে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।
 
বাক্যের মাধ্যমে অন্যায়ের মোকাবিলা
আর যাঁদের হাতে ক্ষমতা নেই, তাঁদের জন্যও দায়ভার ঝেড়ে ফেলার সুযোগ নেই। ঈমানের পরীক্ষায় ইসলাম তাঁদের দায়িত্বের পথ বন্ধ করেনি। সত্য বলা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, নিপীড়িতের পক্ষে দাঁড়ানোএসবও ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাসুল (সাঃ) বলেছেনঅত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ। [মুস্‌নাদ আহ্‌মাদ ১৮৮২৮, সুনান নাসায়ী ৭৭৮৬] আর এ প্রসঙ্গে কুরআন নির্দেশ দেয় তোমরা ন্যায়ের আদেশ দাও এবং অন্যায় থেকে নিষেধ করো। [সূরাতু আলে ইমরান: ১০৪] তবে ইসলাম প্রতিবাদে শালীনতা ও প্রজ্ঞার ওপর জোর দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো। [সূরাতু আন্‌-নাহল: ১২৫] অর্থাৎ সত্য বলবে, কিন্তু দায়িত্বশীল ভাষায়; প্রতিবাদ করবে, কিন্তু মানবিক সীমা অতিক্রম না করে।
 
অন্তরের প্রতিবাদ ঈমানের শেষ রেখা
কখনো কখনো এমন পরিস্থিতি আসে, যখন মানুষ একেবারে অসহায় হয়ে পড়ে। না হাতে শক্তি থাকে, না থাকে মৌখিক প্রতিবাদের সুযোগ। তখন অন্তরে অন্যায়কে ঘৃণা করাই ঈমানের শেষ আশ্রয়। কিন্তু রাসুল (সাঃ) সতর্ক করে বলেছেনএটি ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর। অর্থাৎ এখানেই থেমে যাওয়া কাম্য নয়। এবং তিনি অন্য এক হাদিসে আমাদেরকে অন্তরের অবস্থার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেনসাবধান! শরীরে একটি মাংসপিণ্ড রয়েছেযদি তা সঠিক থাকে, তাহলে পুরো শরীর সঠিক থাকে; আর যদি তা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায় এবং পুরো সিস্টেমই বিগড়ে যায়সেটি হলো অন্তর। [সাহীহ বুখারি ৫২ ও মুসলিম ১৫৯৯] আর তাই অন্তর যদি অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে নেয়, তাহলে ঈমান ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যায়।
 
নীরবতার মূল্য ও বিবেকের ক্ষয়
নীরবতা অনেক সময় মানুষ নিজের নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য কিংবা স্বার্থরক্ষার অজুহাতে বেছে নেয়। কিন্তু ইসলাম আমাদের বারবার সতর্ক করেছেএই নীরবতাই এক সময় ব্যক্তি, সমাজ ও সামগ্রিক মানবতার জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। যখন অন্যায় চোখের সামনে ঘটতে থাকে, অথচ কেউ প্রতিবাদ করে না, তখন সেই অন্যায় ধীরে ধীরে অস্বাভাবিকথেকে স্বাভাবিক’-এ রূপ নেয়। বিবেক ভোঁতা হয়ে যায়, সত্য ম্লান হয়ে পড়ে, আর জুলুম সমাজের রীতিতে পরিণত হয়। রাসুল (সাঃ) এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন। তিনি বলেনযখন মানুষ কোনো জালিমকে দেখে তাকে বাধা দেয় না, তখন আশঙ্কা রয়েছেআল্লাহ তাদের সবাইকেই শাস্তির আওতায় আনবেন।[আবু দাউদ ৪৩৩৮, তিরমিজি ৩০৫৭] এই হাদিস স্পষ্ট করে দেয়অন্যায়ের সময় নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ নেই। জুলুমের সামনে নীরব থাকা মানে, এক প্রকারে জালিমকে শক্তিশালী করা এবং তার অপরাধে নীরব সম্মতি দেওয়া। এই সত্যটি রাসুল (সাঃ) আরেকটি গভীর ও হৃদয়স্পর্শী উপমার মাধ্যমে বুঝিয়েছেনতিনি বলেন একদল মানুষ একটি নৌকায় উঠল। তাদের কেউ উপরের তলায়, কেউ নিচের তলায়। নিচের তলার লোকেরা যখন পানির প্রয়োজন অনুভব করত, তখন তাদের উপরের তলা যেতে হতো। একসময় তারা বলল—‘আমরা যদি আমাদের অংশে নৌকায় একটি ছোট্ট ছিদ্র করে নিই, তাহলে আর উপরের লোকদের কষ্ট দিতে হবে না। যদি উপরের লোকেরা তাদের এই কাজে বাধা না দেয়, তাহলে সবাই ডুবে যাবে। আর যদি বাধা দেয়, তাহলে তারা নিজেরাও বাঁচবে, অন্যদেরও বাঁচাবে। [সাহীহ বুখারী ২৪৯৩] টি কেবল একটি উপমা নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক দর্শন। এখানে নৌকা হলো সমাজ, আর ছিদ্র করা হলো অন্যায় ও অপরাধ। কেউ যদি বলে—“ তো আমার অংশে বা আমার সাথে অন্যায় করছে না, এতে আমার কী?" অথবা যদি মনে করে,"নৌকা তো আমার নয়, তার মালিক যে সে কেন বাধা দিচ্ছে না? ”—ইসলাম স্পষ্ট করে দেয়, এই যুক্তি ভ্রান্ত। কারণ সমাজ একটা নৌকা। এক অংশে করা অন্যায়ের প্রতি নিষ্ক্রিয়তা ও মালিকের প্রতি দোষারোপ সেই মূহুর্তে সবাইকে ডুবিয়ে দেবে অতএব, নীরবতা শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; এটি ধীরে অথচ অবশ্যম্ভাবী সামাজিক আত্মহত্যার নামান্তর। ইসলাম আমাদের শেখায়ক্ষমতা অনুযায়ী অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে: হাত দিয়ে, কথা দিয়ে, অন্তত অন্তরে ঘৃণা রেখে। নীরব থাকা নয়, বরং দায়িত্বশীল ও বিবেকবান হওয়াই একজন মুসলিমের পরিচয়।
 
প্রজ্ঞাময় প্রতিবাদ ও ইসলামের ভারসাম্যের দর্শন
ইসলাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা সমর্থন করে না; বরং প্রতিবাদকে ঈমানি দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে এই প্রতিবাদ যেন অন্ধ ক্রোধ, উগ্রতা কিংবা সীমালঙ্ঘনের রূপ না নেয়সে ব্যাপারেও ইসলাম সমানভাবে সতর্ক করেছে। ইসলামের প্রতিবাদ-দর্শন একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ দেখায়, যেখানে বিবেক, প্রজ্ঞা, ন্যায়বোধ এবং পরিণতির গভীর উপলব্ধি অপরিহার্য। পবিত্র আল্‌-কুরআনে মহান আল্লাহ অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেননিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার এবং আত্মীয়স্বজনকে সাহায্যের নির্দেশ দেন; আর অশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। [সূরাতু আন্‌-নাহল: ৯০] এই আয়াতটি ইসলামের সামাজিক ও নৈতিক দর্শনের এক সারসংক্ষেপ। এখানে আদ্‌ল অর্থাৎ ন্যায়মানে শুধু অন্যায়ের প্রতিবাদ নয়; বরং প্রতিবাদের মধ্যেও ন্যায় বজায় রাখা। ইহ্‌সান অর্থাৎ সদাচারমানে এমন আচরণ, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত না করে বরং সংশোধনের পথ খুলে দেয়। আর বাগ্‌ই অর্থাৎ সীমালঙ্ঘনথেকে নিষেধাজ্ঞা স্পষ্ট করে দেয়ন্যায়ের নামে অন্যায় করার অনুমতি ইসলামে নেই। এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ সম্পর্কিত তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনো অন্যায় দেখে…” এই হাদিস প্রমাণ করে, প্রতিবাদ অবশ্যই করতে হবে, কিন্তু ক্ষমতা ও পরিস্থিতির বিবেচনায়শক্তি প্রয়োগের অনুমতি তখনই, যখন তা আরও বড় ফিতনা, রক্তপাত বা বিশৃঙ্খলার কারণ না হয়। নচেৎ কথা ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবাদই শ্রেষ্ঠ পথ। উল্লেখ্য যে, ইসলামের লক্ষ্য কখনোই প্রতিশোধ নয়। প্রতিশোধ মানুষকে তৃপ্ত করতে পারে, কিন্তু সমাজকে সংশোধন করে না। পবিত্র আল্‌-কুরআন স্পষ্টভাবে বলে মন্দের প্রতিদান মন্দের সমান; তবে যে ক্ষমা করে এবং সংশোধনের পথ অবলম্বন করে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে। [সূরাতু আশ্‌-শূরা: ৪০] এখানে লক্ষ্য করা যায়, প্রতিকার ও ক্ষমার সুযোগ রাখা হয়েছে, কারণ ইসলামের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো সংশোধন, শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠাধ্বংস বা বিশৃঙ্খলা নয়। সুতরাং ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতিবাদ হবে এমন, যা অন্যায়কে রুখে দেয় কিন্তু নতুন অন্যায়ের জন্ম দেয় না; যা জুলুমের বিরোধিতা করে কিন্তু নিজে জালিম হয়ে ওঠে না। প্রজ্ঞাহীন প্রতিবাদ আগুনের মতোসব পুড়িয়ে দেয়; আর প্রজ্ঞাসম্পন্ন প্রতিবাদ আলোর মতোপথ দেখায়। এই ভারসাম্যই ইসলামের সৌন্দর্য, এই প্রজ্ঞাই ইসলামের শক্তি।
 
আলোচিত এই হাদিস ও আয়াতগুলো আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরেআমরা যখন অন্যায়ের মুখোমুখি হই, তখন আমাদের ঈমান কী করে? চুপ থাকে, না দায়িত্ব নেয়? মহান আল্লাহ বলেননিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরাই নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। [সূরাতু আর্‌-রাদ: ১১] ইসলাম চায়, ঈমান যেন শুধু অন্তরের বিশ্বাস হয়ে না থাকে; বরং তা ন্যায়, সত্য ও মানবিকতার পক্ষে এক জীবন্ত শক্তিতে পরিণত হয়। তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়এটি ঈমানের স্পষ্ট সাক্ষ্য, একজন মুমিনের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।


Saturday, 24 January 2026

সূরাতু আল-হুজুরাতঃ সমাজ বিনির্মাণের পাঠ

 

সূরাতু আল-হুজুরাত পবিত্র কুরআনের ৪৯তম সূরা। এটি মদিনায় অবতীর্ণ হয়েছে। এই সূরার মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে আত্মশুদ্ধি, শালীনতা, ভদ্রতা ও শিষ্টাচারের এক পূর্ণাঙ্গ দিশা প্রদান করেছেন। বিশেষ করে সামাজিক জীবন, পারস্পরিক সম্পর্ক ও আচরণবিধি সম্পর্কে এই সূরায় অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে।
 
সূরার প্রথম পাঁচটি আয়াতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর প্রতি প্রদর্শনীয় আদব-কায়দা ও শিষ্টাচারের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এখানে সরাসরি নবীজি (সা.)-কে কেন্দ্র করে আচরণবিধি শেখানো হয়েছেযেমন তাঁর উপস্থিতিতে অগ্রসর হয়ে কথা না বলা, তাঁর সামনে উচ্চস্বরে কথা না বলা, কিংবা অভদ্র ভঙ্গিতে তাঁকে সম্বোধন না করা। তবে এই নির্দেশনাগুলো কেবল নবীজি (সা.)-এর ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; পরোক্ষভাবে এগুলো আমাদের শিক্ষক, গুরুজন, পিতামাতা ও প্রকৃত ধর্মীয় আলেমদের প্রতিও প্রযোজ্য। একই সঙ্গে যেখানে আল্লাহ, তাঁর রাসূল, কুরআন ও হাদিসের আলোচনা হয়সেসব স্থানেও এই আদব ও শিষ্টাচার রক্ষা করা অপরিহার্য।
 
পরবর্তী কয়েকটি আয়াতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সামাজিক বিধান বর্ণিত হয়েছে। যদিও প্রত্যক্ষ সম্বোধন নবী (সা.)-এর প্রতি, তবুও এর লক্ষ্যবস্তু সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাই। এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছেকোনো ফাসেক ব্যক্তি কোনো সংবাদ প্রদান করলে তা যাচাই না করে বিশ্বাস করা যাবে না। প্রতিটি সংবাদ অন্ধভাবে গ্রহণ করে তার ওপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত বা কার্যক্রম গ্রহণ করা সমীচীন নয়। বিশেষত কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা জাতির বিরুদ্ধে কোনো সংবাদ এলে প্রথমেই ভাবতে হবেসংবাদটির উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য। উৎস যদি সন্দেহজনক হয়, তবে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কারণ একটি মিথ্যা সংবাদের ভিত্তিতে কোনো জাতির সম্মান, এমনকি ইতিহাস পর্যন্ত কলুষিত বা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
 
এরপর আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের পারস্পরিক সংঘাতের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। যদি কখনো মুসলমানদের দুটি দল পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, সে ক্ষেত্রে অন্য মুসলমানদের কী করণীয়তা স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে। এখানে ন্যায়বিচার, সংযম ও সহনশীলতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং মুসলিম উম্মাহর ভ্রাতৃত্ববোধকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
 
এরপর মুসলমানদের এমন সব নৈতিক ব্যাধি থেকে আত্মরক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেগুলো সমাজজীবনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তোলে। একে অপরকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা, উপহাস করা, অপমানজনক নামে ডাকা, কু-ধারণা পোষণ করা, গোপন দোষ অনুসন্ধান করা এবং অনুপস্থিতিতে বদনাম করাএসবই গুরুতর গোনাহ এবং সামাজিক অশান্তির মূল কারণ। আল্লাহ তাআলা একে একে এসব কাজকে হারাম ঘোষণা করেছেন। মুসলিম নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একে অপরকে অসৎ নামে সম্বোধন না করা, অমূলক সন্দেহ পোষণ না করা এবং সর্বোপরি গীবত অর্থাৎ পরচর্চা ও পরনিন্দা থেকে বিরত থাকার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গীবতকে আল্লাহ তাআলা এতটাই জঘন্য কাজ হিসেবে তুলে ধরেছেন যে, একে মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণের সঙ্গে তুলনা করেছেন
 
এরপর আল্লাহ তাআলা গোষ্ঠীগত ও বংশগত বৈষম্যের মূলে আঘাত হেনেছেনযা যুগে যুগে পৃথিবীতে ভয়াবহ বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে। জাতি, বংশ কিংবা গোত্রের অহংকারে মত্ত হয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ও অন্যকে নীচু মনে করা, নিজের বড়ত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যকে হেয় করাএসব নিকৃষ্ট প্রবৃত্তির কারণেই পৃথিবী জুলুমে ভরে উঠেছে। আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর একটি আয়াতে এসব ভ্রান্তির মূলোৎপাটন করে ঘোষণা করেছেনসমস্ত মানুষ একই উৎস থেকে সৃষ্টি; জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করা হয়েছে কেবল পারস্পরিক পরিচয়ের জন্য, শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারের জন্য নয়। আল্লাহর কাছে মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড হলো তাকওয়া অর্থাৎ আল্লাহ্‌ভীতি ও সংযমশীলতা 
 
সবশেষে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ঈমান কেবল মুখে দাবি করার বিষয় নয়। প্রকৃত ঈমান হলো অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সত্য বলে গ্রহণ করা, বাস্তবে তাঁদের নির্দেশের অনুসরণ করা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর পথে জান ও মাল উৎসর্গ করা। যারা শুধু মৌখিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে, অথচ অন্তরে তা গ্রহণ করে নাতারা পার্থিব বিচারে মুসলমান হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং সামাজিকভাবে তাদের সঙ্গে মুসলমানদের মতো আচরণ করা যেতে পারে; কিন্তু আল্লাহর দরবারে তারা প্রকৃত মুমিন হিসেবে গণ্য হয় না।
 
শেষ কয়েকটি আয়াতে ঈমান, ইসলাম ও নিফাকের অর্থাৎ দ্বিচারিতার পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছেইসলাম গ্রহণ কোনো স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যম নয়; বরং প্রকৃত ইসলাম গ্রহণের সুফল সম্পূর্ণভাবে মানুষের নিজের জন্যই। ইসলাম গ্রহণ করে তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে উপকার করছেএমন ধারণা নিছক মূর্খতা ছাড়া কিছু নয়।
 
এই সূরার সামগ্রিক শিক্ষা থেকে আমরা যা উপলব্ধি করতে পারি তা হলো
(১) নবীজি (সা.) তো বটেই, সকল সম্মানীয় ব্যক্তির প্রতি শিষ্টাচার ও ভদ্রতা রক্ষা করা।
(২) কোনো ফাসেক অর্থাৎ অসৎ ও পাপিষ্ঠ ব্যক্তির সংবাদ যাচাই না করে গ্রহণ না করা।
(৩) কোনো মানুষকে অপমানজনক নামে সম্বোধন না করা।
(৪) কু-ধারণা ও গীবতের মতো ভয়াবহ গোনাহ থেকে নিজেকে সংযত রাখা।
 
সূরা হুজরাতের এই মহান শিক্ষাগুলো যদি আমরা আমাদের ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে নিঃসন্দেহে আমরা একটি সুন্দর সমাজ গঠনে সফল হবো এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সক্ষম হবোযা আমাদের ইহকাল ও পরকাল উভয় জীবনকেই সৌন্দর্যমণ্ডিত করবে, ইন্‌ শা আল্লাহ। 

ড. আব্দুল মাতিন ওয়াসিম