আমি তখন সবে কৈশোরে পা দিয়েছে। মনের গহীনে নিত্যদিন নতুন নতুন আবেগের আনাগোনা, খানিকটা আমার অজান্তেই। সেই বেলায় প্রথম দেখাতেই আমি তার প্রেমে পড়েছিলাম। তবে ‘তাকে ভালোবাসি, বা তার প্রেমে পড়েছি’ এমন কোনো শব্দবন্ধনী আমি কোনোদিন উচ্চারণ করিনি। কিন্তু তাকে দেখলেই আমার ভেতরে এক নিঃশব্দ আলো জ্বলে উঠত। সেই আলো হয়তো সে কোনোদিন দেখেনি, কিংবা দেখতে চায়নি। দেখা হলেই সে মুখ ফিরিয়ে নিত। তার চোখেমুখে এমন এক বিরক্তি ফুটে উঠত, যেন আমার উপস্থিতি তার জীবনে এক অপ্রয়োজনীয় ছায়া।
একদিন সাহস সঞ্চয় করে, বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের পিড়াপীড়িতে তাকে কিছু বলতে চেয়েছিলাম। পেছন থেকে ডেকেওছিলাম, কিন্তু সে থামেনি। হাঁটতে হাঁটতে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিল, তার শোনার কিছুই নেই। এই সংক্ষিপ্ত প্রত্যাখ্যান বহুদিন ধরে আমার মনে ঘুরে বেড়িয়েছে—অপূর্ণতার মতো, প্রশ্নের মতো।
এর কিছুদিন পরেই তার বিয়ে হয়ে গেল এলাকার এক প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে। সম্পদ আর ক্ষমতার দরুন লোকটার বাড়ি সর্বদা লোকে লোকারণ্য হয়ে থাকতো। বিয়ের দিন উঠোন কানায় কানায় ভরে উঠেছিল। পাড়ার মানুষ বলাবলি করছিল—এমন ঘরে বউ হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।
সেদিন আমি কিছুই বলিনি। বেলা গড়াতেই গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম তুলাই নদীর পাড়ে। বর্ষার নদী ফুলে উঠেছিল—স্রোত ছিল অস্থির, শব্দ ছিল তীব্র। নদীর গর্জনের ভেতরেও নিজের বুকের ভারী শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। অপমান, হাহাকার আর অজস্র প্রশ্ন নিঃশব্দে আমাকে গ্রাস করছিল। সন্ধ্যার আগেই স্থির করেছিলাম—এই পাড়া, এই জনপদ, এই মানুষজন, এমনকি এই নদীকেও পেছনে ফেলে আমি চলে যাবো, দূরে কোথাও।
আমি চলে গেছিলাম কাউকে কিছু না জানিয়ে। দূরের শহরগুলোতে আমি ছিলাম এক নামহীন মানুষ—কখনো শ্রমিক, কখনো রাজমিস্ত্রী, কখনো জোগাড়ি, কখনো রিকশাওয়ালা, কখনো দোকানের কর্মচারী, কখনো কেবল ভিড়ের অংশ। কেউ কখনো আমার পরিচয় জানতে চাইলে শুধু বলতাম—নদীর ধারে আমার বাড়ি। এর বেশি কিছু নয়।
এভাবেই কেটে গেল দশটি বসন্ত, দশটা বর্ষা। একদিন মনে হলো—আর কত দূর, আর কত দিন? তখনই ফেরার ব্যাপারে মনঃস্থির করলাম। এবং একদিন ফিরেও এলাম, ঠিক যেমন করে নিঃশব্দে চলে গেছিলাম। আমার ফেরায় পাড়ায় নতুন করে কৌতূহল জেগে উঠল, লোকজনের মুখে ছিল নানা প্রশ্ন। আমি ধীরে ধীরে এমনভাবে উত্তর দিতে শুরু করলাম, যাতে আর কোনো প্রশ্ন না আসে। শেষে একদিন বলেই ফেললাম—আমি কোথাও যাইনি, শুরু থেকে এখানেই ছিলাম। লোকজন প্রথমে বিস্মিত হলেও ধীরে ধীরে সেই কথাকেই সত্য বলে মেনে নিল। স্মৃতির দায় ঝেড়ে ফেলা সকলের জন্য সহজ ছিল, বোধ করি।
এরপর আমার বিয়ে হলো। স্ত্রীর প্রতি আমার ভালোবাসা ছিল গভীর। সন্তান হওয়ার কথা উঠলে আমি নিরুত্তর থাকতাম। পরে জানা গেল—সে কোনোদিন মা হতে পারবে না। তবু আমি তাকে ছেড়ে যাইনি। পাড়াপড়শি, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের নানা উপদেশের উত্তরে নীরব থেকেছি, কিংবা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি—যা আছে, তাই যথেষ্ট।
আমাদের বাড়ির পেছনে ছিল ছোট্ট একটা বাগান। তাতে তিনটা ফলের গাছ ছিল। নিয়ম করে আমি ও আমার স্ত্রী সেগুলোর যত্ন নিতাম, কিন্তু কখনো ফল পাড়তাম না। সেগুলোতে কুঁড়ি আসতো, ফল ধরতো, পাকতো, আবার একদিন শুকিয়ে মাটিতে পড়ে যেতো। শরৎ আর শীতে মন ভারী হয়ে উঠত আমাদের, বসন্তে কিছুটা হালকা লাগত—যেন আবার নতুন করে বাঁচার উপকরণ পেয়েছি।
কিন্তু একদিন ভোরে ফজরের নামাজ পড়ে ফেরার পথে দেখলাম—তিনটা গাছই লণ্ডভণ্ড, সব ফল চুরি হয়ে গেছে, ডালপালা ভেঙ্গে তছনছ। আর এসব দেখে আমার স্ত্রী হাউমাউ করে কাঁদতে আরম্ভ করলো। তার কান্নাকাটি আমাকে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিয়েছিল। মনে হয়েছিল—আমি আবার কোনো সন্তানের মৃত্যু দেখছি।
এর কিছুদিন পর, খদ্দের ডেকে অল্প দামে বাড়িটা বিক্রি করে দিলাম। জানতে পেরে পাড়াপড়শি ছুটে এলো, জিজ্ঞেস করতে লাগল—কোথায় যাবে, কী করবে? সেদিন তাদের এসব প্রশ্নের উত্তরে শুধু বলেছিলাম, যেখানে নদী থাকে। তারপর একদিন কাকভোরে স্ত্রীর হাত ধরে বেরিয়ে পড়লাম। পাড়ার শেষ প্রান্তে এসে একটু থামলাম। সামনে তুলাই নদী তখন শান্ত। জল ধীরে ধীরে বয়ে চলেছে—যেন সাগরে পৌঁছানোর কোনো তাড়াহুড়ো নেই তার, যেন যাত্রাপথ নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো আশংকাও নেই।
আমি এখন তুলাই থেকে বহু দূরে, বাস করি এক পাথুরে উপত্যকায়। এখানেও পাশেই একটা নদী আছে, তুলাইয়ের চেয়ে ঢের বড় ও বিশাল, তবে তার স্রোতে ঘৃণার পরিমাণ বেশি, তার উচ্ছ্বাসে বিদ্বেষ উতলে উঠে মুহুর্মুহু। আমার আর কখনো ফেরা হয়নি তুলাইয়ের তল্লাটে। লোক মারফৎ জেনেছি, পাড়ার লোকজন কেউ কেউ মাঝে মাঝে আমার কথা বলে। কেউ কেউ আমার নাম শুনে ভ্রূ কুঁচকোয়, যেন কিছুই মনে করতে পারছে না। আবার কেউ কেউ বলে, ও নামের এই এলাকাতেই কেউ ছিল না। কিন্তু তুলাই নদী, নীরবে বয়ে যেতে যেতে হয়তো আজও ভাবে—এত এত বিদায়ের শব্দ নদীর জলে তাহলে কে ফেলে গেছে…!
বাঁশকুড়ি, দক্ষিণ দিনাজপুর
২৭ ডিসেম্বর ২০২১

No comments:
Post a Comment