Pages

Monday, 8 October 2018

আব্দুল মাতিন ওয়াসিমঃ ভিড়তন্ত্রের কবলে



ভিড়তন্ত্রের কবলে 

ছোটবেলায় গল্পটা শুনেছিলাম। সম্ভবত, নানিমা-র কাছে। স্রষ্টা যখন সবাইকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন, একজন ফেরেশতা তাঁর নাম মালাকুল্‌ মাউত্‌ - দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, প্রভু আপনি আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন জান কবজকরার। সবাই তো আমাকে গালাগাল দেবে। অভিশাপ দেবে। স্রষ্টা উত্তর করলেন, তুমি যেমনটা ভাবছ, ঘটনা তার বিপরীত হবে। কোনো প্রাণীর মৃত্যুর পূর্বে সিনারিও এমন তৈরি হবে যে কেউ তোমার কথা খেয়ালই করবে না। সবাই মৃত্যুর কারণ-ঘটনা ইত্যাদি বিশ্লেষণ করবে। আর সেই সাথে এটা না করলে বেঁচে যেত, ওখানে না গেলে কিছুই হত না’-টাইপ কথা আওড়ে আফসোস করবে। (এই কথাগুলো তত্ত্ব ও তথ্যের বিচারে কেমন তা আমার জানা নেই।)

বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে তিনি সবে দিল্লীর মসনদে বসেছেন। পুনেতে আইটি সেক্টরের কর্মচারী মুহ্‌সিন শেখ নিহত হলেন কিছু অতি-রাষ্ট্রবাদীদের হাতে। কদিন খুব আলোচনা চলল, নানা দৃষ্টিকোণ থেকে। ভেসে উঠল তাঁর মুসলিম চেহারা’-র ছবিটা। সময়ের সাথে সবাই ভুলে গেল; শুধু ভুলতে পারেনি সেই মা যার নাড়ি ছিঁড়ে কোন এক ভোরে পৃথিবীর আলো দেখেছিল মুহ্‌সিন।

আখলাক খুন হলেন। দাদরির কোনো এক মহল্লায়। ফ্রিজে তাঁর মাংস ছিল। মাংসকীসের ছিল তা নিয়ে চলল জোর বিতর্ক-আলোচনা। প্রেস্টিটিউটদের টক শতে। শুনেছিলাম মাংসের কিছুটা ফরেনসিক না কীসব টেস্টের জন্য পাঠানো হয়েছিল। খুনবেমালুম হারিয়ে গেল বিতর্ক ও সময়ের গোলক ধাঁধাঁয়; শুধু হারায়নি আখলাক স্ত্রী-সন্তানদের মন থেকে। তাঁর আর্মি ছেলে হয়তো খুন হওয়া পিতার ছবি মনে ও মোবাইলে নিয়ে কাশ্মীরের কোথাও পাহারা দিচ্ছে তেরঙ্গার আব্রুকে।

জে এন ইউ-র ঢাবা ও জঙ্গলের মাঝে কোথাও হারিয়ে গেল নাজিব। নিখোঁজ সে। কোনো হদিশ নেই তাঁর। তাঁর মার আহাজারি কানকে ছুঁলেই মনে প্রশ্ন জাগে, সবুজে ঘেরা ওই সুন্দর ক্যাম্পাসটির কোথায় আছে বারমুডা ট্রাঙ্গেল-টা? নাজিবের স্বপ্ন-উড়ান যেটাতে ভ্যানিশ হয়ে গেল। হয়তো আজ থেকে পাঁচ বছর পরে সেই নাজিবেরই ডাক্তার ছোট বোনের হাতে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে কোন অতি-রাষ্ট্রবাদী ভক্ত।

সোনে কি চিড়িয়া’-র কোনো না কোনো প্রান্তে সপ্তাহান্তে এমন এক-আধটা ঘটনা শোনাই যায়। যেগুলোতে খুন হয় আফরাজুল-পেহ্‌লু-জুনাইদ-ফারুক-আকবর-রা ভিড়’-এর হাতে। নেপথ্যে থাকে কিছু বাঁধাধরা কারণগোমাংস, গো-তসকরি, গো- হত্যা, লাভ্‌ জেহাদ, ছেলে-পাচারকারী, বাইকচোর ইত্যাদি। বাস্তবের মাটিতে সে-কারণগুলোর সাধারণত কোন অস্তিত্ব থাকে না। তবে গোদি মিডিয়া’-র স্ক্রিনে দেখানো হয় কতকিছু। ফলে আলোচনা-বিতর্ক সবই চলে, তবে খুনের বিষয়কে এড়িয়ে গিয়ে। আর প্রেস্টিটিউট-রা মেতে ওঠেন কু-অজুহাতের নানান মোড়কে ঢেকে সেই হত্যাকে বৈধ সাব্যস্ত করতে। এভাবেই মানুষের মুখে মুখে চর্চিত হতে থাকে সিনারিওগুলো আর বেমালুম মুক্তি পেয়ে যায় সেই ভিড়’, জান কবজকারী এই দানবরা...!

-আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

Sunday, 7 October 2018

আব্দুল মাতিন ওয়াসিমঃ ভাইয়ের দরদ


ভাইয়ের দরদ
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

সল্টলেক সেক্টর ফাইভের অফিসপাড়াচারিদিক খুব ব্যস্ততখন দুপুর দুটো তিরিশ হবে। রাস্তার পাশের এক চেনা দোকানে চা খাচ্ছে শাহিদএক যুবতী, বয়স তেইশ-চব্বিশ হবে, ইতস্তত করতে করতে ঢুকলো সেই দোকানেহাতে একটা ট্রান্সপারেন্ট ফাইলদেখা যাচ্ছে, ভিতরে রয়েছে কিছু মার্কশিট ও সার্টিফিকেটসারা শরীরে প্রসাধনের তেমন কোনো চিহ্ন নেই। তবে ঘামে ভেজা ও রোদে মাখা মুখটা ছিল বেশ সপ্রতিভএক পা দু’ পা করে দোকানদারের কাছে গিয়ে বললদাদা, ভাত বা রুটি পাওয়া যাবে?

দোকানদার তখন একটা থালায় ভাত তুলছিল। উত্তর দিল হ্যাঁ, ভাত পাবেনবলুন কী খাবেনডিম, রুই, পাবদা, চারা পোনা, মাছের ডিম, মাংস? বলুন কী দেবো?  
শুধু সব্‌জি ভাত কত দাদা?
ভাত, ডাল, আলুভাজা এবং সোয়াবিনের তরকারি পঁয়ত্রিশ টাকা।
আমার সোয়াবিন চাই না শুধু আলুভাজা আর ডাল দিনতিরিশ টাকায় হবে তো?
হবেবসুন, দিচ্ছি

এরই মধ্যে ওর ফোনটা বেজে উঠল— “হ্যাঁ মা বলো... হ্যাঁ, হ্যাঁ ইন্টারভিউ দিয়েছি... হ্যাঁ আরও কয়েকটা অফিসে যাবো কথা বলতে... হ্যাঁ খেয়েছি... ভাত মাছ... তুমি ওষুধগুলো ঠিকঠাক খেয়েছো তো?... হ্যাঁ আমি পাঁচটার ট্রেনটা ধরবো... ভাইকে টিউশন থেকে ফেরার সময় স্টেশনে দাঁড়াতে বলবে... আচ্ছা, ঠিক আছে, রাখলাম... হুম...

ফোনটা রেখে কিছুক্ষণ বাইরের দিকে আনমনে তাকিয়ে থাকলোহয়তো অসুস্থ মা, পড়ুয়া ছোট ভাইকে ঘিরে সাজানো স্বপ্নগুলো চোখে ভিড় করছিলোশাহিদের মনে এক অদ্ভুত রকমের মায়া জন্মাল ওই অজানা-অচেনা যুবতীর প্রতিনারী স্বাধীনতা কী, ওর কাছে শুনতে খুব ইচ্ছে করছিলো তার চাকরির এই আকাল-যুগে ও যে বেরিয়ে এসেছে এই আগুন-রোদের তলায়, নেমে এসেছে এই শক্ত-পাথুরে মাটিতে জীবন-যুদ্ধে জয়ী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে, এখানেই অর্ধেক যুদ্ধ জিতে গেছে সে। মনে মনে তাকে শুভ কামনা জানাল, আর বাকি অর্ধেকটা যে-দিন নিজের চাকরির টাকায় সত্যি সত্যি মাছ ভাত খাবে সে-দিন জিতবে!  

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই দোকানদার ভাতের থালাটা নিয়ে হাজির তার সামনে রেখে বললো আমি ভুল করে সোয়াবিনটা দিয়ে ফেলেছি খেয়ে নিন প্লীজআর হ্যাঁ, ওই তিরিশ টাকাই দেবেন বেশি দিতে হবে না।
কিন্তু আমি তো শুধু আলুভাজা...। 
আমি ভুল করে তরকারিটা দিয়ে ফেলেছি। আপনি না খেলে এই খাবারটা পুরোটাই নষ্ট হবে। খেয়ে নিন প্লীজ। ভুলটা তো আমার। তাই তিরিশ টাকাই নেবো।

দোকানদারের সাথে শাহিদের বেশ সখ্যতা। দীর্ঘ দিনের আলাপ তাঁদের। তাঁরা ক’জন সহকর্মী সপ্তাহে প্রায় পাঁচ দিনই তার দোকানে দুপুরের খাবার খায়। ওই যুবতীকে খাবারটা দিয়ে এসে দোকানদার শাহিদের দিকে তাকিয়ে চাপাস্বরে বলল ব্যাবসায় শুধু লাভ খুঁজলে হবে দাদা এরকম ভুল করার সুযোগও তো খুঁজতে হবে ওর জোর খিদে পেয়েছিলবনগাঁতে আমার যে-বোনটা থাকে, অবিকল ওর মতো দেখতে। দু’জনই একই বয়সের।

বলে আবারও নির্লিপ্ত মুখে হারিয়ে গেল সে চা-সিগারেট-ভাত-তরকারির দুনিয়ায় শাহিদ ভাবতে লাগল, আজকের এই খণ্ড যুদ্ধে কে জয়ী হল? চাকরির খোঁজে রোদে পোড়া যুবতী, নাকি বনগাঁর সেই যুবতী, নাকি তার দাদা যে সল্টলেকের অথৈ ভিড়ে এক অচেনা যুবতীর মধ্যে নিজের বোনকে খুঁজে নিয়ে দিব্যি আপ্যায়ন করল? হয়তো নিজ নিজ জায়গায় তাঁরা সকলেই জয়ী! তবে মনে মনে সে কুর্নিশ করলো ওই দোকানদারকে এবং ভাবতে লাগলো, জীবন-যুদ্ধ যে কত কঠিন যে বোঝে সে-ই জানে যোদ্ধার রক্ত, ঘাম ও ক্ষিদের মূল্য!

সহকর্মীদের সাথে পায়চারী করতে করতে শাহিদ পৌঁছে গেল অফিস বিল্ডিঙয়ের নীচে। তখনো তার চোখে ভাসছে ওই যুবতীর করুণ মুখটা। লিফটে উঠে ১২ নম্বর বাটান প্রেস করলো। লিফট উপরে উঠতে লাগলো। হঠাৎ তার মনে পড়ল, দু’ সপ্তাহ বাদে তো ইদুল্‌ আজ়্হ়া। তার কলেজ-পড়ুয়া বোন খুব বায়না ধরেছে এবার এক খানা ভালো এন্ডরোয়েড কিনে দিতে। মনে মনে স্থির করলো, “আমি না হয় আরও দু’ মাস নিজের ভাঙ্গা ফোনটাই ইউজ করবো। তবে এবার ঈদে বোনকে একটা ভালো এন্ডরোয়েড কিনে দেবোই।”   

২১-০৯-২০১৮  
কোলকাতা-৩৯  

আইডেন্টিটি ক্রাইসি...!


আইডেন্টিটি ক্রাইসিস...! 

অনেক দিন আগেই দেখেছিলাম। ক'দিন আগে আরেকবার দেখলাম, 'জিন্দেগী লাইভ' অনুষ্ঠানের ঐ এপিসোডটা। হ্যাঁ, যেটাতে রিচা অনিরুদ্ধ মহাশয়া আনসার শেখের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। আনসার শেখকে আমাদের সবার মনে আছে। মনে থাকাটাই স্বাভাবিক; এমন সাফল্য ক'জন অর্জন করতে পারে বলুন। তাও আবার চরম দারিদ্র্যকে পরাজিত করে। মাত্র একুশ বছর বয়সে। সর্বকনিষ্ঠ আই এ এস সে। সেদিন তাঁর একটা কথা আমার ভেতরটাকে তোলপাড় করে তুলেছিল। সঞ্চালক যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, 'যদি আপনি অতীতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পান, তাহলে আপনি কী হতে বা করতে চাইবেন?'। আনসার-এর উত্তর, 'একজন আই এ এস অফিসারের সন্তান...'। এই সহজ উত্তরটার মধ্যে লুকিয়ে আছে অনেক না-বলা কথা; যন্ত্রণার এক দীর্ঘ কেচ্ছা। 

পুনেতে পড়াশুনার জন্য যে ঘরে তাঁর ঠাই হয়েছিল, শুনেছি প্রকৃত পরিচয় গোপন করে। এ কি কম যাতনার কথা! যেন মাহ্‌মুদ দারবিশের বিখ্যাত সৃষ্টি 'আমার পরিচয় পত্র'-র পুনরাবৃত্তি। এটা কিন্তু একটা ট্র্যান্ড-এ পরিণত হয়েছে, আজকাল। মুম্বাইয়ের এক বিশেষ স্থানে কোন এক অভিনেতাকে ফ্ল্যাট কিনতে দেওয়া হয়নি। ধীরে ধীরে এ মানসিকতা মহানগর থেকে শহর, শহর থেকে শহরতলী, গ্রাম সর্বত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। গত মাসেই বাঁশদ্রোণীতে একটা ফ্ল্যাট-ভাড়াকে কেন্দ্র করে বেশ ধুন্ধুমার লেগে গেছিল। উল্লেখ্য, ঐ ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া ছিলেন চারজন ডাক্তার; তবে সবাই 'ম্লেচ্ছ'। যাদবপুর, বেলঘরিয়া ও দমদমের বহু মেসে এমনটা ঘটে থাকে- মেস বা বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রে সব কথা ফাইনাল, যেমনি নাম শুনলেন- 'অন্য বাড়ি দেখো। আমি তোমাদেরকে ভাড়া দিতে পারবো না'। তবে এর বিপরীতও ঘটে। কিছুজন বাড়ি ভাড়া দেন; ভাড়াটিয়াদের খেয়ালও রাখেন। এমন দুটো মজার ঘটনা বলি-

২০০৯-র জুলাই-আগস্ট। এক বন্ধু মেডিকেলের জন্য কোচিং নিল। অনেক কষ্টে একটা রুম পেল, দমদমে। কাকিমা অমত করলেও কাকু বেশ সন্তোষ প্রকাশ করলেন। ছেলেটি মেডিকেলে ভালো র‍্যাংক করে ভর্তি হল; ভর্তির দিন তাঁর সাথে সেই কাকুও হাজির ছিলেন। যেন তাঁর নিজের 'সন্তান' মেডিকেলে সুযোগ পেয়েছে।

দ্বিতীয়টা গল্পটা আমার ইতিহাসের এক স্যার শুনিয়েছিলেন। তাঁর এক ডাক্তার বন্ধু বিশেষ কারণে বেলঘরিয়ার কোন এক জায়গায় ঘর ভাড়া নিলেন। 'মুছল্‌মান'-কে ঘর ভাড়া দেওয়ার কারণে এলাকার পণ্ডিত মশাই ঐ বাড়িতে পূজা দিতে নারাজ। বাধ্য হয়ে বাড়ির মালিক কাজ চালাবার মত ধর্মাচরণ শিখে ফেললেন। দিন কাটছিল, এক রাতে পণ্ডিত মশাই পেটের যন্ত্রণায় কাতর। কাটা মাছের মত ছটফট করছেন। নিরুপায় হয়ে লোকে ঐ ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসল। ডাক্তার নিজের কাজ করলেন...। পরদিন সকালে পণ্ডিত মশাই হাজির সেই বাড়িতে। নিজের ভুল শুধরোতে। বাড়ির মালিক ক্ষুব্ধ-কণ্ঠে বলেছিলেন, 'আমি যে এখন পূজা করতে শিখে গেছি...!' 

এমন ভুল হয়তো আমরা সবাই করে থাকি। তবে ভুলটা বুঝতে পেরে, নিজেকে শুধরোতে ক'জন প্রস্তুত? ও হ্যাঁ, আমরা অনেকে আবার নিজেকে জাহির করতে, নিজের ভুল ঢাকতে অপকৌশলও করি। যেমনটা আজকাল পশ্চিমবঙ্গে কিছু বামপন্থী করছে। দুঃখিত, কিছু 'মেকী-বামপন্থী'; যারা বামপন্থা শিখতে মাঝেসাঝে নাগপুরে যাচ্ছে...।  

আব্দুল মাতিন ওয়াসিম    
  

   

মায়েরা অমনই হয়...!


মায়েরা অমনই হয়...!
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম
বহু বছর আগের কথা। আমি তখন খুউউব ছোট। থাকি কিশানগঞ্জে। একটি মাদ্‌রাসায় পড়ি সেখানে। ঐ মাদ্‌রাসায় আমাদের সবই পড়ানো হতো- ইংরেজি, বাংলা, হিন্দি, আরবি, উর্দু, এমনকি ফার্সিও। ইস্‌লামিক স্টাডিজ ও থিওলজির পাশাপাশি আমাদের শেখানো হতো অংক, ইতিহাস, কম্পিউটার ও বিজ্ঞানের পাঠ। সেবার ছুটি কাটিয়ে ফিরছি হস্টেলে। চাষির ছেলে আমি; আশৈশব অর্থ-সংকটকে সঙ্গী করে এগিয়ে চলেছি। বাড়ি থেকে যা টাকা দিয়েছিল, বোর্ডিং ফিজ ও পকেটমানি সব মিলিয়ে তা যথেষ্ট ছিল না। হয়তো আমার চোখমুখ দেখে মা সেটা বুঝতে পেরেছিল। তাই অতি কষ্টে জমানো পাঁচশো টাকা- মা যেটা জমিয়ে রেখেছিল একটা ভালো শাড়ি কিনবে বলে, সবার চোখ এড়িয়ে আমার হাতে গুঁজে দিয়েছিল। সেদিন ঐ টাকাগুলো পেয়ে খুব খুশী হয়েছিলাম। কিন্তু আজ যখন মনে পড়ে সেদিনের কথা, বুকের ভেতরটা কেমন ছটফট করে। মনের গহীন থেকে শব্দরা হুড়োহুড়ি করে বেরোতে গিয়ে কম্পমান ঠোঁটের ডগায় গিয়ে ধাক্কা খায়। বলতে পারি না সেসব কথা। শুধু একটা কথা খুব সহজে বলতে পারি আমি, মা তোমাকে ভালোবাসি। খুউউব ভালোবাসি; সবার থেকে বেশী। 
আমার বিশ্বাস সব মায়েরাই অমন। হয়তো তাই, মায়ের পায়ের তলে কোথাও জান্নাত, তো কোথাও স্বর্গ, তো কোথাও প্যারাডাইজ...।

Monday, 17 September 2018

আব্দুল মাতিন ওয়াসিমঃ আমি এখন স্বপ্নবিহীন...!


আমি এখন স্বপ্নবিহীন...!
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

এই কদিন কোনকিছুই লিখতে পারছিনা। লিখতে বসলে শব্দগুলো কেমন জড়িয়ে যাচ্ছে। ভাবনাগুলো থেমে থেমে আসছে। রাজনৈতিক চাপানউতোরের মাঝে আর্থসামাজিক ইস্যুগুলো কেমন কিলবিল করছে মাথার মধ্যে। স্মৃতি হাতড়ে পূর্বের কোনো দিন বা মুহূর্ত ঘুরে আসলে সেই স্মৃতিই বারবার জারণ করছে মনকে; অজান্তেই কখনো এক চিলতে হাঁসি ভেসে উঠছে ঠোঁটের কোণে, তো কখনো চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে এক-আধ ফোঁটা অশ্রু। 
আমি চাষির ছেলে। আর্থিক সংকটকে গল্প-কাহিনী-সিনেমা-সিরিয়াল দিয়ে নয়; বাস্তব জীবন থেকে অনুভব করেছি। তাই আমার শৈশব-কৈশোর-তারুণ্য-যৌবনের উচ্ছলতা-উচ্ছ্বাস-আবেগ-উল্লাস সব তিল তিল করে জমানো ছিল বুকে; বেশ গভীর ভাবে। স্বপ্ন ছিল, ভালোভাবে পড়াশুনা করে আগে একটা চাকরি পেতে হবে। তারপর সেই স্বপ্নের জগতে পাড়ি জমাবো। এক এক করে জয় করবো পরিকল্পনার কেল্লা-প্রাসাদকে...। 
কিন্তু, আজকাল আমি কেমন যেন গুটিয়ে গেছি। আগে বন্ধুদের মাঝে সারাক্ষণ বকবক করতাম। এখন বন্ধুদের থেকে আড়ালে থাকি; তাঁদের ফোন ধরিনা। এড়িয়ে যাই। ডাকলেও যাই না। তাই, কেউ কেউ ভাবে, আমি চাকরি পেয়ে বদলে গেছি। জানি না, তাঁরা ঠিক না ভুল। তবে, হ্যাঁ বদলে গেছি আমি; চাকরি পেয়ে নয়। আসলে আমার ভাবনাগুলো বদলে গেছে। ভেঙে গেছে আমার স্বপ্নে গড়া সেই জগত। একটা একটা করে খসে পড়ছে ইচ্ছার সব তারারা। একটু একটু করে ধসে যাচ্ছে আত্মবিশ্বাসের সেই গগনচুম্বী প্রাচীর। তবে আমি আজও থেমে নেই; হেঁটে চলেছি দিগদিগন্তে; উদ্ভ্রান্তের মতো; অজানার পাণে...। 
হয়তো, আজ আমি অসহায়; বালক ইউসুফের মতো; যাকে কুয়োতে নিক্ষেপ করেছিল তাঁর সহোদরেরা...। 
আজ আমি স্বপ্নবিহীন। মনের গহীনে লালিত স্বপ্নেরা পালিয়েছে আমায় ফেলে এই ঘন অন্ধকারের চাদরে-মোড়া সমাজ-কুয়োতে। যেভাবে ঠিকাদার ফেলে যায় রাস্তার ধারে তাঁর বিকল রোড-রোলার!

Sunday, 16 September 2018

কারবালাঃ ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায় - ড. আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



আশুরা অর্থাৎ ১০ই মুহার্‌রাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন একটা দিন এ দিনেই মুসা (আঃ) ও তাঁর অনুসারীরা ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন আর এ জন্যই মদিনার ইহুদিরা এ দিন রোযা রাখত। তা দেখে নবী (সাঃ)-ও ৯-১০ বা ১০-১১ সিয়াম পালনের অসিয়ত করেন (বুখারি ৩২১৬, আহ্‌মাদ ২১৫৫)। কিন্তু উপমহাদেশে এ দিনটি স্মরণীয় হয়ে আছে কারবালা-কে কেন্দ্র করে; বহু ইতিহাস-গ্রন্থে এই মর্মন্তুদ ঘটনার বাস্তব আখ্যানকে ঘিরে রেখেছে পাথর উল্টালে রক্ত বের হত, সূর্যগ্রহণ লেগেছিল, আকাশের দিগন্ত লাল হয়েগেছিল, আকাশ থেকে পাথর পড়ছিল-র মত গল্পের আগাছারা।  

৬০ হিজ্‌রিতে ইয়াযিদ পিতা কর্তৃক খলিফা নিযুক্ত হতেই শুরু হয় বিতর্ক। সাইয়েদুনা হুসাইন (রাঃ)-ও তাঁকে মেনে নেননি। চলে আসেন মক্কায় (আল্‌-বিদায়াহ্‌ ওয়ান্‌-নিহায়াহ্‌ ১১/৪৭৭)। এখানে কুফা-বাসীদের বারো হাজার চিঠি, ইয়াযিদের প্রতি অসন্তোষের খবর নিয়ে তাঁর নিকট পৌঁছলে তিনি পিতৃব্য-তনয় মুস্‌লিম বিন আকিল-কে কুফার মনোভাব যাচাই করতে পাঠান। ইমাম হুসাইন (রাঃ)-এর খেলাফতের প্রতি লোকেদের আবেগ ও উৎসাহ দেখে মুসলিম বিন আকিল তা চিঠি মারফৎ জানালেন। আঠারো হাজার অত্যুৎসাহী লোক হানি বিন উর্‌ওয়া-র ঘরে ইমাম হুসাইনের পক্ষে মুসলিম বিন আকিলের হাতে বায়াতও করে ফেলেন (তারীখুত্‌ ত্বাবারী ৬/২২৪)। অন্যদিকে, ইয়াযিদ এ খবর পেয়ে উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদ-কে কুফার গভর্নর নিযুক্ত করেন। উবাইদুল্লাহর চক্রান্তের শিকার হয়ে চার হাজার সমর্থক নিয়ে মুসলিম বিন আকিল তাঁর প্রাসাদ ঘেরাও করেন কিন্তু উবাইদুল্লাহর ভাষণ শুনে ও তার সেনাবাহিনীর ভয়ে একে একে সকলে মুসলিম বিন আকিলের সঙ্গ ত্যাগ করে (আল্‌-কামিল, ইব্‌নুল আসীর ৩/১৪২)। সূর্যাস্তের পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। মৃত্যুর পূর্বে তিনি ইমাম হুসাইন (রাঃ)-কে চিঠি লেখেন- হুসাইন! পরিবার-পরিজন নিয়ে ফিরে যাও। কুফাবাসীদের আদিখ্যেতায় প্রতারিত হবে না। এরা তোমাকে মিথ্যা বলেছে। আমাকেও মিথ্যা বলেছে (মুখ্‌তাসারু সীরাতিল খুলাফা আর্‌-রাশিদীন, নাসির আস্‌-সাইফ ২৫) 

ওদিকে, প্রথম চিঠির উপর ভিত্তি করে ৮২ জন সহযাত্রী নিয়ে যিল্‌হাজ্জ মাসের ৮ তারিখে ইমাম হুসাইন (রাঃ) ইবনে আব্বাস, ইবনে উমর, ইবনে যুবাইরইবনে আম্‌র-(রাঃ)-দের বাধা-নিষেধ উপেক্ষা করে (আল্‌-বিদায়াহ্‌ ওয়ান্‌-নিহায়াহ্‌ ৮/১৬১-১৬৩) কুফার উদ্দেশ্যে রওনা দেন (ত্বাবাক্বাতু ইব্‌নে সাদ ১/৪৫১) মাঝপথে দ্বিতীয় চিঠিটি তাঁর হস্তগত হয়। চিঠি পড়ে তিনি কুফার পথ পরিহার করে ইয়াযিদের কাছে যাওয়ার জন্য সিরিয়া অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকেন। পথিমধ্যে ইবনে যিয়াদের সেনাবাহিনী আম্‌র বিন সাদশিম্‌র বিন যিল-জাওশান ও হুসাইন বিন তামিমের নেতৃত্বে কারবালার প্রান্তরে ইমাম হুসাইনের (রাঃ) পথ আটকায় ইমাম হুসাইন (রাঃ) তাদেরকে প্রস্তাব দেন– 
১) আমাকে মদিনা ফিরে যেতে দাও। 
২) অথবা আমাকে বায়াতের জন্য ইয়াযিদের কাছে যেতে দাও 
৩) অথবা কোন সীমান্তবর্তী অঞ্চলে যেতে দাও, সেখানে আমি  জিহাদ করবো ও সীমানা পাহারা দেব। (সিয়ারু আ’লামিন্‌ নুবালা ৩/৩১১)  

কিন্তু তারা রাজি হয়নি। আর তাই তাদের এক সেনাপতি হুর বিন ইয়াযিদ ক্ষুব্ধ হয়ে হুসাইন (রাঃ)-এর পক্ষে চলে যান। ইমাম হুসাইন (রাঃ) পরিবার-পরিজন ও মুষ্টিমেয় সহযোদ্ধাদের নিয়ে বীরত্বের সাথে লড়তে লড়তে শিম্‌রের বর্শা-বিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন (আল্‌-কামিল, ইবনুল আসীর ৩/১৮৩) নিহত হওয়ার পূর্বে ইরাকবাসীদের বলেন, “তোমরা কি চিঠির মাধ্যমে আমাকে এখানে আসতে আহবান করোনিআমাকে সাহায্য করার ওয়াদা করোনিঅকল্যাণ হোক তোমাদের...!” (তারীখুত্‌ ত্বাবারী ৪/৪০১-৪০২) 

এবার প্রশ্ন, তাহলে ইমাম হুসাইন (রাঃ)-এর হত্যার জন্য দায়ী কে? ইব্‌নে তাইমিয়া ও অন্যান্য ঐতিহাসিক-মুহাদ্দিসদের মতে ইয়াযিদ হত্যার আদেশ দেয়নি। সে উবাইদুল্লাহকে পাঠিয়ে ছিল হুসাইন (রাঃ)-কে বায়আত (শপথ) গ্রহণ থেকে বিরত রাখার নিমিত্তে এই মর্মান্তিক খবর পেয়ে সে আফসোস করেছিল এবং পরিবারের জীবিত সদস্যদেরকে সসম্মানে মদিনা পাঠানোর ব্যবস্থাও করেছিল। সেই সাথে উবাইদুল্লাহকে অভিশাপও দিয়েছিল (মিন্‌হাজুস্‌ সুন্নাহ্‌ ৪/৪৭২)। তবে ইবনে কাসীর, ইব্‌নুল আসীর, ইবনে খাল্‌দূন ও ইমাম যাহাবী (রাহঃ)-এর মতে খলিফা ও শাসক হওয়ার দরুন ইমাম হুসাইন (রাঃ)-এর হত্যার দায় খানিকটা হলেও তার উপর বর্তাবে। 

আমি মনে করি, ইয়াযিদের বিষয়ে নীরব থাকাই শ্রেয়। না তাকে তিরস্কার করা উচিৎ আর না তার সাফাই গাওয়া। কারণ সে এখন মৃত। নিজ কৃতকর্ম অনুযায়ী ফল পেয়ে গেছে। তাছাড়া, ৪৯ হিজ্‌রিতে কন্‌স্ট্যান্টিনোপলের যুদ্ধে তার নেতৃত্বে ইমাম হুসাইন, ইবনে আব্বাস, ইবনে উমার, ইবনে যুবাইর, আবু আইয়ুব-(রাঃ) প্রমুখ সাহাবি শামিল হয়েছিলেন (তারীখুত্‌ ত্বাবারী ৫/২৩২)। আর এই যুদ্ধে সকল অংশগ্রহণকারীদের জন্য ক্ষমার সুসংবাদ স্বয়ং নবীজি (সাঃ) প্রদান করে গেছেন (বুখারি ২৭৬৬)   

শেষে বলব, কোনো মৃত বা শহীদের জন্য পরিবার-আত্মীয়-অনুগামীদের মন খারাপ হবে, কান্না পাবে এটাই স্বাভাবিক; স্বয়ং নবী (সাঃ)-এরও এমনটাই হয়েছিল (মুস্‌লিম ৯৭৬)। তবে নাওহা-বিলাপ ইসলামে অবৈধ (বুখারি ১২৩২)। আর বিলাপকারীদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তির বিধানও (মুস্‌লিম ১৬১৩) বরং, সুন্নাহ্‌ অনুযায়ী মুহার্‌রামের ৯-১০ বা ১০-১১ সিয়াম পালন করাই বাঞ্ছনীয়। 

[দৈনিক পূবের কলম, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮-তে 'হৃদয়বিদারক কারবালা' শিরোনামে প্রকাশিত]