Pages

Showing posts with label মা. Show all posts
Showing posts with label মা. Show all posts

Tuesday, 9 June 2026

ত্যাগের সফর - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



আমার মা ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। গ্রামেই একটা প্রাইমারী স্কুল ছিল সেখানে। তারপর আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। সেই প্রত্যন্ত গ্রামে তখন মেয়েদের পড়াশোনার তেমন পরিবেশই ছিল না। আশেপাশে স্কুলও ছিল নাকিন্তু মায়ের ভেতরে শেখার একটা অদ্ভুদ জেদ ছিল। আর তাই গ্রামের অন্য মেয়েদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত মসজিদে যেতেন পড়তে। সেখানে কুরআন শরীফ পড়েছেন, উর্দুর পহেলি, দোসরী, তিসরী পর্যন্ত শেষ করেছেন। ফিকাহ মুহাম্মদীখতম করেছিলেন বেশ আগ্রহ আর নিষ্ঠার সাথেমা এখনও রোজ সকালে কিছুক্ষণ কুরআন তেলাওয়াত করেন। তারপর কিছুক্ষণ অর্থ সহ কুরআন পড়ার চেষ্টা করেন।
 
বাবা তখন কলেজে পড়তেন। লজিং থাকতেন যে বাড়িতে, সেটি ছিল মায়ের ফুফুর বাড়ি এবং আমার বড় আম্মার বাপের বাড়ি। আত্মীয়তার সূত্রে সবাই পরিচিত। বাবা ছিলেন শান্ত স্বভাবের, ভদ্র, পড়াশোনা জানা এক তরুণ। তাই বড় আম্মা নিজের দেওরের জন্য মায়ের কথা ভাবেন। তারপর দেখাশোনা হয়, কথাবার্তা চলে, আর এভাবেই একদিন তাঁদের বিয়ে হয়ে যায়।
 
ছোটবেলা থেকেই মাকে আমি দেখেছি এক অসম্ভব লড়াকু মানুষ হিসেবে। জীবনের কাছে তিনি কখনো সহজে হার মানেননি। দাঁতে দাঁত চেপে সংসারের সমস্ত ঝড় সামলেছেনঅভাব, অনটন, কষ্ট সবকিছুকে নিজের ভেতরে লুকিয়ে রেখে আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তাঁর মুখে কষ্টের শব্দ আমি খুব কমই শুনেছি, কিন্তু তাঁর ত্যাগের ছাপ ছড়িয়ে আছে আমার পুরো জীবনজুড়ে।
 
মনে পড়ে, আমি তখন খুব ছোট। আমাকে সাথে নিয়েই মা নামাজ পড়তেন। বাড়িতে আর কেউ ছিল না আমাকে দেখার মতো। বাবা ও দাদারা সবাই গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত। মা নামাজ পড়তেন আর আমি জায়নামাজের এধারওধার বসে খেলতাম। আর মা যখন সাজদায় যেতেন, আমি দৌড়ে গিয়ে তাঁর পিঠে চেপে বসতাম। ফলে মা দীর্ঘক্ষণ সাজদায় পড়ে থাকতেন। তিনি ভয় পেতেন, সাজদা থেকে মাথা তুললে পাছে যদি আমি পড়ে যাই! একজন মায়ের সাজদাও তখন সন্তানের নিরাপত্তার জন্য থমকে যেতো 
 
আরও মনে পড়ে, রাতের বেলা রান্নাঘরে মা রান্না করতেন, আর সেই রান্নার ফাঁকেই চলত আমার পড়াশোনা। কড়াইয়ে তরকারি ফুটছে, চুলোর আগুন লাল হয়ে জ্বলছে, আর মা আমাকে অ আ ক খশেখাচ্ছেন। স্লেটে লিখে দিয়ে তার উপর হাত বোলাতে বলছেন। কখনো ছড়া শোনাচ্ছেন—“আতা গাছে তোতা পাখি”, কখনো হাট্টিমাটিম টিম”, কখনো বা ঘরে আছে হুল বিড়াল কোমর বেঁধেছে”… বোধ করি, আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্কুল ছিল সেই মাটির রান্নাঘর, আর আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক আমার মা।
 
যখন আরও একটু বড় হলাম, তখন মা শুধু পড়াতেন না, নিয়ম করে লেখাতেনও। তাঁর নিজের পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি, কিন্তু আমার পড়াশোনার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহের কোনো কমতি ছিল না। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় তিনি আমাকে দোয়াদরূদ শেখাতেন ঘুমোতে যাওয়ার দোয়া, ঘুম থেকে ওঠার দোয়া, পেচ্ছাব-পায়খানায় যাওয়ার দোয়া, ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া, আয়াতুল কুরসি, আরও কতো কিছু। এভাবে অজান্তেই আমার ছোট্ট হৃদয়ের ভেতর তিনি ধর্ম, শিষ্টাচার জীবনের সৌন্দর্য বুনে দিতেন।
 
রমজান মাসে ভোরবেলা ফজরের নামাজের পর মা কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আমি তখন তাঁর পাশেই জায়নামাজের উপর বালিশ মাথায় ঘুমিয়ে থাকতাম। আধোঘুমে কুরআনের সেই সুরেলা তিলাওয়াত শুনতে শুনতে কখন যে সকাল হয়ে যেত, বুঝতেই পারতাম না। আজও মাঝেসাঝে, ফজরের পর কুরআনের তিলাওয়াত শুনলে আমার মনের আকাশে ভেসে ওঠে মায়ের সাদা ওড়না, ভোরের নরম আলো আর এক অপার্থিব প্রশান্তি।
 
তারপর, ১৯৯৫ সালের শেষের দিকে আমি হোস্টেলে চলে গেলাম। এই প্রথম মাকে ছেড়ে বাড়ির বাইরে থাকা। বুকের ভেতরটা যেন সবসময় খালি খালি লাগত। পৌনে দুমাস পর কুরবানির ছুটিতে বাড়ি ফিরলাম। বাড়িতে পৌঁছাতেই মা আমাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদে ফেললেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন— “এই প্রথম এক মাস তেইশ দিন মুই তোক ছাড়ি থাকিনু বাপ…”
 
সেই প্রকম্পিত কণ্ঠ আজও আমার কানে বাজে। তখন ঠিক মতো ঠাহর করতে পারিনি, কিন্তু আজ ভালোভাবেই বুঝি সন্তানের দূরত্বে শুধু সন্তানের কষ্ট হয় না, মা-বাবা বুকও সমান শূন্য হয়ে যায়।
 
আরও কবছর পরের কথা। রমজান ঈদের ছুটি শেষে আবার হোস্টেলে ফিরবো। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক দুশ্চিন্তা বাসা বেঁধেছেআমি তো চাষির ছেলে। অভাব-অনটন আমাদের নিত্যসঙ্গী। বাড়ি থেকে যে টাকা পেয়েছিলাম, তা দিয়ে বোর্ডিং ফি আর মাসের খরচ টেনেটুনে পার হবে কথা আমি যেমন বুঝছিলাম, মাও নিশ্চয়ই বুঝেছিলেন। তবে আমার কাছে শুনে নয়, আমার চোখের ভাষা পড়ে। মায়েরা বোধহয় এমনই, না বললেও সব বুঝে যা  
 
সেদিন বিকেলে বাড়ির ভেতরে হালকা ব্যস্ততা বিরাজ করছিলকেউ রান্নাঘরে, কেউ উঠোনে, কেউ বারান্দায়। মা নিঃশব্দে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন এক কোণেচারপাশে একবার তাকালেনকেউ দেখছে কি নাতারপর আলমারির ভেতর থেকে খুব যত্ন করে ভাঁজ করা একটা পুরনো কাপড় বের করলেন। কাপড়টার ভেতরে লুকানো ছিল কিছু টাকাসম্ভবত বহুদিন ধরে জমিয়ে রাখা তাঁর গোপন সঞ্চয়। হয়তো নিজের কোনো শখ বিসর্জন দিয়ে, হয়তো নতুন কাপড় না কিনে, হয়তো বা হাজারো ছোট ছোট ইচ্ছা চেপে রেখে জমিয়েছিলেন সেই টাকাগুলো। মা আস্তে করে টাকাগুলো আমার হাতে গুঁজে দিলেন। তারপর আমার হাতটা শক্ত করে ধরে নিচু স্বরে বললেন— “খবরদার, কাউকে বলবি নারেখে দে। কাজে লাগবে।
 
তারপর বহু বছর কেটে গেছে। কোথাও তুলাইয়ের পাড় ভেঙ্গেছে, তো কোথাও তার গতিপথই সংকুচিত হয়ে গেছে। সময়ের স্রোতে আমিও সংসারী হয়েছি। নিজের সন্তান, নিজের দায়িত্ব, জীবনের হিসাব-কেতাব সব মিলিয়ে আমিও এখন বুঝতে শিখে গেছি সংসারের বোঝা কাকে বলে। এবার ঈদের ছুটিতে বাড়ি গেছিলাম। একদিন রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে বাড়ির সবাই প্রায় ঘুমিয়ে গেছে। চারপাশ পুরো নিস্তব্ধদূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। আমি আর মা মুখোমুখি বসে গল্প করছি গ্রামের মানুষজন, আত্মীয়স্বজন, সংসারের টুকিটাকি হিসাব, পুরোনো দিনের স্মৃতি নানা বিষয় নিয়ে হঠাৎ মা জিজ্ঞেস করে বসলেন— “সাবাকে স্কুলে ভর্তি করাতে কতো টাকা লাগলো বাবু?”
আমি টাকার অঙ্কটা বললাম। মা মন দিয়ে শুনলেন। তারপর আবার জিজ্ঞেস করলেন— “মাসে মাসে ফি কতো?”
—“চার-সাড়ে চার হাজারের মতো।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার জিজ্ঞেস করলেন— “আর যাওয়া-আসা?”
আমি হেসে বললাম—“স্কুটি করে দিয়ে আসবো-নিয়ে আসবো, কখনো সাহানা গিয়ে নিয়ে আসবে
 
মা চুপ করে রইলেন। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছিলাম, ভেতরে ভেতরে কীসের যেন হিসেব কষছেন। কিছুক্ষণ পর ধীর এবং দৃঢ় কণ্ঠে বললেন— “আমাকে আর মাসে মাসে হাতখরচের টাকা দিতে হবে না।
আমি চমকে উঠলামলোকমুখে শুনেছিলাম, মায়েরা সন্তানের বোঝা সন্তানের অজান্তেই নিজের কাঁধে তুলে নেন, এ যেন ঠিক তেমনজিজ্ঞেস করলাম— “কিন্তু তোমার ওষুধপাতি?”
মা খুব সহজ গলায় বললেন— “সে চলে যাবে। তোমার এখন অনেক খরচ। সাবার স্কুল ফি, টিউশন, বইখাতা, জামাকাপড়আবার ওদিকে ফ্ল্যাটের ইএমআই…”
 
কথাগুলো তিনি এমনভাবে বলছিলেন, যেন তাঁর নিজের প্রয়োজন বলে কিছুই নেই। যেন সন্তানের কষ্ট একটু কমাতে পারাই তাঁর সবচেয়ে বড় শান্তি। আমি চুপচাপ বসে ছিলাম। বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে আসছিল। মা হয়তো আমার নীরবতা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই নিজে থেকেখোলাসা করলেন— “অনন্তপুর, মানে আমরা নানীর বাড়ির অংশ পেয়েছি। সেই বাবদ কিছু টাকা হাতে এসেছে…”
 
এই বলে তিনি আঁচলের ভাঁজ খুলে কিছু টাকা বের করলেন। তারপর টাকাগুলো আমার হাতে দিয়ে বললেন— “এই টাকাগুলো সাবার কোনো কাজে লাগাবে”  
জিজ্ঞেস করলামশুধু সাবাকে দিচ্ছো?
না, না। তাহিনা ও সাদিয়ার জন্যও দিয়েছি। 
 
আমি নির্বাক হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, সময় যেন হঠাৎ থেমে গেছে। যে মানুষটা সারাজীবন নিজের চাওয়া-পাওয়াগুলো চুপচাপ বিসর্জন দিয়ে এসেছেন, বয়সের এই পড়ন্ত বেলাতেও তিনি নিজের জন্য কিছু রাখলেন না। নানীর বাড়ির জমির অংশ থেকে পাওয়া টাকাটুকুও নিজের ওষুধ, নিজের প্রয়োজন কিংবা একটু স্বস্তির জন্য সম্পূর্ণ খরচ না করে নাতনিদের ভবিষ্যতের কথা ভাবলেন।
 
আরও মনে হলো, পৃথিবীতে মানামের মানুষগুলো বোধহয় এমনই হয়তারা কখনো সত্যিকার অর্থে বুড়ো হন না, কখনো নিজের কথা ভাবতে শেখেন না। সন্তানের কষ্ট কমানোর চিন্তাটাই তাদের জীবনের শেষ বয়সে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হয়ে থাকে। আমি টাকাগুলো হাতে নিয়ে বসে ছিলাম। আর মনে হচ্ছিল, এই কাগজের নোটগুলোর ওজন যেন আমার পক্ষে অসহনীয়; কারণ তাতে মিশে ছিল আমার মায়ের অতুলনীয় ত্যাগ, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা নিঃশব্দ আত্মদান।
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
১৪ মে ২০২৬

Sunday, 10 May 2026

জ্বালুন-খড়ি - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে মফঃস্বলের কোনো গ্রামে শৈশবকে উৎরেছি, আমাদের ছেলেবেলার সেই দিনগুলো ছিল ধোঁয়া-ওঠা মাটির উনুনের মতোই সাদামাটা, কষ্টমাখা আমার খুব ভালোভাবেই মনে আছে, তখন শুধু আমাদের গ্রাম কেন, আশেপাশে পুরো এলাকাতেই কোথাও রান্নার গ্যাসের কোনো কানেকশনই ছিল না। প্রতিটি বাড়িতে রান্নাঘরের প্রাণ ছিল মাটির উনুনআমাদের আঞ্চলিক ভাষায় যাকে বলা হয় চুলা ও আখা প্রয়োজন ও সুবিধা মতো গ্রামে কারও ছিল একচুলিয়া, কারও দোচুলিয়া, আবার কারও আলকচুলা। সেই চুলা আগুন জ্বালাতে দরকার হতো শুকনো ডালপালা, খড়কুটো, পাটকাঠি, শুকনো পাতা, ঘুঁটে ইত্যাদির  
আমরা তিন ভাই। বাবা ছিলেন পেশায় চাষি। বড় দুই দাদা বাবার সাথে চাষবাসের কাজ করতেন। আর মা বাড়ির যাবতীয় কাজকর্ম প্রায় একা হাতে সামলাতেনতাঁর দিন শুরু হতো ভোরের আলো ফোটার আগেই, আর শেষ হতো গভীর রাতে। তবু তাঁর মুখে কখনো বিরক্তির ছাপ দেখিনিতাঁর ধর্মই ছিল নিঃশব্দে কাজ করে যাওয়া। মেজদা তখন থেকেই মায়ের ডান হাত হয়ে উঠেছিল। চাষবাসের কাজের পাশাপাশি রান্নাঘরে মাকে সাহায্য করত। ধীরে ধীরে তার রান্নার হাত এমন পাকাপোক্তলো যে, আজও বাড়িতে অতিথি এলে বা কোনো অনুষ্ঠান হলে, আমরা সবাই তার ওপর ভরসা করি
 
আমি তখন খুব ছোট। তবু নিজের মতো করে সংসারের কাজে জুড়ে যেতামকখনো কল থেকে মাকে জল এনে দিচ্ছি, তো কখনো জ্বালানি টেনে রান্নাঘরে পৌঁছে দিচ্ছি, আবার কখনো তেলের শিশি বা নুনের খুঁটি মায়ের হাতে তুলে দিচ্ছি। এই ছোটখাটো কাজগুলো করতে করতে মনে হতো, আমিও যেন মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর কষ্টটা একটু হলেও ভাগ করে নিচ্ছি।
 
রাতের বেলার সেই দৃশ্যগুলো আজও মনের ভেতর জ্বলজ্বল করেরান্নাঘরের এক কোণে হেরাকিনের ম্লান হলুদ আলো ধিকধিক করে জ্বলছে, কখনো বা নম্ফর জ্বলন্ত পলতেটা বাতাসের তোড়ে এধার-ওধার দুলছেমা বসে উনুনে জ্বাল দিচ্ছেন, আর আমি তাঁর পাশে বসে খাতায় হাতের লেখা লিখছি, কখনো বা স্কুলের পড়া করছি কোথাও আটকে গেলে মা বলে দিচ্ছেন। আর মাঝে মাঝে মা কোনো কাজ বললে, বইখাতা বন্ধ করে ছুটে গিয়ে তা করছিসেই ছোট্ট রান্নাঘরটাই যেন ছিল আমার প্রথম পাঠশালা, আর মা আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক।
 
যতদূর মনে পড়ে, আমাদের ছেলেবেলার একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল জ্বালানি সংগ্রহের তৎপরতাকারণ আমরা জানতাম, জ্বালানি ছাড়া উনুনে আগুন জ্বলবে না, আর আগুন না জ্বললে সংসারের চাকা থমকে যাবে। তাই সারা বছর ধরে আমরা বালকবালিকার দল এই জ্বালানি জোগাড়ের কাজে ব্যস্ত থাকতাম বিশেষ করে বর্ষার কথা ভেবে আগেভাগেই মজুত করে রাখতাম জ্বালুন-খড়িখড় ছিল গরু-মোষের খাবার, জ্বালানীর কাজে অধিক খড় ব্যবহার করলে গোরুমোষের খাবারের আকাল দেখা দিত। তাই শুধু খড়ের ওপর নির্ভর করা যেত না, আমাদেরকে অন্য উপায় খুঁজতে হতো।
 
যতদূর মনে পড়ে, অগ্রহায়ণ-পৌষের বিকেলগুলো ছিল আমাদের কাছে উৎসবের মতো। আমরা বাড়ির ছোটছোট ছেলেমেয়েরা স্কুল থেকে ফিরে দল বেঁধে কইদা মানে কাস্তে আর বস্তা নিয়ে মাঠে চলে যেতাম। ধান কাটার পর জমিতে পড়ে থাকা নাড়াগুলো কেটে আমরা এক জায়গায় জমা করতাম। তারপর সেগুলো বস্তায় ভরে মাথায় বা কাঁধে করে বাড়ি নিয়ে আসতাম। তা দেখে মায়ের মুখে ফুটে উঠত এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি। মাথায় হাত বুলিয়ে কপালে চুমু খেয়ে মা বলতেন—“মোর বাপটা আইজকা মেলায় কাজ কইছে!”  
 
কখনো আমরা বিকেলবেলা গাছে উঠে খেলার ছলে শুকনো ডালপালা ভেঙে নিচে ফেলতাম। তারপর আঁটি বেঁধে সেই ডালপালাগুলো মাথায় বা কাঁধে করে বয়ে বাড়ি নিয়ে আসতাম। আবার কখনো ঝড়ো হাওয়ায় তাল গাছের ঢাড্ডা বা নারকেল গাছের শুকনো বাজ্ঝা ভেঙ্গে পড়লে, তা কুড়িয়ে বাড়ি নিয়ে আসতাম। মা সেগুলো যত্ন করে তুলে রাখতেন বর্ষার কথা ভেবে, বা কোনো বিশেষ দিনের রান্নাবান্নার জন্য।
 
আরও মনে পড়ে, আমি, সুনতি দি, ক্ষিত্তি দি, বিমল দা আরও অনেকে, আমরা পার্শ্ববর্তী বাগানে বা পুকুরপাড়ে গাছতলায় যেতাম পাতাড়ি সাটতে গাছের শুকনো পাতাগুলো জড়ো করতাম তারপর সেগুলো বস্তায় ভরে বাড়ি নিয়ে আসতাম। রাস্তায় পরিচিত কারও সাথে দেখা হলে শুকনো পাতায় ভর্তি বস্তাগুলো দেখে সহসা জিজ্ঞেস করতো— “এতো লা জ্বালুন, তোরা কুঠি পাতাড়ি সাটিবা গেইছেনেন তে?!”  
 
এছাড়া গ্রীষ্মের ছুটিতে, কখনো সকালে তো কখনো বিকেলে, আমরা পুকুরপাড়ে গিয়ে নতকল্‌মু মানে কলমি লতা কাটতাম। তবে কোনো পাতায় অদ্ভুত আঁকাবাঁকা দাগ দেখলে সাপের ছবি ভেবে ভয় পেয়ে যেতাম। ক্ষিত্তি দি বলত—“ভাই, এইলা কাটি না। এইটাত মনে হয় মা মনসা ভর কছে।” তা শুনে, ভয়ে আমরা অমন কলমি লতার গায়ে হাত দিতাম না। কাটা হয়ে গেলে কলমি লতাগুলো বাড়ি এনে বটি দিয়ে চিরে রোদে শুকতে দিতাম। শুকিয়ে গেলে পরে আঁটি বেঁধে গোয়ালঘর বা ঘুন্ডিয়া মানে হাঁস-মুরগি রাখার ঘরের উপরে তুলে রাখতাম, বর্ষার দিনের জ্বালানি হিসেবে।
 
যখন আমরা আর একটু বড় হলাম, তখন দল বেঁধে অন্যের জমিতে সরিষা তোলার কাজ করতে যেতাম কোনো পারিশ্রমিক বা টাকাপয়সার লোভে নয়। কেবল এটুকুই যে, সরিষা মাড়াইয়ের পর গাছগুলো আমরা যে যার বাড়ি নিয়ে যেতামতারপর সেগুলোকে যত্ন করে জমিয়ে রাখতাম, সময়মতো জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করার জন্য।
 
তাছাড়া আষাঢ় মাসে পাটের সময় আমরা ছেলেছোকরার দল সকলে মিলে অন্যের পাট ধোয়ার কাজে লেগে যেতাম। নিয়ম ছিলপাট মালিকের, আর পাটকাঠিআমাদের। সেই পাটকাঠিগুলো শুকিয়ে বাড়ি নিয়ে আসতাম। তারপর সেগুলোকে সুন্দর করে আঁটি বেঁধে এমন জায়গায় রাখা হতো, যাতে ঝড়বৃষ্টিতে ভিজে না যায়। কেননা বর্ষার দিনে রান্নাবান্নার ক্ষেত্রে এই পাটকাঠিগুলোই ছিল আমাদের ভরসা।
 
ছেলেবেলার সেই দিনগুলোতে কখনো সকালে, আবার কখনো বিকেলে আমরা গোবর কুড়োতে যেতাম। মাঠে বা রাস্তায় পড়ে থাকা গোবর কুড়িয়ে এনে ঘুঁটে দিতাম। উপলা বানাতাম। তারপর সেগুলো শুকিয়ে বস্তায় ভরে রেখে দিতাম। পরে সেই ঘুঁটেই জ্বলে উঠত চুলার আগুনে, আর সেই আগুনেই রান্না হতো আমাদের ভাত-ডাল-সবজি  
 
আমাদের শৈশবের সেই দিনগুলো হয়তো কষ্টে ভরা, কিন্তু বেশ অর্থবহ ছিল! আমরা ছোটছোট ছেলেমেয়েরা মিলেমিশে এইসব কাজকর্ম করতাম। কাজের ফাঁকে হাসতাম, খেলতামআর এসবের পাশপাশি ধীরে ধীরে দায়িত্ব নিতেও শিখতাম। আমাদের প্রতিটা কাজের মধ্যে ছিল এক ধরণের আনন্দ, বিশেষ করে কোনো কাজের পর যখন মায়ের মুখে তৃপ্তির হাসি দেখতাম। ধোঁয়ায় ভরা রান্নাঘর, জ্বালুন-খড়ির জোগাড়, আর মায়ের স্নেহমাখা হাত এসবই তো আমাদের শৈশবের মূল্যবান স্মৃতি। আজও কখনো চোখ বুজলে মনে হয়, সেই চুলার আগুন এখনো নিভে যায়নি, শুধু সময়ের আড়ালে কোথাও লুকিয়ে ঢিপ ঢিপ করে জ্বলছে।
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
৩০ এপ্রিল ২০২৬

Monday, 13 July 2020

রাশীদ সালীম আল-খূরীঃ মায়ের কোলে



মায়ের কোলে  
রাশীদ সালীম আল্‌-খ়ূরী, লেবানন
 
মনে আছে তোমার, কত নিষ্ঠুর ছিলেন মুসা’র প্রভু
কত আনন্দ পেতেন তিনি রক্তপাতে!
মনে পড়ে, কীভাবে পরিবর্তন ঘটল তাঁর
কীভাবে তিনি হলেন দয়াদ্র, হলেন উদার
হলেন স্নেহপ্রবন আমাদের প্রতি, এত বেশি
যে আমাদের ব্যথায় তিনিও এখন ব্যথিত হন! 
কিন্তু, কীভাবে এতটা বদলে গেলেন তিনি?  
কীভাবে ঘটল তাঁর এই পরিবর্তন?
সে কথা লেখা আছে ইতিহাসের পাতায়;
লেখা আছে, বহু কাল আগে কোনো এক শহরে
লোকেরা একদিন কুড়িয়ে পেল একটি শিলালিপি;
যেটি ছিল কিছু অদ্ভুত ও অস্পষ্ট রেখায় ভর্তি 
প্রচুর ঘাম ঝরালো শহরের পণ্ডিত ও বিদ্বানেরা
তবে তার ভাব ও ভাষা উদ্ধার করতে পারল না তাঁরা।
অবশেষে একদিন উন্মোচিত হল তার রহস্য
একদল কবি স্পষ্ট করলেন তার উদ্দেশ্য; 
কারণ কবিতার স্পন্দন ও মর্ম কথা
কবিরা ছাড়া আর কে ভালো বোঝে, বলো!

লেখা ছিল তাতে, বহু কাল আগে
যীশুর আবির্ভাবেরও বহু আগে, প্রাচ্যের বুকে
মৃত্যু হয়েছিল এক প্রতিভাবান কবির
যে কবি নষ্ট করেছিল তার সারাটা জীবন পাপের সন্ধানে
বৈধ করে নিয়েছিল নিজের জন্য এমন সব কাজ ও কথা
আল্লাহ্‌র দৃষ্টিতে যেগুলো ছিল হারাম, ছিল কবিরা গোনাহ্‌
অতঃপর হাবিয়ার নিকষ কালো আগুণের ভেতর 
ফেরেশতারা যখন তাকে নিক্ষেপ করবে ভেবে প্রস্তুত
যে-সব অসৎ কর্ম সে পূর্বে করেছে তার শাস্তিস্বরূপ
ঠিক তখনই ঘোষনা করলেন ঈশ্বর তার ক্ষমার কথা  
মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহারের দরুন ক্ষমা করে দিলেন তাকে
ফলে নাজাত পেল সে হাবিয়ার লেলিহান অগ্নিশিখা থেকে
অতঃপর পুরস্কৃত করলেন তাকে, ঠিক যেমন ভাবে
পুরস্কৃত করা হয় কোনো সৎ-বিশ্বাসী মানুষকে
যেমনটা লেখা আছে সকল আসমানি কেতাবে;
তারপর ঘুমিয়ে পড়ল সেই কবি নবী ইব্‌রাহীমের কোলে
ভোরের একটু আগে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল তার
ঘুম থেকে উঠেই শুরু করে দিল চিৎকার
অভিযোগ করতে লাগল ঈশ্বরের নিকট নানা বিষয়ে
সঙ্গে জুড়ে দিল কান্নাকাটি, আর তার কান্নায়
ভারি হয়ে গেল স্বর্গের আকাশ
মাতমের বিষাদে আচ্ছন্ন হল সব কিছু
সঙ্গে সঙ্গে তাকে অভয় দিলেন ঈশ্বর
স্নেহের পরশ ও অফুরন্ত ভালোবাসায়
ভরিয়ে দিলেন তার মন, আনন্দ দিলেন তাকে
কোলে তুলে নিলেন যেভাবে মা নেয় নিজ সন্তানকে
তারপর বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলেন তার কপালে;
নবী দাউদের কণ্ঠ ছিল সুমধুর, তিনি ছিলেন আজ্ঞাবহ
তাই তাঁকে ডেকে গান গাইতে বললেন কবির জন্য
তাঁর গান শুনে পিতৃকোলেই ঘুমিয়ে পড়ল কবি;
অল্প কিছুক্ষণ পর যখন ঘুম ভাঙল তার
আবারও শুরু করল কান্নাকাটি
তা দেখে রেগে গেলেন স্বর্গবাসীরা
রেগে গেলেন ঈশ্বরও, বিরক্তির স্বরে বললেন—
আর কতদিন সহ্য করব আমি অমন অবাধ্যকে
যে ‘কাওসার’ পান করে বলে ‘গরল পান করছি’
যে পৃথিবীর বুকে অভিযোগ করত অন্যায়ের
কোনো রকমের অন্যায় ছাড়াই, আর এখন
এখানেও, স্বর্গেও সে অভিযোগ করছে অন্যায়ের;
কবিরা ইদানীং প্রায়শই লঙ্ঘন করছে তাদের সীমানা
তাদের সৃষ্টি যেন অর্থহীন, যেন অবাঞ্ছিত তারা।
অতঃপর কবিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন ঈশ্বর—
কেন কাঁদছো তুমি, কে আঘাত করেছে তোমায়?
কীসের এত অভিযোগ তোমার?
তুমি কি আমার ক্ষমার কথা ভেবে কাঁদছো?
নাকি, তোমাকে যে উত্তম প্রতিদান দিয়েছি তার জন্য?
এ কথা শুনে চিৎকার করে উঠল কবি, বলল—
প্রভু ক্ষমা করো আমায়, তুমি ছাড়া আর কে আছে আমার
তুমি ক্ষমা না করলে কে ক্ষমা করবে আর!
তাই তোমার নিকট আমার একটাই অনুরোধ
প্রভু, তুমি পাঠিয়ে দাও আমায় সেই কোলে
যে-কোল আমার কাছে অধিক প্রিয়
যে-কোল এই স্বর্গের চেয়েও বেশী দামী
যে কোলে দীর্ঘদিন ঘুমিয়ে থেকেছি আমি
ঘুমিয়ে থেকেছি সুখে শান্তিতে
স্নেহ-ভালোবাসার আঁচলে মুড়ে।
প্রভু, তুমি কি কখনো মাথা রাখোনি অমন বুকে
যে বুক উপচে পড়ে মাতৃস্নেহে?!
প্রভু, আমি থাকতে চাই না এই স্বর্গে
আমায় মুক্তি দাও তুমি এই স্বর্গ থেকে
মুক্তি দাও এর সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি থেকে
আমি ফিরে যেতে চাই ওই কোলে
সেখানেই আমার প্রকৃত সুখ
সেই কোলেই বড় হয়ে উঠেছি আমি
স্নেহের পরশ মেখে, সেই কোলেই
ঘুমিয়ে পড়েছি বারবার তাঁর কণ্ঠে এই গান শুনে—
“ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসি মোদের বাড়ি এসো
খাট নেই পালং নেই আসন পেতে বসো।”

প্রভু শুনলেন তার কথা নীরবে, মগ্ন হয়ে
ওই মাটির কবির সব কথা, তারপর ভাবতে লাগলেন—
এটা কী করে সম্ভব, কী করে এমনটা হতে পারে
আমি যা জানি না একজন কবি কী করে তা জানতে পারে
কোনো পাপী কী করে ভূলোকে অমন সুখ পেতে পারে
যে সুখ কোথাও নেই, না আছে পৃথিবীতে
না আছে আমার এই সুবিশাল স্বর্গে?!
একদিন আমি নিজেই উন্মোচন করবো এর রহস্য
তার জন্য যদি প্রাণ দিতে হয় আমাকে, দেবো!

রাতের অবসানে, পূব আকাশে সবে
ছড়িয়ে পড়েছে ঊষার আভা
আকাশের কোলে হাসছে সুব্‌হ সাদেক
এমন সময়, মরিয়মের কোল আলো করে
দিগন্তে আলো ছড়িয়ে
জন্ম নিল এক শিশু
জন্ম নিলেন যীশু!


রাশীদ সালীম আল্‌-খ়ূরী (১৮৮৭ – ১৯৮৪)। একজন আরব খ্রিস্টান ও বিখ্যাত প্রবাসী কবি। “আশ্‌-শা’য়েরুল্‌ ক়ারাবী” (পল্লীকবি) নামে খ্যাত। জন্ম লেবাননের বার্‌বারায়। দীর্ঘ ৪৫ বছর ব্রাজিলে বসবাস করেছেন। বিখ্যাত “আর্‌-রাবেত়া” সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন তিন বছর। ১৯৫৮ সালে অন্যতম সাহিত্য সংগঠন “আল্‌-‘উস়্‌বাতুল্‌ আন্দালুসিয়্যা”-র  সভাপতি নির্বাচিত হন। মা’কে নিয়ে লেখা বিশ্বব্যাপী শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলির একটি হল তাঁর এই “হিদ়্‌নুল্‌ উম্মি” কবিতাটি। ১৯২৫ সালে কবিতাটি রচনা করার পর বিশ্বের সকল মা’দেরকে উৎসর্গ করে নিজ মা’কে বলেছিলেন, ইব্‌তাহিজি ইয়া উম্মাহ্‌, লাক়াদ কাতাব্‌তু কাস়ীদাতান্‌ খ়ালেদাতান্‌ আহ্‌দাইতুহা ইলাইকি, ওয়া লাম্‌ ইয়াক্‌তুব্‌ নাযীরাহা শা’য়েরুন্‌ ফিল্‌ ‘আলামি” (মা তুমি জেনে খুশী হবে যে, আমি এক খানা অমর কবিতা রচনা করেছি। আমি সেই কবিতাটি তোমাকে উৎসর্গ করছি। আমার ধারণা, পৃথিবীর আর কোনো কবি অমন ধরণের বা অমন দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কবিতা লেখেননি)।

তাঁর এই রচনা সত্যিই বিরল। মা ও মাতৃত্বকে ব্যখ্যা করতে তিনি তাঁর খ্রিস্টধর্ম বিশ্বাসের মূল ভিত্তি ট্রিনিটি বা ত্রিতত্ত্বের প্রসঙ্গ টেনেছেন। এক অকল্পনীয় উপমার মাধ্যমে মা ও মাতৃত্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি এই কবিতায় বলেছেন, বহু কাল আগে প্রাচ্যে এক কবির মৃত্যু হয়। পিতামাতার সেবা করার সুবাদে স্বর্গে ঠাই হয় তাঁর। কিন্তু স্বর্গসুখে তাঁর মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তিনি পৃথিবীতে ফিরতে উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। তাঁর এই বাসনা কেন, স্বয়ং ঈশ্বর তাঁকে জিজ্ঞেস করেন। কবি উত্তরে বলেন, পৃথিবীতে ফিরে গেলে আমি আমার মা’কে পাবো, তাঁর স্নেহ-ভালোবাসার পরশ পাবো। তাঁর উত্তর শুনে অবাক হলেন ঈশ্বর। অতঃপর মা, মায়ের স্নেহ ও ভালোবাসা, তাঁর আদর-যত্ন উপলব্ধি করতে যীশু রূপে জন্ম নিলেন মা মরিয়মের কোলে।

অনুবাদ- আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



حضن الأم
رشيد سليم الخوري
أتذكر كيف كان إله موسى                      الها قاسيا يلتذ بالدم؟
إذا فإليك كيف غدا مسيحا                       حنونا ان تألمنا تألم
** ** **
روى الراوون أن عثروا بمصر            على درج غريب الخط مبهم
فحاول فهمه العلماء لكن                    بدا لجماعة العلماء طلسم
إلى أن حله الشعراء شعرا                 ومن بالشعر كالشعراء يفهم
وذلك أنه من قبل عيسى                توفي شاعر في الشرق ملهم
أضاع العمر في طلب المعاصي             يحلل ما كتاب الله حرم
فكاد الى اللظى يلقى،جزاء                 لما من سئ الأعمال قدم
ولكن بره الابوين غطى                   مساوئه فخلص من جهنم
وجازاه الاله جزاء عبد                    تقي حسبما في الكتب علم
فنام بحضن ابراهيم لكن                    قبيل الفجر شاعرنا تبرم
وقام لربه يشكو ويبكي                    بكاء صير الفردوس مأتم
فهدأ روعه وحنا عليه                     وطيب قلبه بحنانه الجم
ووسده يديه وركبتيه                     ومال عليه بالتقبيل والضم
وقال لعبده داود رنم                        لهذا البلبل الباكي فرنم
فنام بحضنه الأبوي حينا                وعاد يساقط العبرات عندم
الى ان ضج اهل الخلدغيظا         وصاح الله من غضب الى كم
أطيق تذمرا من عبد سوء                   يجرع كوثرا فيقول علقم
تظلم في الثرى من غير ظلم           وحتى في النعيم معي تظلم
أرى الشعراء جازوا الحد إني              أكاد لخلقي الشعراء أندم
علام بكاك ياهذا وماذا                  دهاك فلا تني تشكو تكلم
أصفحي عنك قد أبكاك أم ما       جزيت به من الأحسان أم.. أم
فصاح:العفو يا مولاي من لي       سواك ومن سوى الرحمن يرحم
أتيتك راجيا نقلي لحضن                   أحب الي من هذا واكرم
لحضن طالما قد نمت فيه              قرير العين بين الضم والشم
أما القيت رأسك فوق صدر                حنون خافق بمحبة الأم؟
فدعني من نعيم الخلد أني            نعيمي بين ذاك الصدر والفم
تربتني كعادتها برفق                     وتنشد نم حبيبي بالهنا نم
** ** **
فأصغى سيد الأكوان لطفا               لشكوى شاعر الغبراء واهتم
وقال لنفسه هذا محال                    أيعلم شاعر ما لست أعلم
أينعم خاطئ في الأرض قبلي        بما انا لست في الفردوس أنعم
لأكتشفن هذا السر يوما                  ولو كلفت ان أشقى وأعدم
** ** **
وكانت ليلة وإذا صبي                  صغير نائم في حضن مريم