আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে মফঃস্বলের কোনো গ্রামে
শৈশবকে উৎরেছি, আমাদের ছেলেবেলার সেই দিনগুলো ছিল ধোঁয়া-ওঠা মাটির উনুনের মতোই সাদামাটা, কষ্টমাখা। আমার খুব ভালোভাবেই মনে আছে, তখন শুধু আমাদের গ্রাম কেন, আশেপাশে পুরো এলাকাতেই কোথাও রান্নার গ্যাসের কোনো কানেকশনই ছিল না। প্রতিটি বাড়িতে রান্নাঘরের
প্রাণ ছিল মাটির উনুন—আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় যাকে বলা হয় চুলা ও আখা। প্রয়োজন ও সুবিধা মতো গ্রামে কারও ছিল একচুলিয়া, কারও দোচুলিয়া, আবার কারও আলকচুলা। সেই চুলায় আগুন জ্বালাতে দরকার হতো শুকনো ডালপালা,
খড়কুটো, পাটকাঠি, শুকনো পাতা, ঘুঁটে ইত্যাদির।
আমরা তিন ভাই। বাবা ছিলেন পেশায় চাষি। বড় দুই
দাদা বাবার সাথে চাষবাসের কাজ করতেন। আর মা বাড়ির যাবতীয় কাজকর্ম প্রায় একা হাতে সামলাতেন। তাঁর দিন
শুরু হতো ভোরের আলো ফোটার আগেই, আর শেষ হতো গভীর
রাতে। তবু তাঁর মুখে কখনো বিরক্তির ছাপ দেখিনি। তাঁর ধর্মই ছিল নিঃশব্দে কাজ করে যাওয়া। মেজদা তখন থেকেই মায়ের
ডান হাত হয়ে উঠেছিল। চাষবাসের কাজের পাশাপাশি রান্নাঘরে মাকে সাহায্য করত। ধীরে ধীরে তার
রান্নার হাত এমন পাকাপোক্ত হলো যে,
আজও বাড়িতে অতিথি এলে বা কোনো অনুষ্ঠান হলে, আমরা সবাই তার ওপর ভরসা করি।
আমি তখন খুব ছোট। তবুও নিজের মতো করে সংসারের কাজে জুড়ে যেতাম। কখনো কল থেকে মা’কে জল এনে দিচ্ছি, তো কখনো জ্বালানি টেনে রান্নাঘরে পৌঁছে দিচ্ছি, আবার কখনো তেলের শিশি বা নুনের খুঁটি মায়ের হাতে তুলে দিচ্ছি। এই ছোটখাটো কাজগুলো করতে করতে মনে হতো, আমিও যেন মায়ের
পাশে দাঁড়িয়ে
তাঁর কষ্টটা একটু হলেও ভাগ করে নিচ্ছি।
রাতের বেলার সেই দৃশ্যগুলো আজও মনের ভেতর জ্বলজ্বল করে। রান্নাঘরের এক কোণে হেরাকিনের ম্লান হলুদ আলো ধিকধিক করে জ্বলছে, কখনো বা নম্ফর জ্বলন্ত পলতেটা
বাতাসের তোড়ে এধার-ওধার দুলছে। মা বসে উনুনে জ্বাল দিচ্ছেন, আর আমি তাঁর পাশে বসে খাতায় হাতের লেখা লিখছি, কখনো বা স্কুলের পড়া করছি। কোথাও আটকে গেলে মা বলে দিচ্ছেন।
আর মাঝে মাঝে মা কোনো কাজ বললে, বইখাতা বন্ধ করে ছুটে গিয়ে তা করছি। সেই ছোট্ট
রান্নাঘরটাই যেন ছিল আমার প্রথম পাঠশালা, আর মা
আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক।
যতদূর মনে পড়ে, আমাদের ছেলেবেলার একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল জ্বালানি সংগ্রহের তৎপরতা। কারণ আমরা
জানতাম,
জ্বালানি ছাড়া উনুনে আগুন জ্বলবে না, আর আগুন না জ্বললে সংসারের চাকা থমকে যাবে। তাই সারা বছর ধরে আমরা বালকবালিকার দল এই জ্বালানি জোগাড়ের কাজে ব্যস্ত থাকতাম। বিশেষ করে বর্ষার কথা ভেবে আগেভাগেই মজুত করে রাখতাম জ্বালুন-খড়ি। খড় ছিল গরু-মোষের খাবার, জ্বালানীর কাজে অধিক খড় ব্যবহার করলে গোরুমোষের খাবারের আকাল দেখা দিত। তাই শুধু খড়ের ওপর নির্ভর করা যেত না, আমাদেরকে
অন্য উপায় খুঁজতে হতো।
যতদূর মনে পড়ে, অগ্রহায়ণ-পৌষের বিকেলগুলো
ছিল আমাদের কাছে উৎসবের মতো। আমরা বাড়ির ছোটছোট ছেলেমেয়েরা স্কুল থেকে ফিরে দল বেঁধে কইদা মানে কাস্তে আর বস্তা নিয়ে মাঠে চলে যেতাম। ধান কাটার পর জমিতে পড়ে থাকা নাড়াগুলো কেটে আমরা এক জায়গায় জমা করতাম। তারপর সেগুলো বস্তায় ভরে মাথায় বা কাঁধে করে বাড়ি নিয়ে আসতাম। তা
দেখে মায়ের মুখে ফুটে উঠত এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি। মাথায় হাত
বুলিয়ে কপালে চুমু খেয়ে মা বলতেন—“মোর বাপটা আইজকা মেলায় কাজ কইছে!”
কখনো আমরা বিকেলবেলা গাছে উঠে খেলার ছলে শুকনো ডালপালা ভেঙে নিচে ফেলতাম। তারপর আঁটি বেঁধে সেই ডালপালাগুলো মাথায় বা কাঁধে করে বয়ে বাড়ি নিয়ে আসতাম। আবার কখনো ঝড়ো হাওয়ায় তাল গাছের ঢাড্ডা বা নারকেল গাছের
শুকনো বাজ্ঝা ভেঙ্গে পড়লে, তা কুড়িয়ে বাড়ি নিয়ে আসতাম। মা সেগুলো যত্ন করে তুলে রাখতেন বর্ষার কথা ভেবে,
বা কোনো বিশেষ দিনের রান্নাবান্নার জন্য।
আরও মনে পড়ে, আমি, সুনতি দি,
ক্ষিত্তি দি, বিমল দা আরও অনেকে, আমরা পার্শ্ববর্তী বাগানে বা পুকুরপাড়ে গাছতলায় যেতাম পাতাড়ি সাটতে। গাছের শুকনো পাতাগুলো জড়ো করতাম। তারপর সেগুলো বস্তায়
ভরে বাড়ি নিয়ে আসতাম। রাস্তায়
পরিচিত কারও সাথে দেখা হলে শুকনো পাতায় ভর্তি বস্তাগুলো দেখে সহসা জিজ্ঞেস করতো— “এতো লা জ্বালুন, তোরা কুঠি পাতাড়ি সাটিবা গেইছেনেন তে?!”
এছাড়া গ্রীষ্মের ছুটিতে, কখনো সকালে তো কখনো বিকেলে, আমরা পুকুরপাড়ে
গিয়ে নতকল্মু মানে কলমি লতা কাটতাম। তবে কোনো পাতায় অদ্ভুত আঁকাবাঁকা দাগ
দেখলে সাপের ছবি ভেবে ভয় পেয়ে যেতাম। ক্ষিত্তি দি বলত—“ভাই,
এইলা কাটি না। এইটাত মনে হয় মা মনসা ভর কইছে।”
তা শুনে, ভয়ে আমরা অমন কলমি লতার গায়ে হাত দিতাম না। কাটা হয়ে গেলে কলমি লতাগুলো বাড়ি এনে বটি দিয়ে চিরে রোদে শুকতে দিতাম। শুকিয়ে গেলে পরে আঁটি
বেঁধে গোয়ালঘর বা ঘুন্ডিয়া মানে হাঁস-মুরগি রাখার ঘরের উপরে তুলে রাখতাম, বর্ষার দিনের জ্বালানি হিসেবে।
যখন আমরা আর একটু বড় হলাম,
তখন দল বেঁধে অন্যের জমিতে সরিষা তোলার কাজ করতে যেতাম। কোনো পারিশ্রমিক বা টাকাপয়সার
লোভে নয়। কেবল এটুকুই যে, সরিষা মাড়াইয়ের পর গাছগুলো আমরা যে যার বাড়ি নিয়ে যেতাম। তারপর সেগুলোকে যত্ন করে জমিয়ে রাখতাম, সময়মতো জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করার জন্য।
তাছাড়া আষাঢ় মাসে পাটের সময় আমরা ছেলেছোকরার
দল সকলে মিলে অন্যের পাট ধোয়ার কাজে লেগে যেতাম। নিয়ম ছিল—পাট মালিকের, আর পাটকাঠিআমাদের। সেই পাটকাঠিগুলো শুকিয়ে বাড়ি নিয়ে আসতাম। তারপর সেগুলোকে সুন্দর করে আঁটি
বেঁধে এমন জায়গায় রাখা হতো, যাতে ঝড়বৃষ্টিতে ভিজে না যায়।
কেননা বর্ষার দিনে রান্নাবান্নার ক্ষেত্রে এই পাটকাঠিগুলোই ছিল আমাদের ভরসা।
ছেলেবেলার সেই দিনগুলোতে কখনো সকালে, আবার কখনো বিকেলে আমরা গোবর কুড়োতে যেতাম। মাঠে বা রাস্তায় পড়ে থাকা গোবর কুড়িয়ে এনে ঘুঁটে দিতাম। উপলা বানাতাম। তারপর সেগুলো শুকিয়ে বস্তায় ভরে রেখে দিতাম। পরে সেই ঘুঁটেই জ্বলে উঠত চুলার আগুনে, আর সেই আগুনেই রান্না হতো আমাদের ভাত-ডাল-সবজি।
আমাদের শৈশবের সেই দিনগুলো হয়তো কষ্টে ভরা,
কিন্তু বেশ অর্থবহ ছিল! আমরা ছোটছোট ছেলেমেয়েরা মিলেমিশে এইসব কাজকর্ম করতাম।
কাজের ফাঁকে হাসতাম, খেলতাম। আর এসবের পাশপাশি ধীরে ধীরে দায়িত্ব নিতেও শিখতাম। আমাদের প্রতিটা কাজের মধ্যে ছিল এক ধরণের আনন্দ, বিশেষ করে কোনো কাজের পর যখন
মায়ের মুখে তৃপ্তির হাসি দেখতাম। ধোঁয়ায় ভরা রান্নাঘর, জ্বালুন-খড়ির জোগাড়, আর মায়ের
স্নেহমাখা হাত
এসবই তো আমাদের শৈশবের মূল্যবান স্মৃতি। আজও কখনো চোখ বুজলে মনে হয়, সেই চুলার আগুন এখনো নিভে যায়নি, শুধু সময়ের আড়ালে
কোথাও লুকিয়ে ঢিপ ঢিপ করে জ্বলছে।
হেস্টিংস, কোলকাতা
৩০ এপ্রিল ২০২৬

No comments:
Post a Comment