Pages

Tuesday, 9 June 2026

ত্যাগের সফর - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



আমার মা ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। গ্রামেই একটা প্রাইমারী স্কুল ছিল সেখানে। তারপর আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। সেই প্রত্যন্ত গ্রামে তখন মেয়েদের পড়াশোনার তেমন পরিবেশই ছিল না। আশেপাশে স্কুলও ছিল নাকিন্তু মায়ের ভেতরে শেখার একটা অদ্ভুদ জেদ ছিল। আর তাই গ্রামের অন্য মেয়েদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত মসজিদে যেতেন পড়তে। সেখানে কুরআন শরীফ পড়েছেন, উর্দুর পহেলি, দোসরী, তিসরী পর্যন্ত শেষ করেছেন। ফিকাহ মুহাম্মদীখতম করেছিলেন বেশ আগ্রহ আর নিষ্ঠার সাথেমা এখনও রোজ সকালে কিছুক্ষণ কুরআন তেলাওয়াত করেন। তারপর কিছুক্ষণ অর্থ সহ কুরআন পড়ার চেষ্টা করেন।
 
বাবা তখন কলেজে পড়তেন। লজিং থাকতেন যে বাড়িতে, সেটি ছিল মায়ের ফুফুর বাড়ি এবং আমার বড় আম্মার বাপের বাড়ি। আত্মীয়তার সূত্রে সবাই পরিচিত। বাবা ছিলেন শান্ত স্বভাবের, ভদ্র, পড়াশোনা জানা এক তরুণ। তাই বড় আম্মা নিজের দেওরের জন্য মায়ের কথা ভাবেন। তারপর দেখাশোনা হয়, কথাবার্তা চলে, আর এভাবেই একদিন তাঁদের বিয়ে হয়ে যায়।
 
ছোটবেলা থেকেই মাকে আমি দেখেছি এক অসম্ভব লড়াকু মানুষ হিসেবে। জীবনের কাছে তিনি কখনো সহজে হার মানেননি। দাঁতে দাঁত চেপে সংসারের সমস্ত ঝড় সামলেছেনঅভাব, অনটন, কষ্ট সবকিছুকে নিজের ভেতরে লুকিয়ে রেখে আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তাঁর মুখে কষ্টের শব্দ আমি খুব কমই শুনেছি, কিন্তু তাঁর ত্যাগের ছাপ ছড়িয়ে আছে আমার পুরো জীবনজুড়ে।
 
মনে পড়ে, আমি তখন খুব ছোট। আমাকে সাথে নিয়েই মা নামাজ পড়তেন। বাড়িতে আর কেউ ছিল না আমাকে দেখার মতো। বাবা ও দাদারা সবাই গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত। মা নামাজ পড়তেন আর আমি জায়নামাজের এধারওধার বসে খেলতাম। আর মা যখন সাজদায় যেতেন, আমি দৌড়ে গিয়ে তাঁর পিঠে চেপে বসতাম। ফলে মা দীর্ঘক্ষণ সাজদায় পড়ে থাকতেন। তিনি ভয় পেতেন, সাজদা থেকে মাথা তুললে পাছে যদি আমি পড়ে যাই! একজন মায়ের সাজদাও তখন সন্তানের নিরাপত্তার জন্য থমকে যেতো 
 
আরও মনে পড়ে, রাতের বেলা রান্নাঘরে মা রান্না করতেন, আর সেই রান্নার ফাঁকেই চলত আমার পড়াশোনা। কড়াইয়ে তরকারি ফুটছে, চুলোর আগুন লাল হয়ে জ্বলছে, আর মা আমাকে অ আ ক খশেখাচ্ছেন। স্লেটে লিখে দিয়ে তার উপর হাত বোলাতে বলছেন। কখনো ছড়া শোনাচ্ছেন—“আতা গাছে তোতা পাখি”, কখনো হাট্টিমাটিম টিম”, কখনো বা ঘরে আছে হুল বিড়াল কোমর বেঁধেছে”… বোধ করি, আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্কুল ছিল সেই মাটির রান্নাঘর, আর আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক আমার মা।
 
যখন আরও একটু বড় হলাম, তখন মা শুধু পড়াতেন না, নিয়ম করে লেখাতেনও। তাঁর নিজের পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি, কিন্তু আমার পড়াশোনার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহের কোনো কমতি ছিল না। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় তিনি আমাকে দোয়াদরূদ শেখাতেন ঘুমোতে যাওয়ার দোয়া, ঘুম থেকে ওঠার দোয়া, পেচ্ছাব-পায়খানায় যাওয়ার দোয়া, ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া, আয়াতুল কুরসি, আরও কতো কিছু। এভাবে অজান্তেই আমার ছোট্ট হৃদয়ের ভেতর তিনি ধর্ম, শিষ্টাচার জীবনের সৌন্দর্য বুনে দিতেন।
 
রমজান মাসে ভোরবেলা ফজরের নামাজের পর মা কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আমি তখন তাঁর পাশেই জায়নামাজের উপর বালিশ মাথায় ঘুমিয়ে থাকতাম। আধোঘুমে কুরআনের সেই সুরেলা তিলাওয়াত শুনতে শুনতে কখন যে সকাল হয়ে যেত, বুঝতেই পারতাম না। আজও মাঝেসাঝে, ফজরের পর কুরআনের তিলাওয়াত শুনলে আমার মনের আকাশে ভেসে ওঠে মায়ের সাদা ওড়না, ভোরের নরম আলো আর এক অপার্থিব প্রশান্তি।
 
তারপর, ১৯৯৫ সালের শেষের দিকে আমি হোস্টেলে চলে গেলাম। এই প্রথম মাকে ছেড়ে বাড়ির বাইরে থাকা। বুকের ভেতরটা যেন সবসময় খালি খালি লাগত। পৌনে দুমাস পর কুরবানির ছুটিতে বাড়ি ফিরলাম। বাড়িতে পৌঁছাতেই মা আমাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদে ফেললেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন— “এই প্রথম এক মাস তেইশ দিন মুই তোক ছাড়ি থাকিনু বাপ…”
 
সেই প্রকম্পিত কণ্ঠ আজও আমার কানে বাজে। তখন ঠিক মতো ঠাহর করতে পারিনি, কিন্তু আজ ভালোভাবেই বুঝি সন্তানের দূরত্বে শুধু সন্তানের কষ্ট হয় না, মা-বাবা বুকও সমান শূন্য হয়ে যায়।
 
আরও কবছর পরের কথা। রমজান ঈদের ছুটি শেষে আবার হোস্টেলে ফিরবো। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক দুশ্চিন্তা বাসা বেঁধেছেআমি তো চাষির ছেলে। অভাব-অনটন আমাদের নিত্যসঙ্গী। বাড়ি থেকে যে টাকা পেয়েছিলাম, তা দিয়ে বোর্ডিং ফি আর মাসের খরচ টেনেটুনে পার হবে কথা আমি যেমন বুঝছিলাম, মাও নিশ্চয়ই বুঝেছিলেন। তবে আমার কাছে শুনে নয়, আমার চোখের ভাষা পড়ে। মায়েরা বোধহয় এমনই, না বললেও সব বুঝে যা  
 
সেদিন বিকেলে বাড়ির ভেতরে হালকা ব্যস্ততা বিরাজ করছিলকেউ রান্নাঘরে, কেউ উঠোনে, কেউ বারান্দায়। মা নিঃশব্দে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন এক কোণেচারপাশে একবার তাকালেনকেউ দেখছে কি নাতারপর আলমারির ভেতর থেকে খুব যত্ন করে ভাঁজ করা একটা পুরনো কাপড় বের করলেন। কাপড়টার ভেতরে লুকানো ছিল কিছু টাকাসম্ভবত বহুদিন ধরে জমিয়ে রাখা তাঁর গোপন সঞ্চয়। হয়তো নিজের কোনো শখ বিসর্জন দিয়ে, হয়তো নতুন কাপড় না কিনে, হয়তো বা হাজারো ছোট ছোট ইচ্ছা চেপে রেখে জমিয়েছিলেন সেই টাকাগুলো। মা আস্তে করে টাকাগুলো আমার হাতে গুঁজে দিলেন। তারপর আমার হাতটা শক্ত করে ধরে নিচু স্বরে বললেন— “খবরদার, কাউকে বলবি নারেখে দে। কাজে লাগবে।
 
তারপর বহু বছর কেটে গেছে। কোথাও তুলাইয়ের পাড় ভেঙ্গেছে, তো কোথাও তার গতিপথই সংকুচিত হয়ে গেছে। সময়ের স্রোতে আমিও সংসারী হয়েছি। নিজের সন্তান, নিজের দায়িত্ব, জীবনের হিসাব-কেতাব সব মিলিয়ে আমিও এখন বুঝতে শিখে গেছি সংসারের বোঝা কাকে বলে। এবার ঈদের ছুটিতে বাড়ি গেছিলাম। একদিন রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে বাড়ির সবাই প্রায় ঘুমিয়ে গেছে। চারপাশ পুরো নিস্তব্ধদূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। আমি আর মা মুখোমুখি বসে গল্প করছি গ্রামের মানুষজন, আত্মীয়স্বজন, সংসারের টুকিটাকি হিসাব, পুরোনো দিনের স্মৃতি নানা বিষয় নিয়ে হঠাৎ মা জিজ্ঞেস করে বসলেন— “সাবাকে স্কুলে ভর্তি করাতে কতো টাকা লাগলো বাবু?”
আমি টাকার অঙ্কটা বললাম। মা মন দিয়ে শুনলেন। তারপর আবার জিজ্ঞেস করলেন— “মাসে মাসে ফি কতো?”
—“চার-সাড়ে চার হাজারের মতো।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার জিজ্ঞেস করলেন— “আর যাওয়া-আসা?”
আমি হেসে বললাম—“স্কুটি করে দিয়ে আসবো-নিয়ে আসবো, কখনো সাহানা গিয়ে নিয়ে আসবে
 
মা চুপ করে রইলেন। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছিলাম, ভেতরে ভেতরে কীসের যেন হিসেব কষছেন। কিছুক্ষণ পর ধীর এবং দৃঢ় কণ্ঠে বললেন— “আমাকে আর মাসে মাসে হাতখরচের টাকা দিতে হবে না।
আমি চমকে উঠলামলোকমুখে শুনেছিলাম, মায়েরা সন্তানের বোঝা সন্তানের অজান্তেই নিজের কাঁধে তুলে নেন, এ যেন ঠিক তেমনজিজ্ঞেস করলাম— “কিন্তু তোমার ওষুধপাতি?”
মা খুব সহজ গলায় বললেন— “সে চলে যাবে। তোমার এখন অনেক খরচ। সাবার স্কুল ফি, টিউশন, বইখাতা, জামাকাপড়আবার ওদিকে ফ্ল্যাটের ইএমআই…”
 
কথাগুলো তিনি এমনভাবে বলছিলেন, যেন তাঁর নিজের প্রয়োজন বলে কিছুই নেই। যেন সন্তানের কষ্ট একটু কমাতে পারাই তাঁর সবচেয়ে বড় শান্তি। আমি চুপচাপ বসে ছিলাম। বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে আসছিল। মা হয়তো আমার নীরবতা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই নিজে থেকেখোলাসা করলেন— “অনন্তপুর, মানে আমরা নানীর বাড়ির অংশ পেয়েছি। সেই বাবদ কিছু টাকা হাতে এসেছে…”
 
এই বলে তিনি আঁচলের ভাঁজ খুলে কিছু টাকা বের করলেন। তারপর টাকাগুলো আমার হাতে দিয়ে বললেন— “এই টাকাগুলো সাবার কোনো কাজে লাগাবে”  
জিজ্ঞেস করলামশুধু সাবাকে দিচ্ছো?
না, না। তাহিনা ও সাদিয়ার জন্যও দিয়েছি। 
 
আমি নির্বাক হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, সময় যেন হঠাৎ থেমে গেছে। যে মানুষটা সারাজীবন নিজের চাওয়া-পাওয়াগুলো চুপচাপ বিসর্জন দিয়ে এসেছেন, বয়সের এই পড়ন্ত বেলাতেও তিনি নিজের জন্য কিছু রাখলেন না। নানীর বাড়ির জমির অংশ থেকে পাওয়া টাকাটুকুও নিজের ওষুধ, নিজের প্রয়োজন কিংবা একটু স্বস্তির জন্য সম্পূর্ণ খরচ না করে নাতনিদের ভবিষ্যতের কথা ভাবলেন।
 
আরও মনে হলো, পৃথিবীতে মানামের মানুষগুলো বোধহয় এমনই হয়তারা কখনো সত্যিকার অর্থে বুড়ো হন না, কখনো নিজের কথা ভাবতে শেখেন না। সন্তানের কষ্ট কমানোর চিন্তাটাই তাদের জীবনের শেষ বয়সে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হয়ে থাকে। আমি টাকাগুলো হাতে নিয়ে বসে ছিলাম। আর মনে হচ্ছিল, এই কাগজের নোটগুলোর ওজন যেন আমার পক্ষে অসহনীয়; কারণ তাতে মিশে ছিল আমার মায়ের অতুলনীয় ত্যাগ, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা নিঃশব্দ আত্মদান।
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
১৪ মে ২০২৬

No comments:

Post a Comment