Pages

Showing posts with label দুরন্ত শৈশব. Show all posts
Showing posts with label দুরন্ত শৈশব. Show all posts

Friday, 28 August 2026

মেঘু - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 


“এই পা-পড় নেবেন নাকি পা-পড়, এই কা-কড়ি আছে, ঝু-রি ভাজা আছে”— বিকেল নামলেই দরোজার বাইরে গলির মোড়ে ভেসে উঠত এই ডাক। আর এই ডাকের জন্যই যেন আমাদের বিকেলগুলো অপেক্ষা করে থাকত। স্কুল থেকে ফিরে জামাকাপড় বদলেছি কি না, খেয়েছি কি না, পড়তে বসেছি কি না এসবের চেয়েও বড় হয়ে উঠত একটা বিষয়—কখন মেঘু আসবে, কখন মেঘুর হাঁক শোনা যাবে? কানটা তখন অজান্তেই দরোজার দিকে লেগে থাকত। দূর থেকে কোনো ফেরিওয়ালার আওয়াজ ভেসে এলেই বুকের ভেতর কেমন একটা ধক করে উঠত—এই বুঝি মেঘু আসলো! এই বুঝি সে ডেকে উঠলো!  

 

মেঘুর হাঁক শোনা মাত্রই আমাদের আর তর সইত না। এক কৌটা চাল হাতে নিয়ে ছুটতাম দরোজার দিকে। ওই এক কৌটা চালই ছিল আমাদের শৈশবের মুদ্রা। বিনিময়ে পেতাম দুটো পাঁপড়, কিংবা কয়েকটা কাঁকড়ি, অথবা একমুঠো ঝুরি ভাজা। কখনো আবার দুটো দিলখোশ—যাকে অনেক জায়গায় চোঙা বলা হয়। তারপর সেগুলো নিয়ে আমরা বসতাম মহা আনন্দে, কখনো পুকুর পাড়ে, কখনো কোনো বেঁটে পাঁচিলের উপর, আবার কখনো মাঠের ধারে। খুব ধীরে ধীরে, তারিয়ে তারিয়ে খেতাম। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামী খাবার আমাদের হাতের মুঠোয়।

 

তুলাইয়ের তল্লাটে আমরা যারা শৈশব কাটিয়েছি, আমাদের কাছে মেঘু শুধু একজন ফেরিওয়ালা নয়; মেঘু যেন আমাদের শৈশবেরই একটি চরিত্র। আজও অলস দুপুরে, কিংবা অবসরের কোনো নির্জন বিকেলে, হঠাৎ নামটি মনে পড়ে গেলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই কাঁচা রাস্তা, ধুলোমাখা উঠোন, দরোজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি শিশু আর দূর থেকে ভেসে আসা সেই টানটান ডাক—“পা-পড়… কা-কড়ি… ঝু-রি ভাজা…”

 

মেঘু থাকত আমাদের পার্শ্ববর্তী গ্রাম আঁচরলে। লোকমুখে শুনেছিলাম, তার আসল বাড়ি নাকি উড়িষ্যায়। কীভাবে, কোন অজ্ঞাত টানে সে আমাদের এলাকায় এসে হাজির হয়েছিল, তার কোনো ইতিহাস আমরা জানতাম না। জানার বয়সও ছিল না। শুধু জানতাম, মেঘু আছে, বিকেল হলে আসে, আর তার সঙ্গে আসে আমাদের আনন্দ। এখানেই সে ঘর বেঁধেছিল, এখানেই সংসার গড়েছিল। দুমুঠো ভাতের জন্য, জীবনের নিতান্ত প্রয়োজনের তাগিদে সে বিকেলবেলা পাঁপড়, কাঁকড়ি, ঝুরি ভাজা, দিলখোশ—এসব নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরত। আর আমরা ছিলাম তার অপেক্ষারত খরিদ্দার।  

 

তবে সেই এক কৌটা চাল জোগাড় করাও আমাদের কাছে কম বড় অভিযান ছিল না। কখনো মায়ের কাছে আবদার করে, কখনো একটু কান্নাকাটি করে বা মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে, কখনো মাকে নানা যুক্তি বুঝিয়ে, আবার কখনো একেবারে মায়ের চোখ এড়িয়ে চালের কৌটা নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম। তখন এক কৌটা চালের মূল্য আমাদের কাছে এক আকাশ আনন্দের সমান।

 

শুধু ঘরের চালেই আমাদের শৈশবের বাজার চলত না। ধানের মরসুম এলে আমরা নিজেরাই হয়ে উঠতাম ছোটখাটো সংগ্রাহক। মাঠে পড়ে থাকা ধানের শীষ কুড়িয়ে জমাতাম। ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ে ধানের শীষ বের করতাম। ধান বোঝাই গরুর গাড়ির পেছন পেছন ছুটে, গাড়ি থেকে পড়ে যাওয়া শীষ কুড়িয়ে নিতাম। ধানের ক্ষেত কিংবা ধানের পোনের চারপাশে ঝাঁটা দিয়ে, পড়ে থাকা ধান সংগ্রহ করতাম। সেই সামান্য ধানই তখন আমাদের কাছে ছিল সম্পদ। আর সেই সম্পদ দিয়ে কত কী কেনা হতো!

 

মেঘু কিংবা অন্য ফেরিওয়ালারা যখন বাদাম-মটকা নিয়ে আসত, তখন আমাদের জমানো ধান হয়ে উঠত বিনিময়ের মাধ্যম। একশো-দুশো গ্রাম বাদাম-মটকা হাতে পেয়ে আমরা যেন রাজ্য জয় করে ফেলতাম। তারপর পাড়ার অলিগলি চষে বেড়াতাম বাদাম খেতে খেতে। শুধু খাওয়াই নয়—অন্যরা দেখছে কি না, সেটাও ছিল আনন্দের একটা অংশ। নিজের হাতে অর্জিত বাদাম, তাই তার স্বাদও যেন একটু বেশি।

 

আর গ্রীষ্মের সেই দগ্ধ বিকেল! মনে হতো, সূর্য যেন আকাশ থেকে আগুন ঢেলে দিচ্ছে। সেই সময় গ্রামে বরফওয়ালা এলে আমাদের মধ্যে হুলস্থুল পড়ে যেত। এক কৌটা চালের বিনিময়ে পাওয়া যেত সাদা কিংবা হলুদ রঙের বরফ। বরফ হাতে নিয়ে আমরা ছুটতাম মাঠের দিকে। এক হাতে বরফ, আর অন্য হাতে ঢিলেঢালা প্যান্টের কোমর ধরে—কী অদ্ভুত আনন্দে যে ছুটতাম!

 

তবে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ছিল নারকেলকুচি দেওয়া সেই বিশেষ বরফ। তার দাম ছিল একটু বেশি—দু কৌটা চাল। তাই ইচ্ছে থাকলেও সব সময় সেই বরফ খাওয়ার সৌভাগ্য হতো না। কিন্তু যেদিন মা’কে ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে দু কৌটা চাল জোগাড় হয়ে যেত, আর সেই বরফটা সত্যিই হাতে এসে পৌঁছত, সেদিনের আনন্দের কোনো হিসাব ছিল না। মনে হতো, আমরা যেন আকাশে উড়ছি। হাতে যেন বরফ নয়—সোনার বাটি বা নিজামের কোহিনূর! পৃথিবীতে এর চেয়ে মূল্যবান বুঝি আর কিছু নেই। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বরফ গলে যেত, নারকেলকুচি শেষ হয়ে যেত, হাত বেয়ে ঠান্ডা জল গড়িয়ে পড়ত, জামাকাপড় ভিজে যেত; কিন্তু সেই আনন্দটা গলে যেত না।

 

আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে বুঝি, তখন আমাদের কাছে সম্পদ ছিল খুব সামান্য, কিন্তু আনন্দ ছিল অঢেল। এক কৌটা চাল, দুটো পাঁপড়, একমুঠো ঝুরি ভাজা, একশো গ্রাম বাদাম-মটকা কিংবা একখানা বরফ—এই সামান্য জিনিসগুলোই আমাদের পৃথিবীকে পরিপূর্ণ করে রাখত।

 

আজ বাজারে কত রকমের খাবার, কত রকমের আয়োজন, কত দামি জিনিসপত্র আমাদের নাগালের মধ্যে। অথচ সেই স্বাদ আর নেই। কারণ খাবারটা তখন শুধু খাবার ছিল না; তার সঙ্গে মিশে থাকত অপেক্ষা, পরিশ্রম, লুকিয়ে চাল জোগাড় করার দুষ্টুমি, মাঠে ধানের শীষ কুড়ানোর উত্তেজনা, বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে খাওয়ার আনন্দ; আর সবচেয়ে বড় কথা—একসঙ্গে ছোট হয়ে থাকার সুখ।

 

তুলাই দিয়ে বহু জল গড়িয়েছে। সময়ের স্রোতে মেঘু কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। সেই বরফওয়ালা আর আসে না। ধান বোঝাই গরুর গাড়ির পেছন পেছন হেঁটে শীষ কুড়োনো সেই শিশুরাও আজ ছড়িয়ে গেছে জীবনের নানা প্রান্তে। তুলাইয়ের সেই পথ, আঁচরলের সেই মানুষ, বিকেলের সেই হাঁক—সবই যেন সময়ের ওপারে চলে গেছে। আজও কখনো কখনো কোনো নিস্তব্ধ বিকেলে মনে হয়, খুব দূর থেকে আবার সেই ডাকটা ভেসে আসছে—“এই পা-পড় নেবেন পা-পড়! কা-কড়ি আছে… ঝু-রি ভাজা আছে…” আর তখন বয়স, ব্যস্ততা, দায়িত্ব সবকিছু পেছনে পড়ে যায়। মনে হয়, আমি আবার সেই ছোট্ট ছেলেটি হয়ে গেছি; হাতে এক কৌটা চাল, চোখে অগাধ বিস্ময়, আর বুকভরা অপেক্ষা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি বাড়ির বারান্দায়—এই বুঝি মেঘু এলো!

 

২৬ আগস্ট ২০২৬

হেস্টিংস, কোলকাতা

Wednesday, 29 April 2026

ফাঁসিতলা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 

আমরা তখন খুব ছোট। কেউ প্রাইমারীতে, তো কেউ মক্তবে পড়ি। পানিঝড়ির দিনে, কখনো বা মাগরিবের পরে, আবার কখনো সকালের কোমল মিঠা রোদে, আমরা বাড়ির বাচ্চারা ডেড়িতে, মানে আমাদের বৈঠকখানায় গোল হয়ে বসতাম। আর আমাদের মাঝখানে বসতেন মেজো আব্বা। হাতে তাঁর একটা মাঝারি সাইজের হুঁকো। ধোঁয়ার কুণ্ডলী ধীরে ধীরে উপরে উঠতো, আর সেই সঙ্গে উন্মোচিত হতো গল্পের এক অদ্ভুত ও অজানা জগৎ।
 
মেজো আব্বার গল্প মানেই এক রহস্যময় ভুবনে প্রবেশ। কখনো ভূতের গল্প, যা শুনে শরীর শিউরে উঠত আর মনের ভেতরে ডর ঢুকে পড়তো। আবার কখনো পরীদের গল্প, যা মনে স্বপ্নের রঙ ছড়িয়ে দিত। এছাড়া রাজা-বাদশাদের ঐশ্বর্য, বিন্যাকুড়ির ভূত, মোলানিয়ার কালী, পীরপখরিয়ার পীর, কিংবা ফাঁসিতলার সিন্দুক কত গল্প যে শোনাতেন, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আর আমরা প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনতাম, যেন টু শব্দ হলেই গল্পের জাদু ভেঙে যাবে।
 
একদিন মেজো আব্বা বলছিলেন তাঁর ছোটবেলার কথা। তখন তিনি আমাদের মতোই ছোট। দাদুর সঙ্গে, মানে তাঁর বাবার সঙ্গে প্রায় দিন মানপারের জমিতে যেতেন। তখন মানপারে, ফাঁসিতলার আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল অনেক ভগ্নস্তূপ। কোনোটা দোতলা দালানের ধ্বংসাবশেষ, কোনোটা একতলার, আবার কোথাও বড় কোনো ইঁদারার। সময়ের নির্মম আঘাতে সবকিছুই ভেঙে পড়ে ছিল।
 
ফাঁসিতলাকে ঘিরে আমাদের এলাকায় লোকমুখে কত গল্প যে প্রচলিত আছে, তার কোনো হিসেব নেই। পাশের শহর দিনাজপুর, যা এখন বাংলাদেশের অন্তর্গত। সেখানকার রাজা ছিলেন দিনানাজ, কেউ কেউ বলেন দিনানাথ। বলা হয়, তাঁর তিন রানী ছিল, আর তাঁদের তিনজনের জন্য প্রাসাদের তিন পাশে তিনটি পুকুর খনন করা হয়েছিল। অনেকে মনে করেন, সেই রাজার আস্তাবল, আদালত ও কয়েদখানা ছিল আমাদের এই মানপার-ফাঁসিতলা এলাকাতে। যেহেতু এখানে কয়েদখানা ছিল, তাই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের নাকি এখানেই ফাঁসি দেওয়া হতো। সেই থেকেই নাকি এই জায়গার নাম হয়েছে ‘ফাঁসিতলা’।  
 
শুধু ইতিহাসের কৌতূহল নয়, এই জায়গাকে ঘিরে রহস্যেরও অন্ত নেই। এখানে নাকি রাজার গুপ্তধন লুকানো আছে। কতজন যে কত অদ্ভুত গল্প বলে! কেউ বলে, হাল চাষ করতে গিয়ে হঠাৎ লাঙলের ফাল আটকে গেছে। খুঁড়ে দেখে একটা পীতলের ডেকচি, সোনারূপায় ভর্তি। কিন্তু যেই তুলতে যাবে উধাও! কেউ আবার বলে, সে হাল বাইছিল, এমন সময় পার্শ্ববর্তী ঢিবির মাটি হঠাৎ সরে গিয়ে দেখা দিয়েছে একটা দরজা, আস্তে করে দরজাটা খুলে গেছে, ওপারে চোখ ধাঁধানো রত্নভাণ্ডার, মনিমুক্তায় ভরা। কিন্তু হাত বাড়াতে নিমেষেই দরজা বন্ধ হয়ে মাটিতে সব ঢেকে গেছে।
 
এমন হাজারো গল্প গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে আছে। কেউ কেউ তো স্বপ্নে দেখেছে, এই ধনরত্ন নাকি এখনো গচ্ছিত আছে, কাউকে পাওয়ার অপেক্ষায়। যেন কোনো এক বিশেষ মানুষ জন্মাবে, আর এইসব ধনরত্ন তার হস্তগত হবে। শুনতে শুনতে মনে হতো, আমরা যেন আলিফ লায়লা বা সিন্দাবাদের গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়ছি।
 
তবে এসব কল্পকাহিনীর আড়ালে একটা বাস্তব সত্য লুকিয়ে আছে। এই অঞ্চলে কোনো এক সময় নিশ্চয়ই সমৃদ্ধ কোনো সভ্যতা ছিল। হয়তো দিনানাজ রাজার রাজত্ব, কিংবা পাল রাজাদের সুশাসন। আর এর প্রমাণ যেন চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। কাছেই মহিপাল দীঘি—দ্বিতীয় মহিপাল রাজার খনন করা বিশাল জলাধার। তাছাড়া চণ্ডিপুরের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য পুকুর যেন কোনো কৃষিনির্ভর সমৃদ্ধ জনপদের সাক্ষ্য দেয়।
 
শুধু তাই নয়, সময় সময় এই অঞ্চলে মাটি খুঁড়তে গিয়ে, বা কখনো পুকুরে খনন কাজ করতে গিয়ে পাওয়া গেছে বেশ কিছু অমূল্য নিদর্শন। কখনো পাথরের দামী মূর্তি, যার মূল্য কোটির উপরে, যেগুলো বর্তমানে জেলার যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। তো কখনো মাটির কলসি বা হাড়ি, তাতে রুপোর বা সোনার মুদ্রা। আবার কখনো কড়ি ভর্তি মাটির বারিয়া, যা নিয়ে আমরা ছোটবেলায় খেলা করতাম, যেগুলো প্রাচীন কোনো কালে বিনিময়ের মাধ্যম বা মুদ্রা রূপে ব্যবহার হতো। এসব আবিষ্কার যেন কোনোভাবে জানান দেয়—এই মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এক হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস, এক বিস্মৃত সভ্যতা।
 
আমার মনে আছে, ছোটবেলায় একদিন আমি, বাবলু কাকু, আমু আর সাজ্জেত আমরা আমাদের বৈঠকখানার পাশেই টালির খোলা ছোড়াছুঁড়ি খেলছিলাম। খেলাটার নাম আমাদের অঞ্চলে “টাকা-টাকা”। দেশলাইয়ের ছেড়া খাম ছিল আমাদের টাকা। যেখানে খেলছিলাম তার পাশে একটা ছোট্ট মাটির ঢিবি ছিল। হঠাৎ বাবলু কাকু ঢিবির ওপাশে নিজের খোলাটা ছুড়ে দিল, যাতে কেউ তার নাগাল না পায়। খোলাটা গিয়ে পড়ল ঢিবির একটা ফাটলে, আর “ঠক” করে একটা অদ্ভুত আওয়াজ হলো। আমাদের মধ্যে বয়সে সে ছিল সবচেয়ে বড়। তৎক্ষণাৎ বুঝে গেল, এখানে কিছু একটা আছে। তাড়াতাড়ি মাটি সরাতে শুরু করল। আমরা সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকলাম। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলো একটা ছোট মাটির পাইলা। ভেতরেও মাটি ভর্তি। সেটাকে উপুড় করতেই খনৎ করে একটা শব্দ হল। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে সেটা দ্রুত পকেটে পুরে নিল।
 
আরও মনে পড়ে। বাড়ি ভাগ হওয়ার পর আমাদের পুরনো মাটির ঘরগুলো ভাঙা হচ্ছিল। ঘরগুলো কত পুরনো, কেউই জানত না। অনেকেই মনে মনে আশা করেছিল, খননের সময় হয়তো লুকিয়ে থাকা কোনো ধনসম্পদ বেরিয়ে আসবে। সত্যিই তাই হল, পাওয়া গেল কয়েকটা মাটির হাঁড়ি আর কলসি। কিন্তু সেগুলোতে সোনার বা রুপোর কোনো ঝলক ছিল না। একটাতে মিলল ক’টা তামার মুদ্রা, আর বাকিগুলোতে শুধু কড়ি।
 
আজ যখন অতীতের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, মনে হয়—আমাদের শৈশব শুধু গল্পে ভরা ছিল না, ছিল ইতিহাস আর রহস্যের এক অপূর্ব মিশেল। মেজো আব্বার সেই গল্পগুলো হয়তো নিছক কল্পনা ছিল, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল আমাদের মাটির অতীত, আমাদের শিকড়ের কাহিনী। আর তাই সেই গল্পগুলো আজও আমাদের মনে এক অদ্ভুত টান সৃষ্টি করে। আমাদের ইচ্ছে করে ফিরে যেতে সেই ডেড়ির কোণে। হুঁকোর ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে আবার শুনতে ইচ্ছে করে সেই হারিয়ে যাওয়া দিনের কথা।
 
যদিও এই গালগল্পগুলো অধিকাংশই লোককথার আবরণে মোড়া, তবুও তার ভেতরে কোথাও না কোথাও বাস্তবতার ক্ষীণ রেখা যে লুকিয়ে আছে, তা অস্বীকার করা যায় না। আর সেই কারণেই ইদানীং আশঙ্কা হয়— কিছুদিন আগে যেভাবে ‘ছাওয়া’ সিনেমাটা দেখার পর একদল ভক্ত রায়গড় কেল্লার বাইরে টর্চ, কোদাল, ফাওড়া, এমনকি কেউ কেউ হাতে মেটাল ডিটেক্টর নিয়ে হাজির হয়েছিল, গুপ্তধনের খোঁজে মাটি খুঁড়তে। ঠিক তেমনি এইসব গল্পের টানে যদি ওদের আরেক দল কোনো একদিন ফাঁসিতলায় পৌঁছে যায়, সেই একই মোহে, অদেখা গুপ্তধনের খোঁজে…!  
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
৮ এপ্রিল ২০২৬

Thursday, 18 May 2023

বদিউর রহমানঃ অনুপ্রেরণা


 
অনুপ্রেরণা
বদিউর রহমান
 
আমার বয়স বাহাত্তরেরও বেশি। তা বললে কি হবে! আমার এক প্রিয় বন্ধু আছে, সে সবে ফাইভ পাশ করে সিক্সে উঠেছে। বন্ধু না বলে বান্ধবী বলা ভাল। একটা নাম করা ইংরেজি ইস্কুলে পড়ে। তার সঙ্গে আমার খুব বন্ধুত্ব। সে তার মনের অনেক কথা আমাকে বলে।
 
তার এমনিতে বুদ্ধিসুদ্ধি খুব ভাল, বরং অনেকের থেকে বেশি ভাল। কিছুক্ষণ পড়াশুনা করলে ওর মোটামুটি হয়ে যায়। কিন্তু তার মা, বিশেষতঃ আমার স্ত্রী, তার বড়মা চায়, সে সবসময় বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে পড়াশুনা করুক। সে জন্য তাকে যখনই দেখেন মোবাইল দেখছে, তিনি তার স্বরে চিৎকার করে বকা দিতে থাকেন। আর তাতেই নাকি আমার বন্ধুরও জেদ চেপে যায়। সে তখন কিছুতেই মোবাইল ছাড়ে না। নানা কারণে তার মা বাংলা, অংক বিভিন্ন বিষয়ের জন্য বাড়িতে গৃহশিক্ষক রেখেছেন।
 
আমার বন্ধুটি তাদের কাছে পড়তে যায়, কিন্তু খুব অনিচ্ছা নিয়ে। সে জন্য টিচার আসার ঠিক আগের মূহুর্তে তার একটু ঘুম ঘুম আসে। এমনিতে সে দিনের বেলা কিছুতেই ঘুমায় না। কিন্তু টিচারের জন্য একটু ঘুম আনতে হয়। আরও কিছু কায়দা সে রপ্ত করেছে যাতে টিচারের কাছে গেলেও একটু কম পড়তে হয়। যেমন টিচারের কাছে যাওয়ার পর বিষয়ের বইখাতা খুঁজতে একটু সময় কাটানো। পড়তে বসে ঘন ঘন টয়লেট পাওয়া। সেখানেও একটু সময় কাটানো। বুদ্ধিমানের মত কাজ করতে সে বেশ পটু। তার টিচারদের সঙ্গে সখ্যতা করে সমঝোতা করে কম কম পড়া। সেটা কী রকম বলি; বাংলার অর্পিতা ম্যাডামের সঙ্গে রফা হল যে, তিনি তার নিজের লেখা শোনাবেন আর তার জন্য একটু কম পড়াবেন। আর অঙ্কের কলেজ ছাত্রী ম্যাডামের সঙ্গে রফা হল, তার হাত চুলকে দিতে হবে, তাহলে কম অঙ্ক করাবেন। এইভাবে স্কুলের টিচারদেরও বেশ হাত করেছে। আমার বন্ধুটা অঙ্কে বেশ ভাল। স্কুলে অঙ্কে কয়েকবার পুরো নম্বর তুলে কিছু টিচারের নজর কেড়ে নেয়। আর্ট স্যরকেও ম্যানেজ করে সব আর্ট তাকে দিয়েই করিয়ে নেয়। অবশ্য টেনিস খেলতে তার খুব ভাল লাগে। তাই বিকালে পল স্যারের কোচিং-এর পরও তাকে টেনিস খেলতে যেতেই হবে। আর একটা ভাল কাজ বাংলার অর্পিতা করিয়েছে। সে ভুলিয়ে ভালিয়ে তার ছাত্রীকে বেশ কয়েকটা বাংলা কবিতা মুখস্থ করিয়েছে; সেগুলো আবৃত্তি শিখিয়েছে।; তার মধ্যে ‘শুঁয়োপোকা’ অন্যতম। তাছাড়াও সে বাংলা গল্প পড়তে শিখিয়েছে। বন্দে আলী মিঞা, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, কুমুদরঞ্জন প্রমুখদের চিনিয়েছে।
 
গত বছর সল্টলেক বইমেলায় ওকে সুকুমার রায়ের ‘আবোলতাবোল’ ও ‘হ-য-ব-র-ল’ কিনে দেওয়া হয়েছিল। আর সেদিন সন্ধ্যাতেই ‘কুমড়োপটাশ’, ‘পেঁচা ও পেঁচানি’ ইত্যাদি পড়ে শোনানো হয়েছিল। ‘পেঁচা ও পেঁচানি’ নিয়ে আমাকে ও আমার স্ত্রীকে ইঙ্গিত করে সে রসবোধের পরিচয় দেয়। ক’দিন হল আমাকে ফোন করে লীলা মজুমদারের হলুদ পাখির পালক পড়েছে জানাল। গল্পটা কী জানতে চাইলে সে তার সারমর্ম আমাকে শোনালো! আমি অবাক! আরও অবাক আমাকে হঠাৎ বলে বসল, “আজকাল আর লিখছ না?” বললাম, প্রায় মাস দুয়েক হল আমি অসুস্থ। তুমি তা জানো। তাই আর লিখতে পারছি না। ওদিক থেকে যা শুনলাম, তাতে আমি শুধু আশ্চর্যান্বিতই নই, পুলকিতও বটে। শুনি কী, আমার বন্ধু বলছে, “লেখাটা ছেড়ো না। ব্যাথা, বেদনা আর কষ্টের দিনগুলো কেমন কাটছে, তাই লিখে রাখো। যতটুকু পারো লেখো। কিন্তু লেখো। আমিও একটু একটু করে লেখা শুরু করেছি।” কথাগুলো শুনে এত আনন্দিত হয়েছি যে, ছোট্ট বন্ধুটিকে বলি, “কথা দিচ্ছি আজীবন লেখার চেষ্টা করব।” আর একটা ছোট্ট বাচ্চার কাছে এভাবে অনুপ্রাণিত হব, জীবনেও কল্পনা করিনি।
 
সল্টলেক
২৭/৪/২৩