Pages

Wednesday, 11 March 2026

এক অন্য রকম সংবর্ধনা - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

  

২০০৭ সাল। আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। সে বছর আমি বাসুরিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা থেকে আলিম পরীক্ষা দিই। আলিম পরীক্ষা—পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষৎ কর্তৃক আয়োজিত, মাধ্যমিকের সমতুল্য এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তবে আমার কাছে তা শুধু একটি পরীক্ষাই ছিল না, ছিল স্বপ্ন, ছিল প্রত্যাশা, ছিল নিজের ভেতরের সাধনার এক নীরব প্রকাশ।
 
পরীক্ষার সেন্টার পড়েছিল আবেশকুড়ি হাই মাদ্রাসায়। বাড়ি থেকে বেশ দূরে। ফলে গিয়ে উঠলাম জলকুড়িয়ায় সুরো দি’র বাড়িতে। পরীক্ষার দিনগুলো আজও চোখে ভাসে। সকাল সকাল গোসল করে, চারটা ডালভাত খেয়ে সাইকেল নিয়ে যথাসময়ে পৌঁছে যেতাম সেন্টারে। পরীক্ষা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকেই ইনভিজিলেটর স্যার ও ম্যাডামেরা মাঝে মাঝে এসে আমার খাতা উল্টেপাল্টে দেখতেন, মৃদু হেসে বলতেন—“বেশ সুন্দর হাতের লেখা, বিশেষ করে আরবি।” কথাগুলো শুনে বুকের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসত। আমাদের স্কুলের স্যারেরা আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন, যেন পরীক্ষার হলে আমার কোনো রকম ডিস্টার্ব না হয়। সেই যত্ন, সেই আস্থা—আজও মনে পড়লে বুকটা ভরে যায়।
 
পরীক্ষা শেষে ফিরে এলাম বেলপুকুর মাদ্রাসায়। দিন কাটছিল খুব সাধারণভাবে—দিনে একটু আধটু পড়াশোনা, বিকেলে মাসুদের সঙ্গে গল্প, কখনো বা খেলাধুলা। এরই মাঝে একদিন বিকেলে বনিপাড়ার মোতালেব স্যার আমাকে ডেকে বললেন— “মাতিন, তুমি একটা কাজ করবে? সন্ধ্যেবেলা আমাদের বাড়িতে এসে তোমার কাকিমা আর বাকিদের আরবি উচ্চারণটা একটু শুদ্ধ করে শিখিয়ে দেবে। যাতে ওরা ঠিকভাবে কুরআন পড়তে পারে।”
 
স্যার আমাকে খুব স্নেহ করতেন। ফলে তাঁর  সেই কথা অমান্য করে তাঁকে অসম্মান করার মতো আহাম্মকি করি কী করে। তাই মাগরিবের নামাজের পর স্যারের বাড়ি যেতে আরম্ভ করলাম। এভাবেই দিন গড়াতে লাগল—নিঃশব্দে, নীরবে।
 
তারপর এলো রেজাল্টের দিন। মোতালেব স্যার মালদা গেলেন বেলপুকুর হাই মাদ্রাসার রেজাল্ট আনতে। সেখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয় আমাদের হেড স্যারের—অর্থাৎ সুপারিন্টেন্ডেন্ট গণি স্যারের। সেখান থেকেই প্রথম খবরটা আসে। মোতালেব স্যার ফোন করে বললেন, “মাতিন, তুমি র‍্যাংক করেছো।” কত নম্বর, কত র‍্যাংক—তা তখনও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।
 
কিছুক্ষণ পরেই স্কুলের স্যারেরা জানালেন—আমি রাজ্যে দ্বিতীয় হয়েছি। আনন্দে বুক ভরে গেল। কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেই ফারুকী স্যারের কণ্ঠে প্রবল ক্ষোভ— “এই পেপারটায় তো তুমি আরও ভালো করেছিলে! এখানে এত কম নম্বর কেন?”
 
স্যারের সেই কথার ভেতর ছিল ছাত্রের প্রতি গভীর দরদ। পরবর্তীতে তাঁরাই উদ্যোগ নিয়ে রিভিউয়ের আবেদন করলেন। যথাসময়ে ফল বেরোল—দেখা গেল, আমার সেই পেপারে দশ নম্বর বেড়েছে। মুহূর্তেই বদলে গেল ইতিহাস। আমি রাজ্যে প্রথম হয়ে গেলাম।
 
এরপর যেন একের পর এক ঘটনা। কোলকাতায় গিয়ে বিভিন্ন সংস্থা থেকে পুরস্কার, সংবর্ধনা, মানপত্র গ্রহণ। খবর বেরোল পত্রপত্রিকায়। এলাকায় জানাজানি হয়ে গেল। চারপাশ থেকে স্নেহ, ভালোবাসা, দোয়া—সবকিছু একসঙ্গে এসে আমাকে ঘিরে ধরল। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেও এমন এক ঘটনা ঘটেছিল, যা আজও আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
একদিন হোস্টেল থেকে বাড়ি ফিরছি। মহিপালে বাস থেকে নামলাম। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর একটা রিকশা পেলাম। কথা হতে লাগল রিকশাওয়ালা কাকুর সঙ্গে। তাঁর বাড়ি আমাদের পাশের গ্রাম চাঁদপুরে। তাঁর কথাবার্তায় বুঝতে পারলাম, তিনি আমাদের পরিবারকে অল্পস্বল্প চেনেন ও জানেন। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করছিলেন—আমি এখন কোথায় পড়ছি, কী পড়ছি। আমিও সহজভাবেই সব বলছিলাম।
 
আধ ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের গ্রামের মোড়ে পৌঁছে গেলাম। তখন মহিপাল থেকে বাঁশকুড়ি পর্যন্ত রিকশা ভাড়া ছিল সম্ভবত কুড়ি টাকা—সে সময়ের হিসেবে যা মোটেই কম নয়। আমি যখন ভাড়া দিতে এগিয়ে গেলাম, তিনি হাত বাড়ালেন না।  মৃদু হেসে বললেন— “বাপু, তোরা হামার এলাকার নাম উজ্জ্বল কইছেন। তোমার ঠি হাঁরা ভাড়া নিমো না। ভগবান তোমাক আরও বড় মানুষ করৌক!”  
 
আমি থমকে দাঁড়িয়ে রইলাম। এতটা নিঃস্বার্থ ভালোবাসা! কীভাবে তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানাবো—সেই মুহূর্তে মাথায় কিছুই আসছিল না। এতটাই অবাক হয়ে গেছিলাম যে, কাকুকে তাঁর নামটাও জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছিলাম।  
 
আজ এতো বছর পর আমার আফসোস হয়। যদি রিকশাওয়ালা কাকুর নামটা জানা থাকত, ওই গ্রামে আমার যে বন্ধুবান্ধব আছে, তাদের মাধ্যমে হয়তো তাঁর খোঁজখবর নিতে পারতাম। কিন্তু না—তা আর হয়ে ওঠেনি।
 
মাঝে মাঝেই কেন জানি মনে হয়, জীবনে কিছু মানুষ সত্যিই ফেরেশতার মতো আসে। কোনো পরিচয় ছাড়াই, কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই—নিজের ভালোবাসাটুকু দিয়ে চলে যায়। সেই রিকশাওয়ালা কাকু আমার জীবনে ঠিক তেমনই এক ফেরেশতা হয়ে এসেছিলেন। আসলেন… স্নেহ-ভালোবাসায় জড়িয়ে আবার নিঃশব্দে মিলিয়ে গেলেন।
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
০৪/০৩/২০২৬

No comments:

Post a Comment