Tuesday, 3 March 2026

তারাবীহ্‌র নামাজে - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 

রমজান মাসে রাতের প্রথম প্রহরে “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার” ডাক কানে ভেসে এলেই আমাদের বাড়ির পুরো ছবিটা বদলে যেত। বাতাসে নেমে আসত এক অদ্ভুত রকমের ব্যস্ততা। আমি কোনোরকম দেরি না করে তাড়াতাড়ি অজু সেরে নিতাম, যেন আজানের ধ্বনি আমাকে তাড়া দিচ্ছে। তারপর পাঞ্জাবিটা গায়ে গলিয়ে ছোট্ট লুঙ্গিটায় দুবার, কখনো তিনবার টেনে শক্ত করে গিঁট বেঁধে নিতামমনের ভেতরে একটা ভয় কাজ করতো, পাছে রুকু-সাজদায় গিয়ে যদি লুঙ্গি খুলে যায়!
 
বাবা তখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করতেনআমার অজু করা হলে তিনি যত্ন করে আমার মাথায় টুপি পরিয়ে দিতেন। তারপর রেডি হয়ে আমি তাঁর হাত ধরে মসজিদের পথে রওয়ানা দিতাম। তাঁর হাতটা ধরলেই আমার মনে হতো, পুরো দুনিয়াটাই বুঝি নিরাপদ হয়ে গেছে। রাস্তার অসমতল মাটি, সন্ধ্যার হালকা অন্ধকার, বারান্দায় বারান্দায় জ্বলতে থাকা বাতিসবকিছু মিলিয়ে সেটা ছিল এক মায়াবী পথ আজও মনে হলে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক হাহাকার জেগে ওঠেবোধ করি, তারাবীহ পড়তে যাওয়ার সেই পথটা শুধু একটা পথ ছিল না, সেটা ছিল আমাদের শৈশবের এক নির্ভার যাত্রা
 
রমজান এলেই তারাবীহ আমাদের কাছে উৎসব হয়ে উঠত। যদিও তা নফল (অর্থাৎ আবশ্যিক নয় এমন) নামাজতবে আমরা তখন এত কিছু বুঝতাম না আমরা শুধু বুঝতাম, রাতে মসজিদে গেলে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে। আনন্দ হবে। হৈচৈ হবে, এই আরকি। আমাদের গ্রামে আট রাকাআত তারাবীহ পড়া হতো। এখনো আট রাকাআতই হয়। যদিও কোথাও দশ হয়, কোথাও আবার বিশতবে হিসাবের এই মারপ্যাঁচ তখন জীবনে ঢোকেনি। আমাদের তখনকার হিসাব ছিল খুব সোজাকে কার পাশে দাঁড়াবে, কে আগে মসজিদে পৌঁছাবে।  এই সব।
 
মসজিদে ঢুকেই আমাদের ঠাঁই হতো একেবারে পেছনের কাতারে। নিয়ম মেনে বড়রা সামনে, আর আমরা ছোটরা পেছনেপেছনের সেই কাতারযেন আমাদের তরে আলাদা এক রাজ্য। নামাজ শুরু হতেই আমাদের মন নামাজে কম, খুনসুটিতে বেশি আটকে যেত। কখনো আমু হঠাৎ করে পেছন থেকে কারো পাঞ্জাবি ধরে টান দিচ্ছে, তো লাবু লুঙ্গির গিটে আঙুল ঢুকিয়ে খোঁচা মারছে। কখনো দেলোয়ার আর পাগলু চোখাচোখি করে নিঃশব্দে হেসে উঠছে। আবার কখনো আফসার কানে কানে এমন কিছু বলছে, যেটা শুনে সাজ্জেত দাঁত চেপে হাসতে হাসতে প্রায় কেঁপে উঠছে। কখনো সামনের কাতারে মিঠুন আর ঠিক তার পেছনে জুয়েল দাঁড়ালে, সাজদার বেলা সুযোগ বুঝে মিঠুনের পা ধরে জুয়েল একটা হ্যাঁচকা টান দিতো। অমনি মিঠুন নামাজের মধ্যেই ঝাঁঝিয়ে উঠত, “শালারা নামাজ পড়িব আসি শয়তানি করেছে”আরও কতো কিছু, তবে আমরা সবাই বুঝতামহাসি বেরিয়ে গেলে বিপদ, তাই আমরা সেই হাসি গিলে নামাজের জায়গায় চোখ আটকে রাখার অভিনয় করতাম
 
সত্যি করে বলতে, পেছনের কাতারটা তখন আমাদের জন্য এক অদ্ভুত স্বর্গ ছিলযেখানে শাসন ছিল না বললেই চলে, কিন্তু স্বাধীনতা ছিল অফুরানআর তাই শিশুসুলভ দুষ্টুমি, চাপা হাসি, দৃষ্টির লুকোচুরি, ঠাট্টামশকরাসব মিলিয়ে এক অনাবিল শৈশবের মঞ্চ ছিল পেছনের সেই কাতার  
 
তবে একটা মুহূর্তে সব সিনারিও বদলে যেত। যেই না ইমাম সাহেব কিরাত শেষ করে ওয়ালাজ-জাল্লীনবলতেন, অমনি আমরা সবাই যেন একসঙ্গে সিরিয়াস হয়ে যেতাম। আমু, লাবু, দেলোয়ার, পাগলু, আফসার, সাজ্জেত, মিঠুন, জুয়েলআমরা সবাই বুকভরা দম নিয়ে একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠতাম, “আমীন এত জোরে যে, আমাদের কণ্ঠ যেন টিনের ছাউনি ভেদ করে আরশে পৌঁছে যাচ্ছে। মনে হতো, এই একটিমাত্র শব্দে আমাদের সব দুষ্টুমি ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছেইদানীং মনে হয়, হয়তো সেই আমীনউচ্চারণেই ছিল আমাদের শিশুমনের সব বিশ্বাস, সব আশা, সব নির্ভরতা।
 
তারপর ইমাম সাহেব যখন অন্য কোনো সূরার পাঠ আরম্ভ করতেন, আবার শুরু হতো আমাদের দুষ্টুমিজামা টানাটানি, চোখে চোখে ইশারা, ঠাট্টামশকরা আর চাপা হাসির গুঞ্জনকিন্তু দু’ রাকাআত শেষে যেই না ইমাম সাহেব সালাম ফেরাতেন, আমরা হঠাৎই অসম্ভব ভদ্র হয়ে যেতাম। চোখ নামিয়ে চুপচাপ বসে থাকতাম, কেউ আবার তাসবীহ পাঠের আদলে মুখ নাড়তযেন আমাদের পেছনের কাতারে কোনো কিছুই হয়নি। তবে ইমাম সাহেব আবার যখন আল্লাহু আকবার বলে পরবর্তী রাকাআত আরম্ভ করতেন, আমাদের ছোট্ট রাজ্যে আবার প্রাণ ফিরে আসত।
 
এভাবে চার রাকাআত নামাজ শেষে, আরম্ভ হতো মোনাজাতইমাম সাহেব যখন দোয়ার জন্য হাত তুলতেন, তখন মসজিদের আকাশে বাতাসে এক অদ্ভুত রকমের নীরবতা নেমে আসতোতাঁর কণ্ঠ মাঝেমধ্যে কেঁপে কেঁপে উঠত, কান্নার ভারে গলা বুজে আসত। মুসল্লি মহলেও একটা চাপা কান্নার রোল উঠত। আর তা দেখে আমাদের বুকের ভেতর অজানা এক ভার নেমে আসতআমরা তখন দোয়াগুলোর মানে বুঝতাম না, কিন্তু জানতামকোথায়, কখন আমীনবলতে হয়। তাই বারবার বলে উঠতাম, “আমীন, সুম্মা আমীন, আমীন ইয়া রাব্বাল আলামীন।আজ মনে হয়, সেই আমীনগুলোই ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে খাঁটি ও নির্ভেজাল দোয়া।
 
তারাবীহ শেষ হলে আমরা আর এক মুহূর্তও মসজিদে থাকতাম নাজুতো জোড়া হাতে নিয়ে দে দৌড়। মনে হতো, যেন পায়ে বল নিয়ে গোল পোস্টের দিকে ধাওয়া করছে কোনো ফুটবলার, যেন কেউ মেসি, কেউ রোনাল্ডো, কেউ মোহাম্মদ সালাহসেই আলোআঁধারি পথ ধরে কেবল ছুটছি, আর ছুটছিযেন আমাদের সেই দৌড়ের ভেতরই শৈশবের সকল আনন্দ, সম্পূর্ণ মুক্তি।
 
আমাদের গ্রামের সেই মসজিদ আজও আছে, এখন আরও বড় আকারে, আধুনিক সাজসরঞ্জামে ভরা, মেঝেতে মার্বেল পাতা, আজানও হয়, তারাবীহ্‌ও হয়, এবং শেষ ক’বছর ধরে মেয়েরাও তাতে শামিল হয়কিন্তু পেছনের কাতারের সেই ছোট্ট ছেলেগুলো আর নেই। আমু, লাবু, দেলোয়ার, পাগলু, আফসার, সাজ্জেত, জুয়েলসবাই যে যার জীবনের কাতারে দাঁড়িয়ে গেছে। বাবার হাত ধরার সুযোগটাও আমার আর নেই। তবে রমজানের রাতে আজও যখন দূর থেকে ভেসে আসে—“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার”, হঠাৎই মনে হয়, আমি আবার সেই ছোট্ট ছেলেটা, লুঙ্গির গিট শক্ত করে বাঁধছি, আর বাবার হাত ধরে তারাবীহ পড়তে আলোআঁধারি পেরিয়ে মসজিদের পথে হাঁটছি
 
হেস্টিংস, কোলকাতা
২৪/০২/২০২৬

No comments:

Post a Comment