সকাল বেলা সবাই বসে চা খাচ্ছি। এমন সময় মেইন দরজায় ক্রিং ক্রিং করে
সাইকেলের বেল বেজে উঠলো। সেই সাথে বাতাসে ভেসে এল একটা দরাজ কণ্ঠ— “কাঁ বো মামি, বাড়িত আছেন?” মুহূর্তেই হাড়াম করে দরজাটা
খুলে গেলে। আর সেই সাথে লম্বা একটা সালাম শুনতে পেলাম আমরা। দেখলাম, দরজায় শইরদ্দিন ডাক্তার।
তাঁর ভালো নাম শহিরুদ্দীন আহমেদ। কিন্তু এই নামটা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। মানুষ তাঁকে চেনে ও ডাকে—শইরদ্দিন ডাক্তার নামে। সম্পর্কে তিনি আমার দাদু হোন—আমার বাবার দূরসম্পর্কের মামা। তাই দেখা হলে, আমাদের দাদু-নাতির খুনসুটি লেগেই
থাকে। তবে এই সম্পর্কের চেয়েও বড় পরিচয়, তিনি আমাদের এলাকার এক জীবন্ত ইতিহাস।
সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। একটা
পুরনো সাইকেল, হ্যান্ডেলে ঝোলানো ব্যাগ ও মাঝেসাঝে একটা বর্ষাতি—এই তাঁর সব, এই তাঁর সম্বল। সেই সাইকেল
নিয়েই তিনি চষে বেড়ান পুরো এলাকা—চণ্ডিপুর, পুতহরি,
তুলাই পেরিয়ে উদয়পুর,
আরও আশপাশের কতশত গ্রাম। সাইকেলের হ্যান্ডেলে ঝোলানো সেই
পুরনো ব্যাগে থাকে
নানারকমের ওষুধ—হোমিওপ্যাথির শিশি, কাগজে মোড়া বড়ি, আর সঙ্গে তাঁর অদ্ভুত বিশ্বাস—মানুষ ঠিক হলে
ওষুধও কাজ করে। কোনো ডিগ্রি নেই, কোনো চেম্বার
নেই;
তবু অসংখ্য মানুষের ভরসার জায়গা তিনি।
তিনি শুধু ডাক্তার নন, তিনি একজন গল্পকারও। এলাকার সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষদের একজন, তাঁর ঝুলিতে জমে আছে সময়ের অগণিত কাহিনী। সন্ধ্যা নামলে, বা অলস দুপুরে, তাঁর মুখে শুনেছি
পলিয়া পাড়ার গল্প, ফাঁসিতলার ইতিহাস, শালেককুড়ির অজানা উপাখ্যান, বড় মৌলানা ও
তাঁর ভাইয়ের শিক্ষা, সংগ্রাম, রাজনীতি ও নানা টানাপোড়েন—আরও কত শত গল্প, যা কোনো বইয়ে লেখা নেই, শুধু মানুষের মুখে মুখেই বেঁচে আছে।
এসবের বাইরেও তাঁর একটা অদ্ভুত শখ আছে—শখ বললে কম বলা হবে, তবে কেউ চাইলে একে বদ নেশাও বলতে পারে। তিনি বছরের পর বছর ধরে লিখে রেখেছেন এলাকার মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ। কার
কখন জন্ম,
কে কবে চলে গেল—সবই তাঁর খাতায় যত্ন করে লেখা। কোনো গবেষণার উদ্দেশ্যে নয়, কোনো উপার্জনের আশায়ও নয়, আর না কোনো স্বীকৃতির লোভে। শুধু মানুষকে, এলাকা আর তার ইতিহাসকে ভালোবেসে। যেন সময় হারিয়ে গেলে অন্তত নাম-তারিখগুলো
বেঁচে থাকে।
ইদানীং বয়স বেড়েছে তাঁর।
শরীর ভার হয়েছে, চোখে ঝাপসা দেখেন, হাত কাঁপে কখনো কখনো। তবে
আশ্চর্য এক জেদে আজও থেমে যায়নি তাঁর সাইকেলের চাকা, এক দিনের জন্যেও না। গতি কমেছে, পথ ও পরিধি ছোট
হয়েছে,
কিন্তু থামেনি। কারণ এই সাইকেল শুধু যাতায়াতের বাহন নয়—এটাই তাঁর পরিচয়, তাঁর দায়বদ্ধতা, তাঁর নিঃশব্দ সেবা।
এবার বাড়ি গিয়ে একদিন মোড়ে বসে
মোবাইল ঘাঁটছি, এমন সময় তিনি মহিপাল থেকে ফিরছিলেন। আমাকে দেখে অটো থেকে নেমে পড়লেন।
কাছে এসে বিনয়ের স্বরে বললেন,
—“প্রোফেসর সাহেব, একটা অনুরোধ
রাখতে হবে”।
উত্তর দিলাম—হুকুম করেন, মহারাজ।
হা হা করে হাসতে হাসতে বললেন,
—আমাদের গ্রামে একবার যেতে হবে,
মসজিদটা দেখতে। বহুবার বলেছি, এবার যেতেই হবে।
—আলবৎ যাবো। কথা দিলাম। ইন্ শা
আল্লাহ্!
পরের দিন সকাল বেলা চা খেয়ে হাঁটতে
হাঁটতে পৌঁছে গেলাম বাটুয়াদীঘি। আমাদের জমিজমাগুলো এক নজর দেখে প্রথমে গেলাম বড়
দাদিকে দেখতে। তাঁর সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিলাম। তারপর
শইরদ্দিন দাদুর বাড়ি গেলাম। গিয়ে দেখি, তিনি যথারীতি সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন।
দাদি ঘর থেকে বেরিয়ে বেশ জোরাজুরি করতে লাগলেন চা খাওয়ার জন্য। তাঁকে কোনোরকমে
মানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আব্দুল ওয়াহাব, তাঁর ছোট ছেলে আমাকে তাঁদের মসজিদটা দেখাতে
নিয়ে গেল। মসজিদে ঢুকেই আমি অবাক। সুন্দর করে সাজানো। চারপাশে ফুলের গাছ। কতশত
রকমের ফুল ফুটে আছে ডালে ডালে। প্রাচীরের গায়ে লম্বা লম্বা সুপুরি ও পাইন গাছ
দাঁড়িয়ে। মেঝের মার্বেল আয়নার মতো স্বচ্ছ। কোথাও ধূলিকণাও নেই। আব্দুল ওয়াহাবকে
জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, দাদু রোজ দু’ বেলা নিজে প্রথমে ঝাড়ু দেন। তারপর একবার
জল দিয়ে পোছা লাগান। শেষে একবার শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে দেন। আর এসবই করেন পরম
যত্নে, মমতা ভরে।
সত্যি করে বলতে, শইরদ্দিন দাদু
শুধু একজন মানুষ নন—তিনি একটা যুগ, একটা জনপদ,
একটা চলমান স্মৃতিভাণ্ডার। তিনি ওষুধ দিয়ে যেমন বহু মানুষের রোগ সারিয়েছেন, তেমনই
গল্প দিয়ে জুড়ে রেখেছেন ভাঙতে বসা স্মৃতিগুলোকে।
এই এলাকায় জন্ম নেওয়া আর চলে যাওয়া অসংখ্য মানুষের নামের
পাশে,
নীরবে কোথাও না কোথাও লেখা আছে তাঁরই ছায়া—যে ছায়া এখনো
হেঁটে বেড়ায়, শীতের সকালে কুয়াশার চাদর জড়িয়ে, অথবা গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় গোধূলির
আলো গায়ে মেখে, অথবা নিঝুম বর্ষায় বর্ষাতি মাথায়, হেঁটে বেড়ায় বাঁশকুড়ি-বাটুয়াদীঘি
মেঠো পথে।
১৯/০১/২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা

No comments:
Post a Comment