Pages

Friday, 6 March 2026

পীর পখরিয়া - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

 


কাঁ বাহে, পন্তা খাবানেন। বেলা হই গেল।
কেনে খামোঁ না। আলবাৎ খামোঁ। কুইন্না খাবেন চলো।
কেনে, পীর পখরিয়া ডাঙিত।
চলো তাইলে।
 
আমাদের গ্রামের দক্ষিণপশ্চিম কোণে, এক্কেবারে মাঝ মাঠে অবস্থিত একটা ছোট্ট জলাশয়তার চারপাশে বিস্তৃত ধানক্ষেত, পুকুর লাগোয়া একটা ডাঙা ধাঁচের সামান্য উঁচু জমি, আর পাড়ে কয়েকটা পুরনো গাছযে গাছগুলো বহু বছর ধরে সবকিছুর নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লোক মুখে এর নাম পীর পখরিয়া। এই নামটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের একখণ্ড শৈশবএই পুকুরটাই ছিল আমাদের ছেলেবেলার পরিচিত দিগন্তের শেষ সীমানা। এখানে পখর বা পখরিয়া মানে পুকুরআর শোনা যায়, কোনো এককালে এই পুকুরপাড়েই নাকি এক পীরের আবাস ছিল। সেই থেকে পীর পখরিয়া। তবে সত্য-মিথ্যা আমার জানা নেইআর তখন তা যাচাই করার বয়সও আমাদের ছিল না; প্রয়োজনও মনে হয়নি। তখন বিশ্বাসটাই ছিল আমাদের একমাত্র যুক্তি।
 
বছরের পর বছর ধরে সেই পুকুরপাড়ে কত মানুষের যে ক্লান্তি এসে জমা পড়েছে, তা আল্লাহ্‌ই ভালো জানে ছোটবেলায় দেখতাম, রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে চাষা, দিনমজুর ও রাখালেরা কাজের ফাঁকে সেখানে এসে বসত। কেউ পোঁটলার ভেতর থেকে পান্থা ভাত বের করে বলত,
—“এই জায়গাত বসো, এইন্না হাওয়া লাগেছে
কেউ পুকুরের জল হাতে-মুখে ছিটিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলত,
—“আহ্‌, কী আরাম লাগেছে, মনে হছে স্বর্গত আনু!
 
পুকুরের ঠান্ডা জল, গাছের ছায়া আর নিঃশব্দ মাঠসব মিলিয়ে জায়গাটার মধ্যে ছিল এক নৈস্বর্গীক সৌন্দর্য, সেখানে বিরাজ করতো অদ্ভুত এক প্রশান্তি, যা শব্দে ধারণ করা আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব।  
 
আমাদের শৈশবের স্কুল ফেরত বিকেলগুলো সেই পুকুরকে ঘিরেই আবর্তিত হতোস্কুল ছুটির পর আমরা ছুটে যেতাম পীর পখরিয়ায়। কেউ চিৎকার করে বলত,
—“চলো, আগে পুকুরপাড়ত দৌড় দিমোঁ!
কেউ আবার সাবধানের সুরে ফিসফিস করে বলত,
—“আন্ধার হইলে কিন্তু পীর বাবা রাগ করিবি!
 
হঠাৎ যদি কোনো অচেনা শব্দ কানে আসত, কিংবা আকাশটা আচমকা কালো হয়ে উঠত, আমরা সবাই একসাথে বলে উঠতাম
—“পীর বাবা, হামাক বাঁচা!
আর সঙ্গে সঙ্গে দর কষাকষি শুরু হয়ে যেত
—“দুটা ঘোড়া চড়ামো তোর থানত
—“মুই বাতাসা দিম
—“মুই খুরমা দিম, কথা দেছু
সেই প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল শিশুসুলভ, কিন্তু আন্তরিক।
 
সময় এগোল, আমরা একটু বড় হলাম। ভয় কিছুটা কমল, সাহসও খানিকটা বাড়ল। সেই সময় সকালে, কোনোদিন বিকেলে, মাঠে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই আমাদের চোখে পড়তপীরের থানে কেউ নতুন করে মাটির ঘোড়া চড়িয়ে গেছে। তখন আমরা খুশিতে লাফিয়ে উঠতাম।
—“দ্যাখ, নয়া রঙিন ঘোড়া!
—“এইটা মোর, আগে মুই ধইছু!
 
কখনো দেখতাম পীরের থানে বাতাসা বা খুরমা রাখা আছে। আমরা সেসব গামোছায় বেঁধে নিয়ে গাছের ডালে উঠে ভাগাভাগি করে খেতাম। খেতে খেতে কেউ গল্প ধরত, কেউ গুনগুন করে গান গাইত, আবার কেউ তার সাথে তাল মিলিয়ে বলত,
—“এনা আরও জোরে, পীর বাবা শুনেছে!
এটা শুনে আমরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়তাম। আর আমাদের হাসি, কোলাহল ও গানের সুরে মাঠটা যেন আরও প্রশস্ত হয়ে উঠত।
 
আজ এত বছর পর মনে হয়, পীর পখরিয়া আদতে কোনো অলৌকিক জায়গা ছিল না; ওটা ছিল আমাদের শৈশবের এক আশ্রয়স্থল। সেখানে ভয় ছিল, কিন্তু সেই ভয়েই ছিল ভরসা। সেখানে বিশ্বাস ছিল, কিন্তু তা কোনো ধর্মগ্রন্থে বাঁধা ছিল নাছিল নিছক মানব-আশ্রিত
 
আজ এতো বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়, যদি কোনো এক বিকেলে আবার সেই মাঠের পথে হাঁটি, হয়তো পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে কারো কণ্ঠ শুনতে পাবো
—“পীর বাবা হামাক বাঁচা!
 
যদিও সেই কণ্ঠ আর ফিরবে না জানি। সময় অনেক বদলেছেএখন গ্রামের শিশুকিশোরেরা স্কুল থেকে ফিরে আর পীর পখরিয়ায় যায় না পুকুরটাও অবহেলায় অযত্নে হয়তো বুজে গেছে সেই গাছগুলো হয়তো নেইধর্ম নিয়ে মানুষের কৌতূহল ও সচেতনতা বেড়েছে, ফলে পীরের থানে ঘোড়াগুলো আর কেউ চড়ায় না, বাতাসা-খুরমাও আর কেউ রেখে আসে না মাঝে মাঝে বালিকা বেটির দোকানের চালায় বসে অপলক পীর পখরিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকি। পচিশ-তিরিশ বছর আগের ছবিগুলো একে একে চোখে ভেসে ওঠে। মনে হয়, স্মৃতির ভেতরে পীর পখরিয়া আজও জেগে আছেপূর্ণ হয়েও যেন অপূর্ণ, ছোঁয়া যায় না অথচ ভুলে যাওয়াও যায় না। মনে হয়, সেই অপূর্ণতার স্বাদ নিয়েই আমাদের শৈশব আজ দূরে কোথাও দাঁড়িয়ে, আমার মতো করে নিঃশব্দে অপলক তাকিয়ে আছে
 
৩১/০১/২০২৬
হেস্টিংস, কোলকাতা

No comments:

Post a Comment