Pages

Tuesday, 26 October 2021

বদিউর রহমানঃ আমি জানি না



আমি জানি না
বদিউর রহমান
 
একটা গোলাপে
কতগুলো পাপড়ি
আমি জানি না

প্রস্ফুটিত গোলাপের রূপ সুবাস
কোথা হতে আসে
আমি জানি না

পেলব পাপড়িগুলো
কেন শুকিয়ে যায়
আমি জানি না

দুদিনে তার অত পরিবর্তন
কেন হয়
আমি জানি না 

---------- ০ ---------

মানুষ হয়ে জন্মানোর রহস্য
আমি জানি না

জন্মলগ্নের প্রভাত কিরণ
কেমন ছিল
আমি জানি না

মধ্যগগনে বিরাজমান
আত্মম্ভরিতা কেন ছিল
আমি জানি না

শেষ অধ্যায়ে সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ
কেন জবাব দেয়
আমি জানি না

মৃত্যুর বজ্রকঠিন হাত
কখন টুঁটি টিপে ধরবে
আমি জানি না

চিরাচরিত নিয়মে
কেন এমন হয়
আমি জানি না

ক্ষণকাল পরের অবস্থাটা
কেমন হবে
আমি জানি না 


২৮ মে, ২০২১ শুক্রবার, সন্ধ্যা : ১০
সল্টলেক, কোলকাতা

Tuesday, 5 October 2021

আন-নাহদা আল-আরাবিয়্যাহঃ আরব রেনেসাঁ



আন্‌-নাহ্দ়া আল্‌-‘আরাবিয়্যাহঃ আরব রেনেসাঁ
 
উনিশ শতকে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও গতিশীল অর্থনীতি পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোকে সমৃদ্ধ করে তুলেছিলো। ফলে এই শতকে ইউরোপের সাংস্কৃতিক বিস্তার নতুন এক ধরণের আধিপত্যের সূচনা করে। পৃথিবীর অনগ্রসর অঞ্চলগুলোতে বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে ইউরোপের সম্ভাব্য আগ্রাসন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। ফলে এ অঞ্চলের সমাজে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় ।
 
আরব বিশ্বের বিভিন্ন জায়গাতেও এমন সংস্কারের প্রয়োজন ছিলকারণ পশ্চিম ইউরোপের সাথে আরব বিশ্বের শুধু আধিপত্য বিস্তারের সম্পর্ক ছিল না। ক্রুসেড সহ অন্যান্য ঐতিহাসিক কারণেও এ অঞ্চলে সম্ভাব্য পশ্চিমা আগ্রাসনের ভীতি তৈরি হয়েছিলএছাড়া আঠারো শতকে নেপোলিয়নের মিশর আক্রমণ ও উনিশ শতকে অটোমান সাম্রাজ্যে গৃহীত তানজিমাত’-এর কারণে আরব বিশ্বে আন্‌-নাহ্দ়ানামে নবজাগরণ আন্দোলন শুরু হয়।
 
আন্‌-নাহ্দ়া'অর্থ রেনেসাঁএই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল একই রকম উনিশ শতকের শেষ ভাগ ও বিশ শতকের প্রথম ভাগে এর উদ্দেশ্য ছিল স্থবির আরব বিশ্বের জনগণের চেতনায় আধুনিকতা নিয়ে আসা এবং বিজ্ঞানমুখী সমাজ গড়ে তোলা  এই আন্দোলনের কথা আসলে প্রথম যাঁর কথা মনে আসে, তিনি রেফ়াআহ্‌ রাফ়েআত়্-ত়াহ্‌ত়াবী।  ১৮২৬ সালে মিশরের শাসক মোহাম্মদ আলীর সরকারের সহায়তায় ফ্রান্সে বিজ্ঞান ও শিক্ষানীতি নিয়ে পড়াশোনা করতে আসেন। তিনি প্যারিস মিলিটারি একাডেমির মিশরীয় বংশের ক্যাডেটদের ইমাম হিসেবেও কাজ করতেন। ফরাসি ভাষা শিখে তিনি এ ভাষার গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসিক বইপত্র আরবিতে অনুবাদ করা শুরু করেন। ১৮৩০ সালে রাজা দশম চার্লসের বিরুদ্ধে ঘটিত তথাকথিত জুলাই বিপ্লবপ্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য তাঁর হয়েছিলো। এসব ঘটনার বিবরণ ও মতামত তিনি মিশরের শাসক মোহাম্মদ আলীর কাছে সাবধানে রিপোর্ট আকারে পাঠাতেন। প্রথম দিকে তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ পূর্বের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল্‌-হারের দ্বারা বেশি প্রভাবিত ছিলফ্রান্সে পড়াশোনা ও অন্যান্য অভিজ্ঞতার ফলে তিনি নারী শিক্ষা ও সংসদীয় গণতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন।
 
রেফ়াআহ্‌ রাফ়েআত়্-ত়াহ্‌ত়াবী  ফ্রান্সে পাঁচ বছর কাটিয়ে ১৮৩১ সালে মিশরে ফিরে আসেন। ১৮৩৪ সালে তাঁর লেখা বই তাখলিস আল্‌-ইবরিজ ফি-তাল্খিসি বারিজপ্রকাশিত হয়। এই বইতে তিনি ফ্রান্স ও পশ্চিমা বিশ্বের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের বেশ প্রশংসা করেন। মজার ঘটনা হচ্ছে, বইটি পদ্যাকারে লেখা হয়েছিলো। তিনি লিখেছেন, আরব বিশ্বের উচিত নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অবস্থান ঠিক রেখে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রগতির দিকটি গ্রহণ করা। তাঁর এই মত পরে আন্‌-নাহ্দ়ার অন্যতম উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছিল 
 
আন্‌-নাহ্দ়ার আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ ছিলেন বুত্রুসল্‌-বুস্তানি। ১৮১৯ সালে তিনি বৈরুতে এক লেবানী ম্যারোনাইট খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আমেরিকান মিশনারিদের দ্বারা তিনি ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তাদের প্রভাবেই তিনি প্রোটেস্ট্যান্ট মতে দীক্ষিত হন। স্থানীয় প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চে তিনি পুরোহিত হিসেবে কাজ করতেন। প্রোটেস্ট্যান্ট স্কুলে শিক্ষকতা করার সময় বাইবেল আরবিতে অনুবাদ করায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। প্রথম দিকে আমেরিকান প্রোটেস্ট্যান্ট চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ হলেও পরে তিনি তাদের থেকে আলাদা স্বাধীন মতে আস্থা রাখতেন
 
ল্‌-বুস্তানি ১৮৬৩ সালে আল্‌-মাদ্রাসা আল্‌-ওয়াতানিয়া নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। এই স্কুল সেক্যুলার নীতিতে পরিচালিত হতো। স্কুলের বেশিরভাগ শিক্ষক আধুনিক চিন্তাধারার অনুসারী ছিলেন। আন্‌-নাহ্দ়ার পরবর্তী বহু চিন্তাবিদ এই স্কুলে ছাত্রজীবন কাটিয়েছেন। তিনি অনেক স্কুল পাঠ্যবই ও অভিধান প্রকাশ করেছিলেন। এসব বই আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তির দিক বিস্তারিত হতে সাহায্য করেছিলতিনি নাফির সুরাইয়ানামে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করতেন। এই ম্যাগাজিন আরব বিশ্বে একটি শিক্ষিত ও বিজ্ঞানমনস্ক অভিজাত শ্রেণীর উদ্ভবে ভূমিকা রেখেছিলো।
 
ল্‌-বুস্তানির লেখালেখি ও চিন্তাধারা আধুনিক আরবি সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য দিকের বিকাশে সহায়তা করেছিলো। আমেরিকান মিশনারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণ করেও তিনি দৃঢ় সেক্যুলার ছিলেন। বলা হয়ে থাকে, আধুনিক সিরীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে আল্‌-বুস্তানি একজন অগ্রগণ্য চিন্তাবিদ ছিলেন।
 
আন্‌-নাহ্দ়ার আরেকজন প্রভাবশালী চিন্তাবিদ ছিলেন জামালুদ্দীন আফগানি। তিনি আরব বিশ্বের মুসলিম সমাজের তৎকালীন বদ্ধতার কঠোর সমালোচনা করতেন। তিনি মনে করতেন, ইসলামকে প্রথাগত সমাজের মানুষ এক ছোট নিগড়ে বন্দী করে ফেলেছে। মুসলিম সমাজের জাগরণ ও উন্নতির জন্য এই বদ্ধতার বাইরে এসে এই ধর্মের যুগোপযোগী নতুন ও কার্যকর ব্যাখ্যা করতে হবে। তিনি ইউরোপীয় উপনিবেশ বিস্তারের নীতি ও আরব বিশ্বের শাসকদের স্বৈরাচারী আচরণের কঠোর সমালোচক ছিলেন।
 
জামালুদ্দীন আফগানির চিন্তাধারা অনেক ব্যক্তিকে আলোড়িত করেছিলো। তার মধ্যে অন্যতম ব্যক্তি ছিলেন মোহাম্মদ আবদুহু। জামালুদ্দীন আফগানির মতো তিনিও মুসলিম সমাজের বদ্ধতার সমালোচনা করতেন। তাঁর মতে, আরব ও অন্যান্য অঞ্চলের মুসলিম সমাজ ইসলামের প্রাথমিক ন্যায়ভিত্তিক সমাজের ধারণা থেকে বহুদূর চলে এসেছে। ফলে এ সমাজ ইসলামের মতো মানবকল্যাণের ধর্মের অনুসারী হয়েও এর সত্যিকার মূল বাণী থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এ অবস্থা থেকে নিস্তার পেতে চাইলে বিদ্যমান অনড় প্রথার বাইরে এসে নবী (সাঃ) ও তাঁর প্রথম চার খলীফার সরল ও মানবকল্যাণের নীতি সময়োপযোগী করে গ্রহণ করতে হবে।
 
আন্‌-নাহ্দ়া আরবি সাহিত্যের জগতে বেশ উল্লেখযোগ্য আলোড়ন এনেছিলউনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের শুরুতে আরবি সাহিত্যে ক্ল্যাসিক্যাল বর্ণনায় আধুনিক বিষয় ও ভাবের বর্ণনা দেওয়া হতো১৮৬৫ সালে সিরীয় লেখক ফ্রান্সিস ফাতাল্লাহ মারাশ গাবাতুল্ হক্নামে একটি রূপকধর্মী আরবি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। আরেক সিরীয় লেখক কুস্তাকি আল্‌-হিমসি আধুনিক আরবি সাহিত্যে অনবদ্য অবদান রাখেন। তাঁকে আধুনিক আরবি সমালোচনা সাহিত্যের জনক বলা হয়। তাঁর লেখা মানহাল ওয়ারাদ আল্‌-ইন্তিকাআরবি সমালোচনা সাহিত্যের বাইবেল হিসেবে গণ্য হয়।
 
মারিয়ানা বিনতে নাসরাল্লাহ মারাশ আরব সাহিত্য জগতের প্রথম নারী। তিনি তারিখু সিরিয়ানামে সিরিয়ার ইতিহাস রচনা করেছিলেন। ১৯১৪ সালে মিশরের অধিবাসী মোহাম্মদ হুসাইন হায়কলের লেখা জানাপ্রকাশিত হয়। এই বই প্রথম আরবি উপন্যাস হিসেবে সমাদর পেয়ে থাকে। আধুনিক কবিদের মধ্যে মিশরের আহমাদ শাওকি তাঁর কাব্যগ্রন্থ শ্‌-শাওকিয়াত’-এর মাধ্যমে নতুন ধারা তৈরি করেন। মিশরের অন্যতম কবি হাফেজ ইব্রাহীম তাঁর শাকারতু জামিলকাব্যগ্রন্থে ইউরোপের আধিপত্য ও শ্রেষ্ঠত্বের তীব্র বিরোধিতা করেন।
 
আন্‌-নাহ্দ়া আরব জগতে প্রকাশনা ও গণমাধ্যমেও ব্যাপক পরিবর্তন আনে। উল্লেখ্য, ১৮২১ সালে প্রথম আধুনিক মিশরীয় ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৭৫ সালে মিশরীয় পত্রিকা আল্‌-আহরাম প্রতিষ্ঠিত হয়। এই পত্রিকা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশে প্রচুর সাহায্য করেছিলবৈরুতে প্রায় ১৫টি পত্রিকা ও ৪০টি সাময়িকী প্রকাশিত হতো।
 
আরবি ভাষা এই জাগরণের ফলে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলইউরোপীয় সাহিত্য, বিজ্ঞান ও দর্শনের বইপত্র আরবিতে অনুবাদের কারণে নতুন নতুন শব্দ ও পরিভাষার আগমন এই প্রাচীন ভাষাটিকে সমৃদ্ধ করে তুলছিলো। আগে ইউরোপের বৈজ্ঞানিক শব্দভাণ্ডারের প্রচুর শব্দ আরবি থেকে ইউরোপে গিয়েছিলআধুনিক স্ট্যান্ডার্ড আরবি এ সময়ই আলোর মুখ দেখে, যা বর্তমানে আরব বিশ্বের শিক্ষা ও গণমাধ্যমের ভাষা। আধুনিক আরবি এনসাইক্লোপেডিয়া এ সময়ই জন্ম নেয়। এই এনসাইক্লোপেডিয়া ক্লাসিক আরবি ও আধুনিক ইউরোপীয় বর্ণনা পদ্ধতির সমন্বয়ে রচিত হয়েছিলো। প্রথম আধুনিক আরবি ডিকশনারি মাতনুল্‌-লুগাহ্এ সময়ই রচিত হয়
 
আন্‌-নাহ্দ়া বা নবজাগরণ আরব সমাজগুলোর অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য সংঘটিত হয়েছিলমধ্যযুগে ইউরোপ যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল, তখন আরব ও মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতেই জ্ঞানের আলো জ্বলছিলআধুনিক বিজ্ঞান ও দর্শন অনেকাংশে আরব জগতের কাছে ঋণী। মূলত মুসলিম জগতের কাছ থেকেই ইউরোপ নিজেদের হারানো জ্ঞানের জগত আবার উদ্ধার করতে সচেষ্ট হয়েছিলফলে ইউরোপে সংঘটিত হয় রেনেসাঁ নামের পুনর্জাগরণ। সে হিসেবে আন্‌-নাহ্দ়া বা নবজাগরণকে ইউরোপের রেনেসাঁর একধরনের আরব সংস্করণ বলা চলে। এর সফলতার পরিধি কত তা বলা সহজ নয়। কিন্তু উনিশ ও বিশ শতকের প্রেক্ষিতে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
-আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


Sunday, 3 October 2021

জাহেলি কবি আমর বিন কুলসুম (৫২৬ - ৫৮৪ খ্রি)


 
ম্‌র বিন কুলসুম
(৫২৬ ৫৮৪)
 
প্রাক-ইসলামী যুগে আরবী কাব্যসাহিত্য চরম উৎকর্ষ লাভ করেছিল। সে যুগে রচিত কাব্যগুলো আজও বিশ্বসাহিত্যের দরবারে বিপুলভাবে সমাদৃতএই আরবী সাহিত্য কাব্যাকাশে উজ্জল নক্ষত্রগুলির মধ্যে কবি আমর বিন কুলসুম উল্লেখযোগ্য ও অন্যতম
 
পরিচিতি ও জন্ম
প্রকৃত নামআম্‌র, পিতার নাম কুলসুম, পিতামহের নাম মালিক, তাঁর উপনাম আবুল্‌ আস্‌ওয়াদ। তিনি তাগ্‌লিব গোত্রের অধিবাসী ছিলেন তাঁর মায়ের নাম লায়লা, তিনি মুহাল্‌হিল বিন রাবিআহ্‌র কন্যা। তাঁর জননী ছিলেন আত্মমর্যাদা সম্পন্না এক সম্ভ্রান্ত মহিলা। তিনি বাহরাইনে জন্ম লাভ করেন।     
 
শৈশব ও প্রতিপালন
তাঁর গোত্র বানু তাগ্‌লিব ফোরাত উপদ্বীপের আশেপাশে বসবাস করতো। সেখানেই কবির জন্ম হয়। তাঁর গোত্র হেরা রাজের অধীনে পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে বসবাস করতো। তাই কবি অত্যন্ত স্নেহ ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে বড় হয়ে ওঠেন। ফলে ছোট থেকেই তাঁর মধ্যে মর্যাদা ও সম্মান বোধ দেখা দেয়। তিনি একটু বড় হতেই জনগণকে জীবনের উৎকর্ষের প্রতি আগ্রহী ও উদ্বুদ্ধ করতে আরম্ভ করেন। তারুণ্যে উপনীত হয়ে তিনি পিতার স্থলাভিষিক্ত হন এবং নিজ গোত্রকে নেতৃত্ব দিতে আরম্ভ করেন। মানুষ ও সমাজের প্রয়োজনে কবিতা রচনা আরম্ভ করেন এবং তাতেও উৎকর্ষের ছাপ রাখেন। যদিও তাঁর রচিত কবিতার সংখ্যা খুব বেশি নয়।
 
জীবন যাপন
তিনি পনের বছর বয়সে তাঁর গোত্রের গোত্রপতি নিযুক্ত হন। আর তারই সুবাদে তাঁকে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করতে হয়। তিনি ফোরাতে উপকণ্ঠ থেকে শুরু করে সিরিয়া, ইরাক ও নাজ্‌দ বিভিন্ন প্রদেশের সফর করেন। সফল ভাবে নিজ গোত্র ও জাতির মহিমা মণ্ডন করেন। আরবের বিভিন্ন গোত্র ও জনজাতির জীবনশৈলীর উপর প্রভাব বিস্তার করেন। তাঁর গোত্রে বহু ক্ষিপ্র অশ্বারোহী ও বীরযোদ্ধা ছিলেন। আর তাই বলা হয়
   لو أبطأ الإسلام لأكلت تغلب الناس.
 
তাঁর সম্ভ্রম বোধ
বাদশাহ আম্‌র একদিন নিজ সভাসদদের নিয়ে বসে ছিলেন। হঠাৎ করে তিনি প্রশ্ন করে বসলেন, তোমরা এমন কাউকে জানো কি, যার মা আমার মায়ের সেবা করতে অস্বীকার করবে? তারা বলল, হ্যাঁ কবি আম্‌র বিন কুলসুমের মা। বাদশাহ জিজ্ঞেস করলেন, কেন? লোকেরা বলল, কারণ তিনি হচ্ছেন বিখ্যাত মনীষা মুহাল্‌হিলের কন্যা, আর তাঁর মামা কুলায়েব বিন ওয়ায়েল আরবদের মধ্যে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। এবং তাঁর স্বামী কুলসুম বিন মালিক আরবের অন্যতম বীরযোদ্ধা ও অশ্বারোহী। আর তাঁর ছেলে আম্‌র বিন কুলসুম তাঁর গোত্রের গোত্রপতি।
 
অন্যদিকে বাদশাহ আম্‌র বিন হিন্দের মাও অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত বংশের ছিলেন, তিনি বিখ্যাত কবি ইম্‌রাউল কায়েসের পিসি ছিলেন। আর কবি আম্‌র বিন কুলসুমের মা লায়লা কবি ইম্‌রাউল কায়েসের মায়ের ভ্রাতুষ্পুত্রী ছিলেন। ফলে বাদশাহ আম্‌র ও কবি আম্‌র উভয়ের মায়েরা একে অপরের আত্মীয় ছিলেন। ফলে বাদশাহ আম্‌র কবিকে তাঁর মা সহ ডেকে পাঠালেন। কবি নিজ মা ও গোত্রের লোকেদের নিয়ে ফোরাতের উপকণ্ঠ থেকে হেরার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। অতঃপর রুয়াকাহ্‌তে বাদশাহ্‌র সাথে তাদের দেখা হল। কাফেলার মহিলাদের জন্য আলাদা তাঁবুর ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। বাদশাহ নিজ মাকে বলে দিয়েছিলেন, তিনি যেন কবির মার থেকে সেবা করিয়ে নেন। ফলে রাতে যখন দস্তরখান বিছানো হল বাদশাহ জননী কবি জননীকে খাবার এগিয়ে দিতে বললেন। কবি জননী সোজা উত্তর দিলেন, যার দরকার সে এগিয়ে গিয়ে খাবার তুলে নিক। বাদশাহ জননী পীড়াপীড়ি করতেই কবি জননী চিৎকার করে ওঠেন। আর তা শুনে কবির চোখে রক্ত জমতে লাগলো। তিনি লাফিয়ে উঠে সেখানে রাখা বাদশাহ্‌র একমাত্র তরবারিটি তুলে নেন এবং তা দিয়ে বাদশাহ্‌র মাথায় আঘাত হানেন। তাতেই বাদশাহ্‌র মৃত্যু হয়। এই ঘটনাটি ৫৬৯ খ্রিস্টাব্দে ঘটেছিল। অতঃপর কবি নিজ গোত্রের লোকেদের আওয়াজ দেন। তারা সেখানে যা কিছু ছিল সব লুঠ করে নেয়। এই ঘটনায় কবির সম্ভ্রম বোধ আরও তীব্র হয়। পরবর্তীতে তিনি এই ঘটনার উল্লেখ করে তাঁর মুআল্লাকাটি রচনা করেন। তাতে তিনি নিজ আত্মগৌরবের কথা তুলে ধরেন। বাদশাহর সাথে তাঁর এই ঘটনার বর্ণনাও দিয়েছেন তাঁর মুআল্লাকায়।
 
তাঁর মুআল্লাকা
কবি আম্‌রের রচিত কবিতাগুলির মধ্যে তাঁর মুআল্লাকাই শ্রেষ্ঠ ও বিখ্যাত। অনেকে মনে করেন, তাঁর এই কবিতায় প্রায় এক হাজার পংক্তি ছিল। কিন্তু সময়ের স্রোতে সব হারিয়ে গেছে, শুধু বাকি রয়েছে যেগুলো বর্ণনাকারীরা নিজ নিজ স্মৃতিতে সংরক্ষণ করতে পেরেছিলেন। তাঁর এই কবিতায় তাঁদের অসীম সাহসিকতা ও গৌরবের উল্লেখ রয়েছে। কবিতাটির আদ্যোপান্তে তা-ই বর্ণীত হয়েছে। বলা যেতে পারে সে সময়ের একমাত্র একক উপজীব্য নির্ভর কবিতা।  বলা হয়ে থাকে, তিনি তাঁর এই কবিতাটিকে বক্তব্যে রূপে উকাজের মেলায় উপস্থাপন করেছিলেন। তার প্রথম কয়েকটি পংক্তি হল—       
أَلاَ هُبِّـي بِصَحْـنِـكِ فَاصْبَحِيْـنَـا                     وَلاَ تُـبْـقِـي خُـمُــوْرَ الأَنْـدَرِيْـنَـا
مُشَعْشَعَـةً كَـأَنَّ الحُـصَّ فِيْهَـا                       إِذَا مَـا المَـاءَ خَالَطَـهَـا سَخِيْـنَـا
تَجُـوْرُ بِـذِي اللَّبَانَـةِ عَـنْ هَـوَاهُ                       إِذَا مَـــا ذَاقَـهَــا حَـتَّــى يَلِـيْـنَـا
تَرَى اللَّحِـزَ الشَّحِيْـحَ إِذَا أُمِـرَّتْ                    عَـلَـيْـهِ لِـمَـالِـهِ فِـيْـهَـا مُهِـيْـنَـا

-আব্দুল মাতিন ওয়াসিম