Pages

Showing posts with label আরব রেনেসাঁ. Show all posts
Showing posts with label আরব রেনেসাঁ. Show all posts

Monday, 20 July 2026

আধুনিক আরবী সাহিত্যে নবজাগরণের কারণসমূহ - কাজী মোহাম্মদ মাকীন


ভূমিকা
সাহিত্য কোনও জাতির মননচর্চা, চিন্তাধারা ও সামাজিক অবস্থার প্রতিবিম্ব। আরব সাহিত্য দীর্ঘকাল ধরে ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত রীতির প্রভাবাধীন ছিল। তবে উনিশ শতকের শুরু থেকে আরব বিশ্বের সাহিত্যিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে, যা "আন-নাহদা" বা নবজাগরণ (النهضة الأدبية) নামে পরিচিত। এই নবজাগরণ শুধু সাহিত্যিক নয়, বরং সামাজিক, ধর্মীয় ও বৌদ্ধিক ক্ষেত্রেও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। আধুনিক আরবী সাহিত্যের এই নবদিগন্ত উন্মোচনের পেছনে একাধিক ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কারণ কাজ করেছিল। নিচে সেই প্রধান কারণগুলো ব্যাখ্যা করে তুলে ধরা হলো।
 
১. ইউরোপীয় উপনিবেশ এবং পশ্চিমা সংস্পর্শ
ফরাসি নেতা নেপোলিয়ন ১৭৯৮ সালে মিশর আক্রমণ করলে আরব সমাজ সরাসরি ইউরোপীয় সভ্যতা, বিজ্ঞান ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে পরিচিত হয়। এই অভিযানের সঙ্গে আসা অনেক পণ্ডিত ও বিজ্ঞানী যেমন চিত্রকার, মানচিত্রবিদ, ভাষাতাত্ত্বিকতারা আরব সমাজে নতুন চিন্তার বীজ বপন করে যান। এ ছাড়াও ইউরোপীয় শিক্ষা, আইন, প্রযুক্তি, ও সামরিক কৌশল দেখার পর আরব সমাজে একধরনের আত্মসমালোচনার ভাব আসে এবং তারা নিজেদের সংস্কার ও উন্নয়নের প্রয়োজন উপলব্ধি করে।
 
২. মুদ্রণযন্ত্র ও সংবাদপত্রের প্রচলন
আধুনিক মুদ্রণপ্রযুক্তির প্রসারে আরব বিশ্বে সাহিত্যিক চর্চা বহুলভাবে বিস্তৃত হয়। উনিশ শতকে বহু সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্র প্রকাশিত হতে থাকে। যেমন: মিশরের "الأهرام" (১৮৭৫), "الهلال", "المقتطف" প্রভৃতি। এইসব পত্র-পত্রিকায় সমাজ, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও সাহিত্যের ওপর আলোচনা হতো, যার ফলে জনগণের মধ্যে জ্ঞানের পরিসর বৃদ্ধি পায় এবং পাঠকদের মাঝে আধুনিক চিন্তাভাবনার বিস্তার ঘটে।
 
৩. ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার আন্দোলন
নবজাগরণের অন্যতম প্রধান দিক ছিল ধর্মীয় চিন্তায় আধুনিকতা আনা। আল আফগানী, মোহাম্মদ আবদুহ প্রমুখ চিন্তাবিদ ধর্মকে বিজ্ঞান, যুক্তি ও আধুনিক জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করেন। তারা কোরআন ও সুন্নাহর প্রকৃত মর্ম উপলব্ধি করে অন্ধবিশ্বাস, গোঁড়ামি ও ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। পাশাপাশি নারীর শিক্ষা, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, সামন্ততন্ত্র ইত্যাদি সামাজিক বিষয়েও তারা সংস্কারের ডাক দেন।
 
৪. শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণ
মিশরসহ অনেক আরব দেশে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু হয়, যেখানে ধর্মীয় বিষয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস, দর্শন ইত্যাদি পড়ানো হতে থাকে। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়েও যুগোপযোগী পাঠক্রম চালু করা হয়। এই শিক্ষা থেকে উপকৃত হয়ে এক শ্রেণির আধুনিক চিন্তাবিদ ও লেখক তৈরি হয়, যারা সাহিত্যকে একটি মানবিক ও সামাজিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন।

৫. অনুবাদ আন্দোলন
এই সময় ইউরোপের বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যের অনুবাদ ব্যাপক হারে শুরু হয়। গ্রীক, ফরাসি, ইংরেজি, জার্মান প্রভৃতি ভাষা থেকে বিজ্ঞান, দর্শন, নাটক ও উপন্যাস অনূদিত হয়। বিশেষ করে রিফা'আ আত-তাহতাবি ফরাসি সাহিত্য অনুবাদে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এর ফলে আরবি লেখকগণ ইউরোপীয় সাহিত্যের কাঠামো, কাহিনী নির্মাণ, বাস্তবতাবাদ, এবং মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচিত হন এবং তাদের সাহিত্যেও সেইসব বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়।
 
৬. মিশরীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের অবদান
রিফা'আ আত-তাহতাবি, আলী মোবারক, মোহাম্মদ আবদুহ প্রমুখ ব্যক্তি মিশরে শিক্ষাব্যবস্থা, সাহিত্য ও সংস্কারে গভীর প্রভাব ফেলেন। তাহতাবি ফ্রান্সে অবস্থান করে সেখানে পাশ্চাত্য চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হন এবং তা আরবে ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট হন। মোহাম্মদ আবদুহ ধর্মীয় সংস্কারে যেমন অগ্রণী, তেমনি তিনি আরবি ভাষা ও সাহিত্যের আধুনিকীকরণেও ভূমিকা রাখেন। তারা সকলেই জাতীয় চেতনা ও আধুনিকতা ছড়িয়ে দিতে সাহিত্যকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।
 
৭. আরব অভিবাসী সাহিত্যিকদের ভূমিকা (أدب المهجر)
উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় বসবাসকারী আরব অভিবাসী সাহিত্যিকরাযাদের মধ্যে সবচেয়ে খ্যাতিমান হলেন জিবরান খলীল জিবরান, মীখাইল নাঈমা, নাসীব আরীদা প্রমুখতারা আরবি সাহিত্যে এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেন। তারা ব্যক্তিস্বাধীনতা, আত্মোপলব্ধি, প্রকৃতি ও প্রেমের মতো বিষয় নিয়ে লেখেন যা ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। তাদের লেখায় কবিত্বময় গদ্য, প্রতীকবাদ ও দার্শনিক চিন্তার সমন্বয় দেখা যায়।
 
৮. জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও রাজনীতির প্রভাব
উনিশ ও বিশ শতকে আরব দেশগুলোতে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী চেতনার জাগরণ ঘটে। এই চেতনা সাহিত্যে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়। কবিরা দেশের স্বাধীনতা, জনগণের অধিকারের কথা বলেন, সাহিত্য হয়ে ওঠে প্রতিবাদ ও জাগরণের ভাষা। বিশেষত কবিতা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক চেতনার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, যা জনগণের মনে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
 
উপসংহার
উপরোক্ত বিশ্লেষণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আধুনিক আরবী সাহিত্যে নবজাগরণ একটি বহুমাত্রিক ও সমন্বিত প্রক্রিয়া। ইউরোপীয় চিন্তার প্রভাব, প্রযুক্তির বিকাশ, ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার, নতুন শিক্ষাব্যবস্থা এবং জাতীয়তাবাদসবকিছু মিলে আরবি সাহিত্যে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে। এই নবজাগরণ কেবল রচনার ধরণ নয়, বরং চিন্তার গভীরতা ও বিষয়বস্তুর ব্যাপ্তিতেও এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করে, যা আরবি সাহিত্যকে আধুনিকতার সোপানে পৌঁছে দেয়।

Tuesday, 5 October 2021

আন-নাহদা আল-আরাবিয়্যাহঃ আরব রেনেসাঁ



আন্‌-নাহ্দ়া আল্‌-‘আরাবিয়্যাহঃ আরব রেনেসাঁ
 
উনিশ শতকে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও গতিশীল অর্থনীতি পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোকে সমৃদ্ধ করে তুলেছিলো। ফলে এই শতকে ইউরোপের সাংস্কৃতিক বিস্তার নতুন এক ধরণের আধিপত্যের সূচনা করে। পৃথিবীর অনগ্রসর অঞ্চলগুলোতে বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে ইউরোপের সম্ভাব্য আগ্রাসন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। ফলে এ অঞ্চলের সমাজে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় ।
 
আরব বিশ্বের বিভিন্ন জায়গাতেও এমন সংস্কারের প্রয়োজন ছিলকারণ পশ্চিম ইউরোপের সাথে আরব বিশ্বের শুধু আধিপত্য বিস্তারের সম্পর্ক ছিল না। ক্রুসেড সহ অন্যান্য ঐতিহাসিক কারণেও এ অঞ্চলে সম্ভাব্য পশ্চিমা আগ্রাসনের ভীতি তৈরি হয়েছিলএছাড়া আঠারো শতকে নেপোলিয়নের মিশর আক্রমণ ও উনিশ শতকে অটোমান সাম্রাজ্যে গৃহীত তানজিমাত’-এর কারণে আরব বিশ্বে আন্‌-নাহ্দ়ানামে নবজাগরণ আন্দোলন শুরু হয়।
 
আন্‌-নাহ্দ়া'অর্থ রেনেসাঁএই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল একই রকম উনিশ শতকের শেষ ভাগ ও বিশ শতকের প্রথম ভাগে এর উদ্দেশ্য ছিল স্থবির আরব বিশ্বের জনগণের চেতনায় আধুনিকতা নিয়ে আসা এবং বিজ্ঞানমুখী সমাজ গড়ে তোলা  এই আন্দোলনের কথা আসলে প্রথম যাঁর কথা মনে আসে, তিনি রেফ়াআহ্‌ রাফ়েআত়্-ত়াহ্‌ত়াবী।  ১৮২৬ সালে মিশরের শাসক মোহাম্মদ আলীর সরকারের সহায়তায় ফ্রান্সে বিজ্ঞান ও শিক্ষানীতি নিয়ে পড়াশোনা করতে আসেন। তিনি প্যারিস মিলিটারি একাডেমির মিশরীয় বংশের ক্যাডেটদের ইমাম হিসেবেও কাজ করতেন। ফরাসি ভাষা শিখে তিনি এ ভাষার গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসিক বইপত্র আরবিতে অনুবাদ করা শুরু করেন। ১৮৩০ সালে রাজা দশম চার্লসের বিরুদ্ধে ঘটিত তথাকথিত জুলাই বিপ্লবপ্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য তাঁর হয়েছিলো। এসব ঘটনার বিবরণ ও মতামত তিনি মিশরের শাসক মোহাম্মদ আলীর কাছে সাবধানে রিপোর্ট আকারে পাঠাতেন। প্রথম দিকে তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ পূর্বের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল্‌-হারের দ্বারা বেশি প্রভাবিত ছিলফ্রান্সে পড়াশোনা ও অন্যান্য অভিজ্ঞতার ফলে তিনি নারী শিক্ষা ও সংসদীয় গণতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন।
 
রেফ়াআহ্‌ রাফ়েআত়্-ত়াহ্‌ত়াবী  ফ্রান্সে পাঁচ বছর কাটিয়ে ১৮৩১ সালে মিশরে ফিরে আসেন। ১৮৩৪ সালে তাঁর লেখা বই তাখলিস আল্‌-ইবরিজ ফি-তাল্খিসি বারিজপ্রকাশিত হয়। এই বইতে তিনি ফ্রান্স ও পশ্চিমা বিশ্বের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের বেশ প্রশংসা করেন। মজার ঘটনা হচ্ছে, বইটি পদ্যাকারে লেখা হয়েছিলো। তিনি লিখেছেন, আরব বিশ্বের উচিত নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অবস্থান ঠিক রেখে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রগতির দিকটি গ্রহণ করা। তাঁর এই মত পরে আন্‌-নাহ্দ়ার অন্যতম উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছিল 
 
আন্‌-নাহ্দ়ার আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ ছিলেন বুত্রুসল্‌-বুস্তানি। ১৮১৯ সালে তিনি বৈরুতে এক লেবানী ম্যারোনাইট খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আমেরিকান মিশনারিদের দ্বারা তিনি ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তাদের প্রভাবেই তিনি প্রোটেস্ট্যান্ট মতে দীক্ষিত হন। স্থানীয় প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চে তিনি পুরোহিত হিসেবে কাজ করতেন। প্রোটেস্ট্যান্ট স্কুলে শিক্ষকতা করার সময় বাইবেল আরবিতে অনুবাদ করায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। প্রথম দিকে আমেরিকান প্রোটেস্ট্যান্ট চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ হলেও পরে তিনি তাদের থেকে আলাদা স্বাধীন মতে আস্থা রাখতেন
 
ল্‌-বুস্তানি ১৮৬৩ সালে আল্‌-মাদ্রাসা আল্‌-ওয়াতানিয়া নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। এই স্কুল সেক্যুলার নীতিতে পরিচালিত হতো। স্কুলের বেশিরভাগ শিক্ষক আধুনিক চিন্তাধারার অনুসারী ছিলেন। আন্‌-নাহ্দ়ার পরবর্তী বহু চিন্তাবিদ এই স্কুলে ছাত্রজীবন কাটিয়েছেন। তিনি অনেক স্কুল পাঠ্যবই ও অভিধান প্রকাশ করেছিলেন। এসব বই আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তির দিক বিস্তারিত হতে সাহায্য করেছিলতিনি নাফির সুরাইয়ানামে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করতেন। এই ম্যাগাজিন আরব বিশ্বে একটি শিক্ষিত ও বিজ্ঞানমনস্ক অভিজাত শ্রেণীর উদ্ভবে ভূমিকা রেখেছিলো।
 
ল্‌-বুস্তানির লেখালেখি ও চিন্তাধারা আধুনিক আরবি সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য দিকের বিকাশে সহায়তা করেছিলো। আমেরিকান মিশনারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণ করেও তিনি দৃঢ় সেক্যুলার ছিলেন। বলা হয়ে থাকে, আধুনিক সিরীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে আল্‌-বুস্তানি একজন অগ্রগণ্য চিন্তাবিদ ছিলেন।
 
আন্‌-নাহ্দ়ার আরেকজন প্রভাবশালী চিন্তাবিদ ছিলেন জামালুদ্দীন আফগানি। তিনি আরব বিশ্বের মুসলিম সমাজের তৎকালীন বদ্ধতার কঠোর সমালোচনা করতেন। তিনি মনে করতেন, ইসলামকে প্রথাগত সমাজের মানুষ এক ছোট নিগড়ে বন্দী করে ফেলেছে। মুসলিম সমাজের জাগরণ ও উন্নতির জন্য এই বদ্ধতার বাইরে এসে এই ধর্মের যুগোপযোগী নতুন ও কার্যকর ব্যাখ্যা করতে হবে। তিনি ইউরোপীয় উপনিবেশ বিস্তারের নীতি ও আরব বিশ্বের শাসকদের স্বৈরাচারী আচরণের কঠোর সমালোচক ছিলেন।
 
জামালুদ্দীন আফগানির চিন্তাধারা অনেক ব্যক্তিকে আলোড়িত করেছিলো। তার মধ্যে অন্যতম ব্যক্তি ছিলেন মোহাম্মদ আবদুহু। জামালুদ্দীন আফগানির মতো তিনিও মুসলিম সমাজের বদ্ধতার সমালোচনা করতেন। তাঁর মতে, আরব ও অন্যান্য অঞ্চলের মুসলিম সমাজ ইসলামের প্রাথমিক ন্যায়ভিত্তিক সমাজের ধারণা থেকে বহুদূর চলে এসেছে। ফলে এ সমাজ ইসলামের মতো মানবকল্যাণের ধর্মের অনুসারী হয়েও এর সত্যিকার মূল বাণী থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এ অবস্থা থেকে নিস্তার পেতে চাইলে বিদ্যমান অনড় প্রথার বাইরে এসে নবী (সাঃ) ও তাঁর প্রথম চার খলীফার সরল ও মানবকল্যাণের নীতি সময়োপযোগী করে গ্রহণ করতে হবে।
 
আন্‌-নাহ্দ়া আরবি সাহিত্যের জগতে বেশ উল্লেখযোগ্য আলোড়ন এনেছিলউনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের শুরুতে আরবি সাহিত্যে ক্ল্যাসিক্যাল বর্ণনায় আধুনিক বিষয় ও ভাবের বর্ণনা দেওয়া হতো১৮৬৫ সালে সিরীয় লেখক ফ্রান্সিস ফাতাল্লাহ মারাশ গাবাতুল্ হক্নামে একটি রূপকধর্মী আরবি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। আরেক সিরীয় লেখক কুস্তাকি আল্‌-হিমসি আধুনিক আরবি সাহিত্যে অনবদ্য অবদান রাখেন। তাঁকে আধুনিক আরবি সমালোচনা সাহিত্যের জনক বলা হয়। তাঁর লেখা মানহাল ওয়ারাদ আল্‌-ইন্তিকাআরবি সমালোচনা সাহিত্যের বাইবেল হিসেবে গণ্য হয়।
 
মারিয়ানা বিনতে নাসরাল্লাহ মারাশ আরব সাহিত্য জগতের প্রথম নারী। তিনি তারিখু সিরিয়ানামে সিরিয়ার ইতিহাস রচনা করেছিলেন। ১৯১৪ সালে মিশরের অধিবাসী মোহাম্মদ হুসাইন হায়কলের লেখা জানাপ্রকাশিত হয়। এই বই প্রথম আরবি উপন্যাস হিসেবে সমাদর পেয়ে থাকে। আধুনিক কবিদের মধ্যে মিশরের আহমাদ শাওকি তাঁর কাব্যগ্রন্থ শ্‌-শাওকিয়াত’-এর মাধ্যমে নতুন ধারা তৈরি করেন। মিশরের অন্যতম কবি হাফেজ ইব্রাহীম তাঁর শাকারতু জামিলকাব্যগ্রন্থে ইউরোপের আধিপত্য ও শ্রেষ্ঠত্বের তীব্র বিরোধিতা করেন।
 
আন্‌-নাহ্দ়া আরব জগতে প্রকাশনা ও গণমাধ্যমেও ব্যাপক পরিবর্তন আনে। উল্লেখ্য, ১৮২১ সালে প্রথম আধুনিক মিশরীয় ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৭৫ সালে মিশরীয় পত্রিকা আল্‌-আহরাম প্রতিষ্ঠিত হয়। এই পত্রিকা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশে প্রচুর সাহায্য করেছিলবৈরুতে প্রায় ১৫টি পত্রিকা ও ৪০টি সাময়িকী প্রকাশিত হতো।
 
আরবি ভাষা এই জাগরণের ফলে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলইউরোপীয় সাহিত্য, বিজ্ঞান ও দর্শনের বইপত্র আরবিতে অনুবাদের কারণে নতুন নতুন শব্দ ও পরিভাষার আগমন এই প্রাচীন ভাষাটিকে সমৃদ্ধ করে তুলছিলো। আগে ইউরোপের বৈজ্ঞানিক শব্দভাণ্ডারের প্রচুর শব্দ আরবি থেকে ইউরোপে গিয়েছিলআধুনিক স্ট্যান্ডার্ড আরবি এ সময়ই আলোর মুখ দেখে, যা বর্তমানে আরব বিশ্বের শিক্ষা ও গণমাধ্যমের ভাষা। আধুনিক আরবি এনসাইক্লোপেডিয়া এ সময়ই জন্ম নেয়। এই এনসাইক্লোপেডিয়া ক্লাসিক আরবি ও আধুনিক ইউরোপীয় বর্ণনা পদ্ধতির সমন্বয়ে রচিত হয়েছিলো। প্রথম আধুনিক আরবি ডিকশনারি মাতনুল্‌-লুগাহ্এ সময়ই রচিত হয়
 
আন্‌-নাহ্দ়া বা নবজাগরণ আরব সমাজগুলোর অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য সংঘটিত হয়েছিলমধ্যযুগে ইউরোপ যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল, তখন আরব ও মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতেই জ্ঞানের আলো জ্বলছিলআধুনিক বিজ্ঞান ও দর্শন অনেকাংশে আরব জগতের কাছে ঋণী। মূলত মুসলিম জগতের কাছ থেকেই ইউরোপ নিজেদের হারানো জ্ঞানের জগত আবার উদ্ধার করতে সচেষ্ট হয়েছিলফলে ইউরোপে সংঘটিত হয় রেনেসাঁ নামের পুনর্জাগরণ। সে হিসেবে আন্‌-নাহ্দ়া বা নবজাগরণকে ইউরোপের রেনেসাঁর একধরনের আরব সংস্করণ বলা চলে। এর সফলতার পরিধি কত তা বলা সহজ নয়। কিন্তু উনিশ ও বিশ শতকের প্রেক্ষিতে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
-আব্দুল মাতিন ওয়াসিম