Pages

Thursday, 18 April 2019

আল-কুরআনের ভাবানুবাদঃ (৮৩) সূরাতু আল্‌-মুত়াফ়্‌ফ়িফ়ীন (ওজনে প্রতারণা করে যারা)

৮৩) সূরাতু আল্‌-মুত়াফ়্‌ফ়িফ়ীন (ওজনে প্রতারণা করে যারা)

 মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত ৩৬, রুকু’ ১

 

بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيمِ

আল্লাহ্‌র নামে (শুরু করছি), তিনি পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু।

وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ

যারা মাপে কম দেয় তাদের জন্য রয়েছে দুর্ভোগ,

الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُواْ عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ

যারা লোকের কাছ থেকে যখন মেপে নেয় তখন পূর্ণ মাত্রায় নেয়;

وَإِذَا كَالُوهُمْ أَو وَّزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ

কিন্তু যখন লোকেদেরকে মেপে দেয় কিংবা ওজন করে দেয় তখন কম করে দেয়।

أَلَا يَظُنُّ أُولَئِكَ أَنَّهُم مَّبْعُوثُونَ

তারা কি চিন্তা করে না যে, তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে (কড়ায়গণ্ডায় সেই হিসেব মিটিয়ে দেওয়ার জন্য),

لِيَوْمٍ عَظِيمٍ

সেই মহা দিবসে?

يَوْمَ يَقُومُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ

যেদিন সমগ্র মানবজাতি বিশ্ব পালনকর্তার সামনে দাঁড়াবে।

كَلَّا إِنَّ كِتَابَ الفُجَّارِ لَفِي سِجِّينٍ

কখনই নয়, নিশ্চয় পাপাচারীদের আমল-নামা (অর্থাৎ কৃতকর্মের নথি) সিজ্জীনে (সংরক্ষিত) রয়েছে।

وَمَا أَدْرَاكَ مَا سِجِّينٌ

আর সিজ্জীন কী— তুমি কী জানো তার সম্পর্কে?

كِتَابٌ مَّرْقُومٌ

সিজ্জীন হচ্ছে একটি লিপিবদ্ধ খাতা।

وَيْلٌ يَوْمَئِذٍ لِّلْمُكَذِّبِينَ

সেদিন দুর্ভোগ ও দুর্গতি হবে মিথ্যা আরোপকারীদের,

الَّذِينَ يُكَذِّبُونَ بِيَوْمِ الدِّينِ

যারা প্রতিফল দিবসকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।

وَمَا يُكَذِّبُ بِهِ إِلَّا كُلُّ مُعْتَدٍ أَثِيمٍ

তবে সীমালংঘনকারী পাপিষ্ঠরা ছাড়া অন্য কেউই একে মিথ্যা মনে করে না।

إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِ آيَاتُنَا قَالَ أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ

যখন তাদের কাছে আমার (আল্‌-কুর্‌আনের) আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তারা বলে— এ তো পুরাকালের উপকথা।

كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِم مَّا كَانُوا يَكْسِبُونَ

কখনই না, বরং তারা যা করে সেই অপকর্মগুলোই তাদের হৃদয়ে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে।

كَلَّا إِنَّهُمْ عَن رَّبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَّمَحْجُوبُونَ

কখনই না, তারা সেদিন তাদের পালনকর্তার দর্শন থেকে পর্দার অন্তরালে থাকবে।

ثُمَّ إِنَّهُمْ لَصَالُوا الْجَحِيمِ

অতঃপর তারা অতি অবশ্যই জাহান্নামের গনগনে আগুনে প্রবেশ করবে।

ثُمَّ يُقَالُ هَذَا الَّذِي كُنتُم بِهِ تُكَذِّبُونَ

তারপর (তাদেরকে) বলা হবে— এই তো সেই জিনিস, যাকে তোমরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে।

كَلَّا إِنَّ كِتَابَ الْأَبْرَارِ لَفِي عِلِّيِّينَ

কখনই নয়, নিশ্চয় সৎ লোকদের আমল-নামা ‘ইল্লিয়্যীনে (সংরক্ষিত) রয়েছে।

وَمَا أَدْرَاكَ مَا عِلِّيُّونَ

আর ‘ইল্লিয়্যীন কী— তুমি কী জানো তার সম্পর্কে?

كِتَابٌ مَّرْقُومٌ

‘ইল্লিয়্যীনও একটি লিপিবদ্ধ খাতা।

يَشْهَدُهُ الْمُقَرَّبُونَ

আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতারা এই খাতাকে প্রত্যক্ষ করে।

إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ

নিশ্চয় সৎ ও পুণ্যবান লোকেরা (জান্নাতে) অতি স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে,  

عَلَى الْأَرَائِكِ يَنظُرُونَ

তারা (সেখানে) সুসজ্জিত আসনে বসে অবলোকন করবে।

تَعْرِفُ فِي وُجُوهِهِمْ نَضْرَةَ النَّعِيمِ

তুমি তাদের মুখমণ্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের সজীবতা দেখতে পাবে।

يُسْقَوْنَ مِن رَّحِيقٍ مَّخْتُومٍ

তাদেরকে মোহরাঙ্কিত বিশুদ্ধ সুধা পান করানো হবে।

خِتَامُهُ مِسْكٌ وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ

সেই সুধার মোহর হবে কস্তুরীর। আর তাই এ বিষয়ে প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিৎ।

وَمِزَاجُهُ مِن تَسْنِيمٍ

আর তাতে মেশানো হবে তাস্‌নীমের পানি;

عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا الْمُقَرَّبُونَ

তাস্‌নীম (মূলত) একটি ঝর্ণা, যার পানি পান করবে (আল্লাহ্‌র) নৈকট্যপ্রাপ্ত লোকেরা।

إِنَّ الَّذِينَ أَجْرَمُوا كَانُواْ مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا يَضْحَكُونَ

(পার্থিব জীবনে) যারা নানা ধরণের অপরাধ করতো তারাই বিশ্বাসীদেরকে উপহাস করতো।

وَإِذَا مَرُّواْ بِهِمْ يَتَغَامَزُونَ

তারা যখন তাদের কাছ দিয়ে অতিক্রম করতো তখন (ঠাট্টা করে) পরস্পরে চোখ টিপে ইশারা করতো।

وَإِذَا انقَلَبُواْ إِلَى أَهْلِهِمُ انقَلَبُواْ فَكِهِينَ

তারা যখন নিজ পরিবার-পরিজনদের কাছে ফিরত তখনও হাসাহাসি করতে করতে ফিরতো।

وَإِذَا رَأَوْهُمْ قَالُوا إِنَّ هَؤُلَاء لَضَالُّونَ

আর তারা যখনই তাদেরকে (অর্থাৎ বিশ্বাসীদেরকে) দেখতো, বলতো— এরা তো বিভ্রান্ত ও বিপথগামী।

وَمَا أُرْسِلُوا عَلَيْهِمْ حَافِظِينَ

কিন্তু তাদেরকে তো বিশ্বাসীদের তত্ত্বাবধায়ক রূপে প্রেরণ করা হয়নি।

فَالْيَوْمَ الَّذِينَ آمَنُواْ مِنَ الْكُفَّارِ يَضْحَكُونَ

আর তাই যারা বিশ্বাসী আজ তারা অবিশ্বাসীদেরকে উপহাস করবে।

عَلَى الْأَرَائِكِ يَنظُرُونَ

সুসজ্জিত আসনে বসে তাদেরকে অবলোকন করবে।

هَلْ ثُوِّبَ الْكُفَّارُ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ

অবিশ্বাসী ও অসৎ লোকেরা (পার্থিব জীবনে) যে সব অপকর্ম করতো তার উপযুক্ত প্রতিফল (আজ) তারা পেয়েছে তো?

ভাবানুবাদ- আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

Sunday, 14 April 2019

আমার মায়ের ইফতার - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



আমি তখন ক্লাস টু কিংবা থ্রিতে পড়ি। সে সময় গ্রামে সদ্য বিদ্যুৎ এসেছে বটে, কিন্তু সংযোগ ছিল হাতে গোনা কয়েকটি বাড়িতে। সবার তো আর সে সামর্থ্য ছিল না। গ্রামের মসজিদেও তখনো বিদ্যুৎ সংযোগ সম্ভব হয়নি আর তাই রাত নামলেইমাগরিব, এশা কিংবা ফজরের নামাজের সময় আছোল বড়আব্বা কখনো হ্যারিকেন, কখনো টুকটুকি জ্বালাতেন। কখনো আবার নিজের বাড়ি থেকে নম্ফ নিয়ে আসতেন অন্ধকার দূর করতেমসজিদের বাম পাশে নির্মিত মিনার-আকৃতির উঁচু জায়গাটিতে উঠে তিনি সর্বশক্তি দিয়ে আজান দিতেন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর মসজিদ-লাগোয়া কয়েকটি বাড়ির সীমানা পেরোতো না।

সেই সময় রমজান মাস এলেই আমাদের মতো বাড়ির বাচ্চাদের ঘাড়ে চাপত এক বাড়তি দায়িত্বমাগরিবের আজানের খবর বাড়ি পৌঁছে দেওয়া। তাই সূর্যাস্ত ঘনিয়ে এলে আমরা কেউ লুকোচুরি, কেউ বুড়ি ছোঁয়া, কেউ কিতকিত কিংবা গাদি খেলা ছেড়ে দৌড়ে আসতামকারও হাতে তখনো ছেঁড়া প্লাস্টিক আর দড়ি দিয়ে বানানো ফুটবল, কেউ বা গাছের ডাল কেটে বানানো ব্যাটটা পাশে রেখে ছুটে আসত মসজিদ সংলগ্ন কল-তলায়।

তারপর গাঁ-পোখোরিয়া নালায় নেমে চলত জলকেলি। হুড়োহুড়ি, জামা টানাটানি, মুখ ভ্যাংচানো, নাম বিকৃতি করে খেপানোআরও কতোকিছু। কিন্তু যেই আছোল বড়আব্বার কণ্ঠে মাগরিবের আজান ভেসে আসত, অমনি সবাই যে যার বাড়ির দিকে দৌড় দিতামশরীরের সর্বস্ব শক্তি ঢেলে, প্রাণপণে। সেই সাথে কণ্ঠ উজাড় করে চেঁচাতাম, “জান হই গেইছে—! এফ্‌তার করি নেও!

কোনোমতে দরজা ঠেলে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকতাম। আমার গলা শুনেই মা-বাবা আগেভাগে ইফতার করে নিতেন। আর আমি ঢুকেই সোজা ছুটে যেতাম মায়ের কাছে। তাঁর আঁচলে মুখ মুছতাম। মা তখন কী যেন বিড়বিড় করতে করতে আমার মুখে এক চিমটে আদা-কালাই পুরে দিতেন। 

তখন গ্রামে মানুষ এভাবেই ইফতার করত। আজও বহু গ্রামে সেই চিত্র খুব একটা বদলায়নি। এক বাটি মুড়ি, সঙ্গে বাসি তরকারি বা শাকভাজা। কপাল ভালো হলে বা অবস্থা একটু সচ্ছল হলে ছোলা-মটরের ঘুগনি। কখনো হাট থেকে আনা গরম গরম দুটো জিলিপি, কখনো বা মোড়ের দোকানের দুপিস পেঁয়াজি-বেগুনি। শহরের ইফতার পার্টির বাহারি আয়োজন গ্রামবাংলার শতকরা পঁচানব্বই জনের বরাতে যে আজও জোটে নাতা আমি হলফ করে বলতে পারি।

অনেক বছর পর, বড় হয়ে কিছু বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে জানতে পারলামখেজুর বা জল দিয়ে ইফতার করাই উত্তম। নবীজি নিজে খেজুর না পেলে জল দিয়ে ইফতার করতেন এবং নিজ উম্মতকে তিনি সে নির্দেশই দিয়েছেন[1]আরও জানলাম, মা যখন আমাকে ইফতার করাতেন, তখন তাঁর বিড়বিড়ের মধ্যে থাকত ইফতারের দুআ— “আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিযকিকা আফতারতু[2]

কয়েক বছর আগে সিয়াম সম্পর্কিত একটা বই পড়তে গিয়ে জানতে পারলামএই হাদিসটির বর্ণনাসূত্রে দুর্বলতা রয়েছে, যার ফলে এর প্রামাণ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ‘জারহু ওয়া তা’দীল' (হাদিস যাচাইয়ের ব্যাকরণ)-এর বিদ্বানদের মতামত ও সিদ্ধান্তও চোখে পড়ল। সত্যিই, বর্ণনাশৃঙ্খলের বিচারে হাদিসটি দুর্বল। তবে ইফতারের আরেকটি দুআও রয়েছে, যা ব্যাকরণের দৃষ্টিতে হাসান (অর্থাৎ প্রামাণ্য)। দুআটি হলো— “যাহাবায্‌ যামাউ, ওয়াব্‌তাল্লাতিল উরুক্বু, ওয়া সাবাতাল আজরু ইন শা আল্লাহ্‌।[3]

মা এখন সত্তরের দোরগোড়ায়। শরীর আর স্মৃতিশক্তি দুটোই ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই বয়সে নতুন কিছু রপ্ত করা সত্যিই কঠিন; নিয়মিত অনুশীলন তো আরও কঠিন। তাই ইদানীং প্রতি বছর রমজানের শুরুতেই মেছুয়া-নিউ মার্কেট ঘুরে মায়ের জন্য আলাদা করে ভালো, নরম খেজুর কিনে লোক মারফত পাঠিয়ে দিই।

তারপর ঈদের ছুটি পেয়ে বাড়ি ফিরি শেষ রোজার দিন বা তারও এক-দু দিন আগেবিকেলে মায়ের সঙ্গে বসে ইফতারের আয়োজন করি। পাশের বাড়ির দু-চারজনকে নেমন্তন্ন করা হয়কখনো আবার পাড়া-প্রতিবেশী মিলেও সম্মিলিত ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়। সবাই বসে আজানের অপেক্ষা করি। কেউ দুআ-দরুদ পড়ে, কেউ ইহলোক-পরলোকের মঙ্গল কামনা করে, কখনো আবার সমস্বরে মোনাজাতও করা হয়।

এরপর যখন মসজিদের মাইক থেকে আল্লাহু আকবার ধ্বনি ভেসে আসে সবাই খেজুর মুখে দিয়ে ইফতার করে। কিন্তু মা, সামনে খেজুর থাকা সত্ত্বেও আজও কেন জানি সেই এক চিমটে আদা-কালাই আগে মুখে দেয়তারপর খেজুর। জিজ্ঞেস করলে মুচকি হেসে বলে,

—“ও মা, মনে থাকে না বা...!” 
 
০৯/০৪/২০১৯
তপ্সিয়া, কোলকাতা

[1]  মুসনাদ আহমাদ: ১২২৬৫; আবু দাউদ: ২৩৫৬
[2]  আবু দাউদ: ২৩৫৮। এর অর্থ— হে আল্লাহ্‌, আমি কেবল তোমারই জন্য এই রোজা রেখেছি এবং তোমার দেওয়া খাবার দিয়েই ইফতার করছি।
[3]  আবু দাউদ: ২৩৫৭; শাইখ আলবানি রহ. হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। এর অর্থ— পিপাসা মিটে গেছে, স্নায়ুগুলো সতেজ হয়ে উঠেছে এবং প্রতিদান নির্ধারিত হয়ে গেছে, ইন্‌ শা আল্লাহ্‌! 

Thursday, 11 April 2019

বদিউর রহমানঃ মীরা, কেমন আছ?




মীরা, কেমন আছ?
বদিউর রহমান

“মীরা কেমন আছ?” কথাটা বলতে চেয়েও বলতে পারিনি। সে তখন সস্তা মদের নেশায় টলতে টলতে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। চুলগুলো অবিন্যস্ত, ক্ষুধাতুর শীর্ণকায় শরীরটাকে টানতে টানতে। মুহূর্তের জন্য তার থেমে যাওয়ায় আমার ধারণা সেও বিলক্ষণ আমাকে চিনতে পেরেছে। হয়তো সেও কুশল জিজ্ঞাসা করতে চেয়েছিল। ছোটবেলার এক খেলার সঙ্গীকে।
আমাদের বাড়ির অনতিদূরে আমাদের একটা পুকুর আছে। পশ্চিম পাড়ে বেশ কিছু আমগাছ। একপাশে রউফদের মাটির ঘর। ওর বাবা একজন রাজমিস্ত্রী। বিহারের লোক। নন্দীবাবু তাদেরকে ঐ জায়গায় থাকতে দিয়েছিলেন।
নন্দীবাবুর বিশাল রাইস মিল। ধান শুকানোর জন্য বিস্তৃত এলাকাজুড়ে সিমেন্ট করা ঘেরা চাতাল। সেই চাতাল, দেওয়াল ইত্যাদিতে প্রায়শই মিস্ত্রী কাকুর কাজ। তাই তাদেরকে নন্দী বাবুর ঐ জায়গায় বসবাস করতে দেওয়া। মিস্ত্রী কাকুর ছেলেমেয়ে—আনোয়ার, রউফ, যুবাইদা কাউকে কখনো স্কুলে যেতে দেখিনি। তারা ছোট থেকেই লোকের বাড়ি কাজ করত। আনোয়ার ভাই আমাদের বাড়িতে বেশ কয়েক বছর ছিল। তার ছোট ভাই রউফ ছিল আমার বয়সী। সে ছিল ভীষণ দুরন্ত ও সাহসী। যুবাইদা তাদের ছোট্ট ফুটফুটে বোন। সুন্দর মুখশ্রী। গায়ের রঙটা চাপা হলেও ভারি মিষ্টি ছিল তার চেহারা। কে বলবে যে সে এক রাজমিস্ত্রীর মেয়ে।
রউফদের বাড়ির কাছে একটা আমগাছের ডালে বাঁধা ছিল একটা দোলনা। কখনো কখনো খেলার জন্য রউফদের বাড়ি যেতাম। দোলনাটা ছিল বিশেষ আকর্ষণ। আমরা পালা ক’রে দুলতাম। সেখানে মাঝেমধ্যেই আর একটা মেয়ে আসত। নাম তার মীরা। সে দোলনা চাপায় খুব পটু। আমরা যত জোরে তাকে দোলা দিতাম সে নির্ভয়ে দোল খেত আর ততোধিক জোরে হাসত। তার হাসিটা মনে হতো পর্বত শিখর থেকে ঝরে পড়া প্রবল স্রোতের ঝর্ণা। অমন নির্মল হাসি খুব কম শুনেছি। মীরা ছিল ছিপছিপে শ্যামবর্ণের। কাটা কাটা নাক চোখ। হাসলে পরে সারিবদ্ধ উজ্জ্বল সাদা দাঁতগুলো মুক্তমালার মতো দেখাত।
একদিন বিকেলে দোলনা চড়ার পর রউফ বলল, “চল বালির পাহাড়ে”। নন্দী বাবু বালির খাদ করছে আর বালিগুলো মাটির তলা থেকে তুলে পাহাড়ের মতো স্তূপ করা বালির পাহাড় ছিল অনতিদূরে। অতএব সেখানে যেতে কোনো বাধা ছিল না।
রউফের দেখাদেখি আমরা সকলে বালির পাহাড়ে উঠলাম। অনেক উঁচুতে উঠে রউফ নীচের বালিতে দিল ঝাঁপ। আমরাও বালিতে ঝাঁপ  দেওয়া খেললাম। বালির স্তূপে ঝাঁপ দেওয়ায় কোনো কষ্ট নেই। আছে বেশ শিহরণ। এক নতুন ধরণের খেলা। বেশ উপভোগ করলাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগে আমরা সকলে যে যার বাড়ি অভিমুখে রওয়ানা দিতে চাইলে মীরা বলল “আমি এখন বাড়ি যাব না। বাড়িতে এখন লোক থাকে। মা মারবে।” তাকে বললাম, “সন্ধ্যাবেলায় পড়তে বসবি না?” সে বলল, “আমি পড়ি না। তোদের মতো স্কুলেও যাই না।” ভেবেছিলাম ওর কী মজা! পড়াশুনোর কোনো ঝক্কি ঝামেলা নেই। দিনরাত শুধু খেলা আর খেলা।
তারপর যত বড় হয়েছি আমার খেলাধূলা তত কমেছে পড়াশুনোর চাপে। বিশিষ্ট বিষয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য ছাড়তে হয়েছে নিজের গ্রাম। দীর্ঘদিন কলকাতা শহরে থাকতে থাকতে ভুলে গিয়েছিলাম অনেক কথা, বহু চেনা-জানা মুখ। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর পর হলেও মীরাকে চিনতে ভুল করিনি যদিও ছেলেবেলার মীরার সঙ্গে বর্তমান মীরার আকাশ-পাতাল তফাৎ। বর্তমান মীরা বিগত দিনের জীবন্ত প্রেতাত্মা। চেনা সত্ত্বেও তাকে কুশল জিজ্ঞাসা করতে পারলাম না। ছেলেবেলায় বুঝিনি, বড় হয়ে জেনেছিলাম ওরা নিষিদ্ধ এলাকার মানুষ। এক সময় মীরা ছিল নির্মল, নিষ্পাপ। খেলা করেছি নির্দ্বিধায়। এখন তাকে আমার জিজ্ঞাসা করা যাবে না “মীরা কেমন আছ?”

০২-০৬-২০০৭
সল্টলেক, কলকাতা


Thursday, 4 April 2019

স্যার বদিউর রহমান শতকোটি অভিনন্দন আপনাকে!



স্যার বদিউর রহমান, শতকোটি অভিনন্দন আপনাকে!
আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

অধ্যাপক মুহাম্মদ বদিউর রহমান। পশ্চিমবঙ্গজুড়ে আরবি মহলের  একটি সুপরিচিত নাম। ছাত্রদের মাঝে "বি আর স্যার" নামে অধিক চর্চিত। পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি ভারতের অন্যান্য রাজ্য এবং বাংলাদেশেও তিনি এক সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। ১৯৮৩ থেকে শিক্ষকতা করছেন। কয়েক দশক যাবৎ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। বিভাগীয় প্রধানের পদও সামলেছেন বহুবার। ২০১২ সালে অবসর গ্রহণ করার পরও কয়েক বছর এক্সটেনশন-এ ছিলেন। সে-সময়েই (২০১২-২০১৪) আমি তাঁর শিষ্যত্ব লাভের সুযোগ পাই। বর্তমানে তিনি আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগে ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি রূপে কর্মরত। 

শিক্ষকতার পাশাপাশি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট মেম্বার, সেনেট মেম্বার, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল মেম্বারের দায়িত্বও সামলেছেন। তাঁর এক অপূর্ব গবেষণা কর্ম হল "ইস্‌লামিক স্টাডিজ ইন্‌ বেঙ্গল"। এটি ছিল স্যারের পি এইচ ডি-র থিসিস। ডক্টর ত্বহা হুসাইন এর তিনি অনুরাগী। তাঁর পাণ্ডিত্য ও প্রতিভা সম্পর্কিত একাধিক আর্টিকেলও লিখেছেন। সেগুলি পরবর্তীতে "এসেজ অন ত্বহা হুসাইন" নামে বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। আরবি সাহিত্যের ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর একটি খুব সুন্দর বইও আছে, "হিস্ট্রি অফ এরাবিক লিটারেচার" নামে। এছাড়া বিভিন্ন পত্রিকা ও জার্নালে তাঁর বহু মূল্যবান আর্টিকেল ও গবেষণা পেপার প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর গবেষণা ও কাজকর্মের মুখ্য উপজীব্য হল--  "রবীন্দ্রভাবনা ও আরববিশ্ব", "রবীন্দ্রনাথ ও আরবজগৎ", বঙ্গভূমিতে আরবি চর্চার ইতিহাস, আলিয়া মাদ্‌রাসা ও ওরিয়েন্টালিস্টদের অবদান। আল্লামা মাসুমি, প্রোফেসর মাসুদ হাসান, প্রোফেসর যুবায়ের খান, প্রোফেসর রাহাতুল্লাহ প্রমুখদের খুব কাছের এবং প্রিয় ছাত্র ছিলেন। তাঁদের সম্পর্কে স্যারের কিছু স্মৃতিচারণামূলক তথ্যবহুল রচনাও রয়েছে। 

এসবের পাশাপাশি তিনি কবিতা লেখেন। আরবি ও বাংলা উভয় ভাষায় কাব্য চর্চা করেন। বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর বহু কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বহু ছোটগল্পেরও স্রষ্টা। তাঁর অপূর্ব কয়েকটি ছোটগল্প হল-- ছাতা কাহিনী, টাইম বাবু, ইংরেজি শেখা, মাস্টার মশাই এবং সবই মায়া। বাংলা ও আরবির পাশাপাশি ইংরেজি, হিন্দি এবং উর্দু সাহিত্যেও স্যারের বেশ দখল রয়েছে। ক্লাসে আরবি কাব্যকবিতা বা অন্য কিছু পড়ানোর সময় হরহামেশায় তিনি শেক্সপিয়ার, কিটস, ওয়ার্ডসওয়াথ, মুন্সী প্রেমচাঁদ, গালিব, ইকবাল, নজ্রুল, শরৎ, মাইকেল, রবি ঠাকুর প্রমুখদের রচনার উদ্ধৃতি দিতেন।      

বাংলার বর্তমান প্রজন্মের আরবির শিক্ষকরা প্রায় সকলেই তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ছাত্র। সুঠামদেহী, সুশ্রী, মিতভাষী এই মানুষটি বরাবরই প্রচারবিমুখ। কিন্তু সূর্যের আলো তো ছড়াবেই। ফুলের সৌরভও তো আবদ্ধ থাকে না, তার ধর্মই যে বিচ্ছুরিত হওয়া। আর তাই আরবি ভাষা ও সাহিত্যে অনবদ্য অবদানের জন্য এবার তাঁকে 
 রাষ্ট্রপতি পুরস্কারে সম্মানিত করা হল। রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি বেঙ্কাইয়া নাইডু তাঁর হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন। অধ্যাপক রাহাতুল্লা ও অধ্যাপক শহীদুল্লাহ সাহেবের পর আরবি ভাষা ও সাহিত্যের সেবার জন্য তৃতীয় বাঙালি অধ্যাপক হিসাবে তিনি এই সম্মাননা লাভ করেন।

২০১২ সালে স্নাতকোত্তরে উঠে স্যারের শিষ্যত্ব গ্রহণের সৌভাগ্য হয় আমার। সেসময় ত্বহা হুসাইনের প্রতি স্যারের অনুরাগ, তাঁর পাণ্ডিত্য ও প্রতিভা সম্পর্কিত স্যারের  লেখাগুলো আমার ভাবনার দৃষ্টিকোণকে বদলে দেয়। পরবর্তীতে আরবি সাহিত্যের ইতিহাস বিষয়ক স্যারের বইটা এবং "রবীন্দ্রভাবনা ও আরববিশ্ব" বা "রবীন্দ্রনাথ ও আরবজগৎ" সম্পর্কিত স্যারের একাধিক আর্টিকেল আমাকে পথ দেখায় অনুবাদ সাহিত্যের। অনুপ্রাণিত করে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে কাজকর্ম করতে। তারপর প্রতিনিয়ত, প্রতিদিন, সময়অসময়ে শিখতে থাকি কাব্যানুবাদের কলাকৌশল ও খুঁটিনাটি স্যারের কাছে।

বিশ্বকবি রবি ঠাকুরের আরব ও পারস্য ভ্রমণ। সেখানে আধুনিক যুগের কবি সম্রাট আহ্‌মাদ শাওক্বির বাড়িতে তাঁদের আলাপ, এবং হুসাইন শাওক্বির "আবি শাওক্বি" গ্রন্থে তার অবতারণা, ইরাকে গিয়ে কবি আয্‌-যাহাবির আপ্যায়ন, ইরান পৌঁছে শিরাজির সমাধিতে ফুল দেওয়া, এবং সে বিষয়ে খোদ রবি ঠাকুরের "পারস্যে" নামে বই লেখা এমন অনেক তথ্য উপস্থাপন করে স্যার বাঙালি আরবি পড়ুয়াদের সম্মুখে গবেষণার একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।

তপ্সিয়া, কলকাতা
০৫-০৪-২০১৯