Sunday, 14 April 2019

আমার মায়ের ইফতার - আব্দুল মাতিন ওয়াসিম



আমি তখন ক্লাস টু কিংবা থ্রিতে পড়ি। সে সময় গ্রামে সদ্য বিদ্যুৎ এসেছে বটে, কিন্তু সংযোগ ছিল হাতে গোনা কয়েকটি বাড়িতে। সবার তো আর সে সামর্থ্য ছিল না। গ্রামের মসজিদেও তখনো বিদ্যুৎ সংযোগ সম্ভব হয়নি আর তাই রাত নামলেইমাগরিব, এশা কিংবা ফজরের নামাজের সময় আছোল বড়আব্বা কখনো হ্যারিকেন, কখনো টুকটুকি জ্বালাতেন। কখনো আবার নিজের বাড়ি থেকে নম্ফ নিয়ে আসতেন অন্ধকার দূর করতেমসজিদের বাম পাশে নির্মিত মিনার-আকৃতির উঁচু জায়গাটিতে উঠে তিনি সর্বশক্তি দিয়ে আজান দিতেন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর মসজিদ-লাগোয়া কয়েকটি বাড়ির সীমানা পেরোতো না।

সেই সময় রমজান মাস এলেই আমাদের মতো বাড়ির বাচ্চাদের ঘাড়ে চাপত এক বাড়তি দায়িত্বমাগরিবের আজানের খবর বাড়ি পৌঁছে দেওয়া। তাই সূর্যাস্ত ঘনিয়ে এলে আমরা কেউ লুকোচুরি, কেউ বুড়ি ছোঁয়া, কেউ কিতকিত কিংবা গাদি খেলা ছেড়ে দৌড়ে আসতামকারও হাতে তখনো ছেঁড়া প্লাস্টিক আর দড়ি দিয়ে বানানো ফুটবল, কেউ বা গাছের ডাল কেটে বানানো ব্যাটটা পাশে রেখে ছুটে আসত মসজিদ সংলগ্ন কল-তলায়।

তারপর গাঁ-পোখোরিয়া নালায় নেমে চলত জলকেলি। হুড়োহুড়ি, জামা টানাটানি, মুখ ভ্যাংচানো, নাম বিকৃতি করে খেপানোআরও কতোকিছু। কিন্তু যেই আছোল বড়আব্বার কণ্ঠে মাগরিবের আজান ভেসে আসত, অমনি সবাই যে যার বাড়ির দিকে দৌড় দিতামশরীরের সর্বস্ব শক্তি ঢেলে, প্রাণপণে। সেই সাথে কণ্ঠ উজাড় করে চেঁচাতাম, “জান হই গেইছে—! এফ্‌তার করি নেও!

কোনোমতে দরজা ঠেলে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকতাম। আমার গলা শুনেই মা-বাবা আগেভাগে ইফতার করে নিতেন। আর আমি ঢুকেই সোজা ছুটে যেতাম মায়ের কাছে। তাঁর আঁচলে মুখ মুছতাম। মা তখন কী যেন বিড়বিড় করতে করতে আমার মুখে এক চিমটে আদা-কালাই পুরে দিতেন। 

তখন গ্রামে মানুষ এভাবেই ইফতার করত। আজও বহু গ্রামে সেই চিত্র খুব একটা বদলায়নি। এক বাটি মুড়ি, সঙ্গে বাসি তরকারি বা শাকভাজা। কপাল ভালো হলে বা অবস্থা একটু সচ্ছল হলে ছোলা-মটরের ঘুগনি। কখনো হাট থেকে আনা গরম গরম দুটো জিলিপি, কখনো বা মোড়ের দোকানের দুপিস পেঁয়াজি-বেগুনি। শহরের ইফতার পার্টির বাহারি আয়োজন গ্রামবাংলার শতকরা পঁচানব্বই জনের বরাতে যে আজও জোটে নাতা আমি হলফ করে বলতে পারি।

অনেক বছর পর, বড় হয়ে কিছু বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে জানতে পারলামখেজুর বা জল দিয়ে ইফতার করাই উত্তম। নবীজি নিজে খেজুর না পেলে জল দিয়ে ইফতার করতেন এবং নিজ উম্মতকে তিনি সে নির্দেশই দিয়েছেন[1]আরও জানলাম, মা যখন আমাকে ইফতার করাতেন, তখন তাঁর বিড়বিড়ের মধ্যে থাকত ইফতারের দুআ— “আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিযকিকা আফতারতু[2]

কয়েক বছর আগে সিয়াম সম্পর্কিত একটা বই পড়তে গিয়ে জানতে পারলামএই হাদিসটির বর্ণনাসূত্রে দুর্বলতা রয়েছে, যার ফলে এর প্রামাণ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ‘জারহু ওয়া তা’দীল' (হাদিস যাচাইয়ের ব্যাকরণ)-এর বিদ্বানদের মতামত ও সিদ্ধান্তও চোখে পড়ল। সত্যিই, বর্ণনাশৃঙ্খলের বিচারে হাদিসটি দুর্বল। তবে ইফতারের আরেকটি দুআও রয়েছে, যা ব্যাকরণের দৃষ্টিতে হাসান (অর্থাৎ প্রামাণ্য)। দুআটি হলো— “যাহাবায্‌ যামাউ, ওয়াব্‌তাল্লাতিল উরুক্বু, ওয়া সাবাতাল আজরু ইন শা আল্লাহ্‌।[3]

মা এখন সত্তরের দোরগোড়ায়। শরীর আর স্মৃতিশক্তি দুটোই ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই বয়সে নতুন কিছু রপ্ত করা সত্যিই কঠিন; নিয়মিত অনুশীলন তো আরও কঠিন। তাই ইদানীং প্রতি বছর রমজানের শুরুতেই মেছুয়া-নিউ মার্কেট ঘুরে মায়ের জন্য আলাদা করে ভালো, নরম খেজুর কিনে লোক মারফত পাঠিয়ে দিই।

তারপর ঈদের ছুটি পেয়ে বাড়ি ফিরি শেষ রোজার দিন বা তারও এক-দু দিন আগেবিকেলে মায়ের সঙ্গে বসে ইফতারের আয়োজন করি। পাশের বাড়ির দু-চারজনকে নেমন্তন্ন করা হয়কখনো আবার পাড়া-প্রতিবেশী মিলেও সম্মিলিত ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়। সবাই বসে আজানের অপেক্ষা করি। কেউ দুআ-দরুদ পড়ে, কেউ ইহলোক-পরলোকের মঙ্গল কামনা করে, কখনো আবার সমস্বরে মোনাজাতও করা হয়।

এরপর যখন মসজিদের মাইক থেকে আল্লাহু আকবার ধ্বনি ভেসে আসে সবাই খেজুর মুখে দিয়ে ইফতার করে। কিন্তু মা, সামনে খেজুর থাকা সত্ত্বেও আজও কেন জানি সেই এক চিমটে আদা-কালাই আগে মুখে দেয়তারপর খেজুর। জিজ্ঞেস করলে মুচকি হেসে বলে,

—“ও মা, মনে থাকে না বা...!” 
 
০৯/০৪/২০১৯
তপ্সিয়া, কোলকাতা

[1]  মুসনাদ আহমাদ: ১২২৬৫; আবু দাউদ: ২৩৫৬
[2]  আবু দাউদ: ২৩৫৮। এর অর্থ— হে আল্লাহ্‌, আমি কেবল তোমারই জন্য এই রোজা রেখেছি এবং তোমার দেওয়া খাবার দিয়েই ইফতার করছি।
[3]  আবু দাউদ: ২৩৫৭; শাইখ আলবানি রহ. হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। এর অর্থ— পিপাসা মিটে গেছে, স্নায়ুগুলো সতেজ হয়ে উঠেছে এবং প্রতিদান নির্ধারিত হয়ে গেছে, ইন্‌ শা আল্লাহ্‌! 

5 comments:

  1. অসাধারন..... নিজের অজান্তেই কখন যেন চোখে জল চলে এসেছিল...

    ReplyDelete
  2. Mamu osadharon likhecho...

    ReplyDelete
  3. হৃদয় ছুঁয়ে যায়......

    ReplyDelete
  4. Kichu Boler ney ...sotty .. Allah apnk uttom protidan dik... present /future every day jno notun valo kichu sekhar/ korer toufik dan koruk

    ReplyDelete