পুরোনো বাড়ি ছেড়ে নতুন বাড়িতে এসে উঠেছি মাস ছয়েক হবে। নতুন বাড়ি মানেই তো নতুন করে গুছিয়ে নেওয়া জীবন, কিন্তু
আমাদের ক্ষেত্রে তা হয়নি। নতুন ঘরদোরের তো কোন বালাই ছিল না। আগে যেগুলো আমাদের বৈঠকখানা ছিল, সেগুলোই আমাদের থাকার ঘর হল। আর তার একটাতে আব্বা থাকতে আরম্ভ করলেন,
একটাতে মা ও আমি, আরেকটাতে বড়দা ও মেজদা।
আষাঢ় মাসের দিন সবে পড়েছে। আকাশে-বাতাসে বর্ষার গন্ধ, মাটিতে সোঁদা সোঁদা আর্দ্রতা, আর আমার শরীরে সিজিনাল জ্বরের ছায়া। টানা দু’দিনের প্রবল জ্বরে কাহিল হয়ে পড়েছিলাম। কখনো কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে, তো
কখনো শরীর ভেঙে যাচ্ছে অবসাদে। ডাক্তার ওষুধ দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু সেই ওষুধ খেয়ে মুখ এমন তেঁতো হয়ে গেছিল যে জল পর্যন্ত
গিলতে কষ্ট হচ্ছিল। সবকিছুই বিস্বাদ ও অরুচিকর ঠেকছিল। জ্বর যেন শুধু শরীরকেই নাকাল করে দেয়নি, মুখের
স্বাদও কেড়ে নিয়েছিল।
সেদিন বিকেলে হঠাৎ করেই আকাশ কালো হয়ে এলো। দূরে কোথাও মেঘ গর্জাচ্ছে। দাদারা তখন উঠোনে ছুটোছুটি করছে,
গরু-ছাগলগুলোকে তাড়াতাড়ি গোয়ালে তুলতে হবে। মা ব্যস্ত হয়ে
জ্বালুনখড়ি হেঁসেলে গুছিয়ে রাখছেন, বৃষ্টি নামলে
আর বাইরে যাওয়া যাবে না। আর আমি তখন নিঢাল শরীর নিয়ে বাবার ঘরে শুয়ে আছি। মাথাটা পাথরের মতো ভার, শরীর জ্বরের আগুনে ঝলসে যাচ্ছে। আর বাবা শিয়রে বসে আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
বাবার সেই হাতের স্পর্শ আজও যেন আমার কপালে লেগে আছে। কত মমতা, কত স্নেহ,
কত নির্ভরতা ছিল সেই স্পর্শে! তিনি আমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে হজরত আইয়ুব (আঃ)-এর কাহিনি
শোনাচ্ছিলেন। অসুস্থতার মধ্যেও বাবার কণ্ঠে গল্প শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, জ্বরের কষ্ট যেন একটু একটু করে কমে আসছে। হঠাৎ বাবা স্নেহমাখা গলায় জিজ্ঞেস
করলেন,
—“কিছু খাবে বাবু…
বলো কী খেতে ইচ্ছে
করছে তোমার?”
আমি কষ্ট করে
বললাম,
—“কিছুই ভালো লাগছে না, বাবা। যা খাচ্ছি সবই কেমন তেঁতো লাগছে।”
বাবা একটু ভেবে
বললেন,
—“মিষ্টি খাবে? মজিদকে আনতে বলবো?”
আমি মাথা নেড়ে
বললাম,
—“না বাবা, কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে
না।”
বাবা তখন আরেকটু
ঝুঁকে মমতা জড়ানো কণ্ঠে বললেন,
—“আচ্ছা, মাছ-ভাত খাবে?”
আমি যেন অনেক কষ্টে মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ইচ্ছেটুকু খুঁজে পেলাম। আস্তে করে বললাম,
—“মাগুর মাছ আর মুসুর ডালের বড়া খাবো, বাবা।”
বাবা একগাল
মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে ছিল আশ্বাস, ছিল স্নেহ, ছিল এমন এক নিশ্চিন্ততা, যেন আমি যা চাইছি, তা তিনি এনে দেবেনই। তিনি শুধু বললেন,
—“আচ্ছা।”
কিছুক্ষণের
মধ্যেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। টিনের চাল, উঠোন, গাছের পাতা
সব একসঙ্গে বৃষ্টির তালে মুখর হয়ে উঠল। বাবা একটি পাতলা
খেন্দা মানে কাঁথা আমার গায়ে জড়িয়ে দিয়ে বললেন,
—“তুমি একটু ঘুমাও।”
এই বলে তিনি বাইরে চলে গেলেন। কখন যে বৃষ্টির শব্দে, শরীরের ক্লান্তিতে,
আর বাবার হাতের উষ্ণতায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, তা টেরই পাইনি। ঘুম ভাঙল হৈহট্টগোল শুনে। চোখ খুলে দেখি, চারদিক আবছা অন্ধকারে
ঢেকে গেছে। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ঠিক তখনই বাতাস ভেদ করে মাগরিবের
আজান ভেসে এলো। আমার সাড়া পেয়ে বাবা ঘরে ঢুকলেন। তাঁকে দেখে আমি অবাক—ভিজে একেবারে যবুথবু! গায়ের কাপড় চুপচুপে, চুল ভিজে কপালে
লেগে আছে। কিন্তু তাঁর মুখে কী অপার উচ্ছ্বাস! একগাল হেসে বললেন,
—“বাবু,
বাইরে আসো,
দেখো কী কাণ্ড হয়েছে!”
আমি কোনোরকমে উঠে বাইরে গেলাম। গিয়ে দেখি, একটা হাঁড়িতে অনেকগুলো
মাগুর মাছ কিলবিল করছে। বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলাম,
—“বাবা, এতগুলো মাগুর মাছ!
কোথায় পেলে?”
বাবা ছোট্ট ছেলের মতো আনন্দ নিয়ে বললেন,
—“আমি আর তোমার মেজদা পুন্যা দীঘির নালায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামায় মাছগুলো ডাঙায় উঠে
আসছিল। আমরা জাল নিয়ে তৈরি ছিলাম। ব্যাস,
ধরতে শুরু করলাম!”
আমি আরও
কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
—“কতগুলো ধরলে, বাবা?”
বাবা হেসে
বললেন,
—“ওই,
চল্লিশটার মতো হবে। আমাদের মাছ ধরতে দেখে তোমার বারি দা’ও গেছিল। ওকেও ক’টা দিয়েছি।”
মাগরিবের নামাজ শেষে বাবা আদা-চা আর মুড়ি নিয়ে বসলেন। আমাকেও এক মুঠ করে মুড়ি খাইয়ে দিচ্ছিলেন। পাশাপাশি গল্প শোনাচ্ছিলেন—ঠাকুমার ঝুলি, শেয়াল পণ্ডিত,
আরও নানা রকম মজার কাহিনি। জ্বরের ঘোরে, আধো ঘুমে-আধো জাগরণে আমি বাবার থেকে গল্প শুনছিলাম; মনে হচ্ছিল, বাইরের অন্ধকার,
বৃষ্টি, জ্বর সবকিছুর ভেতরেও এক অদ্ভুত নিরাপদ আশ্রয়ে আছি আমি। সেই আশ্রয়ের নাম—বাবা।
ক’দিনের জ্বরে শরীরটা এক্কেবারে কাহিল হয়ে গেছিল। ফলে
কিছুক্ষণ পর আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম, জানা নেই। হঠাৎ বাবার ডাকে
ঘুম ভাঙল,
—“বাবু,
ওঠো,
ভাত খাবে চলো।
তোমার মা তোমাদের জন্য খাবার নিয়ে বসে আছে।”
বাইরে তখন বেশ গাঢ় অন্ধকার। আমি উঠে কুলি করে, মুখে-হাতে জল দিয়ে হেঁশেলে গেলাম। গিয়ে দেখি, মা গরম গরম ভাত বেড়ে বসে আছেন। আমরা সবাই সার বেঁধে বসলাম—মা আর বাবার মাঝখানে আমি। মা বাটিতে করে আমার সামনে রাখলেন মাগুর মাছের মাথা, একটা গাদা আর ঝোল, সঙ্গে দুটো মুসুর ডালের বড়া আর একটা শুকনো বড়া। সেই খাবার দেখে আমার চোখ-মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। যেন জ্বর, তেতো মুখ,
অরুচি সব মুহূর্তেই কোথাও মিলিয়ে গেল!
খেতে শুরু করলাম। তিন-চার দিন পর সেদিনই প্রথম পেট ভরে ভাত খেলাম। গরম ভাতের সাথে মাগুর মাছের ঝোল,
ডালের বড়া,
কী সুস্বাদু! শেষে মাগুর মাছের মাথাটা খুব তৃপ্তি করে, তারিয়ে তারিয়ে
খেলাম। আমার খাওয়া দেখে মা-বাবার মুখে যে আনন্দ ফুটে উঠেছিল, তা আজও চোখে ভাসে। মায়ের চোখ চিকচিক করে উঠেছিল; যেন আমার সুস্থ হয়ে ওঠার প্রথম আলামত দেখে তাঁর বুকটা হালকা হয়ে গেছিল। আর বাবা হয়তো মনে মনে ভাবছিলেন, তাঁর বৃষ্টিভেজা পরিশ্রম
সার্থক হয়েছে। অন্যদিকে আমার খাওয়া দেখে মেজদা খুনসুটির ভঙ্গিতে বলে উঠল,
—“এইলা,
মিছামিছি জ্বর, মা! মাগুর মাছ দেখিই ভালো হই গেল! খামাখায় ডাক্তার দেখাবা হলি!”
এই কথা শুনে সবাই হো হো
করে হেসে উঠল। আর আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে রইলাম। আজ বহু বছর পর ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, সেদিনের সেই
আষাঢ়ের সন্ধ্যা আমার শৈশবের এক গভীর আশ্রয়ের স্মৃতি। সেখানে ছিল বাবার ভেজা কাপড়ে
লুকিয়ে থাকা সীমাহীন ভালোবাসা, মায়ের নিঃশব্দ উদ্বেগ, দাদাদের হাসি-ঠাট্টা,
আর এক অসুস্থ শিশুর মন ভালো করে দেওয়ার জন্য একটি পরিবারের
সম্মিলিত প্রয়াস। আষাঢ়ের সেই বৃষ্টি, কিলবিল করা
মাগুর মাছ,
মায়ের হাতের গরম ভাত, আর বাবার “বাবু”
ডাক সব মিলিয়ে তা ছিল আমার জীবনের
এক অমলিন,
উষ্ণ, ভালোবাসায়-ভেজা
সন্ধ্যা, যার পরশ এখনো হৃদয়ের কোণে কোথাও লেগে আছে।
হেস্টিংস, কোলকাতা
৪ জুলাই ২০২৬

No comments:
Post a Comment