Pages

Showing posts with label নবী জীবনী. Show all posts
Showing posts with label নবী জীবনী. Show all posts

Friday, 18 September 2026

ভালোবাসার বাঁধন (হযরত যায়নাব ও আবুল ‘আস রাঃ-এর) - ড. আব্দুল মাতিন ওয়াসিম


মক্কার আকাশে তখনও ভোরের আলো পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। মরুভূমির নরম বাতাসের কাঁধে চেপে কাবার চত্বর থেকে ভেসে আসছিল মানুষের কোলাহল। চারদিকে তখনও কুরাইশদের সেই পুরোনো সমাজ ব্যবস্থা, পুরোনো বিশ্বাস আর বংশগৌরবের দাপট। কিন্তু সেই পরিচিত পৃথিবীর বুকেই নীরবে জন্ম নিচ্ছিল এক নতুন ইতিহাস।
 
এই ইতিহাসের কেন্দ্রে ছিলেন যায়নাব (রাঃ)আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ (সাঃ)-এর প্রিয় কন্যা। যায়নাব (রাঃ)-এর বিয়ে হয়েছিল তাঁরই খালাতো ভাই আবুল আস ইবনুর রাবি’ (রাঃ)-এর সাথেআবুল আস ছিলেন কুরাইশদের অন্যতম ধনী, সম্মানিত ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। মক্কার বাণিজ্য জগতে তাঁর যথেষ্ট খ্যাতি ছিল সততা ও আমানতদারিতার কারণে মানুষ তাঁর পর অগাধ আস্থা রাখত। দুজনের দাম্পত্য জীবনও ছিল ভালোবাসা, বিশ্বাস ও পারস্পরিক শ্রদ্ধায় পূর্ণ।
 
কিন্তু সময় কখনো কখনো মানুষের জীবনে এমন এক মুহূর্ত এনে দেয়, যখন হৃদয়ের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির সঙ্গে বিশ্বাসের পথ আলাদা হয়ে যায়। বিয়ের কয়েক বছর পর যায়নাব (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করলেন। তিনি বিশ্বাস করলেন এক আল্লাহকে, বিশ্বাস করলেন তাঁর প্রিয় পিতা মুহাম্মদ (সাঃ)-এর নবুওয়াতকে। তাঁর হৃদয় ভরে উঠল ঈমানের আলোয়। কিন্তু সেই আলোয় আবুল আস তখনও আলোকিত হননি। তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের ধর্মেই অটল ছিলেন।
 
একই ঘরে দুজন মানুষএকজনের হৃদয়ে ঈমানের নতুন আলো, অন্যজনের হৃদয়ে পূর্বপুরুষদের বিশ্বাস। তবু ভালোবাসা কি এত সহজে শেষ হয়ে যায়?! যায়নাব (রাঃ) তাঁর স্বামীকে ছেড়ে দিতে চাইলেন না। আর আবুল আসও তাঁর প্রিয় স্ত্রীকে হারাতে চাননি। কিন্তু তাঁদের সামনে তখন এমন এক পরীক্ষা অপেক্ষা করছিল, যার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁদের ভালোবাসা, দাম্পত্য, বিশ্বাসসবকিছুকেই যেন নতুন করে সংজ্ঞায়িত হতে হবে।
 
সেদিন তাঁরা কেউই জানতেন নাএই নীরব দূরত্ব একদিন তাঁদের নিয়ে যাবে মক্কার অন্ধকার গলি পেরিয়ে বদরের প্রান্তরে, সেখান থেকে কারাগারের নিঃসঙ্গতায়, আর শেষ পর্যন্ত এমন এক মিলনের আঙিনায়যেখানে ভালোবাসা শুধু ভালোবাসা থাকবে না; হয়ে উঠবে ঈমান, ত্যাগ ও বিশ্বস্ততার এক অনন্য উপাখ্যান।
 
কুরাইশরা আবুল আসকে নানা ভাবে বোঝাতে লাগল— “যায়নাবকে তালাক দিয়ে দাও। তুমি কুরাইশের যে সুন্দরী নারীকে চাইবে, আমরা তার সঙ্গেই তোমার বিয়ে দিয়ে দেবোকিন্তু আবুল আস রাজি হলেন না। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে জানিয়ে দিলেন— “কুরাইশের সব সুন্দরী নারীকে আমার সঙ্গে বিয়ে দিলেও আমি আমার স্ত্রী যায়নাবকে ত্যাগ করতে পারব না।কী গভীর ছিল সেই দাম্পত্যের টান!
 
একদিকে যায়নাব (রাঃ)-এর ঈমান, অন্যদিকে তাঁর স্বামীর ভালোবাসাকিন্তু দু’জনের পথ তখন এক নয়। আবুল আস তাঁর ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। কুরাইশদের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর সম্পর্ক এবং প্রশ্নাতীত আনুগত্য। আর সেই আনুগত্যই তাঁকে একদিন এমন এক যুদ্ধের ময়দানে হাজির করলো, যেখানে তাঁর বিপরীতে ছিল তাঁর শ্বশুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী
 
বদরের প্রান্তর একদিকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ), যায়নাব (রাঃ)-এর বাবা। অন্যদিকে সেই বাহিনীর বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর স্বামী। ভাবুন, যায়নাব (রাঃ)-এর মনের অবস্থা! যে মানুষটিকে তিনি ভালোবাসেন, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর পরম শ্রদ্ধেয় পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। শেষ পর্যন্ত আবুল আস যুদ্ধে বন্দী হলেন। মক্কায় বসে যায়নাব (রাঃ) যখন জানতে পারলেন তাঁর স্বামী বন্দী হয়েছেন, তখন তিনি তাঁর মুক্তির জন্য নিজের গলার মূল্যবান হারটি পাঠিয়ে দিলেন, মুক্তিপণ স্বরূপ হারটি হাতে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। তাঁর চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরতে লাগলো। কারণ, এটি ছিল তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রাঃ)-এর হার, যা তিনি বিয়ের সময় মেয়েকে উপহার দিয়েছিলেন।
 
একদিকে বন্দী জামাতা, অন্যদিকে প্রিয় কন্যার ভালোবাসার স্মৃতি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাহাবাদের আব্দার মেনে সেই মুক্তিপণ ফিরিয়ে দিয়ে আবুল আসকে একটি শর্ত দিলেনযায়নাবকে মক্কা থেকে মদীনায় পাঠিয়ে দিতে হবে। আবুল আস কথা রাখলেন। যে নারীকে তিনি কুরাইশের শত প্রলোভন সত্ত্বেও ত্যাগ করেননি, সেই প্রিয় স্ত্রীকেই শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে দেওয়া কথা রাখার জন্য মদীনায় পাঠিয়ে দিলেন।
 
আর যায়নাব (রাঃ)? তিনিও স্বামীকে খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু যখন তাঁর বাবা, আল্লাহর রাসূল (সাঃ), তাঁকে মদীনায় চলে যেতে বললেনতিনি নিজের ভালোবাসাকে বুকের ভেতর চাপা দিয়ে মদীনার পথে পা বাড়ালেন। এটা ছিল তাঁর জীবনের এক বিশাল পরীক্ষা স্বামীকে ভালোবাসবেন, নাকি ঈমানকে? তিনি ঈমানকে বেছে নিলেন। তারপর শুরু হলো অপেক্ষা। এক বছর নয়, দু’ বছর নয়প্রায় পাঁচ বছর।
 
পাঁচ বছর যায়নাব (রাঃ) মদীনায় অপেক্ষা করলেন। এই দীর্ঘ পাঁচ বছরে, কত রাত কেটেছে তাঁর চোখের জলে, কতবার হয়তো মনের অজান্তে মক্কার দিকে তাকিয়ে ভেবেছেন— “আবুল আস কি কখনো ইসলাম গ্রহণ করবে না, সে কি কখনো আমার কাছে ফিরে আসবে না?”
 
তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্কও আর আগের মতো ছিল না। কারণ একজন মুসলিম নারী হিসেবে একজন অমুসলিম পুরুষের সঙ্গে তাঁর সেই দাম্পত্য বৈধ থাকেনি তবে যায়নাব (রাঃ) অপেক্ষায় থাকলেন। কোনো নতুন সংসার করলেন না। কোনো নতুন সম্পর্কের দিকে এগোলেন না। তাঁর হৃদয়ের গভীরে তখন একটা আশাই যেন অনুরণিত হচ্ছিলএকদিন আবুল আস ঠিকই ফিরে আসবেতবে শুধু আমার কাছে নয়আমার দ্বীনের কাছেও।
 
এরপর এল আরেক কঠিন অধ্যায়। একদিন আবুল আস বাণিজ্যিক কাফেলা নিয়ে মদীনার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। খবর পেয়ে সাহাবিরা সেই কাফেলাকে ধাওয়া করলেন। আবুল আস কোনোভাবে পালিয়ে গেলেন। পরে তাঁর মনে হলোএই কাফেলায় শুধু তাঁর নিজের সম্পদ নেই, কুরাইশদেরও আমানত রয়েছে। তিনি মদীনায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
 
কিন্তু যাবেন কোথায়? যে শহরে তাঁর কোনো অধিকার নেই। যে শহরে তিনি কেবল একজন ‘মুশরিক’ যে শহরে তাঁর সঙ্গে যায়নাব (রাঃ)-এর বৈবাহিক সম্পর্কও আর আগের মতো নেই। তবু তাঁর পা তাঁকে নিয়ে গেল একটি ঘরের সামনে। যায়নাবের ঘর। মদীনার অসংখ্য ঘরের মধ্যে তিনি খুঁজে নিলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির আশ্রয়। রাতের অন্ধকারে তিনি সেখানে আশ্রয় নিলেন কী অদ্ভুত দৃশ্য! পাঁচ বছর ধরে যে নারী তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন, সেই নারীই আজ তাঁর আশ্রয়, তাঁর ঠিকানা  
 
ভোর হলো। ফজরের নামাজের সময় যায়নাব (রাঃ) ঘর থেকে বেরিয়ে ঘোষণা দিলেন আমি আবুল আসকে নিরাপত্তা দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বিষয়টি জানতে পেরে বিস্মিত হলেন। কিন্তু যায়নাব (রাঃ)-এর দেওয়া নিরাপত্তা তিনি গ্রহণ করলেন। তারপর আবুল আসকে জানিয়ে দেওয়া হলো এখন আর তিনি যায়নাবের স্বামী নন।
 
কী কঠিন সেই মুহূর্ত! যে মানুষটির জন্য যায়নাব (রাঃ) এত বছর অপেক্ষা করেছেন, যাঁর জন্য নিজের গলার হার পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছেন, সেই মানুষটি তাঁর সামনে দাঁড়িয়েতবু তিনি তাঁর স্বামী নন। কিন্তু যায়নাব (রাঃ) আবারও মেনে নিলেন। কারণ তাঁর ভালোবাসা ছিল গভীর, কিন্তু তাঁর ঈমান ছিল তার চেয়েও দৃঢ় ও গভীর।
 
এরপর আবুল আস কুরাইশদের পণ্য ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর অনুরোধ গ্রহণ করলেন। কেউ কেউ তাঁকে বললেন— “তুমি ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় থেকে যাও। এই সম্পদগুলো তোমারই থাকবে।কিন্তু আবুল আস বললেন, না। তিনি মুশরিক অবস্থাতেও ছিলেন আমানতদার। তিনি ভাবলেন— “আমি কি প্রতারণার মাধ্যমে আমার নতুন জীবন, নতুন সফর শুরু করবো?” তিনি সমস্ত পণ্য নিয়ে মক্কায় ফিরে গেলেন। এক এক করে সকল সম্পদ তার মালিকদের বুঝিয়ে দিলেন। তারপর বললেন—“তোমাদের মধ্যে কারও কি আমার কাছে কোনো পাওনা আছে?” সবাই বলল— “না।তখন তিনি ঘোষণা করলেন— “তোমরা জেনে রাখো, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি।
 
তারপর তিনি ব্যাখ্যা দিলেন, কেন তিনি মক্কায় ফিরে এসে ইসলাম গ্রহণের কথা জানালেন। তিনি বললেন, মদীনায় থাকা অবস্থায় যদি তিনি ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করতেন, তাহলে মানুষ মনে করততিনি তাদের সম্পদ আত্মসাৎ করার জন্যই মুসলিম হয়েছেন। তাই তিনি প্রথমে প্রত্যেকের আমানত ফিরিয়ে দিলেন। তারপর ঈমানের ঘোষণা দিলেন। কী অসাধারণ আমানতদারি! একেবারে কল্পনাতীত!
 
এবার তিনি মদীনার পথে রওয়ানা হলেন। সেই মদীনাযেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন যায়নাব (রাঃ)। পাঁচ বছর ধরে। পাঁচ বছরের ইন্তেজার শেষে যখন আবুল আস মদীনায় পৌঁছে ইসলাম গ্রহণের কথা জানালেন, তখন মদীনার আকাশবাতাস যেন আনন্দে ভরে উঠল। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হলেন একজন—যায়নাব (রাঃ)। যে নারী পাঁচ বছর ধরে অপেক্ষা করছিলেন, তাঁর অপেক্ষার অবসান হলো। যে স্বামীকে তিনি ভালোবেসেছিলেন, তিনি ফিরে এলেন। তবে শুধু স্বামী হিসেবে নয়মুসলিম হয়ে।  
 
যায়নাব (রাঃ)-এর জীবনের দিকে তাকালে মনে হয়, তাঁর ভালোবাসায় কোনো দুর্বলতা, কোনো মোহ ছিল না। তাঁর ভালোবাসায় ছিল ত্যাগ ও অপেক্ষা ঈমানের কাছে নিজের আবেগকে সমর্পণ করাই ছিল তাঁর কাছে ভালোবাসা তিনি স্বামীকে ভালোবেসেছিলেনকিন্তু তাঁর জন্য আল্লাহর বিধান অমান্য করেননি। তিনি স্বামীকে ফিরে পেতে চেয়েছিলেনকিন্তু সেই প্রত্যাবর্তনের পথকে ঈমানের আলোয় আলোকিত দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি পাঁচ বছর অপেক্ষা করেছিলেনতাঁর সেই অপেক্ষার প্রতিটি দিন ছিল একেকটি এবাদতসদৃশ ধৈর্যের পরীক্ষা।
 
অবশেষে তাঁদের আবার সংসার হলো। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর এ যেন এক মহামিলন। কিন্তু নিয়তি তাঁদের এই দীর্ঘ অপেক্ষার বিনিময়ে খুব বেশি সময় দেয়নি। পাঁচ বছরের বিচ্ছেদের পর, তাঁরা একসঙ্গে থাকতে পেরেছিলেন মাত্র বছর খানেক; যেন বিস্তীর্ণ কোনো মরুভূমির মাঝে এক চিলতে মরূদ্যান তারপর এক বছরের মাথায় যায়নাব (রাঃ) ইন্তেকাল করলেন। আর আবুল আসের জীবনে নেমে এল মরুভূমির শূন্যতা
 
[তথ্যসূত্র—ইব্‌নু ইস্‌হাক, সীরাতু রাসূলিল্লাহ, পৃ ৩১৩; সুনান আবু দাউদ ২৬৯২ (হাসান), ২২৪০; সুনান তিরমিযী ১১৪৩; মুস্‌নাদ আহ্‌মাদ ১৮৭৬; ইমাম বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুব্‌রা ১৪৪৪৯; মুস্তাদ্‌রাক হাকিম ৫১১৬; ইব্‌নু হিশাম, আস-সীরাহ্‌ আন-নাবাবিয়্যাহ্‌ ১/৬৫২-৬৫৯] 

Thursday, 18 September 2025

হাদীস ও সমার্থক শব্দাবলীঃ অর্থের নিরিখে

 


হাদীস সমার্থক শব্দাবলীঃ অর্থের নিরিখে

আব্দুল মাতিন ওয়াসিম

হাদীস শব্দটি মুসলিম সমাজ, সংস্কৃতি ও সাহিত্যে অধিক ব্যবহৃত ও পরিচিত। এটি মূলত আরবি ভাষার শব্দএর বিপরীত শব্দ কাদীম অভিধানে হাদীস-এর অর্থ নতুন আর কাদীম-এর অর্থ পুরাতন [আল-কামূস /১০৪, আক্রাবুল মাওয়ারিদ /১৭০] হাদীস শব্দটি কথাবার্তা, আলাপ, খবর ও বানী-এর অর্থেও ব্যবহার হয় পবিত্র আল-কুরআনে রয়েছে— “তারা (যারা নবী সাঃ-এর বিরোধিতা করছে) যদি সত্যবাদী হয় তাহলে এই আল্‌-কুরআনের মতো একটি হাদীস অর্থাৎ বানী নিয়ে আসুক” [সূরা আত-তূর ৩৪] তাছাড়া মানুষ কোনোরকম গভীর চিন্তাভাবনা ছাড়াই যে নিত্যনতুন শব্দাবলী তৈরি করে, সেই শব্দগুলোকেও আরবিতে হাদীস বলে ভাষাবিদদের মতে, এর বহু বচন আহা-দীস আর তাই বিস্ময়কর কল্পনাতীত ঘটনাবলীর বর্ণনাকে আহা-দীস বলা হয়েছে পবিত্র আল-কুরআনে রয়েছে— “অতঃপর আমি তাদেরকে (সাবা নগরীর অধিবাসীদেরকে) আহা-দীস অর্থাৎ প্রবাদ-কাহিনীতে পরিণত করেছি। [সূরা সাবা ১৯] ঠিক তেমনই খবর ও সংবাদ-এর অর্থেও হাদীস শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় পবিত্র আল-কুরআনে রয়েছে— “তোমার নিকট নবী মূসা আঃ-এর হাদীস অর্থাৎ খবর পৌঁছেছে কি?” [সূরা তাহা , সূরা নাজিআত ১৫] বিখ্যাত ভাষাবিদ ইমাম রাগিব আল-আস্ফাহানী এর অর্থ প্রসঙ্গে বলেছেন, এমন কথা যা জাগ্রত অবস্থায় বা প্রত্যাদেশ মারফৎ মানুষের নিকট পৌঁছোয়, তাকে হাদীস বলে

পরিভাষায় হাদীস বলা হয় নবীজির কথা, কাজ মৌনসমর্থনের বর্ণনাকে আর মর্মে সুন্নত শব্দটি হাদীসের সমার্থক ইমাম সাখাবী (রাহঃ)-এর মতেকথা, কাজ মৌনসমর্থনের পাশাপাশি নবীজির গুণাবলী, জাগ্রত নিদ্রিত অবস্থায় তাঁর গতিবিধির বর্ণনাও হাদীস আর ক্ষেত্রে হাদীস শব্দটি সুন্নতের তুলনায় ব্যাপক অর্থ বহন করে [ফাত্হুল মুগীস ] হাদীস শাস্ত্রের বিখ্যাত পণ্ডিত ইমাম ইবনু হাজার আল-‘আস্কালানী (রাহঃ) বলেছেনপূর্বে সাহাবা (নবীজির সহচর), তাবেয়ীন (সাহাবাদের সহচর) তাবা’-তাবেয়ীন (তাবেয়ীনদের সহচর)-দের কথা, কাজ ফাত্ওয়াহ্‌ (কুরআন হাদীসের আলোকে উদ্ভাবিত সিদ্ধান্ত মতামত)-কেও হাদীস নামে অভিহিত করা হতো [নুজহাতুন নাজার ৯৩] তবে পরবর্তী সময়ে বিষয়গুলোকে আরও স্পষ্ট করার জন্য পৃথক স্বতন্ত্র পরিভাষা তৈরি করা হয় ফলে নবীজির কথা, কর্ম মৌনসমর্থনের বর্ণনাকে হাদীস বলা হয় আর সাহাবাদের কথা, কাজ মৌনসমর্থনের বর্ণনাকেআসারএবং তাবেয়ীন তাবা’-তাবেয়ীনদের কথা, কর্ম সমর্থনকে ফাত্ওয়াহ্নামে অভিহিত করা হয় [মুকাদ্দামা সাহীহ বুখারী ১৩]

হাদীস-এর পরিভাষাকে বোঝাতে হাদীস-এর পাশাপাশি আরও তিনটি শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় প্রথমটি হলআসার এর আভিধানিক অর্থ কোনো বস্তুর এমন চিহ্ন যা তার অস্তিত্বকে প্রমাণ করে [আল-মুফরাদাত ] এর বহু বচন-সা- পবিত্র আল-কুরআনে রয়েছে— “তোমরা মহান আল্লাহ্ করুণার-সা-অর্থাৎ চিহ্নাবলীর প্রতি লক্ষ্য করো [সূরা আর-রূম ৫০] এছাড়া কোনোকিছুর অবশিষ্ট অংশকেও-সা-বলা হয় [আকরাবুল মাওয়ারিদ /, আল-কামূস /২২৪] যেমন পবিত্র আল-কুরআনে জ্ঞানবিজ্ঞানের অবশিষ্টাংশকে-সা-রাহ্‌’ বলা হয়েছে— “তোমরা আমার নিকট পূর্বের কোনো বই অথবা জ্ঞানের কোনো-সা-রাহ্‌’ অর্থাৎ অবশিষ্টাংশ নিয়ে এসো [সূরা আল-আহকাফ ] তবে পরিভাষায়আসারশব্দের চার রকম অর্থ পাওয়া যায় একহাদীস-এর সমার্থক শব্দ, অর্থাৎ নবীজির কথা, কাজ মৌনসমর্থন হলআসার দুইসাহাবা তাবেয়ীনদের কথা, কাজ মৌনসমর্থন তিনকেবলমাত্র সাহাবাদের কথা, কাজ সমর্থন, খোরাসানের ফিক্ শাস্ত্রবিদেরা এই অর্থে ব্যবহার করতেন চারসালাফ বা পূর্ববর্তী ওলামাদের বানী, ইবনু আলী আল-ফারেসী (রাহঃ) বলেন— ফিক্ শাস্ত্রের পণ্ডিতেরা এই অর্থে ব্যবহার করতেন [জাওয়াহিরুল উসূল ১০, নুজহাতুন নাজার ৮৬, তাদ্রীবুর রাবী ] অর্থের এই তারতম্যের কারণেই বিভিন্ন গ্রন্থে শব্দটির সম্বন্ধবাচক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়; যেমন-সা-রুর্রাসূল’ (নবীজির আসার) এবং-সা-রুস্সাহাবা’ (সাহাবাদের আসার)ইমাম নাবাবী (রাহঃ) প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, পূর্ববর্তী অধিকাংশ মুহাদ্দিস (হাদীস শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞরা) বিদ্বানেরা নবীজি সাহাবাদের হাদীসকেআসারনামে অভিহিত করা পছন্দ করতেন আর তাই আমরা লক্ষ্য করি, ইমাম তাহাবী (রাহঃ) নিজ সংকলন গ্রন্থ (যাতে নবীজির হাদীস সাহাবাদের আসার সংকলন করেছেন)-এর নাম রেখেছেনশার্হু মাআনীল -সা- আর ইমাম তাবারী (রাহঃ)- তাঁর একটি সংকলনের নাম দিয়েছেনতাহ্জীবুল -সা-”; তাঁর এই সংকলনটি মূলত নবীজির হাদীস সম্বলিত, তবে আনুসঙ্গিকভাবে সাহাবাদের আসারও উদ্ধৃত হয়েছে

দ্বিতীয় পরিভাষা হলখবর এর আভিধানিক অর্থ সংবাদ রাখা বা কোনো জিনিস জানা পবিত্র আল-কুরআনে রয়েছে— “তোমরা যা কিছু করো মহান আল্লাহ্সবকিছুর খবর রাখেন” [সূরা আলে ইমরান ১৫৩, আত-তাওবাহ্১৬, আল-মুজাদিলাহ্১৩, আল-মুনাফিকূন ১১] এবং যা কিছু বর্ণনা করা হয় কথায় প্রকাশ করা হয় তাকেও খবর বলে [আল-মুফরাদাত ১৪১, আক্রাবুল মাওয়ারিদ /২৫৪] আর পরিভাষায় খবর-এর তিন রকম অর্থ রয়েছে একহাদীস-এরই সমার্থক, অর্থাৎ নবীজির কথা, কাজ অনুমোদন দুইনবীজি সম্পর্কে বর্ণীত ইতিহাস ঘটনাবলী এজন্যই যারা ইতিহাস চর্চা করে তাদেরকেআখবারী’ (ইতিহাসবিদ) বলা হয়; আর যারা হাদীস চর্চা করে তাদেরকেমুহাদ্দিস’ (হাদীস শাস্ত্রের পণ্ডিত) বলে তিনখবর হাদীস-এর চেয়ে ব্যাপক অর্থ বহন করে তাই প্রত্যেকটি হাদীসই খবর, কিন্তু প্রত্যেকটি খবর হাদীস নয় কেননা, কেবল নবীজির নিকট হতে বর্ণীত কথা, কাজ অনুমোদন হাদীস পক্ষান্তরে, নবীজি অন্যান্যদের নিকট হতে বর্ণীত বিষয়সমূহ খবর ফলে খবরের উৎস নবীজি ছাড়া সমকালীন যে কোনো মুসলিম এমনকি অমুসলিমও হতে পারে আর তাই প্রত্যেক মুহাদ্দিস স্বভাবতই আখবারী, কিন্তু প্রত্যেক আখবারী মুহাদ্দিস নয় [নুজহাতুন নাজার -]

তৃতীয় পরিভাষা সুন্নাহ এর আভিধানিক অর্থ পথ, পন্থা, চরিত্র নিয়মনীতি ইত্যাদি [আকরাবুল মাওয়ারিদ /৫৫০] আর ইসলামী শরীয়তের পরিধিতে এর অর্থ নবীজির নির্দেশ নিষেধ [নিহাইয়াহ্/২০১] এজন্যই শরীয়তের বিভিন্ন আলাপআলোচনায়কিতাব সুন্নাহ” (কুরআন হাদীস) শব্দদুটো খুব শোনা যায় এছাড়া চিরাচরিত নিয়ম অভ্যাসকেও সুন্নাহ বলা হয় [আল-মুফরাদাত ২৪৫] যেমন পবিত্র আল-কুরআনে রয়েছে— “এটা আল্লাহ্ সুন্নাহ অর্থাৎ চিরাচরিত নিয়ম যা পূর্বেও ছিল [সূরা আল-ফাত্ ২৩] আর পরিভাষায় সুন্নাহ-এর বেশ কিছু অর্থ পাওয়া যায় একইমাম ইবনু হাজম (রাহঃ) বলেন, সুন্নাহ তিন প্রকার নবীজির কথা, তাঁর কাজ এবং তাঁর অনুমোদন অর্থে সুন্নাহ হাদীস-এর সমার্থক দুইনবীজির কথা, কাজ অনুমোদন এবং সাহাবাদের কথা কাজ তিনইমাম শাতেবী (রাহঃ) বলেন, নবীজি থেকে যা কিছু বর্ণীত হয়েছে, বিশেষ ভাবে যে বিষয়ে কুরআনে কোনো স্পষ্ট নির্দেশ নেই চারসাহাবাদের কর্মসমূহ, কেননা তাঁরা কেউই সুন্নাহ্ নির্দেশনা ছাড়া মনগড়া কোনো কাজ করতেন না পাঁচবিদ্‌’আত (শরীয়তে নব আবিষ্কৃত রীতি বা অপসংস্কৃতি)-এর বিপরীত শব্দ সুন্নাহ ছয়ফরজ (অত্যাবশক) ওয়াজিব (আবশ্যক) কাজ ছাড়া যে কাজগুলো নবীজি নিয়মিত করতেন শরীয়তের পরিভাষায় সেই কাজগুলোকেও সুন্নাহ বলে [ইহ্কামুল আহ্কাম /, নুরুল আন্ওয়ার ১৭৩, আল-মুওয়াফাকাত /-, কিতাবুত তারীফাত ৮২] এই সজ্ঞাগুলো থেকে বোঝা যায় যে, সুন্নাহ শব্দটি সম্পূর্ণ রূপে হাদীস-এর সমার্থক নয় কেননা, সুন্নাহ বলতে অধিকাংশ সময় নবীজির কর্ম কর্মপদ্ধতি বোঝায় পক্ষান্তরে হাদীস বলতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নবীজির কাজ-এর পাশাপাশি কথা অনুমোদনকেও বোঝায় আর তাই ইসলামী সাহিত্য, দর্শন ইতিহাসের আলাপআলোচনা ও লেখালেখিতে নবীজির আদর্শ, চেতনা, বানী বিধিনিষেধ বোঝাতে হাদীস-এর পাশাপাশি আসার, খবর সুন্নাহ শব্দগুলিরও ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়

[পূবের কলমঃ দ্বীন দুনিয়া – ২৭ জুন ২০২৫, শুক্রবার, ১২ আষাঢ় ১৪৩২-এ প্রকাশিত]